রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

লুতফুন নাহার লতা'এর গল্প : কালো দুর্গা


সমস্যাটা শুরু হল ঠাকুরমাকে নিয়ে। বাড়ি’র অন্যরা কাল রাতেই চলে গেছে। সুনীল সরকারের পরিবার এমনিতেই দেশের মায়া করে করে দেরী করে ফেলেছে অনেক। এখুনি না সরে গেলে আর রক্ষা হবে না। এপাড়ার পঁচাত্তর ভাগই হিন্দু পরিবার। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আগেই পাড়া শূন্য করে চলে গেছে প্রায় সবাই। কিছু মুসলমান পরিবার, নগেন মাস্টার, তার ভাই খগেন ডাক্তার আর জোড়াকল বাজারে দু’এক ঘর ব্যাবসায়ী ছাড়া তেমন আর কেউ নেই।

বড়মা, মেজো কাকা, মেজো কাকীমা, সুনু পিসি, ফুলতলা থেকে বেড়াতে আসা সুনু পিসির দেবর আশিস আর বাচ্চারা সব, বড় জেঠুর সাথে খুলনা থেকে যশোর হয়ে বেনাপোলের দিকে রওনা হয়ে গেছে। রয়ে গেছে ঠাকুরমা আর এবাড়ির সবার কাছে অপয়া কালো হতকুৎসিত টেমুদি। ওই টেমুদিই ঠাকুরমা’র দেখাশোনা করে। জন্মের সময় মা মারা গেলে অপয়া বলে জেঠু এ মেয়ের মুখ দেখতেও চাননি। কিছুদিন যেতেই আবার তিনি বিয়ে করেছেন। মায়ের মত কালো দেখতে হয়েছে বলে ওর কপালেও জন্মাবধি জুটেছে অনাদর। কালো মেয়ে তো, অবহেলা আর খোঁটা ছাড়া আর কি জুটবে কালো মেয়ের!

পাকিস্তান আর্মি, ২৫শে মার্চের রাতেই ঢাকায় শুরু করেছে গনহত্যা। কিছুদিনের মধ্যেই তারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। লোকজন বলছে মিলিটারী এসে পড়েছে খুলনায়। খালিশপুরে বিহারীদের সাথে নিয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে তারা। জামাতি ইসলামের মাওলানা ইউসুফের মদদ পুষ্ট হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা খুলনা। খালিশপুর, দৌলতপুর বাঙালীর রক্তে গঙ্গা বইয়ে দিয়েছে মিলিটারিরা। খুলনার ধর্মসভা, বড় বাজার, শিতলাবাড়ি, শিব বাড়ি , কালীমন্দির এলাকা সব রক্তে আগুনে মাখামাখি।

বড়বাজারের দিকটায় ভয়াবহ অবস্থা। রাস্তায় রাস্তায় আর্মি মোতায়েন হয়েছে। বাড়ি থেকে, কলেজ থেকে, ছাত্রাবাস থেকে ট্রাক ভরে তুলে নিয়ে গেছে আটকে পড়া ছেলে মেয়েদের। শহরে কোথাও কোন তরুন ছেলে দেখলে আর রক্ষা নেই। মৃত্যু থম থম করছে সারাশহরে।

ওরা আজ বা কাল রওনা দেবে এই মত কথা হয়ে আছে। ঠাকুরমার বয়স প্রায় নব্বই হবে। এখনো পাটকাঠির মত লম্বা, ফর্সা, একহারা গড়নের মানুষ। টনটনে মেজাজ তার। কিছুদিন আগে পুকুরঘাটে নাইতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, তাতে বাম পা টা ভেঙেছেন। গাঁদা ফুলের পাতা আর জার্মানিলতার মিশ্রণ বানিয়ে ব্যা্নডেজ বেঁধে রেখে এখন পা টা একটু সল হয়েছে। পুরনো ঘিয়ের মালিশ দিয়ে দিয়ে ইদানিং একটু আধটু হাঁটতেও পারছেন কিন্তু তাই বলে এই দুঃসময়ে অতটা পথ! যশোর রোড বরাবর গ্রামের ভেতর দিয়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে খুলনা থেকে বনগাঁয় যেতে ঠাকুরমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। ওমর আলী কাঠের তক্তা কেটে বড় সড় বসার পিড়ির মত তৈরি করেছে। সেটা মাঝখানে বসিয়ে চারদিকে দড়ি দিয়ে দাঁড়ি পাল্লার মত করে বেঁধেছে সে। এটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ঠাকুরমাকে। ঘোষেদের বাড়ির ছেলে সন্তোষ ঘোষ মিষ্টি বেঁচে। মিষ্টি বানানো ও বিক্রি করা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। প্রতিসকালে সে যখন টুটপাড়ার রাস্তা আলো করে যায়, সব বাড়িতে বাড়িতে তাকে ডেকে নানা রকম মিষ্টি, দই, ঘোল, মাঠা আর জলের উপরে ভাসা ছোট ছোট মাখনের গোল্লা কেনার ধুম পড়ে যায়। কিন্তু সন্তোষের ঘোল বা মাঠা যে না খেয়েছে সে তো জানেনা সন্তোষের হাতের মাঠা খেলে আর তো ভোলা যাবেনা। ঠাকুর মা’কে রোজ সে মাঠা দিয়ে যায়। আজো সে এসেছে। উঠোনে ওমর আলীকে পিড়ি বানাতে দেখে সে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ওমর আলীকে ফিসফিসিয়ে বলে, ওমর রে বড়বাজারের দিকি আর কিছু নেই। পুড়াইয়ে দিছে সব। দাউ দাউ কইরে আগুন জ্বলতিছে। আমি গেইলাম মিষ্টান্ন দিতি সুরেন মুক্তারের বাড়ি, তারা কেউ নেই তাইগে বাড়ি মিলিটারী দখল করিছে। সুরেন মুক্তারের দুই মাইয়েরে উটয় নিয়ে গেইছে। চাইরদিক দেহে শুইনে ঠাউর মা রে নিয়ে সাবধানে যাইস বাইডি।

দরিদ্র বাবার মৃত্যুর পরে স্কুলে পড়া বাদ দিয়ে ওমর আলি এবাড়িতে কাজ করতে শুরু করে। বহু বছর ধরে সে আছে এখানে। মুসলমানের ছেলে হয়েও ঠাকুর মা’র আদরে মায়ায় তার মনেই হয়না সে ভিন্ন কোথাও আছে। আজান শুনে ঠাকুরমা ওকে নামাজে পাঠায়। রোজার মাসে ওর জন্যে ছোলা ভিজিয়ে রাখে। ইফতারি বানায়। এছাড়াও অন্য একটা কারনে সে ঠাকুরমার বিশেষ প্রিয়ভাজন। ওমর সৎ, ওমর বিশ্বাসী, ওমরকে বিশ্বাস করেন তিনি। হরিপদ ঠাকুরমার দূরসম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। পাঁচ বছর বয়সে কলেরায় বাবা মা মারা যাবার পর থেকে সে এবাড়িতে আশ্রিত। এ দুজনের উপর ভরসা আছে বলেই জেঠু ওদের উপরে তার মা আর মেয়ের ভার দিয়ে গেছে। তা না হলে জেঠু মাকে কোলে কোলে করেই নিয়ে যাবে বলেছিল।

পরদিন সন্ধ্যারাতেই টেমুদি, ওমর আলী আর হরিপদ, ঠাকুরমাকে সেই পিড়িতে বসিয়ে নিয়ে রওনার আয়োজন করেছে। ঘর বাড়ি আগে ভাগে জেঠুই তালা টালা মেরে বন্ধ করে গেছে। ওমর আলী ঠাকুরমার ঘর খানা তালা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে রোয়াকের পাশে বেগুনি সন্ধ্যামালতির গাছটাতে হাতের ঘটির জল টা ঢেলে দিয়ে তুলসী গাছের গোড়ায় প্রণাম সারছেন ঠাকুর মা। উঠে বসবে পিড়িতে এমন সময় দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসেছে যবেদ আলী। ওমর আলির চাচাত ভাই। একবার ওমরের দিকে চেয়ে চেচিয়ে ঠাকুরমাকে বলছে, "ও ঠাউর মা কুয়ানে যাও! তা তুমি যাইচ্ছ যাও ওমর আলীরে নিয়েনা। ও গেলি ওর মারে দেকপেনে কিডা! তার তো আর কেউ নেই।"

ওমর আলী চাচাত ভাইকে কিছু একটা বলে থামিয়ে দেয়। হয়ত সে ক'দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে সেই কথা বলে। হয়ত বলে -দাদা মা রে কিছু কইয়েনা, আমি ওনাগো পৌঁছায় দিয়েই ফিরে আসতিছি। ওদের যাত্রা পথের দিকে চাচাত ভাই তব্দা মেরে চেয়ে থাকে। মনে মনে বলে একথা সে কিছুতেই কাকীর কাছে বলবে না।

ওরা, জোড়াকল বাজার, করের পুকুর, ধর্মসভা, শিতলাবাড়ি হয়ে বড়বাজারের আনাচ কানাচ দিয়ে নদীর ঘাটে এসে অনেক কষ্টে একটা নৌকা যোগাড় করেছে। নৌকার মাঝি মাঝ বয়সী, তার মুখ ভরা কালো দাঁড়ি। পরনের নীল ডোরাকাটা লুঙ্গিটা নতুন। কেমন জানি গা ছম ছম করে। তবু যদি নদীপথে যশোরের দিকে কিছুটা পথ আগানো যায় সেই ভরসায় নৌকায় উঠে বসে। ঠাকুরমা'র কোমরে গোঁজা টাকার ছোট্ট থলিটা সায়ার ফিতের সাথে কষে বেঁধেছে সেই ভাঁজে চুল্বুল করে চুল্কে চুল্কে উঠছে থেকে থেকে। তবু সে চেয়ে আছে নদীর জলের দিকে। ওমর আলীকে সে চোখের ইশারায় পিতলের ঘটিটা ভরে দিতে বলে নদীর জলে। সব ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে। এই দেশ। এই নদী। এই আকাশ। এই দেশের মাটি আর তার কপালে হবেনা।

ওমর আলীর ভাবতে কষ্ট হয় কেমন করে কি হয়ে গেল। অথচ সেদিনও হিন্দু , মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান সবাই এক সাথে ভাইভাই হয়ে ছিল। পাড়ায় ঈদ, পূজো, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা সব পালন হত সবাইকে নিয়ে। ওমর আলির মা দরিদ্র হলেও বাড়ীতে ফেরীওয়ালা ডেকে গজ কাপড় কিনে যেমন ঈদের নতুন জামা বানিয়ে দিত তেমনি পূজোর জামাও। বাড়ির সামনে সুনীল সরকারের বাড়ী। ওনাদের সকল জ্ঞ্যতিকুটুমের ঘর বাড়ী ঘিরে ছিল এই পাড়া। সে কারনেই এই পাড়ার নাম সরকার পাড়া। সুনীল জেঠুর বাড়ীর সামনে কচি টিয়ে সবুজ ঘাসে ভরা বড় মাঠ। মাঠ পেরুলে তাঁদের পুরনো দিনের পলেস্তারা খসা লাল খয়েরী ইটের দালান বাড়ী। সেই বাড়ীর বারান্দা ছিল অসম্ভব রকমের উঁচু। মাঠে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে তাকালে মনে হত মঞ্চের দিকে চেয়ে আছে সে।

জেঠুর একজন ভাই ছিল, কালী পূজোর দিনে তিনি অনেক কান্না কাটি করতেন, সম্ভবত একটু আধটু নেশা টেশা করতেন বলে। একবার কোলকাতায় গিয়ে আর ফিরে আসেনি সেই ভাই। সবাই বলে নেশা টেশা করে হয়ত সেই আজব শহরের কোথাও মরে পড়ে আছে। সেই থেকে ঠাকুর মা কোলকাতার নামও শুনতে পারে না। তার ধারনা সে শহর ভয়ানক শহর। বাংলাদেশের সহজ সরল মানুষ পেলে সে শহর আস্ত গিলে খায়।

ঠাকুরমাকে এবাড়ির ছেলেমেয়েরা সবাই ডাকে ঠাম্মা। ছোটবেলায় ওমর আলিও অন্যদের দ্যাখাদেখি ঐ তাইই ডাকত। ঠাম্মা' কাছে ডেকে নারকেল গুড়ের নাড়ু খেতে দিলে একবারের জায়গায় দুইবার ঠাম্মা ঠাম্মা করত। সন্ধ্যার পরে পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা দল বেধে চাটাইয়ে বসে রাত জেগে কীর্তন শুনত। কীর্তনের সঙ্গে বাজত ঢাক, ঢোল, কাসর, মন্দিরা, আর মাঝে মাঝে শাঁখ, উলুধ্বনি। ভাবতে ভাবতে নৌকার ঢুলুনিতে চোখ লেগে এলো ওমর আলীর। হরিপদ ঘুম, ঠাকুরমাও।

কেবল ঘুম নেই টেমুদি’র চোখে। কত যে বেদনার ভার তার ওইটুকু বুকে সে কথা সে বলতে পারেনা কাউকে। বাবার উপরে তার অভিমান জমে আছে কত সেকথা সেই ই শুধু জানে। কালো বলে, কুৎসিত বলে তার নামটাও রাখেনি কেউ। ঠাকুরমা না থাকলে হয়ত সে বেঁচেও থাকত না এতদিন। অনাদর আর অবহেলা নিয়ে বেড়ে ওঠা মেয়ে সে, সাহস হয়নি মুখ ফুটে কাউকে বলে তার গোপন ভালোবাসার কথা। তবু কেন মনে হয় তার সকল না বলা বাণী বাঙময় হয়ে ওঠে ওমর আলীর কাছে। কি পরম মমতায় সে ডাকে টেমুদি। হয়ত ওরা একই বয়সী তবু ঠাকুরমা’র কড়া নির্দেশ ওমর আলী যেন তাকে দিদি বলে ডাকে। সে যা খুশী ডাকুক,তবু একমাত্র ওমর আলীই পারে তার জন্যে সব ছাড়তে। এইযে ভালোবাসাটুকু বুকের তলায় হীরের কুচির মত লুকানো আছে সেই ওর আনন্দ। মন চায় ওকে নিয়ে পালিয়ে যায় কোথাও কিন্তু ধর্মের কথা ভেবে সে সাহস আর তার হয় না। কিন্তু আজ, আজ যদি তা হয় ,যদি ওমর আলীর হাত ধরে সে এইখানে এই নদীর জলে ডুবে মরতে পারত! কি হবে বনগাঁয় গিয়ে! ঠাকুরমা’র কোন দুরের সম্পর্কের বোনের বাড়িতে তাও সে বোন স্বর্গত হয়েছে বিশ বছর আগেই, তার ছেলেমেয়েদের কাছে এতগুলো মানুষ গিয়ে উঠবে কিভাবে! কী অনিশ্চিত আর অজানা এই যাত্রা।

রাত আরো গভীর হয়ে এসেছে। আকাশ জুড়ে মেঘের ঘোর অন্ধকার। বিদ্যুতের চমক, মেঘের গর্জন। শুরু হল মুষল ধারায় বৃষ্টি। বাতাসের তোড়ে আর একটু হলেই ওদের নৌকা ডুবে যাচ্ছিল। মাঝি খুব চেষ্টা করেও হাল ধরে রাখতে পারছেনা। ওমর আলি দোয়া দরুদ যা জানে তার সব পড়তে শুরু করেছে। ঠাকুরমা ভগবান, আল্লাহ সবাইকে ডাকছেন। হরিপদ চোখ বন্ধ করে ঠাকুরের নাম জপছে। কেবল স্তব্ধ আঁখি মেলে পাথরের মত বসে আছে টেমুদি। ওকে মনে হচ্ছে জলের ভেতর থেকে উঠে আসা দূর্গা। ওরা নদীপথে জোড়াগেট, খালিশপুরের পাশ দিয়ে দিয়ে ফুলতলা এলাকা পার হয়ে নোয়াপাড়া পর্যন্ত যখন এসেছে তখন ভোর হয় হয়। ততক্ষণে থেমেছে ঝড়ের তান্ডব। শান্ত হয়েছে নদী। ভোরের নরম আকাশ তার দূর দিগন্ত রেখায় পরিয়ে দিয়েছে একটি প্রগাঢ় সোনার বলয়। এ এক অলৌকিক সুন্দর সকাল।

দূরে নদীর কিনারে বুড়ো বটের গাছ। জোয়ারের জল থৈ থৈ করছে শেকড়ের গায়ে। সেখানে আরো নৌকা থামানো, আরো লোকজন। মাঝি ওদের আগেই বলেছিল ‘ঘাটে ঘাটে চেক বসাইছে, ডাক দিলি যাতি হবে, না গেলি গুলি করবেনে।’ মাঝির কথা ফুরোবার আগেই নৌকা থামিয়ে দিল নদীর কিনারে পাহারারত আর্মি। আরো অনেক নৌকা থেকে লোক নামিয়ে লাইন করিয়েছে। ওদেরকেও নামিয়ে নিল নৌকা থেকে। ‘হ্যান্ডস আপ’ করতে বলে ও হিন্দু না মুসলমান জানতে চাইল। ওমর আলি হাত উচু করেই আছে। মুখে মুসলমান বলা্তেও বিশ্বাস করল না ওরা, কাপড় খুলে দেখাতে বলল। দেখে কি জানি মনে করে ওকে ছেড়ে দিয়ে হরিপদকে চেক করে নিয়ে গেল ওদিকে। বলির পাঠার মত ঠক ঠক করে কাঁপছে হরিপদ। ওর পায়ে পা জড়িয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে ওমর আলীর দিকে একবার সে চাইল। কিছুক্ষন পরে বিকট শব্দ হল। লম্বা সেই লাইনের সব মানুষ গুলো পড়ে গেল। ওখানে হরিপদ ছিল। আর্মির জীপ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো যখন, টেমুদিকে মনে হলো কালো দূর্গা। তখন সূর্য উপরে উঠেছে।

ওমর আলি স্তব্ধ পাথর। বুড়ো বটগাছটার গোড়ায় বসে ঠাকুরমা কেঁপে কেঁপে ডাকছেন ‘ও হরি, ও হরি, জল খাব।’

দেশ স্বাধীন হল। ওরা কেউ ফিরল না। না ঠাকুরমা, না হরিপদ, না ওমর আলি। খুলনা সদর হাসপাতাল থেকে টেমুদি ফিরে এসেছিল আরো কিছুদিন পরে। সুনীল সরকার টেমুর বাবা! কত মানী লোক, টেমুকে কেমন করে ঘরে তুলবেন তিনি! দেশ নতুন হলে কি হবে সমাজ তো সেই পুরনো। সমাজের কাছে কি বলবেন তিনি!

টেমুদি প্রতিবেশীদের সাথে এবাড়ি ওবাড়ি করে কাটায় কিছুদিন। মুক্তিযুদ্ধে সে মরেনি কিন্তু ফিরে আসবার পরে সংসারে সে যে অনাবশ্যক এই ভাবনা তাকে কাতর করে তোলে। একদিন মাঝরাতে চাঁদের আলোয় ওদের বাড়ীর সামনের মাঠের ভেতর দিয়ে সাদা কাপড় পরা কাকে যেন হেঁটে যেতে দেখে সে। চেনা, খুব চেনা তার এই মানুষ! টেমুদি চিৎকার করে ডাকে- ওমর আলীইইই। কাকে যেন সে খুঁজে খুঁজে মরে তবু তার সন্ধান সে কিছুতেই বের করে আনতে পারেনা। পাড়ার লোকেরা বলে ' পাকিস্তানী মিলিটারীগে ঐত্যাচারে মাইয়েডার মাতা খারাপ হইয়ে গেছে।'

সবসময় ভয়ানক বিষাদে ভরে থাকে টেমুদির মন। হঠৎ কি হল টেমুদির, একদিন বোতল ভরে জমিয়ে রাখা এসিড ঢেলে দিল গলায়। পান করল আকণ্ঠ। পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল ওর কন্ঠনালী। তবু সাথে সাথেই কিন্তু মৃত্যু হল না তাঁর। আরো কতদিন, কত অর্ধ দগ্ধ রাত্রীর ছেঁড়া তন্ত্রী নিয়ে আর্তনাদ করে করে বেঁচে রইল।

শ্রাবণের বর্ষা থেমে গেছে বেশ আগে। শান্ত পরিস্কার আকাশে নিশুতি রাতের চাঁদ ঢেলে দিচ্ছে বিচ্ছেদের ধবল জ্যোতস্না। ধীরে ধীরে সে নেমে এসেছে সরকার বাড়ির ঘরের চালে। পুরনো দালানের ভাঙা ইটের খোঁড়ল থেকে একটি ঢোঁড়া সাপ নিঃশব্দে নেমে যায় দালান সংলগ্ন পুকুরে। ঘাটে জগডুমুরের ঘাড় বাঁকা ডাল থেকে দু’একটি পাতা খসে পড়ে জলে।

সেই রাতে রুপসা নদীর জলে, কালীঘাটের শ্মশানে ওকে চির বিদায় দিয়ে নিঃশব্দে ফিরে এলেন ওঁর বাবা, কাকারা। সকালের আলো তখনো ফোটেনি। ও বাড়ি থেকে, ওঁর সকল স্মৃতি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। রুপসার জলে মিশে গেল ১৯৭১।

আজো সন্তোষ, যবেদ আলী কিম্বা ওপাড়ার বেলাদি নাকি মাঝে মধ্যে দেখতে পায় ওদের। চাঁদনি রাতে কারা যেনো ছায়ার মত হেঁটে যায় মাঠের ভেতর দিয়ে। তাদেরকে টেমু আর ওমর আলী বলেই ভ্রম হয়। ওরা কোথায় যায় কেউ তা জানেনা। যেতে যেতে কচি ঘাসের ডগায় শিশিরে শিশিরে পায়ের চিহ্ন রেখে যায়।।



লেখক পরিচিতি
লুতফুন নাহার লতা
বাংলাদেশের খুলনায় বাড়ি।
বর্তমানে নিউ ইয়র্কে থাকন।
গল্পকার। কবি। অভিনেত্রী। আবৃত্তিকার। 

1 টি মন্তব্য: