রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

সুমিতা বসু'র তিনটি গল্প



খাঁচার ভিতর

—টমটমকে খাঁচায় ঢোকাও জয়, হোসের ঘাস কাটা হয়ে গেলে আবার বের কর, এই কথা বলে আমি আবার Yaa Gyasi-র Homegoing বইটায় মন দিলাম। শনিবারের বিকেল চা'য়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্যাটিওতে বসে এই বই পড়ার বিলাসিতাটা আমার বড় প্রিয়, অন্তত যতদিন না ম্যারিল্যান্ডের এই অঞ্চলে ঠান্ডা পড়ছে । জয় এতক্ষণ ওর প্রাণের খরগোশ টমটমের সঙ্গে বাগানে ছুটে বেড়াচ্ছিল। খুব বিরক্তি দেখিয়ে টমটমকে পাঁজকোলা করে এনে প্যাটিওর এক কোণায় রাখা খাঁচার দরজাটা খুলল। হোসেকে চেঁচিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি করো তো, টমটমের খাঁচায় থাকতে একটুও ভালো লাগে না ! 

টমটমের মোটেই খাঁচার ভেতরে যাবার ইচ্ছে নেই, ওইটুকু প্রাণী হলে কি হবে, বেশ প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আমি বই থেকে চোখ তুলে একটু হেসে ওদের কান্ড কারখানা দেখে আবার অন্যমনস্কভাবে বইয়ের মধ্যে ডুবে গেলাম। 

হয়তো কয়েক মিনিট কেটে গেছে, কোনো আওয়াজ নেই ! চোখ তুলে দেখি এক অদ্ভুত দৃশ্য ! দেখি, হোসে তার ঘাস কাটার মেশিনটা বন্ধ করে চোখ ছলছল করে খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জয়ও ব্যাপারটায় একটু হতভম্ব হয়ে খাঁচার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। আর টমটম খাঁচার দরজায় প্রাণপনে আঁচড়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা প্রায় ছবির মতো লাগল। ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য উঠে গিয়ে সামনে দাঁড়াতেই, হোসে অঝোরে কাঁদতে লাগল আমার দিকে চেয়ে। এবার আমার হতভম্ব হবার কথা। আজ পাঁচ-ছ' বছর হোসেকে দেখছি, নিজের মতো সময়ে আসে, ঘাস কাটে, চলে যায় —এরকম তাজ্জব ব্যাপার কখনো দেখিনি ! 

কাছে গিয়ে বললাম, কি হল হোসে, বাড়িতে সব ভালো তো ? 

হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল সে, না ম্যাডাম একেবারে ভালো না। এই রকম…. ঠিক এই রকম এক খাঁচায় ওরা ইউ এস বর্ডারে আমার বোনের তিন বছরের ছেলেটাকে জন্তুর মতো খাঁচায় আটকে রেখেছে, আজ দু'মাস। বল ম্যাডাম, কী করে আমরা ভালো থাকব, বল ! আজ টমটমকে খাঁচার দরজা আঁচড়াতে দেখে মনে হল, আমার ভাগ্নের তো কেউ নেই ওখানে ! খাঁচার দরজায় ধাক্কা দিলেও জয়ের মতো কেউ নেই যে ওকে কোলে তুলে আদর করবে ! ওর মাত্র তিন বছর বয়স ম্যাডাম, ভাবতে পারো ? 

গলার কাছে এক পাথরের দলা আটকে গেল। 

অসাম্যের কদাকার নগ্ন চেহারা দেখি দিনরাত— খবর দেখি, পড়ি— টিভিতে, কাগজে । পোশাকি ভাষায় এর একটা বাহারী নামও আছে, Policy। যুগ যুগ ধরে বুঝি মানুষের বৈষম্যের শিকার হয়ে মানুষের এতো চোখের জলেই বুঝি পৃথিবীর তিন ভাগই নোনা জল— আর আমরা তাকে বলি সমুদ্র ! 



অচিন পাখি 

আরাধনা মাসির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল পিঙ্কিদের বাড়িতে। পিঙ্কি আমার যাদবপুরের বন্ধু। আটলান্টা থেকে কাজে কর্মে যখনই ডালাসে আসি, ঠিক সময় বের করে পিঙ্কির কাছে ঢুঁ আমি মারবই। এবার ফোন করতেই, পিঙ্কি দারুণ উত্তেজিত হয়ে বলল, জানিস শুভ, আমার ঠিক পাশের বাড়িটা একটা বাঙালী মেয়ে কিনেছে, ভাবতে পারিস, my very next door neighbor is a Bengali । ওর মা এখানে এসে এখন কোভিদের জন্য আটকে গেছেন। রোজ দারুণ রান্না করেন আর দিয়ে যান, আহা, কত পুণ্যের ফল বল তো ? আসছিস কবে এদিকে ? ভদ্রমহিলা খুব স্টাইলিশ কিন্তু শুনেছি খুব দুঃখের জীবন, ডিভোর্সি, একাই মেয়েকে মানুষ করেছেন। তুই আয়, আলাপ করিয়ে দেব। তুই এলে ওদের একদিন ফরমাল-ভাবে ডাকব। 

বললাম, সামনের সপ্তাহেই আসছি, লাগিয়ে দে তোর পার্টি ! 

অতএব এই আয়োজন। 

ঘরে ঢুকে, পিঙ্কি কিছু বলার আগেই আমি আরাধনা মাসিকে দেখে স্তম্ভিত। এতো বছর পরেও চেহারাটা একই আছে, থুতনির মাঝখানে বড় তিলটাও। বললাম, আরাধনা মাসি, তুমি ? 

মনে হল, আরাধনা মাসীও আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার মতো চমকে গেছে। 

—আরে, তুই চিনিস নাকি ? তুই যে কাকে চিনিস না শুভ ? পিঙ্কিও অবাক। 

আরাধনা মাসির সঙ্গে আমার সেই ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম দেখা ! শেষ দেখাটাও মনে আছে পরিষ্কার, সে কথায় আসছি। ১৯৮১-৮২ সালের দিকে আরাধনা মাসির ঘন ঘন যাতায়াত ছিল আমাদের বাড়িতে, আমি তখন পাঠ ভবনে ক্লাস টেন-ইলেভেনে পড়ি। ছোটকাকুর সঙ্গে আরাধনা মাসির চুটিয়ে প্রেম চলছে, ঠাম্মার কিন্তু বেশ আপত্তি ছিল। আরাধনা মাসির বাড়ি নাকি মফস্বলে— কাকিনাড়া, না কোথায়, আর আমরা তিন পুরুষে কলকাতার বর্ধিষ্ণু পরিবার ! তাছাড়া পরিবারের কারো সঙ্গে আলাপও করা হয়নি গত দু বছরে— মনে হয় সেটাই ছিল ঠাম্মার প্রধান আপত্তির কারণ । 

বাবার আর ছোটকাকুর বয়সের তফাৎ চোদ্দ বছরের, তাই বাবা ছোটকাকুকে খুব স্নেহ করত। মেজকাকু বরাবর দিল্লিতে, কলকাতার বাড়িতে ঠাম্মা আর আমরা। আর ছিল ছোটকাকু। আমার মা'র কাছেও ছোট দেওর খুব আদরের। মা ছিল সব কিছু ম্যানেজ করার জন্য—একদিকে ঠাম্মা আর অন্যদিকে ছোটকাকু ও আরাধনা মাসি । ছোটকাকু খুব ভালো সরোদ বাজাতো। এরকমই একবার টিভি-তে সরোদ বাজাতে গিয়ে আরাধনা মাসীর সঙ্গে আলাপ, আর বলা বাহুল্য, সঙ্গে সঙ্গেই তা হয়ে গেল প্রেমালাপ। আরাধনা মাসি সুন্দর নজরুলগীতি গাইত। ঠাম্মা সুযোগ পেলেই ঠেস দিয়ে দিয়ে বলত, যাকে তাকে বাড়িতে আনো, এরপর প্রেমালাপ আবার বিলাপ প্রলাপ না হয়ে দাঁড়ায়। আরাধনা মাসী একাই আসত আমাদের বাড়িতে আর এসে বাকিদের এড়িয়ে, হয় ছোটকাকু নয়তো মায়ের সঙ্গে গল্প করত। ঠাম্মা দেখতে পেলেই বলত, কোথাকার এক ধিঙ্গি মেয়ে ! মা আবার ছোটকাকুকে একটু আস্কারা দিত, তাই বলত, তুমি এতো negative কথা বোলো না তো মা, ক'দিন পরে ও-ই তোমার ছোট বৌ হয়ে আসবে এ বাড়িতে। 

এতদিন পর পিঙ্কির ডালাসের বাড়িতে যে এভাবে আরাধনা মাসির সঙ্গে আচমকা দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেও পারিনি। আরাধনা মাসির মেয়েটার ভারী মিষ্টি চেহারা, নাম বলল, রাধিকা। একটু আলাপ করার চেষ্টা করলাম, বিশেষ জমলো না ! রাধিকা হঠাৎ, 'যাই পিঙ্কি দিকে একটু হেল্প করি', বলে উঠে গেল। 

যেখানে যাই সেখানেই আমি জমিয়ে নিই, এই রকম এক সুনাম বা দুর্নাম আছে আমার কিন্তু এই মুহূর্তে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে একা একা আরাধনা মাসির সামনে ! আরাধনা মাসিরও কেমন ছাড়াছাড়া ভাব ! পিঙ্কি অনেক রান্না করেছে, সে খাবার-দাবার গরম করতেই ব্যস্ত। চেঁচিয়ে বলল, এই শুভ, একটু গল্প কর তো, রাধিকার মা খুব ভালো নজরুলগীতি করেন, একটু গান হয়ে যাক, আমি খাবারগুলো গরম করতে করতে আর গোছাতে গোছাতে, এখান থেকেই শুনব। 

আমার দিকে থেকে আরাধনা মাসি চোখ সরিয়ে নিয়ে সোফার পাশে রাখা পিঙ্কির একটা হাউস-প্লান্টের বোধহয় প্রতিটি পাতা গুণতে লাগল, খুব মনোযোগ দিয়ে । আর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল, সেই শেষ যেদিন আরাধনা মাসিকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি, সেই দৃশ্যটা। কোনো বন্ধুর বিয়ে বলে মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে জড়োয়া গয়নার সেটটা নিয়ে ব্যাগে ভ'রে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল ছুটে ছুটে। আমায় দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে বলল, শুভব্রত একটু বাসে উঠিয়ে দাও না। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আমি তখন সবে টিউশন সেরে ফিরেছি। বাবা বা ছোটকাকু কেউই বাড়িতে ছিল না। আমি পিঠের ব্যাগটা সিঁড়িতেই নামিয়ে রেখে, মা, একটু এগিয়ে দিয়ে আসছি, বলে আরাধনা মাসির সঙ্গে বাস স্টপ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বলেছিল, আরাধনা খুব সাবধানে যেও আর পরশু এসে দিয়ে যেও ওটা। তখন আমি 'ওটার ' মানে বুঝিনি, পরে সব শুনেছিলাম । 

তারপর পরশু এবং আরো অনেক পরশু কেটে গেল আরাধনা মাসি আর আসেনি ফিরে। ছোটকাকু অনেক ছোটাছুটি করেছিল কিন্তু ঠিকানাই নাকি ভুল ছিল। থানা পুলিশ সবই হয়েছিল। টিভি স্টেশনও কোনো বিশেষ খবর দিতে পারেনি। আর কোনোদিন আরাধনা মাসিকে টিভিতেও দেখিনি। ছোটকাকু তো লজ্জায় রাগে দুঃখে মাথাই তুলতে পারেনি। বাবাও খুব মন খারাপ করেছিল। মা'র চোখের জল দেখে তারপর একদিন বাবা বলেছিল আমার সামনেই, অন্তত এক দেড় লাখ টাকা দাম তো হবেই, তবু মন খারাপ করো না, আমি আবার একদিন না একদিন গড়িয়ে দেব তোমায় ! 

শুধু ঠাম্মা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমি জানতাম, আমি চোখ দেখে মানুষ চিনতে পারি—অচিন পাখি ! তারপর মায়ের হাত ধরে বলেছিল, মধুরা পৃথিবীটা ঠগ জোচ্চোরে ভর্তি, তোমার মতো বড় ঘরের মেয়েও না সে আবার মানুষ হিসেবেও তোমার মতো দেবতুল্য নয়—এবার বোঝো। তুমি সবাইকে সরল মনে বিশ্বাস করে বসে থাক ! 

আমি সেদিন সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, মা তখনো কাঁদছিল। ঠাম্মা আমার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেছিল, দেখে শেখ তুমিও দাদুভাই, যাকে তাকে ধরে এনো না বাড়িতে, পরিবার বংশ দেখো। ঠাম্মা আরো বলেছিল, যাক যাক, তবু একটু পয়সার ওপর দিয়ে গেল, এরপর ওই মেয়ে বাড়িতে গাঁটছড়া বেঁধে ঢুকলে আমাদেরও সকলকে মেরে ধরে বাড়ি ফাঁকা করে একেবারে উড়িয়ে হাওয়া করে দিত ! 

পিঙ্কি একটু অবাকই হল, কোনোমতো খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম তাড়াতাড়ি । ড্রাইভওয়ে থেকে গাড়িটা ব্যাক করতে করতে ঠাম্মার গলাটা স্পষ্ট কানে ভেসে এল, তবে যাই হোক, মানুষ ঠকালে নিজেকেও ঠেকতে হবে। যতই ওপর চাল দিক না কেন, চোখের জলে কাটবে ওর জীবন, এই কথা আমি বলে রাখলুম। আপদ গেছে, কোথাকার কোন অচিন পাখি ! 

হঠাৎ মনে পড়ল ফোন-এ পিঙ্কি বলেছিল, দারুন স্টাইলিশ মহিলা কিন্তু শুনেছি খুব দুঃখের জীবন ! 



ক্যামনে আসে যায় 

—আরেকটু জোরে শ্বাস টানো বাবা, আর একটু জোরে।.. এই বনী একটু জল আন তো বাবার জন্যে— এই কথা বলে চৈতি বাবার বুকে পিঠে তেল মালিশ করতে করতে খুব যত্ন করে হাত বোলাতে লাগল। পাঁচ দিন হয়ে গেল জ্বর নামছে না সন্তোষের, খাওয়ায় রুচি নেই, চোখ ঘোলা ঘোলা। মেয়েদের বলেছে কাউকে কিচ্ছু না বলতে, এক্কেবারে কথাটা যেন না বেরোয়, তাহলেই পাড়ার লোক ধরে হাসপাতালে পুরে দেবে। এই পনেরোটা বছর একা একা দুই মেয়ে নিয়ে সন্তোষ মিস্ত্রি তিনজনার ছোট্ট সংসার টানছে। প্রথম সন্তান জন্মালো সে বছর মার্চ মাসে, তখনও বিশেষ গরম পড়েনি। খুব সাধ করে চৈত্র মাসে জন্মেছে বলে বৌ— বড়মেয়ের নাম রেখেছিল, চৈতি। 

তার আড়াই বছর পর ছোট মেয়ে হতে গিয়ে সে চোখ বুঝলো। সেটা ছিল অগাস্ট মাস, বাংলায় শ্রাবণ। অপারেশন টেবিলেই জন্ম ও মৃত্যুকে পাশাপাশি রেখে, ডাক্তার মুখটা নিচু করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, 

— ভালো মন্দ দুটো খবরই আছে। ভালোটাই আগে দিই, আরেকটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে আপনার। কিন্তু... খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, দুঃখিত, মাকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারলাম না ! ছোট্ট চৈতিকে বুকে নিয়ে মাথায় বাজ পড়েছিল সেদিন। 

ক'দিন পর মা-মরা শিশুটিকে ঘরে আনতে বুক ভেঙে গেলেও, মাথার ওপর অনেক অনেক দায়িত্ব, সন্তোষ চোখের জল মুছে শক্ত থেকেছে । শ্রাবণে জন্মালো বলে এর নাম রাখলো সন্তোষ নিজেই, শ্রাবণী ! পাড়ার আর পাঁচজনের কোলে পিঠে দুই কন্যা বড় হতে লাগলো। সন্তোষ মিস্ত্রির দুঃখের ঘরের প্রদীপ ওরা --ভারী লক্ষ্মী ! সকালে দুই বোন দুটো ঠিকে কাজ সেরে, বাড়ি এসে ভাত ফুটিয়ে, বাবার খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে স্কুল যায় । আবার ফিরে হোমওয়ার্ক, টিউশনি। ক্লাস টেন আর টুয়েলভে পড়ে দু'জন, পড়াশোনাতেও খুব মন। খুব ইচ্ছে দুজনেরই— কলেজে পড়ার, দেখা যাক। মেয়েদের পড়াতেই হবে, আর ... দাঁড়িয়ে বিয়ে দেবে। ব্যাস, একটুকুই স্বপ্ন সন্তোষের। 

সন্তোষের নিজের বিদ্যে ক্লাস সেভেন, তারপর থেকেই অভাবের সংসারে — কাজ আর কাজ। উল্টোডাঙার বাজার থেকে আনাজ-পাতি কিনে ভ্যান-রিকশা করে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করা থেকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ, সবেতেই হাত পাকিয়েছে। তবে না, বেপথে যায়নি কখনো, আছাড় খেতে খেতেও কোনোমতে সামলে নিয়েছে। কোথাও যেন বুকের মধ্যে একটা ভয় কাজ করতো সবসময়, অজানা পাপের ভয় ! আর বিনোদ মাস্টারের একটা কথা, সব সময় মনে রাখবি, God only helps those who help themselves। এটাই নিজের অজান্তে কবে জানি হয়ে গেল সন্তোষের বীজমন্ত্র। চোখের সামনে মেয়েদুটোকে দেখে আর অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে পরম সৌভাগ্যের কথা ! ভাবে — কোথাও না কোথাও উপরয়ালা ঠিক শুনতে পেয়েছেন তার মন্ত্র আর তাই তো এতো কষ্টেও এতো সুন্দর ফুলের মতো উপহার এ জীবনে। 

এই ক'দিন একটু বেশি কাজ করতে গিয়েই বিপদ হলো, যা ভয় পাচ্ছিলো, হয়তো তাই ! সাবধানে থেকেও কোথা থেকে ঐ মারণব্যাধি, করোনা নাকি বলে নিশ্চই ওটাই হবে— যা যা শুনেছিল উপসর্গগুলো সব হুবহু মিলে যাচ্ছে ! আবার শ্বাসের কষ্ট হচ্ছে —দুই বোন আকুল হয়ে বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে । 

—কিছু ভাবিস না তোরা, হাঁফাতে হাঁফাতে সন্তোষ বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে, কাউকে কিছু বলিস না আর দরজাটা সবসময় বন্ধ রাখ। 

কে জানে, এখন ধরা পড়লে আরো বিপদ, মনে মনে বলল। শুনেছে, জানাজানি হলে একেবারে সরকারী হাসপাতাল তারপর সেখান থেকে ধাপার মাঠ, ডোমেরাই কাজ সারবে। মেয়েদুটোকে কিছুতেই অনাথ করতে পারবে না সে, এই সময়, সামনে ওদের বোর্ডের পরীক্ষা। অতএব, চুপ করে ক'টা দিন একটু লুকিয়ে থাকা …. 

দরজায় কেউ একটা কড়া নাড়ছে ঘন ঘন। চৈতি আর শ্রাবণী ভয় পেয়ে বাবার মুখের দিকে চাইল, খুলবো বাবা ? 

—না না চুপ করে বসে থাক ! 

কড়া নাড়ার শেষ নেই, এবার গলা পাওয়া গেল, কি রে মায়েরা এক মুঠো চাল দে' রে, আর একটু মুড়ি, কপালে কিচ্ছু জোটেনি আজ ! 

হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেল, টোপা বাউল এসেছে। 

—যা, এক মুঠো চাল আর একটু মুড়ি দিয়ে ওকে বিদেয় কর, আবার কোনোমতে দম নিতে নিতে সন্তোষ বলে। শ্রাবণী উঠে গেল আর চৈতি বাবার বুকে মালিশ করতে লাগল। 

ঘর থেকে শোনা গেল, দরজা খোলার আওয়াজ। ঘর থেকে শোনা গেল ওদের কথাবার্তা । 

—না রে মা, গান না শুনিয়ে ভিক্ষে আমি নিই না...আমি কি ওদের মতো ওই বাউন্ডুলে ভিখিরি নাকি? আমি জাত বাউল ...শ্রাবণী উত্তরে কী বলল, ঘরের ভেতর থেকে ঠিক শোনা গেল না । 

ঘরের মধ্যে কাঁটা হয়ে বসে আছে চৈতি আর সন্তোষ। চৈতি একটু মুখ বাড়িয়ে দেখলো শ্রাবণী হতাশ মুখে দালানের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। আবার শ্বাসের কষ্ট হচ্ছে, মুখে কাপড় দিয়ে কাশি থামাতে চোখ দুটো উল্টে গেল সন্তোষের। চৈতি কোনোরকমে বাবাকে জাপ্টে ধরে আছে আর বুকে গলায় হাত বোলাচ্ছে, সন্তোষের মাথাটা চৈতির কাঁধে ঢোলে যাচ্ছে । 

দালানে দাঁড়িয়ে তখন টোপা বাউল একতারায় ধুন ধরেছে, তারপর গলা ছেড়ে গাইল— 

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায় 

তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি, ধরতে পারলে মন বেড়ি দিতাম পাখির পায়ে " .... 




লেখক পরিচিতি
সুমিতা বসু
বাস হিউস্টন, টেক্সাস।
গল্পকার। অনুবাদক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন