বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

দেবদ্যুতি রায়ের গল্পঃ যৌথবাস


আজকাল বনিকে খুব মনে পড়ে। বনি মানে বোহেমিয়ান নিলয়, আমার কবি বন্ধু যে আমার প্রেমে পড়েছিল কোনো এক ঝুম বৃষ্টির দিনে, লাইব্রেরির বারান্দায় দুজনে পাশাপাশি কফি মগে চুমুক দিতে দিতে। ওর এই প্রেমে পড়ার গল্প আমি শুনেছি হাজারবার।

ক্লাসের ফাঁকে, নাসিরের চায়ের দোকানে, ইবলিশ চত্বরের সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে কিংবা বধ্যভূমির রাস্তা ধরে কোনো নিঝুম দুপুরে হাঁটতে হাঁটতে কোনোদিন হঠাৎ আমার চোখে তাকিয়ে বনি বলতো- 

মন্দিরা, সেদিনের আগে তোর প্রেমে পড়িনি কেন বল তো? তাহলেই তুই অন্য কারো হতিস না। 

‘অন্য কারো’ শব্দ দুটো বনি খুব সাবধানে, খুব আলগোছে ব্যবহার করতো। সেই বৃষ্টিদিনের পর ও আর সৌমিক নামটা উচ্চারণ করেনি কখনো। অথচ তার আগে সৌমিকের সঙ্গে ওর বেশ দেখাসাক্ষাৎ বড় একটা কম হয়নি। আমার তখন সৌমিকের সঙ্গে তুমুল প্রেম। দুমাসে ছমাসে সৌমিক যখন দেখা করতে যেত ক্যাম্পাসে, আমরা দুজনে মিলে ভোরসকালে পদ্মার ঢেউ গুনতে যেতাম, সিমলা পার্কের নির্জনতায় ওর ঠোঁটের অতলে মিশে যেত আমার ঠোঁট। সেইসব দিনে বনি ওর এই প্রেমে পড়ার কথা বলতো খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে, একদম আমার চোখের তারায় তাকিয়ে। ওর চোখের দিকে তাকাতে আমার অস্বস্তি হতো খুব, হয়তো একটু কষ্টও মেশানো থাকতো সেই তাতে। সেই অস্বস্তি আর হয়তোবা কষ্টের অনুভূতিটুকু বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে ওর কথা শুনে আমি হা হা করে হাসতাম। বলতাম- 

পাগল! তুই আমার প্রেমে পড়লেই বুঝি আমারও তোকে ভালোবাসতেই হবে? 

আমার এমন উত্তরে বনি নিশ্চুপ হয়ে যেত। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতো না। আমরা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়তাম ক্লাস, নোটস, টিউটোরিয়াল, প্রেজেন্টেশন নিয়ে। বনি আর আমি একসঙ্গে পড়তাম, একসঙ্গে নোটস তৈরি, ক্লাসের পড়া বুঝে নেয়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রেজেন্টেশনের পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডস, সব। এত সবকিছুর ভিড়ে ডিপার্টমেন্টের ‘মেধাবী ছাত্রী’ আমার মনে থাকতো না বনির সেই পাগলামির কথা। তারপর অনেক অনেক দিন বাদে, বনিকে হয়তো আবার সেই পাগলামি পেয়ে বসতো, হয়তো তখন আমরা টুকিটাকি চত্বরে দু’কাপ লাল চায়ে পাশাপাশি চুমুক দিচ্ছি, বনি হঠাৎ করে বলে উঠতো- 

মন্দিরা, সেদিনের আগে তোর প্রেমে পড়িনি কেন বল তো? তাহলেই তুই অন্য কারো হতিস না! 

সেই একই বাক্য। প্রেমে পড়া নিয়ে ও আর অন্য কিছু বলেনি কোনোদিন। ওর কথা শুনে আমি আবার হা হা করে হাসতাম। আমাদের চারপাশের সারি সারি বেঞ্চে বসা ছাত্রছাত্রীরা, রবীন্দ্রভবনের পাশের রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া চেনা অচেনা মুখের মানুষদের অনেকেই ফিরে তাকাতো সেই শব্দে। 

আমার বন্ধু, আমার বিষণ্ণ প্রেমিক সেই বনিকে কোথায় হারিয়ে ফেলেছি আমি! আজকাল ওর সেই চোখের তারায় তাকিয়ে বলা সেই প্রেমের কথাটা খুব মনে পড়ে, ওর কফি মগ হাতে আওড়ানো নিজের কবিতাগুলোর এলোমেলো দুয়েকটা চরণ মনে পড়ে। আমার জন্মদিনে ওর উপহার দেয়া জয় গোস্বামীর কবিতার বইয়ের ভেতর বনির দুলাইনের কবিতা আমাকে অনেক অনেকদিন বিষণ্ণ করে রেখেছিল। নীল কালিতে বনি আমার জন্য লিখেছিল- এই জন্মের সব হাহাহার শেষে/ পরের জন্মে তোরই হবো দেখে নিস… 

বনির সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন, রাখিনি আমিই। সৌমিকের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছি পাঁচ বছর হলো। এই পাঁচ বছরে বনির সঙ্গে আমার হয়তো এক কী দুবার কথা হয়েছে, তাও সেই প্রথম দিকে। আসলে সৌমিকের সঙ্গে আমার যৌথবাসের শান্তির সংসারে বনির স্মৃতি আমি বয়ে আনতে চাইনি। সৌমিক আর আমার গত পাঁচ বছরের হাওয়ায় ওড়া দিন আর মহুয়াগন্ধের রাতগুলো কী অপার্থিব! সেই অপার্থিব দিন রাতগুলোতে আমি বনির করুণ চোখের কাতরতা সঙ্গী করে বাঁচতে চাইনি। এ সংসারের ভালোবাসার গল্পগুলোয় তাই বনি নামের কোনো চরিত্র নেই। এই সেদিন পর্যন্ত, গত পাঁচ বছরে আমরা মলয় বাতাসে ভেসে গেছি শুধু, কুসুমের মধু করেছি পান… 

এই সেদিন পর্যন্ত, কথাটা পুরাটা ঠিক। সেদিনের আগ পর্যন্ত আমরা একটা জীবন কাটিয়ে এসেছি, সেদিনের পর থেকে যেন আমাদের আরেকটা জীবন শুরু হয়েছে। এতদিন অন্য কারো মুখে শোনা গল্পগুলো কেমন করে আমাদের জীবনেই সত্যি হয়ে গেল! আমি এখনো ঠিকঠাক বিশ্বাস করে উঠতে পারি না। 

আমার পুরনো ইনসোমনিয়া আজকাল কোনো নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ হঠাৎ ফিরে আসে। সেদিনও ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল হঠাৎ। ঘুমচোখে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের দুজনের একই আইফোন- ইলেভেন প্রো, এবারের বিয়েবার্ষিকীতে সৌমিক কিনেছিল দুজনের জন্য। দুজনের একই ফোন কভার, এমনকী মোবাইলের পাসকোডও এক। ঘুম না এলে আমি হোয়্যাটস বা মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রামে ঘুরে ঘুরে নোটিফিকেশন দেখি। সেই ভোরে ঘুমঘোরে হোয়্যাটসঅ্যাপ খুলে আমার পৃথিবীটা থমকে গিয়েছিল। আমি না বুঝেই সৌমিকের মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম! আগের বিকেলে মৌমিতাকে পাঠানো ওর শেষ মেসেজটা চোখে পড়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, পাগলের মতো পড়েছিলাম পুরো চ্যাট হিস্ট্রি। ছবির পর ছবিতে সাটিনের নাইটি, ভারতীয় জর্জেট শাডি আর আঁটসাঁট কুর্তির ভেতরে নানা ভঙ্গিমায় মৌমিতার ভীষণ উদ্ধত শরীর আর দুজনের কথোপকথন আমাকে অপমানে নাকি ঈর্ষায় পুড়িয়ে দিয়েছিল কে জানে। সেই বিকেলে, আমি যখন বারান্দার ছোট্ট টেবিলটায় নিজেদের জন্য বানানো দুকাপ লাল চায়ের ছবি তুলছিলাম শখ করে, সৌমিক মৌমিতাকে লিখেছিল- 

আই মিস ইওর স্মেল, ডিয়ার। হোয়েন দিস লকডাউন পিরিয়ড ইজ ওভার, উইল গো টু আওয়ার ফেভরিট প্লেস এগেইন। লাভ। 

ওদের পুরনো মেসেজ থেকে জেনেছিলাম রাজেন্দ্রপুরে ওদের ‘ফেভরিট’ রিসোর্টে প্রথম যাবার তারিখ বছর পেরিয়েছে। মৌমিতাকে আমি চিনতাম, আমাদের বিয়ের আগে ওর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল সৌমিকের, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে মেয়েটা। মৌমিতা বা সৌমিক- কারো ওপর আমার রাগ, অভিমান কিছুই হয়নি সেদিন, কেবল এত দিন ধরে একটা চরম অপমানের দাম্পত্য সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর লজ্জায়, বেদনায় আমি মাটিতে মিশে গিয়েছিলাম আর আমার মনে পড়েছিল কেবল ভোরে বদলে যাওয়া সেই রাতের কথা। এই ঘর, এই বিছানায় সেই রাতটাও কী আশ্চর্য মহুয়াগন্ধী ছিল! 

তারপর থেকে এ সংসারে মহুয়ার গন্ধ মাতাল করেনি একদিনও, হাওয়ার পালক গায়ে লাগিয়ে মেঘের ওপরে ভাসার স্বপ্ন ভরিয়ে রাখেনি এ ঘর, বারান্দা, ফুলের টব। এখন সৌমিক আর আমি কেবল কয়েক বছরের অভ্যাসে এক অলীক সময় যাপন করে যাচ্ছি নিজেদের সঙ্গে। কতদিন এভাবে কাটবে এখনও জানি না, ভাবতে পারি না আর। 

সৌমিক কিন্তু ফিরেছে। পরিচয়ের বারোতম বছরে এসে ওর অভিব্যক্তি বুঝতে আমার ভুল হয় না এবার। ওর চোখের জল, শ্বাসের ওঠানামা আর কুঁকুড়ে যাওয়া মুখ দেখতে দেখতে আমি টের পাই, ও সত্যিই ফিরেছে আমার কাছে। এই কদিনে হাজারবার স্যরি বলতে বলতে ও সত্যিই ভুলে গেছে অন্য কারো গায়ের গন্ধ, অন্য কারো সঙ্গে নিভৃতে কাটানো সমস্ত অবকাশ। 

আজ সন্ধ্যায়ও সৌমিক আমার হাত ধরে বলছিল- 

প্লিজ চলে যেও না মন্দিরা। তোমাকে ছাড়া আমি কী করে বাঁচবো? 

আমি উত্তর দিইনি। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল- আমাকে ছাড়া এতদিন তো বেশ বেঁচে ছিলে, সৌমিক। মৌমিতার সঙ্গে কাটানো সময়গুলোতে আমি তো তোমার পৃথিবীর কোথাও ছিলাম না! 

কী মনে করে ওকে কিছুই বলিনি এই সম্পর্ক নিয়ে, মৌমিতাকে নিয়ে। শুধু সেদিন ভোর পেরিয়ে নরম শিউলির ঘ্রাণ বুকে করে যে সকাল এসেছিল, সেই সকালে ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম- আমাকে এতটা সময় ভালো না বেসেও কী করে ভালোবাসার অনুভব দিয়ে গেছো, সৌমিক? 

সৌমিক উত্তর দেয়নি সেদিন, মাথা নিচু করে বসে ছিল অনেকক্ষণ। বোধহয় সেদিন ওরও কাছে মনে হয়েছিল আমার এ প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। শুধু আমাদের গল্পেরা সেদিনের পর কেমন টুক করে হারিয়ে গেছে। আমাদের দিনগুলোও কেমন চুপচাপ একটা একটা করে উধাও হয়ে যাচ্ছে কোন ডাইনি বুড়ির ঝোলার ভেতর। আজকাল সময়ের হিসেব থাকে না আমার। আচ্ছা, টবের গাছগুলোতে জল দিই না আজ কতদিন হয়! সৌমিকের পনের দিনের সিক লিভের আর কদিন বাকি আছে? 

কদিন থেকে কিচ্ছু করতে ভালো লাগে না। আগে ছুটির দিনগুলোতে একসঙ্গে আমরা কত কিছু রান্না করতাম, সিনেমা দেখতাম, প্রিয় সিরিয়ালের নতুন সিজন এলে নাওয়াখাওয়া ভুলে বসে থাকতাম টিভির সামনে। এখন চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থেকেও আমাদের পাঁচ মিনিট কথা বলার অবসর হয় না। 

সৌমিক কেমন অবাক হয়ে আমাকে দেখে আজকাল। ওর কয়েক দিনের দাঁড়ি না কামানো গাল দেখে এখন আর মায়া হয় না, চোখের নিচে জল শুকিয়ে গেলেও মুছে দিতে হাত বাড়াই না। সৌমিককে বলিনি আজকাল ওকে আর অনুভব করতে পারি না আমি, ভালোবাসতে পারি না। আজকাল সৌমিক ঘরে আছে বলে আমার একটুও আনন্দ হয় না। 

আমি ওকে বলিনি সেদিনের পর থেকে আমার খুব বনির কথা মনে পড়ে। সেই বনি যে এক ঝুম বৃষ্টির দিনে আমার প্রেমে পড়েছিল, নীল কালিতে বইয়ের পাতায় লিখেছিল পরের জন্মে আমার হবে। আজকাল আমার খুব মনে হয় আমার বিয়ের দিন বনি হয়তো খুব কেঁদেছিল, একলা পালিয়ে গিয়েছিল এক ঘর পালানো মেঘের সঙ্গে। দুপাশে জারুলের রং মাখা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বনি আমাকে কতদিন বলেছে, তোকে পেলাম না বলে দেখিস এ জন্মে আমি মেঘের সঙ্গে ঘর বাঁধবো! 

সৌমিক ঘুমাচ্ছে, ওর চোখের নিচে কী অপরিসীম ক্লান্তি! আমি সেদিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফেরাই, আগে হলে ওর চোখের ক্লান্তি আমি মুছিয়ে দিতাম আলতো চুমুতে। এখন ইচ্ছে করে না। সেদিনের পর সৌমিককে চুমু খাইনি একবারও। ও যতবার চেয়েছে, বিরক্তিতে দুহাতে সরিয়ে দিয়েছি। সৌমিকের নিঃশ্বাসের স্পর্শ আজকাল আমার সহ্য হয় না। 

সৌমিকের ক্লান্ত মুখের বিপরীতে হঠাৎ বনিকে দেখতে ইচ্ছে করে। আমি ফেসবুকে বোহেমিয়ান নিলয় লিখে সার্চ দিই। প্রথম প্রোফাইলটাই বনির, কফি মগ হাতে হাসিমুখ সেই তরুণের ছবির ওপরে ক্লিক করি। ছবিটা আমার তোলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির বারান্দায়। বনি সেদিন খুব হাসছিল কী কারণে, ওর মুখের একপাশে সকালের রোদ এসে পড়েছিল। আমি মোবাইলে সেই হাসি আর রোদে মাখামাখি মুখের ছবি তুলেছিলাম। 

ফেসবুকে প্রোফাইল ছবির নিচে বনির বায়োতে লেখা- ‘সেদিনের আগে তোর প্রেমে পড়িনি কেন বল তো?’ 

বনির ছবি আর হাজারবার শোনা সেই বাক্যটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমার বুক কাঁপিয়ে কান্না আসে। সেই ভোরবেলার পর এই প্রথম আমি সবকিছু ভুলে কাঁদি। তারপর এক সময় সেই কান্নায় বুঁদ হয়ে যেতে যেতেও টের পাই, সৌমিক উঠে বসেছে, ওর চোখ আমার মোবাইল স্ক্রিনে। 

---------------









লেখক পরিচিতি
দেবদ্যুতি রায়
গল্পকার।
বাংলাদেশে থাকেন।
                                                                                 




৭টি মন্তব্য:

  1. না থেমে পড়লাম। ভালো লেগেছে।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক সরিয়েছেন।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. মনে পড়ছে এই গল্প নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল বিস্তর। এই যে যৌথবাসের মায়াজাল এ দুর্ভেদ্য রে, কষ্ট কেবল কষ্ট তবু ছিন্ন করতেও নিভৃতে বাজে...ভালোবাসা বোন।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এই গল্প আমি লিখেছি বিস্তর সময় নিয়ে। তোমার সাথে গল্প নিয়ে কথা বলার আনন্দ অপার। এটা নিয়েও অনেক কথা হবার কথা মনে রেখে দিয়েছি। অনেক ভালো থেকো আপু।

      মুছুন