বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

হিশাম বুস্তানি'র গল্প : নিস্তব্ধতা


অনুবাদ অমর মিত্র

পাথরে তৈরি দেওয়ালগুলি স্যাঁতসেতে এবং ছাতাধরা, বহু প্রাচীন । দেওয়াল থেকে আবছা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। একটি দেওয়াল থেকে রংবেরঙের আলো ক্রমাগত ঘুরে যাচ্ছিল এবং দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির চাকার স্পষ্ট শব্দ, সস্তার গান এবং অবোধ্য কথাবার্তা ভেসে আসছিল।

তারা সোফার দুদিকে বসেছিল। যুবকের হাত যুবতীর হাত ছুঁয়ে ছিল। রোমশ হাত পেলব হাত। তাদের ছোট হয়ে আসা চোখ ক্রমশ স্ফীত হয়ে উঠছিল। তারা এখানে বহু সময় ধরে বসেছিল প্রায় শীতে জড়োসড়ো হয়ে থাকার মতো করে। পুরু ধুলোয় ঢেকে যেন শীতযাপন। তাদের নিশ্চল দেহের ভাঁজে, ফাটলে মাকড়শা জাল বুনে যাচ্ছিল, বাতাস সেই বুননে কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারছিল না।

তাদের বুক উঠছিল নামছিল এবং তাদের শ্বাস নেওয়ার শব্দ এতই আবছা যে মনে হচ্ছিল তারা মৃত। তাদের চোখের পাতায় কোনো কম্পন ছিল না, তাদের চোখ স্পন্দনহীন, খোলা ছিল এবং দৃষ্টি বিপরীত দিকের দেওয়ালে গিয়ে আটকে পড়েছিল।

সব দেওয়ালই ছিল খা-খা, শূন্য। শুধু একটি দেওয়ালের টেলিভিশন থেকে তরল স্ফটিকের মতো রঙিন আলো, ছবি বদল হয়ে যাচ্ছিল। একটি ডাব করা তুর্কি ধারাবাহিকে নগ্ন নারীরা নৃত্য করছিল। ধারাবাহিকটি কুৎসিত গানে ভর্তি, টেলিভিশনের অপেরা শো যেমন হয়ে থাকে। এ ব্যতীত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ছিল রান্নার তেল, স্যানিটরি ন্যাপকিন এবং মোবাইল ফোনের। কে হলেন ক্রোড়পতি--এই নামে একটি সংবাদ প্রোগ্রামের দুই পরিচালক নিশ্চিন্তে তাদের মাথা দোলাচ্ছিল কপট গাম্ভীর্যে। স্টার একাডেমি নামের একটি হলিউডি অ্যাকশন ফি্লমে গাড়ি তাড়া করার দৃশ্য নবমবার ঘুরে দেখান হচ্ছিল টিভিতে, তার ভিতরে বন্দুক ছিল এবং ‘ফাক’ শব্দটি বারংবার গর্জে উঠছিল। টেলিভিশনের রঙিন আলো ঘুরছিল অবিশ্রান্ত, তাদের নিস্পন্দ চোখে প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল।

আচমকা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ঘোর অন্ধকার নেমে এল সেই ঘরে। টেলিভিশনের পর্দা নিভে যাওয়ার আগে রঙিন চিত্রমালা কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেঙেচুরে গেল, এবং শেষ চিত্রটি যুবক যুবতীর চোখে নিবদ্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার ঘরটিকে পুরোপুরি ছেয়ে ফেলল।

নিস্তব্ধতা ক্ষণিকের হলো।

ওহে ওঠো, জানালা খুলে দাও। যুবতী নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল। 
আমি কী করে জানালা খুলব ? আমি এই সোফায় তোমার মতোই বসে আছি তখন থেকে যখন থেকে আমি সোফায় বসে জানালাই দেখে যাচ্ছি। তুমি যা জানো, আমিও তা জানি, আমরা দুজনে ঐ জানালা দিয়েই যেন এইসব দেখে যাচ্ছি। আমি জানি না কীভাবে জানালা খুলতে হয় বা বন্ধ করতে হয়। আমরা কোনোদিন জানালা বন্ধ করিনি--এইটা সব সময় খোলাই থাকে। জানালা খোলার জন্য আমি কি জানব না ওই জানালা কীভাবে বন্ধ করতে হয়?

‘‘তুমি কি আমার কথা শুনতে পাওনি, যাও বলছি, জানালা খুলে দাও।" যুবতী রাগী গলায় বলল।

“ আমি জানালা দিয়ে কত কিছু দেখেছি। আমি দেখেছি জাদুকরী পৃথিবী এবং সুন্দরী রমনী, ঈশ্বরপ্রতিম মানুষ এবং যন্ত্রের মতো মানুষ, ধ্বংস এবং পরাজয়, জয় এবং ভগ্ন হৃদয়। এবং যৌনতা, আহা যৌনতা! তুমি কি দেখেছ কীভাবে সেই বিজ্ঞাপনের মেয়েটা চকোলেট বার মুখের ভিতরে প্রবেশ করাচ্ছিল? ওই দৃশ্যকে আমরা বাণিজ্যিক বলি। কিন্তু জানালা আমাকে শেখায়নি কীভাবে তা খুলতে হয় বা বন্ধ করতে হয়। জানালা সব সময় খোলাই থাকে। তোমার কি মনে হয় না এই ঘটনা খুব আশ্চর্যের।

“তোমার অজুহাত শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত, দিশাহারা মানুষ! তুমি কি বুঝতে পারছ না জানালা বন্ধ থাকলে আমরা দমবন্ধ হয়ে মরব? আমার দম আটকে আসছে এখনই, শ্বাস নিতে পারছি না।” যুবতী বলল। 
“ ঠিক আছে, আমরাই বা কেন বুঝতে চাইব না জানালা বন্ধ থাকলে কেমন হয়। একবারই শুধু। আমি ঠিক ওইটাই এখন ভাবছি, আরো স্পষ্ট করে বলছি, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, আমরা কেন জানালা থেকে আমার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি না, আমাদের মাথা এগিয়ে দিই না? যে রমনীরা সোফার উপর হতাশ হয়ে বসেছিল একটি চকোলেট বার-এর জন্য, তাদের কাউকে আমরা ডাকতে পারি। ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে প্রতিবাদ সভায় আমি যোগদান করতে পারি। আমি সেই গায়ককে ডেকে নিতে পারতাম আমাদের পাশে বসতে। তখন তুমি শুধুমাত্র সিলিকোন উদ্ভূত ধাতব শব্দই শুনতে পেতে। আমি জরুরি ওষুধ নিয়ে সেই বাচ্চাটির কাছে চলে যেতে পারতাম যে বিক্ষত হয়েছে তীক্ষ্ণ কিছুর দ্বারা। সে কীভাবে আর্তনাদ করছিল? আমি মনে করতে পারব না আর। কিন্তু এসবের ভিতরেও আমরা নীরব ছিলাম, শুধু মাত্র দেখছিলাম। আমার উচিত ছিল জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখা।

“ওহো, আমার দম আটকে আসছে এখানে। চুৎমারানি, জানালাটা খুলে দে। তুই আমাকে এখানে বন্দি করে ফেলেছিস, মেরে ফেলছিস।”

যুবতী আর্তনাদ করতে লাগল। তার আর্তনাদ ক্রমশ উচ্চগ্রামে উঠতে লাগল, উঠতেই লাগল যতক্ষণ না সেই আর্তনাদ সিলিঙের বড় নির্গমপথ দিয়ে বেরিয়ে বড় পাইপে ঢুকে, বড় পাইপ থেকে ছোট পাইপে ঢুকে প্রতিধ্বনিত হতে হতে মুছে যেতে যেতে, মুছে যেতে যেতে, ক্ষুদ্রতর হতে হতে, ক্ষুদ্রতর হতে হতে...

২.


তার সাবান মাখা পিচ্ছিল হাতের আঙুলের আটক থেকে গ্লাসটি পড়ে গিয়ে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেল। গৃহবধূ তার ঘরের কাজ করতে করতে একটি কন্ঠস্বর শুনতে পায়, সিংক থেকে বেরিয়ে আসছে তা। “ ওহ, আমি এখানে বাতাস নিতে পারছি না… জানালা খুলে দাও”। নতুন স্যুট পরে, ব্রিফ কেসে ল্যাপটপ নিয়ে, বিশের উপর বয়স যে লোকটির, সম্প্রতি যে এক বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তার পা হড়কে গেল, ম্যানহোল থেকে একটি কন্ঠস্বর বেরিয়ে এল, “চুৎমারানি, তুই আমাকে এখানে বন্দি করতে চাইছিস, মেরে ফেলতে চাইছিস...জানালা খুলে দে।” এবং যে বৃদ্ধ একটি ভায়াগ্রা পিল নিয়ে গন্ধ সাবান মেখে উষ্ণ জলের শাওয়ারে স্নান করছিল, একেবারে পা হড়কে পড়ল সেই কন্ঠস্বরের উপর যা তার দু’পায়ের ফাক দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, “ তুই আমাকে মেরে ফেলছিস, জানালা খুলে দে।”

৩ .

“ হ্যালো, ৯১১ ? ইয়েস, হ্যালো। সিংকের জল নির্গমনের নর্দমা কন্ঠস্বর বেরিয়ে আসছিল। হ্যাঁ, হ্যাঁ। একটা বন্ধ জানালা নিয়ে কথা বেরিয়ে পড়ছে… আচ্ছা। তুমি এইটার দিকে নজর রাখছ? ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।
“হ্যালো, ৯১১ ?”
“হ্যাঁ, বলুন।” 
“ আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম ম্যানহোলের ভিতর…শ্বাস না নিতে পারা, দমবন্ধ হয়ে আসা, মৃত্যু এবং একটি বন্ধ জানালা নিয়ে...।”

“আচ্ছা, আমি জানি আপনি এইটা নজরে রাখবেন, হ্যাভ আ গুড ডে।”

“ হ্যালো...আমি সকালের দিকে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা জানাতে চাইছি। স্নানের শাওয়ারের নির্গম পথ দিয়ে একটা অদ্ভুত কন্ঠস্বর উঠে আসছিল। একটি জানালা, এবং বন্দিশালা, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি আসলে কী ঘটেছে। আপনি বলছেন একই রিপোর্ট এসেছে আরো কয়েকটা ? শুধু আমিই নই, আরো অনেকেই শুনেছে ? এবং আপনি সমস্যাটি নিয়ে ব্যস্ত আছেন ? ওহ, ওকে, দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করে ফেলুন, বাই।”



পাহাড়িয়া শহরটির বিস্তৃত উপত্যকার মধ্যভাগে, ক্লান্ত বিদেশি শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে উঠল যখন তারা বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রিত ড্রিল মাটির নিচে প্রবেশ করাতে গিয়ে তা ছিটকে ফিরে এসে তাদের বাহুতে আঘাত করল। নিকটেই একটি বৃহৎ হলুদ রঙের মাটি-খননের বুল ডোজার তার মস্ত ধাতব খনন যন্ত্র মাটির ভিতরে প্রবেশ করিয়ে স্তুপ আবর্জনা সংগ্রহ করছিল।

গহ্বরটি ছিল দশ মিটার গভীর। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসারে কর্মীরা বিশেষ দড়া নামিয়ে দিল গহ্বরের তলদেশ পর্যন্ত। এইভাবে তারা শহরের নর্দমায় নজর রাখতে পারবে।

“হোস পাইপ নামিয়ে দাও।” তাদের একজন মাইক্রোফোন মুখের সামনে বলল যখন অন্য দু’জন তারের জট ছাড়াচ্ছিল। তখন কর্ণ বিদারক এক আর্তনাদ সেই গহ্বরের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “ জানালা খুলে দাও, নির্বোধ…, আমি শ্বাস নিতে পারছি না...আমি মারা যাচ্ছি।”

চারজন কর্মী গহ্বরের মুখে কাঠের পাটাতন লাগিয়ে দিল। ধাতব দণ্ড কোনাকুনি বসিয়ে দিয়ে তা পোক্ত করল। তার হাতে দুই কর্মী যখন বলল, “ এখন সব কিছু প্রস্তুত স্যার,”

নিচের আর্তনাদ থেমে গেল। দূরের কিন্তু বাতাসে ভেসে কাছে চলে আসা গাড়ির চাকার শব্দ, সস্তার গান এবং অবোধ্য কথাবার্তা ক্রমশ সেই রঙিন আলোর মতো মুছে যেতে থাকে কাঠের পাটাতন এবং ধাতব দণ্ডের আড়ালে।
“পাম্পিং শুরু করো’’ মাইক্রোফোন হাতে যুবকটি বলল। সবকিছুই এখন তরল সিমেন্টের ভিতর ডুবে গেছে।






-----------------


হিশাম বুস্তানি'র গল্প: নিস্তব্ধতা


লেখক পরিচিতি:

হিশাম বুস্তানি জর্ডানের কবি এবং ছোটগল্পের শিল্পী। আরবীয় ভাষায় লেখেন। তাঁর গল্পে পরাবাস্তবতার ঝোঁক লক্ষণীয়। তিনি জর্ডানে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে সমাদৃত এবং শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত। তাঁর প্রচুর গল্প এবং কবিতা ইংরেজি ভাষায় অনুদূত হয়েছে। আলোচ্য গল্পটিও ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। এর ইংরেজি অনুবাদটি তাইওয়ানের Asymptote পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হিশাম বুস্তানি’র গল্প বাংলায় এর আগে কেউ অনুবাদ করেননি। তাঁর সাথে পরিচয় ও বন্ধুতা হয়েছিল কাজাখস্হানে এশীয় লেখক সম্মেলনে। তাঁর এই ক্ষুদ্র গল্পে সভ্যতার ভয়ানক এক সংকটকাল উপস্হাপিত হয়েছে।





অনুবাদক পরিচিতি:
অমর মিত্র।
কথাসাহিত্যিক।
কলকাতায় থাকেন।

                                                                            

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন