রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

বোলপুরের কোভিড হাসপাতাল ভ্রমণবৃত্তান্ত


অহনা বিশ্বাস

বলতে নেই, করোনা হবার পর বোলপুরের গ্লোকাল হাসপাতালে আমি ভালোই ছিলাম।

কোভিড পজিটিভ, সঙ্গে জ্বর হবার পর বাড়িতেই থাকব বলে মনস্থির করি। কিন্তু অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম হতে থাকায় আমাকে সরকার নির্দিষ্ট কোভিড হাসপাতালে যেতে হয়। আমার নানাবিধ কোমর্বিডিটি ছিল।

এর আগে কখনও হাসপাতালে থাকিনি। আর শ্বাসকষ্ট থাকাতে একটু ভয়ও লাগছিল। যখন হাসপাতালে গেলাম, তখন পড়ন্ত দুপুর। সকলে ঘুমোচ্ছে। একটা বড় ডর্মেটারিতে আমার জায়গা হল।

বেশিরভাগ বেডই ভর্তি। তারমধ্যে দুটি কয়েকদিনের শিশুকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। মেয়ের মা নিজেই এইটুকু। আঠারো বছর বয়স। সে ওই রকম পুতুলের মতো বাচ্চা সামলাচ্ছে দেখে তাজ্জব হয়ে গেলাম। মেয়ের নাম রেখেছে শনি। শাশুড়ির নামে। তাছাড়া শনিবারে সে হয়েওছে।

অন্য মা -টি বেশ স্মার্ট। এটি তার দ্বিতীয় সন্তান। ছেলের নাম দিয়েছে দেবাংশু।

নার্সদের আসা- যাওয়া, কর্তব্যকর্ম দেখে আমি হতবাক। পি পি ই পরা অল্পবয়সী মেয়েগুলোর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। অক্লান্ত পরিশ্রম করছে হাসিমুখে। কার কী প্রয়োজন সবসময় জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে। আর সুযোগ পেলেই বাচ্চাদুটোকে আদর করছে।

আমি ওদের দেখে অবাক হচ্ছি। কে বলে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের ডাক্তারদের ব্যবহার মন্দ! আমার তো একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা হল গ্লোকাল হাসপাতালে।

সন্ধেবেলায় অক্সিজেন লাগানোর সময় ডাক্তার আমাকে নমস্কার করে জানালেন যে তিনি ডাক্তার। পি পি ই -এর ভেতর তার মুখ দেখতে পাই না। মনে হল ছেলেমানুষ বয়স। আমাকে বললেন, আমি অনেক করোনা রোগী সারিয়েছি। কিন্তু আপনি টেনশন করলে আপনাকে সারাতে পারব না।

আগে চিনতাম না, কিন্তু আমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকা একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। স্কুলে পড়ায়। যমজ সন্তানদের বাপের বাড়িতে রেখে এসেছে।

মেয়েটির স্বামী আর শ্বশুরও এই হাসপাতালে ভর্তি। অন্য ওয়ার্ড। দেখা হয় না। 

বন্ধ রঙিন কাঁচের জানলার ওপারে করিডর। তার ওপারে মেল ওয়ার্ড। সেখানেও অমন রঙিন কাঁচ। মাঝেমাঝে আমার মুখোমুখি জানলা দিয়ে একটা নৃত্যরত ছায়ামূর্তি দেখি। একজন জানায় ,ওটি আসলে ওই শিক্ষিকা মেয়েটির স্বামী। ওই ছবি দেখলে মেয়েটিও জানলার সামনে এসে দাঁড়ায়। আকার ইঙ্গিত করে। আমি মজা পাই ছেলেটির অঙ্গভঙ্গি দেখে।

আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করি, ও কী বলল, তুমি বুঝতে পেরেছো?

সে বলে —খানিক খানিক। ভালো থেকো। আমি ভালো আছি এইসব তো মনে হল বলল। আন্দাজে যেটুকু বুঝলাম আর কী।

আমার মনে হল, ওকে ভৈকম মুহম্মদ বশীরের 'দেয়াল' গল্পটা বলি। কিন্তু ইচ্ছে হলেও গল্প বলার মতো শারীরিক ক্ষমতা তখন আমার নেই।

বেশিরভাগ রোগী এসেছে কোনও না কোনও হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার হয়ে। অন্য কোনও রোগে হাসপাতালে চিকিৎসা করতে এসেছিল, তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে কোভিড হাসপাতালে। অনেকেরই বাড়ির লোক খবর পায়নি। ফোন সঙ্গে রাখার নিয়ম নেই। হাসপাতালে ভর্তির সময়ই তা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের একটাই ফোন তাই সব ওয়ার্ডে ঘুরছে। লটারির মতো হাতে পেলে তা আর কেউ ছাড়ে না।

তাছাড়া অনেকে যোগাযোগ করতেও পারছে না। ফোন লাগছে না। কেউ কাঁদছে তার ছোট ছেলেমেয়ের জন্য, কেউ নাতিনাতনির জন্য। কাছাকাছি কোন গ্রামের রোগী পেলে তার ফোনে হাজার বোঝানো চলছে, কোথায় তার বাড়ি। তাদের আশেপাশের পাড়ার মাতব্বর লোকেদের নাম। যদি একটু বাড়িতে খবর দেওয়া যায়।

আমার পাশের বেডের মেয়ে রাণুকে প্রথম দেখি ঘুমন্ত অবস্থায়। চশমা পরে ঘুমিয়ে পড়েছে। খুবই শীর্ণ, শ্যামলা মেয়েটিকে আমার প্রথম দর্শনেই যে কী সুন্দর দেখতে লাগল। 
ছেলের কাছ থেকে সে করোনা পেয়েছে। তার কিডনির অসুখ। তাকে ডায়লাসিস করতে হচ্ছে বছর তিনেক ধরে। 

বিহারি মেয়ে, স্বামী কলকাতায় কাজ করে। মেয়ে অসুস্থ আর একা বলে ব্যাঙ্গালোর থেকে তার মা বাবা এসেছিলেন মেয়ের সেবা করতে। তাদেরও করোনা হয়ে গেছে। ফোন ধরলে মেয়েটির চোখের জল বাঁধ মানে না।

আমার এ পাশের মেয়ে সাকিলা বিবি বেশ মজার। চারটে বাড়িতে সে কাজ করে। চারটে বাড়িতে কাজ করে পায় মাত্র আড়াই হাজার টাকা। অবসর সময়ে বিড়ি বাঁধে। ইন্দিরা আবাস যোজনায় বাড়ি করতে গিয়ে তার কিছু টাকা ধার হয়েছে। চারটি মেয়ে তার। সে আশা করে, করোনায় মরে গেলে তার মেয়েরা সেই বাড়ি বিক্রি করে তার ধার মেটাবে।

প্রবল বমি - পেটখারাপ নিয়ে সাকিলা বিবি অন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তাকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সবসময়ই বলে ভাল আছি। এখানে কাজ না করতে পেরে তার গায়ে হাতে ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নার্স বা ডাক্তার তাকে ছাড়তে চান না। সেও ছোট নার্সগুলোর ছোটাছুটি করে কাজ দেখে অবাক হয়। তাদের প্রতি সম্ভ্রম উপচে পড়ে।

নার্সদের কারুর কোনও রোগী সম্পর্কে অভিযোগ নেই। বিরক্তি নেই। প্রত্যেকের হাতে আলাদা আলাদা ওষুধ দিয়ে যায়। নিয়ম করে বিপি মাপে। আঙুলে অক্সিমিটার দেয়।

কেবল তারা আস্তে কথা বললে রেগে যায়। পিপিই পরে তারা ভাল করে শুনতে পায় না। এক নাম লিখতে গিয়ে আর এক নাম লেখে। আমরা যখন রাতে ঘুমোই, তখনও তারা এসে এসে দেখে যায়। একদিন চোখ মেলে দেখি ডাক্তারও ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

কখনও কখনও ফিমেল ওয়ার্ডে ফোনটা বেশিক্ষণ পড়ে থাকে। হয়ত মেল ওয়ার্ডের কারুর ফোন এল। সাকিলা বিবি তা ধরবেই। ধরে তার খানিক গল্প করে নেওয়া চাই। বাকিরা তা দেখে হেসে আকুল হলেও সাকিলা বিবির কৌতূহল যায় না। সে সবার হাসি উপেক্ষা করে ফোনে কথা বলে চলে।অনেক গল্প করার পরে জানায়, ফোন অন্য ওয়ার্ডে দেবার তার অধিকার নেই।

সদা হাস্যমুখী সাকিলার জীবনের লড়াই কিছু কম নয়। এক মেয়েকে কাজের নামে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছ বছর পর একটি নদীয়ার ছেলে তাকে উদ্ধার করে বিয়ে করে। সেসবের ভয়ানক গল্প শুনি। যে মেয়েটিকে নিয়ে গিয়েছিল, সে তাদের গ্রামে বাড়ি কিনেছিল। তারপর মাসি পাতিয়ে খুব খাওয়াদাওয়া করেছিল।

গরীব বাড়ির মেয়ে একটু বেশি রোজগারের আশায় সেখানে গিয়েছিল। মেয়েটির বয়স তখন মাত্র দশ। সাকিলা বলছিল, ওই মহিলার অনেক বয়স, কিন্তু খুব সুন্দরী। হারামের রোজগার খেলে মানুষের নাকি রূপ খোলে।

রূপের কথা বলতে বেবির কথা মনে হল। খুব কালো আর ক্ষয়াটে চেহারা তার। যেদিন সে এসে ঢুকল, তার সঙ্গে এল আরেক বয়স্ক মোটাসোটা মহিলা। ঘরে ঢুকেই সে বৃদ্ধা মহিলাকে ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে গেল।

কেউ কেউ সন্দেহ করল, এরা দুজন মা আর মেয়ে নাকি!

সাকিলা বলল, তা কীকরে হবে! দেখলে না একজন দাস আর একজন আমাদের মুসলমান জাতি।

বেবি এসে থেকেই সাতকাহন করে নিজের কথা বলতে শুরু করল। তার বাড়ির লোক জানে না, সে এই হাসপাতালে এসেছে। তার ছেলে খবর জানে না। তার ছেলের বৌ বিয়ের চার বছরের মাথায় মারা গেছে। দুটো নাতনি আছে তার। তাদের জন্য তার চোখে জল আসে। মা মা করে কতই না কাঁদছে তারা।
বেবির বর বেবিকে পছন্দ করে না। কারণ তার নাকি 'বডি নেই'। বডি আছে তার বেয়ানের। কাজেই বেয়ানের সঙ্গে তার স্বামীর সম্পর্ক।

তাকে বলি, তোমার মতো চেহারা হলে আমার যে কত প্রেমিক জুটতো তার ঠিক নেই। সে বিশ্বাস করে না। বললাম , বম্বেতে তৈরি সিনেমা দেখলে তুমি বুঝবে রোগা মেয়েদের সেখানে কত দাম। সে বলে আমি সিরিয়াল দেখি। হিন্দি সিনেমা দেখি না।

বেবি ভোটার কার্ডে ওর বরের ছবি গদগদ হয়ে দেখায়। দেখে আমাকে বুঝতে হবে, ওর স্বামী কত সুপুরুষ। ওকে বলি, তোমার বর প্রেম করে যখন, আর তুমিও তাকে দেখতে পারো না, অতএব ছেড়ে দাও লোকটাকে।

ছাড়াছাড়ি মেয়েরা করতে পারে বলে বেবির ধারণা নেই। সে মায়ের ঘরে থাকে, মায়ের জমি চাষ করে। কিন্তু যা রোজগার করে বর শুধু নিয়ে নেয় তাই নয়, এর ওপর ধার করে বেড়ায়। এক লাখ কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে সে বাইক কিনেছে। আর কত যে মোবাইল তার এ যাবৎ বদল হল।

সে বেবি কোনওমতে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনা। নোংরা সে দেখতে পারে না। পারলেই বাথরুম পরিষ্কার করে, গোটা ঘর ঝাড়ু দেয়। এতেও তার কাজ শেষ হয় না। সে বয়স্ক লোকেদের পায়ে তেল ঘষে দেয়। মাথায় তেল মাখায়। চুল আঁচড়ে দেয়। আমাকেও দিতে চায়। রাগ করে নিই না বলে।
আমি বলি, বেবি, তোমার বর যখন তোমার বেয়ানের সঙ্গে প্রেম করে, তখন তুমিও তো কারুর সঙ্গে করতে পারো। সে গলায় তুলসীর মালা দেখিয়ে বলে — কী যে বলো, আমি দীক্ষা নিয়েছি। আমার গুরু আছে না।আমার বরও দীক্ষা নিয়েছে। তবে সে তার মতো।

সাকিলাদেরও গুরু আছে শুনি। ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি দীক্ষা নাও নি?

হাসপাতালে পড়বার জন্য একটা রবীন্দ্ররচনাবলীর খন্ড নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবিটি দেখিয়ে বললাম — এই যে আমার গুরু।

ওরা অবাক হল না। বলল, ক্যালেন্ডারে এঁর ছবি দেখেছে তারা। লোকটাকে চেনে।

হাসপাতালের খাবার মন্দ নয়। সকালে কাঁচা পাউরুটি, কলা , দুধ আর ডিম। দুপুরে মাছ বা মাংস এবং দই। রাতে ডাল ভাতের সঙ্গে দুটো ডিম। আমি খেতে পারতাম না। আমিষটুকু খেয়েই শেষ করতাম। বাকিরাও যে তৃপ্তি করে খেত এমন নয়। অনেকের খারাপ লাগত, খাবার নষ্ট করতে। কিন্তু কী করা যাবে। করোনা রোগীর খাবার তো অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না।

সবচেয়ে অসুবিধা হল এখানে চা বা গরমজলের ব্যবস্থা নেই। আমার বাড়ি কাছে। তাই একটার পর একটা জিনিস বাড়ি থেকে আনাই। ইলেকট্রিক কেটলিতে চা করে সবাইকে দিতে থাকি। ক্রেট ক্রেট জলের বোতল আসে। গেলাসের অভাবে তাতেই চা আর গরম জল নেয় তারা। আমি বোতলের জলেই চা করি। 

একটি আদিবাসী মেয়ে আমাকে অবাক করে জানাল বোতলের গরম জলে তার নেশা হয়। ট্যাপ কলের জল তাকে গরম করে দিতে হবে।

তাকে মজা করে বলি, তুমি কি এটাকে হান্ডি বা চুল্লু ভেবেছ নাকি। 

সে জানাল, সে কোনও নেশা করে না বলে বোতলের জলে তার নেশা লাগছে। 

পরে অবশ্য সে সেটাই খেত। বোতলদর্শনেই তার নেশার কথা মনে আসত কেবল।

পিপিই পরা লোক আসে ঘর পরিষ্কার করতে। দেখে নারী না পুরুষ বুঝতে পারি না। একজন লোক কী ভেবে আমার কাছে এসে বলে, জানিনা আপনি হিন্দু না মুসলমান, তবে আমি মুসলমানের ছেলে, প্রথম দিন থেকে এখানে কাজ করছি, একমাত্র আমি ভয় কাকে বলে জানি না। মরতে তো হবেই একদিন। করোনাকে ভয় করব কেন! সবাই ভয় পায়,আমি পাই না। 

সেও সবাইকে জিজ্ঞাসা করে, ও খালা কেমন আছো, ও বুন কেমন আছো, যা দরকার হবে আমাকে বলবে। আমি আছি তোমাদের পাশে। কাউকে বলে, ভাল হয়ে ঘর যাও মা। দেখে সুখী হই।

দুজন বৃদ্ধা মহিলা এলেন। একজনের শান্তিনিকেতনে বাড়ি। কিন্তু ঠিক কোথায় বলতে পারলেন না। কেবলই বলেন, শান্তিনিকেতনের সামনে। 

সাকিলা জিজ্ঞাসা করল, তোমার স্বামী আছে? সে খুব বিরক্ত হয়ে জবাব দিল, স্বামী টামি আবার কে?

সাকিলা আমার দিকে ফিরে গজগজ করল, পায়ে আলতা রয়েছে, আবার বলছে স্বামী টামি কে! আমাদেরই যত জ্বালা। একটা নখপালিশ পরতে পাবে না। টিপ পরতে পাবে না। শখ করে সালোয়ার কামিজ কিনেছিলাম, তাও পরতে পারলাম না।

সে মহিলাকে নিয়েও বেবি পড়ল। মহিলা একটু অপ্রকৃতিস্থ।আস্তে আস্তে তার মুখেই শুনলাম, কদিন আগেই তার স্বামী মারা গেছে। ছেলেরা হয়ত কাজকর্ম করছে। 

তবু মাঝেমাঝেই তার ইলিউশন হয়, তার ছেলে বৌমা বুঝি দোতলায় রান্না করছে। তার হাজার উদ্ভট প্রশ্ন আর কাজকর্ম বেবি সামাল দেয়। অক্সিজেন কিছুতেই তিনি নেবেন না। বারবার খুলে দেন।

নার্স ডাক্তার এসে মা বলে, ঠাকুমা বলে কত আদর করে তাকে বারবার লাগিয়ে দিয়ে যায়। একবার বলেন মুড়ি খাব তো একবার বিস্কুট। নার্সরা সাধ্যমত এনে দেয়। একদিন দেখা গেল অক্সিজেনের মাস্ক দিয়ে তিনি বোতলের মুখ ডাকছেন। একজন ওনাকে অ্যাবনর্মাল বললে ডাক্তার নিজে তার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, ওরকম বলবেন না। উনি নিজে জানেন না, যে উনি নর্মাল নন।

বাচ্চাগুলোর ছুটি হয়ে গেল। আদিবাসী মেয়েটিকে সেফহোমে পাঠান হল। অন্য মেয়েটি রাতের দিকে একটু লুকিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইল। যদিও তার শাশুড়ি কাউকে জানাননি, যে তার বৌএর করোনা হয়েছে। বলেছেন সিজারের অসুবিধার জন্য অন্য হাসপাতালে আছে।

সিট খালি থাকে না। দিন রাত্রি লোক আসতেই থাকে। একবার বের হয়ে একটা আপাদমস্তক নীল রেক্সিনে জড়ানো মৃতদেহ দেখলাম। বেশ লম্বাচওড়া শরীর। তার থেকে একটু দূরেই আমার ইসিজি হল।
দুটি নার্স মেয়ে রোগী হয়ে এল। তারা একটা ঘর নিয়ে দরজা বন্ধ করে রইল। বাইরে স্টাফেদের বাথরুম ব্যবহার করতে লাগল। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ওদের বাড়ি কলকাতায়। এদিকে কাজ করে।

মেয়েদুটির অনেকটা একরকম চেহারা। শর্ট হাইট, একটু মোটা, হাফপ্যান্ট পরা। ওরা যখন ঘর থেকে বের হয়, সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। 

একদিন বেবি বলল, কলকাতার মেয়েরা সব বেঁটে হয়, তাই না! আর আমাদের একদিকের মেয়েরা সব লম্বা। 

আমি হেসে বললাম, কলকাতা গেছো কোনওদিন নাকি! সে বলল, কী করে যাব। বাজারে কাজ করে করে জীবন গেল। অতদূরে কে যায়। এখন আমার নাতনিদের কাছে পৌঁছাতে পারলে ঢের।

ভাল হয়ে আসছি, নাকি সবার মাঝে ভাল থাকছি জানিনা। থালা ধোওয়ার বেসিনের কাছে খোলা জানলার সামনে খানিক দাঁড়িয়ে থাকি।মাঠ জুড়ে উজ্জ্বল রোদে সোনালি লম্বা লম্বা ঘাসগুলো মাথা নাড়ে। 

সরু একটা জলস্রোতের পাশে ছোট বড় তালগাছ। মোষ চরাচ্ছে ছাতা মাথায় মানুষ। ঘাসের জঙ্গলে সামান্যই তারা স্পষ্ট হচ্ছে। 

নিজের বাড়ির কথা মনে হয়। এমন দিগন্তজোড়া শূন্য মাঠের আদরের মধ্যে আমাদের একরত্তি বাড়িটি ছিল। আজ হোটেল আর লজ এসে তাকে চারিদিকে ঘিরে ফেলেছে। হঠাৎ হঠাৎ সেখানে কোনও না কোনও গাছের মৃত্যু দেখে চমকে উঠি । তাই এইরকম চেনা ভূগোল দেখলে বুকের ভেতর হু হু করে।

ভালো আছি, আমাকে ছুটি দিয়ে দিন। ডাক্তারকে বলি। নার্সও বলে, ওকে ছুটি দিয়ে দিন। ডাক্তার বলেন, আপনার এক্সরে খারাপ আছে। ছুটি দেওয়া যাবে না। তারপর একদিন সকালে পিঠে হাত দিয়ে বলেন, তিন তিন তিন বলুন।

নার্স জানায়, আজ আমার ছুটি হবে। আমার ফলমূল খাবার দাবার যার যা লাগবে দিয়ে দিই। তাতে তাদের যে খুব আগ্রহ আছে এমন নয়। তারা একটু চা চায়। গরম জল চায়। যাবার আগে তাই যতটাসম্ভব বেশি করে চা করি। তাতেও সবার কুলোয় না।

বাইরে থেকে তাড়া আসে আমার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে বলে।
উড়তে উড়তে যাই। তারপরই শুনি ছুটি তো নয়। যেতে হবে সেফহোমে।
আমি ফের অসুস্থ হতে থাকি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন