বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

কথা সাহিত্যিক অমর মিত্র'র উপন্যাস "ধ্রুবপুত্র" নিয়ে লিখেছেনঃ রুমা মোদক


অমর মিত্রের ধ্রুবপুত্র পড়ার জন্য কি পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন? পূর্বপ্রস্তুতি বোধকরি প্রায় প্রতিটি ক্লাসিক কিংবা কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের ক্ষেত্রেই অল্পবিস্তর অনস্বীকার্য। মূলত সাধারণে মিথ অন্ধ অনুকরণ করেন৷ অসাধারণে ক্লাসিক কিংবা মিথ ভেঙে মিথের পুননির্মাণ করেন৷ আবিষ্কার করেন নতুন কোন সত্য।

যেমন মাইকেল মধুসূদন করেছিলেন। রামায়ণের প্রচলিত মিথ ভেঙে রেঁনেসা প্রসূত জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম প্রভূত আধুনিক মতবাদের আলোকে তিনি যে মেঘনাদবধ কাব্য লিখেছিলেন, তাও মূলত এক রামায়ণ। নিজ সৃজনশীলতা কিংবা প্রতিভার গুনে তিনি নব রামায়ণ নির্মাণ করেছিলেন সাফল্যের সাথে।

 কিন্তু প্রচলিত রামের মিথ না জানলে মধুসূদনের নবসৃজনের শক্তিমত্তা আবিষ্কার করা অসম্ভব। 
ধান ভানতে শিবের গীতের মতো ধ্রুবপুত্র প্রসঙ্গে কেনো মেঘনাদ বধ। দুজনেই পুত্র। ধ্রুবপুত্র আর রাবণপুত্র। না মিল কিংবা অমিলের একটি ক্ষেত্র নয়। মূলত ধ্রুবপুত্র পাঠে আমার বোধ হয়েছিলো মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত না পড়লে কি ধ্রুবপুত্রের রসাস্বাদন সম্ভব? সম্ভব উজ্জ্বয়িনী অবন্তী নগরী কিংবা শিপ্রানদী তীরবর্তী ভূমিসংলগ্ন মানুষগুলোর জীবনাচরণের সাথে আত্মিক সংযোগ বোধ করা? 

ধ্রুবপুত্রের নিরুদ্দিষ্ট হওয়া কিংবা নক্ষত্রের উদয় অস্তের সাথে যে জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন যাপন আর মঙ্গল অমঙ্গল জড়িত, তাঁদের বাস্তবতা তাঁদের মতো না জানলে ধ্রুবপুত্র কেবল পাঠের নিমিত্তে পাঠেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। কখনোই অন্তর্নিহিত সত্য নিয়ে পাঠাভিজ্ঞতাকে চমৎকৃত করবে না। 

অমর মিত্রের শ্রমলব্ধ উপন্যাস ধ্রুবপুত্র। বিশালাকার। উপন্যাসের শুরু হয় ধ্রুবপুত্রকে খোঁজার মধ্য দিয়ে। বৃদ্ধ ধ্রুবপুত্রকে যে মেলায় খুঁজতে আসেন, তার এক অপূর্ব চিত্রকল্প লেখক তৈরি করেন ভাষার জাদুতে। বর্ণিত দীপাবলির মেলায় টাঙ্গন ঘোড়া, মণিমাণিক্য, মসলিন শাড়ির পসরা যেন আমাদের পাঠে শব্দকেন্দ্রিক কল্পনার লক্ষ্মণগণ্ডি ভেঙে সেলুলয়েডের ফিতার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে কিংবা কখনো নিজেকেই বিলীন করে দেয় মেলায় একজন বণিকের বাণিজ্যে। 

কথাকার অমর মিত্রের এটাই বিশেষত্ব যে অসাধারণ দৃশ্যকল্প নির্মাণে তিনি পাঠককে উপন্যাসের শুরুতেই ধ্রুবপুত্রকে অন্বেষণের নিমগ্ন যাত্রী করে নিতে সক্ষম হন৷ যে যাত্রায় শেষ পর্যন্ত সে নিবিষ্ট থাকে সেই সময়ে, সেই উজ্জ্বয়িনী অবন্তী নগরে।
  
কালিদাসের মেঘদূতে মেঘের মাধ্যমে যে বার্তা প্রেরণ, তা ঠিক মৌসুমী বায়ুর যাত্রাপথে নয় বরং যে পথে বণিকরা বাণিজ্য করতে যায় সে পথে। অমর মিত্র তাঁর ধ্রুবপুত্র উপন্যাসে আমাদের নিয়ে যান উল্টোরথে। সেখানে আমরা যা জনপদের সন্ধান পাই, তা বৃষ্টিহীন ঊষর। এ কি ধ্রুবপুত্রকে বিতাড়িত করার পরিণাম? একে কি কোন প্রতীকী ব্যাখ্যায় দাঁড় করাতে চান লেখক? যুগে যুগে জ্ঞানসাধক আর প্রজ্ঞাবানরা তো এভাবেই হয়রানির শিকার হয়েছে এস্টাবলিশমেন্টের কাছে, রাজশক্তি কিংবা শোষকের কাছে। গ্যালিলিওর মতো, সক্রেটিসের মতো। জ্ঞানবান প্রজ্ঞাবানকে অবহেলা করে যে জনপদ তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে এমনই ফল/ফসলহীন ঊষরতা! এই ইংগিত সবদিক দিয়ে সমকালেও প্রযোজ্য। 

প্রজ্ঞাবান বলেই যুবা ধ্রুবপুত্র জাতপাতের ভেদাভেদহীন এক মানুষ হয়ে ওঠার সাধনায় নিবেদিত। গন্ধবতীকে সে চেনায় জ্যোতির্বিদ্যা, নক্ষত্রের গতিপ্রকৃতি। আর শেষ পর্যন্ত নিরুদ্দিষ্ট ধ্রুবপুত্রই জ্ঞানচক্ষু উন্মিলীত করে রাজার, শাসকের। ক্রমাগত অনাবৃষ্টি, উষড়তায়, ফসল হীনতায় দুর্ভিক্ষের পদভারে রাজা উপলব্ধি করে 'যত ক্ষমতা তত অজ্ঞানতা। ক্ষমতাই অজ্ঞানতার জন্ম দেয়।' ঔপন্যাসিক অমর মিত্র হাজার বছর আগের এক আখ্যানকে এভাবেই কৌশলে যুক্ত করে দেন বিশ্বরাজনীতির সাথে, সমসাময়িক শাসকদের অন্তসারশূন্যতার সাথে।আর পাঠক এক অতীত ইতিহাসের সুত্রে বর্তমানের অভিজ্ঞতার সংযোগ আবিষ্কার করে চমৎকৃত হন। 

ধ্রুবপুত্র উপন্যাসে ভীষণভাবে আছে কাম ও প্রেম। নারীদেহ। এবং তা সমকালীন নানা বাদ প্রতিবাদকে সরাসরি ধারণ না করেও দুর্দান্তভাবে আধুনিক ও সমসাময়িক, যেখানে নারী তাঁর দেহে স্পষ্টতই বিভাজন করতে পারে প্রেমময় স্পর্শের সুখ আর আধিপত্য বিস্তারের পীড়নময় বেদনার। চতুরিকার অভিজ্ঞতায় উদ্ধবের উদ্ধত পীড়ন যা ধর্ষণেরই সমার্থক,আর তাম্রধ্বজ যখন স্পর্শ করে গন্ধবতীর স্তনবৃন্ত, প্রেমের তুমুল আকাঙ্ক্ষায় তখন আকাশ থেকে লুপ্ত হয় অরুন্ধতী, সপ্তর্ষি। কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিতে ভিজার অপেক্ষায় উন্মুখ হয় ধরণী।কাম আর প্রেমের এমন অভূতপূর্ব মেটাফর পাঠককে এক অনির্বচনীয় আর্দ্রতায় ভাসিয়ে নেয়। আমরাও যেনো দয়িতের সাথে মিলনে দীর্ঘ দহন ক্লান্ত সময়ে মেঘের গুড়ুগুড়ু ডাক শুনতে পাই, বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস আমাদের গায়ে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়, উচ্ছৃঙখল, ক্ষুধার্ত, পীড়িত জনতার সম্মিলিত পদধ্বনি আমাদের কানে বাজে মেঘের অর্জন হয়ে। 

ধ্রুবপুত্র উপন্যাসে যে সময়কে ধরেছেন অমর মিত্র, ভাষা ভঙ্গিতে তিনি সে সময়টাকেই বিশ্বস্ততায় ধরে রাখতে পেরেছেন। তিনি যখন লিখেন, "রাজা কখন বেরোলেন এই সুন্দরীর গৃহ থেকে, রাজা যেন ভাদ্র আশ্বিনের সারমেয় হয়ে গেছেন ", আমরা স্পষ্টতই জানি এ এসময়ের ভাষা নয়। শওকত আলীর 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' কিংবা সেলিনা হোসেনের 'নীল ময়ূরীর যৌবনের' ভাষা মনে পড়ে আমাদের। এবং এই স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গিতে উজ্জ্বয়িনী অবন্তী নগরীর এই আখ্যানের কাল আমাদের কাছে অধিকতর বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। মূলত যে সময় এবং যে জনপদের আখ্যান লেখক লিখছেন, তাও যে লেখকের সিগনেচার নিরপেক্ষ এক স্বাতন্ত্র্য মনোযোগ দাবি করে অমর মিত্র ধ্রুবপুত্রে তা প্রমাণ করেছেন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন