বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

মধুময় পালের গল্পঃ আকাশবাণী কলকাতা


ঘোড়াগড়ি এসে দাঁড়াল। খুরের শব্দ। বাদামি রঙ্গের উজ্জ্বল চ্যারিয়ট। মার্জিত পেতলের বাতিদান কোচোয়ানের আসনের দু পাশে। ছিটকিনি খুট করে সরে দরজা খুলল। ঘোড়ার ঘামের গায়ে নরম জ্যোৎস্না। শিবতলার লাউমাচা আর পাতিলেবুর পাতায় পাতায়, মাজারের আমগাছের ডালে ডালে, গির্জার পাঁচিল ঘেষে ঝুলে থাকা অজস্র নোনাফলে চাঁদের আলো উড়ছে। দূরে, যেখানে নক্ষত্রের ঘরবাড়ি নিয়ে আকাশের রাজ্যপাট, ডিঙ্গির মতো একটা মেঘ ছিল। ঘোড়া একবার ডাকলো চিহি, গলায় বাঁধা ঘুঙুর বাজিয়ে, কপালে বাঁধা পাখিরপালক রচিত রাজকীয়তা দুলিয়ে। ঘোড়ার রং, রোম, পেশি, গঠন, উচ্চতা প্রমাণ করে তার কৌলীন্য। সেই অশ্ব আকাশের দিকে রাত্রির দিকে স্তব্ধতার দিকে মুখ তুলে আরেকবার ডেকেছিল,চিঁ ইইহিহহি। যেন সে যুদ্ধক্ষেত্র প্রত্যাগত বিজয়ী অশ্ব , পিঠে নেই মৃতদেহ। সে আরও কয়েক পা ঠুকে মাটি থেকে শব্দ তুলে স্তব্ধতা ভাঙতে চায়। 

সে রাতে বেড়িয়ে এসেছিল এই বাড়িতে। চ্যারিটের গাড়ির দরজা খুলে বাতাসের মতাে নিঃশব্দে, শুধু একটা খুটি শব্দ ছিটকিনির । 

দাদা,এই দাদা, একটি কথা শুনবি। একটু দাঁড়া। তুই যেন ঘোড়া লাগামে রেখে এসেছিস! বলব? শুনবি তো? রাখবি তো? এবার পুজোয় আমি শাড়ি নেব না। লাগবে না। অনেক জমে গেছে। দাদা, একটা রেডিয়ো দিবি? আমাদের বাড়িতে রেডিয়ো ছিল। এখানে তো নেই। সেই ভাবুক বাচ্চার রেডিয়ো। ঠোঁটের নীচে আঙ্গুল রেখে তাকিয়ে থাকা বাচ্চাটা কি দুষ্ট। দাদা, দিবি তো। আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি। 

দাদা যেন ভাঁটফুল আকন্দ বোলমূলি করমচা বনকচু বুনোলংকা শনঘাস আর রাংচিতার ঝোপ পেরোতে পেরোতে শেয়াল কাঁটা এড়াতে এড়াতে জবাব দিয়েছিল, বাবা, তোমার মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। তার একটা রেডিয়ো চাই। বাবা, তোমার মেয়ে আর ছোট্ট তপু নেই। তোমার মেয়ে গান শুনতে চায়, পাঠ করতে চায়, ভোরে উঠে গান গায়, পঙ্কজ মল্লিকে কান পেতে রাখে, ছড়া থেকে ছবি হতে চায়, বাবা,মেয়ে তোমার গল্পে ডুবে বৃষ্টি ধরতে চায়। পুজোর আগে তো আসবে তুমি, মনে রেখো, তোমার মেয়ে আর ছোট্ট খুকি নেই। 

দাদার সঙ্গে ফুটতে ছুটতে তপু বলে, সেই ভাবুক বাচ্চা চাই, পদাবলীর গান চাই, দেবব্রত বিশ্বাস চাই, অনুরোধের আসর চাই, কাবুলিওয়ালার মিঠাই চাই। দাদা, লিখে দে বাবাকে, তোমার তপু বড্ড একা, মেমবাড়ি থেকে উড়ে আশা ঝরা নিমপাতার উঠোনে সারা দুপুর সারা বিকেল বসে থাকা। দাদা, এখন তো শ্রাবণ। আকাশ নীল হয়ে বাবার আসতে অনেক দেরি। 

উকিলবাড়ির পুকুরে ঝুপ করে শব্দ হয়, যেন একটা মেঘ ডুব দিলো। 

বাবা আসছে শুনলেই তপু দেখতে পায় আরিচাঘাটে পদ্মার ঢেউ আর ঢেউ ভেঙে স্টিমারের চলা। 

মনে পড়ে অবিনাশ কাকার কথা। শেরপুরে চারু সাহা, মানে তপুর বাবা দোকানের বিশ্বাসী অবিনাশ সাহা। সবার অবিনাশ কাকা, কেউ কেউ বলে অবিন চাচা। দোকান তো নয়, লোকে বলে বারোকপাটের বাজার। সেই বাজারের ম্যানেজার অবিনাশ কাকা। লোকে বলে, বেঁচে থাকতে এবং মৃত্যুর পর যা যা লাগে, সব, আঁতুড়ঘরের পাতিল আর শঙ্খ প্রদীপ কাজললতা থেকে শ্মশানযাত্রার অগুরুচন্দন, পিন্ডের উপকরণ, লক্ষীর পাঁচালি থেকে শ্রাদ্ধের মন্ত্র, সব আছে চারুসা-র দোকানে। সেই অবিনাশকাকার হাত ধরে শেরপুরের বাড়ি ছেড়েছে তপু আর তার দাদা। দিনকাল ভালো নয় শেরপুরে। চারদিকে হাঙ্গামা। কখন কী হয় কওন যায় না। তাই বাদলরে আর তোমারে কলকাতায় পাঠায়া দিলেন কর্তামশায়। মা-ঠাকরণ কয় মাস থাকবো তোমাগো লগে। তিনি চইলা আইলে তোমরা ভাইবইনে থাকবা। ভয় কী ? ছয় ঘড় ভাড়াইটা আছে। গিয়াসউদ্দিন চাচা আছেন। সৰ ব্যবস্থা কইরা রাখছেন তিনি। এই যে বিনিময়ের ঘরবাড়ি হইল, কার জইন্য হইতে পারল? গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী। তেনার এক বন্ধু শেরপুরে তোমাগো বাগানবাড়িটা নিল। 

অবিনাশকা, তুমি কি আসছ পদ্মার ঢেউ ভেঙে ভেঙে? যে পথ দিয়ে আমাদের চলে আসতে হল। ছোটবেলার সব ভালো লাগা ছেড়ে। অবিনাশকাকা শোনো, বাবাকে বলবে আমার একটা রেডিয়ো চাই। বলবে, তোমার তপু বড্ড একা। বলবে, তোমার তপু বড়ো হয়েছে। তার অনেক না-জানা জমেছে। ভাড়াটেদের সঙ্গে কথা হয়, গল্প হয়। তবু বড্ড একা । নিমপাতা উড়ে আসে মেমবাড়ি থেকে। আমরা রেডিয়োর সামনে বসে গল্প শিখতে পারি, গান শিখতে পারি। 

বাবা আসছে শুনলেই সেই ঘোড়া্গাড়ি ভেসে ওঠে। যেন ওটা কোনো আবছা অন্ধকারে ডুবে থাকে ঋতুচক্র জুড়ে। একবারের বেশি আরিচাঘাট বা পদ্মা দেখেনি তপু। রেলগাড়িতেও উঠেছে একবার। সেই দেশ থেকে পালানোর সময়। ঘোড়াগাড়ি দেখে রোজ। বাড়ির দরজা দিয়ে যায়, স্কুলের জানালা দিয়ে যায়, মসজিদবাড়ির সামনে উথলে-ওঠা গঙ্গাজলে ঘোড়াদের স্নান হয়, গির্জার পেছনে মাঠছড়ানো রোদে ঘুরে ঘুৱে ঘাস খায় দুটো চারটে ঘোড়া, সিনেমাহলের সামনে দাঁড়িয়ে হাক দেয় কোচোয়ান। তবে বাবা যে গাড়িতে আসে সেটা অন্যরকম। অবিনাশকাকা বলেছে,কর্তামশাইর জন্য পার্কসার্কাসের ঝাউতলা থেইকা গাড়ি আসে। ঘোড়ার বডি হইব রেসের ঘোড়ার মতোন। চৌধুরী গিয়াসউদ্দিন সাহেব নিজের ব্যাভারের গাড়ি পাঠাইয়া দেন। 

অবিনাশকাকা, তুমি তাে আগের মতো আসো না এখন। আগে মাঝে মাঝে আসতে। সাতদিন ধরে মহাজনের ঘরে ঘরে বাজার করে মাল পাঠাতে শেরপুরে। এখন আসা কমেছে, থাকা কমেছে, মাল পাঠানোও কমেছে। তুমি বলতে, একটা একটা কইরা কপাট বন্ধ হইতাছে। কর্তা মশাই বুঝছেন, শেরপুরের দিন ফু্রাইল। ইন্ডিয়ায় চইলা যাইতেই হইব। তবে কি বাবা-মা এবার চলে আসবে? এই ঘিঞ্জি বাড়িতে বাবা-মা কি থাকতে পারবে? আগে আসুক। ,দাদা, মা কি বরাবরের জন্য চলে আসবে? 

আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি ...

উকিলবাড়ির পুকুর থেকে দুটো বক উড়ে এল গির্জার কার্নিশে। বন্ধ জানালার খড়খড়ি তুলে কেউ হয়তো সূর্য দেখল। 'প্রভু কহিলেন, আমার ব্যথিত সন্তানগণ”--, লেখাটা পার করে ফুটপাথে জ্যালজেলে বস্তা পেতে বসেছে কুচো মাছের তিন জেলে ও জেলেনি। বড়ুয়া বেকারির নোংরা গলি থেকে কেক বোঝাই করে সরসরিয়ে নেমে এল চারটে সাইকেলভ্যান। 

পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, শরণার্থী সমস্যার সমাধান আমরা প্রায় করে ফেলেছি। রাজ্যের প্রান্তিক এলাকাগুলির কয়েকটি শিবির থেকে ত্রাণবণ্টনে কিছু বৈষম্যের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরও মানবিক হতে বলেছেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী। শরণার্থীদের নিয়ে রাজনীতি না করার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, বাস্তুহারাদের দুর্ভোগের অবসানে প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা চায় রাজ্য। 

কয়টা অতিসাইরা দেশটা ভাগ কইরা ছাড়ল। আমরা ব্যাবাক চুপ থাকলাম। এত বড় পৃথিবীতে আমাগো একটা দ্যাশ চাই। এক ইঞ্চি নিজের জমিও নাই। ঘর থেকে খড়ম পায়ে কোণাকুণি উঠোন পেরিয়ে পেচ্ছাবখানার দিকে যান শ্যামলবরণ দত্ত। পাবনায় স্কুলমাস্টার ছিলেন। এখন উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন। শিবতলার মাঠের চালাঘরে অস্থির কয়েকটি বালক-বালিকাকে পড়ান বিকেলে। যৎসামান্য পারিশ্রমিকে। ডয়াবেটিক। হাড্ডিসার শরীর। 

দাদা, উঠবি তো! সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। আমাকে আজ কলেজে যেতেই হবে। সোনাদি এখনই এসে পড়বে। সকালে বাজারে যাবি বলছিলি। ওঠ। 

আকাশবাণী কলকাতা। রবীন্দ্রসংগীত। আজকের শিল্পী সুবিনয় রায়… 


অ্যাই বৃষ্টি! আজ কেন মেঘ দেখছি না তোমার? কাল ডানা ভিজিয়ে নেমেছিলে শ্রাবণের দুপুরে। পা ছুঁয়ে খেলেছে জলধারা। 

কার্তিক, কাল অনেক রাত পর্যন্ত ছবি এঁকেছিস। ঘরে আলো দেখেছি। 

তুমি জেগে ছিলে? 

তবে কি ঘুমিয়ে দেখলাম? 

আসোনি কেন? 

অ্যাই পাঁজি। সাহস বেড়েছে? 

আমি তো তোমাকে একা একা অ্যাই বৃষ্টি ডাকি। সবার সামনে কী বলি ? তপু দি। সাহস কোথায় দেখলে? 

আস্তে। আমি যে ডাকি আইপাজি। অ্যা ই পা জি। 

শিল্পী সুবিনয় রায়.. 
মাটির প্রদীপখানি আছে মাটির ঘৱের কোণে/ 
সন্ধ্যাতারা তাকায় তারি আলো দেখবে বলে ॥ 
সেই আলোটি নিমেষহত প্রিয়ার ব্যাকুল চাওয়ার মতো,/ 
সেই আলোটি মায়ের প্রাণের ভয়ের মতো দোলে। 

বাসনমাজা, কাপড়কাচা, গা-ধোওয়া, কলতলার শ্যাওলাঘষা, কয়লাভাঙ্গা ও আরও অনেক জৈব শব্দের সঙ্গে আধি-দৈব দুঃখকষ্টকান্না জড়িয়ে জেগে ওঠা বস্তিবাড়ি এসময় খেলাপ্রবণ শিশুদের কলরবে ভরে যায়। 

পুকুরের জল ভাবে, চুপ করে থাকি-- 
হায় হায়, কী মজায় উড়ে যায় পাখি। 
তাই একদিন বুঝি ধোঁয়া-ডানা মেলে/ 
মেঘ হয়ে আকাশেতে গেল অবহেলে/ 
আমি ভাবি ঘোড়া হয়ে মাঠ হব পার/ 
কভু ভাবি, মাছ হয়ে কাটিব সাঁতার/ 
কভু ভাবি , পাখি হয়ে উড়িবো গগনে/ 
কখনো হবে না সে কি ভাবি যাহা মনে। 

কার্তিক, ঘরে আছো? 
হ্যাঁ, প্রীতিময়দা। বলুন। 
কী করছো? 
চা বসিয়েছি। খাবেন? জল এক কাপ বাড়িয়ে দিই। 

সকাল থেকে দু রাউন্ড হয়ে গেল। রতনের চা দিয়ে ভোরের দরজা খুলল। বুঝতেই পারছ। আমার বাথরুম প্রায় সূর্যোদয় লগ্নে। তা ছাড়া দেরী হলেই লাইন লেগে যায়। তোমার বউদি একটু দেরি করে ওঠে। অনেক দিনের অভ্যেস। প্রাক বিয়ের চলন-বলন কি বিয়ের মন্ত্রে মুছে যায়? 

আসুন, ঘরে আসুন। এখানে বসতে হবে মাটিতে। এতটুকু ঘরে তক্তপেশ ঢোকালে জায়গা আর থাকে কীভাবে? মাটির হাতেই বেশ আদরে আছি। মাদুরটা বিছিয়ে দিই। বসুন। 

ওগুলো সবই ছবি। 
হ্যাঁ। ছড়ানো ছিল। জড়ো করে কোনায় রেখেছি। দেখবেন? 
এখন নয়। একটু বাদেই তোমার বউদি ডাকবে। ডিউটি যেতে হবে। কয়েকটা ছবি আগে দেখেছি। আমি বুঝি না। তবে বেশ লেগেছে গ্রামের দৃশ্য। ল্যান্ডস্কেপ। চাষি, জেলে, গরুর গাড়ি, মেঠোপথ, ধানের গোলা, দোচালা মাটির বাড়ি। তুমি এ সব অনেক দেখেছ। 

আমাদের দেশটা কৃষকের দেশ, ফসলের দেশ, সরল শ্রমজীবী মানুষের দেশ। শহর ছেড়ে একটু গেলেই দেখবেন গ্রামের আসন পাতা। 

তপু তোমার খুব প্রশংসা করে। বলে, কার্তিকের মতো ছেলে দেখিনি। যেমন ছবি আঁকে, তেমনি কাগজ ভাঁজ করে, কেটে, জুড়ে কত রকম খেলনা বানায়। হাতের কাজ সুন্দর বলেই দুটো পয়সা রোজগার হয়। বেশি দাম চাইতে পারে না, লজ্জা হয়। গাঁয়ের বাড়ি ছেড়ে, বাবা-মাকে মেয়ে এখানে একা একা থাকা বড়ো কষ্টের। খাওয়া দাওয়ার ঠিক নেই। তপু বলে, তুমি যদি সাইনবোর্ড লেখো, ভাল পয়সা পেতে পারো। 

হ্যাঁ, আমাকে বলেছে। 

একটা কবিতা শুনলে, কার্তিক? কাল সন্ধ্যায় লিখেছি। বিয়ের আগে সময় পেতাম। বিয়ের পর দু মাসে এটাই প্রথম লেখা। শুনবে?
পড়ুন। 

একটি চুমু খেয়েছিলাম সমুৎপন্ন সর্বগ্রাসে 
নীরব তুমি সরব তুমি ছড়িয়ে দিলে ঘাসে ঘাসে 

দূরে কোথায় এখন তুমি গাংচিলে কি ফেরিঘাটে 
পুড়ছিল সব আগুন যত হৃদ্‌ব্যথাতুর বাসরখাটে

আমার ঠোঁটে জড়িয়েছিল মায়ামাতন 
তোমার ঠোঁটে ফুল্ল কুসুম মনউচাটন

ছিল না ঠোঁট নিখিল বিশ্বে,দূরসকাশে 
একটি চুমু এসেছিল সমুৎপন্ন শস্যভাষে 

হাতে হাতে ঘষলে নাকি জ্বলে ওঠে স্তব্ধ পাথর
হাত পেতেছে অতল খাদে আকুল এক জলের 'আদর

মাটি ফাটছে নির্জলা দেশ উড়ন্ত বিস্তারে
তুমি নেই কোত্থাও নেই, আছো শুধু মিথ্যাচারে

শুদ্ধ ঘৃত অম্বুবাচী শাস্ত্রাচারে উপবাসে
একটি চুমু ভেবেছিলাম অন্ধরাষ্ট্র ত্রাণ আবাসে

শুনছ। রান্না বসাতে হবে তো। আজ উনুন ধরাতে ইচ্ছে করছে না। গুল বাড়ন্ত। কেরোসিন তেল নিয়ে এসো। এক লিটার হলেই হবে। স্টোভে ভাতে ভাত করে নেব একবেলা। ওবেলা হিরণদির মেয়ের জন্মদিনের নেমন্তন্ন।

আমার ভালাে লেগেছে, প্রীতিময়দা। তবে সত্যি বলতে কী সবটা বুঝিনি। 
পরে কথা হবে। তোর ছবি আমি সবটা কি বুঝি? না-বোঝা জ্যোৎস্নার পর্দা ওড়ে। আলো কিন্তু ছায়া।

অ্যাইবৃষ্টি, আমরা কোথাও চলে যাবো। দূরে, একটার পর একটা টিলা পেরিয়ে। কৃষকের দেশে। ভয় থেকে দূরে। ফসলের শ্রমের, ফসলের গন্ধের আশ্রমে। জানো না সে দেশ আমার চেনা। তোমারও। দেখলেই মনে পড়বে। বহু বছরের ঘুম থেকে জেগে রাজকুমারী যেমন চিনে নেয় তার বাড়িঘর, চিনে নেয় কোথায় ছিল পদ্মদিঘি আর কোথায় আস্তাবল। আমাদের রক্তের ভেতর এই সব চেনা খেলা করে। যাবে তো তোমার অ্যাইপাজির সঙ্গে? ফসলের ক্রমাগত জন্মসাধে কেটে যাবে আমাদের সকাল দুপুর। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ভাতের শব্দে গন্ধে তুমি গান গাইবে, আমি ছবি আঁকব। অ্যাইবৃষ্টি!

বাবা, তুমি লিখেছ, এবার মাকে নিয়ে আসবে। মা এখানে থাকবে। বাবা, আকাশ এখন নীল হচ্ছে। সেই আরিচাঘাট, পদ্মার ঢেউ, রেলগাড়ি, ঘোড়াগাড়ি। কতদিন দেখিনি তোমায়, বাবা! তুমি কি এখনও সেই হাফ-হাতা সাদা শার্ট, ঢোলা পাজামা পরো। তোমার কপালে নেমে আসে কোঁকড়ানো চুল? সেই গোল চশমাটা আছে? এখনও কি হাতে হুঁকো নিয়ে বসো অবসরে, তামাকের গন্ধে চোখ বুজে আসে?

বাবা আসছে জানালেই রাতের নির্জনে দুয়ারে দাঁড়ায় চ্যারিয়ট। বাদামি রঙের উজ্জ্বল গাড়ি। মার্জিত পেতলের বাতিদান গাড়ােয়ানের আসনের দু পাশে। পার্কসার্কাসের ঝাউতলার চৌধুরী গিয়াসউদ্দিনের গাড়ি। ঘোড়া পা ঠোকে। নির্জনতা যেন ভেঙে দিতে চায়। নক্ষত্রের রাজ্যপাটের দিকে মুখ তুলে ডাকে চিঁহইইহিইইঁ। নীল আকাশ দেখছিল তপু। রাগসংগীতে থেমে গেছে রেডিয়ো । কে যেন গাইছে? তপু কান পাতে। মালতীদির ঘর থেকে ভেসে আসছে। নিচু স্বর। রেলপাড়ের রিফিউজি কলোনির মেয়ে মালতীদির বিয়ে হয়েছে নিধিরামের সঙ্গে। নিধিরাম সিএসটিসি-র কন্ডাক্টর। মাঝেমাঝে বাড়ি আসে না। কোথায় যেন যায়। যাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। মালতীদি গাইছে : কত না হাজার ফুল ফোটে ভুবনেতে/ তারই কিছু ফুল দিয়ে গাঁথা হয় মালা/ বাকি ফুল ফোটে অনাদরে মরে যেতে।


আপনারা শুনছেন আকাশবাণী কলকাতা ক..
পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কমিশনার বলেছেন...

আরে উজবুগ, আমরা শরণার্থী না। আমরা তগো দয়ায় বাঁচতে চাই না। আমাগো ঘর আছে। আমাগো উঠান আছে। একটা দুইটা ফুলগাছ আছে, ফলগাছ আছে, আছে, আলো আছে, ছায়া আছে, পাখি আসে, প্রজাপতি-ফড়িং আসে, আমাগো দুয়ারে কীর্তন আসে, ফকিরসাহেব আসেন, প্রতিবেশীগো বন্ধন আছে, এইটারেই তো দেশ কয়। আমাগো দেশ আছে, দেশঘর আছে। আমরা বিতাড়িত। অরা খেদাইছে। খড়মের শব্দ উঠোনের মাঝখানে থেমে যায়। ভাগের পলাতক, বিতাড়িত আমি শ্যামলবরণ দত্ত বলি কি, দিদিভাই, একটা গাছ লাগাও, তার পাতায় যেন মরণের আগে এক টুকরা দেশ পাই।
খড়ম কোণাকুণি হাঁটে পেচ্ছাবখানাব দিকে।

দাদা, কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলি তোরা? কোথায় গিয়েছিলি আগুনের মধ্যে? ওই সব ভয়ঙ্কর চিৎকারের মধ্যে? কারা যেন খুন করার তাড়নায় চিৎকার করছিল। কারা যেন খুন হয়ে যাবার ভয়ে চিৎকার করছিল। বোমা ফাটছিল। মালতীদি আমার ঘরের দরজায় আছড়ে পড়ল। গোঁ গোঁ করতে করতে একটা কথা বারবার বলছিল, দাঙ্গা, দাঙ্গা। ওরা মারবে। মেরে ফেলবে। কার্তিককে ডাকলাম। মালতীদি তখন জ্ঞান হারিয়েছে। কার্তিক শিবতলার মাঠ থেকে দৌড়ে এল। বাড়ির সবাই উঠোনে দাঁড়িয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। মায়েরা, শিশুরা। কার্তিক বলল, মশাল উড়ছে। এ বাড়িতেও পড়তে পারে। গােলামের বস্তি জ্বলছে। রহিমের হােটেল জ্বলছে। সাধুখাঁদের বাড়িতে, কচিদের বাড়িতে মশাল পড়েছে। কচিরা পালিয়েছে। মেয়ে-বউ-বাচ্চা সবাই। হাফিজ মিয়ার আস্তাবলে আগুন লেগেছে। ছিটকে বেরিয়ে এসেছে ঘোড়াগুলো । হয়তো হাফিজ মিয়া বাঁধন খুলে দিয়েছে। না হলে পুড়ে মরত। কার্তিক বলল, ঘরে থাকলে আমরাও পুড়ে মরব। তৈরি থাকুন, তেমন হলে মায়েরা বা শিবতলার মাঠে চলে যাবেন। তপুদি, বাদলদা ঘরে নেই? দাদা। তুই কোথায় গিয়েছিলি? মালতীদির চোখেমুখে জল দিতে জ্ঞান ফিরল। কেঁদে উঠে বলল, আমার মাকে ছেড়ে দাও, তোমরা আমার মাকে ছেড়ে দাও। বুঝতে পারিনি। কার্তিক বলল,স্মৃতি হয়তো পাকিস্তানে।

আমরা শিবতলার মাঠে খোলা জায়গায় দাঁড়ালাম। দেখলাম, আকাশে মশাল উড়ছে। এদিক থেকে ওদিক। ওদিক থেকে এদিক। দাদা, তুই কি মশাল ছুঁড়তে গিয়েছিলি? মশাল ছোঁড়ার দলে ছিলি? এত মশাল কোত্থেকে এল? এত বোমা? দাদা, আমাকে ফেলে যাস না। গিয়াসউদ্দিন চাচার গাড়ির ঘোড়ার মতো অবিকল একটা ঘোড়া এসে দাঁড়াল আমাদের দরজায়। পা ঠুকল। চিঁহি চিহি ডাকল। তাবপর চলে গেল গির্জার পেছনে মাঠের পথে। গিয়াসউদ্দিন চাচা কি আমাদের খবর নিতে পাঠিয়েছিল?

আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি..
পাকর্সার্কাস-বেনেপুকুর-এন্টালি এলাকায় বস্তি অধ্যুষিত অঞ্চলে গতকাল একটি গুজবকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সঘর্ষ বাধে।
দুষ্কৃতীদের আক্রমণে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর। কয়েকটি ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় কার্ফু জারি হয়েছে। সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে মুখ্যমন্ত্রী শান্তিরক্ষার আবেদন জানান। তিনি বলেছেন, যারা এলাকায় শান্তি নষ্ট করতে চায়, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে। জনগণকে নির্ভয়ে থাকতে এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে বলেছেন তিনি।
শ্যামলবরণ দত্তর খড়মের শব্দ শোনা যায়।

ভারতে ইংরেজের আবির্ভাব নামক ব্যাপারটি বহুরূপী; আজ সে ইংরেজের মুর্তিতে, কাল সে অন্য বিদেশির মুর্তিতে এবং তার পরদিন সে নিজের দেশি লোকের মূর্তিতে নিদারুণ হয়ে দেখা দেবে।
কোণাকুণি উঠোন পেরিয়ে খড়মের শব্দ পেচ্ছাবখানার দিকে চলে যায়।

তপু, একটা কথা বলি। ঠাণ্ডা মাথায় শোন। কার্তিকের সঙ্গে তোর মেলামেশা নিয়ে লোকে বলাবলি করছে। তুই বড়ো হয়েছিস। বুদ্ধি হয়েছে। বাবা-মা এখানে নেই। আমার ওপর তোকে দেখাশোনার ভার। তোকে আমি কোনোদিন বকিনি। কেন বকব? একটা বোন। বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে হয় যাকে, তাকে কি বকা যায়? বকবই বা কেন? তুই তো দুষ্টুমি করিসনি। কোনোদিন কথার অবাধ্য হোসনি। এমন কোনো আবদার করিসনি যা মানা যায় না। তুই যে অন্যরকম মেয়ে। তোকে কি বকা যায়? শুধু বলি, কার্তিকের সঙ্গে অতটা ঘনিষ্ঠতা অনেকেরই চোখে লাগছে।

প্রীতিময় বললেন সেদিন। ওঁর স্ত্রী ওঁকে বলেছেন। রমাদি বললেন। রত্নাদি বললেন। কার্তিক ছেলেটা ভালো। খুবই ভালো। গুণী। কত কষ্ট করে থাকে এখানে। আসল কথাটা কি জানিস? রমাদি বা রত্নাদিকে আমি গুরুত্ব দিই না। ওঁরা নিন্দেমন্দ করে সুখে থাকেন। হয়তো এমন ছিলেন না। আলোহীন আশাহীন একটা জীবনে থাকতে থাকতে এরকম হয়ে গেছেন। আসল কথাটা হল, বাবা-মা এ কথা জানলে কষ্ট পাবে। এমনিতেই বাপ-ঠাকুর্দার ভিটে, ছেলেবেলার দেশঘর, নিজের হাতে গড়ে তোলা ব্যবসাপত্তর সব ছেড়ে চলে আসতে হচ্ছে। এ কষ্টের মাপ নেই। তার ওপর যদি শোনে...। সব ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, বোনটি আমার।
দাদা!
উকিলবাড়ির পুকুর থেকে দুটো বক বিকেলের রোদে ডানা মেলে রঙকলের মাঠ, আকন্দ-ভাঁটফুলের ঝোপ, রাধাডিঙির খাত পেরিয়ে ভেড়ির জলবনের দূরে চলে গেল।


অনেক ভাঙার পরেও কিছু স্বপ্ন থেকে যায়। তোকে ঘিরে হয়তো স্বপ্ন আছে। বড়ো ঘরে বিয়ে দিয়ে এখানে, এই দেশে একটা অন্য পরিচয়, একটা নতুন জায়গা হয়তো পেতে চায় বাবা-মা।
দাদা! 
শিবতলার মাঠে আদিম লতাগুল্ম থেকে অন্ধকার ধোঁয়া ওঠে, গন্ধ ওঠে।
দাদা, কতদিন মার চিঠি পাই না। সেই লেখা : প্রথমে তোমরা আমার স্নেহ নিবে। আশা করি, সকলে কুশলে আছে। শেরপুর আর আগের মতো নাই। দোকান আর আগের মতো নাই। আমরা একপ্রকার। সাবধানে থাকিবে। আমাদের আশীর্বাদ জানিবে। কতদিন আসে না।

তপু, আমাদের দোকান কিনে নেবে অবিনাশ কাকা। বলেছে, কর্তামশায়ের দোকান আর কাউকে কিনতে দেবে না। জলের দরে দোকান কেনার মতলবে যারা ঘুরছিল, তারা ধাক্কা খেয়েছে। অবিনাশ কাকা বলেছে, আমার ভয়ডর নাই। মরতে হইলে এই মাটিতেই মরুম। কর্তামশাযের দোকান আমিই রাখুম। আবার বারোকপাট খুলুম। এমন দিন যদি কখনও আসে, যদি কর্তামশায় এইখানে ফিরে আসেন, যে দরে দোকান নিছি, সেই দরে ফিরাইয়া দিমু। 
দাদা, তোকে একটা কথা পরে বলব।

আকাশবাণী কলকাতা। আজকের নাটক মঞ্জরী আমের মঞ্জরী...

প্রথমেই একাত্তর হাজার হাঁক দিয়ে খঁকাবাবুর দিকে আড়চইখে চাইয়ে অল্প মুচকি হাসলেন। আমি চাইরদিক চাইয়ে চিন্তে বাজার বুঝে বললাম, পঁচাত্তর। চক্কোত্তিমশাই চইমকে গেলেন, হাঁইকলেন, আশি। আমি বললম পঁচাশি। উনি হাঁইকলেন, নবুই। উনি পাঁচ উইঠলে, আমিও পাঁচ উঠি। উনি দশ উইঠলে আমি দশ। উনি হাঁইকলেন এক লাক পনেরো। আমি হাঁইকলাম, বিশ। ব্যস, বিশ রাম, বিশ দুই, বিশ তিন। হইয়ে গেল ছ-কুড়ি হাজারে সব আমার হইয়ে গেল-- এখন ই বাড়ি আমার। ওই আমবাগান, ওই নদীর ধার তক জমি আমার, আরে বাইসারে বারিসারে বাইসারে বাইসা— এই বাড়ি, ওই আমবাগান, ওই জমি সব আমার-- ভাইবছ এ ব্যাটা তো আইচ্ছা মাতলামি লাগাইছে, মাইরি, বিশ্বাস যাও আমি জন্মে কুনদিন মদ খাই নাই। আমার মাথার ভিতরট ঝিমঝিমাইছে, আমাকে ধরাে ত ভাই। আমার চাদ্দিকে যেমন মায়ের অষ্টমীপূজার বাজনা বাজাইছে হে।...এখন যদি আমার ঠাকুদ্দা আর আমার বাপ মনাইটাঁড়ের শ্মশান হইতে চুপেচাইপে উইঠে আইসে উঠানের উঠানের আঁধারে দাঁড়াইয়ে তুমাদিগে শুধায় কী হইয়েছে বাবু? আজ বড়ো বাড়িতে কী হইয়েছে? অ্যাত হাসি কীসের গো? তা হইলে একবার চেঁচাই চেঁচাই বলে দিও মাইরি, ‘তুমাদের সেই লালু হে, তুমাদের সাধের লালমন, কিয়া কর দিয়া জানতা, দুনিয়া উইল্টে দিয়া হ্যায়। তুমরা ত ছোটোকালে কত লাথি জুতা কিল চড় মাইরতে। বইলতে, তুর দ্বারা কিছু হবেক নাই, কিছু হবে্ক নাই। তুই না খেইয়ে মরবি। ত এখন কীরকম দেইখছ তুমরা? এই বাড়িতে ছোটোকালে, আমি ওই উঠানে বইসে কলাপাত কেইটে আইনে ভাত, শুধু ভাত আর নুন মেইখে মেইখে খেঁয়েছি।


কার্তিক, ফিরতে এত রাত হয় কেন? কোথাও কাজের ব্যবস্থা হল? সেই সকালে বেরিয়ে যাস। খাওয়া হয় ঠিকমতো? চোখমুখ বসে গেছে। কী করছিস, বল আমাকে।
তেমন কিছু না।
আমাকে বলতে অসুবিধে আছে? ছবি আঁকছিস না। হাতের কাজও বন্ধ। কী করে চলছে? আমাকে ।
বলব। সব বলব। এখন নয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, তোমার অ্যাাইপাজি কোনো বাজে কাজ করছে না। ভরসা রাখতে পারো
অ্যাইপাজি, আমাকে লুকোচ্ছিস!
আমাকে গ্রামে যেতে হবে।
কেন?
গ্রাম ডাকছে।
বাবা-মা কিছু বলছে। 
গ্রাম ডাকছে। যাবে আমার সঙ্গে, অ্যাইবৃষ্টি। জীবনের নতুন মানে শেখব আমরা। গ্রাম মানে সংগ্রাম।
শোনো, শোনো। ওসব কথা মাথায় ঢুকছে না। আজ সন্ধেয় ফিরবে। যেখানেই যাও | আমি রান্না করে রাখব। বাইরে কোথাও খাবে না।
সন্ধেয় ফিরবে। কথা দাও । 
দিলাম। 
অ্যাইপাজি।

ঘর প্রায় অন্ধকার। একটা নীল আলো জ্বলছে। রাত আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। রমাদি, রত্নাদি, মালতীদি এসে গেছে। ছোটোদের ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে মায়েরা। বারান্দায় বসেছে প্রীতিময়দা আর তাঁর স্ত্রী। কার্তিককে ঘরে নিয়ে ঢুকল তপু। টেবিলে রেডিয়ো। রেডিয়োর মুখোমুখি সবাই। কার্তিক আলমারির পাশে গিয়ে বসল। তপু তার কাছে।

আকাশবানী কলকাতা। আজকের নাটক তপস্বী ও তরঙ্গিনী।
তরঙ্গিনী : তুমি আমার প্রিয়। তুমি আমার বন্ধু। তুমি আমার মৃগয়া। তুমি আমার ঈশ্বর।
ঋষ্যশৃঙ্গ : তুমি আমার ক্ষুধা। তুমি আমার ভক্ষ্য। তুমি আমার বাসনা।
তরঙ্গিনী : আমার হৃদয়ে তুমি রত্ন।
ঋষ্যশৃঙ্গ : আমার শোণিতে তুমি অগ্নি।
তরঙ্গিনী : আমার সুন্দর তুমি
ঋষ্যশৃঙ্গ : আমার লুণ্ঠন তুমি।
তরঙ্গিনী : বলো চিরকাল তুমি আমার থাকবে।
ঋষ্যশৃঙ্গ : আমি তোমাকে চাই-- তুমি প্রয়োজন।
তরঙ্গিনী : তুমি চলো চলো আমার সঙ্গে। চলো সেখানে, যেখানে আমি তোমাকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে পারব।
ঋষ্যশৃঙ্গ : কোথায় যাই, কী এসে যায়? কোথায় থামি, কী এসে যায়? আমি চাই তোমাকে। আমি চাই তাোমাকে।
তরঙ্গিনী : এসো প্রেমিক। এসো দেবতা— আমাকে উদ্ধার করো।

ঋষ্যশৃঙ্গ : এসো দোহিনী। এসো মোহিনী-- আমাকে তৃপ্ত করো। 
বৃষ্টি আসে। উঠোন থেকে অন্ধকার থেকে একটা ক্লান্ত আদরথরোথরো আলোর ভেতর বৃষ্টি ঝরে।

অ্যাইবৃষ্টি তখন গাঢ় হাতে জড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে অ্যাইপাজিকে। অ্যাইপাজির শরীর বেজে ওঠে অ্যাইবৃষ্টির স্তনবৃন্তের ছোঁয়ায়, ঠোঁটের ছোঁয়ায়। বাজতে থাকে। বৃষ্টির এমন শব্দ আগে কখনও সে শােনেনি।
অ্যাইপাজি, আর একটু ঝুঁকে এসো।

আকাশবাণী কলকাতা। আজ ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। এখন রাত ৯টা।
বাংলাদেশে আমার সংগ্রামী বন্ধুরা, আজ এই রাতে তােমাদের জানাই ভারতের কোটি কোটি মানুষের সংগ্রামী অভিনন্দন, লাখাে লাখাে সেলাম। কারণ আমি জানি এই রাত ভাের হবে, পুবের আকাশে উঠবে নতুন সূর্য, আর ওই সূর্যকে ছিনিয়ে আনছ তােমরা আমার সংগ্রামী ভাইয়েরা। আমি জানি ঢাকা মুক্ত হয়েছে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বিশ্বের কনিষ্ঠতম গণতন্ত্রের রাজধানী রূপে। ইতিহাসের এই পরম ও অনিবার্য সত্যকে আমি এখনও ঘােষণা করতে পারছি না। কিন্তু এ-ও জানি এ-সত্যকে পৌঁছে দেবই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে আজ নয়, কাল।


বাবা-মার কোনাে খবর পাওয়া গেল, দাদা?

না। কেউ কিছু বলতে পারছে না। বিশ্বনাথবাবু শুধু বললেন, ওঁরা একসঙ্গে বেরিয়েছিলেন। অনেকটা পথ একসঙ্গে ছিলেন। তারপর রাজাকার বা আলবদরদের হামলায় গোটা দল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সশস্ত্র ওই গুন্ডারা কয়েকজনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
চিৎকার করে ওঠে তপু, বাবাআআআ! কাঁদে।

বােনের মাথায় হাত দিয়ে দাদা বলে, গিয়াসউদ্দিন চাচা খোঁজ করছেন। বর্ডারে তাঁর লোকজন আছে। চেনাজানা অফিসার আছে। গিয়াসউদ্দিন চাচা বললেন, চারুবাবু কোথাও আটকে পড়েছেন। কারও আশ্রয়ে আছেন হয়তাে। বেরােতে পারছেন না। এখন পাক মিলিটারি ভাগছে। রাজাকাররাও পালাচ্ছে। এবার নিরাপদ বুঝে চলে আসতে পারেন। আমার লোকজন খোঁজ করছে।

আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি...।

মধ্যরাতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক নকশাল নেতা নিহত। পুলিশ সূত্রের খবর, এন্টালি-পদ্মপুকুর এলাকায় একদল সশস্ত্র নকশাল যুবককে ঘেরাও করে পুলিশবাহিনী। যুবকরা একটি বাড়িতে বৈঠকে বসেছিল। পুলিশের অনুমান, তারা কোনো অ্যাকশনের পরিকল্পনা করছিল। নিজস্ব সূত্রে পুলিশ খবর পেয়ে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বৈঠকে হাজির উগ্রপন্থীদের আত্মসমর্পণ করতে বলে। মাইকে বারবার আবেদন জানানো হয়। কিন্তু নকশাল যুবকরা পুলিশকে আক্রমণ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, পুলিশকে একদিকে লড়াইয়ে ব্যস্ত রেখে অন্যদিকে গোপন পথ দিয়ে পালানো। পুলিশ সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। পালানাের মুখে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। যুবকের পরিচয় জানা যায়নি। বাকিদের কয়েকজন আহত হয়েও পালাতে পেরেছে বলে পুলিশের অনুমান। পুলিশের সন্দেহ, যুবকটি নেতৃস্থানীয়। আরও বড়ো নেতা সম্ভবত বৈঠকে ছিল।

দরজায় খুরের শব্দ। সেই ঘোড়া এসেছে। সেই চিচিঁহি ডাক। তপু ছুটে যায়। দরজা খোলে। উজ্জ্বল বাদামি রঙের চ্যারিয়ট তো নেই। জোরে পা ঠুকল। আকাশের দিকে মুখ তুলে ডাকল, চিঁহিহহইঁ।

তপু দেখে, ঘোড়ার পিঠে মৃতদেহ। কার্তিকের মুখ। রক্তে ভাসা বুক। ঝুলে থাকা ডানহাতে আলকাতরার দাগ। তার আইপাজি।

 


1 টি মন্তব্য:

  1. দেশভাগ থেকে নকশাল আন্দোলন - একটা দ্রুতগামী
    দীর্ঘ সময়ের পটভূমি। আকাশবানী মাঝে মধ‌্যে সূত্রধর। কাহিনীর অতুলনীয় ঘোড়সওয়ায় পরিসমাপ্তি। ভেঙ্গে যায় ছোট‌ ছোট কথা, ভালোবাসা বা বেঁচে থাকার যুদ্ধ। ভালো লাগলো গল্পটা!



    উত্তর দিনমুছুন