বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী'র গল্পঃ ঈশ্বরের জন্ম



সবুজ পাতা বেয়ে চুঁইয়ে ঝড়ছে গাছের গুঁড়িতে। সেখানে দুটো ধুমসো বিড়াল হুটোপুটি খাচ্ছিল।করে আর গনগনে আগুনের গোলাকে আকাশে রেখে যে যার কোটরে নিবিড় হবে। চাইলে এই সময়েই পাথর ছুঁড়ে অন্তত একটা উদবিড়ালকে মারতে পারত আহিক। আগুনের ধারে গোল হয়ে বসে সেই মাংস পুড়িয়ে খেতো দলের সবাই।

 কিন্তু শিকারে তার মন নেই। সে এখন একটা গাঢ় বাদামী পাথর খোদাইতে বিভোর।

আহিক ধরতে চাইছিল আকাশের এই লাল গোলককে সব রকম চেহারায়। পৃথিবীকে পাক মারতে মারতে কেমন সকালের খুশিয়ালি, দুপুরের শরীর পোড়ানো আঁচ আবার মায়াবী বিকেলের শেষ আলো ছড়াচ্ছে রোজ। অদ্ভূত লাগে আহিকের। কীভাবে এই লাল তেজিয়াল গোলা থেকে ছড়ানো আলোয় নীল হয়ে যায় জল, বাতাস, অন্তরীক্ষ! আহিক জানে সেই রঙ যখন জলের গভীরে পৌঁছায়, সে আরো গাঢ় নীল। জল যত শান্ত, নিস্তরঙ্গ নীলের গভীরতা ততই বেশী। আহিক কপালে হাত রেখে ঠাহর করতে চাইছিল দূর দূরান্তে যেখানে সমুদ্রের সমুদ্র-নীল নীল মিশে গেছে আকাশের আকাশী-নীল নীলের সঙ্গে।

নীল চরাচরে দাঁড়িয়ে শিউরে শিউরে ওঠে আহিক। নিজেকে পাচ্ছিল সঙ্গীহীন একাকী। এই আনন্দগুলো যদি বেঁটে নেওয়া যেতো কারো সঙ্গে! মনের ভাবনা বেরোনোর দরজা খুঁজে না পেয়ে কেমন আঁকুপাঁকু করছিল।

কীভাবে সে একই সূর্যের এত রকমের ভাব, এমন রঙ্গের গভীরতা প্রকাশ করবে পাথর খুদে খুদে!
এই পাথর খোদার কাজ আহিককে যতদূর সম্ভব গোপনে করতে হয়। কেউ বোঝে না কেন পাথর খুদে ছুরির ধার নষ্ট করতে হবে। তার চেয়ে কোন জানোয়ার মেরে খাবার জোগাড় করলেই তো লাভ। অস্ত্রের সেটাই তো কাজ। একটা ছুরিতে ধার তোলা কি সোজা ব্যাপার? তাকে পাথরে কুঁদে কুঁদে ভোঁতা করার কারণটা কী?

কেন তাকে পাথরের গায়ে ফুল পাতা ফুটিয়ে তুলতে হয় আহিক নিজেও সেটা বোঝে না। হয়তো অনুভব করে, কিন্তু প্রকাশ করার মত যথেষ্ট শব্দ তার ভান্ডারে নেই। গুহার গায়ে আহিককে আঁকিবুঁকি কাটতে দেখে অধৈর্য পা পাথুরে জমিতে ঠুকতে ঠুকতে বেনকুয়াশাও তাকে জিজ্ঞাসা করেছে কতবার। সেই মেয়ের কুঁচকানো চওড়া ভুরু বিরক্তি গোপন করতে চায় নি।

একসময় আহিক আর বেনকুয়াশা নিয়মিত মিলিত হত। গুহার প্রত্যন্ত অন্ধকারে আহিককে হাত ধরে নিয়ে যেতো বেনকুয়াশা, চুলের আবরণ সরিয়ে নিজের সুউচ্চ স্তন উন্মুক্ত করে দিত আহিকের কাছে। আহিক ছিল দলের তরুণতম বলশালী যার হাতের নখ হিংস্র বনবেড়ালের জ্যান্ত শরীর থেকে চামরা ছাড়িয়ে আনতে পারত, আবার বেনকুয়াশার উন্মুখ শরীরে রক্তপাতহীন আঁচড় কেটে শিহরণ তুলতো প্রতিটা রোমকূপে। বলশালী আহিক দলের প্রধান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিল। প্রৌঢ় দলপতি বেনদেবারাকে লড়াই করে হারিয়ে দিলেই সেই শিরোপা ছিল হাতের মুঠোয়। কিন্তু কোমলতা খেলা করত
আহিকের চোখে, নিজের পাথরের আঘাতে লুটিয়ে পড়া জীব কুড়িয়ে আনার সময় করুণায় ভিজে যেত তার মন। দলপতি হওয়ার কঠোর নির্লিপ্তি তার ছিল না।

পাথরটার দিকে তাকিয়ে আজ অদ্ভূতভাবে বেনদেবারাকেই মনে পড়ল আহিকের। হঠাত। সূর্য হারানো দিনে আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মত। কোন লড়াইতে জেতার পর বেনদেবারার খুশিতে চকচকে মুখ, ধাওয়া করেও শিকার কব্জা করতে না পারার রাগ কিংবা নোটোমনের অস্ত্রে মৃত্যুর আগের মুহূর্তের বিষণ্ণ সমর্পন- সূর্যের বিভিন্নতাকে ধরার জন্য যেন এরকমই একটা মুখের প্রয়োজন আহিকের যার আধারে সূর্য এই পাথরে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। পারে না?

এই সম্ভাবনাটা আহিকের জন্য একটা নতুন উপলব্ধি। এর আগে বরফের ভারে ন্যুব্জ বাইউ গাছের বেঁচে থাকার সকরুণ প্রচেষ্টাকে পাথরে খোদাই করতে গিয়ে বারবার ব্যার্থ হয়েছে আহিক। এখন মনে হল সে পারবে। ভেষজ গাছ, শিকর ভাল চেনে বলে বুড়ো, শিকারে অক্ষম ওয়াপিকে এখনো তাদের দল কাঁধে বয়ে বেড়ায় এক আস্তানা থেকে অন্য আস্তানায়।

শিকরের সন্ধানে টলোমলো পায়ে বনেজঙ্গলে ওয়াপির ঘুরে বেড়ানোটা বরফের ভারে ঝুঁকে পড়া বাউই গাছের মতই এক বাঁচার লড়াই। জীর্ণ অথচ প্রচেষ্টায় দৃঢ়। এইভাবে আগে কখনো ভাবতে পারেনি। আনন্দে আহিকের ইচ্ছা করছিল দুই হাত মুখের কাছে এনে গলা ছেড়ে ডাক পাড়ে ই-ই-ই করে। কিন্তু পাথরের উপর খোদাই করার সময় দলের অন্য কারো চোখে পড়তে চায় না আহিক। শুধু উপহাস নয়, যদি নোটোমন তাকে একবার পাথর খোদাই করতে বারন করে দেয় তাহলে কী করবে সে? দল ছাড়তে হবে, অথবা নোটোমনের সঙ্গে লড়াই। জিতলে আহিককে দলপতি হতে হবে। সেই পদে তার কোন আকর্ষণ নেই। মরতেও সে চায়না এখুনি।

বেনদেবারার পেটানো শরীর, শক্তপোক্ত পেশী খোদাই করে হল সূর্যের শরীর। দূর থেকে দূরে পৌঁছে যাওয়া চোখের চাহনিতে ফুটে উঠল সূর্যের তেজ। মুখের হাসিতে ছড়িয়ে গেল ভোরের প্রসন্নতা। মাথার চুল নাবিয়ে দিল হাঁটু ছাড়িয়ে যেভাবে সূর্যের আলো ছোঁয় মাটিকে। পাথর খোদাই করতে করতে সূর্য আকাশের মাঝামাঝি এখন। কাঠের আগুনের মত গনগনে। দলের সবাই, পশুপাখি যে যার নিজের কোটরে। আহিক শরীরের সব কোষ দিয়ে সূর্যের তেজ অনুভব করছিল আর সেটাই ফুটিয়ে তুলছিল পাথরের গায়ে। ঘামে ভিজে চুল লেপ্টে পড়েছিল কাঁধে। একমনে কাজ করছিল আহিক। বুঝতেও পারেনি কখন বেনকুয়াশা পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

পাথরে ফুটে ওঠা চেহারা দেখতে দেখতে বেনকুয়াশার চোখের বিরক্তি মুছে যাচ্ছিল। আগে আহিকের করা অনেক গাছ পালা নদীর পাথর খোদাই দেখেছে। কিন্তু আজ সূর্যের এই অভিনব রূপের সঙ্গে চেনা পরিচিতির আভাস পেয়ে আনন্দে চলকে উঠল বেনকুয়াশা। কেমন নিটোল একটা চেহারা ফুটিয়ে তুলেছে! জগত সংসার ভুলে কাজ করা আহিকের উপর থেকেও চোখ সরাতে পারছিল না। পাথর ঠোকার তালে তালে শিল্পীর পেশীতে জলের ঢেউয়ের মত ওঠা নাবা দেখতে দেখতে বেনকুয়াশার শরীর জেগে উঠছিল।
বহুদিন পর আবার এই পুরূষের আলিঙ্গনে পেতে চাইছিল নিজেকে। আহিকের ঘামে ভেজা পিঠে ভালবাসার আঁকিবুঁকি কাটছিল বেনকুয়াশা। হাতের টানে আহিকের মুখ ফেরাতে চাইল নিজের দিকে। 

ঠোঁট আহিকের কানের কাছ এনে ফিসফিস করে ডাকল, আহিক! আহিক আমার!

সূর্য তার পাক খাওয়া থেকে থেমে থাকবে না, একটু বাদেই ঢলতে থাকবে দূরে। নষ্ট করার মত কোন সময় নেই আহিকের।

ঠেলে সরিয়ে দিল বেনকুয়াশার হাত।

তুমি যাও এখন। যাও! অস্থির বিরক্তি গোপন ছিল না আহিকের গলায়।

যদি আহিক একবারের জন্যও প্রত্যাখাত বেনকুয়াশার রাগে ঝলসে ওঠা মুখের দিকে তাকাত তাহলে হয়তো সূর্যের চেহারায় নতুন মাত্রা যোগ হত। কিন্তু একাগ্র আহিক সেটা দেখতে পায় নি, এমনকী এই প্রত্যাখানের পরিণামে বেনকুয়াশা যে তার কোন ক্ষতির কারন হতে পারে সেই ভাবনাও তার মনে মাথা তোলেনি।

আগের দিন নোটোমনের নেতৃত্বে মানুষের দল এক ঝাঁক ঘোড়াকে তাড়িয়ে পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকায় নিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে ছিল সুগভীর খাদ। সেখান থেকে আর পালাবার পথ নেই। এতগুলো ঘোড়াকে মারার পর খাবার অফুরন্ত। সারা রাত ঝলসানো মাংস আর আঙ্গুরের রস খেয়ে আজ সারাদিন গুহার কোটরে ঝিমোচ্ছে সবাই। এতো মাংস জমেছে আরও কয়েকদিন শিকার না করলেও হয়। চামরা ছাড়িয়ে মাংস নুনে জারিয়ে গুহার গহীন অভ্যন্তরে রেখে দেওয়া হয়েছে। অন্য পশু কিংবা অন্য মানুষের দলের আক্রমন হবে তা না হলে। দলপতি নোটোমন সেই তৃপ্তি নিয়ে বিবশ শরীরে শুয়ে ছিল। 

রাগে কাঁপতে কাঁপতে এসে বেনকুয়াশা ঝাপিয়ে পড়ল নোটোমনের উপরে। শুধু দলপতি নয়, নোটোমন দলের সব নারীর মুখ্য পতিও বটে। বেনকুয়াশা তার সবচেয়ে প্রিয়। শরীরের কোনায় কোনায় আগুন জ্বালাতে পারে মেয়েটা। অচিরেই নোটোমন জাগ্রত হল, তেতে উঠল তার শরীর। স্বল্প শব্দের বিনিময়ে দুই শরীর এক হয়ে গেল। বেনকুয়াশা তবুও আহিকের প্রত্যাখান ভুলতে পারছিল না।

নোটোমনের শিশ্নের আঘাত স্তিমিত হতেই পাথরের মূর্তির কথা জেগে উঠল ঠোঁটের কোনায়।

ধড়মড় করে উঠে বসল নোটোমন। কী করতে চাইছে আহিক? দলপতি পদ দাবী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
অন্তত এইভাবেই বোঝাতে পেরেছিল বেনকুয়াশা। গুহার অভ্যন্তর নোটমনের হুঙ্কারে কেঁপে উঠল। ততক্ষণে দলের অন্য মানুষেরাও এসে পড়েছে।

কোথায়, কোথায় আহিক?

কী করেছে?

দলপতির হুকুম মানেনি কেন?

এইরকম নানা প্রশ্নে কেঁপে উঠছিল গুহার দেওয়াল। চলো! মারো! শেষ করে দাও! রাগের আগুন জ্বলতে শুরু করলে আর থামানো যায় না। বেনকুয়াশার দেখানো পথ ধরে রে রে করে চলল সবাই।

সূর্য এখন অনেক স্তিমিত। পাথরের খোদাই শেষ করে নিজেই অভিভূত হয়ে গিয়েছিল আহিক। সে ভাবতেই পারেনি সূর্যের তেজ বেনদেবারার শরীরকে নিয়ে এইভাবে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। কী আনন্দ, কী আবেগ! কেমন ভাবে প্রকাশ করবে বুঝতে পারছিল না আহিক। শ্রান্ত দেহে পাথরের পদমূল জড়িয়ে লুটিয়ে পড়েছিল আপ্লুত শিল্পী। জানতেও পারেনি কখন দলের সব মানুষ মানুষী এসে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে।

পাথরের মূর্তির কাছে এসে থমকে গিয়েছিল নোটমন। তার দেখাদেখি দলের সবাই। এরকম কিছু কোনদিন দেখেনি কেউ।

তাদের চেনা জগতে কত গাছ, পশু, পাখী। খাবার জোগাড়ের জন্য তারা পাথর দিয়ে অস্ত্র বানানো শিখেছে। জানে তার আঘাতে নিজেদের দরকারে খাবার জোগাড় করতে হয়। সেই পাথর যদি কোন শরীরের আকার পায় তাদের মন কেন আলোড়িত হচ্ছে কেউ বুঝতে পারছিল না। ওই ভঙ্গীতে আহিককে পড়ে থাকতে দেখেও থমকে গেছিল তাদের রাগ।

আহিক!

আবেশ কাটিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল নোটোমন। যদিও নিজের অজান্তেই সেই চিৎকারে হিংস্রতা কম আর জানার আগ্রহ ফুটে উঠল বেশী।

আহিক চারদিকে ঘিরে দাঁড়ানো সবাইকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেল। কী করবে সে এখন? ওরা কি নষ্ট করে দেবে তার পাথরের সূর্য? নিজের থেকেও পাথরের মূর্তিটা বাঁচানোর কথাই প্রথম মাথায় এলো তার। লড়াই তবে অনিবার্য।

এটা কী? তুমি কেন এভাবে শুয়ে ছিলে?

সূর্যদেবারা। এইভাবেই মনে এলো আহিকের। সূর্যের তেজ আর বেনদেবারার শরীর। ওই দেখো নোটোমন, আকাশের সূর্য আজকের মত চলে যাচ্ছে। আমি কেমন ধরে ফেলেছি সেই সূর্যকে আমার এই পাথরে।

এও কি সম্ভব? পুরোপুরি অবিশ্বাস করতেও পারছিল না মানুষের দল। পাথরের শরীরে সূর্যের তেজ, সেই আশ্বাস যেন ফুটে ফুটে বেরোচ্ছে। অস্থির ঝড় উঠছিল মনের গভীরে, অদ্ভূত এক অনুভূতি যার ব্যাখ্যা জানা ছিল না এই মানুষদের।

এই সময় দূর থেকে আসা এক তীক্ষ্ণ শলাকা শাঁ শাঁ করে চলে গেল নোটমনের কানের পাশ দিয়ে। হুই! এক পাক মেরে মাটিতে শুয়ে পড়ল নোটোমন। তার দেখা দেখি আর সবাই। শুধু লিলাক নামের একটি মানুষ তীরের মত ছুটে গিয়ে লম্বা শিড়িঙ্গে এক গাছের উপরে চড়তে লাগল। তার চোখের তেজ দলের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো। পশুশিকারে গেলে কিংবা অনাগত শত্রুকে দূর থেকে দেখে সবাইকে জানানোই তার কাজ।

কারা লিলাক? কাউকে দেখা যাচ্ছে?

গাছের উপর উঠে চারদিকে তাকাতেই লিলাক বুঝতে পারছিল একটা অন্য মানুষের দল ধেয়ে আসছে তাদের দিকে।

শত্রু! অনেক। এদিকেই আসছে। পালাও, পালাও সবাই।

বলতে বলতেই এক ঝাঁক শলাকা তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।
ওদের হাতে এটা কী অস্ত্র? কেমন করে এত দূরে ছুঁড়ছে ওরা?

এরা শরীরে আমাদের চেয়ে অনেক ছোট। কিন্তু অনেক বড় দল। আর ওদের সবার হাতে একটা লাঠি, যেটায় রেখে ছুঁড়ে দিচ্ছে এই শলাকা।

নোটোমন ভাবছিল। মাংসের খোঁজেই এসেছে এরা কোন সন্দেহ নেই তাতে। মাংস ফেলে পালিয়ে যেতে মন চাইছিল না। সে দলপতি, তার নির্দেশ পেলেই সবাই পালাবে। শিকারের সময় সবার আগে ধেয়ে যাওয়া তার কাজ, তেমনি লড়াইয়ের সময় দলকে পরিচালনার কাজও তার। যা করবে দ্রুত ভেবে নিতে হবে। এই মানুষের দলের কাছে একটা অস্ত্র আছে যেটা অনেক দূরের থেকে পাঠিয়ে দেওয়া যায়। পালাতে গেলেও পিছন থেকে ওটা ছুঁড়েই মারতে পারে ওরা। তাদের দলে এরকম অস্ত্র নেই, তারা লড়াই করতে পারে শুধু মুখোমুখি। দরকার পড়লে সেটাই করতে হবে। ওরা চেহারায় যদি ছোট হয়, সামনা সামনি লড়াইতে জেতা সহজ হবে।

এই সময় আহিকের দিকে চোখ পড়ল নোটমনের। সবাই যখন নিজেকে বাঁচানোর কথা ভাবছে, আহিক তার পাথরের সূর্যকে বাঁচাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। সেটা দেখেই এক নতুন ভাবনা খেলে গেল নোটোমনের মাথায়। সে গর্জন করে উঠল, কেউ যাবে না, সবাই এখানে মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকো।

এখানে? ককিয়ে উঠল বেনকুয়াশা। দলপতির নির্দেশে কোন শব্দ করার সাহস ছিল না অন্য কারো।

শুয়ে পড়লে ওদের এই শলাকা আমাদের আঘাত করতে পারবে না। নোটোমনের মাথায় আর একটা কথাও ঘাই মারছিল। ভাবনাটা এখন সদ্য ভোরের আলোর মত। সম্ভাবনাময় কিন্তু উপস্থিতিতে ক্ষীণ। কাউকে বলে বোঝানো মুশকিল।

লিলাক গাছের উপর থেকে তড়তড় করে নেবে আসছিল। এসে গেছে, এসে গেছে!

এইসময় আবার একটা কথা উপচে এলো নোটোমনের মাথায়। সব মাংস, রস এখুনি নিয়ে আসো এখানে। এখুনি। চার জন মানুষ ছুটল আজ্ঞা বহন করতে। দলপতির নির্দেশে বাকিরা ওখানেই সটান শুয়ে ছিল। নোটোমন মাটি ঘষরে ঘষড়ে গিয়ে পৌঁছাল আহিকের কাছে। ফিসফিস করে বলল, ওরা খাবার নিয়ে এলে সব কিছু সূর্যদেবারার সামনে এনে রাখো।

নোটমন তার মূর্তিকে সূর্যদেবারা বলায় তৃপ্ত হয়েছিল আহিকের মন, অন্তত একজনের কাছে তার পরিশ্রমের ফসল পৌঁছে দেওয়া গেছে। কিন্তু মাংস রস কেন আনতে হবে এখানে?

নোটোমন তার উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়, এখন তার সময়ও নয়। হুকুম দিল শুধু। কারো সাধ্য নেই সেটা অগ্রাহ্য করে। সব খাবার মূর্তির সামনে স্তূপ করে রাখা হল। আহিক পাথরের মূর্তির গোড়া ধরে শুয়ে রইল। দলের অন্য সবাইও।

খাবারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে রইল শুধু নোটোমন। উড়ন্ত শলাকা ছুঁড়লে তাকেই বিদ্ধ করবে আগে।

নোটোমন নিজেও জানে না কী করছে, কী করাচ্ছে তার মানুষের দলকে দিয়ে। কিন্তু অনুভব করল যে কোন যুদ্ধের আগে যেরকম উত্তেজনা ও আশঙ্কা গ্রাস করে তাকে, আজ সেরকম হচ্ছে না। এমন কী যখন ওই অন্য মানুষের দল তাদের সবাইকে ঘিরে দাঁড়াল তখনো নয়। দলের সবার মাথা মাটিতে ছোঁয়ান, তাদের জানার কথা নয়। দলপতির নির্দেশ না পেলে তারা মাথা তুলবেও না। নোটোমন যে কোন মুহূর্তে আঘাতের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সেরকম কিছু হল না। এই দলটাও এসে কেমন চমকে গেছিল। লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল তারা। অথচ তাদের জন্য সব খাবার সাজিয়ে এরা যে এমন আত্মসমর্পনের ভঙ্গিতে শুয়ে থাকবে একবারও সেটা ভাবেনি। থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সবাই। এই দলের নেতা নোটমনের সামনে এসে দাঁড়াল।

আহুসাকা। নিজের বুকে হাত চাপড়ে বলল এই নতুন মানুষ।

নোটোমন। নিজের বুকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলতে বলতে অতি ধীরে উঠে দাঁড়াল নোটোমন। মেপে নিচ্ছিল এই লোকটাকে। যদি তার পরিকল্পনায় কাজ না দেয় তাহলে সামনা সামনি লড়তে হবে। এরা অনেক খাটো চেহারার। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিল নোটোমন। সামনা সামনি লড়াইতে তার দল জিতে যাবে। 

এটা কী?

লোকটার কৌতূহল জাগাতে পেরেছে বুঝে খুশি হল নোটোমন। এক হাতে অস্তায়মান সূর্যের দিকে দেখিয়ে বলল, সূর্যদেবারা। আকাশের আলো এই পাথরের মধ্যে বন্দী? বলতে বলতে অবাক বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল আহুসাকার।

আমাদের রক্ষক, আমাদের দলপতি।

আহুসাকার ভাবনা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিল না কিভাবে এই পাথরের দলপতির সঙ্গে লড়া যায়। তার পদক্ষেপ হঠাত কেমন অনিশ্চিত।

অস্তিত্বহীন সত্যের উদ্ভাসে আলোকিত নোটোমন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, সূর্যদেবারা! এই আলো, এই মাটি, এই গাছ, পশু পাখি মানুষ সবার দলপতি।

এবার আহুসাকা অবাক চোখে ওই পাথরের মূর্তির দিকে এগিয়ে গেল এক পা এক পা করে। এই পাথরের খোদাই করা সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। এই পাথরের মূর্তির কাছে মানুষের দলটির সম্পূর্ণ আত্মসমর্পন তাকে ভাবাচ্ছিল আরও বেশি। 

সেই অস্ফুট বিস্ময় তার ঠোঁটে জেগে উঠল, সূর্যদেবারা!

সবার গলায় উপচে পড়ল সেই বিস্ময়। সূর্যদেবারা!

আহিকের ডাকে তার দলের সবাই এবার ধীরে ধীরে উঠে বসল। সমস্বরে উচ্চারণ করল সূর্যদেবারা।

আকাশের সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু আজ এক অন্য দিন। সূর্য চলে গিয়েও যায় নি। নিজেকে রেখে গেছে এই পাথরের মূর্তিতে। যার চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে বসে দুটি দল ঘোড়ার মাংস এবং রস পান করছে। আলাদা দলের হয়েও এক বিশাল ছাতার তলায় এসে যাচ্ছে ওরা। তাদের কাছে এসেছে সূর্যদেবারা, যাকে বিশ্বাস করে সব আশঙ্কা ঠেকিয়ে রাখা যাবে।

আহিক রস পান করতে করতে আকাশ ভাসানো চাঁদের রূপ দেখছিল। ভাবছিল সূর্যের মত চাঁদকেও পাথরে খোদাই করা যায় কিনা। পাথরে রাতের আলোর চেহারা কেমন হবে সেই নিয়ে মনে কোন দ্বিধা নেই। মিলনের শেষে এরকমই স্নিগ্ধতা দেখেছে বেনকুয়াশার তৃপ্ত শরীরে।

-------------------





লেখক পরিচিতি:
বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
কথাসাহিত্যিক
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন