বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

সুজয় দত্তের তিনটি গল্প : নষ্ট, প্রয়োজন ও অধিকার

১. নষ্ট

শনিবার সকাল আটটা পনেরো। দোতলার গ্রিল না-দেওয়া খোলা বারান্দায় ব্রেকফাস্ট টেবিলে সকলের প্লেটে দুটো করে সবুজ সবুজ মেথির পরোটা। সঙ্গে অনেকটা কিমা, আচার আর চিলি সস।

সকাল আটটা সাতচল্লিশ। টেবিলের খালি প্লেটগুলোয় শুধু কিমার হলুদ তেলের ছাপ আর আচারের লাল দাগ -- শুধু একটি প্লেট ছাড়া। সেখানে একটা মেথির পরোটা তখনও না-ছোঁয়া। সবাই কি সাত-সকালে অত খেতে পারে?

সকাল নটা এগারো। রাস্তার উল্টোদিকের তিনটে বাড়ী পরে যে গোলাপী রঙের পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ীটা, তার চারতলার রান্নাঘরের জানলায় প্রবল তাড়া খেয়ে একটা কাক পড়িমরি করে উড়ে এসে বসল রাস্তার এদিককার বেঁটে নারকোলগাছটায়। সেখান থেকে কিন্তু সোজা দেখা যায় সেই গ্রিল না-দেওয়া দোতলার বারান্দা।

সকাল নটা পনেরো। দুটো ব্যস্ত হাত ব্রেকফাস্ট টেবিলের এঁটোকাঁটা পরিষ্কার করছে। প্লেটগুলো সবই খালি, কারণ বেঁচে যাওয়া মেথির পরোটাটা ও-ই নারকোলগাছের মাথায়। সেখানে তখন উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা আর স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি ওটা নিয়ে। 

সকাল নটা আঠেরো। রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরদের এলাকাদখলের লড়াইয়ে হেরে গিয়ে খোঁড়াতে থাকা একটা কঙ্কালসার কুকুরের মাথায় ঝপ করে যেটা পড়ল নারকোলগাছ থেকে, সেটা পাওয়া আর হাতে চাঁদ পাওয়া একই ব্যাপার। একদিকটা একটু ঠোকরানো, ত্রিকোণাকার সেই বস্তুটিতে লেগে আছে মাংসের কিমার অপ্রতিরোধ্য সুগন্ধ। তিনদিনের উপোসী পেট লালা ঝরাচ্ছে উদ্দাম।

সকাল নটা কুড়ি। অ্যাই অ্যাই অ্যাই -- সামলে! একটা অসতর্ক সাইকেলের চাকা পিছনের পা-দুটোর ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল আরেকটু হলে। একে সামনের বাঁ পা-টা খোঁড়া, তার ওপর -- । নাঃ, এই রাস্তার ধারের নারকোলগাছতলায় বসে খাওয়াটা নিরাপদ নয়। সামনের ওই বাঁধানো চাতালটায় বরং --

সকাল নটা বাইশ। মুদীর দোকান 'মনোরমা স্টোর্সের' মালিক তার বাঁধানো চাতালে রাস্তার একটা নোংরা কুকুর উঠতে দেখে লাঠি নিয়ে তেড়ে এল। পিঠে লাঠির ঘা পড়তেই মুখের জিনিস ফেলে রেখে খোঁড়া পায়েই চোঁ-চাঁ দৌড় সেখান থেকে।

সকাল নটা সাতাশ। সেই চাতালের শেডের এককোণে একগাদা পুঁটলিপত্তর আর চট-টট নিয়ে সংসার পেতে বসা পরিবারটির দুটো বাচ্চার চোখে পড়ে গেছে মুদীর দোকানের সামনে গড়াগড়ি খাওয়া সবুজ রুটির মতো জিনিসটা। ত্রিকোণের আদ্ধেকটাই এখন আর নেই। সে যাই হোক -- খিদের তো আর জ্যামিতি হয় না, তাই তাদের মধ্যে একজন দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এসেছে ওটা।

সকাল নটা একত্রিশ। ঝাল-মিষ্টি লাল সস লাগানো সেই সবুজ অর্ধত্রিকোণ তখন উধাও। পুঁচকে দাদাটি ঠোঁট চাটছে। সমান ভাগ না পেয়ে ছোট ভাইটা তার বিরুদ্ধে তারস্বরে নালিশ জানাচ্ছে।

এইভাবেই শেষমেষ নষ্ট হল একটা বাড়তি মেথির পরোটা। সময় লাগল ঠিক এক ঘন্টা ষোলো মিনিট। দারিদ্র আর শিশু-অপুষ্টি নিয়ে একটা লেকচার বা সেমিনারের জন্য যথেষ্ট সময় সেটা -- তাই নয় কি? 



২.  প্রয়োজন

একফালি বন একটা। শহরের সীমানার ঠিক গায়ে। কতই বা একর হবে? কিন্তু গাছ আছে অনেকরকম। বিশাল সুগার মেপল, ছোটখাটো জাপানী মেপল, কাঁটায় ভরা হথর্ন, ফুলে ভরা রেডবাড আর ডগউড, ওক, অ্যাশ, পাইন, জুনিপার -- কত কী। সেই বনে এক হথর্ন গাছের ডালের খাঁজে একজোড়া বুলবুলি পাখী বাসা করেছিল। তাতে পেড়েছিল দুটো ছোট্ট নীলচে ডিম। ডিমের সুরক্ষার জন্য হথর্ন গাছের ঝুপসি পাতার আড়াল আর বড় বড় কাঁটার খুব প্রয়োজন ছিল ওদের। ওরা জানত না, যতই আড়াল থাক, কাছেই একটা জাপানী মেপলের মগডালে বসে ওদের বাসার দিকে একদৃষ্টে নজর রাখছে একটা রেড-উইংড ব্ল্যাকবার্ড। তাকেও যে খুঁজতে হবে সঙ্গিনী, গড়তে হবে পরিবার -- সময় তো মাত্র কয়েক মাস। তারও একটা তৈরী বাসার বড় প্রয়োজন। পাখীরা নজর করেনি, কিন্তু অল্প দূরের একটা ওকগাছের কোটর থেকে বারবার উঁকি দিয়ে ওই নীলচে ডিমদুটোকে একঝলক করে দেখছিল একটা ধূসর কাঠবিড়ালী। আসলে ওদের তো শুধু acorn আর বাদামটাদাম খেয়ে থাকলে চলে না সবসময়, একটুআধটু ওসবও চাই যে। গরমকালে আর শরৎকালে পেট ভরে খেয়েদেয়ে চর্বি জমিয়ে গায়ে গত্তি না লাগালে শীতের ওই অতগুলো মাস বরফের চাদরের তলায় গর্তে সেঁধিয়ে থাকবে কী করে? না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরবে তো। তাই পাখপাখালির বাসা থেকে ডিম চুরিটাও ওদের প্রয়োজনের মধ্যেই পড়ে। অবশ্য কাঠবিড়ালীর নিজেরও আছে উড়ন্ত বিপদ। ওই বনেরই একটা অনেক উঁচু সুগার মেপল গাছের ওপর ঘাঁটি গেড়ে আছে এক বাজপাখী। তার বাঁকানো ঠোঁট আর তীক্ষ্ণ নখের কাছে বুলবলি, ব্ল্যাকবার্ড, কাঠবিড়ালী -- সব সমান। সবাই সম্ভাব্য শিকার। আর শিকার না করেই বা উপায় কি তার? বাসায় কদিন আগেই ডিম ফুটে বেরোনো দু-দুটো বাচ্চার রাক্ষুসে খিদে তো তাকে একাই সামলাতে হয়। তাই ঘন ঘন শিকারের খোঁজে যাওয়াটা ওর খুবই প্রয়োজন।

তারপর? তারপর আর কি -- যা হওয়ার তাই হল। বাচ্চা বুলবুলিদেরও আর পৃথিবীর আলো দেখা হল না, রেডউইং ব্ল্যাকবার্ডদেরও আর সংসার পাতা হল না, কাঠবিড়ালীরও আর হলনা শীত অবধি বাঁচা। না না, ব্ল্যাকবার্ড বুলবুলিকে বাসা থেকে উচ্ছেদ করল বলে নয়, কাঠবিড়ালী তার ডিম্ চুরি করল বলে নয়, বা বাজপাখী এসে ওদের সবাইকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল বলেও নয়। 

আসলে ওই বনের সীমানা পেরোলেই ইঁট-কাঠ-লোহা-কংক্রিটের যে আরেকটা জঙ্গল আছে, সেখানে অন্য একরকম জন্তু থাকে। তারা দুপায়ে হাঁটে আর দুহাতে ধ্বংস করে। শোনা যায় তারা আবার নাকি বিধাতার সবসেরা সৃষ্টি, পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানোর জন্যই নাকি তাদের জন্ম। তো তাদের একদিন খুব প্রয়োজন হল খানিকটা জমির। ওই শহরের পাঁচনম্বর সিনেমাহল, এগারো নম্বর বিউটি সেলুন আর উনিশ নম্বর রেস্তোরাঁটা তৈরী না করতে পারলে ওদের একেবারে মরণবাঁচন সমস্যা তো -- তাই। একদিন সকালে বিরাট বিরাট দাঁত-নখ-খেঁচানো রাক্ষসের মতো সব যন্ত্রপাতি এনে তারা ধরল ওক-মেপল-জুনিপার-হথর্ন-পাইন আর অ্যাশদের গোড়ায়। ওরা সব বিনা-প্রতিবাদে, বিনা-প্রতিরোধে, নিঃশব্দে একে একে শুয়ে পড়ল মাটিতে। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে হয়তো স্বপ্ন দেখছিল আবার জন্মেছে দুপেয়েহীন অন্য কোনো এক সবুজ পৃথিবীতে, যেখানে শুধুই ওরা আর বুলবুলি-ব্ল্যাকবার্ড-কাঠবিড়ালীরা। তবে ওটাতো স্রেফ স্বপ্ন। বাস্তব পৃথিবীতে তো এই গল্পে যা হল তাইই হয়। ওটাই তো স্বাভাবিক। এই নিয়ে আবার এতো কথা বাড়ানোর কী আছে, হ্যাঁ? 



৩.  অধিকার

একান্নবর্তী পরিবারের মেজোভাইয়ের ছেলেকে একদিন তার বাবা অফিস-ফেরত একবাক্স রংপেন্সিল আর এক প্যাকেট স্কেচপেন এনে দিতেই তার জ্যাঠতুতো দাদার কান্নাকাটি -- "ও পাবে আর আমি পাব না কেন? আমি বড় না?" অর্থাৎ বড়র অধিকার ফলানোর চেতনাটা জগতে শুরু করেছে তার শিশুমনে। কিন্তু শুধু কান্নাকাটিতে না আটকে থেকে সে যখন জোর করে কেড়ে নিতে গেল জিনিসদুটো তার ছোট্ট ভাইয়ের হাত থেকে, ঠাস করে একটা চড় এসে পড়ল তার গালে। তার কাকার কাছ থেকে। স্বাভাবিক। অধিকার ফলাতে এলে অধিকারের সীমাটাও জানা দরকার। অবশ্য তার পরেই সে যখন কাঁদতে কাঁদতে তার বাবা-মার কাছে গিয়ে নালিশ করল, তখন অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত স্বয়ং তার কাকা। অর্থাৎ বাড়ীর মেজোভাই। আর সে-অভিযোগ এলো তাঁরই বৌদির কাছ থেকে, "ও অন্যায় করলে ওকে বোঝাও, বকো, কিন্তু আমার ছেলের গায়ে হাত দেবার অধিকার তোমায় কে দিল?" এই নিয়ে যে বচসা শুরু হল সেদিন সেই পরিবারে, তাতে মধ্যস্থতা করতে এসে সেজোভাই শুনল, "যা যা, আগে সংসারে মাসে মাসে একটু বেশী করে টাকাপয়সা দে, তারপর কথা বলতে আসিস"। মানে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হল তার ক্ষেত্রে অনধিকারের প্রাচীরটা অর্থনৈতিক। এই অপমান দেখে তার এগারো-ক্লাসে পড়া ছোটভাই যখন সহানুভূতি জানাতে এল, সে সেজদার মুখে শুনল, "তুই পড়গে যা, সামনে পরীক্ষা, এসব বড়দের ব্যাপারে নাক গলাস না। ছোট ছোটর মতো থাক।" 

সে-রাতের সেই তুমুল ঝগড়াঝাঁটি দোতলা ভাড়াবাড়ীটার অন্য বাসিন্দাদের শান্তিভঙ্গ করে থাকবে। পরদিন অভিযোগ পেয়ে বাড়ীওয়ালা এসে পরিবারের কর্তার, মানে বড়ভাইয়ের, সঙ্গে দেখা করে ভদ্রভাবে বলে গেলেন এভাবে আশপাশের ভাড়াটেদের উত্যক্ত করলে পরের বার লিজ রিনিউয়ালের সময় তাঁকে ভেবে দেখতে হবে করবেন কিনা। ঘটনাচক্রে সেদিনই বিকেলের দিকে ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের লোক এসে বাড়ীওয়ালাকে নোটিস দিয়ে গেল, অনেকদিন ধরেই যে এবাড়ীতে রাস্তার পোস্ট থেকে বেআইনীভাবে বিদ্যুৎ টেনে নেওয়া হচ্ছে তার ওপর তাদের নজর আছে আর অবিলম্বে এটা বন্ধ না করলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনকে রাজ্যসরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রক চিঠি দিয়ে জানাল যে, দেশীয় বাজারে খনিজ তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাসের সুলভ সরবরাহের দরুন এবং সবকটি উৎপাদন কেন্দ্র ঠিকঠাক কাজ করায় সম্প্রতি তাদের যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, তা দেশের অন্যান্য রাজ্যে রফতানি করে মুনাফা করার এক্তিয়ার তাদের নেই। সেই মাসের শেষে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যসরকারকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারী দিল যে, রাজ্যের প্রশাসনিক অব্যবস্থায় পঙ্গু অর্থনীতিকে ধুঁকতে ধুঁকতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ইচ্ছেমতো যখন তখন কেন্দ্রের কাছ থেকে ওভারড্রাফট বা ঋণ নেওয়াটাকে তারা যেন তাদের সাংবিধানিক অধিকার বলে ভেবে না বসে। একই বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি জরুরী বিজ্ঞপ্তিতে জানাল যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈষম্যমূলক আচরণ ও তাদের সামাজিক অধিকাররক্ষায় ব্যর্থতার জন্য অদূর ভবিষ্যতে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করার কথা ভাবছে সংস্থাটি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পশ্চিমী দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর ও বিত্তশালী রাষ্ট্রটি বিশ্ব মানবাধিকার কমিশনকে দ্বর্থ্যহীন ভাষায় হুমকি দিল, সে-দেশে জাতিগত বৈষম্য ও সেই সংক্রান্ত বিক্ষোভ-আন্দোলনে পুলিশী উৎপীড়নের সমালোচনা করে সংস্থাটি যেন তার 'অধিকারের' সীমা লঙ্ঘন না করে -- যেন মনে রাখে কে তাকে সবচেয়ে বেশী আর্থিক অনুদান দেয়।

ব্যস, এখানেই কি শেষ? অধিকারের এই ধাপে ধাপে ওঠা সিঁড়িতে এর পর কি আর ধাপ নেই কোনো? তাকিয়ে দেখ। সেই মহাশক্তিধর দেশটি জুড়ে একের পর এক খরা, দাবানল, প্রলয়ঝড়, বন্যা, মহামারী -- এরা সবাই মিলে সমস্বরে বলছে "আছে, আছে, আছে। হে নশ্বর মানুষ -- তুমিই শেষ কথা নও।"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন