বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

রোখসানা চৌধুরীর পাঠপ্রতিক্রিয়া : লেখা রুমা মোদকের গল্প -- "এবং এই বাংলাদেশেরই কথা"

১.
আমাদের দেশে যখন শিল্প-সাধকগণ উঠে পড়ে লেগেছেন মার্কেজ-মুরাকামি হয়ে উঠবার জন্য, সেখানে রুমা মোদকের গল্প ঐকান্তিকভাবে বাংলাদেশেরই কথা বলে। আজকাল এই কাজটাই অধিকতর দুরূহ বলে মনে হয়, অন্তত আমার কাছে।নিজ দেশের মানুষের সাথে পাশাপাশি বসবাস করে,আদ্যোপান্ত জাতিগত যাবতীয় নেতিবাচক দিক মাথায় রেখেও সেইসব চরিত্র নিয়ে কল্পনার খেলাধুলা লেখকের মমত্ববোধ জারিত ভাবনা থেকে উৎসারিত।লেখক হিসেবে তিনি নির্মোহ নন,মানবতাবাদের ধর্মে বিশ্বাসী।তিনি মনে করেন, "ভালো এবং মন্দ আমার কাছে আপেক্ষিক। কালে কালে, দেশে দেশে, সমাজে সমাজে এবং ব্যক্তি মানুষে মানুষে যা ভিন্ন হতে পারে। তবে সমকালে, এক অভিন্ন সংস্কৃতিতে মোটা দাগে ভালো মন্দের কিছু সংজ্ঞা থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস কিছু ভালো মন্দ ঠিক করে দেয়। আমার কাছে যা কিছু ইতিবাচক ভাবে মানুষের কাজে লাগে তাই ভালো। যা মানুষের ক্ষতির কারণ হয় তাই খারাপ।" অর্থাৎ নৈতিকতা প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান প্রাঞ্জল, কোন দ্বিধা বা দ্বৈরথ দ্বন্দ্ব চোখে পড়ে না।


২.
'গোল' গল্পগ্রন্থটি ২০১৮ সালে জেব্রা ক্রসিং ঢাকা থেকে প্রকাশিত, প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাব্য কারিম।
রুমা মোদকের গল্পের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর গল্প অযথাই তত্ত্বের ভারে ভারাক্রান্ত হয় না। গল্প লেখার বিভিন্ন ভঙ্গিমা তাঁর অনায়াস সাধ্য। 'সে' গল্পের নামহীন নায়ক প্রতারক স্ত্রী প্রদত্ত পুরুষত্বহীনতার মিথ্যা অভিযোগে অব্যক্ত বেদনায় খুনী হয়ে ওঠে। এলিয়েনেশন বা মগ্নচেতনা রীতি অনুসরণ না করেও নায়কের নামহীনতাই চরিত্রটির উন্মূল অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। নারীবাদের সচেতন অবস্থান গ্রহণ ছাড়াই তাঁর স্বপ্নভুক নারীরা আত্মগত জীবন যাপন করে।

তাঁর চরিত্রেরা সবাই আমাদের চারপাশেই আছে। প্রতিটি মানুষের মুখ,এমনকি নড়াচড়াও আমরা চিনে নিতে পারি।গল্পগুলো গল্প অথচ গল্প নয়।গল্পের জন্য তাঁকে কল্পলোকে কিংবা প্রভাবশালী বিশ্বসাহিত্যের কোন লেখকের দ্বারস্থ হতে হয়নি।


৩.
রুমা মোদকের ভাষা নিঃসন্দেহে তাঁর কবিসত্তাকে আমাদের কাছে তুলে ধরে। তাঁর স্বপ্নভুক ভাষার গীতিময়তা পাঠককে আচ্ছন্ন করে।বিশেষত যে সব গল্পে রোমান্সধর্মিতা গল্পের একটা অংশে জায়গা করে নিয়েছে।

"বারান্দায় গড়াগড়ি যাওয়া ভাদ্রের খরখরে রোদটা জানালা টপকে ঘরে ঢুকে পড়ে,আক্রমণটা কেমন প্রথম মিলনের ব্যথাময় সুখ হয়ে ওঠে আজ।এই বাড়ির সামনে জমে থাকা পুরনো বৃষ্টির একটুখানি জল,অগভীর অপ্রশস্ত জেনেও যাকে ট্রেনের জানালায় চকিতে দেখা অতল অথৈ দিঘি মনে হয়, দরজায় দাঁড়ানো শিউলিগাছের রৌদ্রধোয়া পাতাগুলোকে মনে হয় সদ্যস্নাতা নববধূ,সারা অঙ্গে জ্বলজ্বল করছে যার রাতের সোহাগ।...কবিতার শব্দবন্ধ-উপমা-উৎপ্রেক্ষা-ব্যজস্তুতি সব অলংকারে মুড়িয়ে বসে থাকব আজ।"
(দুঃখভুক মৃত্যুময় দিন/পৃ.২৫)


অথবা

"স্বপ্নটা আবারও নড়েচড়ে ওঠে বুকের গহীনে।...রিকশাটা এগিয়ে যায় আষাঢ়ের বৃষ্টিস্নাত থমকে থাকা মেঘের ভ্রুকুটি দেখানো বাতাস কেটে,অলস ঘুমের শহরটা ঠিকঠাক জাগেনি তখনো। মৌসুমী বায়ুর তোড়ে উড়ে যায় সারারাত ভিজতে থাকা জবুথবু চিপসের প্যাকেট,কী সুখী এই ছেঁড়াখোঁড়া সবুজ প্যাকেটটিও,বুঝতে পারি আমারই সুখে।"
(দুঃখভুক স্বপ্নময় দিন/পৃ.৩৩)

তবে 'খাঁটি করুণ বাস্তবতা'র গল্পগুলো কখনো কখনো যেন ভাষার সাহচর্য লাভ করে ওঠে নি।ক্রিয়াপদ এবং সর্বনাম ছাড়া লেখকের ভাষা প্রায় সাধু গোত্রের। প্রায়শ জটিল দীর্ঘ বাক্যে সাধারণের জীবনযাত্রার ছবিটি অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
"মাস শেষে ভাড়া আসার উৎস যখন অনিশ্চিত আর বছর ছয়েকের সোহাগকে তখনো পিতা মাতার বিচ্ছিন্নতার অব্যবহিত প্রতিকূলতা স্পর্শ না করার ফলে চুপিচুপি গুটিশুটি মেরে মা-বোনের মাঝখানে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে পারত বলে, তখন এটুকুতেই সন্তুষ্টির অন্ত ছিল না খালাম্মার।"
(একটি সন্ধ্যা যেভাবে রাত হয়/পৃ.৫০)

রুমার গল্পে রয়েছে স্হানীয় ভাষার বহুল ব্যবহার।বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ভাষা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে ফটোগ্রাফিক করে তুলতে সাহায্য করেছে।

" ফানিত ফড়ছ না কিতা?আমার চাকরিডা আছে নানি?"
(ধুতরার বিষ/পৃ.৮৭)

"তর নি হউর লাগে বে,হারাদিন অত ঢলাঢলি কিয়ের?অত পিরিত তে টেহাগুলা লইতে পারছ না ক্যারে?"
(প্যান্ডোরার বাক্স /পৃ.১২৬)


৪.
একটুখানি সমালোচনা।
রুমার অধিকাংশ গল্পই পাঠককে সর্বক্ষণ সচেতন রাখে, প্রায় টানটান ভঙ্গিতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, দরিদ্র নিম্নবর্গের মানুষের জীবন কি এতটাই ঘটনাবহুল, তাদের জীবনের গল্পের জমিতে কি গা-ঘিঞ্জি বসতির মতন শ্বাসরুদ্ধতা?লেখক কি অন্য অনেকের মতো বিশ্বাস করেন যে খেটে খাওয়া মানুষের ডিপ্রেশন হয় না? তাদের মনস্তত্ত্ব জীবিকা আর শরীরের চাহিদার(খাদ্য, যৌনতা) ভেতর ঘুরপাক খায়?দার্শনিক ভাবনা কেবল সুমনাদের (এইসব প্রেম মোহ) মতো মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্য?যারা স্বামীকে খুন করে বাড়িতে লাশ ফেলে রেখে নির্দ্বিধায় প্রেমিকের সঙ্গে বিশ হাজার টাকা মূল্যের রিসোর্টে রাত্রিযাপন করতে আসে,অতঃপর সূক্ষ্ম রুচিসম্পন্ন বিষাদ ভাবনায় ডুবে যেতে পারে।যদিও এমত জটিল প্লট ছোটগল্পের জন্য কিঞ্চিৎ প্রশ্নবিদ্ধ করে,বিশদ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অথবা লেখকের অধিক পরিচর্যার অপেক্ষায়। এবং 'প্যান্ডোরার বাক্স' গল্পটিও।দুটি গল্পেই নারী বৈধ কিংবা অবৈধ সঙ্গলাভের আকাঙ্ক্ষায় আপনজনকে খুন করেছে।নারীর এইসব কামনা-বাসনা সম্পর্কে লেখকের নেতিবাচকতা পরিস্ফুট হয়ে পড়ছে, সেই সম্পর্কে লেখক সচেতন কিনা তা স্পষ্ট হয় নি পাঠকের কাছে।


৫.
'গোল' গল্পগ্রন্থে গল্পের সংখ্যা পনেরো।আমরা তাঁর কাছ থেকে ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে 'নদীর নাম ভেড়ামোহনা'র মতো কালজয়ী গল্প পেয়েছি।'গোল' বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের উপর কোন গল্প নেই। কিন্তু ১৯৭৫ নামে যে গল্পটি আছে তা আসলে মুক্তিযুদ্ধেরই পরবর্তী বঙ্গবন্ধু হত্যার কালো অধ্যায় নিয়ে ভিন্ন ধাঁচে লেখা অসাধারণ একটি গল্প।জাতিগত সংকীর্ণতা, সম্প্রদায়গত সম্পর্কের সত্যিকার বাস্তবতা তুলে ধরতে পারলেই আসলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পরিপূর্ণ রূপে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপিত হতে পারবে।হরিপদ কেরানির গল্পে সেই বাস্তবতার ছবি পাই লেখকের নিখুঁত অভিনিবেশে।সংখ্যার ক্রমশ লঘুত্বের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে,মাথা হেঁট হয় 'মানুষে'র। 'গণতন্ত্রের মৃত্যু' এবং 'মামা ফকিরের কেরামতি' গল্প দুটো দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের অভ্যন্তরীন কোন্দল আর জঙ্গি হয়ে ওঠা ভ্রষ্ট তরুণদের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় আক্রমণ নিয়ে লেখা।গল্পের কনটেন্ট যাই হোক না কেন, লেখক মূলত বাংলাদেশের শ্রমজীবী মুখের নিরন্তর সন্ধানে রত। তাই রাজনৈতিক পাণ্ডা বদরুলের চাইতে অতি দরিদ্র শোষিত শ্রেণীর রহম মোল্লার জীবনের সুখ-দুঃখ তাঁর গল্পে ফোকাসড হয়ে ওঠে,প্রধান চরিত্র না হয়েও।আশরাফ সিদ্দিকীর কবিতার তালেব মাস্টারের মতো অবিরাম বাংলাদেশের কথা বলে চলেন তিনি।


৬.
রুমা মোদকের গল্পের বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর রাখে।একই সাথে এই বৈশিষ্ট্য লেখক হিসেবে তাঁকে সনাক্ত করতে, তাঁর নিজস্ব সিগনেচার নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ছিল হয়তো।কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখক রুমা মোদক ঋজু ভঙ্গিমায় মানুষের গল্পকে উপজীব্য করে এগিয়ে যান,জনপ্রিয়তার মোহকে উপেক্ষা করে। রুমা মোদক আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের শেষ প্রজন্মের সাক্ষ্য রেখে যাচ্ছেন ইতিহাসের কাছে, তাঁর সমুদয় সাহিত্যসৃষ্টির মাধ্যমে।

তাঁর নায়ক ব্যর্থ হলেও তিনি গোলপোস্টে পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর ভাষ্য,অনমনীয় দৃঢ়তায়।
তাঁর সকল গ্রন্থ পাঠকের কাছে পৌঁছে যাক এই কামনায় আমি রুমা মোদকের পঞ্চাশে শততম উদযাপনের আশা রেখে লেখাটা শেষ করছি।






লেখক পরিচিতি
রোখসানা চৌধুরী
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক। গবেষক
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে থাকেন
                                                                                    


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন