রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

দীপেন ভট্টাচার্যের গল্পঃ মা'র সঙ্গে ট্রেনে


মা’কে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। কোভিড টেস্ট করাতে। দুজনেরই। 

এই হাসপাতালটা শহরের যেদিকে সেদিকে আমার আসা হয় না। হাসপাতালের দালানটি আগে দেখি নি। সরু একটা বিল্ডিং, চারতলা উঁচু। প্রথম তলার একটি বড় ঘরে আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আসে আছি। মা বলল, “কেন আমাকে নিয়ে এলি? এখানে না আসাই ভাল ছিল।” 

সকালে যখন এই বিল্ডিংএ ঢুকেছিলাম তখন আকাশে সূর্য ঝলকাচ্ছিল। বাইরে প্রচুর হট্টগোল, গাড়ির হর্ণ, মাইকের আওয়াজ। এখন দুপুর হয়ে আসছে, কিন্তু মনে হল সকালের আলোটা ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। সাথে শব্দগুলোও চাপা পড়ে যেতে থাকল। মেঘ, ভাবলাম আমি। মেঘ শব্দ শুষে নিচ্ছে। 

আমাদের দুজনের গলায় গত দু’দিন ধরে ব্যথা, শরীরের তাপমাত্রা অবশ্য তেমন না। মা’কে অনেক বলে রাজি করিয়েছিলাম টেস্টিংটা করাতে। এখন এই অপেক্ষার ঘরটাতে দু ঘন্টা বসে ভাবলাম কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা। সকাল দশটায় আসতে বলেছিল। এসেই এই ঘরের একদিকের দেয়ালে একটা ছোট জানালায় নাম বলেছি, জানালার পেছনে বসা একজন নারীকর্মী অপেক্ষা করতে বলল। এর মধ্যে দু-বার উঠে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। তার একই নির্বিকার উত্তর, “আপনার নাম তালিকায় আছে, অপেক্ষা করুন।”

এমন নয় যে অনেক লোক সেখানে অপেক্ষা করছিল। আমরা দু জন ছাড়া ছিল আরো চারজন। তাদের ডাক পড়ল এই দু ঘন্টায়, তারা চলে গেল। এরপরে শুধু এক্জন এসে যোগ দিল আমাদের সাথে। হাসপাতালকে এখন সবাই এড়িয়ে চলতে চায়। 

বাইরে আলোটা আরো কমে আসে। সকাল দশটায় যখন এসেছিলাম ঘরের দেয়ালটা গাঢ় সবুজ ছিল। এরকম রঙ কেউ দেয়? কিন্তু এখন গাঢ় রঙটা ফিকে হয়ে আসতে শুরু করল। রঙটা নীল না সবুজ বুঝতে পারছিলাম না। 

মা বলল, “চল্, চলে যাই।” আমি বললাম, “এতক্ষণ বসে আছি। আর এখানে এসে আমরা তো ভাইরাসে এক্সপোজড হয়েছি।” 

“এক্সপোজড…,” কথাটা মা ধীরে উচ্চারণ করে এমন যেন এই প্রক্রিয়াটা এখনই ঘটছে, শত শত হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস ঘরের বাতাসে ভাসছে, দুলছে, আমাদের মাস্ক পেড়িয়ে ঢুকতে চাইছে নাকে আর মুখে। আমাদের দুজনের হাতে প্লাস্টিকের গ্লাভস। 

ঘরের বাইরের দিকের দরজাটা দিয়ে বের হলেই একটা বড় খোলা জায়গা। একজন পুরুষ-নার্স সেখান দিয়ে ঢুকে ঘরে কতজন লোক আছে যেন গুণতে চাইল। এক, দুই, তিন। আমি তড়িৎ উঠে দাঁড়াই, ওর দিকে অগ্রসর হতে হতে বলি, “হ্যালো, আমাদের কি আরো দেরি হবে?” 

তরুণ মানুষটি হকচকিয়ে যায়। বলে, “আপনারা কি টেস্টের জন্য?” তার মুখ ও নাক লুকিয়ে থাকে একটা নীল সার্জিকাল মাস্কের পেছনে। নীল পাজামা, নীল ঢিলে জামা, মাথায় নীল ক্যাপ কালো চুল ঢেকে রেখেছে। কাল চোখের মণির ওপরে ঘন কালো ভ্রু। তার মুখাবয়ব ঢাকা রইল, কিন্তু চোখের মণিদুটো আমাকে বিভ্রান্ত করে দিল। 

আমি মাথা নাড়াই, হ্যাঁ। সে বলে, “আপনার মাস্কটাতো বেশ। ফ্যান্সি। আমার পছন্দ হয়েছে।” 

আমি অপ্রস্তুত হই। ফ্যান্সি মাস্ক আমি পরি না। আসলে ওর মত নীল সার্জিকাল মাস্কই পরি। আজ কী মনে হল এই লাল রঙের মাস্কটা পরে এলাম। টেস্ট করব, বিশেষ দিন। 

“ধন্যবাদ,” আমি বলি, “কিন্তু আমরা বহুক্ষণ বসে আছি। আমাদের কি ওরা ভুলে গেছে?” 

“ও, আচ্ছা,” তরুণটি বলে, “এটা আসলে আমার ডিপার্টমেন্ট না, কিন্তু দেখছি ওরা কী বলে।” 

এই বলে তড়িঘড়ি বের হয়ে যায়।

বাইরেটা আরো অন্ধকার হয়ে আসে। দুপুরের ভ্যাপসা গরমে বহুদূরের জলাশয়ের জল বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। কালো মেঘ হয়ে যায়। তার চারপাশের বাতাস ঠাণ্ডা হয়, বাহিত হয় এই শহরের জনাকীর্ণ কোণে। মা আবার বলে, “চল্, চলে যাই।” 

মা’র মাথায় এখনো কালো চুল কয়েকটা রয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবি মা’কে আসলেই এখানে নিয়ে আসাটা ঠিক হয় নি। এখানে না আনলে মা হয়তো টেলিভিশনে নাটক দেখত অথবা গল্পর বই পড়ত নইলে উপুড় হয়ে তাস খেলত - সলিটেয়ার। ওইটুকু সময়ও মূল্যবান। আর যদি কোভিড টেস্ট পজিটিভ হয় তখন আমি কী করব? 

তরুণ পুরুষ-নার্সটি দৌড়ে ঘরে ঢোকে। বলে, “আপনি আমাদের একটু সাহায্য করতে পারবেন?” 

আমি কিছু না ভেবেই দাঁড়াই, ওর দিকে অগ্রসর হই। মা আমার ডান হাত ধরে আমাকে থামাতে চায়। নার্সটি বলে, “আমাদের এক রুগীকে এখনি ওপরের তলায় নিতে হবে। সেখানে ভেন্টিলেটর। কিন্তু আমাদের কোনো স্ট্রেচার নেই।” 

আমি কিছু না বুঝেই, মা’র হাত ছাড়িয়ে, নার্সের সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। পেছনে মা’র অস্ফূট কন্ঠস্বর শুনি, “অমল, যাস্ না!” 

ঘর থেকে বের হলে বিল্ডিং-এর মূল ল্যান্ডিং। সেটা পার হয়ে একটা ছোট ঘরে ঢুকি আমরা। 

একজন সত্তরোর্ধ্ব নারী বিছানায় শোয়া, সাদা শাড়ী, নীল পাড়, শরীরে যেন কোন মাংস নেই। চোখ কোটরে বসে গেছে, তাতে মণি, কিন্তু অতীতের কোনো উজ্জ্বলতাই নেই। আমাকে দেখে মুখ খুললেন, কিন্তু কোনো শব্দ বের হল না। হাত তোলার চেষ্টা করলেন, হাড্ডিসার হাত, শুকিয়ে কাঠকয়লার মত। আমাকে কি কিছু বলতে চাইছেন, ওনাকে কি আগে কোথাও দেখেছি? ঘরে আরো দুজন পুরুষ, তারা নার্স হতে পারে, হতে পারে আর্দালি, জমাদার, কিংবা রিসেপসনিস্ট। তরুণ নার্সটি আমাকে বলল, “আপনি চাদরের একটি কোনা ধরুণ, আমরা অন্য কোনাগুলো ধরছি।” 

যন্ত্রচালিতর মত একটি কোনা ধরলাম। সে বলল, “আমি বলব এক দুই তিন, তিন বললেই একসাথে তুলবেন।” তিন বলতেই আমরা সবাই চাদরসহ সেই বর্ষীয়ান কঙ্কালসার নারীকে তুললাম। তার শরীরের কোনো ভারই ছিল না। তাকে নিয়ে দরজা দিয়ে বের হয়ে প্রথমে ল্যান্ডিং। ল্যান্ডিংএর অন্যপাশের ঘরে মা’র থাকার কথা, কিন্তু ঘরটা পুরো দেখতে পেলাম না। নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি কেন এই কাজটা করছি, কিন্তু নিজেকে গুছিয়ে উত্তর দেবার আগেই অন্যদের সাথে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকলাম। 

“লিফট নেই?” চিৎকার করি আমি। পরিচিত নার্স মাথা নাড়ায়, “লিফট খারাপ।” 

একতলা থেকে দোতলা, দোতলা থেকে তিনতলা। হাঁফাতে লাগলাম। অন্যদেরও মনে হয় একই অবস্থা। সৌভাগ্যই বলতে হবে তিনতলায় উঠে বাঁদিকে মোড় নিয়ে প্রথম ঘরটিতেই আমরা ঢুকলাম। বিছানায় চাদরসহ নারীটিকে নামিয়ে দিতে দিতে মনে হল তাঁর চোখ আমার পরিচিত। তারপর খেয়াল হল আমার মুখে মাস্ক নেই। মাস্কটি থুতনির নিচে বা গলায়ও নেই। কেমন করে সেটি খুলে পড়ে গেল জানি না। নার্স সবাইকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল। অন্য দু’জন রুগীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক্সপোজড শব্দটি মাথায় এল। এক্সপোজডই বটে, কিন্তু যে নার্সটি আমাকে ডেকেছিল সে আমার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ি ধরে নিচে নামলাম আমি। ল্যান্ডিং। মাস্কটিকে কোথাও দেখলাম না। ল্যান্ডিং-এর ডানদিকের ঘরে মা বসে আছে। 

কিন্তু সেই ঘরে ঢুকে দেখলাম মা নেই। মা কোথায় গেল? ঘরটার দেয়ালের রঙ দেখলাম কেমন রক্তবেগুনী হয়ে গেছে। আমি যে সাংঘাতিক আতঙ্কিত হয়েছিলাম তা নয়, কারণ মা’র জন্য এই শহর খুব পরিচিত আর এইসব হাসপাতালে মা এর আগে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করেছেন। কিন্তু আমাকে ফেলে মা কোথায় যাবেন? হাসপাতালের ভেতরে যাবার কোনো সুবিধে নেই, সেখানে একজন গার্ড বসা, তাহলে কি বাইরে গেছেন? 

বাইরে বের হয়ে দেখি জোর বাতাস বইছে। ঠাণ্ডা বাতাস, আকাশে কালো মেঘ জমেছে। গ্রীষ্মকালে মাঝে মধ্যে এরকম হয়। নিদাঘ সূর্য থেকে জলীয় বাষ্প, তা জমে কালো মেঘ। এরপরে দমকা হাওয়া, বৃষ্টি, সাথে বাজ। রাস্তায় সেরকম লোক বা গাড়ি নেই। মা’ও নেই। ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের বিল্ডিংটা দেখি। সরু চারতলা বাড়ি। আকাশে বিজলি চমকায়, কড়কড় করে বাজের শব্দটা ভেঙে ভেঙে এগোয়। হঠাৎ আমার একটা জিনিস মনে পড়ে। এতক্ষণ কেন মনে পড়েনি বুঝতে পারলাম না। আজই তো উল্কাপিন্ডটাকে লেজার রশ্মি দিয়ে কিছু একটা করার কথা। গত কয়েক মাস ধরে জ্যোতির্বিদরা এটাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বেশ বড়, দশ কিলোমিটার আকারের। ধেয়ে আসছিল উল্কাপিন্ড পৃথিবীর দিকে। নানান পরিকল্পনা হল, কিন্তু সবাই একমত হল না। এক এক দেশ এক একভাবে উল্কাটি ধ্বংস করার প্ল্যান নিল। আমি তখন ভেবেছিলাম, ভালই তো – ক দেশ যদি ব্যর্থ হয় তো খ দেশ আমাদের বাঁচাবে। এমন কিছু নয়, সবাই কর্তৃপক্ষের ওপর ভরসা করে ছিল। আজ খুব ভোরে ওইসব দেশের ওইসব প্ল্যান কার্যকরি করার কথা ছিল। আমি নিজেও জ্যোতির্বিদ, তবে ধূমকেতু, উল্কা এসবের না, তাই এই ধূমকেতু নিয়ে সেরকম মাথা ঘামাই নি। এরমধ্যে আবার কোভিড এল। গতকাল রাত থেকে মা ও আমার শরীরটা খারাপ হওয়াতে এই সংবাদটাকে অনুসরণ করতে পারি নি। পকেট থেকে মোবাইল বের করে খবরের অ্যাপটা খুলি। বড় করে লেখা “ব্যর্থ!”। কোনো কাজই হয় নি। বরং আরো খারাপ হয়েছে, খণ্ড-বিখণ্ড হয় গেছে উল্কা। ধেয়ে আসছে, স্থানীয় সময় দুপুর দুটো নাগাদ আঘাত করবে পৃথিবীকে বিভিন্ন জায়গায়। আমাদের আশেপাশেও পড়বে। 

মোবাইলে দেখি দেড়টা বাজে। খুব যে আতঙ্কিত হয়েছিলাম এমন নয়। মৃত্যুকে আমি স্বপ্নহীন ঘুমের মতই ভাবি,, অথবা সার্জারির আগে অ্যানাস্থেশিয়া দিলে যেমন সাময়িক মানসিক অসারতা যা কিনা সময়কে স্তব্ধ করে দেয়, তার সঙ্গে মৃত্যুর পার্থক্য নেই। প্রতিটি জীবনাবসান ব্যক্তিগত, সেই একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতার অবসান কি মহাবিশ্বেরই অবসান নয়? সেই! মনে হল যাই হোক না কেন শেষ সময়টা মায়ের পাশেই থাকব। মৃত্যুচিন্তার ব্যাপারে আমার মা আমার থেকে অনেক এগিয়ে। এ’ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি ও দর্শন আমার থেকে অনেক সুসংহত, অনেক গভীর। মা’কে নিয়ে একবার বিদেশ গিয়েছিলাম। সেখানে যে বাড়িতে থাকতাম তার পেছনে বন ছিল। সেই বনের ভেতর দিয়ে রাতে ট্রেন যেত। অদ্ভূত রহস্যময় ছিল সেই ট্রেনের আওয়াজ, মনে হত রাতের গভীর অন্ধকারে সারা পৃথিবীর মাল-মশলা, প্রাণ নিয়ে সে চলে যাচ্ছে নিরুদ্দিষ্ট গন্তব্যে। সেই ট্রেনের কথাটা মা পরে দেশে ফিরেও বলতেন। হয়তো রাতের নিশুত নিস্তব্ধতায় ট্রেনের শব্দে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবার মধ্যে মৃত্যুর ছায়া দেখতেন। অথবা স্মৃতির বিলোপ। স্মৃতি হারানোও কি মৃত্যুর সমকক্ষ না? 

মা’র ফোনে ফোন করলাম। একটি যন্ত্রচালিত স্বয়ংক্রিয় নারীকন্ঠ বলল, “আপনার নম্বরটি সঠিক নয়। চেক করে আবার ফোন করুন।” 

সামনের রাস্তার যানবাহন কমে আসছিল। ঘুরে হাসপাতালের দিকে তাকালাম। এবার সব মনে পড়ল। এরকম একটি বাড়ির তেতলার একটি ঘরের বিছানায় শুয়ে দশ বছর আগে বনের ট্রেন ধরে মা চলে গিয়েছিলেন। দশ বছর আগে কোভিড বা ক্রমশ অগ্রসরমান উল্কাপিন্ডের স্বপ্ন কি আমি দেখেছিলাম? 

কিছু ভাবতে চাইলাম না, মনে হল জ্বরে গা’টা পুড়ে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে বললাম, “এক্সপোজড হয়েছি।” 

মা’কে আর খুঁজতে হবে না ভেবে স্বস্তি এল মনে। আর এদিকে মাস্ক নিয়েও ভাবতে হবে না। কিছু দূরে একটা চায়ের স্টল। ওদিকে এগোলাম। কত মাস হলে বাইরে কিছু খাই না। বিক্রেতাকে এক কাপ কফি দিতে বললাম। তাকে কফির পয়সাটা দিতে দিতে বললাম, “জানেন তো উল্কাপিন্ডটা ধ্বংস করা যায় নি।” বিক্রেতা বলল, “এরা এসব কত কী বলে, সব কি বিশ্বাস করা যায়?” বিক্রেতার মাস্কটি থুতনির ওপর ঝুলে আছে। 

কাগজের কফির কাপটা নিয়ে ফুটপাথের ওপর বসি। আমার পা থাকে রাস্তার ওপর। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কফিটা খারাপ বানায় নি। মানুষ আমার পেছন দিয়ে হাঁটে, নানান কথাবার্তা কানে আসে, কিছু কোভিড সংক্রান্ত, কিছু স্টক মার্কেট, অল্প কিছু রাজনীতি। কিন্তু উল্কার কথা শুনি না। তাহলে কি আমি ভুল দেখেছি। না, মোবাইলে সংবাদ-অ্যাপ বলছে বেলা দুটোয় আঘাত হানবে উল্কা। এখন পৌনে দুটো। 

হঠাৎ দেখি সেই তরুণ নার্সটি। মুখে মাস্ক নেই, তার মুখমণ্ডল স্পষ্ট, চোখের মণিদুটি উজ্জ্বল। দশ বছর আগে আমি কীরকম দেখতে ছিলাম? নার্সটি একটা কফি নিয়ে এসে আমার পাশে বসে। একটা সিগারেটও ধরায়। আমি বলি, “উল্কাটা আসছে।” সে বলল, “হুম।” বললাম, “বনের মধ্যে ট্রেনটির কথা মনে পড়ছে।” এবার সে কোনো উত্তর দেয় না, মাথা নিচু করে রাস্তার অ্যাসফাল্ট দেখে। 

দুটো বাজার পাঁচ মিনিট আগে রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। আর দুটো বাজার দশ সেকেন্ড পরে আকাশের কোনো এক কোনা থেকে একটা শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দে কান ব্যথা করে। কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে একটা উজ্জ্বল আলোর রেখা চলে যায়। তারপর আবার আর একটি জোর শব্দ, তারপর আরো একটি। এর পরের শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে আসে, সেই বজ্রপাতের মত। আমি বলি, “এরপরে একটা বড় শক ওয়েভ আসবে। হাসপাতালের বিল্ডিং সেটা সহ্য করতে পারবে না।” সে আর একবার “হুম” বলে সিগারেটের শেষটুকু ছুঁড়ে ফেলে দেয়, বলে, “এবার হাতের গ্লাভসটা খুলে ফেলতে পার। আগুনের হল্কায় প্লাস্টিক গলে যাবে। হাতের ত্বককে শক ওয়েভ, আগুন সবকিছুকে স্পর্শ করতে দাও।” 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন