বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

বইপড়া : শিকড় ও ডানার গল্পকার বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

রঞ্জিতা চট্টোপাধ্যায় 

বাংলা ছোটগল্পের উজ্জ্বল ঐতিহ্য রবীন্দ্রোত্তর যুগে সমৃদ্ধ হয়েছে তারাশঙ্কর -প্রেমেন্দ্র -মাণিক -সুবোধ ঘোষ -নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় -সমরেশ বসু -বিমল কর প্রমুখের হাত ধরে।গত শতকের ছয়ের দশকে সেই ধারা আরো পুষ্ট হয়েছে দীপেন্দ্রনাথ -দেবেশ রায় -মতি নন্দী -সিরাজ -শীর্ষেন্দু -দিব্যেন্দুর অবদানে। বাংলাদেশের হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম ও এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সময়ের সাঁকো পার হয়ে যদি একেবারে আজকের সময়ে এসে দাঁড়ানো যায় তাহলে বাংলা ছোটগল্পের ছবিটা কেমন লাগে দেখতে?
ইতিমধ্যে বাঙালীর আর্থ -সামাজিক পরিস্থিতি বদলে গেছে অনেকটা। বিশ্বায়ন ও মনমোহন সিং এর উদার অর্থনীতির ফল-স্বরূপ বাঙালী দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা শহরে। সঙ্গে নিয়ে গেছে নিজের ভাষা ও সাহিত্য। বাংলা ছোটগল্পের ঊর্বর জমিতে ফসল ফলতে দেরী হয় নি। বিষয়বস্তু পালটেছে। প্রবাসী বাঙালীর জীবন ও জীবনবোধ, সমস্যা , আবেগ, দ্বন্দ্ব ক্রমশ জায়গা করে নিয়েছে বাংলা ছোটগল্পে। তৈরী হয়েছে প্রায় নতুন একটি genre -প্রবাসের বাংলা সাহিত্য। এই সাহিত্য কিন্তু মোটেই শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্করহিত নয়। বরং এখানে ঘুরেফিরে এসেছে ছেড়ে আসা মানুষগুলির কথা আর তাদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন। বাঙালী পাঠকেরা পেয়েছেন বেশ কিছু প্রবাসী ও অভিবাসী গল্পকার যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে বাংলা ছোটগল্পের ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে চলেছেন। 

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী এমনই একজন গল্পকার। কাজের সূত্রে তিনি বিদেশবাসী বহু বছর। প্রবাস জীবনের আশা নিরাশা, ভালবাসা, ভালোলাগা যেমন ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর গল্পে ঠিক একইভাবে এসেছে দেশে থেকে যাওয়া মানুষগুলির চ্যালেঞ্জ ও অসহায়তার কথা। দূর প্রবাস জীবন থেকে ফেলে আসা মানুষগুলিকে নিরপেক্ষ দর্শকের মতো দেখে চলেছেন গল্পকার। তাঁর কলমে তাই ফুটে উঠছে বিদেশে ও দেশের মাটিতে বাঙালী জীবনের জলছবি। এইরকম একটি গল্প হলো 'শিকড় ও ডানার আখ্যান। ' গল্পের চরিত্ররা অরবিন্দ সরণীর জি প্লাস ফোরের অবিনাশধামের বাসিন্দা। "অবিনাশধামের বুড়োবুড়িদের ছেলেমেয়েরা দূরে থাকে, অনেকে মাঝেমাঝে আসেও। কেউ স্কাইপে আসে, কেউ সশরীরে। " শহুরে, মফস্বলী বাঙালীর জীবনে এ দৃশ্য আজ একান্তই পরিচিত। মধু কাকিমা, সুজন জেঠু, দাশগুপ্ত আঙ্কেলদের মতো একা বৃদ্ধ বৃদ্ধার এক বড় অবলম্বন অমিতাভ । গল্পের নায়ক সে। অনেক সময় স্ত্রী ইন্দুর আপত্তি অগ্রাহ্য করেই সে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তাঁদের দিকে । গল্পের শেষে অন্যরকম উত্তোরণ ঘটে কাহিনীর। শুধু প্রবাসে থাকা ছেলেমেয়েদের বাবা মারাই নয়, অমিতাভ আবিষ্কার করে অবিনাশধামের 'এই যে এতগুলো লোক, কোন না কোন কারণে আত্মজর থেকে আলাদা। চাকরি দূরে ঠেলে দিয়েছে অনেককে। ' কিন্তু কাছে থাকলেও কি কাছাকাছি থাকতে পারত তারা ? এ গল্প সাধারণ চরিত্রদের হাত ধরে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠকদের। "ম্যারাথন" গল্পেও এসেছে বাবা-ছেলের সম্পর্কের কথা। এবারে গল্পের পটভূমি একেবারে আলাদা। আলাদা কাহিনীর চরিত্রগুলিও। দক্ষতার সঙ্গে গল্পকার ফুটিয়ে তুলেছেন আমেরিকার Ann Arbor শহরের বরফ ঢাকা পথঘাট আর পার্কিং লট। কাহিনীর নায়ক সুরজিৎ তার বাবার কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে। "তোমার ভয় লেগেছিল বাবু ?
কখন ?

সাততলা ছাদের আলসেতে দাঁড়িয়ে। 
--- --- --- ---- ----
উত্তর দাও বাবু। বেশ জোরে জোরে চেঁচাল এবার সুরজিৎ। হাওয়া ধরে ঝাঁকাতে ইচ্ছে করছিল। বাবু বলতে ইতস্তত করছে। দূরে সরে যাচ্ছে সুরজিতের থেকে। " আত্মজরা সরে যাচ্ছে তাদের বাবা -মার কাছ থেকে। বর্তমান সমাজের এ এক বিচিত্র সমস্যা।দুই প্রজন্মের মানসিকতা ও মূল্যবোধের ব্যবধান চিরকালই ছিল। কিন্তু এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সুগভীর একাকিত্ব। বর্তমান সমাজের এই অসুখটি বারেবারে এসেছে বিশ্বদীপের গল্পে। এ তাঁর সমাজসচেতনতার পরিচয়। "যারা আত্মহত্যা করে নি " গল্পে একাকিত্বের দুটি দিক তুলে ধরেছেন গল্পকার। একদিকে বিদেশে স্থিত সন্তানদের দেশে থাকা বাবামায়ের একাকিত্ব যেমন আছে, তেমনই আছে বিদেশবাসী সেইসব সন্তানদের পরবর্তী প্রজন্মের একাকিত্বের দিকটিও। ভারী সুন্দর বুননে দুটি কাহিনীর ধারা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে এই গল্পে। এখানে গল্প শৈলীর নতুনত্ব পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। 

"বিচ্ছিন্ন দ্বীপসমূহ" গল্পে আবার দেখি কলকাতা শহরের ভিড় বাসের চিত্র। অফিসফেরত অসিত মোড়ের দোকানে সাধারণ কিছু জিনিস কিনতে গিয়ে দেখে তার মানিব্যাগটি উধাও। দোকানদার মুখচেনা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যবহার করে সে। ধারে মাল দিতে রাজী হয় না। সেই শুরু। তারপর একের পর এক বিচিত্র সব ঘটনা ঘটতে থাকে। অসিতের বউ সাবি আর তার ছেলে বিলু চিনতে পারে না অসিতকে। "সকালবেলা একভাবে অফিস বেরুল, কিন্তু ফিরল মুখোশ বদলে। হ্যাঁ ,মুখোশই তো। কারণ মুখটা পাল্টে গেলেও, সে তো ভিতরে এখনো অসিত চৌধুরীই আছে। কিন্তু কে এই অসিত চৌধুরী ?" একই ছাদের তলায় থেকেও কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। সরে যাচ্ছে পরস্পরের থেকে দূরে। মুখোশে মুখ ঢাকতে ঢাকতে নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকেও আর চেনা যায় না। এ যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাঁচা। "সাবি কোনদিন জানতেও পারবে না, যে ওই লোকটা অন্য কেউ , অন্য স্পৰ্শ , স্বাদ-গন্ধের। যা অনেকদিন হারিয়ে গেছে তার খোঁজ কেনই বা কেউ রাখবে ?" আবার আত্মজিজ্ঞাসার সামনাসামনি হয় পাঠক। 

"ভয় " গল্পে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ইমান মিয়াঁ ট্রেন কামরায় মিডল বার্থ থেকে নেমে জমি খুঁজলো। 'ফজরের নামাজ আদায় করবে। ' ভাষার প্রয়োগ এখানে লক্ষণীয় গল্পের শুরু থেকেই। সংলাপ ব্যবহারের দক্ষতা বিশ্বদীপের গল্পে আমেরিকার ঝকঝকে শহরে আই টি সংস্থায় কর্মরত বাঙালী আর বেনিয়াপুকুর হাই মাদ্রাসায় অঙ্কের মাস্টার ইমানুল্লা -সবরকমের চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এস আই ঘোষ সপাটে এক লাথি কশায় ইমানুল্লার পুরুষাঙ্গে। পাশের পুলিশটা খিকখিক করে হেসে বলে ওঠে "শালার কাটার গুষ্টি। শুয়োরের পালের মতো পয়দা করে তো , এরপর আর পারবে না বাঞ্চোৎ। " ভয় বা সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে কারা ? সন্ত্রাসবাদীই বা কারা ? এসব প্রশ্ন পাঠককে ভাবায় গল্পটির শেষে। নিশ্চিন্ত আরামে পড়ে চলার গল্প এটি নয়। "স্বপ্নের জাদুঘর " গল্পে গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ ঘিরে গড়ে ওঠে এক মায়াময় জগৎ। একরকমের ম্যাজিক রিয়ালিজমের স্বাদ এই গল্পে। ফুলটির সুবাস ক্রমশ হয়ে ওঠে কাহিনীর প্রধান চরিত্র তিলকের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক। "যেবার পেলে এসেছিল" গল্পে সময় বা বিশেষ একটি বছরই যেন গল্পের একটা মুখ্য চরিত্র। ছায়াপিসি বড় পেলেভক্ত। এ কি নিছকই একজন ভাল ফুটবল খেলোয়াড়ের প্রতি এক ক্রীড়াপ্রেমীর প্রেম ? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কোন কারণ ? গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক আবিষ্কার করে সেই কথা। 'কুচকুচে কাল , বেঁটে আর মানুষের পূর্বগোত্রীয়দের মতো মুখের অধিকারী " পেলে সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল ছায়াপিসির চোখে। সেইসঙ্গে আরো কিছু। এই গল্পে লেখকের দরদী মনটি ফুটে ওঠে । চরিত্র চিত্রণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মমতা ও যত্নের ছোঁয়া। 
"আলো মরে যাওয়া আকাশ গভীর কালচে নীল। নীল ? নাকি রক্ত শুকিয়ে জমাট হলে এমনি গাঢ় বেগুনী রং ধরে !" 'গমন' গল্পের শুরু থেকেই অশুভ ইঙ্গিত। একেবারে এই সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি গল্প। অতিমারীতে আক্রান্ত পৃথিবী। অদৃশ্য জীবাণুজাল ঘিরে ফেলছে চারদিক। দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাস্তবের চেহারা। 'মৃত্যুর আর কোন মর্যাদা নেই এই করাল সময়ে। ' সময়ের এক ধারাবিবরণী হয়ে থাকবে এই গল্প। কিছুটা একই পটভূমিতে লেখা অণুগল্প "আমার গানের ওপারে। " পবন পালিয়েছে। কে পবন ? কেন আর কোথায় পালাল ? পড়তে শুরু করলে থামার উপায় নেই। না , কোন রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী নয়। এ গল্পটিও এই সময়ের এক উল্লেখযোগ্য দলিল। গল্পের সম্পূর্ণ মৌলিক আঙ্গিক পাঠককে গল্পের গভীরে নিয়ে যায়। পড়তে পড়তে কোথাও কোথাও গল্প যে পড়ছি তা ভুলে যেতে হয়। গল্প আর কবিতার ছন্দ মিলেমিশে যায়। "যে ঝড় আসার অপেক্ষায় " থাকে পবন, রেললাইনের ধরে চলতে চলতে অপেক্ষা করে পরিযায়ী সব শ্রমিকদের সঙ্গে সে ঝড়ের অপেক্ষায় পাঠক গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছয় টানটান উত্তেজনায়। 

সামগ্রিক বিবেচনায় বলতেই হয় যে বিশ্বদীপ এই সময়ের একজন শক্তিশালী কথা সাহিত্যিক। কথা তাঁর লেখনীতে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তার গল্পগুলিতে যেমন বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য আছে তেমন আছে আঙ্গিক নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা। ছোটগল্প, অণুগল্প ও বড় গল্প- সবেতেই স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর। সমাজের নানা স্তরের মানুষকে তিনি খুঁটিয়ে দেখেছেন। তাদের যথাযথ ছবিটি ফুটিয়ে তুলেছেন স্থান ও কালের প্রাণময় প্রেক্ষিতে। প্রায় প্রতিটি গল্পেই ফুটে উঠেছে জীবন ও তার গূঢ় রহস্য। বিশ্বদীপ লিখছেন। তাঁর লেখা চলতে থাক। আরো অনেক নতুন গল্প পাবে আজকের ও ভবিষ্যতের পাঠক,-এটাই বিশ্বদীপের কাছে আমাদের প্রত্যাশা । 

1 টি মন্তব্য:

  1. এতো সুন্দর পাঠ প্রতিক্রিয়া পাঠককে খুঁজে খুঁজে লেখকের সব গল্প পড়তে আরোই উৎসাহী করে তোলে।


    উত্তর দিনমুছুন