বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

মৌসুমী ব্যানার্জীর গল্পঃ স্ট্রবেরি



বিড়লা হাউসে প্রথম দেখেছিলাম স্ট্রবেরি। উজ্জ্বল লাল, সুপুষ্টু। অভিজাত মহলের ফল, বাড়ির সদস্যদের মতই মসৃণ, নিটোল । শীতের সকাল পৌনে ন'টা, লেজি ডেইসি টেবিলে ঘুরছে বর্ধিষ্ণু লাল স্ট্রবেরি, সুগন্ধি মেথি পরোটা, ধোঁয়া ওঠা ভাজি, আর ধবধবে সাদা দই। স্ট্রবেরিগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। আমার তখন ক্লাস নাইন। দুই বিনুনি বেঁধে মরা বিকেলে রিকশার হাওয়ায় ওড়না উড়িয়ে ভবেশ স্যার-এর কোচিং এ পড়তে যাই।

ট্রিগনোমেট্রি আর সাউথ পয়েন্ট-এর ফার্স্ট বয়, দুইয়ের-ই অমোঘ টান।

মাসির সঙ্গে গিয়েছিলাম বিড়লা হাউসে। আমার মাসি, আভা গান্ধী, স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত এক সুপরিচিত নাম । বাংলার মেয়ে, কর্মকান্ড এবং বিবাহসূত্রে গান্ধী পরিবারের সদস্যা । থাকতেন রাজকোটে রাষ্ট্রীয়শালায়। সেই মাসি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো বিড়লা হাউসে। বিড়লাদের কাছে পেশ করা হয়েছিল আমাকে স্কলারশিপের জন্য । বেরোবার আগে মা তড়িঘড়ি এরাম, এটা কি পড়েছিস? বলে সেলাইখোলা সেফটি পিন আটকানো কামিজ ছাড়িয়ে আলমারি থেকে ইস্তিরি করা সালোয়ার কামিজ বের করে দিয়েছিলো, আর হলদে নকশা আঁকা স্কার্ফ দিয়েছিলো সঙ্গে। প্রতিদিনের মতো গড়িয়া ব্যান্ডস্ট্যান্ড মিনির বদলে সেদিন অ্যাম্বাসেডর ট্যাক্সি চড়ে মাসির সঙ্গে গিয়েছিলাম বিড়লা হাউসে ।

মধ্যবিত্ত পরিবারের কৃতি ছাত্রীর জন্য বরাদ্দ হলো প্রতি মাসে আশি টাকার স্কলারশিপ। বাড়ি ফিরে মাসি বললো মাকে, শোন, ওকে নিয়ে প্রতি মাসে কিন্তু টাকাটা তুলে আনতে হবে তোদের – বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামে অফিস । মা দুপুরের খাবার থালায় ভাত, মোচার ঘন্ট, সজনে ডাঁটার চচ্চড়ি সাজাতে সাজাতে বললো, সে তো আপনার ভগ্নিপতি নিয়ে যাবে মেজদি। তারপর অল্প থেমে, জানেনই তো, এনাদের বড় পরিবার । মেয়েটার এই স্কলারশিপ টা হয়ে অনেকটা সুবিধে হলো । সেদিন বাড়িতে রান্না হয়েছিলো মাসির প্রিয় নারকেল দিয়ে মানকচু বাটা আর কাঁকরোলের বড়া। একতলার বড় খাটে জানালা দিয়ে যেখানে একফালি রোদ আসতো দিনভর, সেখানে শুয়ে বসে মা আর মাসি টুকটাক গল্প করলো সারা দুপুর। ওয়ার্ধার গল্প, মা'রা যে বাড়ীতে ছিল তার লম্বা দালান, সবরমতি আশ্রমের ঘরের সামনে বেড়া দেওয়া ছোট্ট বাগান, মাসির বেলফুল গাছ, আর তারই মাঝে মার ছোটবেলার বন্ধু বাজাজ পরিবারের মেয়ে সুমন-এর টুকটুকে লাল প্যান্টির গল্প। আদুরে গলায় হাসতে হাসতে মা বললো --- মনে আছে মেজদি, আমার কি শখ ছিল অমন একটা লাল প্যান্টির!
এইসবের মাঝে আমি জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পিঠের জামা তুলে দিয়ে মাসিকে আবদার করলাম, সুড়সুড়ি দিয়ে দাও না মাসি।

আলতো সুড়সুড়ির আরাম, চোখ জুড়ে স্বপ্ন স্বপ্ন লাল স্ট্রবেরি, মা'র আদুরে গলা ---- সব মিলিয়ে দুপুরটা বেশ অন্যরকম, সাউথ ক্যালকাটার দামি আহ্লাদী মেয়ের দুপুরের মতন ।

আমাদের না-শহর না-গ্রাম বৈষ্ণবঘাটা রোডের বাড়ি তখন সবে একতলা, তাও সবকটা ঘরের মেঝে হয়নি। বাবা প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে বাড়ি করছিলেন, তাই দোতলার সিঁড়ি খানিকটা উঠে থমকে ছিল, দোতলার আশ্বাস নিয়ে। দুপুরবেলায় সেই থমকে থামা সিঁড়িতে মা তেঁতুলের আচার আর বড়ি শুঁকোতে দিত, আর বিকেলে আমি কুলো সরিয়ে সেখানে বসে গীতবিতান পড়তাম কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না, শুকনো ধুলো যত, কে জানিত আসবে তুমি গো, অনাহূতের মতো। মাসি কলকাতায় এলেই এই গানটা শোনাতে হতো আমায়। সিঙ্গেল রীড হারমোনিয়াম টেনে আনা হতো সিঁড়ির ল্যান্ডিং এ, বসে যেত সা পা টিপে গানের জলসা, আগু পিছু করে সিঁড়িতে দর্শক মা, মাসি,
পাড়ার টুলুবৌদি, মাধবী কাকিমারা। 

মাসি কলকাতায় এলে আমাদের যেন উৎসব পড়ে যেত। দলবেঁধে যাওয়া হতো শহরতলীর মামাবাড়িতে। আমার ছোটমামা হিন্দমোটরে চাকরি করতেন। কলকাতা থেকে যাতায়াতের অসুবিধে বলে কোন্নগরে বাড়ি করলেন।

হুট্ করে চাইলেই তো যাওয়া যেত না, তাই বেশ গরমের ছুটিতে ভ্রমণে যাওয়ার মতো হয়ে গেলো ওই বাড়িটা। মা, বাবা, আমরা তিন বোন, রাজকোটের মাসি, আর ওদিক থেকে বালিগঞ্জের ক্যাডবেরি মামা, মানি, মুন্নু, আর রুক্মি, সবাই ভোর ভোর জড়ো হতাম হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির তলায়। সঙ্গে নারকেলের সন্দেশ কিংবা লবঙ্গলতিকা, আর আমাদের বাগানের গন্ধরাজলেবু। ছোটমামা শেষপাতে ডাল খাবে গন্ধরাজলেবু চিপে, আর মাসিরও বড্ড প্রিয়, অতএব বাজারের চটের থলিতে গোটা পঁচিশ গন্ধরাজলেবু যেত আমাদের সঙ্গে। হৈ হৈ করে ট্রেনে উঠতাম আমরা। ওই কটা তো স্টেশন কিন্তু মনে হতো যেন চলেছি অনেক দূরে ছুটিতে। ট্রেন থামতে দেখতাম স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছোটমামা --- সাদা বুকখোলা ফতুয়া, ফতফতে পাজামা, আর উদ্ভাসিত মুখ। সিগন্যাল- এর আলো বদলালেই আমরা ছোটরা ট্রেনলাইন পেরোতাম লাফিয়ে লাফিয়ে, পেছনে বড়রা হেলে দুলে গল্প করতে করতে। স্টেশনের উল্টোদিকে বাজার পেরিয়ে হীরালাল পাল গার্লস স্কুলের পরেই মামাবাড়ি।

 কাঁচাসবজি আর মাছের বাজার তখনও রমরমা, রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে মা আর মামা দুপুরের রান্নার জন্য থোড়, লালশাক কিনতে বসে যেত। 

রিকশা প্যাকপ্যাক করে হর্ন বাজিয়ে শিউলি গাছের সামনে থামতেই হাসি হাসি মুখগুলো দৌড়ে এগিয়ে আসতো গেটে ---ডাটু , তিন্নি, আর আঁচলে তেল হলুদের হাত মুছতে মুছতে বৌমা। আমার ছোটমাইমাকে আমি ভুলে গেছি কবে থেকে ডাকতাম বৌমা বলে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো মুগ ডাল ভাজার গন্ধ। হারুর মা দৌড়ে গিয়ে কেটলিতে চা-এর জল চাপাতো, আর গ্রামোফোনের পিন ফুটিয়ে ডাটু চালিয়ে দিতো চিত্রাঙ্গদা গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে পর্বতশিখরে অরণ্যে তামসছায়া। অর্জুন যখন সুরূপা চিত্রাঙ্গদা-কে দেখে বিমুগ্ধ: কাহারে হেরিলাম, একী সত্য, একী মায়া, একী সুবর্ণকিরণে রঞ্জিত ছায়া!

 তখন বাইরের খোলা বারান্দায় মোড়া পেতে বড়রা চা খাচ্ছে আর সতরঞ্চিতে আমরা ছোটরা গড়াগড়ি। 

সেই সময়ের শহরতলীর বিকেলগুলো ছিল বড্ড আটপৌরে, বড্ড নরম। বৌমা কুয়োর তোলা জলে গা ধুয়ে খোঁপা বাঁধতো, গায়ে অনেকটা পন্ডস পাউডার আর কপালে ছোট টিপ্ পরে আমাদের বলতো চল প্রসূনদের বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি তোদের। আমরা ঘাড় থেকে খানিকটা ওপরে কলাবিনুনী ঝুলিয়ে, হাওয়াই চটি ফট ফট করতে করতে মরা বিকেলে বৌমার সঙ্গে বেড়োতাম পাড়া বেড়াতে। মিলির মা'র সঙ্গে কুরুশকাঠির টেবিলকভারের ডিসাইন নিয়ে আলোচনা, তুতাম-এর ঠাকুমার হাঁটুর ব্যাথার জন্য কবিরাজী মালিশ, শঙ্কুর জেঠিমার জন্য ছোট বাটিতে

লইট্যা শুঁটকি, এইসব আদানপ্রদান সেরে যখন আমরা প্রসূনদের বাড়িতে ঢুকতাম তখন তুলসীতলায় শাঁখ বাজিয়ে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে ওর কাকিমা। ওমা, তোরা কবে এলি?এই তো আজ সকালের ট্রেনে কুট্টি বেশ লম্বা হয়ে গেছে কিন্তু এইসবের পরে ছোট ছোট স্টিলের বাটিতে আসতো আমতেলে মাখা মুড়ি, ওপরে কড়াইশুঁটি আর নারকেল কুচি ছড়ানো।

দ্বিতীয়বার স্ট্রবেরি দেখেছিলাম মাম্পির জন্মদিনে। আমার খুড়তুতো ভাই মাম্পি থাকতো যোধপুর পার্কে ওর মা আর দাদু দিদিমার সঙ্গে। মাম্পির জন্মদিনে নাহুম থেকে কেক আসতো, ওপরে গোল করে সাজানো স্ট্রবেরি, সবুজ ঝুঁটিসুদ্ধ। কাকু মাকে বলতো, ওদের ভালো ড্রেস পরিয়ে দিও বৌদি। আমার একটা নাইলনের জামা ছিল, স্ট্রেটকাট হালকা সবুজ, ছিমছাম সাদা কলার, আর বুকের কাছে দুটো সাদা মুক্তো বোতাম। সেজেগুজে আমরা কাকুর হাত ধরে বড় রাস্তা পেরিয়ে পাঁচ নম্বর বাসরুটের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সি ধরতাম। মাম্পিদের বাড়ি থেকে দু তিনটে বাড়ি এগিয়ে ট্যাক্সি থামতো। কাকু আমাদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতো--- ওই যে অনেক আলো জ্বলছে দেখছো, বড় বড় পর্দা খোলা জানালাটা, ওর পাশ দিয়েই প্যাসেজ, ঢুকে যাও। আমি একটা কাজ সেরে ঘন্টা দুয়েক বাদে এসে তোমাদের তুলে নিয়ে যাবো। মাম্পির জন্মদিনে ওর স্কুলের আর পাড়ার সব বন্ধুরা আসতো, সবাই ফর্সা ঝকঝকে, আর কি সুন্দর করে ইংরাজী বলে! জন্মদিনের খাবারও অন্যরকম --- আমাদের বাড়ির মতো লুচি, পাঁচ ভাজা, মাংস, আর কাঁসার বাটিতে পায়েস নয়, মাম্পির জন্মদিনে আমরা খেতাম ছোট ছোট করে কাটা সাদা তুলতুলে স্যান্ডউইচ, তার ভেতরে কোনটাতে ডিম্, কোনটাতে হ্যাম, শশা, মাখন।

কোকা কোলা থাকতো পাশে প্লাস্টিকের কাপে। আর ছোট ছোট কাগজের থালায় কেক। আমি ঝুঁটিসুদ্ধ স্ট্রবেরি পেয়েছিলাম একবার। একটা কামড় দিয়ে বাকিটা জামার পকেটে পুরে নিয়ে এসেছিলাম বাড়িতে। পরের দিন সকালে বলাইদা বাজারে যাওয়ার সময় নমুনা হিসেবে দিয়েছিলাম। মাথা নেড়ে বলাইদা বলেছিলো, এ সব বিলিতী ফল, হগ সাহেবের মার্কেটে পাওয়া যেতে পারে। এ কি আর রামগড় বাজারের জিনিষ!

আমাদের বাড়িতে তখনও টেলিভিশন আসেনি। দীপা শঙ্করীদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল, আর সেটা তেরছা করে রাখা ছিল ওদের বসার ঘরে। আমাদের গ্রীল দেওয়া বক্স জানালায় বসলে দিব্যি দেখা যেত টেলিভিশনের পর্দার অর্ধেকটা। ছটা বত্রিশে বড় গোল চশমা ছন্দা সেন খবর পড়তেন, তার পরেই থাকতো বাংলা ছায়াছবি শনিবার করে। যেদিন সপ্তপদী দিল টিভিতে সেদিন দীপার মা কাকিমা টেলিভিশনের মুখটা আরেকটু ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন বক্স জানালার দিকে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশের বছর দুয়েক বাদে আমাদের বাড়িতে টিভি এসেছিলো। সে এক উৎসবের সন্ধ্যা! মা সেবারের শীতের মেলা থেকে লিসিয়া ম্যাকারনির প্যাকেট কিনে এনেছিলো। তখন বাজারে সবে উঠেছে লিসিয়া ম্যাকারনি, বিজ্ঞাপনে ছিপছিপে সুন্দরী গৃহিনীর হাসি হাসি মুখ।

টেলিভিশন আসার সন্ধ্যায় মা জলখাবারে লিসিয়া ম্যাকারনি বানালো ফুলকপি, বিন্স আর গাজর দিয়ে,
ওপরে ছড়ানো ওমলেট কুচি আর টমেটো সস। কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমরা হামলোগ দেখলাম সবাই মিলে বসে। 

একটু রাত বাড়লে ছোট পর্দায় ছায়াছবি ম্যাকেনা'স গোল্ড। বেশ যোধপুর পার্কের লোকজনদের মতো লাগছিলো নিজেদেরকে। অনেক পরে জেনেছিলাম আমাদের সেদিনের সেই অবস্থানের একটা বাহারি নাম--আপওয়ার্ডলি মোবাইল ক্লাস। 

আমেরিকায় পড়তে যাবার আমন্ত্রণ এল, সঙ্গে স্কলারশিপের প্রতিশ্রুতি। বাবা ভিসা ইন্টারভিউ এর দিন বাড়ির দলিলপত্র সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলো প্রপার্টি কি আছে জিজ্ঞেস করলে দেখাবি। ভিসা অফিসার
কাগজপত্র দেখে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করেছিলো ডু ইউ হ্যাভ এনি আদার প্রপার্টি ? আমি একটুও না
থমকে বলেছিলাম উই হ্যাভ এ টেলিভিশন। খাদি থেকে সেজোমামার নাম করে রিবেটে কাপড় কিনে এনেছিল মা। 

সেলাইমেশিনে ফেলে হাই নেক পাঞ্জাবি তৈরী করে দিয়েছিলো, তার কলার জুড়ে মার নিজের হাতে এমব্রয়ডারি করা রং বেরঙের ছোট্ট ছোট্ট পাখি আর ঝুঁটিসুদ্ধ স্ট্রবেরি। শিকাগোতে নেমেছিলাম যখন তখন মরা বিকেল।

কৃষ্ণাঙ্গ ইমিগ্রেশন অফিসার আমার চোখে মুখে নিশ্চয়ই দেখেছিলেন ভয় আর দুই বিনুনীর মধ্যবিত্ততা। হেসে বলেছিলেন আই লাইক দোস রেড এন্ড ইয়েলো স্ট্রবেরিস অন ইওর শার্ট। বাট বিফোর আই লেট্ ইউ এন্টার দা ইউনাইটেড স্টেটস, ইউ মাস্ট স্মাইল ফর মি ওয়ানস।

এখন এদেশে শীত চলে গিয়ে ঝকঝকে বসন্ত। গত সপ্তাহে জনা কয় মিলে ভোর ভোর বেড়িয়ে স্ট্রবেরি
কুড়োতে গিয়েছিলাম কাছাকাছি একটা ফার্মে। অল্পবয়সীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোচরভর্তি করে স্ট্রবেরি কুড়িয়েছি। জুন মাসে মেয়ের গ্রাজুয়েশনে ব্যাকইয়ার্ড পার্টি হবে, সেখানে স্ট্রবেরি দাইকিরি বানাবো পানীয় হিসেবে। নিমন্ত্রিতের সংখ্যা অনেক, সুতরাং পাউন্ড চল্লিশ স্ট্রবেরি তো লাগবেই। বাড়ি ফিরে আমার অনেক কাজ, স্ট্রবেরিগুলোকে ধুয়ে, ঝুঁটি কেটে, ডেকচিভরা ফুটন্ত জলে অল্পক্ষণের জন্যে ফেলতে হবে।

তারপরেই তুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বরফ ঠান্ডা জলে তাদের একটুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা। অতঃপর জিপলক ব্যাগ-এ পুরে ফ্রীজারে চালান। থরে থরে জিপলক ভর্তি স্ট্রবেরি আরও উজ্জ্বল, আরও নিটোল হয়ে ফ্রীজার থেকে বেরোবে পার্টির দিন সকালে। ড্রিঙ্কস-এ স্ট্রবেরি দাইকিরি হবে শুনে মেয়ে বলেছে, মা, প্লিজ, নট উইথ দোস চিপ সুপারমার্কেট স্ট্রবেরিজ! অতএব অর্গানিক ফার্ম-এ আসা, অভিজাত স্ট্রবেরি সংগ্রহের প্রচেষ্টায়।

ক্ষেতের একধারে ইল্ম গাছের পাশে সার দিয়ে রাখা ঝুড়ি। কোচরভর্তি স্ট্রবেরি এনে এনে ঝুড়িতে ফেলছি আমরা। আমাকে সাহায্য করতে সঙ্গে এসেছে মারিসা আর ওর বর হুলিয়ো। বহু বছর আগে ওরা মেক্সিকো থেকে সান্তা ফের বর্ডার পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকে পড়েছিল। বেশ কিছু বছর নিউ মেক্সিকোর একটা খামারে কাজ করেছে, সেখানে ওদের মতোই আরো অনেক ইললিগাল ইমিগ্র্যান্ট কর্মচারী। আজকের মতো তখন আই.সি. ই. (ইম্মিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-এর উপদ্রব ছিল না। একসময় আইনি হওয়ার পরে পারিবারিক বন্ধুর ল্যাজ ধরে ওরা মিশিগান চলে আসে। মেইড সার্ভিস এর ব্যবসা শুরু করে স্বামী স্ত্রী মিলে। 

গত আট ন' বছর ধরে ওরাই আমাদের বাড়ি পরিষ্কার করছে। মারিসা মাঝে মধ্যে সঙ্গে আনে অচেনা কোনো মহিলাকে। তারা দু'চারদিন আসে, তারপর আবার নতুন কোনো মুখ। এক বর্ণ ইংরাজী বলে না তারা, কিছু জিজ্ঞেস করলে ভীতু চোখে দৌড়ে গিয়ে মারিসা কে ডাকে স্প্যানিশে, মারিসা একটু অপ্রস্তুত হেসে আমাকে বলে দে জাস্ট কাম ফ্রম মাই ভিলেজ ইন পুয়েবলা।  মারিসা মেক্সিকোর পুয়েবলা অঞ্চলের একটা ছোট্ট গ্রামে থাকতো।

সেখানে চার পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। গ্রামের বাসিন্দা সংখ্যা আড়াই হাজার, বংশপরম্পরায় সকলেই কাজ করে খনিতে। নব্বই এর দশকের শেষাশেষি যখন খনিগুলি বন্ধ হতে শুরু করে, তখনই মারিসা আর হুলিয়ো পালিয়ে আসে আমেরিকায়। ওর বোন আর ভগ্নিপতি বর্ডার পেরোতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। 

স্ট্রবেরি বাছতে বাছতে মারিসা টুকটাক গল্প করে। আর ঝুড়ি ভরে গেলে হুলিয়ো এক এক করে পাতলা কাপড় ঢাকা দিয়ে ঝুড়িগুলো রেখে আসে ছায়ার তলায়। মোর বাস্কেট ম্যাদাম ? আমি তখন বিধ্বস্ত। মারিসা মুখের ঘাম মুছে বলে ইউ তায়ার্ড, ইউ সিট। মি এন্ড হুলিয়ো ডু ইট।  আমি ওকে জলের বোতল আনতে ইঙ্গিত করি, তারপর বলি এসো আমরা সবাই একটু জিরিয়ে নি, আবার হাত লাগাবো একসঙ্গে। মারিসা একগাল হেসে পা থেকে জুতো জোড়া টেনে খুলে বসে পড়ে। তারপর ফর্সা পায়ের পাতায় ইল্ম গাছের চিকণ ডাল দিয়ে আঁকিবুকি কাটতে থাকে। 

রিকার্দো নোজ স্ট্রবেরিজ। হোয়েন হি সারেন্ডার, দে টেক হিম রেফিউজি ইন এ স্ট্রবেরি ফার্ম। আমি
প্রশ্নচোখে তাকাই মারিসার দিকে----রিকার্দো কে? মাই সিস্টারজ সন রিকার্দো। হি কাম ফ্রম এল
সালভাদোর হোয়েন হি ওয়াজ থারটিন | হি অন হিজ ওন। হি সারেন্ডার এট দে বর্ডার, দে টেক হিম টু
ওয়ার্ক ইন স্ট্রবেরি ফার্ম --- উত্তেজিত গলায় বলতে থাকে মারিসা । হি স্টিল নট লিগাল, হি পেন্ডিং কেস।

রেফিউজি রিসেটলমেন্ট অফিস থেকে মারিসার কাছে ফোন এসেছিলো এক পড়ন্ত বিকেলে--- রিকার্দো তখন ছোট্ট ছোট্ট হাতে সবুজ পাতা সরিয়ে টুকটুকে লাল স্ট্রবেরি ঝুঁটিসুদ্ধ কেটে নিচ্ছে বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীর নখে।

মাইনর বলে পেন্ডিং কেস হয়েই রিকার্দো এলো মাসির কাছে রিসেটলমেন্ট অফিসের দাক্ষিণ্যে। তার আগের আট মাস কোনো খোঁজখবর ছিল না ছেলেটার, আদৌ বেঁচে আছে কিনা সেটুকুও না। বর্ডারের এদিকে ওকে চালান করতে সাহায্য করেছিল যারা, তারা শুধু শিখিয়ে দিয়েছিলো ঢুকেই সারেন্ডার করে দিবি। ও তাই করেছিল। তারপর কান্না চেপে, মা'র টলটলে চোখ আর বাবার রোদে তাতাপোড়া মুখ ভুলে, এল সালভাদোরের পাহাড়ি বাঁশির সুর ভুলে, ও স্ট্রবেরি তুলেছে অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মাস। আর কখনো ছায়া ছায়া বিকেলে মাথার টুপি বুকের কাছে জড়ো করে আলের ধারে শুয়ে স্বপ্ন দেখেছে মা হাত বাড়িয়ে ছুটে আসছে সীমান্তরেখা পেরিয়ে, খোঁপায় এক থোকা রক্তবর্ণ স্ট্রবেরি। রিকার্দো গোনা পাস হাই স্কুল দিস ইয়ার, লাইক ইওর ডটার।

 আমার চটকা ভাঙলো মারিসার উচ্ছাসে। বাহ্, কি করবে রিকার্দো এর পরে? কলেজে যাবে, কিন্তু তার আগে গ্রীষ্মে কাজ করে পয়সা জমিয়ে ও একটা বাঁশি কিনতে চায়, এল সালভাদোরের সুর তুলবে সেই বাঁশিতে।

আমাদের ফেরার সময় এগিয়ে আসে। হুলিয়ো এক এক করে ট্রাকে ঝুড়ি তোলে পরম যত্নে, পরম আদরে। আমি গিয়ে সামনের সিটে বসি । মারিসাকে ওদের বাড়িতে নামিয়ে হুলিয়ো আমাকে স্ট্রবেরি সমেত পৌঁছে দেবে বাড়িতে।

এক চিলতে বাগানের পাশ দিয়ে ওদের বাড়িতে ঢোকার পথ। রঙচটা দরজা খুলে বেরিয়ে আসে উড়োখুড়ো চুল ভাসা ভাসা চোখের বছর আঠেরো একটা ছেলে। রিকার্দো ! মারিসার চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠে পাহাড়ি রোদ্দুর। আমি ট্রাক থেকে নেমে ওদের হতভম্ব করে এক ঝুড়ি স্ট্রবেরি নিয়ে এগিয়ে যাই রিকার্দোর দিকে।

ছেলেটা অবাক বিস্ময়ে তাকায় আমার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে আঁজলা ভরে টুকটুকে লাল একগুচ্ছ স্ট্রবেরি তুলে নিয়ে ছোঁয়ায় ওর চোখের পাতায় আর ঠোঁটে, আঘ্রাণ নেয় প্রাণভরে! আমিও ওর দেখাদেখি ঝুড়ি নামিয়ে আঁজলা ভরে তুলি স্ট্রবেরি। তারপর কি ভেবে খোলা আকাশে ছড়িয়ে দিই তাদের। আমার চোখের সামনে বিড়লা হাউসের স্ট্রবেরিরা তখন আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে যায় ঝুঁটি মেলে, ঠিক মায়ের হাতে বুনে দেওয়া রংবেরঙের পাখিগুলোর মত!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন