শাহাব আহমেদের ভ্রমণকথা : উরুবাম্বা নদী তীরে

নদীটা অদ্ভুত। কুস্কো থেকে মাচুপিচু ,তারপরে আমাজনে হারিয়ে গেছে সে, যেমন হারিয়ে গেছে ইনকাদের শেষ শহর 

"বিলকা বাম্বা" যাকে আমরা জানি "এলদোরাদো" নামে। 

নদীর বুকে অনেক পাথর, বড় বড় পাথর। আর ফেনিল স্রোত ওই পাথরগুলোতে মাথা কোটে, তার পরে রেগে চলে যায়। ইনকারা হাঁটতো এই নদী তীরে, স্নান করতো, মাছ ধরতো।

"ট্রাউট " মাছগুলো উজান বাইতে পছন্দ করে। কিছু কিছু মানুষের উজান ঠেলা একটা রোগ, ওই মাছগুলোর মতই। খলসে, পুঁটি , চাপিলা, চান্দা মাছের ডোবা নালা থেকে উঠে এসে কেউ কেউ এই পৃথিবীর ছোট বড় নদী, সমুদ্রে উজান ঠেলে ঠেলে হাতে ফোস্কা ফেলে অথচ বুকে তার চর জাগে, গহীন বালুচর। 

আমি প্রশ্ন করি "তোমার নাম কি?" 

তন্বী ও সুন্দর, বলে ,"উরুবাম্বা" 

উফ! কি গম্ভীর একটা নাম। 

বলি ,"তোমাকে এত চমৎকার চটুল মনে হয়, মনে হয় একজন কিশোরীর হাল্কা পায়ের হাওয়া, কেন এই ভারী নাম?" 

"সময়, সময়ের বোঝা কাঁধে হে আমার, আর ইতিহাসের অবিচার।" 


ইনকারা সভ্য ছিল, কিন্তু ওদের হত্যা করতে, ওদের পুড়িয়ে মারতে, ওদের গ্রাম, সভ্যতা, মন্দির, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে স্পেন থেকে এসেছিল আরও বেশি এক সভ্যতার পৈচাশিকতা, ফ্রানসিসকো পিজারো নামে। 

সেটা ছিল ১৫৩২ সাল। 

সেই থেকে মানুষ আর মানুষ ছিল না, ছিল বাইবেলে হাতে বরাহ বহর। 

তারপরে ইনকারা চলে গেছে। 

ইনকা ছিল রাজাদের টাইটেল, আর সভ্য সেই জাতির নাম ছিল কেচোয়া। কেচোয়ারা হারিয়ে গেছে, যেমন হারিয়ে গেছে বাংলার সরু আলপথে হাঁটা একজন মানুষ, বুকে যার এক স্তেপ ভালোবাসা। 

উরুবাম্বা নদী আজও বুকে বইছে অশ্রু। নীরব নিথর কিন্তু জীবন্ত পাহাড়গুলোর অক্ষি-নির্গত অশ্রু। আর সারি সারি আকাশ চুম্বী তন্বী ইউক্যাল্পটাস গাছ, খাটো কাপুলি বৃক্ষ, মিষ্টি লাল লাল ফলবাহী, আরও অগুনিত গাছ ও ফুলের সমাহার । 

আমি নদীর বুকে একটি ছোট্ট পাথরের উপরে গিয়ে বসি। পাশেই বিশাল একটি পাথর। এত বড় ও গুরু গম্ভীর সে, যে আমার সাহস হয় না তার উপরে বসতে। 

পাহাড়ী নদী ছুটছে হৈ হৈ করে। 

আমি বসে আছি। 

"আপনি একটি রোবট" 

কে যেন বলে, ফিরে তাকাই, কেউ নেই। 

"আপনার কোন অনুভূতি নেই, দুম দুম করে আপনাকে মারতে ইচ্ছে হয়।" 

"অনুভূতি কেন থাকবে না, অবশ্যই আছে" আমি বলে উঠি । 

কিন্তু পর মুহূর্তই টের পাই আমি নিজের সাথে কথা বলছি। তারপরেও কেন যেন মনে হয় কেউ আমার পেছনে।একজন নারী, খোপায় তার কদম ফুল, গলায় বর্ষার হিজল ফুলের মালা আর বুকে কঞ্চুলী ঢাকা হেমলক ফুলের ত্বিষ শুভ্র বিশুদ্ধতা। 

ফিরে তাকাই। 

না সত্যিই কেউ নেই। অডিটরি হ্যাল্যুসিনেশন, অবিরল জলের শব্দে কোথায় কখনও শোনা বা না-শোনা deja vu! 

কে যেন গাইতি শাবল দিয়ে আমার উপলাচ্ছন্ন শ্ক্ত মগজে ট্রেঞ্চ কাটছে, শিরির প্রেমে উদ্ভ্রান্ত ফরহাদের মত। তারপর সেখানে প্লাবন ফুসে উঠছে, সেই প্লাবনে ফরহাদের মত মৃত ভেসে যেতে যেতে আমি বুঝে উঠতে পারছি না কি সেই প্লাবন, জল না অনুভূতির। আমি অনেক কথা শুনতে পাই, কল কল জলের শব্দের মত স্পষ্ট অবাক-করা সব কথা। বিগত বিক্ষিপ্ত ভালোবাসা, না অনাগত দ্বিচীরিনী স্বপ্ন-কল্পনা-প্রজাপতির পাখার ঝটপট,আমি বুঝে উঠতে পারি না। 

একঝাক ট্রাউট উজান ঠেলছে, কেউ কেউ লাফ দিয়ে দিয়ে দস্যি বালকের মত। আকাশে চক্রাকারে দুটো চিল উড়ছে। উঁচু উঁচু রকি পর্বতগুলোর পাথরের গা ঢেকে অনেক গাছ, ঘাস আর শৈবাল, অদ্ভুত এক দৃশ্য। পাথরের প্রাণ নেই কিন্তু অ্যান্ডিজে সেই পাথরেই প্রাণ গজিয়েছে অজচ্ছল। অথচ আমি জীবন মরুভূমিতে এক নৈর্ব্যক্তিক খাড়া রকি পর্বত ! 

নগ্ন,সবুজতাহীন ধুসর! 

পাশেই বিশাল যে পাথরটি ছিল সে কোথায় হেঁটে চলে গেছে হঠাৎ। এখন সেখানে বিশাল মানবাকৃতির একজন হুমানয়েড বসে বসে হাসছে। 

এডুয়ার্ড সিন্ড্রমের রোগী যেমন নিষ্পাপ হাসে, এবং আমরা যাকে বলি "হ্যাপি পাপেট সিন্ড্রম" ঠিক তেমন। 

"আপনি কে?" 

তুমি বলতে ভয় হয়। 

"আপনি কে?" প্রতি উত্তর। 

"আমি ,পদ্মা তীর থেকে এসেছি।" 

"আমি পদ্মা তীর থেকে এসেছি।" 

সে অবিকল ফিরিয়ে দেয় আমার বাক্য। 

মেডিকেল সাইন্সে আমরা একে বলি "ইকোলালিয়া"। সেই ইকোলালিয়ার মত শব্দমালা তার কন্ঠে। আমার বিশ্বাস হয় না যে এত বড় একটা প্রাণী অটিস্টিক। 

সে নিশ্চিত আমার সাথে মস্করা করছে। 

তার কণ্ঠে অরাল এক তাচ্ছিল্য। 

সে আমাকে ফ্রান্সিসকো পিজারোর ডাকাত দলের একজন ভাবছে। আমি বুঝতে পারি, সব বুঝতে পারি, এমনকি যে আমাকে রোবট বলে, তার প্রতিটি অব্যক্ত কথাও । 


নার্সিসাসের ইকো ছিল অপূ্র্ব সুন্দরী। ইকো নিজে কথা বলতে পারতো না , শুধু কারো বলা কথার প্রতিধ্বনি করতো। কিন্তু এ ইকো নয়। ইকো অদ্ভুত সুন্দর এক নারী, আমার অডিটরি হ্যালুসিনেশনের ধুতুরা-হেমলক বুকে যে নারীর, তার মত। 

আর আমার পাশে যে, সে বিরাট এক পাথর। এখন আর পাথরও নয় একজন হাসি মুখের বিশাল দানব। আমি নিশ্চিত সে আমাকে রোবট বলে নি। 

তার কণ্ঠস্বর অত সুন্দর নয়। 

নিজে সে কদর্য । 

তার কণ্ঠে রিরংসা-পীড়িত নারীর ভাসিয়ে নেবার বুনো অনুভূতি নেই। 

কিন্তু শব্দটা থামছে না । কে যেন বলছে "আমার পরিমিতি বোধকে আমি অতিক্রম করতে পারি না। অথচ কাকে যেন আমি ভীষণভাবে খুঁজছি আমার হৃদয়ের খনিতে, কেন তা জানি না। খুঁজি মানুষ, অথচ সেখানে সোনা ঝকঝক করে ! তাল তাল সোনা। আমার সোনার দরকার নেই, আমার এমনকি কাউকে খোঁজারও আর দরকার নেই, আমি আমার স্বামীকে নিয়ে সুখী, কিন্তু তারপরও... 

জানি না আমি কিচ্ছু জানি না ...। 

কি যেন একটা ঘোরের মধ্যে আমি! এক্সটাসির (Ecstasy) নেশার মত অবোধ্য, আকাশ চুম্বী চোয়াল খোলা এক ক্ষুধার্ত আকাংখা.... 

এক তীব্র স্পর্শের হাঙর ... 

আমি ভালোবাসা চাই। অনেক, অনেক ভালোবাসা, আমি ভালোবাসার ধুতুরা পান করে অজ্ঞান হয়ে যেতে চাই। আপনি কেন সব বুঝেও না বোঝার ভান করছেন?" 

সমস্ত আকাশে গম গম করে ঠাঠার চিৎকারের মত তার কণ্ঠ। 


ছটফট করে দুলে ওঠে সমস্ত বিশ্ব সংসার। আমার পপি ফুলের বাগান, আমার ক্যকটাস কুসুম ও কাঁটার অন্দর মহল। 

আমি শব্দ খুঁজে পাই না, মহাদেবের কণ্ঠনালীর মত গলায় বাসুকীর বিষের তিক্ত স্বাদের পিত্ত উঠে আসে গল গল করে তীব্র বিবমিষায়। মগজে লাটিমের মত টাইফুনের ফানেলের নর্তন আর পৈচাশিক বিভৎসতার ট্যাঙ্গো নাচের ফাকে ফাকে শব্দ শুনি : 

"মানুষের হাত-পা সব সময় বাঁধা, কতকিছুর কাছে বাঁধা, আমার ভালো লাগে না। আমার সব ছিড়ে-ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। মানুষ কেন এত নতজানু? মানুষ কেন স্বাধীন হতে পারে না আকাশের ঈগলের মত? কেন ভালোবেসে কাছে আসতে পারে না সব 'কিন্তুর' শিকল ভেঙে ফেলে দিয়ে?" 

আমি বলি, “চুপ, চুপ করুন ! ভালেবাসার কথা এখন আর বলা ঠিক নয়। আমরা জীবনের পাদপীঠে এক একজন কাপালিক, স্বামী, ভার্যা, মাতা ও পিতা। কত তপস্যার হাজার সম্বত অতিক্রম করে আমরা উচ্চ এই বেদীতে এসেছি। আমাদের চিত্ত চাঞ্চল্য ভালো নয়। ভালোবাসা শুধুই তারুন্যের চঞ্চলতা।" 

সে চিৎকার করে ওঠে: 

"আপনি একজন কাপুরুষ! হায় ঈশ্বর, ছোট্ট এক জীবনে মানুষ আসলে কতই না পরাধীন!" 

"শুনুন, স্বাধীনতা সম্পূর্ণই একটি আইডিয়া মাত্র,পরাধীনতাই বাস্তব। নিজের কমফোর্ট জোনে বসে মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু সেই জোনের বাইরে বের হয়ে কিছু করতে খুব কম মানুষই রাজি হয়। আপনি নিজেও পারবেন না।" 

"না আমি কোন মতেই মানবো না। আমি স্রষ্টা, আমি লেখক, আমি ভালোবাসার মহাপ্লাবনে ভেসে যাবো বার বার। কেউ আমাকে থামাতে পারবে না, ভালোবাসাই আমার সৃষ্টির মহাবিস্ফোরণের শক্তি।" 

আমার হ্যাপি পাপেট দানব পাশে বসে হাসছে। যেন সে উপভোগ করছে আমার এই নরক যন্ত্রনা। হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মত মনে পড়ে ইনকা জেনেসিস স্টোরি। আমি এই দানবকে চিনতে পারি : 

ভিরাকোচা - ইনকা ভগবান। তিনিই সৃষ্টি করেছেন সব কিছু, বিশ্ব, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র , সময় এবং সভ্যতা। তাকে পূজা করা হতো সূর্য বা ঝড়ের দেবতা হিসেবে। তার মাথায় ছিল সূর্যের মুকুট, হাতে বজ্র এবং তার অক্ষি নির্গত অশ্রু - বৃষ্টি। 

তিতিকাকা হ্রদ থেকে সে উঠে এসেছে, যখন চারিদিকে ছিল ঘুট ঘুটে অন্ধকার । সে বিশাল বিশাল পাথরে ফুঁ দিয়ে জীবিত করে তুলেছে। এরাই ছিল প্রথম মানুষ কিন্তু তাদের মগজ ছিল না। তারা ছিল নির্বোধ দৈত্য দানোর দঙ্গল। তারা ঈশ্বরকে অসুন্তুষ্ট করে তোলে মগজহীন কর্মকাণ্ডের দ্বারা। ঈশ্বর তখন এক মহাপ্লাবন সৃষ্টি করে এদের নির্মূল করে দেয়।তারপরে সে ছোট ছোট পাথরে ফুঁ দিয়ে আগের চাইতে ভালো মানুষের সৃষ্টি করে।এরপরেই সে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যায়।তাকে আর কখনও দেখা যায় নি। সে নাকি একজন ভিক্ষুর বেশে ঘুরে বেড়ায় সারা পৃথিবীতে এবং তার নব সৃষ্ট মানুষকে জ্ঞান দান করে । সে কাঁদে, যখন দেখতে পায় তার সৃষ্টির দু:খ-কষ্ট, অবর্ণনীয় যন্ত্রনা, অন্যায়, আর অবিচার । 

"মানুষের কষ্টে ঈশ্বর কাঁদে, তুমি এই গাঁজাখুরী গল্প বিশ্বাস করো?" হ্যাপী পাপেট জিজ্ঞেস করে। 

"আপনি কে ?" 

“ভিরাকোচার প্রথম সৃষ্টি আমি, তার প্লাবন আমাকে ধ্বংস করতে পারে নি। বলা হয়, আমাদের মগজ ছিল না, কিন্তু আমাদের হৃদয় ছিল। আমি প্রেমলুব্দ্ধ ছিলাম এক নারীর প্রতি। সেই ভয়াল প্লাবনের কালে, আমি যাকে ভালোবাসতাম আমি তাকে ডেকেছিলাম আমার সাথে যেতে। কিন্তু তার হৃদয় সম্পূরক দ্যোতনায় দোলেনি। ভালোবাসতে না পারা পাপ। সেই পাপেই সে ভেসে গেছে বিস্মরণে, এই দেখো আমি বেঁচে আছি।" 

আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার বাম দিকে হৃদয়, তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে কোমল কুমুদের মত একজন। সে কিছু স্বপ্ন দেখছে, তার মুখে প্রশান্তির হাসি। না, আমি তাকে ফেলে ঈশ্বরের মত প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে চলে যেতে পারবো না। 

না হোক আমার কোন মহৎ সৃষ্টি। 

যে আমাকে রোবট বলে ডাকে সে অধরা ভ্রান্তির হাতছানি । 

হ্যাপি পাপেট হেঁটে চলে গেছে উরুবাম্বা নদীর পাথরে পাথরে বড় বড় পা ফেলে ভিরাকোচা ঈশ্বরের খোঁজে। 

তাও দীর্ঘক্ষণ বা দীর্ঘদিন আগে। 



জুন ২৭,২০১৭



                                                                                     

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ