বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

স্মৃতি ভদ্র'র গল্পঃ এলেনা বেলেনা



ঝিম ধরা দুপুরবেলা, এদেশে একে অতিশয়োক্তিই বলা চলে । সারাদিনই মানুষের অল্পবিস্তর গতিবিধি দুপুরবেলাকে নিয়ে আলাদা করে আহ্লাদিত হবার ফুরসত দেয়না এখানে। 
তবুও রবিবারের দুপুর। একটু আধটু আলস্য ঠিকই গড়াগড়ি খায় দুপুরের গা জুড়ে। জানালার শার্সিতে একটা দুটো কমলা রঙের পাতার পিছলে পড়ার শব্দে বোঝা যায়, দুপুরটি হেমন্তের।




আমি নেটফ্লিক্সে খুব ঢিমে আওয়াজে মুভি অন করে ফ্রিজ থেকে বেল পেপার আর কুচিয়ে রাখা ক্যাবেজ ভর্তি জিপলক ব্যাগ বের করছিলাম স্প্যাগেটির জন্য। তখনই টুং করে মৃদূ একটা আওয়াজ ভেসে এলো। মেসেঞ্জারে বার্তা আসার সংকেত। 

ফেসবুকে নামকাওয়াস্তে আমার একটি আইডি আছে বেশ আগে থেকেই। আমি কখনই তাতে খুব বেশী আগ্রহ বোধ করিনি। অসামাজিক একজন মানুষের জন্য 'সামাজিক মাধ্যম' শব্দগুলোই কেমন যেন ন্যাকা ন্যাকা। 

তবে সপ্তাহ দুই হলো কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মেসেঞ্জারের সবুজ বাতির রোশনাই খুব একটা খারাপ লাগছে না আমার। হুটহাট করে বেজে ওঠা টুংটাং-এও তেমনভাবে বিরক্তি জাগছে না। আমি বরং আগ্রহ নিয়েই পড়ছি সবুজ বাতির ওপাশে থাকা মানুষগুলোর কথা। 

আমি জিপলক ব্যাগ কাউন্টার টপে রেখে এসে বসলাম ল্যাপটপের সামনে। টুয়েন্টি ফাইভ সংখ্যাটি জ্বলজ্বল করছে সবুজ বাতির পাশে। 

এরা পারেও! প্রায় সারাদিন আর রাত জুড়েই চলে এদের কথা। আসলে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন টাইম জোন থেকে এরা সবাই জড়ো হয়েছে এক ছোট্ট সবুজ বাতির ঘরে। 

সারা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে জড়ো করেছে এক জায়গায়। 

কী আশ্চর্য ক্ষমতা এই সবুজ বাতির! 

আমি স্ক্রল করে চোখ বুলাই ওদের কথায়। কে কি রেঁধেছে, কার সন্তান কী করেছে সেসব কথার ফাঁক ফোকর পেরিয়ে আমার চোখ আটকে যায় একটি বইয়ের ছবিতে। রাশিয়ান রূপকথা'র বইয়ের ছবির নীচে ছোট্ট করে লেখা, ' পড়ছি'। 

আমি টুক করে লাইক বাটন চেপে মানুষটির পাঠকে উৎসাহিত করলাম। আর একইসাথে চোখ বুলিয়ে নিলাম নামটিতেও। 

চল্লিশের প্রথম ভাগে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি রাশিয়ান রূপকথা পড়ছে, সে মানুষটিকে আরেকটু কাছে থেকে দেখবার লোভ হলো আমার। আর এরসাথে রবিবারের ঝিমধরা দুপুরের যোগসাজশ তো আছেই। অলস এই সময়কে শুধু ফ্রেঞ্চ টোস্টেড কফির ধোয়াতেই উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হল না আমার। 

আমি ' অ্যাসোসিয়ন অফ এক্স স্টুডেন্টস-- সালেহা চৌধুরী গার্লস স্কুল (১৯৯৪-৯৫)' মেসেঞ্জার গ্রুপ থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৌঁছালাম রওশন আরার ব্যক্তিগত প্রোফাইলে। প্রোফাইল রেস্ট্রিক্টেড নয়। সারা প্রোফাইল জুড়েই বিভিন্ন ধর্মীয় বয়ানের ভিডিও শেয়ার করা। মাঝেমধ্যে দু'একটি ব্যক্তিগত ট্যাগ হওয়া ছবি। তবে সবাই অচেনা। অচেনা মানুষগুলোর উৎসব আনন্দের ছবিগুলোর মাঝে নিজেকে খুব বেখাপ্পা মনে হলো। 

আমি বেরিয়ে এলাম সেই প্রোফাইল থেকে। গ্রুপ মেসেঞ্জারে 'রাশিয়ান রূপকথা' বইটির ছবি যতখানি আগ্রহ জাগিয়েছিলো তা প্রায় পুরোটাই শেষ হয়ে গেলো তার ব্যক্তিগত প্রোফাইলে ঘুরে। 

আমি আবার ফিরে আসি ঝিমধরা অলস দুপুরের গায়ে। 

স্কুলের এই মেসেঞ্জার গ্রুপটিতে গেলেই বুঝতে পারি আমার সমবয়সীরা সবাই বেশ আছে সংসারের জমকালো পৃথিবীতে। অন্তত মেসেঞ্জারে দেওয়া গ্লিম্পস্ দেখে তো তাই মনে হয়। 

সবকিছুই গুস্তাভো ক্লিমট-এর কালার প্যালেটের মতো রঙিন। 

আমি ল্যাপটপ থেকে আপাতত ফেসবুকের জানালা বন্ধ করে নেটফ্লিক্সে মন ডুবাই। ' এ্যা টেল অফ লাভ অ্যান্ড ডার্কনেস' দেখতে দেখতে নিঃশব্দে পার করি রবিবারের দুপুর। কাপের তলায় জমে থাকা রোস্টেড কফির তিতকুটে গুঁড়োটুকুতে শেষ চুমুক দেবার আগেই ফুরিয়ে যায় হেমন্তের দুপুুর। 

হেমন্তের দুপুর বরাবরই এখানে দৈর্ঘ্যে খুব ছোট। 

উইক ডে'র ব্রেকফাস্ট থেকে ডিনার সব আমি এই রবিবারেই রেডি করে রাখি। তাই পুরোদস্তুর ঘরকন্নায় প্রবেশের আগে আরেকবার ইচ্ছে হয় গ্রুপ মেসেঞ্জারের কালার প্যালেটের রঙে এখন কী ছবি আঁকা রয়েছে, তা দেখতে। 

আমি আবার জানালা খুলি ফেসবুকের। বেশ বাজে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে, তা বুঝে নিজেই একটু মুচকি হেসে নেই। 

না, এবার আর মেসেঞ্জারে যাওয়া হলো না। তার আগেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নোটিফিকেশনের ঘন্টায়। 

সেখানে দুলছে একটি রিকোয়েস্ট। সেই 'রাশিয়ান রূপকথা'র বইটির মালিকের বন্ধুত্বের আহ্বান। 

কিছু না ভেবেই আমি সাদরে গ্রহন করলাম সে আহ্বান। অসামাজিক এই আমি সামাজিক মাধ্যমে বন্ধু হলাম অনেকদিন পর। 

এরপর ফ্রিজের গায়ে লাগানো টুডু লিস্টের চোখরাঙানী বেশীসময় আমাকে বসতে দিলো না। সপ্তাহের কাজগুলো গুছিয়ে রাখার তাড়া আমাকে বাধ্য করলো একে একে ল্যাপটপের খোলা জানালাগুলো বন্ধ করতে। 

আমি আবার অবরুদ্ধ হলাম ছয়শো স্কয়ারফিটের টাউনহলের একটি ছোট্ট কন্ডোতে। যার জানালার শার্সিতে ছুঁয়ে থাকা প্লেইন ট্রি-ই শুধুমাত্র সময় বদলের খবর পৌঁছে দেয় ফিসফিসিয়ে। 

আমার উইক ডেইজ কেটে যায় হুড়মুড়িয়ে। অফিস আর বাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্বল্প সময়ে জুড়ে যায় গ্রোসারী, শপিং আর দু'একটি জরুরী কল। এদেশীয় আদবকেতায় অভ্যস্ত আমি ডিনার শেষে শাওয়ার নিয়ে সিগ্রামসের মল্ট ব্রেভারেজে একটু গলা ভিজিয়েই সোজা বেডে চলে যাই। এরপর 

বেড়ালের মতো গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। 

আমার এসব উইক ডেইজের আড়ালে অন্তর্জালে জমা হতে থাকে অসংখ্য বার্তা। কালার প্যালেটের একদম ঠিকঠাক স্কেলে আঁকা তাদের রঙিন ছবিগুলো হাওয়ায় ভাসতে থাকে আমার সিন করার অপেক্ষায়। 

ইদানিং শনিবার আসতেই আমি কেমন যেন আটপৌরে হয়ে উঠি। প্রফেসনাল মিস সুলতানা'র নাগপাশ ছাড়িয়ে আয়েশ করে শায়লা হয়ে থাকি। এমনকি বিভিন্ন ফ্লেভারের কফির ফিল্টার সরিয়ে টি ব্যাগের লিকারবিহিন দুধ চা বানাই। তাতে কুচিয়ে দেই আদা। আবার, ইচ্ছে করেই ছুটি দেই ক্রিম চিজ আর টোস্টেড বেগলকে। তার বদলে খুঁজতে থাকি দুধ চায়ের সাথে যুৎসই কোনো সকালের খাবার। 

এসবই কিন্তু সেসব করকরে রঙিন ছবির প্রভাব। এতদিন পরেও আমি আদ্যপ্রান্ত রমণীর জীবনযাপন করতে চাই। 

এই শনিবারেও তার ব্যত্যয় হলো না। 

আমি কুচানো আদা ভাসা এক কাপ ফ্যাকাসে দুধ চা আর প্যানকেক এর কুইক ব্যাটারে গোলা রুটি বানিয়ে বসেছি ল্যাপটপের সামনে। 

অনেকদিনের অভ্যাসকে পাশ কাটিয়ে শুরুতেই খুলে দিলাম ফেসবুকের জানালা, নিয়মমাফিক জিমেইল চেক না করেই। আমার অপেক্ষা না করেই যথারীতি জমে উঠেছে টুংটাং শব্দের কাটাকুটি খেলা। স্থির সবুজ বাতিগুলোর পাশে জেগে ওঠা শব্দগুলো আমাকে জানিয়ে দেয় ওদের রঙিন জীবনে আরোও এক পোচ রঙ চড়েছে। আমি নিঃশ্চুপে বিস্বাদ চা গিলতে গিলতে দেখতে থাকি কারো উইকএন্ডের গেট টুগেদারের বায়ান্ন পদের রান্নার ছবি, নয়তো কারো নতুন বাড়ির ভিডিও ট্যুর। 

আমি অক্লেশে নেতানো গোলারুটির এক কোণ ছিঁড়ে মুখে দেই। 

তখনি আর একটি আইডি পপ আপ হয় স্ক্রিনে। 

' কেমন আছো? ভাল নিশ্চয়।' 

অনেকদিন পর কেউ এমন করে কুশল জানতে চাইলো। তবে অনভ্যস্ত হওয়ায় উত্তর দিতে গিয়ে আলসেমি পেয়ে বসলো। 

কী দরকার বাবা ঝকঝকে ছবির এমন আয়েশি সময়ে কেজো গল্প ফাঁদা? আমি সেই পপ আপ করা আইডিটি মিনিমাইজ করে আবার মন ডুবিয়ে দেই 'অ্যাসোসিয়ন অফ এক্স স্টুডেন্টস-- সালেহা চৌধুরী গার্লস স্কুল (১৯৯৪-৯৫)' মেসেঞ্জার গ্রুপে। 

কিছুক্ষণ থেমে আবার সেই আইডিটি পপ আপ করে ওঠে। 

' তুমি কী দোদুল?' 

এবার আমার চোখ স্থির হয় সেই সবুজ বাতিতে। হাতে ধরা বিস্বাদ চায়ের কাপ নীচে নামিয়ে ল্যাপটপ তুলে নেই কোলের উপর। রওশন আরা নামের পাশে সবুজ বাতিটি নিশ্চল তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি একটু রয়েসয়ে লিখি, 

' আমরা কী একই শাখার ছাত্রী ছিলাম? এতদিন পর আসলে কাউকে সেভাবে চিনতে পারছি না।' 

সবুজ বাতিটি নিভে গেলো। 'একটিভ ফাইভ মিনিটস এগো' শব্দগুলো আমার নাকের ডগায় কলার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। 

আমার অস্থিরতা বাড়লো। কে এই রওশন আরা? এতদিন পর যে আমার হারিয়ে যাওয়া নামটি মনে রেখেছে। না, আমি ব্রেনের অসংখ্য নিউরন রিএ্যাকটিভেট করেও স্মৃতি থেকে উদ্ধার করতে পারছি না রওশন আরার পরিচয়। 

আমার অস্থিরতার কারণেই মনে হয় রওশন আরার নামের পাশে আবার দপ করে জ্বলে উঠলো সবুজ বাতিটি। 'একটিভ নাও' আইডিটি থেকে এবার শব্দ নয় উড়ে এলো একটি ছবি। সেই বইয়ের ছবি। 

'রাশিয়ান রূপকথা' বইয়ের ছবির পরেই এলো, 

' চিনতে পারছো এই বইটিকে? ' 

হুম, আমার খুব পছন্দের বই ছিল এটি। তবে তাতে করে রওশন আরাকে আমি চিনে ফেলবো, তা কেমন করে হয়? একে তো এই নামে সারাজীবনে আদৌ কোনো পরিচিত ছিল কীনা তাতেই আমি সন্দিহান। আর তার উপরে আইডির প্রোফাইল পিকচারে আরবী হরফে কিছু লেখার চিত্র। মানুষটির ছবি থাকলে হয়তো চেনাশোনার সীমা নির্ধারণ করতে পারতাম। 

আমি প্রায় অধৈর্য্য হয়েই লিখলাম, 

' আপনাকে চিনতে পারছি না। প্রোফাইলে কোনো ছবি নেই। থাকলে হয়তো চিনতে পারতাম।' 

এর জবাবে উড়ে এলো, 

'একবেণী সরু নাক 

ম্যাডাম এসে দেয় হাঁক 

অংক খাতা হারিয়ে ফেলে 

দোদুল ভয়ে কুপোকাত।' 

' কে আপনি? এটা তো একজনই বলতো আমায়? তুমি কী নীরু?' 

অনেকদিন পর খোলসবিহীন আমি 'আপনি আর তুমি' গোলমাল পাকিয়ে ফেলি। 

ওপাশ থেকে ছোট্ট উত্তর, 

' চিনেছো তাহলে' 

এরপর....... 

এরপর তো দিনগুলোর ঘুণে কাটা শরীর থেকে গুড়োর মতো ঝুরঝর করে ঝরতে থাকে আমাদের জমানো গল্প। 

ফিরে আসে আমাদের ইচিং বিচিং দিন। 

'নীরু, এই সপ্তাহে খুব ধকল গেলো। অফিসের ইয়ার এন্ডিং কাজগুলো করতে হলো। জানো, আজ গ্রোসারী করতে গিয়ে চকচকে রঙিন সব লজেন্স কিনেছি। এখানে এগুলোকে ক্যান্ডি বলে। ক্যান্ডির গন্ধটা ঠিক সেই স্কুলের মাসিদের বিক্রি করা নাবিস্কো লজেন্সের মতো। 

আমি মেসেঞ্জারে টুক করে রেখে দেই এই বার্তা কোনো শুক্রবার রাতে। সাথে রাখি সেই ক্যান্ডির ছবিও। 

সকাল হলেই মোবাইলের মেসেঞ্জার অ্যাপে গিয়ে খুঁজি আবার আমাদের সুলতানা বিবিয়ানার গল্প। 

'দোদুল, তোমায় চিঠি লিখবো বলে আমি একটা লেটার প্যাড কিনেছিলাম। প্যাডের গায়ে বেগুনী প্রজাপতি আর ঝিকিমিকি জোনাই ছিল। একদিন রাতে লেটার প্যাডের কয়েকপাতা নিমেষেই ভরে ফেলেছিলাম কত কথা লিখে। স্কুলের আসমা আপার কথা, মিলু দি'র কথা, বড় আপার কথা। আর সেই যে স্কুলের পুকুরে কচুরিপানা ফুল, তার কথাও লিখেছিলাম। সেসব কথা প্রজাপতি আর জোনাই হয়ে উড়তে উড়তে ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো।' 

এত সহজে কীভাবে হারাবে? এতদিন পর আমি কী ওদের হারিয়ে যেতে দেবো? 

উইকএন্ডের সব কাজ ফেলে আমি ঢুকে পড়ি রওশন আরার সেই সবুজ বাতির ঘরে। 

' নীরু, তোমাদের লেপা উঠোনে রোদ পোহানো সেদ্ধ ধান, নল খাগড়ার ঝোপ, কচুরিফুলের শরীরে ফড়িং-এর নাচ সব মনে পড়ছে আমার, সব। আচ্ছা, সেই ডোবায় কী এখনো পানকৌড়ি কাদাজল ঘেটে ঘেটে মাছ খোঁজে ?' 

নীরু আমার সব প্রশ্নের উত্তর দেয় লাইন ধরে ধরে। আর এদিকে আমি রওশন আরার আদল মেলাই সরু নাক, মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল আর গজদাঁতের এক কিশোরীর সাথে। 

তখন আমরা ৬ষ্ঠ শ্রেণী। তখন আমাদের বরফ পানি দিন। 

আমার আব্বা ছিলেন সরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা। তাই তিন বছরের অধিক কোথাও আমাদের সংসার স্থায়িত্ব পেতো না। এজন্য আম্মার খুব শখের চিনামাটির ডিনার সেটটি আজীবন কার্টুনবন্দী থাকলো। কোথাও থিতু হলে একটা শোকেসে তা সাজিয়ে রাখার স্বপ্ন আম্মার আমৃত্যূ ছিল। 

গোবিন্দপুরে আমরা ছিলাম আরোও কম সময়। দুই বছর কয়েকমাস হতেই জরুরী কারণ দেখিয়ে আব্বাকে বদলী করে দেওয়া হয়। 

তাই নীরু ও আমার 'টুপুর টুপুর টুপ' দিনগুলো দৈর্ঘ্য প্রস্থে খুব একটা বড় হতে পারেনি। 

"দোদুল, তোমার শেষ দিনের কথা মনে আছে? সেদিন কী বৃষ্টি হচ্ছিলো! দুয়ার থেকে নামলে কলাবাগান ঝাপসা হয়ে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিলো। মা বলছিলো, বানের বৃষ্টি। ডোবার পানি উঠোন ছুঁইছুঁই তখন। সেই পানি ডিঙিয়ে পলিথিনে বই বেঁধে আমি স্কুলে গিয়েছিলাম, শুধু তোমার বিদায় দিন বলে। আধভেজা তুমি পন্ডিত স্যারের ক্লাশে অঝোরে কেঁদেছিলে, আশীর্বাদ করার ছলে স্যারও ধরা গলা আড়াল করে বলেছিলেন 'অংক আর বিজ্ঞানের চর্চাটা ঠিকমতো করিস। তুই একসময় অনেক বড় কিছু হবি।' 

তুমি এখন কত বড় হয়েছো, দোদুল ?" 

আমার মনে দলবেঁধে ধেয়ে আসে ধুসর মেঘ। বড়বেলার গল্প এতো তাড়াতাড়ি কেন? আমার তো ঘোলাপানি ঘোলাপানি পানকৌড়ি ডুবের কত গল্প বাকী! 

উত্তরের বাতাসে প্লেইন ট্রি'র শেষ পাতাটিও খসে পড়ে। আমি জানালায় দাঁড়াতেই কঙ্কাল গাছটি ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে, পাতাঝরা বেলার চেয়েও কী বড়বেলা আছে? 

আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, ওপেন্টি বায়োস্কোপ নাইন টেন তেইশস্কোপ, চুলটানা বিবিয়ানা সাহেব বাবুর বৈঠকখানা....... 

মনের ভেতর সুতোকাটুনি আওয়াজ শুরু হয় আমার। অনর্গল আগত এলোমেলো ভাবনাগুলো ছিন্ন সুতার মতোই অকাজের। তবুও একরৈখিক মনোলগের মতো ভাবনাগুলো আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে। 

আমি বড়বেলার কথা ভাবতে বসি। দূরে চলে যাওয়া কাছের মানুষদের কথা ভাবতে বসি। যাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সুর ঠিক আকাশে মেঘের চিত্রিত ছবির মতো। যেরকম দেখতে চাওয়া যায়, ঠিক সেরকম। চিত্রগুলো মেঘের কিন্তু স্ট্রোকগুলো আমাদের ইচ্ছের। 

উদ্দেশ্যবিধেয় বিহীন, উৎসব-আনন্দবিহীন সে আত্মীয়তা শুধু দোলকের মতো শূন্যে দুলতে থাকে। 

সে শূন্যতা আমাকে পরবাস নামক একটা নির্ভার আশ্রয় দেয়। সে শূন্যতা আমাকে একরৈখিক রেখার মতো পরিকল্পনাহীন ছুটে চলার পথ দেখিয়ে দেয়। আমি ছুটতে থাকি অবশ্যম্ভাবী আত্মীয়তার সব সুতো কেটে কেটে, অনাগত অজানা শূন্যতার দিকে। 

' তুই কীরে বুবু, এতদিন হয়ে গেলো দেশ ছেড়েছিস। ওদেশে এভাবে পড়ে আছিস! ফিরে আয়।' 

শেষ ডাকটি কবে ডেকেছিলো আমার একমাত্র বোন ডালিয়া আমার ঠিকঠাক মনে আসে না। তবে তা অবশ্যই ওর বিয়ের আগে। 

ঘুমন্ত রাতের মতো আমার অথর্ব দিনের পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ আসা হঠাত বন্ধ হয়ে যায়, ওর বিয়ের পর। তবে আমিও ডালিয়ার ডাকবিহীন সময়ে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠি। তবু কেন যেন সকাল হবার অপেক্ষায় এখনো স্থাণু রাতের কোলে বসে থাকি। 

না, এতে আমি ডালিয়াকে দোষ দেই না। কীইবা করবে বেচারি? স্বামীর কথার বাইরে গিয়ে ওয়াটার কালারে করা ছবির মতো সুন্দর সংসারটি ফসকাতে চায় কে? ও না হয় এখন অন্যবাড়ির মানুষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমার ভাইগুলো? ওরা তো সেই কবেই আত্মীয়তার সুরকে বিসর্জন দিয়ে যোগাযোগের শেষ সুতোটিও কেটে দিয়েছে। 

মনের ভেতর সুতোকাটার আওয়াজ বন্ধ করতে আমি হলদে ঘাসের মাঠটিতে তাকাই। 

মনে মনে বলি, নীরু জানো এই মাঠে আবার ঘাস বড় হয়ে শীষ দোলাবে। ওপাশের লেকে হাঁস ভাসবে। হাইড্রেঞ্জিয়ার দিন ফিরবে। সবুজ পাতার দিন ফিরবে। আর আমি এসির ঠান্ডায় কুইল্টের ভেতর, ঝিম ধরা দুপুরের শূন্যতার ভেতর তলিয়ে যাবার আগে সবুজ বাতির রওশন আরাকে খুঁজবো। 

তুমি কবে ফিরবে সবুজ বাতির ঘরে? দেড় সপ্তাহ হয়ে গেলো আমাদের কথা হয়নি। 

না, নীরু আমার অপেক্ষা প্রলম্বিত করলো না। ফিরে এলো ইকড়ি মিকড়ি বেলা নিয়ে। আমিও জগন্নাথের হাঁড়িকুড়ি-র গল্প ফাঁদলাম মন খুলে। 

নীরুদের উনুনে খইয়ের হেসে ওঠা, স্কুলের সোনালু-জারুলের পথ, চালতা ফুলের বৃষ্টিবেলা, বার্ষিক পুরস্কারে মিলু দি'র শিখিয়ে দেওয়া কবিতা দিন ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো আমার আর রওশন আরার সবুজ বাতির ঘরে নেচে বেড়ায়। 

'নীরু, এখানে এখন বৃষ্টিদিন। এ বৃষ্টির বাহারি নাম স্প্রিং রেইন। ঠিক আমাদের দেশের ভাদ্র মাসের বৃষ্টির মতো। এখনো কি দেশে এমন বৃষ্টি হয়? খুব দেখতে ইচ্ছা হয়। শ্রাবণের বৃষ্টি দেখতে ইচ্ছা হয়, শিলাবৃষ্টিতে শিল কুড়াতে ইচ্ছে হয়, ঘড়ের ভেতর দড়িতে মেলে দেওয়া ভেজা কাপড়ের ভ্যাপসা ঘ্রাণ নিতে ইচ্ছে হয়।' 

আমার ইচ্ছেগুলো নিদারুণ নৈঃশব্দ্য হয়ে সবুজ বাতির ঘরে আলগোছে পড়ে থাকে, কোনো এক উইকডেজের অবসরে। 

হ্যাঁ, উইকডেজেও আমি এখন বার্তা লিখি। রওশন আরার প্রতি অমোঘ টান নাকী এলেনা বেলেনা দিনের প্রতি তীব্র নেশায় সবুজ বাতির ঘরে আমি সুযোগ পেলেই ঢুঁ দেই, তার উত্তর আমার কাছে নেই। 

রওশন আরা এ ক'দিন বেশ অনিয়মিত। সবুজ বাতিটি অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে। তবুও সেখানে আমার জন্য ছোট ছোট কিছু কথা থাকে। 

' এবারের গরম সহ্য করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে?' 

বা, 

' স্কুলের বড় আপা মারা গিয়েছেন। প্যারালাইজড হয়ে ছিলেন অনেকদিন।' 

সেসব ছোট কথার উত্তরে আমি লিখি লম্বা বার্তা। 

' নীরু, আমার ঘরের সামনের মাঠজুড়ে এখন ড্যানডোলিয়ন। বাচ্চাগুলো ফুঁ দিয়ে ড্যানডোলিয়ন উড়িয়ে বলে, আই উইশ.... 

আজ আমিও উইশ করেছি। ইচিং বিচিং দিন, আমাদের কানামাছি ভোঁ ভোঁ দিন দীর্ঘায়িত হোক।' 

না, কানামাছি ভোঁ ভোঁ দিনগুলোতে ঠিক যারে পাবি তারে ছোঁয়া হলো না। এবার দিন দশেক পর জ্বললো রওশন আরার সবুজ বাতি। 

' দোদুল, এ ক'দিন মন ভাল ছিল না। এ মাসেই তিনি আমাকে একা করে চলে গেছেন। তাই মাসটি এলেই মন ঠিক আমার আয়ত্তে থাকে না। সবকিছুতেই তাঁর কথা মনে পড়ে।' 

আমি বুঝলাম নীরুর এখন ঠিক এলেনা বেলেনা দিন ভাল লাগবে না। সম্পর্ক আর সান্নিধ্যের দীর্ঘ স্মৃতি আক্রান্ত সময়ে কানামাছিতে চোখ বাঁধা অতটা পাক্কা হবে না। আমি তাই সবুজ বাতির ঘরে সহমর্মিতার শব্দ যোগাই। 

' নীরু, মন খারাপ করোনা। একমুখী জীবনের খুব কুচুটে নিয়ম এটা। মানতেই হয়, মেনে নিতেই হয়। তবুও দেখো তোমার চারপাশে কতরকম সম্পর্ক। চিরপরিচিত কত গুঞ্জন। তুমি তো একা নও। আমার কথা ভাবো একবার!' 

ব্যস্, আমি নিজের অজান্তেই বিসর্জন দিলাম আমাদের টুপুর টুপুর টুপ দিন। 

এরপরের বার্তাগুলোতে শুধুই বড়বেলার গল্প। তবুও রওশন আরার আদলে আমি বসিয়েই চলি কিশোরী নীরুর ছবি। 

' দোদুল, তুমি কখনো দেশে ফিরবে না? কেন অভিমান করে আছো দেশের উপর? মনে হয় ভুল বললাম। অভিমান তো দেশের মানুষগুলোর উপর। জানতে ইচ্ছা হয় তার কারণ?' 

আমি মনে মনে হাতড়ে বেড়াই অভিমানের মানুষগুলোর হিসেব। সেই যে ঝন্টু মানে মমিনুল ইসলাম, আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই। দু'জন ছিলাম একাত্মা। আর আব্বা আম্মা মারা যাবার পরে এই বুবুই ছিল ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেই তো বলে দিয়েছিলো, তুই সিদ্ধান্ত না বদলালে আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিস বুবু। 

আমি ওর কথা মেনেছি। যোগাযোগের সুতো কেটে দিয়েছি এক নিমেষে। 

আর রিন্টু, ছোটভাইটি তো আজীবন বড় ভাইয়ের কথায় সায় দিয়ে এসেছে। তাই ও ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে বুবুর কুশলাদি। 

আর কে বাকী রইলো? 

' দোদুল, কখনো জিজ্ঞাসা করিনি তোমার ব্যক্তিগত কথা। কে ছিল সে? কেনইবা তার জন্য বাড়ি, ভাইবোন সব ছেড়েছিলে?' 

আমি রওশন আরার সবুজ বাতির স্থির তাকিয়ে থাকি। 

কলাগাছের ভেলায় আমি আর নীরু। অবেলায় ভেসে বেড়াচ্ছি। শাপলাপুকুর, হোগলার ঝাড় সব পেরিয়ে আমরা ভাসছি। রেজাল্ট ভাল হয়নি, আব্বা বকেছে। খুব মন খারাপ আমার। নীরু জল ঘেটে ঘেটে আমাকে শামুকের খোলস এনে দিচ্ছে। আমি হরলিক্সের বয়ামে শামুক জমাই। শামুকের রঙবেরঙের খোলস আমার মন একটু একটু করে ভাল করে দেয়। গজদন্তি নীরু খিলখিল করে বলে, ঢ্যাপের ফল এনে দেবো কাল। তুমি মন খারাপ করে থাকলে ভাল লাগে না। 

আমি কোঁচর ভরা ঢ্যাপের আশায় ব্যক্তিগত ঝাঁপি খুলি সবুজ বাতির ঘরে। 

' নীরু, সে অনেক কথা! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পরিচয়। খুব তাড়াতাড়িই সখ্যতার অভ্যন্তরে ভালবাসা নামক চড়ুইপাখির জন্ম হয়। তুমি তো জানোই বেপরোয়া আমি চিরকালের। অপ্রতিরোধ্য আবেগে খুব অল্প সময়েই সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করার। আব্বা আম্মার মৃত্যূতে ঝন্টু তখন বাড়ির অভিভাবক। ছেলের খোঁজখবর নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলো আব্বার অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ছেলে আমার পছন্দ করা পাত্র। আর যাই হোক বুবুকে ওরা পতনের অনুমতি দিতে পারে না।' 

' দোদুল, কী করলে তারপর?' 

' নীরু, সেই যে সুতোয় কাটা সম্পর্ক, অনুমতির দায়ভার থেকে ওদেরকে মুক্ত করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম।' 

আমি মনে মনে বলি, দেশ থেকে বেরিয়ে আসার পথটাও সেদিনই তৈরী হয়ে গিয়েছিলো নীরু। 

' দোদুল, খুব ভালবাসা ছিল তোমাদের, তাই না? জানো, উনিও আমায় খুব ভালবাসতেন। বিয়ের আগে আমাদের জানাশোনা ছিল না। কিন্তু বিয়ের পর কেউ তা বুঝতেই পারতো না। আমাদের খুব বোঝাপড়া ছিল।' 

আমি শব্দগুলোর মাঝে নীরুর জ্বলজ্বলে চোখদুটো দেখতে পাই। 

' নীরু, বোঝাপড়ার কথা জানি না তবে আমাদের দু'জনের চেনাশোনা ছিল চমৎকার। এতই চিনতাম যে, ওর জন্মদাগের নকশাও আমার মুখস্থ ছিল। আমরা দু'জন ছিলাম দু'জনের পাঠ্যবই। বড়বেশী পঠিত আর বোধ্য। বেশী বোধ্য হলে ভাললাগা কমে যায়।' 

নীরু কথাগুলোতে সম্মতি বা অসম্মতি কোনোটিই জানায় না। 

' আমাদের আসলে এসব ভাবার সময়ই হয়নি। বিয়ের পরপরই শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ওদিকে আমার আম্মাও অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকতেন। তাই আমি দায়িত্ব নিলাম এদের সেবা শুশ্রূষার আর উনি দায়িত্ব নিলেন দু' সংসারের। সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে করতে আমরা দু'জন দুজনকে ভাগ করে নিয়েছিলাম।' 

আমি দু'বেণী ঝোলানো নীরুর হাতে এই প্রথম শাপলা ফুল নয়, দোলনচাঁপা দেখলাম। 

আমি লিখি, 

' নীরু, ভাগাভাগির মন্ত্র আওড়ানোর আগেই প্রীতি হারিয়ে গিয়েছিলো আমাদের। প্রথম প্রথম খুব ঝগড়া হতো। তবে আড়ি ভাঙানোর ছলে মিথ্যে নৈকট্যও হতো। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে আড়ি ভাঙানোর ছলও বন্ধ হলো। নৈঃশব্দ্য টুক করে বাসা বাঁধলো আমাদের দু'জনের ভেতর।' 

এই বার্তার প্রতিউত্তরে এলো নীরুর দীর্ঘ বার্তা। 

' দোদুল জানো, মানুষটি সাথে থাকলে নিঃস্তব্ধতা কী জিনিষ আমি জানতাম না। সারাদিনই কারণে অকারণে আমার সাথে কথা বলতেন। কী করছি, কী রাঁধছি, অফিসের কাজে তাঁকে কোথায় যেতে হবে, জমিতে সর্ষে তোলার পর কী লাগাবেন, বাড়ির দোচালা ঘড় ভেঙে ক'তলা ফাউন্ডেশন হবে-----সারাকাল কত কথা আমাদের!' 

আমি নৈঃশব্দের ফাঁকে কথা খুঁজি। 

'নীরু, আমাদের দু'জনের কথা খুব তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে গিয়েছিলো। দু'জন দু'জনকে যত চিনেছি তত ভালবাসা নিঃস্পৃহ হয়েছে। এমনকি নিঃস্পৃহ হয়ে গিয়েছিলো ওর জন্মদাগের প্রতি আমার টান। জানো, ভালবাসার প্রবল দিনগুলোতে জন্মদাগের নাম দিয়েছিলাম আমি 'জারুল'। নিঃস্পৃহ টান আর এরসাথে 'বলার কিছু না থাকা' আমাদের জীর্ণ সম্পর্কটাকে দুম করে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।' 

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম নীরু এখন খুব তাড়াতাড়ি উত্তর লেখে। 

' দোদুল, যতদিন গেছে উনি তত আমায় সবকিছুতে সম্পৃক্ত করেছেন। তা ব্যাংকের বই হোক বা বাড়ি জমির উইল। সবসময় হিসেব বরাবর করার উছিলা খুঁজতেন তিনি। আমায় ডাকতেন, অর্ধাঙ্গিনী।' 

আমি ডুরে শাড়ি পড়া নীরুকে দেখতে পাই। 

' নীরু, বরাবরের হিসেব কখনই আমাদের ছিল না। আমরা বরং একে অন্যকে সবসময় পেছনে ফেলতে চেয়েছি। এজন্যই তো আমার এপোয়েন্টম্যান্ট লেটার দু'দিন মিটসেফের উপর পড়েছিলো। কারণ ও জানানোর আগ্রহ বোধ করেনি। প্রতিযোগিতায় কাটাকুটি খেলতে খেলতে আমরা হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।' 

নীরুর ত্বরিত উত্তর আসে। 

' দোদুল, উনি যতদিন বেঁচে ছিলেন আমার অক্ষমতা ঢেকে রাখতেন। আমার ভাগের কাজটুকু করে নামের বেলায় আমার নাম এগিয়ে দিতেন। তা ননদের বাড়ির জন্য ইদের শপিং হোক বা আমার ভাইয়ের ব্যবসায় সহায়তা । সব নিজেই করতেন কিন্তু বলতেন, অর্ধাঙ্গিনীর আদেশ উপেক্ষা করার সাহস নেই আমার।' 

আমি চোখের কোলে ভাঁজ পড়া নীরুকে দেখতে পাই। 

' নীরু, সাহস আমাদের দু'জনেরই খুব ছিল। এজন্যই হুট করে যেমন বাড়ি ছেড়েছিলাম তেমনি হুট করে ছেড়ে দিলাম দু'জন দু'জনকে। আমি যেমন স্বাধীনতা চেয়েছিলাম ড্রাগন ফ্রুট কালারের পলকা ডটের ফিনফিনে জর্জেট শাড়ি পড়ার, তেমনি ও স্বাধীনতা চেয়েছিলো নিজের ইচ্ছেমতো আমাকে সাজাবার। পোষায়নি, আমরা বেরিয়ে এসেছি একটি অর্থহীন সম্পর্ক থেকে, ছেড়ে দিয়েছি সঙের সার নামের চার দেওয়ালের বৈকল্যতাকে। আর এরপরেই দেশ ছেড়ে দিলাম আমি।' 

এবার আমি কীভাবে যেন আগে থেকেই আঁচ করতে পারলাম নীরুর বার্তা। 

' দোদুল, উনি আমার হাত কখনো ছাড়েননি। উনি ভাবতেন, সহজ সরল আমায় যে কেউ চাইলেই ক্ষতি করতে পারে। এজন্য প্রায় সবসময় আমার সাথে সাথেই থাকতেন। ভাইয়ের বাড়ি হোক বা মায়ের বাড়ি উনি আমায় প্রহরীর মতো চোখেচোখে রাখতেন। যেদিন মারা গেলেন সেদিনও তার মাথার কাছে আমি ঠাঁই বসেছিলাম। এক মুহূর্ত আমায় না দেখলে অস্থির হয়ে পরতেন।' 

প্লাস ২ পাওয়ারের গ্লাস চোখে নীরুর গজদাঁত আমার কল্পনায় কেমন যেন বেমানান লাগে। 

এবার আমার খুব রওশন আরাকে দেখতে ইচ্ছে হয়। আমিও তো এখন শায়লা সুলতানা। 

আমি সাহেব বাবুর বৈঠকখানার নীরুকে নয় রওশন আরাকেই দেখার বায়না ধরি। 

' নীরু, একটি ছবিও কী নেই? তোমার উনি অপছন্দ করতেন বলে না হয় তোমার একার কোনো ছবি নেই। তা বলে কী তুমি তাঁর সাথেও কোনো স্মৃতি রাখোনি? ছবির চেয়ে মেমোরি রিভাইভার আর কিছু নেই।' 

আমি নীরু আর রওশন আরার যুগ্ম প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে একটি অবয়ব মনের ভেতর দাঁড় করাই। 

এরপর অপেক্ষায় থাকি। একদিন, দু'দিন, তিনদিন পেরিয়ে যায়। আমি অধৈর্য্য হই। হাইড্রেঞ্জিয়ার দিন এসেছে। বাতাসে তপ্ত লু ফিরে এসেছে। 

কিন্তু রওশন আরার ছবি আসতেই যত সময় ক্ষেপন। 

আমি বারবার মেসেঞ্জারে সবুজ বাতির খোঁজে যাই। কিন্তু সেখানে 'ট্যাপ ফর ডিটেইলস' ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে রওশন আরা নামের পাশে। 

আমি বিরক্ত হই। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা ঘরে আমি কুইল্টে তলিয়ে যাবার আগে বলি, 

তুমি কই নীরু? 

না নীরু নয়, পরদিন সকালে রওশন আরা হাসিমুখে এসে দাঁড়ায় সবুজ বাতির ঘরে। তার যুগ্মজীবনে একটি অতীত ছবি পাঠিয়ে লেখে, ননদের ছেলের বিয়েতে ফটোগ্রাফার না জানিয়ে ছবিটি তুলেছিলো। এটি আমাদের শেষ তোলা ছবি। 

আমি ছবির উপর ক্লিক করি ভালভাবে দেখবো বলে। তবে নীরু বা রওশন আরা কাকে দেখার প্রস্তুতি নিলাম, তা অবশ্য পরিষ্কার ছিল না। 

স্ক্রিনজুড়ে দু'জন মানুষ প্রাণখুলে হাসছে। একজন কাঁঠালচাঁপা রঙের কাতান শাড়ি আর গহনায় পরিপাটি। আর অন্যজন সাদা পাঞ্জাবীর নকশীর সাথে মিলিয়ে গোল্ডরিমের চমশা পড়া। 

আমি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকি ছবিটার দিকে, গোল্ডরিমের চশমা পড়া লোকটির দিকে। চোখের পাশের জন্মদাগের নকশা চিনতে ভুল হয়না আমার। চোখদুটোতে সেই পুরানো অহংকার। 

এরপর আমি কয়েক মুহূর্ত সময় নেই। নিস্তব্ধ সময়। 

তারপর প্রায় তাড়াহুড়ো করেই বন্ধ করি ল্যাপটপের সব উইন্ডো। আর ফেসবুকের উইন্ডো টি বন্ধের আগে মনে করে ডিএ্যাক্টিভেট করি আমার আইডি। 

জানালায় প্লেইন ট্রি'র সবুজ পাতা হুটোপুটি খায়। 

আমি বিড়বিড় করে বলি, 

টুপুর টুপুর টুপ 

ঘোলাপানি, ঘোলাপানি 

পানকৌড়ি ডুব।।

----------------------





লেখক পরিচিতি:
স্মৃতি ভদ্র
কথাসাহিত্যিক।
নিউইর্য়কে থাকেন।

৫টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন লিখেছো। অনেক অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা রইলো।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. অসাধারন লিখেছো। অনেক অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা রইলো।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. বিস্তৃত কলেবরে নিটোল একটা গল্প। স্মৃতির সোনায় মোড়া হাত।

    উত্তর দিনমুছুন
  4. গল্পটা এভাবেই বলতে চেয়েছিলাম সাদিয়া। ভালবাসা জেনো।

    উত্তর দিনমুছুন