বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

রঞ্জনা ব্যানার্জীর গল্পঃ রঙ

টিম আর সান্ড্রা কখন যে ঘরে ঢুকেছিল আমি টেরই পাইনি! অশোকের আর কাণ্ডজ্ঞান হলো না। কতদিন বলেছি ঘরের বাইরে বেরোলে যেন দরজা টেনে যায়!কীসের কী? আজও দরজা হাট করে খোলাই ছিলো। কলবেলটা বাজলে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময়টুকু অন্তত পেতাম।
আলগা পা’টা একটু দূরে সোফার কিনারে অসহায় তাকিয়ে আছে। হুইলচেয়ার অবশ্য আমার পাশেই। 

অক্টোবর যাই যাই করছে। গত দুইদিন তুমুল হাওয়ায় মেপল আর বার্চ গাছগুলো মাথা ঝাঁকিয়ে পাতা খসিয়েছে। অশোক বাইরে পাতা কুড়োচ্ছে। ওর ঠান্ডার ধাঁত, এতক্ষণ বাইরে থাকা ঠিক নয়। শালটা বুনছিলাম মন লাগিয়ে, সময়ের তাল রাখিনি। এখন দেখছি ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চার ছুঁই ছুঁই!আমি বাজারটা চাপি। এটা এখন অশোক আর আমার জরুরি যোগাযোগের মাধ্যম। একসময় এইসব পাতা কুড়োনো, বাগান করা স-ব আমিই করতাম। হাঁটুর কাছটা চিনচিন করে ওঠে। এই এক ঝামেলা, যখনই কোনো পুরোনো কথা মনে হয় তখনই বাম হাঁটুর চারপাশ ঘিরে বিচ্ছিরি একধরণের অস্বস্তি হয় আমার। 

টিম আমার মুখোমুখি সোফাটায় ধপ করে বসে। ওর হাতে চিঠি জাতীয় কিছু একটা। সান্ড্রা তড়বড় করে বলে, ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা। অশোক আসুক, তারপর বলছি।’ আমি কৌতূহল চেপে রাখি। শালটা পরখ করে ও। ‘সামান্থার জন্যে’, আমি জানাই। সামান্থা আমাদের বৌমা। বারোদিন পরেই অটোয়া থেকে আসছে ওরা। ঋষভ, সামান্থা আর আমাদের নাতনি অনুসূয়া। তার আগেই শেষ করতে হবে। সান্ড্রা রায় দেয়, ‘সামান্থাকে মানাবে।’ আমি জানি। সামান্থার নীল চোখের সঙ্গে মিল রেখেই হাল্কা নীল আর লেবু-হলুদ রঙের এই প্যাটার্নটা বুনছি আমি। 

‘কী আশ্চর্য অশোক এলো না এখনও!’ আমি হুইলচেয়ারটা কাছে টানি । সান্ড্রা উঠে দাঁড়ায়, ‘বসো তো আমি দেখছি’ অমনি অশোক ঘরে ঢোকে। ওকে আরো কালো দেখাচ্ছে। আমাদের নাতনিটিও হয়েছে দাদুর মত কৃষ্ণকালো। ঋষভ আর আমি সামান্থার মত ফকফকা সাদা না হলেও ময়লা নই তাও দাদুর রঙটাই জিতে গেল! সামান্থা অবশ্য বলে মিষ্টি রঙ। 

অশোক কল ছেড়ে গরম জলে হাতের হিম তাড়ায়। টিম চোখ পাকায়, ‘বাজার টেপার সাথে সাথে ঢুকলে না কেন? এমার্জেন্সি কিছু যদি হতো!’ অশোক হাত মুছতে মুছতে বলে, ‘ তুমি আমাকে না দেখলেও আমি তোমার বপু দেখেছি।এমার্জেন্সির ধরনটা বুঝেছি।’ 

আমি টিমের নজর কাড়ি। ‘অদ্ভুত ঘটনাটা বলো এবার!’ টিম হুঁশে আসে, ‘ওহ্‌ অশোক কী সাংঘাতিক কাণ্ড!’ চিঠিটা হাওয়ায় দুলিয়ে বলে, ‘প্যান্ডোরা’স বক্স!’ 

অশোক সোফায় বসতে বসতে জানতে চায়, ‘ মিউনিপ্যালটির জলের মিটার লাগানোর নোটিস?’ দু’দিন আগেই টিম কোথাও শুনে এসেছে জলের কলে কর্পোরেশন এবার মিটার বসাবে । টিম বলে, ‘পড়েই দেখ।’ 

অশোক হাত বাড়িয়ে নেয় চিঠিটা। হঠাৎ সব সুনসান। কেবল টিমের ভারী নিঃশ্বাস লিভিং রুম জুড়ে ঘুরে বেড়ায়। খানিক পরে চোখ তুলে আমার দিকে তাকায় অশোক। বিষণ্ণ সেই দৃষ্টি। ‘কী হলো?’ আমি জানতে চাই। থমথমে মুখে আমাকে নয় টিমকে বলে ও, ‘চেকটা ফেরত দিয়ে দিও।’ 

‘কিসের চেক?’ 

অশোক এবার চিঠিটা আমার হাতে দেয় । 

প্রেরকের নাম ‘এ্যান ব্রেটন’। কোন এক ইন্ডিয়ান দম্পতির খোঁজে টিমকে লেখা চিঠি । চিঠির সারবত্তা হলো, দশ বছর আগে এই দম্পতির সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিল তার ছেলে। সেই অনভিপ্রেত ঘটনার পরপরই তারা জেনেছিলেন ওদের ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্টের কথা। ভদ্রমহিলার ছেলের নাম ‘ব্রুস ব্রেটন’। ইন্ডিয়ান দম্পতির কাছে তিনি তার ছেলের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এই চেক যদি তারা গ্রহণ করেন তবেই তার ছেলের আত্মার সদ্‌গতি হবে। 

আমার চোখের সামনে দৃশ্যটা দুলে ওঠে। 

সান্ড্রা জিজ্ঞেস করে, ‘চেনো তোমরা?’ ‘না’, আমি মাথা নাড়ি। অশোকও জানায় চেনে না এদের। 

পুলিশের নথিতে দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে লেখা আছে হঠাৎ গাড়ির সামনে মুজ লাফিয়ে পড়াতেই ব্রেইক ফেইল। নর্থ আমেরিকায় হাইওয়েতে মুজ লাফিয়ে নামার ঘটনায় এমন দূর্ঘটনা দুর্লভ নয়। কেবল আমি জানি অশোক অন্যমনস্ক না হলে এড়ানো যেত। গাড়িটা আমার দিকেই দেবে উল্টেছিল। অশোকের কেবল হাল্কা চোট। 

সান্ড্রার কথায় এগারো বছর আগের সেই ২৫ শে জুলাই ঘাই মারে আমার বুকে। 

আমাদের আসলে পাঁচদিন থাকার কথা ছিলো। ২৩ থেকে ২৭ শে জুলাই। আমাদের পঁচিশতম বিয়েবার্ষিকীতে ঋষভের উপহার; সমুদ্রের ধারে মনোরম সেই কটেজে পুরো পাঁচদিনের অবকাশযাপনের প্যাকেজ। কটেজটা টিমের বন্ধুর। ছোটো স্কটিশ অধ্যুষিত শহর, নামটাও রিনরিনে; ‘ইঙ্গলটাউন’। সাড়ে তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। আঠারো শতকের স্থাপত্যকলার নিদর্শনের জন্যে বিখ্যাত। ঋষভ তখন ইয়েলে ল পড়ছে। আমাদের অজান্তেই সে আমেরিকায় বসে টিমের মাধ্যমে সব আয়োজন সেরেছিল। স্থাপত্যকলা অশোকের প্যশন। আর আমার ভালো লাগে বিস্তীর্ণ সমুদ্রের পাশে চুপচাপ বসে ঢেউয়ের আনাগোনা দেখতে। টিমের মুখে এই কটেজের কথা শুনে আমিই কোনো এক সময় আবদার করেছিলাম, যাব একবার। ছেলে মনে রেখেছে। 

সেদিন ছিল সোমবার । ২৩ শে জুলাই ২০০৭ সন। সকাল সকাল বেরিয়ে যাব ঠিক করলেও বেরোতে বেরোতে বেশ বেলাই হয়েছিল আমাদের। তবে অফিসের সময় পার করে বেরোনোয় হাইওয়ে প্রায় ফাঁকাই ছিল। তিন ঘণ্টার মধ্যেই ঢুকে পড়েছিলাম শহরে। কী সুন্দর গোছানো শহর! দু’ধারে পাইন আর বার্চের সারি মাঝখানে সিঁথি কেটে সোজা পথ। তারপর বামে হেলে মেঠো রাস্তা। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে ছয়-সাতটা কটেজ। কটেজগুলোর ডান পাশে সার সার হাওয়াকলের আভাস। সূর্যের তেজ কমলে সমুদ্রের ধারেই কাটিয়েছিলাম প্রথম বিকেল। 

পরদিন ২৪ শে জুলাই আমাদের বিয়েবার্ষিকী। ব্রেকফাস্ট সেরেই শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম। রাস্তাঘাট ঝকঝকে। বড়বড় ভিক্টোরিয়ান দড়দালান ; এক্কেবারে ছবির মতন। প্রচুর ছবি তুলেছিলাম। দুপুরে লাঞ্চ করতে ঢুকেছিলাম একটা সীফুড রেস্তোরাঁয়। প্রায় ফাঁকাই কিন্তু আমরা ঢোকা মাত্র সবাই অদ্ভুতভাবে মাথা ঘুরিয়ে দেখছিল আমাদের! 

শহরে ঢোকার সময়েই চার্চটা নজর কেড়েছিল। রেস্তোরাঁ থেকে ফেরার পথে থেমেছিলাম আমরা। খুঁটিয়ে দেখবার মত স্থাপত্য। ভেতরটা আরও সুন্দর। উঁচু ডোমের নিচে স্টেইণ্ড গ্লাসের অপরূপ চিত্রকল্প। আমাদের যিনি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন তাঁর নাম ‘এ্যান্ড্রু হল’। তিনি এই চার্চের মিনিস্টার। আসলে আমরা বাইরে দাঁড়িয়েই ছবি তুলছিলাম, উনি দেখতে পেয়ে ভেতরে ডাকলেন। জানালেন এই প্রিসবেটেরিয়ান চার্চটি আঠারো শতকের ঐতিহাসিক স্থাপনা। বেশ প্রশান্ত মনে কটেজে ফিরেছিলাম আমরা। 

বিকেলে জলের ধারে ফোল্ডিং চেয়ার পেতে বসেছিলাম। সূর্য পাটে নামেনি তখনো। বিয়ের প্রথম দিককার দিনগুলো নাড়াচাড়া করছিলাম দুজনে। অশোকই দেখেছিল আগুনটা। আনমনেই মাথা ফিরিয়েছিল কটেজের দিকে। টালির ছাদের ওপারে লালের হোলি যেন! একটু পরেই হাওয়া কেটে ফায়ার সার্ভিসের বুক কাঁপানো সাইরেন। প্রায় ছুটে ফিরেছিলাম আমরা। রান্না ঘরের জানালা দিয়ে দমকলের লাল-আলোর ঘূর্ণির আভাস বোঝা যাচ্ছিল। 

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের জন্যে পাউরুটি কিনতে বেরিয়েছিল অশোক। ফিরে এসে জানালো চার্চটাতেই আগুন লেগেছে। চার্চে? এতো উঁচু পাথরের তৈরি চার্চে আগুন লাগলো কীভাবে? শর্ট সার্কিট? অশোক মাথা নাড়ে। ‘সম্ভবত আর্সন কেইস। পুলিশ ধারে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না’। দোকানে ক’জন ছোকরা গোছের ছেলেপেলে ওকে দেখছিল ঘুরে ঘুরে। সেতো প্রথম দিন থেকেই আদেখলার মত দেখছে যেন মঙ্গল গ্রহ থেকে নামলাম! অশোককে বলি, ‘ধুর! চল ফিরে যাই!’ অশোক রাজি হয়। অতঃপর পাঁচদিনের প্যাকেজের গচ্চা মেনে আমরা বাড়ির পথ ধরি। 

চার্চের দিকটা বন্ধ, ঘুরপথে হাইওয়ের নিশানা পেতে সময় লাগে আধঘন্টা। গাড়িতে তেল ভরার জন্যে থামে অশোক। আর আমাদের ঠিক সামনে দাঁড়ায় ট্রাকটা। ড্রাইভার সিট থেকে নামে একজন। বিশের ওধারেই বয়স তবে বেশ গাঁট্টাগোট্টা। অবাক হচ্ছিলাম আমি কারণ পাম্প আটকে গাড়ি পার্ক করলেও ও তেল ভরছিল না। অশোক এসবের কিছুই খেয়াল করেনি। তেল ভরা শেষে স্টোরের ক্যাশকাউন্টারের দিকে এগোচ্ছিল অশোক। দেখি ছেলেটাও তেল না ভরেই অশোকের পেছন পেছন হাঁটছে। ট্রাকের পেছনের সিট থেকে নেমে অন্য একজন ড্রাইভারের সিটে বসে এবং গাড়িটা টেনে স্টোরের পার্কিংএ থামায়। কী হচ্ছে? আমার বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি গাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। দোকানের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা পার হবার জন্যে পা বাড়াতেই দেখি ছেলেটা তেড়েফুঁড়ে যাচ্ছে অশোকের দিকে। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠি আমি। ছেলেটাও চমকে তাকায় আমার দিকে। স্টোর থেকে ক’জন বেরিয়ে ওদের আলাদা করে। আমার কোমর থেকে পা জেলির মত টলটলে হয়ে গলে যাচ্ছিল যেন । আমি রাস্তাতেই বসে পড়ি। ছেলেটা ছুটে গাড়িতে ওঠে আর সঙ্গে সঙ্গেই চাকা ঘষে বিচ্ছিরি ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তুলে গাড়িটা আমার প্রায় গা ঘেঁষেই বেরিয়ে যায়। অশোক আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা গাড়িতে ওঠে। কেউ একজন রাস্তার ওপার থেকে চেঁচিয়ে জানতে চায়, ‘লেডি আর ইউ ওকে?’ সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে আমি খেই হারিয়ে বোকার মত একভাবে বসেছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। পাদুটো ভয়ানক কাঁপছিল আমার। গাড়িতে ফিরতে যেন সারাদিন লেগে গিয়েছিল সেদিন । আমার পায়েরা কি আগাম টের পেয়েছিল এটাই ওদের একসঙ্গে শেষ হাঁটা? 

সারা রাস্তা অশোক গুম ধরে ছিল। কী হয়েছিল কিছুই বলেনি। অ্যাক্সিডেন্টের পরেও নয়। আমিও জানতে চাইনি। সান্ড্রার প্রশ্নের জবাবে আজই অশোক মুখ খুললো। এবং এই প্রথম আমিও জানতে পেলাম ২০০৭ সনের ২৫ শে জুলাই আমাদের পঁচিশতম বিয়েবির্ষিকীর ঠিক একদিন পরে আসলে কী ঘটেছিল স্টোরে! 

সেদিন ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে ছেলেটা এক্কেবারে অশোকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। এই ছেলেই ‘ব্রুস ব্রেটন’। অশোক পেছন ঘুরে তাকাতেই ছেলেটা মারমুখে জানতে চাইলো, ‘কোনো সমস্যা?’ 

অশোক হেসে বলেছিল, ‘তোমার সমস্যাটাই বোঝার চেষ্টা করছি।’ ছেলেটা সাপের মত হিসহিস করে আঙুল তুলে বলেছিল, ‘তোমাকে আরও ছোটো করে দাঁড়ানো শিখতে হবে’। অশোক বুঝে গিয়েছিল এই ছেলে ঝামেলা পাকাতে চাইছে। কথা না বাড়িয়ে দাম দিয়ে দরজার দিকে এগোতেই ছেলেটা লাফ দিয়ে সামনে আসে, ‘এখানে থাকতে হলে আমাদের সমীহ করে চলতে হবে’। অশোক অবাক ‘তুমি কে? ’ ছেলেটা তখন চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ‘তোমরা সব একই। কৌশলে আমাদের রক্তের ধারা পাল্টাচ্ছ’। আচ্ছা ঝামেলাবাজ তো! অশোক দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যায়। পেছন থেকে ছেলেটা চেঁচায়, ‘এখান থেকে দূর হও। নিজের দেশে ফিরে যাও’। অশোক এবার আর মেজাজ ধরে রাখতে পারে না, এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘তোর বাপের দেশ এটা?’ ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে গায়ের ওপর তেড়ে আসে। আশপাশের লোকজন না থামালে সেদিন রক্তারক্তি হত। 

এই ঘটনার কোন মাথামুণ্ডু পায়নি অশোক। 

টিমই প্রস্তাব দেয়, ‘চল যাই ইঙ্গলটাউন। চেকটারও তো একটা কূল করা দরকার’। 

রাতে ঋষভ আদ্যোপান্ত শোনে। বলে টিমের কথাই ঠিক। ওরাও যাবে সঙ্গে। 

ঠিক হয় ঋষভ, সামান্থা এলে একটা সেভেন সিটার ভাড়া করে সবাই একসঙ্গেই যাব। এ্যানের ফোন নম্বর জোগাড় করে ফেলে টিম। ফোনে ওকে জানিয়ে দেয় আমরা শনিবার এগারোই নভেম্বর আসছি ইঙ্গলটাউন। এ্যান আমাদের সেদিনই বিকেল চারটায় চায়ের নেমন্তন্নে ডাকে। 

খুব ভোরে আমরা রওয়ানা দি। শহরটাতে ঢুকতেই সেই চার্চ। বাতাসে শীতের হিমের আঁচ ধরছে। আমি আর অনুসূয়া ছাড়া বাকি সবাই গাড়ি থেকে নামে। আমি জানালা দিয়ে চোখ মেলতেই মনে হয় চার্চের গায়ে খোদাই করা মূর্তিগুলো ঠান্ডা চোখে দেখছে আমাকে। বাইরে থেকেই কটা ছবি তুলে ফিরে আসে সবাই। কাল ফেরার পথে টিম ভেতরে যাবার ব্যবস্থা করবে। সামান্থা ওর সেলফোন স্ক্রল করে চার্চের গায়ের ক্লোজআপ শটগুলো দেখায়। ছবিতেও যেন শীতল বিষণ্ণতা ছুঁয়ে আছে পাথরের গায়ে। 

গ্রীষ্ম শেষ। কটেজ গুলো বন্ধ এখন। হলিডে ইনে উঠবো আমরা। মেঠো পথটায় গাড়ি ঢুকতেই হাঁটুর চিনচিন অস্বস্তিটা বাড়ে। 

আমরা সময়মতই পৌঁছেছিলাম এ্যান ব্রেটনের বাড়িতে। ডোরবেলে হাত দিতে না দিতেই দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ষাটের ওপারে বয়েস। সম্ভ্রান্ত চেহারা। আমাদের সবাইকে সাদরে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। অনুসূয়া ওর কারসিট বাস্কেটে ঘুমিয়ে কাদা। প্রস্থেটিক পা’টা গায়ের সাথে সয়ে গেছে, সাহায্য লাগে না তাও সামান্থা হাত ধরে আমাকে সোফার কাছে নিয়ে গেল। 

সামনের দেয়ালেই ঝুলছে ছবিটা। হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশনের ছবি। কালো গাউন পরা, নিচে লেখা, ‘ব্রুস ব্রেটন ১৯৮৮ – ২০১৬’। ছবির চোখ জোড়া মনে হ’ল সরাসরি আমাকে দেখছে। আমি চোখ সরিয়ে নি। কফি টেবিলের ওপরে বাদাম, চিজ, বাইট-সাইজ স্যান্ডুইচ। ট্রলিতে ফ্রুটপাঞ্চ আর গ্লাস পাশেই চায়ের সরঞ্জাম সাজানো। ভদ্রমহিলা আমার কাছাকাছি রিক্লাইনারটাতে বসেন। কেউ কোনো কথা খুঁজে পাইনা। অবশেষে টিম গলা খাঁকারি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ব্রুসের জন্যে। এ্যানও আমার হাত ধরে সমবেদনা জানায়। এরপরেই ক্রমশ কথার পিঠে কথা বাড়ে আর আমরা অকল্পনীয় এক কাহিনীতে হোঁচট খেতে খেতে ঢুকি। অবাক হই জেনে যে ব্রুস আত্মহত্যা করেছিল। দীর্ঘদিন বিষন্নতায় ভুগছিল। চিকিৎসা চলছিল। মারা যাবার আগে সারাক্ষণ কেবল একজোড়া ভয়ার্ত চোখের ছবি আঁকতো। অবশেষে ওর সুইসাইড নোট থেকেই এ্যান জানে এটা সেই ইন্ডিয়ান লেডির চোখ। ব্রুস এই চোখের ভয় ভাঙাতে চেয়েছিল। আমি শুধরে দি, ‘আমি বাংলাদেশের’। 

ঘটনার মূলে ‘এ্যান্ড্রু হল’ এবং তাঁর স্ত্রী ‘ইসাবেলা’। 

আর এ্যান্ড্রু হল হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সেদিন আমাদের চার্চটা ঘুরে দেখিয়েছিলেন! 

এ্যান্ড্রু এসেছিলেন আমেরিকার শিকাগো শহর থেকে। শিকাগোতে বড় হলেও এ্যান্ড্রুর জন্ম কানাডার সাস্কাচুয়ানে। মিনিস্টারের চাকরি নিয়ে ফিরে এসেছিলেন স্বদেশের এই ছোট্ট শহরে। সাথে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ইসাবেলা। হাসিখুশি ইসাবেলা সানডে স্কুলে পড়াতো। সমমনা মহিলাদের নিয়ে বুকক্লাবও করেছিল। এ্যানও ছিল সেই বুকক্লাবে। 

এখানের লোকেরা মুখে কিছু না বললেও অন্য সংস্কৃতির আঁচ এড়িয়ে চলে। নিজেদের নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। ইসাবেলা আমেরিকান। কেউ কেউ একারণে ওকে এড়িয়ে চলতো। ইসাবেলা আর এ্যান্ড্রু দু’জনেই আমুদে এবং বন্ধুবৎসল। সুদূর আমেরিকা থেকে ওদের পুরোনো বন্ধুরা আসতো। এদের মধ্যেই আফ্রিকানআমেরিকান একজন বন্ধু ছিল; নাম অলিভার। লেখক। বেশ কবার এসেছিল সে। ইঙ্গলটাউনের পটভূমিতে কী এক উপন্যাস লিখছিল সে। 

মিনিস্টারের বাড়িতে বিদেশীদের হুল্লোড় অনেকে এক্কেবারে পছন্দ করছিল না। তাছাড়া এখানকার উঠতি মেয়েদের কাছে আমেরিকান ইসাবেলা ক্রমশ আইকন হয়ে উঠছিল সেটাও বিশেষ করে মহিলাদের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আড়ালে এরা ইসাবেলার পোশাক-আশাক, উচ্চস্বরে কথা বলা, এসব নিয়ে সমালোচনা করতো - ‘ইসাবেলা একেবারেই মিনিস্টারের স্ত্রীসুলভ নয়’। ‘এটা শিকাগো নয় ইঙ্গলটাউন’। সমস্যার জটিল হয় এ্যান্ড্রু ইসাবেলার শিশুকন্যার জন্মের পরে। বাচ্চাটা হওয়ার পরে অবশ্য ইসাবেলা এ্যান্ড্রুর গুণমুগ্ধরাও চমকে উঠেছিল। এই বাচ্চা কিছুতেই এ্যান্ড্রু কিংবা ইসাবেলার মতো নয়। ওর গায়ের রঙ হাল্কা বাদামী। মাথা ভর্তি কোকড়া চুল। এ্যান্ড্রু কিংবা ইসাবেলার মত সমুদ্র নীল চোখও নয় বাচ্চাটার। 

এটা প্রিসবেটেরিয়ান চার্চের শহর। উপাসনালয় সংক্রান্ত ইস্যুতে কোন ছাড় নেই এখানে। এ হেন শহরে এমন ঘটনা সবাইকে বিব্রত করে। সেই আফ্রিকান-আমেরিকান লেখককে নিয়ে গুজবের ডালপালা ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। অসন্তোষ আর চাপা থাকে না। চার্চের পরিচালনা পর্ষদকে বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে কট্টরপন্থীরা। এ্যান্ড্রু আর ইসাবেলার কানেও পৌঁছায় এইসব কুৎসিত কথা।এক রোববারে এ্যান্ড্রুর পরিচালনায় প্রার্থনা চলার সময় একদল তরুণ বেরিয়ে যায় চার্চ থেকে। শোনা যায় সেদিনই এ্যান্ড্রু পদত্যাগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইসাবেলার কারণেই সিদ্ধান্ত পাল্টায়। এর পরপরই চার্চের সদস্যদের কাছে ইমেইল আসতে থাকে বিভিন্ন অচেনা নামে; তরুণ সমাজকে বাঁচাতে, চার্চের মূল্যবোধ বাঁচাতে, যিশুর ত্যাগকে অপমান না করতে চাইলে এ্যান্ড্রুকে চার্চ থেকে বিতারিত করতে হবে। 

মহিলাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবার জন্যে ইসাবেলা ওর বাড়িতে সবাইকে ডেকেছিল একদিন। কেউ যায়নি এমনকি এ্যানও নয়। অবশেষে পরিস্থিতি সামলাতে শহরের কর্তা ব্যক্তিরা চার্চের পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ে টাউনহলে রুদ্ধ-দ্বার মিটিঙে বসেন। আর মিটিং চলাকালীন সময়েই চার্চে কেউ আগুন লাগিয়েছিল সেই দিন। 

এ্যান জানায়, ‘ট্যুরিস্টদের সাধারণত মান্য করা হয়, সে শাদাই হোক কি কালো। কিন্তু তোমরা এসে পড়েছিলে ভুল সময়ে।’ সেদিন এ্যান্ড্রুর সঙ্গে চার্চের স্থাপত্য দেখাকালীন সময়ে অশোক আমাদের দেখেছিল ব্রুস। ব্রুস এবং তার বন্ধুরা চার্চের কট্টরপন্থি দলের। ওরা ভেবেছিল এ্যান্ড্রু আমাদের চেনা কেউ। পেট্রোল পাম্পে অশোকের সঙ্গে ওদের দেখা হওয়াটা কাকতালীয় ছিলো না, ওরাই অশোকের পিছু নিয়েছিল। 

এ্যান বলে, ‘নিয়তি। তোমরা কিছুই জানতে না অথচ তোমাদেরই ক্ষতি হলো সবচে’ বেশি।’ আমি বলি, ‘তোমারও তো অপূরনীয় ক্ষতি হলো’! এ্যান আমাকে অবাক করে বলে, ‘ব্রুসকে আমি জীবনকে ধারণ করার শিক্ষা দিতে পারিনি। জীবনধারণ আর জীবনকে ধারণ দুটো এক নয় তো।’ 

সান্ড্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘কানাডায় এমন বর্ণবাদী শহর আছে, জানাই ছিল না’। টিম উত্তর দেয়, ‘কার্পেটের নিচে ময়লা জমানো আমাদের ইউরোপিয়ান রক্তের বৈশিষ্ট্য’। 

আমি যুক্তি খুঁজি, ‘আমরাও কি কালো দম্পতির হঠাৎ নীল চোখের বাচ্চা দেখলে এমন ভাবতাম না?’ 

সামান্থা বলে, ‘কেন ভাববে? চার্চের খাতিরেই যদি বলো তাও সমাধান ছিলো; জিনপরীক্ষা। এগারো বছর আগেও এটা ছিলো এখন তো আরো সহজলভ্য। তবে কী সেটাও অপমানজনক। তাছাড়া ইসাবেলা তো কথা বলতেই চেয়েছিল। তৃতীয়বিশ্ব নিয়ে নাক সিটঁকাই অথচ আমরা নিজেরা যে কী কুসংস্কারাচ্ছন্ন!’ 

সামান্থার চোখে জল চিকচিক করে। অনুসূয়াকে কারসিটের বাকল খুলে কোলে তুলে নেয়। বুকের সাথে সাপটে রাখে। কী জানি কী চলছে ওর মনে? আমি মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলি , সব কালে সব দেশে মেয়েদেরই পরীক্ষা দিতে হয়। রামরাবণকে নয়। 

‘কী হলো তারপরে?’, এতক্ষণে অশোক কথা বলে। চার্চের আগুনটা অতিউৎসাহী কেউ ঘটিয়েছে। এ্যান্ড্রুকে তাড়ানোটা উদ্দেশ্য ছিল। চার্চের ক্ষতি নয়। এটা ট্যুরিস্ট শহর। ট্যুরিস্ট সিজনে এমন ঘটনা বাইরে প্রকাশ পেলে শহরের অর্থনীতিতে বিকট প্রভাব পড়বে। তাই চার্চের সংস্কারেই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল কমিউনিটি। তাছাড়া এ্যান্ড্রু ঘটনার কদিন পরেই পদত্যাগ করেছিল। তবে ওরা শহর ছেড়েছে আরও পরে। বাচ্চাটার যখন ছয়মাস প্রায় তখন ইসাবেলা টাউনহলে সবাইকে ডাকে। ও একটা তথ্যবহুল প্রেজেন্টেশন দেয়। এবার সংখ্যায় কম হলেও লোকজন উপস্থিত ছিল, বিশেষ করে চার্চের মহিলা বুকক্লাবের সদস্যরা। এ্যানও গিয়েছিল, তবে বেশ দেরি করে। চার্চের আগুনে ব্রুসের সংশ্লিষ্টটা নিয়ে ওর মনে সন্দেহ ছিল। তাই কিছুটা গ্লানিতে ভুগছিল। তাও শেষমেশ গিয়েছিল। ইসাবেলা সেই প্রেজেন্টেশনের ভিডিও ধারণ করিয়েছিল প্রফেশন্যাল কাউকে দিয়ে। পরে সেই সিডি চার্চের সকল সদস্যের মেইলবক্সে পৌঁছে গিয়েছিল । তথ্যবহুল এই ভিডিওই পরবর্তিতে অনেকের চোখ খুলে দিয়েছিল। এর পরপরই ওরা সাস্কাচুয়ানে এ্যান্ড্রুর নিজের জন্মস্থানেই ফিরে যায়। তখন চার্চের বুক ক্লাবের সদস্যরাই ওর আনুষ্ঠানিক বিদায় দেয়। সেই সমাবেশেই ইসাবেলা বলেছিল, ‘জানালাটা খুলে দিয়ে গেলাম দিগন্ত দেখার দায়িত্ব তোমাদের’। 

আমি শুধাই, ‘বাচ্চাটা নিয়ে কী ব্যাখ্যা দিয়েছিল ইসাবেলা?’ 

সামান্থা হাসে ‘মা ওর জিনোলজিতে কালো কেউ ঘুমিয়ে ছিল। আমাদের সকলের পূর্বপুরুষ আফ্রিকান ভুলে গেলে? তোমার নাতনিকে দেখ!’ 

এ্যান সম্মতি দেয়, ‘ইসাবেলার তিন পুরুষ আগে বংশলতিকায় সাউথ আফ্রিকান কালো আছেন; তিনি ইসাবেলার ঠাকুরমার দিদিমা। বছর কয়েক আগে ইসাবেলা, ওদের একটা পারিবারিক ছবি পাঠিয়েছিল বুকক্লাবের একজনকে। মেয়েটার মুখ এক্কেবারে ওর বাবা মানে এ্যান্ড্রুর কার্বন কপি যেন। ওদের একটা ছেলেও আছে। কেনিয়া থেকে দত্তক নিয়েছে ওরা। সাস্কাচুয়ানে ওরা ভালোই আছে। ওখানে ডাইভার্স কমিউনিটি। সবাই অনেক খোলা মনের। ওরা দুজনই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।’ 

টিম এ্যানকে সেই কুড়ি হাজারের চেকটা ফেরত দিতে গেলে এ্যান হাহা করে ওঠে, ‘ওটা আমার ছেলের প্রায়শ্চিত্ত’। সামান্থাই সমাধান দেয়, ‘এই টাকা দিয়ে ইসাবেলার নামেই তোমাদের লাইব্রেরিতে কর্ণার কর একটা।’ আমি মনে মনে আমার বৌমাটিকে বুকে টেনে নি। 

হোটেলে ফিরতি পথে আমরা একটা রেস্তোরাঁতে থামি। বেশ ভিড়। অর্ডার নিতে আসা ছেলেটা এগারো বছর আগের মত কৌতূহলী চোখে আমাদের দেখে না। ঝটপট খাবার নিয়ে আসে। 

পরদিন ফেরার পথে সামান্থা বলে, ‘মা আগামী বছর তোমাদের বিয়েবার্ষিকীটা সেই কটেজেই করব।’ 

আমি ওকে হাত দিয়ে আলতো ছুঁয়ে থাকি। হাঁটু টা আর জালাচ্ছে না।



----------------





লেখক পরিচিতি:
রঞ্জনা ব্যানার্জী
কথাসাহিত্যিক
যুক্তরাষ্ট্রের থাকেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. অপূর্ব হয়েছে। রঞ্জনা ব্যানার্জী পারেন ও বটে এরকম একটা পটভূমিকায় আমাদের ধরে রাখতে একেবারে শেষ পর্য্যন্ত। খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ জানাই কথা-সাহিত্যিক কে।

    সৌমেন সেনগুপ্ত

    উত্তর দিনমুছুন