বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী'র পাঠপ্রতিক্রিয়া: ইন্দ্রাণী দত্ত'এর "পাড়াতুতো চাঁদ"

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী 

অরহান পামুক বলেন কাহিনীর গভীরতা এবং গল্প বলার কুশলতার সম্যক প্রমান পাওয়া যায় যেখানে লেখক একটি গল্প সাজান যার অভ্যন্তরে একটি গল্প বলেন, দুয়ের মধ্যে সচেতনভাবে দূরত্ব সৃষ্টি করেন। এরকম গল্পে পাঠকের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না।

পাঠককে ভাবতে হয়, গল্পের ভিতরে ঢুকতে হয়। এই অভিজ্ঞতা অনেকটা সমুদ্রদর্শনের মত। তীরে বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের বিশালতা মাপা যায়, উদ্যম একটু বেশি হলে জলে শরীর ভেজান যেতে পারে। কিন্তু ইন্দ্রানীর গল্প সম্পূর্ণ উপভোগ করতে হলে ডুবুরীর মত জলের গভীরে নাবতে হবে, নাহলে তার গল্পের অন্তরঙ্গ সৌন্দর্যের পুরোটা আহরন করা যাবে না। গুরুচন্ডালি থেকে প্রকাশিত তার ‘পাড়াতুতো চাঁদ’ গল্পগ্রন্থ পড়তে পড়তে বারবার এটাই মনে হচ্ছিল আমার।

ইন্দ্রানি তার গল্প বলার কুশলতায় পাঠককে নিবিড়তায় জড়িয়ে ফেলে আস্টেপৃষ্ঠে। নিপুন কুশলতায় উনি তাঁর গল্পের মধ্যে পাঠককে প্রবেশ করান। তার চরিত্র, তাদের অবস্থান, পারিপার্শ্বিককে ছুঁতে ছুঁতে পাঠক এগোতে পারেন অনায়াসে। তার গল্পের হদয়টিকে ছোঁয়ার জন্য পাঠকের হাতে সুতো ধরিয়ে দেন, সঙ্কেত রাখেন। এখানে পাঠকের নিজের এগিয়ে চলার থাকে, খোঁজার থাকে। আবিষ্কারের আনন্দ থাকে। 
এইখানেই তার গল্পের অন্য মাত্রা যেটা বারংবার এই গল্পগ্রন্থের দশটি গল্পের স্বল্প পরিসরে প্রকাশ পেয়েছে।

কয়েকটি গল্পের বিশেষভাবে উল্লেখ না করে পারা যায় না। যেমন পয়লা আষাঢ় গল্পটি – “রুবির বাঘের নাম শান্তনু। বাঘ যেমন হয় – পেল্লায়, ডোরাকাটা, বিশাল খন্ড-ত ল্যাজ......মিত্র সুইটস আর গাড়ির মাঝখানে ঐ জ্যোৎস্নার ওপর হিসি করছিল শান্তনু – আকাশের দিকে মুখ, সামনের দু’পায়ে শরীরের সম্পূর্ণ ভর, পিছনের পা ভাঁজ করা এবং লম্বা ল্যাজ মাটির সঙ্গে সমান্তরাল – “ পিছনে পড়ে যাওয়া রুবির ক্রোধ আর ইচ্ছার মূর্তি হয়ে ওঠা এই বাঘ যে কোন মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে তার চারপাশ। ক্রোধের সেই কালো ডোরার উপর কালো কাপড় ফেলে বাঘ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় রুবি।

কিংবা ক্রায়োনিক্স গল্পে শতদল মেসো যার ধংসস্তূপের সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরছিল পবিত্র আর রাস্তার রোলের দোকানের সামনে বসে তাকেই গলা তুলে বলতে শোনে – “বেশ করে লঙ্কাকুচি আর পেঁয়াজ দিও তো আর একটু বেশী সস। একটু বেশী সস, বুঝলে? কাল কম দিয়েছিলে। তোমার দোকানের সস না – ‘চ অ ক স’ করে তৃপ্তির শব্দ করে মেসো – ঠোঁটে জিভ আর দাঁত দিয়ে – সামান্য থুতু ছিটকোয়। “

তখন প্লাস্টিকের চেয়ারটা অবিকল একটা রথ হয়ে যায়। নটার ট্রেন চলে যায়, কিন্তু মেসোর আত্মহত্যা করার কথা মনে আসে না।

এইরকম ছবি আঁকেন ইন্দ্রানী। যেখানে কল্পনার বাঘের গায়ের গন্ধ পাওয়া যায় সহজেই, মেসোর রোল খাওয়ার ছবি চোখের সামনে ভেসে থাকে অনেকক্ষণ। এইরকম ছবি জুড়তে জুড়তে পাঠককে হাতছানি দিয়ে নিয়ে যান অনেক গভীরে, যেখানে ভাবতে হয়, অনুভব করতে হয়, একাত্ম হতে হয়।

এই সঙ্কলনের আমার অতি প্রিয় দুটি গল্প কুপরিবাহী আর সমরেশের জীবনদেবতা। জীবনস্পর্শ হারিয়ে ফেলা পরিতোষকে আমরা পাই কুপরিবাহী গল্পে। সমরেশের জীবনদেবতা গল্প আমার পড়া ইদানীংকালের শ্রেষ্ঠ গল্প – কি অসামান্য দক্ষতায় এই গল্পের নির্মাণ করেছেন ইন্দ্রানী। গল্পের এক অলীক ঘোড়া স্বপ্নে আসে, সেই পক্ষীরাজ লুক্কায়িত পক্ষ বের করে পিঠে মানুষ নিয়ে ইছাবটের দিকে
উড়ে যায়। কানেকশনের কি সেই টেকনিক, যার খোঁজে সমরেশ ঘুরে বেড়ায়।

ইন্দ্রানীর গল্প অন্য ধরনের, অন্য ঘরানার। তাহলে কি তার গল্প এক্সপেরিমেন্টাল? বাংলায় অনেক লেখকের এক্সপেরিমেন্টাল লেখা পড়েছি। কিন্তু সেরকম অনেক গল্পে প্রকরণ সরিয়ে নিলে কিছুই পড়ে না থাকতেও পেয়েছি। ইন্দ্রানীর লেখার ভঙ্গী বিরল, নিজস্ব।

কিন্তু প্রতিটা গল্পকে তার প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েছেন, কোন স্টাইলে আটকে থাকেন নি। প্রতিটা চরিত্র তাদের আনুষঙ্গিক, কিছু টুকরো কথা আর মনোজগতের জটিল বিন্যাসে ধরা ছোঁয়ার মধ্যে থেকেও অধরা থেকে পাঠকের ভাবনাকে সবসময়েই উসকে দিতে থাকে।

গল্প পড়া শেষ হয়ে গেলেও ছাড়তে চায় না পাঠককে। একেকটা গল্প সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয় অনেকদিন। শেষ হয়ে হইল না শেষের এক নতুন প্রক্রিয়া খুঁজে পাই ওঁর গল্পে। এইখানেই ইন্দ্রানীর সাফল্য।

আমি অস্ট্রেলিয়া নিবাসী ইন্দ্রানীর বিভিন্ন ওয়েবজিনে পড়েছিলাম আর আরও বেশী বেশী করে পড়ার সুযোগ খুঁজছিলাম। গুরুচণ্ডালী প্রকাশনী ইন্দ্রানীর দশটি গল্পের সংকলন এনেছেন ‘পাড়াতুতো চাঁদ’ গল্পগ্রন্থে। সমকালীণ বাংলা গল্প নিয়ে আলোচনায় এই বইটির কথা না বললে ফাঁক রয়ে যাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন