রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক : লেখা নিয়ে লেখকের ভাবনা--১ : রোক্সান রবিনসন


গল্পটা তুমি আবিষ্কার করে থাকলে, 
তুমিই প্রথম বুঝবে কিভাবে সেটা শেষ করতে হবে 
( ভাষান্তরঃ সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত ) 

মার্কিন কথাসাহিত্যিক  রোক্সান রবিন জন্মেছেন ১৯৪৬ সালে। তিনি লেখেন উপন্যাস ও জীবনী। পারিবারিক বন্ধন ও তার ভাঙচুরই তাঁর উপন্যাসের বিষয়। প্রকাশিত উপন্যাস--১. Summer Light, ২. Dawson's Fall, ৩. Sparta, ৪. Cost , Sweetwater, ৫. This is My Daughter। গল্পের বই--১. A glimpse of scarlet and other stories, ২. Asking for love and other stories, ৩. A Perfect Stranger: And Other Stories
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং ও ইরেজি সাহিত্য বিষয়ে পড়া করেছেন। চাকরি করেছেন আমেরিকান পেইন্টিং ডিপার্ট্মেন্টে। আশির দশক পর্যন্ত আমেরিকার শিল্পকলা নিয়ে নানাবিধ লেখালেখি করেছেন। এরপরে তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। The New York Times ও The Washington Post পত্রিকায় তিনি ধারাবাহিকভাবে বইয়ের আলোচনা লিখছেন। 


যেখানে থাকি সেখানকার সরু কাঁচা রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সামনে একটা ছোট লাল গাড়ি – সামনের সীটে দুজন বসে। কাঁচা রাস্তায় তুমি খুব জোরে গাড়ি চালাতে পারবে না, তাই আমরা ধীরগতিতেই এগোচ্ছিলাম। এগোতে এগোতেই আমি সামনের গাড়িটা লক্ষ্য করতে লাগলাম। মাঝবয়সী একজন পুরুষ গাড়িটা চালাচ্ছেন, চোখে চশমা। ওঁর পাশে বসে ঢেউ খেলানো দীর্ঘ স্বর্ণালী কেশ এক মহিলা। 

পুরুষটির মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, কারণ মাঝে মাঝেই মাথা ঘুরিয়ে মহিলাটির সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু মহিলাটির মুখ দেখা হল না। বক্তাকে দেখার বা জবাব দিতে একবারের জন্যেও ঘুরে তাকাননি। 

যেতে যেতে পুরুষটি বার বার মাথা ঘুরিয়ে মহিলাটির সঙ্গে কথা বলে চলেছিলেন। ওঁর কেশ পাতলা হবার দিকে। সহৃদয় মুখ। প্রতিটি আচরণে, অঙ্গভঙ্গীতে, কথা বলার ধরণে ওঁর মধ্যে এক বন্ধুত্বপূর্ণ স্নেহশীলতার ছোঁয়া ফুটে উঠছিল। উনি মহিলাটির দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন, হাসছিলেন। মহিলাটি অনড়। দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ। সাড়াশব্দহীন। ক্ষণেকের জন্যেও উনি পুরুষটির পানে তাকালেন না। এমন কেন – আমার কৌতুহল হল। 

স্বাভাবিকভাবেই আমি ধরে নিয়েছিলাম ওঁরা ঝগড়া করছেন। দীর্ঘ স্বর্ণালী কেশ দেখে মনে করা যেতেই পারে সুন্দরী কেউ হবেন অথবা এমন কেউ যাঁর প্রতি মানুষ সহজেই আকৃষ্ট হন, এবং যিনি সে ব্যাপারে সচেতন। মনে হল মহিলাটি উদ্ধত, স্বেচ্ছাচারী এবং হৃদয়হীন – রূপের অহঙ্কারে মহিলারা যেরকম হয়ে যান। পুরুষটি ওঁর স্বামী হতে পারেন, কিংবা ওঁর প্রেমিক। কোনও রকম সনির্বন্ধ মিনতি করে চলেছেন। কে জানে মহিলাটি হয়ত ক্রমশ ওঁর প্রতি নিরুত্তাপ হয়ে পড়ছেন, হয়ত চিরকালের জন্য সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলতে চাইছেন, আর পুরুষটি ওঁর মানভঞ্জন করতে চাইছেন। পুরুষটির জন্য আমি সমবেদনা বোধ করলাম – সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য কত যত্নই না করছেন। 

একটা পাথরের সেতু পেরোনোর সময় আমাদের দুজনকেই গতি কমাতে হল। পেরিয়ে যাবার পরেই পুরুষটি আবার মহিলার দিকে তাকালেন। মনে হল আমার ভাবনায় কোথাও ভুল হচ্ছে কিনা। পুরুষটি যে মাঝবয়সী, বিনা দ্বিধায় সেটি বলা যায়, আর মহিলাটির দীর্ঘ ঘন স্বর্ণালী কেশ ওর যুবতী হবার সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। উনি ওর স্বামী না হয়ে পিতাও হতে পারেন। 

হয়ত অন্য কোনও ব্যাপারে উনি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন – যেমন মায়ের প্রতি মেয়ের ব্যবহার নিয়ে, অথবা পরীক্ষার ফলাফল বা স্কুলে ওর আচরণ নিয়ে। মেয়েটি হয়ত গোমড়া মুখে নিশ্চল হয়ে বসে আছে, নিষ্ঠুরভাবে নয়। অন্য কিছুও হতে পারে। গোমড়া মুখে নয়, হয়ত মন খারাপ করে রয়েছে। হয়ত ও কেঁদে চলেছে, তাই বাবার দিকে মুখ ফেরাতে পারছে না। হয়ত উনি ওকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছেন – কোনও পুরুষবন্ধু ওর সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছে অথবা অন্য কোনও ঘটনা যা কিশোরী মন ভেঙে দেয়। 

ঘটনার মর্মোদ্ধার করার জন্য অভিনিবেশ সহকারে আমি ওঁদের লক্ষ্য করছিলাম। পুরুষমানুষটি ওর দিকে তাকাচ্ছিলেন, হাসছিলেন, কখনো কখনো খোশামুদে ভঙ্গিতে ওর দিকে হেলে পড়ছিলেন। কিন্তু মেয়েটি তবুও ফিরে দেখছিল না। খুব কষ্ট হচ্ছিল পুরুষটির কথা ভেবে। কি একনিষ্ঠ চেষ্টা, দুঃখে কাতর অবিচল মেয়েটির জন্য, কত সহানুভূতি প্রদর্শন। 

মাউন্ট হলি রোডের সিগন্যালে যখন পৌঁছলাম, তখন পুরুষ মানুষটি স্বর্ণালী কেশ মেয়েটির দিকে আরও একবার তাকালেন। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি ওঁর দিকে ফিরল। ঝুঁকে গিয়ে জিভ দিয়ে ওঁর নাকটা চেটে দিল। ওটি একটি গোল্ডেন রিট্রিভার! 

এই গল্পটি বলার উদ্দেশ্য হল লেখকদের কেমন অভিজ্ঞতা হতে পারে তার সম্বন্ধে তোমাদের একটি ধারণা দেওয়া। কি বিচিত্র, কতখানি অনির্দেশ্য এই বৃত্তি, কতখানি বিনয়ের দাবী রাখে। 

কবে থেকে লিখতে শুরু করলাম – এই কথাটা বহুবার আমার কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে আমার মনে হয় কবে থেকে লেখা শুরু করলাম – এটা জানার থেকেও কেন লিখতে শুরু করলাম সেটা জানাটাই বেশি জরুরি। 

কেন লেখবার ইচ্ছেটা হল – কেন হঠাৎ গল্প লিখতে বসে পড়লাম – এর পেছনে কিছুটা হলেও একটা স্বার্থপর ভাবনা কাজ করেছে। আমার প্রত্যেকটি গল্পেই – অবশ্য গল্প বলতে যা কিছু আমি লিখে থাকি সবটুকুই বোঝাতে চেয়েছি – অন্তরের তাগিদ থেকেই লেখা। হে পাঠকবৃন্দ, এই পর্যন্ত, তোমাদের কোনও ভূমিকা নেই। ব্যাপারটা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত। 

অনেক ঘটনা আমাকে অস্থির করে তোলে। সে সব নিয়ে লিখি আমি। কিছু কিছু ঘটনা আমায় দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। সে সব নিয়েও লিখি। আবার কিছু কিছু ঘটনা মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে তোলে, যে বিনিদ্র রজনী যাপন করতে বাধ্য হই – যে সব ঘটনা আমার ছোট্ট পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। সে সব নিয়েও লিখি। এর মধ্যে কিছু কিছু ঘটনার জন্য হয়ত প্রত্যক্ষভাবে আমি নিজেই দায়ী। আবার এমন ঘটনাও আছে যা আমি দেখেছি বা শুনেছি। বাক্য, বাক্যাংশ, দৃশ্য বা সম্পূর্ণ আখ্যান – নানা রূপে আমার সামনে ধরা দেয়। এরা আমার মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে, আমায় বাধ্য করে এদের নিয়ে লিখে মনের বোঝা হালকা করে ফেলতে। তখন আমি বসে পড়ি লিখে ফেলার জন্য। 

গন্তব্য আমার অজানা নয়। সেই যন্ত্রণাময় মুহুর্তে ফিরে যেতে হয় – ক্ষমার অযোগ্য সেই উক্তি, সেই অপরিবর্তনীয় ক্রিয়াকর্ম – যারা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমার গল্পে এরাই হয় চরম মুহুর্ত। আমার কাজ হল লেখার মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে সেই চরম মুহুর্তের দিকে এমন ভাবে এগিয়ে যাওয়া, যাতে সেই মুহুর্তটির সম্পূর্ণ তাৎপর্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে। দৃশ্য বা চরিত্রদের – যাদের আচরণ আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় – সেই দৃশ্য বা চরিত্রদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি আমি মুহুর্তগুলিকে পুরোপুরি সাজিয়ে নিতে পারি তবেই সেই মুহুর্তরা আমার কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। আমি ওদের বুঝতে পারি আর ওরা আমাকে বিপর্যস্ত করে ফেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দুশ্চিন্তার অবসান করে আমি ঘুমোতে পারি। সত্যি বলতে কি, মন শান্ত রাখার জন্যই আমাকে লিখতে হয়। 

গোল্ডেন রিট্রিভারের কাহিনীটি থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ, সে পরিবারভিত্তিক গল্পেই আমার অনন্ত অনুরাগ এবং সংস্কার। পরিবার আমাদের আবেগময়তার কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের গভীর আবেগের উৎসস্থলই হল পরিবার। 

বাবা-মা আর শিশুর মধ্যে, ভাই আর বোনের মধ্যে, কিংবা স্বামী স্ত্রী’র মধ্যে যে আত্মিক বন্ধন, তার চেয়ে দৃঢ়তর বন্ধন আর কিছুতেই হয় না। আমরা এদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারি, রেগে গেলে মুখের ওপর সেটা বলেও দিতে পারি। পৃথিবীর আর কারোর সঙ্গেই সম্পর্ক এতটা সহজ করে গড়ে ওঠে না। আত্মিক বন্ধন অবিনশ্বর। তুমি কিছু আত্মীয়কে ত্যাগ করতেই পার, জীবনে তাদের মুখ আর কখনও দেখবে না বলে প্রতিজ্ঞাও করতে পার, কিন্তু তবুও তারা তোমার পরিবারেরই অংশ হয়ে থাকবে। না চাইলেও তুমি তাদের অংশ হয়েই থেকে যাবে। পরিবারই সবসময় তোমাকে গড়ে তোলে। তুমি আজ যে ভাবেই ভাবতে চাও না কেন, সেখানেই লুকিয়ে আছে তোমার শৈশব। 

স্বীকার করতে না চাইলেও পরিবার সম্বন্ধে তোমার অনুভূতি জোরালো হতেই হবে। ধর কুড়ি বছর বয়সে তুমি ঠিক করলে যে তোমার মায়ের সঙ্গে আর কথা বলবে না, ধর তারপর চল্লিশ বছর তাঁর সাথে তোমার দেখাই হল না, তবুও তিনি তোমার মা’ই থেকে যাবেন। তোমার মননশীলতার বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকেই যাবে। 

ধর ঘটনাচক্রে, চল্লিশ বছর পর মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হয়ে গেল, যেটা হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়, সমাধিক্ষেত্রের অসমতল ঢালু জমিতে কারও অন্ত্যেষ্টির সময়, তোমার অতি পরিচিত ভঙ্গিতে প্রার্থনার বই হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, কিংবা ধর মান অভিমানের পালা দূরে সরিয়ে তুমি নিজেই একদিন মা’কে দেখতে গেলে। দরজা খুলে তোমার মা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন তোমায় চিনতেই পারছেন না। সেই খণ্ডমুহুর্তে বহুদিন আগের সেই সব অনুভূতি যার জন্য মায়ের সঙ্গে আর দেখা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, সেগুলো স্মৃতির পটে ভীড় করে আসবে। 

এ তুমি এড়িয়ে যেতে পারবে না। এই সব অনুভূতি তোমার মনে সারা জীবনের জন্য গাঁথা হয়ে গেছে, বেদনাদায়ক হলেও তোমার ভাবনায় এসেই পড়বে। তুমি স্বীকার করতে না চাইলেও ওরা রয়ে গেছে, তোমার অবচেতনায় বহমান, নিঃশব্দ নিরালায়, অন্তঃসলিলা নদীর ধারার মত। আমাদের প্রবহমান জীবনের ছন্দকে এরাই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আমরা জানতেও পারি না। যে কোনও মুহুর্তে এরা তমসার অন্ধকার থেকে পরিপূর্ণ দিবালোকে বন্যাধারার মত আত্মপ্রকাশ করতে পারে। 

পরিবারের সব থেকে ভাল দিকটি বোধহয় এই যে এখানে আবেগ গড়ে ওঠে প্রেম থেকে। অসম্ভব শক্তিশালী এর প্রভাব। বিপরীতধর্মী আবেগ – যেমন রাগ, ঘৃণা এবং অসন্তোষ – প্রেমের অভাব কিংবা তার প্রতিসংহার থেকেই সৃষ্ট হয়ে থাকে। তবুও প্রেমই হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। আবেগময়তার সমীকরণে প্রেম অন্যতম উপাদান হওয়ার ফলস্বরূপ আমাদের আবেগময় জীবন সতত পরিবর্তনশীল, নিরন্তর প্রবহমান। প্রেমের আকস্মিক প্রতিভাস চল্লিশ বছরের সযত্নে লালিত ক্ষোভ মুহুর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে। 

চল্লিশ বছরের প্রতিরুদ্ধ ভালবাসা সহসা বন্ধনহীন প্রবাহ লাভ করবে – এরকম সম্ভাবনা অবশ্যই ক্ষীণ। এমনও হতে পারে তোমার পিতা সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেওয়ার বদলে তোমার মুখদর্শন না করেই ইহলোক ত্যাগ করলেন। আবার অন্যরকম কিছুও হতে পারে। হয়ত উনি আবার কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। হয়ত শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে ওঁর বাধা কোথায় সেটা তুমি অনুধাবন করতে পারলে এবং ওঁকে ক্ষমা করে দিলে। যে ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছ সেটা তুমি বুঝতে পারলেও উনি হয়ত সেটা বুঝতে পারলেন না। 

লেখার বিষয়বস্তু হিসেবে পরিবারের ভূমিকা অফুরন্ত। সব সুখী পরিবারকেই সদৃশ হতে হবে, তলস্তয়ের এই ধারণা সঠিক নয়। আসলে, সুখী হোক কি অসুখী – কোনও দুটি পরিবারই সদৃশ নয়। আঙুলের ছাপের মতই, প্রতিটি পরিবারেরই অনন্য কিছু প্রতিমাণ আছে। দ্বন্দ্ব, প্রত্যয় এবং সম্প্রীতি প্রকাশের নিজস্ব একটা ধরণ আছে। বিবিধ বস্তুর সমন্বয়ে সেটা গড়ে ওঠে। প্রাথমিক ভাবে সামাজিক বর্গ, শিক্ষাদীক্ষা, মাতৃভাষা এবং বংশানুক্রমিক ধারা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করা যেতে পারে। পারিবারিক বৃত্তে বেড়ে ওঠার ফলে নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং আচারকেই প্রথাসিদ্ধ বলে মেনে নিতেই আমরা অভ্যস্ত। 

আমরা ধরে নিই, রবিবার সকালে বাবাই সবার আগে ঘুম থেকে উঠে ড্রেসিং গাউন পরে নীচে নেমে সবার জন্য প্রাতরাশ তৈরি করবেন। কিংবা পোষা জীবজন্তু মা পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন না, কারণ ওদের গাঁয়ের গন্ধ মায়ের সহ্য হয় না। অথবা ধর ঝগড়া লাগলে মা হামেশাই শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবেন। তোমরা ধরেই নিয়েছ এই ঘটনাগুলো এভাবেই ঘটে থাকে, নড়চড় হবার নয়। 

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমেরিকার অবস্থান বা মৃত্যুদণ্ড আরোপ করার প্রথা আমরা সমর্থন করব কিনা – এগুলি বৃহত্তর সামাজিক বৃত্তে আলোচনা করার মত বিষয়। এরকম ব্যাপার নিয়ে নানান মুনির নানান মত এ তোমাদের জানাই আছে। তোমাদের প্রেমিক বা প্রেমিকারা এই ব্যাপারে কি ভাবে সেটা তোমাদের জানা, কারণ এই সব বিষয় নিয়ে নিজের নিজের ধ্যান ধারণা আগেই আলোচনা করে ফেলেছ। বরং অন্যান্য অনেক ব্যাপার, যা অধিকতর জরুরি, সেটা অনেক পরে জানতে পেরেছ। অন্য পরিবারের আচার বিচার রুচিবোধ বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার আগে পর্যন্ত জানার কোনও সুযোগই নেই। আর তারপরেই শুরু হয়ে যায় রবিবার ব্রেকফাস্ট কে বানাবে, কুকুরকে টিকা দিতে নিয়ে যাওয়া কার দায়িত্ব, অথবা শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে চেঁচামেচি করা যাবে কি যাবে না, এসব নিয়ে অযথা কথা কাটাকাটি। 

অন্বয় আর বিরোধের এই যুগপত অবস্থানই পরিবারকে সাহিত্যের সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্তর্লীন পারিবারিক দ্বন্দ্ব আমাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তির মূল আলোচ্য বিষয় – যেমন ধর, “ঈডিপাস রেক্স”, “কিং লিয়র”, “আনা কারেনিনা”, “দ্য সাউন্ড অভ দ্য ফিউরি,” “টু দ্য লাইটহাউজ়”, কিংবা র‍্যাবিট সিরিজ়ের উপন্যাসগুলি। এই সব রচনা আমাদের নিজেদের কাছে নিজেকে উন্মোচিত করে। আমার তো মনে হয় আমরা এরকমই – দৃঢ়, সর্বগ্রাসী এবং অনিবার্য পারিবারিক বন্ধনই আমাদের তাড়া করে ফেরে, , ক্ষতিগ্রস্ত করে, জর্জরিত করে; আবার কখনও উল্লসিত করে, বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়, পরিতৃপ্ত করে। 

গোল্ডেন রিট্রিভারের গল্প থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এই সব ছোট বড় ঘটনা – আনন্দের হোক কি বিষাদের – আমি জানবার ঔৎসুক্য বোধ করি, এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে ভালবাসি, এমনকি রাতের গভীরে এসব ঘটনার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলি নিয়েও লড়াই চালিয়ে যেতে ভালবাসি। অন্তহীন এদের আকর্ষণ আমার কাছে, এক অপার বিস্ময়। 

অন্তহীন, জটিল এবং বিস্ময়কর এই সব ঘটনার স্মৃতিই আমার দিশা নির্দেশ করে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে। ঘটনার ঘনঘটা আমায় চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। আমার কাজ হল এদের আবিষ্কার করার সুযোগের সন্ধান করা, এদের নিয়ে ভাবা, যাতে আমি এই সব ঘটনার প্রকৃত স্বরূপ মর্মে অনুভব করতে পারি। সফল হলে মনে হয় আমি যেন কোনো কিছু অর্জন করতে পেরেছি। 

আর হে পাঠক এখানেই তোমাদের দায়িত্ব শুরু হয়। তোমরাই বলতে পার, আমি সত্যি সত্যি কিছু অর্জন করতে পারলাম কিনা। 




অনুবাদক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
গল্পকার। অনুবাদক। বাচিক শিল্পী।
কোলকাতায় থাকেন। 

1 টি মন্তব্য: