বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

সায়ন্তনী ভট্টাচার্যে'র গল্প: যারা টানটান শুয়ে থাকে


-‘ও উচ্ছে, কী খবর?
 -‘আর খবর! এই চলে যাচ্ছে’। 
-‘আয় আয়, পাশে বোস। কদ্দিন পাশে বসিসনি’। 
-‘নাহ, উঠতে ইচ্ছে করছে না। একটু জিরিয়ে নিতে দাও’।  
-‘কখন থেকেই তো শুয়ে আছিস’!


-‘কোথায় কখন থেকে? সবেমাত্র এক ঘন্টা হলো। সেই সকালে বর্ধমান থেকে ট্রেনে উঠলাম। উরিব্বাস, কী ভিড় কী ভিড়। কোনওরকমে শরীর গলিয়ে দিলাম। কটা বাজে তখন? সাড়ে ছটা হবে। ট্রেন একটু লেট করেছিলো। তো নানারকমের লোক, নানারকমের কিচিরমিচির। সেসব শুনছিলাম’।
-‘কিচিরমিচির শুনলে নিজের কাজটা করবি কখন’?
-‘আহা কিচিরমিচির শুনতে শুনতেই কাজ করছিলাম গো। কাঁধে ফ্যাকাশে ঝোলা ব্যাগ…’
‘দুর দুর, ফ্যাকাশে আবার কোনও রং হলো? বর্ণনা দিবি যখন, ঠিকমতো দে। ঝোলা ব্যাগের রং ফ্যাকাশে বললে কিছুই বোঝা যায় না’।
-‘তুমি না হিঞ্চেদা, মাইরি, কথার মাঝখানে ফুট কেটে মেজাজটাই খারাপ করে দাও’।
-‘আহা মেজাজ খারাপ করলে চলবে না তো বাপ। মেজাজ খারাপ মানেই মাথাও খারাপ। আর মাথা খারাপ হলেই উলটোপাল্টা কাজ-কারবার। আচ্ছা আর বাধা দেবো না। তুই বল’।
-‘ব্যাগের রং ফ্যাকাশে মানে আমি বলতে চাইছি ব্যাগের আসলে কোনও রং নেই। কাপড়ের ব্যাগ। সেই বছর দশেক আগে কেনা। যখন কিনেছিলাম তখন সবজে সবজে রং ছিলো। এখন সে রং উঠে গেছে। আমাদের জীবন থেকেও তো রং উঠে গেছে, কী বলো হিঞ্চেদা, হা হা হা’।

উচ্ছের কথা শুনে হিঞ্চেও হেসে ফেলে। পাশের ঝুঁকে থাকা কালোজামের গাছও হেসে নেয় ফিক করে। একটু দূরেই পার্কস্ট্রিট। শহর জমজমাট হয়ে আছে। মানুষকে পাতালে নামিয়ে ট্রেন হুশ করে কেটে পড়ছে। মানুষ পাতাল থেকে হাঁচোর-পাঁচোর করে ওপরে উঠছে। একবার নামলে ওঠা যে কতটা কঠিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। পাতালের অন্ধকার থেকে আকাশে চোখ পড়লেই ‘মুক্তি’, ‘মুক্তি’ বলে উল্লাসে ফেটে পড়ছে। বাস থেকে ঝুলে ঝুলে কাজে যাওয়া মানুষগুলো তাদের উল্লাস দেখছে। ঝুলে ঝুলে কাজ থেকে ফেরা মানুষেরাও জীবনে ঝুলে থাকার অবদান অস্বীকার করতে পারছে না। সেই কবে থেকে মানুষ জাতটাই ঝুলে আছে। এবার দড়ির ফাঁস গলায় বেঁধে নিলেই হলো। ল্যাটা চুকে যায়।

হিঞ্চে বললো, ‘শেষ কর, শেষ কর। ট্রেনের গল্পটা শেষ কর’।

উচ্ছে শুয়ে শুয়েই ঠ্যাং নাচাচ্ছিলো। বললো, ‘তো ডান কাঁধে ফ্যাকাশে ঝোলা ব্যাগ, বাঁ হাত দিয়ে বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরা লজেন্সের প্যাকেট। খোনা গলায় লজেন্স লজেন্স হাঁকতে হাঁকতে আমি লজেন্স বেচছিলাম’।

- ‘আহা লজেন্স লজেন্স হাঁকতে হাঁকতে তো আর সাবান বেচবি না। তারপর কি হলো’?
-‘তারপর আর কি? ওই বেচতে বেচতে এ কামরা, সে কামরা। স্টেশনে নেমে কামরা বদল। রোজ যেমন করি। গরমটাও পড়েছে মাইরি। ঘামে আমার এই হলদে গেঞ্জিটা একেবারে ভিজে জবজবে হয়ে গেলো’।
-‘এমনিতেও গেঞ্জিটা কেমন গু গু দেখতে’।
-‘হিঞ্চেদা তুমি ভারি বাজে বকো’।
-‘আচ্ছা আচ্ছা তারপর কি হলো বল’।
-‘তারপর আর কি। বিক্রিবাট্টা তেমন হচ্ছিলো না। মেজাজ খিঁচড়ে ছিলো। এমনসময় ভেন্ডারের পাশের কামরায় এক ফিটফাট অফিসবাবুর পকেট কাটলো কেউ। তাই নিয়ে হল্লা। হল্লা করে আর কি হবে? ততক্ষণে পকেটমার হাওয়া’।
উচ্ছের কথা শুনে মুখে বেশ আহ্লাদী হাসি নিয়ে জামগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসে থাকা লোকটা বললো, ‘ট্রেনের সেই পকেটমার আমিই ছিলাম’।

উচ্ছে আর হিঞ্চে দুজনেই লোকটার দিকে তাকালো। হিঞ্চে বললো, ‘বলো কি করোলা’?

করোলার মুখে অমায়িক হাসি। বললো, ‘হ্যাঁগো হিঞ্চেদা। ওই পকেটমারিটা আমার অবদান। প্যান্টের পেছনের পকেটে মানিব্যাগ ছিলো। টুপুস করে তুলে নিয়েছি। আজতো হদ্দ ভিড়। ভিড়ে পকেটমারি সোজা। উচ্ছেদা লজেন্স বিক্রি করছিলো তখন। আমি উচ্ছেদাকে দেখেছি। উচ্ছেদা আমায় দ্যাখেনি’।

করোলার মুখে গর্বের ভাব। হবে নাই বা কেন? ভিড়ের মধ্যে লোকাল ট্রেনে পকেটমারি করে কেটে পড়েছে। এলেম না থাকলে হয়? হিঞ্চে বললো, ‘বাহ বাহ করোলা, আজ তো তুমি কামাল করে দিয়েছো। মাঝেও তো একদিন পকেট থেকে মোবাইল তুলে নিতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়ে পেটানি খেয়েছিলে। তবে আজ ধরা পড়োনি’।

করোলা দুঃখ দুঃখ মুখ করে বললো, ‘সে হিঞ্চেদা যেদিন কপালে পাবলিকের প্যাদানি লেখা থাকবে, সেদিন প্যাদানি খেতেই হবে। কোনও শালা আটকাতে পারবে না। তবে আজ সকাল থেকেই বাঁ কান নাচছিলো। তখনই বুঝেছি, যে কাজে নামবো, সেই কাজেই আজ সফল হবো’।

উচ্ছে একটু উৎসুক হলো। করোলার দিকে তাকাতে চাইলো। এতক্ষণ আকাশের দিকে চোখ করে ঠ্যাং-এর ওপর ঠ্যাং তুলে কথাবার্তা হচ্ছিলো। হিঞ্চের মুখ দেখার জন্য উচ্ছের আগ্রহ ছিলো না। ও মুখে দেখার আছেটাই বা কী! থ্যাবড়া মতো মুখ, চোখদুটো গর্তে সেঁধোতে সেঁধোতে কোথায় যে ঢুকেছে, কপাল-গাল তেলতেলে, ঠোঁটদুটো পুরু আর মোটা, আবলুশ কাঠের মতো রং। এছাড়া থাকার মধ্যে আছে থলথলে একটা ভুঁড়ি। সে ভুঁড়ির এমন কীর্তি যে থেকে থেকে হিঞ্চের প্যান্ট নেমে যায়, গেঞ্জি উঠে যায়, বিতিকিচ্ছিরি নাভিটা বেরিয়ে পড়ে। ফলে কথা চালানোর সময় যেহেতু এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই যে হিঞ্চের দিকে তাকাতেই হবে, তার খোলতাই রূপ চাক্ষুস করতেই হবে, তাই উচ্ছে আকাশ দেখছিলো। আকাশ একটা দেখবার মতো জিনিস বটে। শুরু নেই, শেষ নেই। আকাশ কী, আকাশ কেন ভাবলেই মাথা গুবলেট হয়ে যায়। কিন্তু এখন সেই আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে করোলার শ্রীমুখের পানে তাকাবে বলে উচ্ছে খুব সাবধানে কাত হলো। বেশ গাছপালা, সবুজ ঘাসে ঘেরা ময়দান। কোথাও ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে, তো কোথাও ফুটবলের প্র্যাকটিস। সেই ময়দানেই সিমেন্টের বাঁধানো চওড়া রেলিং-এ শুয়ে আছে উচ্ছে। সাবধানে কাত না হলে মাটিতে পড়ে যেতে পারে। অবশ্য মাটিতে ঘাস। পড়লে লাগবে না। তবু পড়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। কারই বা থাকে? ওঠার ইচ্ছা থাকে, পড়ার ইচ্ছা মোটেই থাকে না।

করোলাও উচ্ছের কাত হওয়া দেখছিলো। শুধু কাত হওয়াই নয়, দেখছিলো আরো অনেক কিছুই। পাশের ঝকঝকে পিচ রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া বাস, গাড়ি, একটু দূরে মেঘের মধ্যে দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা হাইরাইজ, ট্রাফিক পুলিশ, ভিক্টোরিয়ার পরী, কোনওকিছু বাদ দিচ্ছিলো না করোলা। আহা দেখাটাই তো সব। দেখার মতো করে দেখতে না জানলে জীবনটাই মাটি। এসবের সঙ্গে অবশ্য উচ্ছের কাত হওয়াও দেখছিলো।

উচ্ছে কাত হয়েও পড়লো না। পড়লো না বলেই তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো। গলার স্বরে বেশ কৌতুহল ফুটিয়ে উচ্ছে বললো, ‘ডান চোখ নাচা, বাঁ চোখ নাচা, একশালিক দেখা, বেড়ালের রাস্তা কাটা এসব শুনেছি। কিন্তু বাঁ কান নাচাটা কী জিনিস’?

করোলা বললো, ‘আমাদের পকেটমারি লাইনে বাঁ কান নাচাকে শুভ লক্ষণ হিসাবে ধরা হয় আর ডান কান নাচাকে অলক্ষণ’।

হিঞ্চে এতক্ষণ চুপ করে ছিলো। এখন বললো, ‘যাহ, গুল মেরো না করোলা’।

- ‘না না গুল মারছি না হিঞ্চেদা। বাঁ কান নাচা মানে তোমার কাজ হাসিল হবেই হবে। আমার পকেটমারির শিক্ষা যে ধলুওস্তাদের কাছে, সেই ধলুওস্তাদ এটা খুব মানতো। আমিও মানি। বাকি কিছু মানি না। কিন্তু বাঁ কান আর ডান কানের নাচানাচি মানি। ডান কান নাচলে পারতপক্ষে আমি কাজে নামি না। তবে হিঞ্চেদা আজকে যে মানিব্যাগটা হাতসাফাই করলাম তাতে ছিলো মোটে শ দুয়েক টাকা, শ্রীদেবীর একখানা ছবি আর খুচড়ো পঁচিশ টাকা। এটুকুর জন্য এত খাটনি পোষায় বলো’?

হিঞ্চে চুপ করে ভাবছিলো। চোখ নাচার ব্যাপারটা ঠিক। কিন্তু কান কি নাচে? কানের পক্ষে কি নাচানাচি সম্ভব? করবে না করবে না করে করেই ফেললো প্রশ্নটা।

- ‘বাবা করোলা, কান কেমন করে নাচে’?

করোলা ঢলঢলে হাসি হেসে বললো, ‘তুমি বড্ড সরল হিঞ্চেদা, কিছুই বোঝো না। এই ধরো এখন তোমার কানে ফিসফিস করে সুন্দর মতো একটা মেয়ে, যার ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল, মাখনের মতো চামড়া...’

মাখনের মতো চামড়া শুনেই উচ্ছে সুরুত করে জিভ থেকে বেরিয়ে মাটি স্পর্শ করতে চাওয়া জলকে ফের ভেতরে টেনে নিলো। মাখন জিনিসটা মাইরি হেব্বি খেতে। মাখনের কথা শুনলেই উচ্ছের মাখন পায়। ওই যেমন কারোর প্রেম পায়, কারোর পায়খানা পায়, তেমন উচ্ছের মাখন পায়।

করোলা বললো, ‘তো তেমন সুন্দর মতো মেয়ে যদি তোমার কানে ফিসফিস করে বলে আমি তোমাকে ভালোবাসি হিঞ্চে, আই লাআআআব ইউ। তখন তোমার বাঁ কান নেচে উঠবে না? তবে হ্যাঁ, কথাটা বাঁ কানেই বলতে হবে। ডাক্তারবাবুরা বলেন বাঁ দিকেই হার্ট থাকে। কান থেকেই কথাখানা হার্টে সেঁধোবে। তো ভালো কথা শুনলে বাঁ কান নাচবে আর কুচ্ছিত, খারাপ কথা শুনলে ডান কান। বাঁ কান নাচলে মন উলু দিয়ে উঠবে। মানে যে কাজ করতে নামছো তাতে মনের সায় পাবে। বুঝলে কিনা’? হিঞ্চে একখানা মিটমিটে হাসি দিলো।

উচ্ছে বললো, ‘আমি লজেন্স বেচলাম, করোলা পকেটমারি করলো, কিন্তু এই যে বেলা দুটো বাজলো, তা সকাল থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত তুমি কী করলে হিঞ্চেদা? সে গল্পটা শুরু করো দেখি’।

হিঞ্চে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
কলকাতা শহর এসময় ফটাসফট করে নড়ে উঠলো। আহা নড়ে উঠবার যথেষ্ট কারণ আছে যে। শহর এত আবর্জনায় ভরে গেছে, মানুষেরও কোনও নিয়ম-নীতি নেই গো, যা পারছে তাই করছে, আর মুখের ভাষার কী ছিরি! গালি দিয়ে ছাড়া কেউ কথা বলছে না। এখানে-ওখানে খাঁচার মতো বাড়িগুলো ঢ্যাঙা হয়ে শহরের হাওয়া খেয়ে ফেলছে। গাছগুলোও শুকোতে শুকোতে মরে যাচ্ছে। শহরটা বাঁচবে তো? অবশ্য এই পার্কস্ট্রিট, ময়দান, ভিক্টোরিয়া, এ জায়গাটা ভারী সুন্দর সাজানো, গাছে ভরা। রাতে আবার নীল-সাদা চকমকি আলো জ্বলে, পুজোর ভাসানের আলো। শহরটাই ভাসান যেতে বসেছে তাই ভাসানের আলোর বাড়বাড়ন্ত। তো এসব দেখেশুনে দুঃখ হলে শহর নড়ে-চড়ে ওঠে। সবাই শহরের এই নড়ে ওঠা টের পায় না। কিন্তু হিঞ্চে পেলো। শহরের মতো তারও ভাসানের সময় হয়েছে। যে কোনও দিন ফুটে যাবে। আর ফুটে গেলে যে আর কোনওদিন ফিরে আসা হবে না সে কে না জানে? ফিসফিস করে বললো, ‘আমি আর কি করব রে উচ্ছে, রোজ যা করি আজও তাই করলাম। পাঁচটা বাজতে উঠে পড়লাম। স্নান করলাম। পান্তা খেয়ে ঢেঁকুর তুললাম। শরীরে জামা-প্যান্ট গলিয়ে, কাঁধের ব্যাগে ব্যাথানাশক বজ্রবাম আর হাতের ব্যাগে শেকড়বাকড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ট্রেন ধরলাম। ট্রেনে বজ্রবামের গুণকীর্তন করলাম। ও দাদাভাই, দিদিভাই, মা, বোন, দাদা, ও দাদু, ও দিদা, এই আমি এসে গেছি ব্যথানাশক বজ্রবাম নিয়ে। সব ব্যথা নিরাময়ে অর্বথ্য এই বজ্রবাম। ব্যথার জায়গায় নিয়ম করে সাতদিন এই বাম মালিশ করুন, দেখবেন ব্যথা গায়েব। বেশি দাম নয়। একটা ব্জ্রবামের কৌটো মাত্র তিরিশ টাকা’।

উঠে বসতে বসতে শব্দ করে হেসে ফেললো উচ্ছে। বললো, ‘মাইরি পাবলিককে টুপি পরাতে তোমার জুরি নেই’।

হিঞ্চেও দুঃখমার্কা হাসি দিলো। এছাড়া আর কি করে হিঞ্চে? করতো বসিরহাটের কাপড়ের দোকানে শাড়ি বিক্রির কাজ। চুরির অপবাদে কাজ গেলো। চুরি করেছিলো মালিকের শালা। কিন্তু সে শালা এমনই শালাখচ্চর যে ধরা পড়তে দিব্য দোষী করলো হিঞ্চেকে। হিঞ্চের কাজ গেলো। চোর তকমা নিয়ে হিঞ্চে আর কোনও দোকানে কাজও পেলো না। কিন্তু পেট চালাতে হবে তো। সাতচল্লিশের হিঞ্চে পেটে ভাত যোগানোর চিন্তায় কেমন নড়বড়ে হয়ে গেলো। বাড়িতে তিনটে ছেলেমেয়ে, বৌ, মা, বোন। তিনবেলা তারা ভাত খায়। চাল লাগে মাসে পঞ্চাশ কিলোর বেশি। চালের খরচ যোগাতেই তো ফতুর হওয়ার যোগাড়। শেষে শুরু করলো এই বজ্রবাম আর শেকড়-বাকড় বেচা। বজ্রবামের একটা কৌটো বিক্রি করলে দশ টাকা লাভ থাকে। বনগাঁ থেকে মাল তোলে আর শিয়ালদা লাইনে বেচে। চাঁদনি, ধর্মতলাতেও এসে বসে শেকড় আর বজ্রবামের কৌটো সাজিয়ে। এদিকে বারোভজা লোকজন। শেকড় বিকিয়ে যায়। বামের কৌটোও বিকোয়। রাতে যখন বাড়ি ফেরে হিঞ্চে, সমস্ত শরীর সারাদিনের খাটনির ক্লান্তিতে অসহ্য ব্যথায় ছটফট করে। বজ্রবাম সে ব্যথা কমাতে পারে না। ব্যথাতেও জীবনের রকমসকম দেখে ফিকফিকে হাসি হাসে হিঞ্চে। আনন্দ-দুঃখ-হাসি-কান্না-ব্যথা-আরামের পসরা সাজিয়ে বসে আছে জীবন। হিঞ্চে ডাক দেয়, ‘ও জীবনদা। কই গেলে গো’?

জীবন উত্তর দেয়, ‘আছি তো’।

-‘টের পাইনা কেন’?
-‘ব্যথা টের পাও’?
-‘তা পাই’।
-‘তাহলে ওটাই তো আমি, ওটাই তো জীবন’।
-‘তাই নাকি? আর’?
-‘আনন্দ টের পাও’?
‘আনন্দ খুব কম হয়। এই যেমন বড় মেয়েটার মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো যেদিন, স্টার পেয়ে পাশ করলো, সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিলো’।
-‘তাহলে ওই আনন্দটাই আমি, ওটাই তো জীবন’।
-‘তাই নাকি? আর’?
-‘বুকে মোচড় দেওয়া কষ্ট টের পাও’?
‘তা পাই। হামেশাই পাই। ছোট ছেলেটা মেলা থেকে একটা খেলনা চেয়েছিলো। কিনে দিতে পারলাম না। হাত খালি ছিলো, কিনবো কি করে? তখন বুকে মোচড় দিয়ে কষ্টের বান ডাকলো’।
- ‘তাহলে ওটাই আমি, ওটাই তো জীবন’।

জীবনের সঙ্গে এমন কথাবার্তা রোজ চলতে থাকে। হিঞ্চে ব্যথানাশক বজ্রবাম বিক্রি করতে করতে জীবনকে চিনে নেয়।

হিঞ্চে মুখ ভার করে থাকলে আবার উচ্ছের সহ্য হয় না। কথা ঘোরাতে বলে, ‘ও হিঞ্চেদা, তিনটে তো বাজতে চললো। এখনো নিমপাতাদি এলো না কেন বলোতো? খিদেয় যে পেট চুঁইচুঁই করছে’।

তাইতো, নিমপাতাদি এখনও এলোনা কেন? করোলা, হিঞ্চে দুজনেই একটু উশখুশ করে উঠলো।

নিমপাতা একটু ঝুঁকে, একটু খুঁড়িয়ে হেঁটে আসছিলো। সাদা চুলে লিকলিকে বিনুনি, মুখের চামড়া ঢিলে হয়ে ঝুলে পড়তে চাইছে, ছাই রঙের ঢোলা ফতুয়া আর প্যান্টে নিমপাতাকে অদ্ভুত দেখতে লাগছে। গাছের ছায়ায় পা রেখে আসতে আসতে অপরাধবোধে ভুগছিলো নিমপাতা। কে না জানে, ছায়াই সব! মানুষের ছায়া মানুষকে ছেড়ে চলে গেলে, সে তখন বেঁচে থেকেও মৃত। গাছের ক্ষেত্রেও তো সেই এক কথা খাটে। তো সেই গাছের ছায়া মাড়িয়ে হাঁটছে নিমপাতা, তা কি অপরাধ নয়? কিন্তু কী আর করবে? রোদ্দুরের বড় তেজ। সে তেজে শরীর যেন ঝাঁঝরা হয়ে যায়। গোটা রাজপথ রোদ্দুরে মেখে আছে। রাজপথ দিয়ে না হেঁটে তাই গাছের ছায়া মাড়িয়েই ফুটপাথ ধরে হেঁটে আসা। আবার রোদ না থাকলে ছায়াও নেই, সেটাও একটা কথা। নিমপাতা ফিসফিস করে বলে, ‘তোমার ছায়ায় পা রাখছি বলে কষ্ট পেও না গাছ। আমি তোমাকে ভালোবাসি’।

গাছ উত্তর দিলো না। মানুষের কথার উত্তর সে দেয় না। ভালো লাগে না।

নিমপাতা এসে বসতেই হিঞ্চে, উচ্ছে, করোলারা খুশি হয়ে গেলো। উচ্ছে অভিমান করে বললো, ‘আজ বড্ড দেরি করে এলে নিমপাতাদি’।

নিমপাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে একা জীবন কাটায়। অবশ্য ঠিক একা না, বস্তির ঘরে একটা বেড়াল আর তিনটে মুনিয়া পাখি আছে। কিন্তু তারা কেউ প্রশ্ন করে না, গলায় অভিমান ফুটিয়ে বলে না যে আজ দেরি হলো কেন? কাঁধের ব্যাগ থেকে জলের বোতল আর টিফিন কৌটো বের করতে করতে নিমপাতা বলে, ‘আজ শিফট শেষ হতে লেট হলো। শপিং মলে আজ হেব্বি ভিড়। তোরা তো জানিস আমি শপিং মলের ঝাঁড়ুদারনি। তো যত লোক, তত নোংরা। আমি নোংরা সাফাই করতে করতে, ঝাঁড়ু মারতে মারতে দেখি দুটো বেজে গেছে। দ্যাখ না, আজ ঝাঁড়ুদারনির পোশাক না বদলেই চলে এসেছি। এই ঢোলা ফতুয়া আর ঢোলা প্যান্ট বদলে যে শাড়ি পরব সেটুকুও সময় পাইনি। জানি তোরা সব অপেক্ষা করবি। তারপর আবার কি হয়েছে জানিস, ঝাঁড়ু দিতে দিতে এমন অভ্যাস হয়েছে, পথে পড়ে থাকা সব চিপসের প্যাকেট, পলিথিনের ঠোঙা, হাবিজাবি ময়লা কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতে আসি। তাতেও একটু দেরি হয় আরকি। তা বাকিরা কই’?

বাকিরাও একে একে এসে পড়ছিলো। ঘাসের ওপরে গোল করে বসছিলো সব। কলকল কলকল করে নানারকম কথা বলছে। ঘাসেদের ভারী মজা, তারাও শুনছে এদের কথাবার্তা। দু-একটা পুলিশ-ঘোড়াও ঘাস খেতে খেতে এদের দিকে দেখছে। নানা বয়সের নারী-পুরুষের প্রায় জনাকুড়ির দলে কিচিরমিচির। জামগাছে বসে থাকা ঘুঘু এদের কিচিরমিচিরে একটু আরাম পেলো। এমনিতে তো শহর থেকে পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায়, কয়েকটা ঘুঘু, কাক, চড়ুই টিকে আছে কোনওরকমে। পাখি নেই, তাই কিচিরমিচিরও নেই। মানুষের কিচিরমিচিরে পাখিদের কিচিরমিচিরের ছাপ খুঁজতে খুঁজতে ঘুঘুও দুবার ডেকে নিলো। হিঞ্চে, উচ্ছে, করোলা, নিমপাতা, গিমে, পলতা, থানকুনি, তেতোশাক, ত্রিফলা কতসব নামের বাহার। সবাই নিজের নিজের টিফিন বাক্স খুলে খাবার বের করে মাঝখানে রাখলো। তারপর সব খাবার মিলিয়েমিশিয়ে খাওয়া শুরু হলো। কেউ এনেছে তেলেভাজা-মুড়ি, কেউ ঘুগনি-পাঁউরুটি, কেউ রুটি-আলুর তরকারি। সবাই সবারটা খাচ্ছিলো। কোনও বাছবিছার নেই। কাজের কথাবার্তা হচ্ছিলো। সারাদিন কে কি করেছে তার গল্প শোনাচ্ছিলো, হাসি-ঠাট্টাও হচ্ছিলো। ময়দানের গাছেরা এসময় হাওয়া দিলো। ভেজা হাওয়া। সেই হাওয়া গায়ে মেখে সবাই খাওয়া-দাওয়া, গল্পে মেতে উঠলো।
খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় টিঙটিঙে লম্বা, রোগা একটা ছেলে এসে দাঁড়ালো। বললো, ‘আমি তোমাদের দলে সামিল হতে চাই। আমাকে নেবে’?

হিঞ্চে ছেলেটাকে দেখছিলো। মুখের মধ্যে দুঃখী ভাব আছে। অন্তত দু দিন এর পেটে কিছু পড়েনি। হিঞ্চে বললো, ‘তুমি কে’?

-‘আমি একটা ছেলে। ঊনিশ বছর বয়েস। বাপ-মা মরেছে। দাদারা বাড়ি থেকে খেদিয়ে দিলো। শহরে এসেছি। কিছুই চিনি না শহরের। পেটে বিদ্যে নেই। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছিলাম। বাবা দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজাতো, চাষ করতো বছরের বাকি সময়। ভাগের চাষ। দিন চলে যেত। বাবা মরতে সব বদলে গেলো। সংসারে রোজ ঝামেলা। হাঁড়ি আলাদা হলো। তারপর মা মরলো। আমি একা হয়ে গেলাম। আমার ভার কেউ নিল না। ঘুরতে ঘুরতে শহরে এসেছি। রোজ দেখি দুপুর-দুপুর তোমরা জড়ো হও, আবার বিকেল সন্ধের দিকে ঝুঁকলেই, যে যার পথ ধরো। আমাকে নেবে তোমাদের দলে’?

নিমপাতা বলে, ‘তার আগে এখনো যে এই একটু রুটি-তরকারি পড়ে আছে, খাও’।

তাই খায় টিঙটিঙে ছেলে। হাপুশ-হুপুশ করে খায়।

খাওয়া শেষ হলে উচ্ছে বলে, ‘বাঁচতে হলে তো কাজ যোগাড় করতে হবে। ঠিকাছে, লজেন্স বিক্রি করো নাহয়। আমি ব্যবস্থা করে দেবো’।

টিঙটিঙে ঘাড় কাত করে। বলে, ‘আমাকে বাঁচালে তোমরা’।

করোলা বলে, ‘কিন্তু মাথা গুঁজবে কোথায়’?

নিমপাতা বলে, ‘আমার বিয়ে হয়ে ছেলেপুলে হলে, তোমার বয়েসীই হতো। তুমি নাহয় আমার ঘরেই থেকো’।

টিঙটিঙে ছেলে কেঁদে ফেলে। অমন টিঙটিঙের এত কান্না থাকতে পারে কে জানতো? বলে, ‘তাহলে কি আমি তোমাদের দলে ঢুকে পড়লাম’?

হিঞ্চে একটু কেশে নিয়ে বলে, ‘তার আগে আমাদের দলের শুরুর কথা জেনে নাও। এ দলে যারা আছে সবার জীবনে দুঃখ আছে, কান্না আছে, কষ্ট আছে। গরীবগুরবো মানুষ আমরা। খেটে খাই। কেউ কেউ আবার পকেটমারিও করে’।

করোলা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলে, ‘পকেটমারি এবার ছেড়ে দেবো হিঞ্চেদা’।

হিঞ্চে হেসে বলে, ‘তো আমরা কেউ কারোকে আসল নামে ডাকি না, কেউ উচ্ছে, কেউ করোলা, কেউ নিমপাতা, কেউ তেতোশাক এসব নামে ডাকি। কাছাকাছি সব কাজটাজ করি। আমাদের জাত নেই, ধর্ম নেই, নামের শেষে পদবী নেই। দুপুর বেলা দু-এক ঘন্টা কাজ থেকে ছুটি হয় বা আমরা নিজেরাই নিজেদের কাজ থেকে ছুটি নিই আর তারপর এই ময়দানে এসে সব জড়ো হই। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাই, সুখ-দুঃখের গল্প করি। কেউ দুঃখ করে বলে, আজ আমার কাছে কেউ জুতো সারাতে আসেনি গো, কেউ বলে আজ আমার একটাও বাদামচাক বিক্রি হয়নি, কেউ বলে একলা থাকতে কত কষ্ট, কেউ বলে বাড়িতে ছেলের অসুখ। আবার সুখের গল্পও হয়, ছেলে ভালো পাশ দিয়েছে বা মেয়ের ভালো বিয়ে হয়েছে, কেউ বলে মেয়ের ভালো কাজ হয়েছে। তো এভাবে জীবন চলে যায়। আমরা দুপুরে জড়ো হই। জীবনকে সহজ করার চেষ্টা করি। বিকেলে আবার যে যার কাজে ফিরে যাই। আবার পরদিন আসি। সবাই মিলেমিশে ভাগ করে টিফিন খাই। এই ময়দানেই আমাদের পরিচয়। এখানকার গাছপালা, পাখিরা আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ত্ব করিয়ে দিয়েছে। এই হলো আমাদের দল। দল রোজ বাড়ছে। বাড়ুক। আমরাও তো তাই চাই। এ দল ভালোবাসার দল’।

টিঙটিঙে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। ঘোর লাগা গলায় বলে, ‘তোমরা কে গো? কেমন মানুষ? তোমরা এ পৃথিবীর কেউ’?
সবাই একসঙ্গে বলে, ‘আমরা মানুষ, এ ছাড়া আর কেউ না। আমরা হলাম সারাদিনের খাটনির পর ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়লে মাঠে-ময়দানে জিরিয়ে নেওয়া মানুষ’।

টিঙটিঙে বলে, ‘তোমরা হলে তারা, যারা মাঠেঘাটে, ফুটপাথে, ব্রিজে ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে, হাতকে বালিশ বানিয়ে মাথার তলায় দিয়ে টানটান শুয়ে থাকো’?

সবাই হেসে ওঠে। করোলা বলে, ‘এখন তুমিও তাই। তুমিও হলে সেই মানুষ যারা টানটান শুয়ে থাকে। তারার নিচে, চাঁদের নিচে, আকাশের নিচে, সূর্যর নিচে, মেঘের নিচে, গাড়ি বারান্দার নিচে চেয়ে দেখলেই আমাদের পাবে’।
খাওয়া হয়েছে, কথাও হয়েছে, সবাই জিরিয়ে নেবে বলে ময়দানে টানটান শুয়ে পড়ে। টিঙটিঙেও শোয়। তার ভারী মজা লাগে। টিঙটিঙে পুলিশ-ঘোড়া, ঘুঘুপাখি, গাছ, আকাশ, বাসযাত্রী সবাইকে শুনিয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘আমরা হলাম তারা, যারা টানটান শুয়ে থাকে’।

------------------




লেখক পরিচিতি:
সায়ন্তনী ভট্টাচার্য 
গল্পকার।
 হুগলি, পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।



                                                                                   




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন