বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

অনির্বাণ বসুর গল্পঃ পরশুরাম

একমনে আলুসেদ্ধ মাখছে ছেলেটা। পাশে জ্বাল না-দেওয়া দুধ ঢাকা পড়ে। খানিক আগেই ফ্রিজ থেকে বের করেছে। ঘরের তাপমাত্রায় আসতে সময় দিচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে ফ্রিজটাও খারাপ হয়ে পড়ে আছে। তবু বাইরের লোককে ঘরে ঢোকাবে না। কাকে আনতে কাকে আনবে, সে যদি এসে খুন করে সব নিয়ে পালায়! কোনও দরকার নেই।

প্রথম দু'দিন সে নিজেই চেষ্টা করেছে বার কয়েক। একবার একটা কাঠের পিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে, চোখে বহু পুরোনো সানগ্লাস লাগিয়ে খোঁচাখুঁচি করেছে ততোধিক প্রাচীন জং-ধরা স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে। তারপর অনেকটা একইরকম দেখতে একটা টেস্টার নিয়ে প্লাগ-পয়েন্টের ফুটোতেও গলিয়ে দেখেছে। টেস্টারে আলো না-জ্বলায় তার মনে হয়েছে যে, ফ্রিজ ঠিকই আছে কিন্তু প্লাগ-পয়েন্টে কানেকশন সামান্য লুজ—হয়তো। তারপর পিঁড়ি থেকে নেমে ফ্রিজের গায়ে হাত বুলিয়ে বলেছিল ,তুই ঠিক আছিস রে! দাম দিয়ে কেনা জিনিস কি আর খারাপ হয়! শালা, যত দোষ ওই ইলেকট্রিক অফিসের লোকগুলোর। বাঞ্চোৎগুলো আবার আমার পিছনে লেগেছে! শালা, শুধু ভালোমানুষদের পিছনে লাগা! ভালোমানুষগুলো একে-একে সব মরবে! আমিও মরব! আমিও মরব!

চিৎকারের সঙ্গে কথা শুরু করলেও, শেষদিকে গলা ঠেলে কান্না উঠে আসে তার।

এমনটাই হয় প্রতিবার। কোনও কিছু নিয়ে বিরক্ত হলে, বা কারও ওপর রাগ হলে চিৎকার করে ওঠে সে। খানিকক্ষণ তারস্বরে চিৎকার করে। তারপর থেমে যায় একটা সময়। যখনই দলা-পাকানো

কান্না মেশে তার উচ্চারণে, তার মা বুঝে যান : ছেলে এবার শান্ত হবে। হয় নিজের ঘরে চলে যাবে। নয়
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। নয়তো বসে পড়বে ধপ্ করে। বসে পড়লে তার ছেলের চোখ
নিষ্পলক চেয়ে থাকবে কালিঝুলি-মাখা ঠাকুরের সিংহাসনের দিকে। সঙ্গে প্রবলভাবে কাঁপবে ছেলের
ঠোঁট। ছেলে কিছু বলতে চায় কিনা, কয়েকবার তা শোনার চেষ্টাও করেছেন তিনি; কিন্তু সামান্য
গজরানিও কানে যায়নি। যতবারই কান পেতেছেন, শুনতে পাননি কিছুই। শুনতে না-পেয়ে চমকে
তাকিয়েছেন ছেলের দিকে, দেখেছেন, ছেলের ঠোঁট তখনও নড়ছে। এই অবস্থায় এসে প্রত্যেকবারই
তিনি চোখ বুজে ফেলেন ভয়ে।

এই মুহূর্তে মন দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখছে ছেলেটা। আজ কিছু আগেই ভাত জুটবে তাঁর। দেওয়াল-ঘড়ির
দিকে তাকালেন তিনি। আড়াইটে। রাত। ইচ্ছে করেই ঘড়িটাকে এক ঘণ্টা ফাস্ট করে রেখেছেন। নয়তো ছেলেকে টলানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব।

ঘরের কোণে ডাঁই করে-রাখা বহুদিনের প্ল্যাস্টিকগুলো ময়লা হতে-হতে ক্রমেই কালচে। তার ফোকর থেকে দুটো আরশোলা মুখ বার করেই আবারও ঢুকে গেল ভিতরে। ছেলেটার সেদিকে নজর নেই।

সে আলু মেখে উঠে দাঁড়িয়েছে। লুঙ্গিটা হাঁটুর উপর তুলে এমনভাবে বেঁধেছে, তলা থেকে সুতির
আন্ডারপ্যান্ট উঁকি দিচ্ছে। বোঝা যায়, একসময় ওটা সাদা ছিল। উপরে একটা হাফ-হাতা প্রায়-সাদা
গেঞ্জি। সেটার বুকের কাছে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ফুটো। ছেলেটা এবার হাত ধোবে। বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কম করে পাঁচ মিনিট। বেসিনের উপরের তাকে রাখা গোলাপি লাইফবয় আরও-কিছুটা গলে যাবে। জল ধুয়ে দেবে তাকে এবং ছেলেটির দুই হাতের তালু আর-একটু ফ্যাকাশে হবে। তখন নখের গোলাপি আরও উজ্জ্বল হয়ে চোখে লাগবে। নখগুলোকে তখন রক্ত শুষে নেওয়া দাঁতের মতো লাগবে।

ক্রমাগত শোষণে হাতের পাতা তখন রক্তশূন্য। মা ও ছেলের সম্পর্কও, বোঝা যায়, অ্যানিমিক। এদিকে মা আর খিদে চাপতে পারেন না। খাটের মতো করে পেতে-রাখা আটপৌরে সোফাটায় যেভাবে বসেছিলেন, সেভাবেই, কিছুটা ইতস্তত করে বলেন, হয়েছে রে! হাতে আর কিছু লেগে নেই! ওই তো ওইটুকু আলু! চশমাটা নামতে-নামতে এখন তাঁর নাকের শেষপ্রান্তে।

বেশি বকবক কোরো না! হাতে আলু আসবে কোত্থেকে? এসে দেখে যাও! হাত থেকে রক্ত বেরোচ্ছে!
গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে! মা যেন জানতেন এমনই কোনও উত্তর আসবে। তাঁর মুখে-চোখেও কোনওরকম ভাবান্তর ধরা পড়ে না। ছেলে তো এমনটাই করে থাকে। বিশেষত হাত ধোয়ার সময় তিনি কিছু বললেই হল, এই এক গল্প।

কোথা থেকে যে ছেলেটা রক্ত খুঁজে পায়, রক্ত খুঁজে পেয়ে পাগল হয়ে যায়—বোঝেন না মা। ছেলের
ইউনিভার্সিটির শেষদিক থেকেই এটা শুরু হয়েছে। মা ভাবেন, ছোটোবেলায়, ছেলে যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ত, ক্লাসের মাঝে পেচ্ছাপ করতে গিয়ে একদিন দেখে ফেলেছিল একটা ওয়ান শটার। মাস্তান গোছের একটা চোয়াড়ে, নিজেকে যে নকশাল বলতে ভালোবাসত, ভরদুপুরে গুলি চালিয়ে দিয়েছিল এক পাতি কনস্টেবলের বুক টিপ্ করে। বাঁ-দিকের বুকে। হৃৎপিণ্ডে! ধকধক করনে লগা! মাধুরী দীক্ষিত! সেইখানে। সেই প্রবলপ্রতাপ মাস্তানের শেষযাত্রা দেখেছিল ছেলেটা। অন্য দলের সঙ্গে খেয়োখেয়িতে একেবারে স্পট্ ডেথ্। ক্যাম্পের সামনে দিয়ে, ওই তিন মাথার মোড়ের সামনে দিয়ে দিনের আলোতেও যারা যেতে ভয় পেত, তাদেরও অনেকেই সেদিন ভেঙে পড়েছিল ক্যাম্পের ওই একচিলতে ঘরটায়। সেদিন ঘরের সব জানলা লাগিয়ে হাততালি দিয়ে উঠেছিল ওইটুকু ছেলে বেশ হয়েছে! ঠিক হয়েছে! বন্দুক নিয়ে আর দুম-দুম করবি! এবার দেখ! টাটা বাই বাই! দুম ফটাস্!
মা ভাবেন, ছেলে বুঝি প্রাইমারির সেই ভয়ের দিনেই আটকে আছে। অন্য কোনও সম্ভাবনা তলিয়ে

দেখতে জানেন না মায়েরা। বন্দুকের নল মানুষকে পাগল করে তোলে—কথাখানা, অনেক মায়ের মতো, উনিও মানেন। ইউনিভার্সিটিতে তখন মিউজিক নিয়ে এমএ করছে ছেলে—শেষের দিকে তখন—আচমকা একদিন ফিরে এসে গুম মেরে বসে রইল। ঘরের দরজায় ভিতর থেকে ছিটকানি। সারাটা রাত কিছু মুখে তুলল না। মা জিজ্ঞেস করায় বলেছিল ,শরীর ভালো নেই। সেইদিন থেকেই কেমন-যেন বদলে যেতে শুরু করেছিল ছেলেটা। অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও একটা চাকরি জোটাতে পারেনি। বিএড করল, কয়েকটা স্কুলে ইন্টারভিউও দিল; হল না। মা তারপরও ঠেলেঠুলে পাঠাতে চেয়েছেন বহুবার। ছেলে চায়নি। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত ঘরের সিলিং-ফ্যানটার দিকে আর আপনমনে বলত ,আমার যোগ্যতা নেই!

আমি অযোগ্য! টাকা না-দিলে চাকরি পাব না! কিন্তু টাকা কোথায় পাব? কে দেবে? কেন দেবে আমায়?
টাকা! টাকা! শালা, ভালোমানুষগুলো একে-একে সব মরবে! আমিও মরব! আমিও মরব!

ছেলের ওইভাবে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে-থাকায় ভয় পেতে শুরু করেন মা। বিষয়টা আর ফেলে রাখতে

ভরসা পান না। তড়িঘড়ি পাড়ার ইলেকট্রিক-মিস্ত্রিকে ডেকে এনে সিলিং-ফ্যানটাকে বিদায় করেছেন।
ওর থেকে টেবিল-ফ্যান ঢের ভালো। আর যাই হোক, কিছুটা হলেও তো নিশ্চিন্তি। বলা যায় না, পাগলামি বাসা বাঁধছে ছেলের মাথায়, কখন কী-করতে কী-করে বসবে! তার থেকে এই ভালো! টেবিল-ফ্যান!

একটাই সমস্যা : ফ্যানটা চলতে-চলতে মাঝেমধ্যেই বিচ্ছিরি একটা ট্যাঁ-ট্যাঁ শব্দ করে। সেই আওয়াজে ছেলের মনে হয়, টিফিনবেলায় খুন-হওয়া কনস্টেবলের দলবল পালা করে গুলি ছুড়ছে।

ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে প্রতিশোধ নিচ্ছে। বন্দুকের সেই উত্তপ্ত নল ছুঁয়ে সে বিড়বিড় করে,অল্প লিটিক্যাল পাওয়ার কামস্ ফ্রম্ দ্য ব্যারেল অফ্ দ্য গান। ইউ রেজিস্টার অ্যান্ড ব্যান্ দ্য ফায়ারআর্মস্ বিফোর দ্য স্লটার, তারপর হাত দুটোকে বন্দুক-ধরার-কায়দায় সামনে আনে। বাঁ-চোখ বুজে হাতের উপর মুখ রাখে। ডান চোখের অপলক চাউনি তখন টেবিল-ফ্যানের উপর। খানিকক্ষণ এভাবে নিশানা তাক করে। তারপর চিৎকার করে ওঠে , ঠাঁয় ঠাঁয় ঠাঁয়!

হাত ধুয়ে ছেলে ফের এসে বসে স্টোভের সামনে-রাখা পিঁড়িটায়। বেশ কিছুক্ষণ কসরত করে স্টোভে
আগুন জ্বালায়। আগুন ঠিকমতো ধরলে এতক্ষণ ধরে পাশে-থাকা দুধের সসপ্যানটা চাপিয়ে দেয়।
তারপর একদৃষ্টে চেয়ে থাকে আঢাকা দুধের দিকে। স্টোভের প্রায় পাশ দিয়েই তখন হেঁটে-চলে বেড়ায়
তিন-চারটে আরশোলা। বুকে হাঁটে, ওড়ে না। ছেলেটার বড়ো-বড়ো চোখ দুধের দিকে তাকিয়ে-থাকা
অবস্থাতেই আরও বড়ো হতে থাকে। খিদে চাপতে-চাপতে মা তখন শতচ্ছিন্ন সোফাখানায় আগের মতো পা-ছড়ানো ভঙ্গিতে বসেই ঝিমোন। একসময় দারুণ রান্নার হাত ছিল তাঁর। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে এখন আর সেই গুণও বোধহয় উধাও। দেড় কামরার এই ঘুপচি ফ্ল্যাটটায় এসে ওঠার পরও বেশ কিছুদিন স্বচ্ছন্দে রান্না করেছেন। হঠাৎই একদিন ছেলের চিল-চিৎকার আর গালিগালাজে সরিয়ে নিলেন নিজেকে। বলা ভালো, সরিয়ে নিতে বাধ্যই হলেন। তখন থেকে ছেলেই রান্না করে। বিষয় তেমন গুরুতর কিছু নয়। কোনওভাবে ছেলের মাথায় ঢুকেছিল যে, মা খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে পারে!

ছেলেটা অপলক চেয়ে আছে ফুটতে-থাকা দুধের সসপ্যানের দিকে; আরও-কিছু পরে যা উথলে উঠবে। দুধ আর আবেগ—উভয়ত এক। দুইই উথলে ওঠে। এই মুহূর্তে উথলানো সেই ঘন সাদা তরলে তার অতীতকে, তার আবেগকে দেখল ছেলেটা। ইউনিভার্সিটির পিছনের দিকের পাঁচিলে তখন গোধূলির রং।

জামরুল গাছটার মাথায় শেষবিকেল ধীরে-ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তখন। গোধূলি আসলে ক্ষণিকের। বিকেল ফুরোতে-না-ফুরোতেই গাছের পাতায় সন্ধ্যা নামে। গাছের নিচে তখন প্রেমিকযুগল। ছেলেটির চোখে কাতরতা, প্রেম। মেয়েটি এসেছে লাল-হলুদ লজ্জা জড়িয়ে। মিউজিক নিয়ে পড়া ছেলেটি গান গাইতে সম্মত হয় মেয়েটির কথায়। দু'জনে বসে পড়ে গাছতলায়। হাত ধরে পরস্পরের। মেয়েটির অনুরোধে ছেলেটি গেয়ে ওঠে ,এখন আমার সময় হল। চোখ বুজে পরম আদরে গাইছিল সে। গান শেষ হলে পর চোখ খোলে। মেয়েটির ডান হাত তখন নিজস্ব শান্তিনিকেতনী ঝোলায়। সেই হাত বের করে আনে একটি খাম। খামের কোণে লাল-হলুদ ছোপ। হলুদ এবং সিঁদুরের গাঢ় সম্মিলন। খামটি এগিয়ে আসে ছেলেটিরদিকে। ছেলেটির চোখ তখন খামে। মেয়েটি, নিরাবেগী, বলে, এতদিনেও তো একটা চাকরি জোটাতে পারলে না! আমার পক্ষে আর ওয়েট করা সম্ভব নয়। আশা করব, এটাই আমাদের শেষ দেখা। আমাদের রিলেশনটা নিজের হাতে খুন করলে তুমি! তুমি খুনি!

দুধ উথলে উঠে নিভিয়ে দিয়েছে স্টোভের আগুন। ঘরময় ধোঁয়া। তন্দ্রা কেটে গেছে মায়ের। ছেলের মুখ অস্পষ্ট। ভিতরে-ভিতরে গজগজ করেন তিনি। এই পাগল ছেলেকে বলেও কোনও লাভ নেই। কিছুতেই জানলা খুলবে না। জানলা খুললেই নাকি গুলি চলবে! মেরে ফেলবে!

সেই ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে মা বন্ধ জানলার দিকে তাকান। চোখ জ্বলছে। ঘরের দেওয়াল জুড়ে কালচে
ছোপ। এক দীর্ঘশ্বাসে জ্বলনের সেই কষ্ট গিলে ফেলেন তিনি। থুতু পাচার হয় পাকস্থলীতে। খিদে মরে
আসে। আচমকা সেই আবছায়ার মধ্যে থেকে শোনা যায় ছেলের উল্লাস ,রক্ত! রক্ত! মার দিয়া কেল্লা!

মা তড়িঘড়ি সোফা থেকে নেমে দেখার চেষ্টা করতেই ছেলে চিৎকার করে ওঠে ,কী হল? কী করছ?
কতবার বলেছি, যখন রান্না করব, তখন নড়বে না। একটু নড়লেই রক্ত পুঁজ বমি কফ—সব—সব
ছিটকে এসে খাবারে পড়বে! চুপ করে বসে থাকো। একটু পরে খেতে দিচ্ছি।

নিজের মনে গজগজ করতে-করতে চুপ করে যান মা। আবার অনন্ত অপেক্ষা। আবার তন্দ্রালস সময়। নিভে-যাওয়া স্টোভটা এককোণে সরিয়ে দুটো থালা টানে ছেলে। ধোয়া থালা আবার করে ধুয়ে নেয়।

সাবধানের মার নেই। ভাত বাড়ে। এতক্ষণ পড়ে থাকতে-থাকতে ভাতও এখন বেমালুম ঠান্ডা। ছেলে
চামচে করে তুলে ঘি দেয় তাতে। পাশে আলুসেদ্ধ, নুন। কী হল, নাও। মায়ের দিকে একটা থালা এগিয়ে দেয় সে। ছেলে থালাখানা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েই খেতে শুরু করেছে। গিলছে, না চিবিয়ে খাচ্ছে, বোঝা দায়। মা হাতে থালা নিয়ে বসে থাকেন। ভুলে যান খেতে। সন্তানের সেদ্ধভাতে বেঁচেবর্তে থাকাতে কিছুটা হলেও নির্ভার বোধ করেন। এমনিতেই চাকরি নেই, রোজগার নেই। যাবতীয় খরচখরচা তাঁর পেনসনের টাকা থেকেই হয়। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরিয়ে ছেলে একটা কালচারাল সেন্টার খুলেছিল। সাংস্কৃতিক কলাকেন্দ্র। কয়েকজন বন্ধু মিলে একসঙ্গে। নাচ গান আবৃত্তি তবলা আঁকা ইত্যাদি।

ধীরে-ধীরে পসারও জমছিল। কিন্তু যেসব বন্ধুরা মিলে শুরু করেছিল সেন্টারখানা, তাদের কেউ চাকরি
পেয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল, কেউ-বা বিয়ের পর হয় শ্বশুরবাড়ির চাপে নয় স্বামীর সঙ্গে বিদেশ গিয়ে
এনআরআই হয়ে ডলার-পাউন্ড-রুবল-দিনার কামানোর বাসনায় অকালে ঝরে গেল। তখন থেকে শুধু
গানই শেখানো হত। একটা সময় পর এত সুর, এত গান—সব থেমে গেল। বাড়ি বদলে গেল। দেড় কামরার পায়রার খোপে বাইরের লোককে কোথায়ই-বা বসাত!
নিছক শখ নয়, রুজিরোজগারের পথও, অতএব, বন্ধ হয়ে গেল।
মায়ের তখনও টিনের স্কুল। চিড়-ধরা দেওয়াল বা ফুটো টিনের চালা সত্ত্বেও বাঁধা মাইনে। রাজ্য সরকার। প্রভিডেন্ট ফান্ড, ডিএ, পেনসন। থেকে-থেকেই লোডশেডিং। হাতপাখা। বেঞ্চহীন ক্লাসঘর।
নোংরা ছেঁড়া জামারা পায়ের কাছে। কখনও বইখাতায় পা। বকাঝকা। কানমলা কিংবা চড়চাপড় অথবা জুলপিতে টান। পিচুটি-লাগা চোখ জুড়ে অপুষ্টি ছলছল। উৎকট ঘেমো গন্ধ। একঘেয়ে জীবন। স্কুল থেকে বাড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল। বাড়িতে ছেলের ক্ষ্যাপামি। ভালো লাগত না তাঁর। পেরে উঠতেন না আর।

কপাল চাপড়াতেন আড়ালে। ভাগ্যকে দোষারোপ।
স্কুল থেকে যেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছিল ছেলে, যেদিন কনস্টেবল গুলি খেল বলে স্কুলে ছুটি
দিয়ে দিয়েছিল, সেদিন রাতে খাওয়ার পর সে হড়হড় করে বমি করে। মুখ ধুইয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন
ছেলেকে। তারপর মাঝরাতে কী গোঙানি! ঘুম ভেঙে তিনি দেখেন, ওইটুকু ছেলে পেট চেপে কাতরাচ্ছে। এদিকে বাড়িতে ওষুধও নেই। স্কুল থেকে ফেরবার পথে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো—টুকটাক—কিনে আনবেন ভেবেও আর কেনা হয়নি। অগত্যা ছেলের খোলা পেটে হাত বোলাতে-বোলাতে তিনি বলেছিলেন,রাক্ষসীবুড়ি রাঁধে বাড়ে, অগস্ত্যমুনি খায়।/আশি মণ চালের ভাত, ভস্ম হয়ে যা।/ বাতাপি, বাতাপি, ভস্ম হয়ে যা। পরপর তিনবার। প্রত্যেকবার বলে হাত সরিয়ে মুখ নিয়ে এসেছিলেন ছেলের পেটের উপর।

তারপর ফুহ্ ফুহ্ ফুহ্। তিনবার। প্রতিবারই কেঁপে-কেঁপে উঠেছিল ছেলে। অদ্ভুত শিরশিরানি। শিহরণ। মা ভেবেছিলেন, বেদনাজনিত ছটফট।

সেই প্রথম উদ্গমে পেটব্যথা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। নিবিড় আশ্লেষ মেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল সদ্যোজাত পৌরুষ।

এখনও খাওনি! এদিকে খিদে পাচ্ছে খিদে পাচ্ছে করে তো খোঁচাচ্ছিলে!
ছেলের ধমকে সম্বিৎ ফেরে। ব্যস্ততার সঙ্গে খেতে শুরু করেন তিনি। ছেলে এঁটো থালা নিয়ে ধুতে ওঠে। থালা ধুয়ে ন্যাতাটা নিয়ে আবার ঘরে আসবে। স্টোভটা সরে যাবে একপাশে। তেলচিটে মেঝেয়
ন্যাতা পড়বে। একদা মোজাইক-করা মেঝের রং বদলাবে না তাতে। মুছে আবার বেসিনের কাছে যাবে
ছেলে। হাত ধোবে সাবান দিয়ে। লাইফবয়। অনেকক্ষণ ধরে। মা কিছু বললেই অবধারিত বলবে,দেখছ
না, গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে! যত ধুচ্ছি, তত রক্ত!

মা খেতে থাকেন। তিনি জানেন, ওই ছেলের সব কাজ সারতে-সারতেই তাঁর খাওয়া হয়ে যাবে। তারপর
ঘুম। আর টানতে পারছেন না। ঘড়িতে পৌনে পাঁচটা। আসলে পৌনে চারটে। ভোর হতে চলল। ছেলেটার সেই কবে থেকেই রাতের ঘুম উবে গেছে। গোটা রাত জেগে থাকে। ভয়ে। সন্দেহে। তারপর সকাল হলে ঘুমোতে যায়। নিজের হাফখানা ঘর তখন ভিতর থেকে বন্ধ হয়ে যায়।

মা খেয়ে ওঠেন। থালা মাজেন। আঁজলা ভরে জল নেন মুখে। কুলকুচি। আঁচলে মুখ মোছেন। তারপর
বাথরুমের দিকে যান। বাথরুমের পাশেই ছেলের ঘুপচি ঘর। একবার কী ভেবে উঁকি দিলে, দেখেন, ছেলে একটা ছোটো করাত নিয়ে পায়ের আঙুলের কাছে আনছে, আবার পরমুহূর্তেই সরিয়ে নিচ্ছে। আবার আনছে। সরিয়ে নিচ্ছে ফের। ঠোঁট নড়ে চলেছে ক্রমাগত। মা শুনতে পান না কিছুই।

ও কী রে! কী করছিস? করাতটা নিয়ে কী করছিস? রেখে দে বাবা!

ঝটিতি ঘুরে তাকায় ছেলে। তলোয়ার ধরার ভঙ্গিতে করাতটা ধরা। আবার আলফাল বকছ! করাত
কোথায়? আমি কোথায় একটু নখ কাটতে যাচ্ছিলাম, শালা সবেতে বাগড়া দেওয়া! কাজ পাও না, না!
ফোটো তো বাল!

মানে-মানে সরে পড়েন মা। ঘুপচি ঘর জুড়ে তখন ছেলের চিৎকার ,বাঞ্চোৎরা শালা সবসময়
ভালোমানুষগুলোর পোঁদে কাঠি করে! সব ক'টা শালা ঢ্যামনা! ল্যাংটো করে বিচিতে বিছুটি ঘষে দেব
শুয়োর! এমন ক্যালাব শালা, আর কারও গাঁড়ে লাগার সাহস হবে না! সব ক'টাকে শালা বুঝে নেব!

চিৎকার উত্তরোত্তর বাড়ছিল। মা এসে বসে পড়েছিলেন সোফায়। নিজের মনে খানিক গজগজ করে


থেমেও গেছেন একটা সময়। ঘুমের ওষুধ খেয়ে গালিগালাজের আবহে ঘুমিয়ে পড়েন তারপর। এরই মধ্যে গালিবর্ষণ থেমেছে। মা তখন গভীর ঘুমে। পায়ে-পায়ে ছেলে চলে আসে তাঁর কাছে। হাত দুটো পিছনে। চোখ বড়ো-বড়ো করে দেখছে মাকে। ঘুমের ঘোরে বুক থেকে কাপড় সরে গেছে মায়ের। ছেলে সেদিকেই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে। ডান হাতটা একবার নিয়ে আসে মায়ের বুকের কাছাকাছি। খুব কাছে। আরও কাছে। কী ভেবে চট্ করে সরিয়েও নেয়। উত্তেজিত হয়ে আঙুল কামড়ায়। কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম।

ডানদিকের জুলপি বেয়ে ঘামের একটা স্রোত নেমে যায়। সে পিছিয়ে যায়। আবার কাছে আসে। আবার পিছোয়। ফের এগোয়। পিছোয়। এগোয়। ঘর জুড়ে তখন নাক-ডাকার-শব্দ। হাঁটু গেড়ে বসে সে। ঈষৎ উন্মুক্ত বুকের সামনে তার মুখ। নিশ্বাস প্রবল। বেশিক্ষণ নয়, উঠে পড়ে আবার। পাশাপাশি মাথা নাড়ায়। জোরে-জোরে। থেমে গিয়ে হাঁপায়। এবার দুটো হাতই সামনে আনে। বাঁ হাতে করাতখানা। ছোটো, কিন্তু ধারালো। দু'হাতে শক্ত করে ধরে করাতটা। মাথার উপর তোলে। বলি দেওয়ার ভঙ্গিতে। তারপর দ্রুত নামিয়ে আনে মায়ের গলায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত। কালচে লাল। ছেলের গলায় অট্টহাসি। চোখে জল।

কিছুটা কাঁপুনির পর মা শান্ত এখন। ধীরে-সুস্থে, আদরে-আদরে সে খুলতে থাকে মায়ের শাড়ি শায়া

ব্লাউজ। রক্ত-লাগা করাতটা নিয়ে বসে মায়ের পাশে। বুকে হাত বোলায়। আস্তে-আস্তে হাত নেমে আসে পেটে। পেটের কাছে আসতেই হাত সরিয়ে নেয় সে। মুখ-চোখ থেকে রাগ ঝরে পড়ে। সে তার অনভ্যস্ত হাতে টুকরো করতে থাকে মাকে। মাথাটা শরীর থেকে আলাদা করে সোফার এককোণে রাখে। মা যেন সবটা দেখছেন। অনেক সময় নিয়ে কাজটা সারে ছেলে।

এত খাটনির পর তার খিদে পায়। সে বাথরুমে যায়। স্নান করে। তারপর ভেজা গায়েই এসে ফ্রিজ
খোলে। ভাত বের করে থালায় বাড়ে। ছোটো করে কাটা, টেনে-টেনে চামড়া ছাড়ানো মায়ের মাংসের
টুকরোগুলো তোলে। তারপর ফ্রিজে রেখে দেয়। কয়েক টুকরো থালায় নেয়। ঠান্ডা ভাতে গরম মাংস।
খেতে শুরু করে। কতদিন পর মাংস! আহ্! চেটেপুটে সবটা খাওয়ার পর ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খায়।

তারপর রক্তে-ভেজা সোফায় শরীর ছেড়ে দেয়। মাথার ঠিক পাশেই মায়ের মুখ। অর্ধনিমীলিত চোখ।
মায়ের দিকে তাকিয়ে পেটে হাত বুলোয়। হাত বুলোয় আর বলে, রাক্ষসীবুড়ি রাঁধে বাড়ে, অগস্ত্যমুনি
খায়।আশি মণ চালের ভাত, ভস্ম হয়ে যা।/বাতাপি, বাতাপি, ভস্ম হয়ে যা। বলে আর মায়ের মুখে থুতু
দেয়।

-----------------





লেখক পরিচিতি:
অনির্বাণ বসু
গল্পকার।
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।

৮টি মন্তব্য:

  1. খুব খুব ভালো লাগলো... দুর্দান্ত লেখা

    উত্তর দিনমুছুন
  2. এমন দুরন্ত লেখা একবার পড়ে মন ভরে না। অসাধারণ!

    উত্তর দিনমুছুন
  3. লেখার সমস্ত শরীর জুড়ে এক নিদারুণ আনপ্রেডিক্টিবিলিটি। যার অনিবার্য পরিণতি শেষের ভয়ঙ্কর ভায়োলেন্সের রূপকল্প। বেশ নাড়িয়ে দেওয়া আছে গল্পটায়।
    - প্রবুদ্ধ মিত্র

    উত্তর দিনমুছুন
  4. হীনমন্যতা,ভীতি, ক্ষোভ এবং একাকীত্ব আর তা থেকে জন্ম নেওয়া বিকৃতি সমাজের করুণ পরিণতি। খবরের কাগজে আকসার এরকম বিকৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়। পৌরাণিক সুর-অসুরের সহাবস্থান-এর ক্লান্ত সাক্ষর যেন বর্তমান সমাজ। হয়ত বীভৎস, কিন্তু জীবনের অঙ্গ, তাই এড়িয়ে যেতে চাইলেও এড়ানো যায় না!

    উত্তর দিনমুছুন