রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

রিমি রুম্মান'এর গল্প : স্বপ্নের আম্রিকা



সবে ভোরের আলোয় ফর্সা হতে শুরু করেছে রসুলপুর গ্রাম। চারটি পা হেঁটে চলেছে ক্ষেতের সরু আইল বেয়ে। আইলগুলো ডানে, বাঁয়ে বাঁক নিয়েছে। কখনোবা আড়াআড়িভাবে একটির বুকের উপর দিয়ে অন্যটি অতিক্রম করে গেছে। তোরাব আলী স্ত্রী জাহেলা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে কোনো পোটলা-পুটলি ছাড়াই লঞ্চঘাটের দিকে রওয়ানা দেন। উদ্দেশ্য ঢাকায় যাবেন। এক কাপড়ে গাঁয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই দুই মানব-মানবীর আচমকা রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার হেতু কী ? গত রাতে ঢাকা থেকে জরুরি ফোনকল এসেছিল গাঁয়ের বাজারের একমাত্র ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে। শীঘ্রই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের ঢাকায় যেতে হবে। কাজ শেষে রাতের লঞ্চেই আবার ফিরে আসবে। কেনো এই জরুরি তলব ? একই গ্রামের রহমত মোল্লাকে ঢাকা এম্বেসিতে আঁটকে রাখা হয়েছে। সেখানকার কর্মকর্তারা বলেছেন, সঠিক ব্যাক্তিকে হাজির না করলে তাকে পুলিশের হাতে সোর্পদ করা হবে। রহমত মোল্লার অপরাধ গুরুতর। ‘ ওপি-১’ লটারি বিজয়ী হয়েছে একই গ্রামের তোরাব আলী। সেই পত্র ডাকপিয়নের হাত থেকে রহমত মোল্লার হাতে এসে পড়েছিল। রহমত মোল্লা নিজেকে তোরাব আলী পরিচয় দিয়ে এম্বেসিতে গিয়েছিল আমেরিকার সোনার হরিণের লোভে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে উপর্যুপরি জেরার মুখে অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, সে তোরাব আলী নয়। তোরাব আলী তাদের গাঁয়েরই একজন। এই ছিল তোরাব আলীর জীবনে প্রথমবারের মতো ঢাকা শহর অভিমুখে রওয়ানা দেয়ার হেতু। তোরাব আলীর কাছে ঢাকা শহর বিলকুল অচেনা। তাই সঙ্গে এসেছে গাঁয়ের যুবক বদি। ঢাকা শহরের অলিগলি তার চেনা। সে সেখানে গার্মেন্টসে চাকুরি করে। পোয়াতি স্ত্রীর অসুস্থতার সংবাদে তিন দিনের ছুটিতে গাঁয়ে এসেছিল। আজ তার ফিরে যাবার দিন। দুপুরের কিছু আগে তুমুল শব্দে সাইরেন বাঁজাতে বাঁজাতে তাদের বহনকারী লঞ্চটি ঘাটে এসে ভিড়ে। বদিকে অনুসরণ করে জনমানুষের ভিড় ঠেলে দ্রুত গতিতে হেঁটে চলে দুই জোড়া পা। তোরাব আলী, আর তার স্ত্রী জাহেলা বেগম। 

এরপরের ইতিহাস তোরাব আলীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৩১ বছরের জীবনে কোনোদিন গাঁয়ের বাইরে না যাওয়া তোরাব আলী আমেরিকার উদ্দেশ্যে উড়াল যানে চেপে বসে সস্ত্রীক। একমাত্র কন্যাকে দেশে রেখে আসে দাদীর কাছে। একে তো অচেনা দেশ, তারমধ্যে লতায়-পাতায় দূর সম্পর্কের এক বড়ভাইয়ের বাসায় উঠবে। কলিজার টুকরা ৫ বছর বয়সী কন্যাকে রেখে আসতে চায়নি কিছুতেই জাহেলা বেগম। কিন্তু স্বামীর ধমকের কাছে নতি স্বীকার করতে হয় তাকে। উড়াল যানের দীর্ঘ যাত্রায় কোনো খাবার গলা দিয়ে নামেনি। শুধু পাঁজরভাঙা কান্না গিলে গিলে খেয়েছে জাহেলা। যারপরনাই বিরক্ত তোরাব আলী দুই ভ্রুর মাঝের অংশ কুঁচকে বলে উঠে, নিজেরা কই যামু, কার বাড়িত গিয়া উঠমু, কী খামু তার নাই ঠিক। ওইটুকুন বাচ্চাডারে আইন্যা কী অচিন দ্যাশত মুসিবতে পরুম নি? আমার মার কাছে ভালাই থাকবো আমাগো ময়না। প্লেনের আলো-আঁধারিতে তোরাব আলীর চোখে তন্দ্রা মতো এক ঘোর ভর করে। বন্ধ চোখ জোড়ায় লাল-নীল-বেগুনি রঙ এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়ায়। একঝাঁক স্বপ্ন চিকচিক করে জ্বলে উঠে। সেইসব রঙের ভেতর দিয়ে সে দেখতে পায়, বেড়ার ঘর পাকা হয়েছে, ছেলের পাঠানো টাকা হাতে পেয়ে খুশিতে মার চোখজোড়া জলে ভরে উঠেছে। কোনোদিন ভালোমন্দ খাইতে না পাওয়া মা আঙুর-আপেল-বেদানা সহ নানান বড়োলোকি খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে হাসি হাসি মুখ করে! ইস্‌, ভাগ্যিস গেরামের বাজারে ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে ১০০ ট্যাকা দিয়া ওপি-১ লটারির আবেদন করসিলাম। জাহেলার ফ্যাস ফ্যাস কান্না বিরক্তির উদ্রেক করে তোরাব আলীকে ঘোরের জগত থেকে বাস্তবে নিয়ে আসে। স্ত্রীকে ভৎসনার স্বরে বলে উঠে, খায়া না খায়া গেরামে পইরা থাকতি, এক কাপড় পিন্দা বছর পার করতি আর রাইত দুপুরে ঘরের চালার ফুটা দিয়া চুইয়া পড়া বৃষ্টির পানি থেইক্যা বাঁচবার লাইগ্যা পাতিল লইয়া দৌড়াদৌড়ি করতি, হেইডাই বালা আছিল তর লাইগ্যা। তর লাহান বেডিগো লাইগ্যা হেই জীবনই ঠিক আছিল। নজর উঁচা কর। বালা কিছুর খোয়াব দ্যাখ। জাহেলা ওড়নার কোণায় চোখ মুছে। মুখে রা করে না। পেলেনে সব ভদ্দর লোক। মেজাজ খিচায়া লাভ নাইক্যা। মনে মনে বিড়বিড় করে, আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন, আমার কলিজা আমার বুকে থাকলে খায়া না খায়া, এক কাপড় পিন্দা ভাঙা ঘরে থাকনও সুখ। 

নিউইয়র্কে যে বাসায় এসে উঠে তারা, সেটি এক বেডরুমের এপার্টমেন্ট। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের একমাত্র সন্তান বসবাস করে। কিচেনের একপাশে ডায়নিং স্পেসের জায়গাটুকুতে পর্দা টানিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে তোরাব আলী ও তার স্ত্রী জাহেলার। এইটুকুর জন্যে তাদের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ ডলার। বাড়ির কর্তা, লতায়-পাতায় দূর সম্পর্কের পরিচিত মতিন ভাই প্রথম দিনই বলেছেন, বুঝলা তোরাব আলী, এই দ্যেশেত কেউ কাউরে মাগ্না রাহে না। তয় আমারে ভাড়া দিতে তুমার প্রব্লেম অইব না। সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড হাতে আইলে কামে লাগায়া দিমুনি তোমারে। তোরা আলীর বুক থেকে ভারি কোনো পাহাড় নেমে যায় যেন। সে আশ্বস্ত হয়। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলে, আফনের ঋণ কুনুদিন শোধ করতে পারুম না। এইডাই বা কে করে কার লাইগ্যা। মাস শেষে তোরাব আলীর কাজ হয় ফার্স্ট ফুডের দোকান ‘ বারগার কিং’ এ। তিল পরিমান ইংরেজি না জানা তোরাব আলী অবশ্য সন্দিহান ছিল। কথা বলতে, বুঝতে না পারলে কে তাকে কাজে নিবে! মতিন ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত হয়। তোরাব আলী সারাদিন কর্মস্থলে ফ্লোর মপ দেয়, গারবেজ ফেলে, টেবিল-চেয়ার মুছে, টয়লেট পরিষ্কার করে। কিচেনে টুকিটাকি ধোওয়া-মোছা সহ বেইজমেন্ট থেকে বরফ আনার কাজ করে। বড় পরিশ্রমের কাজ। সারাদিন খাটাখাটুনি শেষে যখন ঘরে ফিরে, জাহেলা ততক্ষণে বাংলা ‘দ’ অক্ষরের মতো হাঁটু ভাঁজ করে শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। স্বামীর ডাকে চোখ কচলে উঠে বসে। দুইহাতে খোলা চুলগুলোকে পেঁচিয়ে খোঁপা বাঁধে। তোরাব আলী হাতমুখ ধুয়ে কিচেনের এককোণে রাখা ডায়নিং টেবিলে খেতে বসে। ভাতের লোকমা মুখে দিতে দিতে সেদিনের কাজের জায়গার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে। জাহেলা মনোযোগ দিয়ে স্বামীর কথা শুনে। তোরাব আলী সামনে রাখা গ্লাসের পানি ঢক ঢক শব্দে গিলে বলতে থাকে, বুঝছোস ময়নার মা, কাইল্যাগুলা আসলেও আস্তা হারামি। এইগুলা মনে অয় জর্ম থেইক্যা খবিশ। খাইতে বইয়া টেবিল দুইন্যার ময়লা কইরা থোয়। মাডিত টিসু ফালায়। আর এক একটা মনে অয় হাতির লাহান। দরজা দিয়া ঢুকলেই বুইঝা ফালাই এইগুলা তো লারজ অর্ডার করব। জাহেলা কপালে ভাঁজ ফেলে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। জানতে চায়, লারজ আবার কী ? তোরাব আলী আঙুল চেটে খাবারের শেষাংশ খেতে খেতে বলে, আরে, বুঝোস নাই, বড় সাইজ অর্ডার করে আর কী। এইগুলার ফেডে মনে অয় রাক্ষস আছে। জাহেলা খিক খিক করে হাসে। পরক্ষণেই জিভে কামড় দিয়ে সচেতন হয়ে উঠে, পাশের রুমে মতিন ভাই পরিবারের ঘুমের ব্যঘাত হবে ভেবে। সকালে মতিন ভাইকে কাজে যেতে হয়, ভাবী বাচ্চাকে স্কুলে দেয়। সকালে বাথরুম খালি পাওয়া মুশকিল ভেবে জাহেলা প্রকৃতির ডাক না থাকা সত্ত্বেও বাথরুমে যায়। ভাবে, বৈদ্যাশের বাসা বাড়ি গুলা এমুন ক্যান, পেরাই বাড়িত নাকি একটাই বাথরুম। 

তোরাব আলী বিছানায় শুয়ে মনে মনে হিসাব কষে এক সপ্তাহ কাজ করে কত ডলার পাবে। বাংলাদেশের হিসাবে কত টাকা, এক মাসে কত পাবে। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর নাড়িয়ে পাশ ফিরে শোয়। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে। তবু তার ভেতরে আনন্দ খেলে যায়। ম্যালা ট্যাকা। কোনোদিন ভাবে নাই এতো টাকা আয়-রোজগার হবে। ঘর ভাড়া, আনুষঙ্গিক খরচ, মাকে পাঠানো, সব শেষে কত সঞ্চয় হবে সে হিসাবও করে ফেলে সহজেই। নানান সুখস্বপ্নে বিভোর তোরাব আলী সহসাই ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে জাহেলার চোখে ঘুম নেই। কলিজার টুকরা ময়নার কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতরটা খাঁ খা করে। খালি খালি লাগে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তবুও চোখ ভরে স্বপ্ন দেখে। একটু গুছিয়ে উঠতে পারলে আলাদা বাসা নিবে, ময়নারে নিজের কাছে নিয়া আসবে। তখন বুকের ভেতরে জড়িয়ে রাখবে। অন্ধকারে বালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমের দেশে হারিয়ে যায় জাহেলা। 

দিনের অধিকাংশ সময় কাজে ব্যস্ত থাকে তোরাব আলী। আরেক সহকর্মীর সহায়তায় আরেকটা কাজ জুটিয়ে নেয়। পার্ট টাইম। শনি-রবি ছুটির দিনে সেখানে কাজ করে। এদিকে স্ত্রী জাহেলার কাজের জন্যে ‘ বার্গার কিং’ এর ম্যানেজার মিস লরিকে বলে রেখেছে। মিস লরি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। খুবই অমায়িক ব্যবহার। শারীরিক গঠনে বেশ ভারি মনে হলেও বয়সের দিক দিয়ে তরুণী। তোরাব আলীর কাজে খুব সন্তুষ্ট সে। এক দুপুরে অফিস রুমে ডাক পড়ল তোরাব আলীর। মিস লরির সামনে বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে দাঁড়ায় সে। মিস লরি কম্পিউটারে কাজ করছিল। মুখ না তুলেই সহাস্যে বললেন, মিস্টার টেরাব, ইউ হ্যাভ অ্যা গুড নিউজ। কারমেন আগামী সপ্তাহ থেকে আর কাজে আসবে না। ওর স্থলে তোমার স্ত্রীকে হায়ার করতে চাই। তোরাব আলীর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। লরির প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে, থ্যাঙ্কূ থ্যাঙ্কূ। শব্দ দুটি এত ক্ষীণ শোনাল যে, মিস লরির কর্ণকুহর পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা ঠিক বুঝা গেল না। কাজ শেষে বাড়ির পথে যেতে যেতে তোরাব আলীর মনে আনন্দের চেয়ে শংকা, সংশয় বিরাজ করছিল। ইংরেজি না জানা জাহেলা পারবে তো কথা বুঝতে ? পারবে তো কাজ করতে ? 

তবুও ঘরে ফিরে জাহেলাকে জড়িয়ে ধরে সুখবরটা দেয়। হুনছস বউ, একখান বালা খবর আছে। তুর কামডা মনে অয় অইয়াই যাইব। আইজ মেনেজার কইল কাইল সক্কাল সক্কাল তুরে লইয়া যাইবার লাগি। দুইজন মিইল্যা কাম করলে ম্যালা ট্যাহা জমাইবার পারুম। গেরামের ঘরডা বিল্লিং বানায়া ফালামু। জাহেলার ভাবনা অন্যখানে। তার চোখ চিকচিক করে উঠে। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠে, ‘ জীবনে প্রত্থম রোজগার করুম। মায়েরে মাঝে মইধ্যে ট্যাকা দিতে পারুম। বাপডা মইরা গ্যছে হেই ছুডুকালে। বাপের অল্প ইট্টু ফসলী জমি লইয়া তিনডা মাইয়া মা একলাই পালসে, বিয়া দিসে খায়া না খায়া। ফড়ালেহায় বালা অইলেও বেশিদিন আগায়া নিতে ফারে নাই। কচকইচ্যা কাগজের ট্যাকা মা কবে ছুইয়া দ্যাখসে কে জানে। ভাগ্যিস সইল্যের রংডা পাইসিলাম মার লাহান।’ অবস্থাওয়ালা ঘরে বিয়ে না হলেও মোটামুটি খেয়েপরে দিনাতিপাত করতে পারবে, এমন ঘরেই বিয়ে হয়েছে জাহেলার বাকি দুই বোনের। মাঝে মধ্যে টাকা পাঠালে মায়ের ওষুধপত্র কিনা নিয়ে গাফলতি হবে না। মায়ের আনন্দিত মুখাবয়ব দেখতে দেখতে জাহেলা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। 

পরদিন সকালে নিউইয়র্ক শহর কর্মব্যস্ত হয়ে উঠবার আগেই দুরু দুরু বুকে জাহেলা স্বামীর সাথে তার কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বের হয়। মিস লরির কোনো কথা না বুঝলেও সমস্যা হয়নি তার। জমির ভাই নামের একজন বাঙালি ভাই ইংরেজিতে জাহেলার কথা মিস লরিকে বুঝিয়ে বলেন। ফর্ম ফিলাপও করে দেন জমির ভাই। তিনি জাহেলাকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, সে থাকতে জাহেলার কোনো প্রব্লেম হবে না। জাহেলা বার্গার, ফ্রেন্স ফ্রাই বানানো শিখে ফেলে সহসাই। ফ্রেন্স ফ্রাই তেলে কীভাবে কত মিনিট ডুবিয়ে ভাজতে হয়, নির্ধারিত সময়ে চুলায় এলার্ম বাজলেই কেমন করে ফ্রাইগুলো তুলে রাখতে হয়, সল্ট ছিটিয়ে দিতে হয়, এসব শিখতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি তার। শুধু আইটেমগুলোর নাম মনে রাখা যেন খাড়া পাহাড়ে উঠার মতো কঠিন লেগেছে। জাহেলা রোজ সন্ধ্যার কিছু পরে বাড়ি ফিরে। রান্না করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করে। তোরাব আলী ফিরতে একটু দেরি হয়। তবুও জাহেলা অপেক্ষায় থাকে। স্বামী এলে এক সঙ্গে রাতের খাবার খায়। খেতে খেতে নানান বিষয়ে গল্প করে। বেখেয়ালে হো হো করে হেসে উঠে। মাসের শেষ শনিবার মা আর কন্যা ময়না গায়ের বাজারের ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে এসে অপেক্ষায় থাকা নিয়মে দাঁড়িয়েছে। তোরাব আলী আর জাহেলা তাদের ছুটির সেই দিনটি আসার আগের রাত থেকে ভাবনায় থাকে পরদিন ফোনে কী কী কথা বলবে। এ যে বড় আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। নির্দিষ্ট দিনে বাসা থেকে কয়েক ব্লক দূরে জ্যাকসন হাইটসে কলিং সেন্টারে হাজির হয় দুজন। তাদের কথা হয় উচ্চস্বরে, আটলান্টিক মহাসাগরের দুই প্রান্তের দুই দেশে। অশ্রু বিসর্জন চলে ক্ষণিক। চলে আশার কথা। স্বপ্নের কথা। এ যে তোরাব আলী আর জাহেলা বেগমের ব্যস্ত জীবনের একমাত্র বিনোদন। একমাত্র সুখ। 

জাহেলা সপ্তাহে তিনদিন রান্না করে ফ্রিজে রাখে বাটিতে বাটিতে সাজিয়ে। দুইজন মাত্র মানুষ। এতেই সাতদিন চলে যায়। তবুও বিপত্তি বাঁধে রান্নাঘর নিয়ে। জাহেলার রান্নার সময়ে পাশের রুমের মতিন ভাইয়ের স্ত্রী জান্নাত ভাবীও রান্না করে রোজ। ছোট রান্নাঘর। দুইজন একসাথে কাজ করতে সমস্যা হয়। এক সন্ধ্যায় মুখ ফুটে বলেই ফেলে, ভাবী, আফনে তো বাইরে কাইজ কাম করেন না। ঘরেই থাহেন।আফনে তো আনিটাইমে রানতে পারেন। আমার রান্ধনের দিন চুলাডা কী আমার লাইগ্যা খালি রাহন যায় না ? জান্নাত ভাবী জাহেলার মুখে এহেন কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। বলেন, এপার্টমেন্ট ভাড়া নিছি আমরা। আমার সুবিধা মতো সময়ে আমি রান্না করবো। আপনি বলার কে ? জাহেলাও কম যায় না। আমরা তো আর মাগ্না থাহি না। ট্যাহা দিয়া থাহি। তর্কে তর্কে কথা বাড়ে। জান্নাত ভাবী গলা একধাপ উঁচিয়ে বলেন, এইসব প্রবলেম নিয়া থাকতে পারলে থাকেন, নইলে যেইখানে রাজকীয় হালে থাকতে পারবেন সেইখানে যান। ব্যস, সেদিনের পর থেকে একই বাড়িতে থেকেও দুই নারীর কথা বলা বন্ধ। কেউ আর কারো ছায়াও মাড়ায় না। 

চটপটে স্বভাবের জাহেলা কাজ শিখতে শিখতে কখন যে ইয়েস নো ভেরিগুড শিখে ফেলেছে! দিনের শুরুতে ম্যানেজার মিস লরিকে দেখলে গুড মর্নিং মিস লরি বলে সম্ভাষণ জানায়। একটু আধটু ইংরেজি জানায় আর সারাদিন সকলের সাথে হাসিখুশি স্বভাবের কারণে মিস লরি খুশি হয়ে জাহেলাকে ক্যাশ রেজিস্টারে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্যাশিয়ারকে হেল্প করার জন্যে দাঁড় করিয়ে দেয়। এতে জাহেলার একদিকে লাভই হয়েছে বলা চলে। বছর না পেরুতেই জাহেলা নিজেই কাস্টমারের অর্ডার নিতে শিখে ফেলে। শত ব্যস্ততায়ও মুখে মিষ্টি হাসি লাগিয়ে বলে উঠে, হাই ম্যাম, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ? এতে কেউ কেউ খুশি হয়ে জাহেলাকে বখশিস দেয়। এদিকে তোরাব আলীর ইংরেজি বলা হয়ে উঠে না একেবারেই। কেননা তার সাথে কাস্টমারের কোনো সংযোগ নেই। মুখ বুজে শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যায়। 

জাহেলা বেগম ব্রেক টাইমে ষ্টোরের বাইরে গিয়ে হেঁটে আসে ক্ষণিক। পাশের ডিপারট্মেন্টাল স্টোরে কাজ করে রায়হান নামের এক বাঙালি ছোট ভাই। মাঝে মাঝে কেনাকাটা করতে সেখানে যায় জাহেলা। ভিড় না থাকলে দাঁড়িয়ে গল্প করে কিছুক্ষণ। রায়হান নিউইয়র্ক এসেছে স্টুডেন্ট ভিসায়। পড়াশোনার পাশাপাশি উইকএন্ডে ডিপারট্মেন্টাল স্টোরটিতে পার্ট টাইম কাজ করে। সে জাহেলাকে স্কুলে ভর্তি হবার পরামর্শ দিয়ে বলে, আপা, এই দেশে লেখাপড়ার কোনো বয়স নাই। দরকার হলে ছোটোখাটো কোনো কোর্স করেন। ভালো চাকরি পেয়ে যাবেন। বার্গার কিং এর চাকরির তো কোনো ভবিষ্যৎ নাই। রায়হানের কথাগুলো মনে ধরে জাহেলার।

রাতে খাবারের সময় স্বামী তোরাব আলীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে। স্বামীকে এ-ও জানায়, রায়হান কইসে লেহাফরার ব্যাফারে দরকার লাগ্লে সে আমারে সাহার্য করব। তোরাব আলী খুশি হয় যদিও, কিন্তু সংশয় প্রকাশ করে। বলে, এই দ্যাশের লেহাফরা ফারবি তুই বউ ? মুখ দিয়া কওন যত সোজা, আসলে কী এত সোজা নি ? স্বামীর শঙ্কা আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখে জাহেলা বেশ দৃঢ়তা আর আত্নবিশ্বাসের সাথে জানায়, কুনুদিন কী খোয়াবেও কলফনা করসি বিদেশী বেডাবেডি গো ইংরেজি কতা বুঝুম? নাকি কুনুদিন ইংরেজি কইতে পারুম? দেহেন, এহন বেবাক মাইনসের কতা বুঝি। কইতেও ফারি কমবেশি। তোরাব আলী মাথা নেড়ে সায় দেয়। তা অবশ্য মিছা কস নাই বউ। রাত বাড়ে। ক্লান্ত শরীরে তন্দ্রা নেমে আসে। তন্দ্রা আর ঘুমের মাঝামাঝি সেই স্বল্প সময়ে তোরাব আলী ভাবে, বউডায় লেহাফরা শিইখ্যা বালা একখান চাকরি ফাইলে দিন বদলায়া যাইব আমাগো। দুইজনের কামাইয়ের ট্যহায় শহরে কিছু জমি কিইন্যা দালান বানায়া ভাড়া দেওন যাইব। শেষ বয়সে দ্যাশে ফিরা গেলে অন্তত না খায়া থাহন লাগব না। আত্নিয়- স্বজন নাই। চিনা মানুস নাই। এইভাবে এই দ্যাশত কয়দিন থাহুম। তোরাব আলীর বুকের গহিন থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে সে গভীরঘুমে তলিয়ে যায়। 

কিন্তু মাস না পেরুতেই তোরাব আলীর মাথা চৈত্রের খরার মতো জ্বলে উঠে। স্টোরের সুপারভাইজার জমির ভাই এইডা কী হুনাইল? এইসব হুনবার আগেই আল্লায় আমারে উডায়া লয়া গেল না কিল্লাই! পাশের দোকানের রায়হানের লগে জাহেলারে হাসি-তামাশা করতে দেখসে ফট্টিন এভিনিউয়ের কোণায়। আজ সারাদিন তোরাব আলীর মাথায় কিলবিল করে ঘুরেছে জমির ভাইয়ের কথাগুলো। বুঝলা তোরাব ভাই, যত যা-ই কও, এই বউ তুমি বেশিদিন রাখতে পারবা না। একে তো সুন্দরী, গ্রিনকার্ড আছে। তার ওপর আবার এখন লেখাপড়া করবে। তোমার লগে থাকবো কোন দুঃখে? এমন ঘটনা গত এক যুগে এই বিদেশে অনেক দেখছি। এখনই সতর্ক হও তোরাব ভাই। নইলে সামনে বিপদ আছে তোমার। ওই রায়হান ছেলেটার মতলব ভালো না। সে আসছে স্টুডেন্ট ভিসায়। তার তো এই দেশে বৈধ কাগজ নাই। তোরাব আলী ভাবে, জমির ভাইয়ের কথার যুক্তি আছে। ফোলাডারে বালা মনে করসিলাম। এইডা যে আস্তা একটা লাফাঙ্গা, হেইডা তো বুজবার ফারি নাই। খানকি মাগি ফরনের উসিলায় লাফাঙ্গার লগে পিরিত করতাসে? আইজ বাইত গিয়া লই, তরে আমি কী করি দ্যাখ। তোরাব আলীর মাথা যন্ত্রণা করে উঠে। কর্মস্থলে এই প্রথমবারের মতো ম্যানেজার মিস লরিকে অসুস্থতার কথা বলে বেড়িয়ে পড়ে। বাইরে তখন কণকণে শীতের রাত। শীতকালে ৫ টা বাজতেই চারপাশে আঁধার করে সন্ধ্যা নামে। সবে আটটা বাজে। তবুও মনে হয় যেন মধ্যরাতের শহর। তোরাব আলী এই তীব্র শীতেও ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ঘরে ঢুকে। জাহেলা তখনো ফিরেনি। সে তো কাম থেইক্যা বাইর হইসে ঘণ্টা তিনেক আগে। নিশ্চয়ই ওই লাফাঙ্গার লগে রংতামাশা করতাসে কোনো চিপায়। তোরাব আলী থম মেরে বসে থাকে রান্নাঘরের এক কোণে রাখা ডায়নিং টেবিলের পাশের নড়বড়ে চেয়ারটাতে। জান্নাত ভাবী রাতের খাবার নিতে এসে দেখে তোরাব আলী মুখ আঁধার করে বসে আছে। বললেন, কী তোরাব ভাই, আজ এতো তাড়াতাড়ি যে? তোরাব আলী রা করে না। জান্নাত ভাবী প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে বলেন, সেইদিন আপনাদের কথা শুনতেছিলাম। আপনার বউ নাকি লেখাপড়া শুরু করবে? যোগ্যতায় আপনের চেয়ে উপরে উঠে গেলে আপনেরে মান্য করব? ঠাট্টাচ্ছলে তিনি আরও বলেন, লেখাপড়া করলে চোখ উঁচা হইয়া যাইব। তখন আপনেরে ছেড়ে পাখি উড়াল দিব। হি হি হি। ভাতের প্লেট হাতে রুমের দিকে যেতে যেতে জান্নাত ভাবী বলেন, গত মাসেই আমাদের এপার্টমেন্টের চারতলার এক ভাবী ছোট দুইটা বাচ্চা, স্বামী, সংসার সব ফালায়া পলায়া গেছে উনাদের পাশের রুমের সাবলেট থাকা বেচেলর ছেলেটার সাথে। তোরাব আলীর গলা শুকিয়ে আসে। গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে গিলছে। আচমকা নাকে মুখে পানি আটকে কাশতে থাকে। কোন বালা মুশিবত আইতাসে মাথার উপ্রে! এইডা কী কইল জান্নাত ভাবী! আমারে ফালায়া যাইব গা? আমারে ফালায়া পলায়া যাইব? তোরাব আলী বিড়বিড় করতে থাকে। 

দুইহাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ মেঝেতে রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে জাহেলা বলে উঠে, বিড়বিড়াইয়া কী কন? কাম থেইক্যা আসার সময় জ্যাকসন হাইট নামসিলাম বাজার করতে। তাই দেরি হয়া গেল। তা আইজ এত্ত তাত্তারি আইলেন যে! তোরাব আলী তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। হ্যাঁচকা টানে জাহেলাকে পর্দার ওপাশে রুমের ভেতর নিয়ে যায়। আমি তাত্তারি আমু, না দেরিতে আমু তরে কইতে অইব? আমি দেরিতে আইলে তর সুবিদা অয়? লাফাঙ্গার লগে ফষ্টিনষ্টি করবার পারস? তুই কুন শিক্ষিত ঘরের ঝি যে তুর লেহাফরা করন লাগব? তুর চৌদ্দ গুষ্টির কেউ শিক্ষাদীক্ষা করসে নি? তুর ক্যান ইস্কুলে ভরতি অইবার খায়েস অইসে? আমারে বেক্কল পাইছস? ঘটনার আকস্মিকতায় জাহেলা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতে স্বামীকে বলে, আফনের কী অইসে আমারে খুইল্যা কইবেন? তোরাব আলীর মাথায় রক্ত টগবগ করে উঠে। উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলে, মাগী কী কইরা বেড়াইতাছস ভাবছস আমি কিছুই জানি না? আমারে জিজ্ঞাস? আমারে জিজ্ঞাস? জমির ভাই রে জিজ্ঞা গিয়া। রায়হান লাফাঙ্গার লগে... ছি ছি...। জাহেলার বুঝতে বাকি থাকে না জমির ভাই তার নামে কান কথা লাগায়ে স্বামীর মাথাটা বিগড়ায়ে দিছে। স্বল্প সময়ে কাজে দক্ষতা, ইংরেজি বলায় পারদর্শিতায় তার প্রতি ম্যানেজার লরির সুনজরে জমির ভাই অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিল। ইদানিং সে জাহেলাকে তেমন সহ্য করতে পারছিল না। আর তাই মোক্ষম জায়গায় হাত দিয়েছে। সেই রাতে জাহেলার ঘর থেকে হু হু করে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে শোনা যায় রাতের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। পাশের ঘরের মতিন ভাই এবং তার স্ত্রী জান্নাত সে কান্নার নিরব সাক্ষী হয়ে থাকে। 

পরদিন প্রত্যুষে জাহেলা রোজকার নিয়মে কাজে গেলেও তোরাব আলী কর্মক্ষেত্রে ফোন করে অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নেয়। দিনভর রুমে শুয়ে কাটিয়ে দেয়। কী করবে ভেবে কোনো কূলকিনারা করতে পারে না। দুপুরের কিছু পরে পাশের রুমের মতিন ভাই আর জান্নাত ভাবী তাকে একরকম জোর করে খাবার খেতে দেয়। মতিন ভাই তোরাব আলীর কাঁধে হাত রাখে। সান্ত্বনার স্বরে বলেন, ‘ বুঝলে তোরাব, এত বছরের বিদেশ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেছি, অনেক মেয়েমানুষকেই ঘর ছেড়ে পরপুরুষের সাথে চইলা যাইতে দেখছি। জাহেলার আর কী দোষ? তার বয়স কম। সুন্দরী। গ্রিনকার্ড আছে। অনেকেই তারে ফুসলাইয়া বিয়া করতে চাইব কাগজের লোভে। তুমি যেহেতু একটা ঘটনা টের পায়া গেছ, এক কাজ করো, মুভ হয়া বাফেলো চইলা যাও। ওইখানে মানুষ কম, বাঙালি কম। বাড়িভাড়াও কম। ওইখানে আমার এক বন্ধু আছে। সে তোমারে কাজ পাইতে, বাসা পাইতে সাহায্য করব। তোমার একলার কামে সংসার চালাইতে পারবা। বাচ্চাকাচ্চা হইলে জাহেলার বুঝজ্ঞান হইব। বাচ্চার মায়ায় বান্ধা পইড়া যাইব। তখন আর তালিবালি করনের দিকে মন যাইব না’ কথাগুলো তোরাব আলীর মনে ধরে। মতিন ভাই তার দেশি মানুষ। শুভাকাঙ্ক্ষী। মতিন ভাই বিপদে আপদে আগায়া আসা মানুষ। উনার ঋণ কুনুদিন শোধ করতে পারুম না, ভাবে তোরাব আলী। 

পরের সপ্তাহে ভোরের দিকের কথা। কুয়াশার চাদরে ঢাকা সকালটি চোখের সামনেই খুব ধীরে নিরাভরণ হলো সবে। জাহেলাকে বেড়াতে যাবার কথা বলে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে মতিন ভাইর গাড়িতে রওয়ানা দেয়। আসা-যাওয়ার ভাড়া বাবদ মতিন ভাইর চাহিদামাফিক ডলার খামে ভরে দেয় জাহেলার অগোচরে। জাহেলা কিছুই বুঝতে পারে না। সে জানে সপ্তাহ খানেকের জন্যে বেড়াতে যাচ্ছে নতুন একটা শহরে। কিন্তু যাবার পর সবকিছু পরিষ্কার হতে তার বেশি সময় লাগেনি। মনে মনে স্বামীর প্রতি গোসসা হলেও মুখে কিছুই বলে না। এত সুন্দর চাকরি, চেনা মানুষ সব ছেড়ে আসায় যারপরনাই কষ্ট লাগে জাহেলার। কিছুতেই মন বসাতে পারে না নতুন জায়গায়। স্বামীর অবাধ্য সে কোনোদিন হয়নি। হতে চায়ও না। তাই মুখ বুজে থাকে। স্বামী তাকে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। ‘ আমাগো নিজে গো বাড়ি অইব এইহানে। আমরা আর কারুর লগে ছাবলেট থাহুম না’। তবুও বুকের ভেতরের খাঁচায় নিউইয়র্কের জন্যে পরাণ পুড়ে জাহেলার। দেশ ছেড়ে আসার পর কখনোই মনে হয় নাই সে বিদেশে আছে। চারিদিকে বাঙালি কাউকে না কাউকে পেয়েছে। দোকানপাট, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট কোথাও সমস্যায় পড়তে হয় নাই। এত সুন্দর জায়গা থুইয়া কই লইয়া আইল আমারে। এত ভালা কাম ফালায়া এ কোন নরকে লইয়া আইল। বাংলায় কথা কওনের মানুষ নাই, জন নাই। হাইঞ্জা বেলায় মনে অয় বিয়ান রাইত। ঘুটঘুইট্টা আন্ধার। জাহেলার দম বন্ধ হয়ে আসে। হাঁসফাঁস লাগে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তোরাব আলীর কাজ হয় মতিন ভাইর বন্ধুর বাঙালি গ্রোসারি দোকানে। সকালে যায়, রাতে ফিরে। এইদিকে জাহেলা সন্তানসম্ভবা হয়। কিন্তু সে খুশি হতে পারে না। এই অসময়ে সে সন্তান চায় নাই। এবোরোশন করাতে চায়। লেখাপড়া করে ভালো একটা চাকুরি করতে চায়। একটু গুছিয়ে নিয়ে তারপর সন্তান নেয়া যাবে। কিন্তু তোরাব আলী নাছোড়বান্দা। তার সন্তান চাই। জাহেলার আর পড়াশোনা হয় না। চাকরি করা হয় না। বেডপ শরীর নিয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠের দিন গোনে। ডাক্তারের পরামর্শনুযায়ী এক দুপুরে বাড়ির সামনে হাঁটতে বের হয়। কয়েক ব্লক হেঁটে যাবার পর তার মাথা ঘুরে উঠে। পড়ে যাবার উপক্রম হতেই নিকটস্থ বাড়িটির সিঁড়িতে বসে পড়ে। কেউ পানি এগিয়ে দিতেই জাহেলা ফিরে তাকায়। এই তল্লাটে বাঙালি পরিবার আছে জাহেলার জানা ছিল না। এত কষ্টেও তার চোখেমুখে আনন্দ খেলে যায়। যেন গহীন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এক টুকরো খড়কুটার সন্ধান পেয়েছে। ভদ্রমহিলা জাহেলার চেয়ে বছর দশেক বড় হবেন হয়ত। সন্তানসম্ভবা জাহেলাকে বাড়ির ভেতরে ডেকে নেন। খেতে দেন। বহুদিন পর জাহেলার মনে হয় সে তৃপ্তি নিয়ে কিছু খাচ্ছে। বড় আন্তরিক ব্যবহারের মানুষ নাজমা আপা। বিদায়ের সময় নাজমা আপা বলেন, কখনো খারাপ লাগলে যেন বড়বোন ভেবে তার বাসায় আসে। হাঁটতে হাঁটতে জাহেলাকে পৌঁছে দেন বাড়ির সামনে অব্দি।

নির্ধারিত সময়ের ২ সপ্তাহ আগে জাহেলা ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান প্রসব করে। জাহেলা ব্যস্ত হয়ে উঠে নতুন আসা এই মানুষটিকে নিয়ে। এরই মাঝে নাজমা আপা দুই দিন এসেছিল বাচ্চার জন্যে ব্যবহার্য কিছু জিনিষপত্র নিয়ে। সেই সাথে খাবারও এনেছেন নিজ হাতে রান্না করে। জাহেলা যারপরনাই খুশি হয়। খুশি হয় না তোরাব আলী। নতুন স্থানে আসার পর জাহেলা আর তোরাব আলীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট হয়ে উঠে সেতু আর দেয়ালের মতো। সেতু যেমন যোগাযোগে সহযোগিতা করে, দুইকূলের মানুষের মাঝে বন্ধন গড়ে দেয়, জাহেলা ঠিক তেমন। সকলের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে চায়। মিলেমিশে থাকতে চায়। অন্যদিকে দেয়াল যেমন বিভেদ তৈরি করে, তোরাব আলী ঠিক তেমন। জাহেলা কারো সঙ্গে মেলামেশা করুক, কথা বলুক, এটি সহ্য করতে পারে না। জাহেলার চারপাশে দেয়াল তুলে দিতে পারলেই যেন স্বস্তি তার। সে ফিরেও তাকায় না দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট শিশুটির দিকে। তার পুত্রসন্তানের বড় খায়েশ ছিল। তোরাব আলী কাজের শেষে বাইরে আড্ডা দেয়। রোজ রাত করে বাড়ি ফিরে। ছুটির দিনেও ঘরে থাকে না পারতপক্ষে। জাহেলার সময় কাটে কন্যা আয়নাকে নিয়ে। বড়কন্যা ময়নাকে দেখে নাই কতো বছর! আগের মতো মাস শেষে ফোনও করা হয় না। কোথায় কলিং সেন্টার, কীভাবে যেতে হয় কিছুই জানে না সে। তাছাড়া সে তো এখন আর চাকরি করে না। ডলারইবা কই পাবে। তোরাব আলীর কাছে চাইলে ঘরে চিৎকার চেঁচামেচি হবে। অশান্তি হবে। এই তো কয়দিন আগেই তুমুল বিবাদ লেগে গিয়েছিল। নাজমা আপা তার ছোট সন্তানটিকে গার্বার বেবি ফুড খাওয়ায়। খুবই নাকি পুষ্টিকর খাবার বাচ্চাদের জন্যে। জাহেলাও কন্যা আয়নাকে বেবি সিরিয়াল, গার্বার কোম্পানির নানান ফ্লেভারের সস কিনতে চেয়েছিল। স্বামীকে বলতেই খেঁকিয়ে উঠেছিল। বলেছিল, চাউলের গুঁড়া, সুজি দিয়া শিন্নী বানায়া খাওয়া। আমরা এইসব খায়া ডাঙ্গর অই নাই ? আমরা কী বাপের জর্মে সিরিয়াল চউক্ষে দেখসি ? নওয়াবের ঘরের নওয়াব আইছস! জাহেলা কথা বাড়ায় নাই। দিন দুই পরে জাহেলা বাচ্চার ডায়পার লাগবে বলাতে তোরাব আলী চিৎকার করে উঠে। ভাতের থালাটি ছুঁড়ে ফেলে বলে উঠে, নওয়াবের ঝি আইছস ? ডায়ফার মারাইতে আইছস! বাপের জর্মে দেখছস ? আমরা কী তেনা পিন্দা বড় অই নাই ? তরে কী তর বাপ মায় ডায়ফার পিন্দায়া ফালসে ? জাহেলার গা জ্বলে উঠে। সে সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু বাপ মা তুইল্যা কথা কওয়া একদম সহ্য করতে পারে না। সে বিষ খেয়ে বিষ হজম করার মতো করে দাঁতে দাঁত চেপে লা জওয়াব থাকে। এভাবে সন্তান লালন পালনে জাহেলা পদে পদে বাঁধাগ্রস্ত হতে থাকে। সে ভাবে, ‘ যহন যেই ফরিবেশে মাইনসে থাহে, তহন হেই ফরিবেশের সুবিধানুযায়ী চললে ক্ষতি কী! মাইনসে ট্যাহা কামাই করে ফরিবারের লাইগ্যা, নিজের সন্তানের লাইগ্যা। ট্যাহা তো মাইনসে মাডির তলে লইয়া যাইব না মরবার কালে।’ বছর না ঘুরতেই তোরাব আলী আবার সন্তান নেয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠে। তার ছেলে সন্তান লাগবে। জাহেলা এইবার সন্তান নিতে নারাজ। খাওয়াইবেন কী, পিন্দাইবেন কী ? কুত্তা বিলাইর লাহান বছর বছর খালি সন্তান জর্ম দিলেই অয় ? তোরাব আলীর মুখে ভিন্ন সুর। খাওনের কী অভাব আছে ? সরকার থেইক্যা ফুডস্ট্যাম্প পাই। সন্তান বেশি অইলে ট্যাহাও বেশি পামু। তাছাড়া পুলা ও তো দরকার। বংশে বাত্তি দিবো কে ? 

জাহেলা নাজমা আপার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে। হাতের তালুর উল্টো পিঠে চোখ মুছে। সে যে এখনই আবার সন্তান নিতে চায় না, তা জানায়। তাছাড়া সন্তান লালন পালনে নানান প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। নাজমা আপার খুব মায়া হয় জাহেলার জন্যে। এত অল্প বয়সী, সুন্দর, মোটামুটি স্মার্ট একটা মেয়ে! অথচ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কিংবা মতামতের কোনো দাম নেই। কতো অসহায় স্বামীর কাছে। নাজমা আপার স্বামী দুই মাস আগে দেশে গিয়েছিল বাড়ির নির্মাণ কাজ তদারকি করতে। ফিরবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। স্বামীকে বলে বেশি করে মায়া বড়ি আনিয়ে দেয়। আসার সময় বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে ঘটে এক লজ্জাজনক ঘটনা! লাগেজ চেকিং এর সময় অফিসার সন্দেহের বশে খুলে চেক করতে গিয়ে দেখেন প্যাকেট ভর্তি মায়া বড়ি। তার তো চক্ষু ছানাবড়া। বলেন, স্যার আপনাদের আমেরিকায় কী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল পাওয়া যায় না ? ফিরে এসে সেইসব গল্প করার সময় নাজমা আপার স্বামী হো হো করে হাসেন। 

জাহেলা নিয়ম করে স্বামীর অগোচরে মায়া বড়ি খায়। বছর পেরিয়ে যায়। সন্তানাদি হওয়ার কোনো লক্ষণ নাই। তোরাব আলীর পুত্র সন্তান চাই-ই চাই। এক রাতে সে জাহেলাকে সোহাগ করে কাছে টানে। ফিসফিস করে বলে, বউ, আমারে একখান পুলা দে, আমার পুলা লাগবো। জাহেলা স্বামীর বুকের আরও কাছ ঘেঁসে শোয়। ততোধিক মিষ্টি কণ্ঠে বলে উঠে, আফনে তো আর চেষ্টার কমতি করতেসেন না। জর্ম মৃত্যু যেরম আল্লার হাতে, পুলা মাইয়াও দেওনের মালিক আল্লায়। আচমকা জাহেলার মনে পড়ে আজ তো বড়ি খাওয়া হয় নাই। এক ঝটকায় সরে গিয়ে বাথরুমে যাবার নাম করে রান্না ঘরে যায়। লুকানো ডিব্বার ভেতর থেকে বড়ি বের করে খায়। ঘোৎ করে পানি গিলে। পেছনে ঘুরতেই ভূত দেখার মতো নিঃশব্দে তোরাব আলীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। ওষুধের খালি খোসা গারবেজ ক্যান থেকে তুলে নেয় তোরাব আলী। পলায়নপর ভীত ইঁদুরের মতো এদিক সেদিক তাকায় জাহেলা। তোরাব আলীর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। খানকি মাগি, তুই মায়া বড়ি খাস ? কে তরে মায়া বড়ি আইন্যা দিসে ? ঘরময় চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে চুলের মুঠি ধরে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় জাহেলাকে। টেবিলের কোণায় কপাল লেগে ফেটে রক্তপাত হতে থাকে। জাহেলার মাথার উপরে ছাদ, ঘর, পৃথিবী দুলে উঠে। চোখে অন্ধকার দেখে। নিকষ অন্ধকারে সে শুনতে পায় তোরাব আলীর হিংস্র কণ্ঠস্বর। যদ্দিন না পুলা দিবি, তদ্দিন সন্তান পয়দা অয়াইতেই থাহুম। আমারে পুলা দিতে না পারলে দ্যাশে গিয়া আরেকটা বিয়া কইরা আমু, হুইন্না রাহিস কইলাম। তহন কিসু কইতারবিনা। এরপর জাহেলার আর কিছু মনে নাই। কন্যা আয়নার কান্নার শব্দে যখন জ্ঞান ফিরে, দেখে সে রান্না ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। মেঝে জুড়ে তখন জানালা দিয়ে আসা সকালের সূর্যের কিরণ আর গাছের ডালপালার ছায়া আঁকিবুঁকি খেলা করছে। 

পরদিন সারাদিন মনখারাপের সময় কাটে জাহেলার। বিকালের দিকে দরজায় টোকা পড়ে। জানালার পর্দা অল্প একটু সরিয়ে দেখে নেয় সে। নাজমা আপা উঁকি দিয়ে স্মিত হেসে বলেন, এত সুন্দর ওয়েদার বাইরে, আর তুমি বাচ্চা নিয়া ঘরে বসে আছ ? আমি পার্কে যাচ্ছি। তুমি আয়নাকে নিয়ে আসো। জাহেলা মনের সাথে যুদ্ধ করে। পার্কে যাবে কী যাবে না। যাওয়াটা কী ঠিক হবে? তার খুব যেতে ইচ্ছে করছে। বুক ভরে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের উপর ভারি পাথর দিয়ে কেউ যেন তাকে চেপে রেখেছে। কিন্তু কপালের একাংশ ফুলে ঢোল হয়ে আছে। অন্য অংশ কেটে গেছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দিবে ? বলতে অইব পাকের ঘরে কাম করতে গিয়া পইড়া গেসি। জাহেলা আর ঘরে থাকতে পারে না। আয়নাকে তৈরি করে নেয়। নিজেও ভালো জামা পরে মুখে পাউডার দিয়ে ক্ষত ঢাকার চেষ্টা করে। অবশেষে পার্কের দিকে হেঁটে চলে। ততক্ষণে নাজমা আপা ছাড়াও সেখানে আরও দুইজন বাঙালি ভাবী এসেছেন। তারা কাছাকাছি কোথাও থাকেন। জাহেলার সঙ্গে তেমন সখ্যতা নেই। তবে পার্কে এলেই দেখা হয়, কথা হয়। আজ জাহেলার দিকে সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। চোখ জোড়া ফোলা, রক্তজবার মতো লাল। রাতভর কান্নার পর যেমন হয়, ঠিক তেমন। কপালের একপাশ ফোলা, অন্যপাশ কাটা। নাজমা আপা জাহেলার কাঁধে হাত রাখে। কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। কী হয়েছে তোমার? এ কী অবস্থা! কোনো সমস্যা? জাহেলা বলতে পারেনি যে সে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে হুহু করে কেঁদে উঠে। তার চোখের ভেতরের থৈ থৈ জলের দীঘিটি আচমকা উপচে পড়ছে যেন। এই আত্মীয়-পরিজনহীন দূরের দেশে সে কাকে বলে হাল্কা হবে? কার কাছে বলবে যাপিত জীবনের সীমাহীন কষ্ট, যন্ত্রণার কথা? এই যে তিন জোড়া চিন্তিত চাহনি, কাঁধে নির্ভরতার হাত, এরাই তো তার আপনজন। জাহেলা গতরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা আর চেপে রাখতে পারে না। শুনে তারা সকলে ব্যথিত হয়। ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বলে, এই দেশে কারো গায়ে হাত তোলার অধিকার কারো নাই। জাহেলাকে ভৎসনা করে কেনো সে ৯১১ কল করে পুলিশকে জানায়নি। পুলিশের সহায়তা চায়নি। তারা সবসময় জাহেলার পাশে আছে, থাকবে বলে আশ্বস্ত করে। জীবন মানেই ধূসর মরুভূমি, দুর্গম পাহাড়। শত বাঁধা মোকাবেলা করার নামই জীবন, বলেন নাজমা আপা। জাহেলা মাথা নিচু করে একখণ্ড বেদনার নীল সীমানা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। 

সে রাতে তোরাব আলী বাড়ি ফিরে পূর্ব রাত্রির ঝগড়ার রেশ টেনে বলতে থাকে, এতদিন অইয়া গেলো, আইজ পর্যন্ত একটা পুলা দিতারস না! তোরাব আলীর মুখ থেকে ভোঁস ভোঁস করে গন্ধ বেরোয়। ইদানিং এমন গন্ধ প্রায়ই নাকে এসে লাগে জাহেলার। মাথা ঘুরে উঠে। কেনো জানি আজ নিজেকে বড় সাহসী মনে হয় তার। মাথা বিগড়ে উঠে। সে বলে উঠে, দুইডা জর্ম দিসেন, ওইগুলানরেই ঠিক মতো খাওয়াইতে পিন্দাইতে পারেন না, আরও জর্ম দিবার চান? সন্তানের সিরিয়াল কিইন্না দেন না, ডায়পার দেন না। এই বিদেশত থাইক্যা অ্যাঁই কিল্লাই চাইলের গুঁড়া খাওয়াইতাম? কিল্লাই তেনা ফিন্দাইতাম? মুরোদ নাই আবার বড় বড় কতা হুনান! তোরাব আলী ছ্যাঁত করে জলে উঠে। গরম তেলে পানির ছিটা দিলে যেমন, ঠিক তেমন। কয়েকগুণ জোরে চেঁচিয়ে বলে, মাগি, বিদেশত আইয়া তর সইল্যে তেল অইসে? এত্ত বড় সাহস! কে তরে ইন্ধন দেয়? নিউইয়র্ক থাকতে ওই রায়হান পোলাডার লগে ফষ্টিনষ্টি কইরা বেরাইছস। এইহানে আইয়া আবার কোন ভাতার জোগাড় করসোস যে তরে মায়া বড়ি আইন্যা দেয়? আইজই দ্যাশ ফোন দিয়া তর মায়েরে কমু। বইনের জামাইগো রে কমু। দেহুম গেরামে মুখ দেহায় ক্যামতে। জাহেলার আজ আর তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন সহ্য হয় না। তুমুল তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তোরাব আলী জাহেলার দিকে তেড়ে আসে। আত্মরক্ষার্থে জাহেলা দৌড়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। তীব্র ক্ষোভএ, অপমানে, যন্ত্রণায় কম্পিত হাতে সে ফোনের রিসিভার তুলে ৯১১ নাম্বার টিপে। ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো বলতেই জাহেলা কোনো কথা না বলে ভয়ে রিসিভার রেখে দেয়। ক্ষণিক বাদেই দরজায় বেল বেজে উঠে। দরজা খুলে তোরাব আলী। তার চোখে বিস্ময়। মাগি তাইলে পুলিশ কল করসে! দুইজন পুলিশ অফিসার একযোগে জানতে চায় কী হয়েছে, আমরা কীভাবে তোমাদের হেল্প করতে পারি। জাহেলা ভেতর ঘর থেকে সামনে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে তার রাগ গোস্বা খানিক পড়ে এসেছে। সে অফিসারদ্বয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে তাদের হেল্পের প্রয়োজন নেই। তবুও অফিসাররা পুরো ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর ঘুরে ঘুরে দেখেন। যাবার সময় পুলিশ তাদের দুইজনকেই ওয়ার্নিং দিয়ে যায়। থমথমে ঘরে জাহেলা রান্নাঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে সামনের কাঠের বাড়িটার ছাদের উপরের শূন্য দিকটায় চেয়ে থাকে। সে রাতে সারারাত তীব্র বৃষ্টিপাত হয়। সাথে আকস্মিক প্রবল ঝড়ো হাওয়া। সেইদিকে চেয়ে রাতভর বাতাসের শব্দে মনে মনে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কোনো অসহায় মানবী প্রাণপণে দেয়াল সরানোর চেষ্টা করে। 

পরদিন নিয়ম করে সূর্য উঠে। ঝকঝকে নীলাকাশের নিচে ঝলমলে রোদ গা বিছিয়ে শুয়ে থাকে। পাখি ওড়া সন্ধ্যা নামে। অন্ধকার রাত পেরিয়ে ভোরের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে ধরণি। কিন্তু তোরাব আলী আর জাহেলা বেগমের সংসার আর আগের মতো থাকে না। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারো ছায়াও মাড়ায় না। যেন একই ছাদের নিচে থেকেও দুর্লঙ্ঘ এক দেয়ালের দুইপাশে দুজনের বাস। তোরাব আলী ঘরে ফিরলে বিদঘুটে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরে। জাহেলা বুঝে এ যে মদের গন্ধ। সে ভয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে কন্যা আয়নাকে নিয়ে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। তোরাব আলী রাতের অনেকটা সময় সারা ঘরময় উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। হাত বেঁকিয়ে হিজড়াদের মতো অঙ্গভঙ্গি করে গালিগালাজ করে ক্লান্ত না হওয়া অব্দি। ক্লান্তিতে একসময় ঘুমিয়ে গেলেই ক্ষান্ত হয়। মন চাইলে বাজার সদাই করে, নইলে নয়। মন চাইলে জাহেলাকে জোর জবরদস্তি করে ধর্ষণ করে নিজের রুমে গিয়ে বেঘোরে ঘুমায়। জাহেলার নিজের কোনো আয় রোজগার নাই যে প্রয়োজনে এটা সেটা কিনবে কন্যার আবদার মিটাতে। নিউইয়র্ক থাকতে আয়ের পুরাটাই স্বামীর হাতে তুলে দিতো। সদা হাসিখুশি আর সুন্দর ব্যবহারে খুশি হয়ে অনেকে বখশিস দিত জাহেলাকে। সেটাই লুকিয়ে জমাতো। কিছু ডলার জমলেই মানি এক্সচেঞ্জে গিয়ে মায়ের জন্যে দেশে পাঠিয়ে দিত। বাফেলো আসার পর তার আর সেই সুযোগ রইল না। সন্তানের দুধ ফুরিয়ে এলে সে স্বামীকে জানায়। তোরাব আলী খেঁকিয়ে উঠে। হাত নাড়িয়ে নানান অঙ্গভঙ্গি করে বলে উঠে, ট্যাকা কী হাওয়ায় ভাইস্যা আহে ? নাকি গাছে ফাতার লাহান ঝরঝরাইয়া ফরে যে খালি টোকাইয়া ব্যাগে ভরলেই অয়? কইথেইক্যা ক্যামতে ট্যাকা কামাই করি, হেইডা তুই বুঝবি কী? হারাদিন নওয়াবের বেডির লাহান পইরা পইরা ঘুমাস, খাস আর গুইরা বেড়াস! নওয়াবের ঝি আইছস। পত্যেক দিন গোসল করন লাগে? ফানির বিল কত আহে হেই হুস আছে? কইসি পেচ্ছাব কইরা ফেলাস করবি না। খালি হাগলে ফেলাস করবি। কুনু কতাই তো কান দিয়া যায় না চুতমারানির ঝির। জাহেলার চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে। জানালায় এসে দাঁড়ায়। নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে দীঘল কালো খোলা অগোছালো চুল পিঠে এলিয়ে। দিগন্তের দিকে দূরে বহুদূরে যেখানে নীলাকাশ নেমে গেছে, সেইদিকে তাকিয়ে রয়। অসীম নীলের মাঝে শাদা মেঘের আঁচড়কে তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা তীব্র ব্যথার অচেনা আঁচড়ের মতো মনে হয়। 

কন্যা আয়না একটু একটু করে বড় হতে থাকে। এরই মধ্যে স্বল্প আয়ে বাড়ি কিনে বিভিন্ন স্টেট থেকে বেশ কিছু বাঙালি পরিবার মুভ হয়ে এসেছে বাফেলোয়, জাহেলাদের আশেপাশে। দুইব্লক দূরের প্রতিবেশী শায়লার মায়ের সাথে গিয়ে কন্যা আয়নাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে আসে। শায়লা এবং আয়না একই ক্লাসে পড়ে। এতে জাহেলার একটু সুবিধাই হয়েছে। কখনো জাহেলা দুইজনকে একসাথে স্কুল থেকে পিকআপ করে। কখনোবা শায়লার মা। জাহেলার ভেতরে স্বাবলম্বী হওয়ার বোধ তুমুলভাবে নাড়া দিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। স্বামীর কাছে হাত পাততে তার খারাপ লাগে। অপমান লাগে। কথায় কথায় গাইল পারে। আর কত সহ্য করন যায়! গ্রীষ্মে অন্য অনেক বাঙালি মায়েদের মতো জাহেলাও নিয়ম করে কন্যাকে নিয়ে পার্কে গেলে নানান বিষয়ে কথা হয় তাদের। সুখের কিংবা দুঃখের। জাহেলা তাদের কাছে কাজের সন্ধান চায়। সে কাজ করতে চায়। তার সমস্যার কথা খুলে বলে। নারীদের কেউ কেউ ব্যথিত হয়। স্ত্রীর প্রতি তোরাব আলীর এহেন আচরণ কারো কারো অবিশ্বাস্য ঠেকে। ‘ এতো নর্ম ভদ্দর মানুষ! মাতা নিচা কইরা হাঁইট্টা যায়। কথা কম কওনের মানুষ তোরাব ভাই। ক্যমতে গাইল পারে বউডারে মাতাত ঢুকে না’। কেউ কেউ জাহেলাকে চাকরি করার পরামর্শ দেয়। বাচ্চার স্কুলের সময়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ করলে অন্তত নিজের আর সন্তানের হাত খরচ তো চালানো যাবে। জাহেলা দীর্ঘশ্বাস নেয়। কন্যা আয়নাকে বুকে জড়িয়ে অদৃশ্য আয়নায় নিজেকে দেখে। ভাবে, পেডে ভাতে খাওনের নামেরে কী জীবন কয় ? সখ আহ্লাদ থাহে না মাইনসের? যেই মা জর্ম দিসে, এত কষ্ট কইরা খায়া না খায়া পালসে লালসে, হের লাইগ্যা কী কুনু দায়িত্ব নাই মাইয়া মানুষ হয়া জন্মাইসি বইলা? বেডা মাইনসেই কী খালি বাপ-মার লাইগ্যা দায়িত্ব ফালন করব? তারে যেমনে জর্ম দিসে, আমারেও কী হেমনে জর্ম দেয় নাই? 

জাহেলার চাকরি হয় একটি প্যাকেটিং ফ্যাক্টরিতে। সেখানে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, জোয়ান, বুড়া সকলেরই চাকরি হয়। কখনো অনেক কর্মঘণ্টা কাজ দেয়। ওভার টাইম আর কী। আবার কখনো অধিকাংশকে ‘ গো হোম’ বলে দেয়। তরুণরা বেশিদিন সেইখানে কাজ করে না। ভাল চাকরি পেলে চলে যায়। যাদের অন্য কোথাও কাজ হবার নয়, তারা এই চাকরিটিকে আঁকড়ে পড়ে থাকে। শোনা যায় মাঝে মাঝে কর্মীর অভাব দেখা দিলে জেলখানা থেকে সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের গাড়িতে ভরে নিয়ে আসা হয় কাজের উদ্দেশ্যে। কাজ শেষে আবার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জাহেলার এতশত জানার দরকার নাই। সে শুধু স্কুল খোলার দিনে স্কুল চলার সময়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ করতে পারলেই খুশি। শায়লার বাবা সেই ফ্যাক্টরির লোকজনদের রাইড দেয়। অর্থাৎ নিজের গাড়িতে আনা-নেয়ার কাজ করে। বাঙালি কর্মীদের বাড়ির সামনে থেকে নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িতে তুলে নেয় একে একে। ফ্যাক্টরির সামনে নামিয়ে দিয়ে আসে। আবার ছুটির সময়ে এনে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়। এতে প্রতিদিন জনপ্রতি পাঁচ ডলার করে আয় হয় তার। যাদের গাড়ি নেই তাদের কাজ করার চমৎকার সুযোগ। জাহেলাও কাজে যায় নিয়মিত। সপ্তাহ শেষে হাতে কিছু ডলার আসে। বড় কন্যা ময়নার কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। স্কুল ছুটির শেষে ছোট কন্যা আয়না কিছু খেতে চাইলে কিনে দেয়। সন্তানকে পছন্দের খাবারটা কিংবা খেলনাটা কিনে দেয়া, এ যে কী এক স্বর্গীয় সুখ! এ অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করার নয়! কিন্তু তার এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয় না। এ খবর তোরাব আলীর কানে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি। ‘ আবার কাম করা শুরু করসে? কই আমারে তো দুইডা ট্যাকাও দেয় না!’ তোরাব আলী এবার পুরোপুরি বাজার করা বন্ধ করে দেয়। কাজে যোগ দিয়ে জাহেলার ভালোর চেয়ে মন্দই হল। চাউল, ডাউল শেষ অইয়া গ্যাছে, বলা মাত্রই তোরাব আলী ধমকে উঠে। ক্যান, তর ট্যাকা দিয়া কী করস? ওইগুলান কোন লাঙ্গেরে দেস? ওইগুলান কার লাইগ্যা জামায়া রাখছস? 

এক শুক্রবার দুপুরে জুম্মার নামাজের পর তোরাব আলীর সাথে মসজিদের হুজুর এবং মোয়াজ্জেম এসে হাজির। তোরাব আলী সারা সপ্তাহ নামাজ না পড়লেও শুক্কুরবারের জুম্মার নামাজ বাদ দেয় না। জুম্মার নামাজে গেলে এলাকার সকল মুসলমান ভাইদের সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয়। একরকম উৎসবের মতন। সকলেই তোরাব আলীকে ধার্মিক ভদ্দরলোক হিসেবে জানে। হুজুর, মোয়াজ্জেমের আচমকা আগমনে জাহেলা একটু অবাকই হয়। সে মনে মনে আন্দাজ করে নেয় এই আগমনের হেতু। লম্বা কোর্তা আর টুপি পরা দুইজন সোফায় আয়েস করে বসেন। জাহেলা মাথার কাপড়টা ঠিক করতে করতে এসে সালাম দেয়। প্রথমে মুখ খুলেন হুজুর। তিনি বলেন, আয়নার মা, আপনের স্বামী আপনার নামে অভিযোগ করছে। এলাকার মসজিদের হুজুর হিসাবে আমার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াইছে সমস্যা মিটমাট করা। দাঁড়িতে আঙুল বুলাতে বুলাতে হুজুর বলেন, আপনি নাকি আপনের স্বামীকে বাপ-মা তুইল্যা গাইল পাড়ছেন? জাহেলা মাথার ঘোমটা আরেকটু বড় করে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে, সে আগে আমার মরা বাপ তুইল্যা গাইল পারসে। আমি শুধু হেইডা রিপিট করসি। তার গাইল তারে ফিরায়া দিসি। হুজুর চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবলেন। তারপর সামনে রাখা গ্লাসের পানি কুলি করে ঢক ঢক করে গিলে বললেন, আপনে মাইয়া মানুষ। মাইয়া মাইনসে স্বামীরে গাইল দিলে বিরাট গুনাহ হয়। একজন মুসলমান হিসাবে আপনের তো জানা থাকার কথা, স্বামীর পায়ের তলে স্ত্রীর বেহেস্ত। কথা ঠিক কিনা? উত্তরের অপেক্ষা না করে হুজুর বলে চললেন, আপনের স্বামী চাইতেছে আপনি বোরখা পইরা পর্দানশীনভাবে চলাফেরা করেন। কিন্তু আপনি স্বামীর কথা মাইন্য করেন না। কথা কী ঠিক না বেঠিক? জাহেলা এক পলক চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকায়। তারপর মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে, হুজুর, আমি ফুল হাতা জামা পিন্দি, মাতাত হিজাব পিন্দি। আমি তো অশালীন চলাফেরা করি না। বাপের সংসার থেইক্যাই পাচ ওয়াক্ত নামাজ ফড়ি। কিন্তু হেয় তো নামাজও ফড়ে না। খালি শুক্কুরবার আইলে হগলতরে দেহাইবার লাইগ্যা মরজিদে গিয়া জুম্মার নামাজ ফড়ে। হুজুর এবং মোইয়াজ্জেম একযোগে চোখ তুলে তোরাব আলীর দিকে তাকায়। গ্লাসের বাকি পানি মুখে নিয়ে কুলি করে গিলেন। একটু থেমে হুজুর বলেন, ‘ তারে আল্লার রাস্তায় আনার দায়িত্ব আমাদের। ভরসা রাখেন। আপনের বিরুদ্ধে আরেকটা অভিযোগ, আপনি চাকরি করেন কিন্তু স্বামীরে ট্যাকাটুকা দেন না। আপনের চাকরির টাকা সংসারের কাজে আসে না। তাই আপনার স্বামী চায় না আপনি বাইরে গিয়া চাকরি করেন। স্বামীর অমতে কিছু করলে আল্লাহর কাছে রোজ হাশরের ময়দানে জওয়াবদিহি করতে হবে।’ জাহেলা মাথা না তুলেই বলে, হুজুর, হেয় আমার আর সন্তানের খরচপাতি দেয় না ঠিক মতো। মন চাইলে বাজার করে, না চাইলে করে না। আমার তো হাতখরচ লাগে। হুজুর তোরাব আলীর দিকে তাকায়। তোরাব আলী রক্ত চক্ষুতে জাহেলার দিকে তাকিয়ে বলে, হগলই করি। মাইয়া মাইনসের আবার হাত খরচ কি? অবশেষে হুজুর আর মোয়াজ্জেম একযোগে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তোরাব আলী প্রতি মাসে তার স্ত্রী জাহেলা বেগমকে ১০০ ডলার হাতখরচ বাবদ দিবে। জাহেলা স্বামীর অমতে চাকরি করতে পারবে না। তাকে চাকরিতে ইস্তেফা দিতে হবে। সালিশ শেষে তারা চলে যেতেই তোরাব আলী তেড়ে আসে। তরে ভাত কাপড় দেই না? বাজার করি না? তাইলে তর কোন লাঙ্গে আইস্যা তরে ভাত কাপড় দেয়? জাহেলা কথা বাড়ায় না। নিজের রুমে দরজায় খিল দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসে থাকে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। হাঁসফাঁস লাগে। নিজেকে সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি মনে হয়। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়ায়। এই জীবনের লাইগ্যা কী আম্রিকা আইসিলাম? হগলতে কয় আম্রিকা হোনার হরিণ। 

বেশ অনেকদিন যাবত জাহেলার শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। কিন্তু ইদানিং শরীর যেন আর চলে না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। তলপেটে অবর্ণনীয় ব্যাথা হয়। প্রচুর ব্লিডিং হয়। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেই ডাক্তারের কাছে নাম লেখায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তাররা জানায়, জরায়ুতে বড়সড় এক টিউমার বাসা বেঁধেছে। এত দেরিতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ায় তিরস্কার করেন ডাক্তার। দ্রুতই জরায়ু কেটে ফেলে না দিলে এর ভয়াবহতা কী হতে পারে তা ভাল করে ছক একে বুঝিয়ে দেন। ক্যন্সারে রূপ নিতে বেশি সময় নিবে না বলেও হুশিয়ারি করেন ডাক্তার। বাড়ি ফেরার পথে জাহেলার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। পথের ধারে বেঞ্চিতে বসে পড়ে। চারিদিকে গাছে গাছে কী সুন্দর রঙ খেলা করছে। শরৎ-হেমন্তের রঙ। তার খুব করে মার কথা মনে পড়ে। মা ডা মইরা গ্যাল বর্ষাকালে। একবার দ্যাশে যাইবার ফারি নাই। বড় কন্যা ময়নার কথা মনে পড়ে। এতটুকুন কইলজার টুকরাডারে রাইখ্যা আইলাম। কতদিন দ্যাখবার ফারি নাই। দ্যাশ গেলে ম্যালা টেহা খরচ অইব। তাই বইল্যা কী যামু না? জাহেলা অনেক না পাওয়ার বেদনায় দীর্ঘশ্বাস নেয়। রক্তিম চোখ দুটিতে অশ্রুর বন্যা বয়ে যায়। দরদর করে ঘামতে থাকে। অস্থির লাগে। ভাবে, আমার তো আর সন্তান নিবার হাউস নাই। জরায়ু ফালায়া দিলেই তো বালা অইয়া যামু। জাহেলা অহেতুক নিজেকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে। কিন্তু সে জানে চিন্তা আসলে তার নিজেকে নিয়ে নয়। তীব্র তলপেট ব্যাথা নিয়ে ঘরে ফিরে সোফার এককোণে এসে বসে। চোখের সামনের সব আলো নিভে আসে যেন। বমির উদ্রেক হয়। স্বামীকে বিষয়টা জানাবে ? নাকি গোপনে হাসপাতাল গিয়ে কাজ সেরে আসবে বুঝে উঠতে পারে না। নিজের সাথে জাহেলার শীতল বোঝাপড়া চলে কয়দিন। নাহ্‌ ভালোমন্দ যা-ই অয় হেরে তো জানাইতে অইব। 

এক তুমুল বৃষ্টির রাত। জানালায় বৃষ্টির পানি আছড়ে পড়ছে। রাতের খাবারের শেষ দিকে স্বামীকে জানায় তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ। তোরাব আলী শেষ লোকমা মুখে না পুরেই এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে জাহেলার দিকে তাকায়। জাহেলার চোখ ছলছল করে উঠে। মানুষটা যত চেঁচামেচিই করুক সারাজীবন, কিন্তু স্ত্রীর জীবন-মরণ সমস্যায় সে ভেতরে ভেতরে বেদনায় ভারাক্রান্ত হয় ঠিকই। জাহেলার ভাবনাকে ভুল প্রমান করে ভাতের প্লেট সামনের দিকে ঠেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তোরাব আলী। পলেস্তরাখসা দেয়ালের মতো রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকায়। ক্ষোভে ফেটে পড়ে জানায়, এই অফারেশন কুনুভাবেই অইতে দিমু না। আমার পুলা চাই, পুলা। আমার পুলা চাই-ই চাই। পুলা দিবার না পারলে যেইদিগে যাইবার মন চায়, যা। দূর হ। দূর হ। জাহেলার বুক কেঁপে উঠে। এইডা কী কইল? আমার জীবনডা এইরম কইরা শেষ করবার কুনু অধিকার আছে তার? পুলা বড় না আমার জান বাঁচান বড়! আমারে না দিল লেহাফরা কইরা সন্দরভাবে বাঁচবার, না দিল কাম কাইজ কইরা কয়ডা ট্যাহা কামাইয়া সাদ আল্লাদ মিটাইবার, না দিল পয়লা সন্তানের লগে থাকবার। কইসে মাসে একশডা ট্যাহা দিব, কামডা ছাড়াইল আইজ পাঁচ মাস অয়, একটা ট্যাহাও দিল না। আমি কী খালি সন্তান পয়দা করবার মেশিন? আমার জীবনের কুনু দাম নাই? 

তোরাব আলীর নেশার মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। রোজ কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে জনমানবহীন গহীন জঙ্গলের পাশে রাস্তার শেষ প্রান্তে আধো অন্ধকারে গাড়ি থামিয়ে নেশা করে। বাড়ি ফিরে কোনোদিন রাতের খাবার খায়, কোনোদিন না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। জাহেলা নিজের মতো পড়ে থাকে বিছানায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না। এমন দোলাচলের মধ্যে কেটে যায় আরো বেশ কয়টি মাস। জাহেলা মায়া বড়ি খায় না আর। ভাবে, শেষ আরেকবার সন্তান হইলে হোক। খোদা চাইলে পুলা হইতেও তো ফারে। তবুও ময়নার বাপ খুশি থাক। জাহেলার চোখের সামনে ভেসে উঠে এক ফুটফুটে মানব শিশু। পুত্র সন্তান। তোরাব আলী তাকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। তার চোখে মুখে অদ্ভুত এক আনন্দ খেলে যাচ্ছে। কতদিন মানুষটার এই আনন্দমাখা মুখ দেখে নাই জাহেলা। ফোনের রিং বেজে চলছে বিরামহীন। জাহেলার সম্বিৎ ফেরে। নাজমা আপার ফোন। এই দূর পরবাসে নাজমা আপাকে বড় বোন জেনেছে। বিপদে আপদে কাছে পেয়েছে। যে কোনো বিষয়ে নির্ভরতার মানুষ হিসেবে এগিয়ে আসা এক মানবিক মানুষ তিনি। হ্যালো বলতেই নাজমা আপার চিন্তিত কণ্ঠস্বর। হ্যালো জাহেলা, তোমার শরীর এখন কেমন? কয়দিন কোনো খবর পাচ্ছি না। ডাক্তারের কাছে গেছিলা আর? নাজমা আপা একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন। জাহেলা ছোট্ট করে শুধু বলেছে, ‘ না’। নাজমা আপা ঈষৎ ক্ষোভের স্বরে বলেন, আয়নাকে নিয়া ভাইবো না। ওকে আমি দেখে রাখবো। তুমি কালই ডাক্তারের কাছে যাও। আগে তো নিজে সুস্থ থাকবা। তারপর স্বামী সন্তানের কথা ভাইবো, বোন। ‘ বোন’ সম্বোধন শুনে জাহেলার চোখ জলে ভরে যায়। বুকের ভেতরে থৈথৈ সমীহ নিয়ে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখে। আজকাল অল্পতেই জাহেলার চোখ জলে ভেসে যায়। এত মায়া ক্যান মাইনসের মনে? ক্যান আমারে মায়ায় জড়ায়? 

নাজমা আপার কাছে কন্যা আয়নাকে রেখে জাহেলা ডাক্তার দেখাতে যায় অনেকদিন পর। সেখান থেকে জরুরি ভিক্তিতে তাকে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নেয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ফোন আসে তোরাব আলীর ফোনে। অপারেশন ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে। ততদিনে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে শুয়ে জাহেলা মাস্কের আড়ালে থাকা ডাক্তার নার্সের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারে না। শুধু কুঁচকে থাকা কপালের অংশটুকু দেখতে পায়। কপালের ভাঁজ দেখে বুঝে নেয় সম্ভাব্য পরিণতি। খুব করে স্বামী তোরাব আলীর সান্নিধ্য কামনা করে মনে মনে। হেই যে একবার হাসপাতাল আইসিল! আর তো আইল না। হাজার অইলেও সোয়ামি তো! মানুষটারে বালা ফাই। মানুষটা এমুন আছিল না। কেমুন কইরা যে এমুন অইয়া গেল দিনে দিনে, বুঝবার ফারি নাই। হাসপাতালের শাদা বিছানায় শুয়ে জাহেলার মলিন মুখ দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে থাকে। তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। যন্ত্রণানাশক ঔষধ দেয়া হয়। ব্যাথাহীন মৃত্যু নিশ্চিত করাই তার একমাত্র চিকিৎসা এখন। হিমশীতল আঙুল। হাত-পা। আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মাঝে জাহেলা কখনো সখনো চোখ মেলে খোলা দরজার দিকে তাকায়। দরজাটা শতবর্ষী ঘুমন্ত কোনো বৃদ্ধার হা হয়ে থাকা মুখের মতো মনে হয়। জাহেলার মৃত দাদা-দাদী, নানা-নানীর কথা মনে পড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে একাকি, অসহায় মানুষ মনে হয় নিজেকে। খুব তুচ্ছ ও ঠুনকো জানালার কাঁচের মতো মনে হয়। সে খুব ধীরে বাঁ দিকে জানালায় তাকায়। জানালার সার্শীর কাঁচের ভেতর দিয়ে অসীম এক আকাশ দেখা যায়। সেই আকাশে ধাবমান খন্ড খন্ড মেঘ। বিভক্ত মেঘেরা ছুটে চলেছে সমুদ্রের ফেনায়িত ঢেউয়ের মতো। জাহেলার ফ্যাকাশে দুর্বল শরীর মূর্তির মতো পড়ে থাকে শাদা চাদরের নিচে। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজায়। ছোট ছোট শ্বাস নিয়ে আনমনে বিড়বিড় করে। কই যাও মেঘ? আমারে লইয়া যাও লগে। আমার মার কাছে যামু। বাজানের কাছে যামু। আমারে লইয়া যাও। আমিও তুমার লাহান। তুমি আসমানে ভাসমান। আমি ভিনদ্যাশে ভাসমান। আমার দ্যাশ। আমার গেরাম, ক্ষেতের আইল, রাজহাঁসের ডুবসাঁতার, সইর্ষা ক্ষেত...। সর্ষে ফুলের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে যেন। জাহেলার চোখ বুজে আসে। সেই বুজে আসা চোখের ভেতরে হলদেটে এক ঝাঁক গোল্লা ছুটাছুটি করে। আধো ঘুম, আধো জাগরণে এক ঘোরের জগতে বিচরণ করে সে। অনন্তের পথে যাত্রার প্রস্তুতি নেয়া কোনো মানবীর ক্লান্ত ও অস্পষ্ট স্বর, ‘ হগলতে কয় আম্রিকা হোনার হরিণ। এই জীবনের লাইগ্যা কী আম্রিকা আইসিলাম? এইডা কুনু জীবন অইলো? এইডা কুনু জীবন অইলো?’ জাহেলার অস্পষ্ট জিজ্ঞাসা ধূলির পৃথিবীতে লুটোপুটি খায়। হেমন্তের শীতল হাওয়ায় ঘূর্ণির মতো পাক খেতে খেতে কিছু নিঃস্ব ক্লান্ত ঝরা পাতা পথের বাঁকে বাঁকে থমকে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন