বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

জয়া চৌধুরী'র গল্প : এক্স




কথা দেওয়াই ছিল। আসলে দিয়েছিল কি না সেটাও চোখ বুজে বলা যায় না। কথা আদায় করতে তো বাড়িই চলে এসেছিল কুবলয়। রোদ ঝড় জল বৃষ্টি এক একটা দিন কেটে গেছে । দিন যেন মরুভূমি। 
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল মরালীর। এই মরুভূমি শব্দটাকে কেটে জুড়ে বাড়িয়ে অনেক থরথর শব্দ চয়ন করা যেতে পারত হয়ত, যেভাবে ডায়রির পাতা ভরিয়ে ফেলত এক জন্ম জীবন। অনেক ভাবতে চেষ্টা করেছে একটা শব্দ একটাই শব্দ কীভাবে শরীর হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারে। চারদিকে জল রয়েছে মানুষ তার চলাফেরা শব্দ কাশি বাত কর্ম ছাড়াও ঢাক মাইক মিউজিক সম্মেলন ইত্যাদি ছত্রিশ রকম শব্দ তার ছবি নিয়ে রোজ কানে এসে দাঁড়ায়।



মরালী পারবে কি তার ভেতরে মরুভূমি শব্দটা কে বুঝতে? পেরেছে বই কি! ‘না পারা’ শব্দ দুটোই তার অপছন্দ চিরকাল। ভাগ্য তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য ই করেছে চিরকাল না কি বলা যায় সে সাহায্য করেছে ভাগ্য কে। যেখানে জল নেই তপ্ত বালি জমে যাবার মত ঠান্ডা রাত আর শুধু কাঁটাঝোপ এমন টাই তো বলে মরুভূমি র সংজ্ঞা। ঠিক তেমন তেমন ই তো পেয়েছে সে। কত সাধ কত প্ল্যানিং তার। কুবলয় শুনে গেছে দিনের পর দিন, হাত কাজ করেছে ফিনফিনে জামার ওপরে একটু সাহস করে এগোলে একেবারে ভেতরেও ঢুকিয়ে দিয়েছে। সমর্পণের স্তনে গোপন অঙ্গে খেলা করে গেছে হাত তার, কান শুধু খোলা ছিল। কান দেখা যেত তবে খোলাই ছিল কি না টের পায় নি তখন মরালী। দুজনে একসঙ্গে থাকবে এক বিছানায় কোন লুকোচুরি ছাড়াই। পরস্পরকে শরীরে পাবার জন্য মরীয়া দুজন নর নারীকে শোবার লাইসেন্স কে তো বিবাহ বলে। আর যা কিছু ভারী মিষ্টি আইন ই কথা থাক তবু শুরুর শর্ত নিশ্চিন্ত শরীর ভোগ এ কথা চাপা দেওয়া যাবে না অন্তত নিজের কাছে। আয়নার কাছে। তারপরেও দু কথা থাকে জীবন। যৌনতার দ্বার টি খুলতে এগিয়ে আসে আকাঙ্খাতেই আর সে কামনা তৈরী হয় মানুষটার কথায় । হ্যাঁ শুধু কথা তাকে আচ্ছন্ন করে দিত। কী চমৎকার কথা বলে কুবলয়। হ্যাঁ বলে, শুধু বলতই না। আজও বলে। বাংলা ইংরিজী কবিতার লাইন উদ্ধৃতি চমকপ্রদ উইট কথা শব্দের উর্ণনাভ জাল ওকে টানত জালে আটকানো পোকার মত। প্রথম রাতেই চূড়ান্ত আঘাত মরালীর জন্য... না প্রত্যঙ্গের আঘাত নয় তা ছিল কথার আঘাত। এক রূঢ় ব্যর্থতার দায়ভাগ অশ্লীলতম শব্দ গুলো মরালীর মনের কান পুড়িয়ে দিয়েছিল সেই রাতে। তার অনেক চাওয়ার রাত। শেষের সময়টুকু তার মনে হচ্ছিল জল খেলে ভাল হত। খুব তেষ্টা। 

*************** 

একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবে মরালী। কুবলয় ছাড়া আর কার সঙ্গে করবে! দুটো পিরিয়ড মিস করেছে। প্রেগ্ন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ। সামনে তিন চারটে চাকরির পরীক্ষা, কম্পিউটার কোর্সটার চূড়ান্ত পরীক্ষা কি করে সামলাবে এসব? 

- শোনো আমার খুব ভয় করছে। 

- ভয়ের কী আছে। 

- এত গুলো চাপ সামলাব কি করে? 

- নিও না। 

- মানে? আমার এত দিনের প্রস্তুতি... তুমি যদি এই কোর্স টায় আমাকে ভর্তি করে দাও আমি ট্রেনিং নিয়ে পরীক্ষায় বসি 

- ও আমি পারব না। পয়সা নেই। আমার তো কোন ট্রেনিং নিতে হয় নি? তোমার কেন লাগবে? 

- পয়সা নেই মানে? আমি নিজে পারছি না বলেই তো 

- তাহলে বাচ্চার জন্ম দিও না। 

- মানে??? 

- খুব সহজ। 

- আগে মনে হয় নি তোমার? আমি কি বলি নি বারবার এ রিস্ক হয়ে যাচ্ছে। তুমি শুনলে না কেন? কনসিভ করেছি প্রথম বার ... আমি তো দু দিক ই সামলাতে চাই... তুমি আমায় একটু হেল্প করো প্লিজ 

- খুব টায়ার্ড সারাদিন 

- সারাদিন কিচ্ছু করো নি তুমি। অফিসে না গিয়ে অনির্বাণ-এর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছ তারপর বেরিয়ে গেলে মুভি দেখতে ...তুমি কি ব্যাচেলার? 

- আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু আরগু উইথ ইউ। ডিসগাস্টিং... শোবার বিছানাতেও বউয়ের ঘ্যান ঘ্যান... 

- শাট আপ... তুমি এভাবে অসভ্যের মত কথা বলতে পারো না আমার সঙ্গে 

- এই... চুপ কর... আর মাল খালাস করে আয় 

চারদিকে ছড়ানো কাঁটাঝোপেরা... এমনকী হলিউডের ছবিতেও মরুভূমি দেখলে বুক ছমছম করতে থাকে মরালীর। 

************ 

ভোর খুব প্রিয় মরালীর। ভোরের শরীর যেন অনুভব করে সে প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে। ভোরের গম্ভীর নির্মল বাতাস বুকের ভেতর দিয়ে প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে তার। মন বুদ্ধি অহং বলে যেন কিছু নেই আর। যেন একটি ভাসতে থাকা ছিন্ন শুকনো পাতাটি সে... শুকনো তবুও প্রাণহীন নয়। তার দৃঢ় শিরা গুলি যেন নিশ্চিত প্রশান্ত কোন সাগর, মাটি স্পর্শ করতে মন আর চায় না। ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যেতে চায় অনন্ত কোন দিগন্তে। এইসব ভোরগুলোতেই মন দিয়ে সেরে ফেলে তার নিজের কাজ । এক কাপ চা আর পরীক্ষার্থীদের খাতার বান্ডিল নিয়ে বসে। এই বেশ সময়। তার সকল ধ্যানের নিভৃতি এই ভোর। এই তো সময় কিছু লেখার কিছু ভাবার কিছু আঁকার... । আজ তাড়া নেই তেমন। মেয়ে তার কলেজ যাবে না। প্রজেক্টের কোন কাজেই তাকে অন্য কোথাও যেতে হবে। কাজ করতে করতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল, প্রায় শেষ করে এনেছে খাতার আন্ডিল। তার ভালই লাগে পড়াতে পড়তে...। সে তো আজন্ম পড়ুয়াই মানুষ। শুধু মাঝের কটা বছর কেটেছে দুঃস্বপ্ন। মরালীর চমক ভাঙ্গলো কলিং বেল এর শব্দে। উফফ বারবার আওয়াজে মগ্নতা ছিন্ন হয়ে যায়। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই সত্যি বলতে কি... অবাক শব্দটা কি ব্যবহার করবে সে? মনটা তন্নতন্ন করে দেখল। এই দিনটার জন্য কত বছর অপেক্ষা করেছিল সে? এক দুই তিন চার ...জানে না অগুন্তি হবে... আসলেই কী কোন অপেক্ষা ছিল? 

- ভেতরে আসতে দেবে? 

কপিবুক সিনেমার দৃশ্য। কী করলে এই লোকটার সঙ্গে সবচেয়ে ঠিক আচরণটা করা যায় আজও তা ভেবে উঠতে পারেনি মরালী। স্বভাব সৌজন্য মুখ থেকে বের করে দিল 

- নিশ্চয়ই ভেতরে এসো 

একরকম হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল কুবলয়। সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল বিনা আহবানে। যেন কত অভ্যাস এভাবেই বসে পড়া। 

- খুব অবাক হয়ে গেছ তাই না? 

- হ্যাঁ তা একটু 

- আসলে আমার ... আমি ... তুমি কী জানো আমার খুব শরীর খারাপ... টেস্ট হয়েছিল ডাক্তার টিবি বলছে... আমার লাংস টা খুব... জানো বাবা-মা কে তুমি দেখতে পারবে না কী অবস্থা তাদের... 

মরালী তাকিয়ে ছিল ... না কুবলয়ের দিকে নয় সামনের খোলা খাতাটার দিকে। কান দিয়ে কথাগুলো এরকমই ছেঁড়া ছেঁড়া আসছিল... মন চলে যাচ্ছিল সেই সব ভয়ংকর দিনগুলোতে। 

- তুই চোর 

- তার মানে? 

- হ্যাঁ তোকে বাজার করতে দিই কারণ তোর শ্বশুর কটা দিন বাজার যেতে পারছে না। তোকে যে টাকা দিই তুই তার অর্ধেক নিজের কাছে রাখিস। বানিয়ে বানিয়ে দাম বলিস এসে। খাবার বেলা তো কম খাস না তবু এত নোলা কেন তোর? বাপের বাড়িতে খাস নি বুঝি কিছু? শেষ কালে চুরি করতে শুরু করলি? 

এত অবাক হয়েছিল শাশুড়ির এ কথায় যে তোতলাতে তোতলাতে চলে গেল বেড রুমে। তার প্রায় বাল্য প্রেমিক তার বেড়ে ওঠার প্রথম ডাকঘর তার প্রথম আর একমাত্র পুরুষ যাকে তার অপাপবিদ্ধ শরীর তুলে দিয়েছিল একদিন , সকালের উঠতি খটখটে আলোয় জিজ্ঞেস করেছিল সরাসরি- 

- তোমার মা আমায় চোর বলছেন। তুমি তো জানো আমি ডায়রি তে সব হিসেব লিখে রাখি । তুমি শুনলে? কিছু বলবে না 

- একশ বার ঠিক বলেছে মা। বাবা আমায় সব বলেছে। তুমি টাকাপয়সার গন্ডগোল কর। রোজ এত টাকা লাগে কি সে তোমার? 

- মানে? তুমি জানো না কীসে লাগে? তোমাদের এত বড় সংসার হাজারটা পদ রান্না তার মধ্যে এখানকার বাজারের দাম তোমার বাবার তো সব জানা র কথা...। তুমি কি সত্যি আমাকে বলছ ...আমি চোর! 

- বেশ করেছি। কে তুই? তুই চোর কোন সম্মান তোকে করার কারণ তো নেই। দে দে তোর হিসেবের খাতা। আজ থেকে সব টাকা বাবার কাছে থাকবে। তোকে আর বাজার যেতে হবে না। চোরের হাতে আমি আমার বাড়ির রিস্ক তুলে দিতে পারি না 

কানে এল বলেই চলেছে কুবলয়- 

- আমি একটা সংসার চাই এবার। মামলাটা তুলে নিচ্ছি । তুমি একবার আমাদের বাড়ি এসে দেখে যাও ...প্লিজ...মনে আছে তোমার আমরা “দিল” সিনেমাটা যেদিন দেখেছিলাম। তারপর আমি তোমার বাড়ি আর তুমি আমার বাড়ি চলে গেছিলাম... তারপর ... 

- তুমি কি চাও? 

- একবার আমার ফ্ল্যাটে এসে দেখে যাও, দ্যাখো আমি কীভাবে আছি 

- তুমি এত রোজগার করো এত লোকজন এত পার্টি এত আলো... 

- ও সব কিছু নয় , আমার ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমাকে মাফ করে দাও তুমি 

- ভুল? ...ভাবতে থাকে মরালী...ভুল কাকে বলে আর অন্যায় কী? এত সহজ সব কটা পাপ কে পাদ্রীর মত কনফেশনের ডিজাইনে পরিবেশন করলে মাফ করে দেওয়া। তারপর ঝরঝরে আগমার্কা পুণ্যবান মানুষ ... স্টার্টিং এ নিউ লাইফ উইথ এ নিউ এন্টারটেনমেন্ট... টর্চার করাটা এক ধরণে মর্ষকামই তো। আমি আগুন তাতে ছ্যাকা দিচ্ছি আবার সোহাগ করার সময় পাতলা নাইটি পরিয়ে দিচ্ছি কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ধর্ষণ করা যায় মোমের আলোয়... ভুল...এই একটু মিসটেক মাত্র... 

যে দিকে দু চোখ যায় ধূ ধূ করে বালি আর বালি... সকাল থেকে তপ্ত হতে থাকে তার গা...চড়তে চড়তে পুড়িয়ে ফেলার মত আগুন তাত হয়ে যায় যেখানে মরুভূমি তাকেই বলে। 

************************ 

স্টাফ রুমের গোলযোগে কান পাতাই দায়। বিরক্ত হয়ে নিজের মোবাইল টাই নাড়াচাড়া করতে থাকে মরালী। আজ সন্ধ্যায় তার কুবলয়ের ফ্ল্যাটে যাবার কথা। সেদিন সে সেকথাই আদায় করে নিয়ে গেছে। হঠাত মনে হচ্ছে তার খাতায় কলমে আজও সে মিসেস কুবলয় হয়েই তো আছে। মনে মনেও কী তাই নয়? প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ যে সময় কাটিয়েছে কুবলয়ের সঙ্গে হোক না নিষ্ঠুর তবু স্মৃতি তো তারই। সঙ্গেই তো বাস করল সে এক দুই পাঁচ বাইশ টা বছর। এর নামই কি বলবে সে প্রেম? তারও মর্ষকাম আছে না কি! অত্যাচারিত হবার! তবে তো সে এখনও প্রাক্তন হয়ে যায় নি। আসলেই বড় বেশি অযাচিত প্রত্যাখ্যাত এক বর্তমান হয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে গেছে। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে এলে, চেনা কবিতা চোখে পড়লে হাটে বাজারে স্কুলে বাসে সারাক্ষণ তাকেই সে মনে করে রেখেছে এতকাল... খুব মন খারাপ লাগল তার। আসলে খারাপ নয় একটা লজ্জা এল। সে কি মানুষ! যার আত্মশ্রদ্ধা নেই তাকে মানুষ বলা যায়! মন স্থির করল সে। নাম্বার টিপল মোবাইলে। ওপ্রান্তে ফোন তুলতেই শুধু বলল- 

- আমি মরালী কথা বলছি। ভেবে দেখলাম আমার যাবার কোন কারণ নেই। অসুখ হয়েছে ডাক্তার দেখাচ্ছ ঠিক হয়ে যাবে তুমি। একটা কথা বলি আমার বাড়ি আর এসো না। মামলা তুমি তুলবে কি না তোমার ব্যাপার। আমি একটি নতুন মামলা আনছি বিবাহ বিচ্ছেদের। আর আমি ফিরবো না। যেমন আছি তেমন থাকতে চাই। তোমার বর্তমানে আমার আর রুচি নেই। 

লাইন কেটে দিল অক্লেশে। ঠিক ছিল আজ একটা সিনেমা দেখতে যাবে ওরা দুজন , মানে দেবায়ুধ আর সে, তারপর রাতের ডিনার সেরে বাড়ি। মাঝে মাঝে শহরে দেবায়ুধ এলে ওরা একসাথে থাকে। একসঙ্গে সিনেমা দেখা একসঙ্গে বই পড়া একসঙ্গে গান শোনা... একসঙ্গে আজ ঝড় দেখবে। বাইরে ঝড় উঠেছে। শাড়ি ব্যাগ সামলাতে সামলাতে স্কুল থেকে বেরোল সে। আকাশ দেখা যায় না হঠাত এত মেঘ... গুরুগুরু ডাক শুরু হয়েছে। ক্রমশ জলের ঝিরিঝিরি ঝাপট চশমার কাচে... নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ায়... দূরে এসে দাঁড়িয়েছে ওর ট্যাক্সি। দরজা খুলে উঠে পড়ে মরালী রায়, এক্স ওয়াইফ অফ কুবলয় মিত্র। 

মরুভূমির মাঝে উর্বর এক ফালি জায়গা যেখানে জল পাওয়া যায় বৃক্ষ ইত্যাদিও তাকে বলে মরুদ্যান...



------------------





লেখক পরিচিতি:
জয়া চৌধুরী
গল্পকার। অনুবাদক। কবি।
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন