বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

অমলেন্দু চক্রবর্তী'র গল্প: কোন এক লেখক বন্ধুকে

অমলেন্দু চক্রবর্তী (১৯৩৪-২০০৯)। কথাসাহিত্যিক। লিখেছেন ন’টি উপন্যাস এবং শতাধিক ছোটগল্প, যার মধ্যে একটি বড় অংশ এখনও অগ্রন্থিত। ‘যাবজ্জীবন’ উপন্যাসের জন্য ১৯৮৬-তে পেয়েছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নরসিংহ দাস পুরস্কার’ এবং ১৯৮৭-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বঙ্কিম পুরস্কার। অমলেন্দু চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘অবিরত চেনামুখ’-এর ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯)। অমলেন্দু-র উপন্যাস ‘আকালের সন্ধানে’-ও চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল মৃণাল সেনের মাধ্যমেই (১৯৮১)।

নিচের গল্পটিও এতাবৎ অগ্রন্থিত। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭ সংখ্যায়। লেখকের বয়স তখন ২৫-২৬ বছর, স্বকীয় সাহিত্যভাবনার অঙ্কুরে বেড়ে ওঠার সময়। তাই পরিণত সাহিত্যিকবোধের স্বাদ হয়তো পাঠক পুরোপুরি নাও পেতে পারেন। তবু গল্পটি বিশিষ্ট তার আঙ্গিকে, প্রকাশভঙ্গিমায়। অগ্রজ কথাসাহিত্যিক বিমল করের মুখ্য ভূমিকায় পঞ্চাশের দশকের শেষে শুরু হয়েছিল ‘ছোট গল্প, নতুন রীতি’ মুখপত্রটিকে কেন্দ্র করে এক বৌদ্ধিক আন্দোলন। সেসময় পাঁচের দশকে উঠে আসা তরুণ গল্পকারদের কিছু গল্প নিয়ে বিমলবাবু একটি গল্প-সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন—‘এই দশকের গল্প’। সেখানে ঠাঁই পেয়েছিল অমলেন্দু চক্রবর্তী-র এই গল্প...

---------------------------------------------------------------------------------------


প্রিয়বরেষু

জানেন বোধ হয়—এখন বসন্তকাল। এক শ’ সাত ফারেনহিটের উত্তাপে রুটি-সেঁকা হয়ে গোটা কলকাতার মানুষ যখন শাপান্ত করছিল চৈত্র মাসটাকে, তখনই হঠাৎ একদিন আমি আবিষ্কার করলাম বিকেলের হাওয়াটা। অনেককেই জানালাম। খবর পেয়ে হাতের কাজ ফেলে বেরিয়ে এল মানুষগুলো। গোটা কলকাতার মানুষ। ছুটে গেল ময়দানে, মনুমেন্টের তলায়। ভাবুন তো, কি অদ্ভুত আর কি বিচিত্র এই মানুষগুলো।
বিরাট জায়গা জুড়ে সবুজ মাটি, খোলামেলা মস্ত আকাশ, গঙ্গার তীর, দক্ষিণ থেকে আসা বঙ্গোপসাগরের টাটকা বাতাস—সব মিলিয়ে একটু আরাম অবকাশ আর নির্জনতা চেয়েছিল প্রত্যেকটি মানুষ। কিন্তু নিজেরাই ভিড় বানাল। বিরক্তিকর ঠেলাঠেলি ভিড়, প্রাণান্তকর গুমোট। এত বড় পৃথিবী, এত বড় শহর কলকাতা, কিন্তু কি আশ্চর্য, এক চিলতে জায়গার জন্য কি বিশ্রী কাড়াকাড়ি, নির্লজ্জ কলহ। ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে।’ আপনার কি মনে হয়? হয়নি? তা’ যদি না হবে, তবে এমন করে পতঙ্গ হবে কেন মানুষ। পতঙ্গের মতো ব্যবহার করবে কেন ? মানুষ কি বাঁচতে ভুলে গেছে?

আমি ময়দানে যাই না। ভালো লাগে না। যুদ্ধের ভয়ে মাটি-কাটা ট্রেঞ্চের মতো কলকাতার যে অলি-গলি, রাস্তা-ঘাট, রাজপথ, আমি তারই আনাচে-কানাচে বসন্তকে খুঁজতে চেষ্টা করি। ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’—এ খবরটা সবাই পেয়েছে কিনা তার খোঁজ নিতে যাই।

সেদিন বিকেলবেলা। কর্নওঅলিস স্ট্রীট ধরে একা হাঁটছিলাম। অদ্ভুত আনন্দ পাচ্ছিলাম এই অসংখ্য নাগরিকের মিছিলে একা একা পথ হাঁটায়। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন, জীবনে এমন কতগুলো মুহূর্ত এসে স্মরণীয় হয়, যার কাছে সব তুচ্ছ। এমন কি, ইস্তিরি করতে গিয়ে প্রথম-হাতে-কাচা দামী নতুন জামাটা যে এইমাত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেল, সে দুঃখটা দুঃখই নয় মনে করে অনায়াসে একটা সিনেমার টিকিট কিনে ফেলতে পারি। কেন পারব না বলুন। আপনি তো আধুনিক মানুষ, ‘মডার্ন ম্যান’। আপনি বুঝবেন। কাল রাতে মা মারা গেছেন বলে আজ পথ হাঁটতে হাঁটতে আমার পার্শ্ববর্তিনী সুন্দরী যুবতীর নরম ননীর শরীরটার দিকে একবার কি ফিরে তাকাব না?

এমনি একটা অকারণ ভালোলাগা মুহূর্ত পেয়েছিলাম সেদিন বিকেলবেলা। তন্ময় হয়ে ভাবছিলাম ট্যুশানি ফাঁকি দিয়ে কেতাবে-পড়া ফরাসী মেজাজের সাধনা করব কিনা একটু। অন্তত সেই সন্ধ্যেটা। কারণ আমি তো জানি, কোন কিছুই আমাকে তখন বিচলিত করতে পারবে না। এই দুর্লভ মুহূর্তটুকুর সব রস, সব আনন্দ নিংড়ে নিয়ে একা উপভোগ করার পূর্ণ অধিকার আমার আছে।

কিন্তু বলুন তো, একটা সামান্য ঘটনায় এতটা বিচলিত হলাম কেন সেদিন? একটা বাচ্চা ছেলে। ফুটফুটে সুন্দর। বয়স কত হবে ? ধরুন, সাত কি আট, বড় জোর দশ। পরনে সাদা শার্ট সাদা প্যান্ট, পায়ে মোজা সাদা কেড্‌স্‌। কাঁধে ঝুলোনো ব্যাগ। বোধ হয় স্কুল থেকে ফিরছিল। বেশ স্মার্ট, চকোলেট চিবোতে চিবোতে রাস্তাটা পেরোচ্ছিল। কিন্তু জানত না—ও শিশু জানত না—এ শহর অরণ্য। আচমকা একটা বিরাট মোটর বিকট গর্জন করে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওর উপর। ছেলেটার কান্না শুনতে পাইনি। চারদিকের মানুষ ছুটে এসে ছেঁকে ধরল ড্রাইভারকে। জানেন, আমার তখন হাসি পেল। উত্তেজিত জনতার কেউ লক্ষ করল না গাড়িটাকে। গাড়িটার হলুদ শরীরে রক্তের রঙে আঁকা ‘রেড ক্রস’। হাসপাতালের গাড়ি। মানবতার প্রতীক।

ঈশ্বরের পৃথিবীতে কি ভীষণ প্রাণের অপচয়। সে’দিন আমার এক বন্ধু আত্মহত্যা করেছিল। কেন জানেন? আমি জানি না। কেউ জানে না। বোধ হয়, ও নিজেও জানত না। সে’দিন পত্রিকায় পড়লাম—শেয়ালদা সেকশানে প্রতিদিন গড়ে দু’জন চলতি-ট্রেনের চাকায় স্বেচ্ছায় মাথা পেতে দেয়। হিসেব করে দেখেছেন, এক শেয়ালদা-লাইনেই বছরে সাড়ে সাত শ’ আত্মমৃত্যু। আপনার কি মনে হয় না আমাদের পিতৃপুরুষের ফুলের চাষ ব্যর্থ হয়নি আজও। পৃথিবীতে একদিন যত ফুলের বাগান ছিল, আজ তার চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি শ্মশান আর কবর। কিন্তু আশ্চর্য কি জানেন, আমরা সেই কবরের সংখ্যাই বাড়িয়ে চলেছি দিনের পর দিন। তা হোক, পৃথিবীতে তবু বসন্ত আসে আজও। আসবে চিরকাল।

হয়তো অবাক হচ্ছেন। ভাবছেন, হঠাৎ এ চিঠি কেন? এত কথার অর্থ কি? আর বলছিই যখন, হঠাৎ আপনাকেই বেছে নিলাম কেন। আপনি গুণী। এবং উদার। আপনার ক্ষমতায় আমার শ্রদ্ধা অসীম। আমার অনুরোধ, মাটিতে কান পেতে এ পৃথিবীর কান্না শুনুন আপনি। একটা উপন্যাস লিখুন। দীর্ঘ উপন্যাস। দুঃখ-যন্ত্রণা-কান্না আর হাহাকার, ক্লীবত্ব-অসহায়ত্ব পঙ্গুতা, সংশয়-সন্দেহ-অবিশ্বাস, দুর্নিবার স্বর্ণমোহ, লোভের উন্মত্ততা, প্রতিকারহীন অবিচার এ পৃথিবীর ব্যাধি। আপনার রচনায় সে পৃথিবী নায়ক হোক। নায়িকা নয়, নায়ক। ‘মাতা ধরিত্রী’ নয়, পৃথিবী বীর-ক্ষত্রিয় হোক আপনার কলমে। প্রতিবাদে বলিষ্ঠ হোক। সূর্যদেবকে ধন্যবাদ। তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল দিয়ে গড়েছেন এ পৃথিবী। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এই মাটি। এই ক্ষুদ্রতাই আমাদের কল্যাণ। আরও বেশি মাটি মানে আরও বেশি মানুষ, আরও বেশি মানুষ মানে বেশি অন্যায়, আরও উৎপীড়ন, আরও কান্না, আরও হতাশা, আরও হাহাকার যন্ত্রণা মৃত্যু। বিরাট ভূমন্ডলের তুলনায় ভূখন্ড ক্ষুদ্র, কিন্তু সুন্দর। ঠিক আমার বাড়ির সামনের বাগিচার মতো, ছোট এবং সুন্দর। তাকে দলে-মুচড়ে নষ্ট করবার, তছনছ করবার অধিকার কারও নেই। আমার বাগান, বোধ হয় আমারও নেই। এ মাটির গভীরেই আছে আমাদের পিতা বুদ্ধ, যিশু, কনফুসিঅসের চিতা অস্থি। আপনি তার মঙ্গলাচরণ করুন।

‘অন্ধকার ভান্ডারের রহস্যসম্পদ’ আপনার প্রতিবেশী আফ্রিকাকে স্মরণ করুন। উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে আজও অপরিচিত যার মানবরূপ, কালো ঘোমটার নিচে ছায়াবৃতা অন্ধকার সেই মহাদেশ। অতৃপ্ত তৃষ্ণা যার বুকে, প্রকৃতি যাকে বিদীর্ণ করে নির্মম আঘাতে, ‘দস্যুপায়ের কাঁটা মারা জুতোর তলায়’ যার ইতিহাস যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত, অপমানিত, ক্ষত-বিক্ষত। আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন গত তিন মাসে কি বীভৎস, কি ভয়ঙ্কর ক্ষমাহীন অমানুষিকতা ঘটে গেল এই মহাদেশের নগরে, অরণ্যে, মরুভূমিতে। একদিকে প্রকৃতির রুদ্ররোষ, অন্যদিকে নেকড়ের তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়। হ্যাঁ, আমি আগাদিআর কথাই বলছি। ভাবুন তো, হঠাৎ পায়ের তলায় মাটিটা কেঁপে উঠল কি খেয়ালে। হাজার হাজার মানুষের বাঁচার দাবিকে অস্বীকার করে ভেঙে পড়লো সমস্ত শহর। কি মর্মান্তিক দৃশ্য। আপনার মনে পড়ছে না সেই লিসবনের ঘটনাটা? লক্ষাধিক লোকের আকস্মিক অপমৃত্যু নিয়ে পন্ডিতদের আপ্তবাক্য কি পরিমাণ বিরক্তি ধরিয়েছিল ভল্‌তেঅরকে। লিখেছিলেন ‘ক্যান্ডিড’। আগাদিআরে কি আপনি তেমনি কোন পরিহাস লক্ষ করেন নি? ধ্বংস নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে পরিহাস। সেদিন প্লিবিঅন আফ্রিকার কান্নায় বিচলিত হয়ে উঠেছিল পেট্রিশিঅন য়ুরোপ। তাই মৃত শহরের উপকূলে নোঙর করেছিল যুদ্ধ-জাহাজ। যুদ্ধ নয়—সেবার মহৎ উদ্দেশ্য তাদের। তারা ভুলে গেছে, সারা পৃথিবীর প্রতিবাদ অস্বীকার করে দু’দিন আগে তারাই দূষিত ব্যাধি ছড়িয়ে গেছে নির্বিরোধ শান্ত সাহারায়। বিদেশী নাবিক যেমন সিফিলিসের জীবানু ছড়িয়ে যায় ভিনদেশের বন্দরে বন্দরে। কিংবা ধরুন, দক্ষিণ আফ্রিকার সেই নির্লজ্জ বিদ্বেষ প্রচারের, প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জঘন্যতার বর্বরতার কথা। তবু সূর্যদেব আলো দেন সেই অন্ধকারের দেশে। সেই একই আলো, যে আলোয় সারা পৃথিবীর অবগাহন। দেয়ালে টাঙানো মানচিত্রের একটি বিশেষ রঙের ওপর আঙুল রেখে বলতে পারি—এ আমার দেশ ভারতবর্ষ। কিন্তু তখনও আমার দৃষ্টিটা ছড়িয়ে থাকে গোটা পৃথিবীর ওপর। আপনিও কি পারেন না, সারা পৃথিবীর ক্যানভাসে একটি একক মানুষ কিংবা একটি বিশেষ দেশ, কিংবা একটি নিপীড়িত জাতির কান্নাকে তুলে ধরতে। সেসব মানুষ—যারা মরতে চায় না, কিন্তু মার খায়।

আমার প্রতিবেশী মেয়েটির কাহিনী বলি আপনাকে।

একটি অত্যন্ত নগণ্য প্রাণ। পৃথিবীর অফুরন্ত হাওয়া যার নিঃশ্বাসে কণামাত্র আলোড়নও সৃষ্টি করে না। বুড়িগঙ্গা নদী তীরে নিরিবিলি গ্রাম। নিস্তরঙ্গ পুকুরের জলে শাপলা পাতার সঙ্গে চাঁদের খেলা, পাটের ক্ষেতে লুকোচুরি, বর্ষায় নদীর জলে মাঠের জলে সব একাকার। কলসি কাঁখে নদীর ঘাটে গিয়ে ভাবত সে মেয়ে—বেহুলার মতো ভাসান ভাসাবে বুড়িগঙ্গার জলে। নদী তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অন্তহীন সমুদ্রের বিপুল মোহনায়। কিন্তু আঠারো বছর বয়সটা যে’দিন এল, সে’দিন সে কলকাতার শহরতলীতে উদ্বাস্তু। বাপ বৃদ্ধ এবং পঙ্গু। মা ভিক্ষে করেন শহরের ফুটপাতে। চরিত্র কাকে বলে শেখার আগেই ছোট ভাইটি চরিত্রহীন। আর তখনই একদিন উদ্‌ভ্রান্ত বিপন্ন সহজ সরল শিক্ষাহীন অসহায় সে মেয়ে আবিষ্কার করল নিজেকে। এতদিন ছোট ছিল, চোখে পড়ে নি। আঠারো বছরের ‘এনলার্জ’ করা যৌবনে তাই বড়ো হয়ে ধরা পড়ল। বুঝল—সে কুৎসিত। শুধু মুখ নয়, হাত নয়, পায়ের পাতা নয়, শাড়ির আড়ালে ঢাকা সমস্ত শরীরটাই বিশ্রী কালো। কালো এবং অচল। প্রার্থী নেই, লোভাতুরও করুণা করে। অথচ আঠারো বছরের যৌবনটার ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে, স্বপ্ন দেখার চোখ আছে। অন্ধও কি স্বপ্ন দেখে না?

আর পৃথিবীর আরেক পারে ছিল একটি ছেলে। সমাজ-সংসার-মাটির সঙ্গে সম্পর্ক শূন্য, মার খেতে খেতে মার-খাবার অনুভূতি-রহিত, জীবনে ব্যর্থ, লাঞ্ছিত, অবজ্ঞাত, অপমানিত, ন্যাড়া কুকুরের মতো ছিন্নভিন্ন, ক্লিষ্ট এক যুবক।

হয়তো ভাবছেন রূপকথার গল্প ফেঁদে এ চিঠি অনর্থক দীর্ঘ করছি। কিংবা সেই চিরকালের মামুলি গল্প বানিয়ে একটি সস্তা গ্রাম্য প্রেমের কাহিনী বলছি আপনাকে। মাপ করবেন, এ গল্প নয়, গল্পের রসদ। এ কাঁচামালই আমার গল্প। আর প্রেমের কথা বলছেন? এ প্রেম নয়। প্রেম-টেম ওরা বোঝে না। সেসব ওদের আসে না। ওরা সেই সৃষ্টির প্রথম যুগের আদিম প্রাণী। ওরা শুধু বাঁচতে চায়; প্রয়োজন মেটাতে চায়। শুধু প্রয়োজন, বিলাস নয়। শীতের সন্ধ্যায় খোলা মাঠে ওরা উত্তাপ চায়, একজন আরেকজনের শরীরের লোনা-স্বাদ পেয়ে, দারুণ গ্রীষ্মে গাছের ছায়ায় শরীর জুড়োতে চায়। প্রচন্ড ক্ষুধা ওদের। ওরা ক্ষুধা মেটাতে চায়। ওরা পাহাড়ের ঝরনা হতে চেয়েছিল, পেয়েছে বুক-জ্বালা তৃষ্ণা। একজনের শরীর আরেকজনের শরীর চেয়েছিল শুধু সে-তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়োজনে।

কি করে মিলল ওরা, জানি না। বাইশ বছর বয়সের সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন পালাল। কলঙ্ক ছড়িয়ে রইল পেছনে। ছেলেটি কি বলল, জানি না। কি আশ্বাস দিল, তা-ও না।

ওরা ঘর বাঁধল কলকাতায়। আমার বাড়ির পাশে। প্রায় দু’শ বছরের পুরনো এক ভাঙাচোরা বাড়ি। যে ইটখোলা থেকে ফোর্ট উইলিঅম দুর্গের ইট সাপ্লাই হয়েছিল, বোধ হয় সেই একই কোম্পানির চিহ্ন পাওয়া যাবে এ প্রাসাদের ইটে। তবু সেটা ইটের দেয়ালে-ঘেরা আস্তানা। এই ওদের সান্ত্বনা।

আপনি এখানে আসেন নি। এলে ভয় পাবেন।

একতলার একটা ঘর। জানালা নেই একটাও। একটা সরু দরজা। যার চৌকাঠে কখনই আলো পড়ে না। না বিকেলে, না সকালে। হাওয়া আসে না। না বসন্তে, না বর্ষায়। অন্ধকার। সৃষ্টির প্রথম প্রভাত থেকে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত বিশাল প্রসার বনস্পতির ছায়ার মতো গাঢ় ঘন আরণ্যক অন্ধকার। সেই রূপহীন অন্ধকারের গভীরে এক হয়ে মিশে যাওয়া দুটি প্রাণ। প্রাগৈতিহাসিক গুহামানবের অপরিবর্তিত আদিম রূপ। নিশাচর বাদুড়, চামচিকে, বিষাক্ত ইঁদুর, হয়তো বা কোণের গর্তে কোথাও দু-একটা সাপও থাকতে পারে। সেই আদিম হিংস্র পাশবজীবনের মধ্যে পোড়-খাওয়া মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবন। ‘স্কাই-স্ক্র্যাপার’ চায়নি তারা, ‘টাইটেনিক’ নয়, ‘ইফেল টাওঅর’ও নয়, চাঁদে পাড়ি জমাবার সাধ তাদের নেই, না এভারেস্ট না আল্পস—পর্বতের চূড়ায় উঠে প্রভু হবার আকাঙ্ক্ষাও তাদের ছিল না। দুর্লভ মনুষ্যজন্মের দাবিতে শুধু সামান্য অধিকার তারা চেয়েছিল। মানুষের মতো বাঁচবার, সুখী হবার, ভালবাসবার অধিকার। কিছু না চেয়েও তারা পেয়েছে কূলহীন মরুভূমির তৃষ্ণা। আটলান্টিকের তলানি শূন্য করে সব জল ঢেলে দিলেও যে তৃষ্ণা মিটবে না। মেটে না।

না, ভুল হলো। অচরিতার্থ তৃষ্ণার বুকে মেয়েটির কিছু আকাঙ্ক্ষা ছিল। একটা রেলিং দেওয়া নিদেনপক্ষে দোতলা বাড়ির বারান্দা। যেখানে দাঁড়িয়ে পায়ের তলার মানুষ দেখবে সকাল-বিকেল সারাদিন। এবং একটি আরশি। সমস্ত শরীরের ছায়া পড়ে এমনি স্বচ্ছ মসৃণ ঝকঝকে একটি আরশি। কি সাহস দেখুন। সাহস না, স্পর্ধা। খোঁড়া নয়, হাত-কাটা নয়, বধির নয়, অন্ধও নয়—শক্ত সবল পুরোপুরি একটা পুরুষ মানুষ ওকে ভালোবেসেছে, যার শরীরের উত্তাপে এ-শরীর আগুন হয়ে জ্বলতে পেরেছে। অথচ ভুলে গেছে—আঠারো থেকে বাইশের মধ্যে দীর্ঘ চার বছরে এ-শরীরটা তিলে তিলে পুড়েছে। অবজ্ঞায়, উপেক্ষায়, অনাদারে অসহ্য হয়ে ঘৃণায় ধিক্কারে নিজেই নিজের খোলসের মধ্যে সেঁধিয়েছিল। আজ সে নারী, যৌবনে অভিষিক্ত। স্ত্রী হয়েছে, স্বামী পেয়েছে। আলোকিত রাজপথের যাবতীয় নারীর মতো এবার সে সুখ নিংড়ে নেবে জীবন থেকে। সেই কালো মেয়ে মা হবে পূর্ণগৌরবে। সাদা আর কালো—মা হবার নিয়মটা সব মেয়েমানুষের শরীরেই এক।

সে আনন্দেই মেয়েটি তার নিজের রূপ দেখতে চেয়েছিল। যে চোখে ওর পুরুষটি ওর দিকে তাকায়, সে চোখে নিজেকে দেখতে চেয়েছিল। তাই আরশি চেয়েছিল। গোটা শরীর প্রতিবিম্বিত হয়, এমন একটি আরশি।

আপনার হয়তো মনে আছে। এই সেদিন একটা ঝড় এসেছিল কলকাতায়। প্রচন্ড ঝড়। যে ঝড়ের পর আমি আপনি এবং কলকাতার অসংখ্য নাগরিক হঠাৎ আবিষ্কার করলাম—রাসবিহারী এভিন্যুতে যে এত সবুজ গাছ ছিল, জানতাম না এতদিন। সেই ঝড়ের বিকেলে শহরতলীর কোন একটা শহরে আটকে পড়েছিল আমাদের ট্রেন। যাচ্ছিলাম কোথাও। থার্ড-ক্লাস কামরা, গুমোট ভিড়, সময়ের অপচয়, শরীরের ক্লান্তি—সব কিছুর দাবিতে কোন এক সহযাত্রীর কাছ থেকে একখানা বাজার-মাৎ-করা সিনেমা পত্রিকা খুলে নিয়ে আপনার একটা বড়ো গল্প (উপন্যাস বলে বিজ্ঞাপিত) খুঁজে পেলাম। বিশ্বাস করুন—ছেলেবেলার রহস্য-রোমাঞ্চ পড়ার কৌতূহল নিয়েই আপনার সামাজিক গল্পটি শেষ করলাম। সত্যি, কি সুন্দর মিষ্টি প্রেমের গল্প। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম—আহা, এমনি সব সত্যি ঘটে না কেন ! তখন আমি এত বিভোর যে ভুলেই গিয়েছিলাম—আমি ক্লান্ত। বাইরের প্রকৃতি সর্বনাশা। এমনও হতে পারে যে, আপনার গল্প শেষ হবার আগেই ঝড়ের দাপটে রেল-ইঞ্জিনসুদ্ধু হুড়মুড় করে পড়ে এখানেই খতম হয়ে যেতে পারি। সেসব ভাবতে চাইনি। কি জানি, পাছে যদি আপনার মিষ্টি প্রেমের গল্পটির আমেজ কেটে যায়।

ঘরে ফিরে দেখি, আমার প্রতিবেশী মেয়েটি আমাদের ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আকুল হয়ে কাঁদছে। শক্ত দেয়ালে মাথা-ঠোকা আর আর্তনাদ। দেহবাস অসংবৃত। চৌকাঠে পা দিয়েই আমি বেরিয়ে এলাম (এখানে বলে রাখি, আমি মেয়েটির প্রভু। শুধু আমি নই, আমার মতো এ-পাড়ার সব ভদ্রলোক, সব বাড়িতেই মেয়েটির পরিচয়—সে ঝি। ঘর ঝাঁট দেয়, বাসন মাজে, কাপড় কাচে ইত্যাদি ইত্যাদি)। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, মেয়েটির কান্নার কারণ কি? কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে। রজনীগন্ধার বনে নয়, শ্মশানের উর্বর মাটিতে। আপনি কি মনে করেন—বিধ্বস্ত বাড়িটার ভগ্নস্তূপের তলায় থেঁতলে-যাওয়া পুরুষটার জন্য এ-কান্না? আসন্ন বৈধব্যের জন্যে এ শোক? আমার কি মনে হয় জানেন, মেয়েটি ওর স্বামীকে ভালোবাসতেই পারেনি কোনদিন। নষ্ট শশা, পচা চালকুমড়ার মতো এই মেয়েমানুষের শরীরটাকে যে পুরুষটি সবচেয়ে বেশি দাম দিয়েছিল, ভয়-ভক্তি-শ্রদ্ধায় সে-মানুষটার পায়ে মাথা মুড়ে দিয়েছিল মেয়েটি। কৃতজ্ঞতাবোধের তীব্রতা স্বামীকে ভালবাসার সুযোগই দেয়নি কোনদিন। তাই ও ভালবাসতে পেরেছিল একমাত্র ওই আরশিটাকে। যার মধ্যে সে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারত। নিজের প্রতি ঘৃণায় আর ধিক্কারে এতকাল যাকে ছি-ছি করে এসেছে, নিজেরই সে ঘৃণিত সত্তাকে বিদ্রূপ করতে পারত সেই আরশিতে। ঝড়ের পরে আজ আবার সে শূন্যতা, একাকিত্ব, ঘৃণাবোধ। বলুন তো বিরাট ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটা কাচ নিজেকে বাঁচাবে কি করে? মেয়েটির অপরাধ কি বলুন? আমরা যারা এতকাল ধরে ধর্ম-ধর্ম করে পাগল হয়েছি, যথাসর্বস্ব পণ করেছি ধর্মের নামে, তারাও কি ভালবাসতে পেরেছি আমাদের ঈশ্বরকে? ঈশ্বরকে ভয় করেছি, কিন্তু ভালবেসেছি মন্দির-মসজিদ, গির্জা, বেদ, বাইবেল, কোরান। গুরুজনের ভয়ে স্লেট-পেন্সিল নিয়ে যদিও বা বসেছি, শিখিনি কিছুই। শুধু ফাঁকি দিয়েছি। আমরাই কি কোনদিন দর্পণে দেখেছি নিজেদের মুখ? মেয়েটি তো ভাগ্যবতী। মেয়েটির শোকের ভাষায় আর্তনাদে ঈশ্বর ছিলেন। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ওর। ক্ষমা করবেন ওর নির্বুদ্ধিতাকে। অবোধ বালিকা। শুধু ও কেন, জুয়াড়ির ভাগ্যবিশ্বাসের মতো অটল যাদের ঈশ্বরবিশ্বাস, তারাও জানে না, ঈশ্বর নিজেই আজ কত অসহায়। বিশ্ব-জগত নামক বিরাট যন্ত্রটাকে যদি তিনি গড়েও থাকেন, তবু মানুষের হাতে তৈরি যন্ত্রের ওপর তাঁর আর কোন হাত নেই। ‘মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার ওই ভাঙা দরজাটা মেলাবেন।’ কিন্তু কই আর মেলালেন। ঝোড়ো হাওয়া তো আজও আসে, পোড়ো বাড়ি ভাঙে। মেহগনি কাঠের দরজাও কি আজ যথেষ্ট নিরাপদ?

মেয়েটিকে আমি আশ্রয় দিলাম। কি জানি কেন, মনে হল, আমার আশ্রয় ছাড়া ওর আর অন্য কোন পথ নেই। আমি কেরানী। পনের দিনের সংসার-খরচ সারা মাস খেটে ঘরে আনি। বধূ নয়, বিধবা বোন নয়, কিন্তু পরিবারের নতুন সদস্যা। উদারতা বা মানবতা কিছু নয়। মনে হল, এ আমার কর্তব্য।

আমি স্বপ্ন দেখলাম একদিন। অদ্ভুত স্বপ্ন। হয়তো অর্থহীন। কি করে জানি না, সময়ের ভাঁটার টানে হঠাৎ এক প্রত্নতত্ত্বের রহস্যালোকে চলে গেছি আমি। হাজার হাজার বছরের পুরনো এক ধূসর জগত। সভ্যতার শৈশবের দিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভগ্নস্তূপ নয়। মনে হল যেন সুদূরের সেই মিশরীয় সভ্যতার স্মৃতিস্মারক কোন এক মৃত নগরীর ভগ্নাবশেষের পথে একা চলেছি। জনশূন্য পথ, লোকালয়হীন নগরী। সূর্য আছে, বাতাস নেই। পায়ের নিচে এবড়ো-থেবড়ো পাথরের পথ, পথের বাঁক, অলিগলি। পথের ধারে সুদৃশ্য বিরাট বিশাল প্রাসাদ-ইমারতের ভগ্নস্তূপ, বড়ো-বড়ো খিলান, স্তম্ভ, ফোয়ারা, আকাশ ছোঁয়া সিঁড়ির ধাপ, ভাঙাচোরা যোদ্ধাপুরুষের প্রতিমূর্তি, বিলাসিনী নারী। ইতস্তর ছড়ানো অসংখ্য হীরা-জহরত, মরচে-ধরা তরবারি, বর্শা, ঢাল, শিরস্ত্রাণ, বিশালদেহী মানুষের কঙ্কাল। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে ভয় পেলাম আমি। আমার ক্ষিধে পেল। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। প্রতিধ্বনিতে নৈঃশব্দের অট্টহাসি ফেটে পড়ল চারদিকে। আমি পালাতে শুরু করলাম। ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে উঠলাম। এ-শহরের যেন শেষ নেই, এ-সীমাহীন স্তব্ধতাই যেন আমাকে গ্রাস করতে চায়। কিন্তু সামনে ধূসরতা। যতদূর যাই, পথ অনন্ত। দূর থেকে দূরে, অতীত থেকে অতীতে, ধূসর থেকে ধূসরতর জগতে পৌঁছে আমি থমকে দাঁড়ালাম। সামনে নদী। নদীর চড়ায় মস্ত এক কাঠের পুতুল। এমনি পুতুল নিয়ে আমি ছেলেবেলায় অনেক খেলেছি। ঠিক এই পুতুল। কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্পর্শ করলাম। পুতুল নয়, কোন এক অনাবিষ্কৃত মিশরীয় মমি। মমির পাশে পিরামিড। পিরামিডের দরজায় প্রহরী নেই, সান্ত্রী নেই—খোলা। ভয়ে-ভয়ে দেয়াল ঘেঁষে প্রবেশ করলাম। নীল আলো ঘরের ভেতর। দেখে চিৎকার করে উঠলাম। ঘৃণায়, লজ্জায়, আতঙ্কে ছিটকে বেরিয়ে এলাম। দুটো জীবন্ত প্রাণী। অনেকটা কোনর্কের সূর্য-মন্দিরের গায়ে খোদাই-করা রতি-দৃশ্যের ভঙ্গিতে একটি পুরুষ এবং একটি নারী। মুহূর্তে দুজনেই ফিরে তাকাল আমার দিকে। আমি সেই মুহূর্তে চিনে নিলাম। একটি স্বাস্থ্যবান বৃদ্ধ পুরুষ। আমি কি আমাকেই দেখলাম? কিংবা আমারই পূর্বপুরুষকে? আর ওই নারী, আমি কি ভুল দেখলাম! মুখের আদলে এতটা মিল হল কেন? যেন সেই মেয়েটি। এত বৃদ্ধা হল কেন? তবে কি ওর প্রপিতামহী কোন?

আমার ঘুম ভেঙে গেল।

স্বপ্নের শেষে মনে হল আমি ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত। একগ্লাস জলে গলা ভিজিয়ে নিয়ে আমি ছটফট করলাম অনেকক্ষণ। মনে হল—আশ্রিতাকে ভালো না বেসে উপায় নেই আমার। সে আমার বন্ধু, আমার একান্ত আপন। সমস্যা আমার অনেক, ওর সমস্যা আমার চেয়েও বেশি। আমি যন্ত্রণায় আহত, যন্ত্রণা ওর শরশয্যা। যদি বাঁচতে হয়, দুজনকেই বাঁচতে হবে, পরস্পরকে বাঁচাতে হবে। অনাত্মীয়ের সম্পর্ক নিয়ে হলেও কাছের মানুষ হয়।

কিন্তু আশ্চর্য কি জানেন? মেয়েটি আবার একদিন পালাল। আমার আশ্রয় ভাল লাগল না বলে। জীবনে একবার ও হাত-পা ছেড়ে স্বাধীনভাবে বাঁচবার স্বাদ পেয়েছে। ও বাঁচতে চায়। সামান্যতম অবজ্ঞাও এখন অসহ্য ওর কাছে। যেন ও নিজেও আজ বুঝতে পেরেছে—আমি ওর বন্ধু। আমার সঙ্গে ওর প্রীতি-বন্ধন সুন্দর করতে হলে ওকে মুক্ত হতে হবে, আমার সমান হতে হবে। ওর বেপরোয়া বাঁচার তাগিদকে দাবিয়ে রাখার শক্তি কারও নেই।

অনেকদিন ধরে কোন খবর পেলাম না ওর। অনুসন্ধানে জানলাম—কোন এক শক্তিমান সরকারী অফিসারের দোসর ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছে। ভাল চাকরি, ‘মহিলা আশ্রমে’ স্বাধীন জীবন। শুধু সেই অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে হবে একবার। তিনি ভালমানুষ, দেশনেতা, গরিবের ঈশ্বর। সহজ সরল বালিকা ওকে অবিশ্বাস করেনি।

এর পরের কাহিনী আপনি জানেন। সবাই জানে। দেশের সবগুলো পত্রিকায় ফলাও করে সে-কাহিনী বিবৃত হয়েছে। সরকারী অফিসের বড়বাবু। এ-যুগের কুলীন পুরুষ। তাঁর সামনে একটি গেঁয়ো মেয়ে। পটভূমি তৈরিই ছিল। ঘটনাটা ঘটতে সময় লাগেনি। একটা নয়, এমনি হাজার হাজার মেয়েকে আশ্রয় দেবার, চাকরি দেবার, লালন করবার ক্ষমতা তাঁর আছে। কিন্তু প্রতিদান দিতে হবে। দিতে হল। কালো কুৎসিত গেঁয়ো মেয়েটির শরীর একটা মেয়েমানুষের শরীর। সাহেবী কুকুর। হাউন্ড, স্প্যানিয়াল। পঁচিশ বছরের যৌবনটা নিঃশেষে নিংড়ে আঙুলের ডগায় নেমে-আসা পোড়া সিগারেটের মতো মেয়েটাকে একদিন ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

ঝড়ের চেয়েও প্রচন্ড এ শক্তি। মেয়েটির প্রতিরোধ টিঁকল না। এই অসহায়, দুর্বল মেয়েটির পক্ষে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। এ-প্রতিকারহীন অপরাধের অব্যর্থ শিকার তাকে হতেই হল। সাহেবী-কুকুর হাউন্ডের শেকল-হাতে সেই জাঁদরেল মানুষটিকে আগে থেকেই ঘৃণা করতাম। সে ঘৃণার মাত্রা একটু বাড়ল মাত্র। কিন্তু অফিসারটি উঁচুতলার মানুষ। সেখানে গিয়ে একটা আঁচড়ও কাটতে পারব না আমি।

তারপর বহুদিন মেয়েটির খবর পাইনি।

বলুন তো, কেন এমন হয়? বিজ্ঞান সত্য। বিজ্ঞান ধর্ম। কিন্তু এই কি সভ্যতার বিবর্তনের রূপ? ঠিক এমনি স্তরে পৌঁছনোর জন্যেই কি আমাদের প্রপিতামহ সভ্যতার নান্দীপাঠ করেছিলেন? মাঝে মাঝে খবর পাই, চাঁদের দেশে পাড়ি জমাবার আর বেশি দেরি নেই। গর্বিত হই, বিস্ময়ে ভাবি—মানুষ কত বড়ো। কত মহৎ। কি প্রচন্ড শক্তি নিয়ে জন্ম নিয়েছে আমাদের যুগ। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি ভগ্নাংশের এক অতি ক্ষুদ্র অংশ চার দেয়ালে-ঘেরা আমার ঘরে বসে আমি যখন আমার কথা ভাবি, বাঁচবার মতো সব উপকরণ হাতে পেয়েও যখন মেনে নিতে বাধ্য হই—হেরে যাচ্ছি, আমি ব্যর্থ, অসংখ্য আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু যখন আমাকে সত্যি একটা ‘সাকসেসফুল সুইসাইডের’ কথা চিন্তা করতে শেখায়, তখনই খটকা লাগে। মনে হয়, কত ছোট হয়ে যাচ্ছে মানুষ, কত অসহায়। হাত-পা ছড়িয়ে বড়ো হচ্ছি আমরা, ছোট হচ্ছি আমি। এ-যুগের এই কি লজিক? আপনার বাড়ির উঠোনটাকে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টায় আপনি যত বেশি ঝাঁট দেবেন, উঠোনের কোণে এক জায়গায় তত বেশি আবর্জনার স্তূপ তৈরি হবে। চকচকে উঠোনের দিকে তাকিয়ে আপনি যদি মুগ্ধ হন, জানবেন, যে দূষিত বাতাস আপনার নিঃশ্বাসকে বিষাক্ত করছে, তার স্রষ্টা আপনি স্বয়ং। ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’—তবু এই পৃথিবীর কাছেই মানুষের অফুরন্ত ঋণ। আমার জীবনদানের ঋণ পরিশোধ করতেই আমি বাঁচতে চাই। সেই মেয়েটিও বাঁচতে চেয়েছিল তার সঙ্গত দাবিতেই।

সেই মেয়েটিকে আবার আমি খুঁজে পেলাম একদিন, বলতে পারেন, আবিষ্কার করলাম। হাওড়া ব্রিজের নিচে, জটলার মধ্যে। উলঙ্গ, সম্পূর্ণ উলঙ্গ। চোখে-মুখে কালিঝুলি মাটি, চুলে জট। অকথ্য অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার করছে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে। ওকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের ভিড়, রীতিমত একটা জনতা। ধুতি-পাঞ্জাবি আর কোট-প্যান্টের শিক্ষিত ভদ্রবাবুদের সংখ্যাই বেশি। বন্য-উল্লাসে উত্তেজিত, যেন ঘোড়দৌড়ের নেশায় পেয়েছে তাদের। বাহবা দিচ্ছে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বিব্রত করছে মেয়েটিকে। করবে না কেন? পঁচিশ বছরের যুবতীর প্রকাশ্য নগ্নতাকে উপভোগ করে সস্তা মজা লুটবার সুযোগ তারা কেন ছাড়বে? অবচেতনার খাঁচায় আমরা সবাই একটা করে বিষাক্ত সাপ পুষছি। সামান্য উত্তেজনায় সেটা ফণা তুলতে চায় (সে খাঁচায় পাখি পুষতেন আমাদের পূর্বপুরুষ)।

কিন্তু এই কি পরিণাম? এই কি আমাদের মানুষ হবার সাধনা? আপনি গুণী। এবং উদার। আকাশের মতো উদার আপনার হৃদয়। আপনি নিশ্চয়ই অনুভব করবেন এ-যন্ত্রণা, এ-বেদনা। আপনি ওদের ক্ষুধাকে সংযত করতে বলুন। ওদের মানুষ হতে বলুন, ওদের সভ্য হতে বলুন।



(মূল বানান অপরিবর্তিত)


------------------------------



গল্পটি শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রের কাছ থেকে পাওয়া।


                                                                             



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন