রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

মল্লিকা ধরের গল্পঃ বৈশ্রবণা



১ 

বৈশ্রবণা হ্রদের দক্ষিণতীরের প্রান্তরে নৈশ প্রহর ঝিল্লীঝঙ্কারে ভরে আছে । আকাশে প্রায় পূর্ণচন্দ্র, ঝকমকে রুপোলী জ্যোৎস্না দিকদিগন্ত ভাসিয়ে দিচ্ছে । জলের কাছেই বিশাল এক অশ্বত্থ গাছ, তীব্র জ্যোৎস্নায় তার ঘন ছায়া কেমন রহস্যময়! ঐ ছায়ার মধ্য থেকে একটি কন্ঠস্বর শোনা যায়, তরুণ একটি গলা । মিনতির সুরে সে বলে," একবার চেষ্টা করে দেখবেন? " 

উত্তরে একটি গম্ভীর, সতেজ, প্রভুত্বব্যঞ্জক প্রৌঢ় গলা শোনা যায়, "উপায় নেই । দিনক্ষণ সব স্থির হয়ে গিয়েছে ।" 

তরুণ গলাটি তবু মিনতি করে, "একটু ভেবে দেখুন । এতগুলো মানুষ ...মানবিকতার খাতিরে …" 

প্রৌঢ় গলাটি এইবারে ধমকের সুরে বলে, "আহ, বুঝতে কেন চাইছ না? প্রভু নিজেই সবকিছু ঠিক করে দিয়েছেন । তার উপরে আর কারোর কিছু করার নেই । তাঁর বিশ্বস্ত কর্মীদল একেবারে প্রস্তুত হয়ে আছে।" 

এইবারে তরুণ গলাটি সংকল্পে দৃঢ় হয়ে ওঠে, সে বলে, "বেশ । তাহলে আমি নিজেই প্রভুর কাছে যাবো আগামীকাল । আমার যা হয় হোক, কিন্তু সব জেনেও শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো, তা হয় না ।" 

প্রৌঢ় গলাটি রেগে ওঠে এইবার, বলে, "সেধে সেধে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাইছো কেন? প্রভুর কাছে বিনা অনুমতিতে যাওয়া যায় না, তা তো জানো । তার উপর আবার এই জটিল ব্যাপার নিয়ে । তোমার নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে ।" 

"হোক, তাও যাবো । আমার একটা জীবন, তুচ্ছ । কয়েক সহস্র মানুষের জীবনের দামের চেয়ে অনেক কম এর দাম । আমি যাবোই ।" 

প্রৌঢ় গলাটি এবারে তর্জন করে উঠে কী একটা বলে, হয়তো কোনো কঠিন তিরস্কার । তরুণ গলাটি নিঃশব্দ, একদম চুপ । সংকল্প করে ফেলার পর আর সে কথা বলে না, এইটাই তার অস্খলিতসংকল্প থাকার লক্ষণ । 

এরপরে আবার প্রৌঢ়ের তর্জন শোনা যায় আর সঙ্গে প্রচন্ড এক চপেটাঘাতের আওয়াজ । তারপরেই হুড়মুড় করে কারুর পড়ে যাবার আওয়াজ, সঙ্গে তরুণ গলাটির অস্ফুট কাতরোক্তি । তারপরে সব চুপ। ঝিঁঝির আওয়াজ অবধি থেমে গিয়েছে সহসা । জ্যোৎস্নারাত্রি যেন সহসা অপ্রত্যাশিত আঘাতে বোবা হয়ে গিয়েছে । 

নিঃশব্দে কাটতে থাকে সময় । কীসের প্রতীক্ষায় যেন থমথম করছে জল-স্থল-অন্তরীক্ষ, মূর্ছিতপ্রায় পৃথিবী অপেক্ষা করছে প্রচন্ডতর শেষ আঘাতের । 


কিন্তু সেই আঘাত নামে না । আকাশ কাঁপিয়ে দিয়ে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায় একজোড়া রাতচরা পাখি। সেই শব্দের প্রতিক্রিয়াতেই যেন আবার জেগে ওঠে ঝিল্লীঝঙ্কার । 

ছায়ার ভিতর থেকে শোনা যায় প্রৌঢ় গলাটি আবার, এবারে অনুতাপ আর করুণায় ছলছল করছে । কী বলছে কিছুই বোঝা যায় না, কিন্তু মনে হয় যেন সান্ত্বনা দিচ্ছে, আঘাত করার জন্য ক্ষমা চাইছে । তরুণ গলাটিও শোনা যায়, মৃদু কাতরোক্তির মত, কী বলছে বোঝা যায় না । 

তারপর আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকে, নৈশ প্রহর ভেদ করে দূর থেকে ভেসে আসে শৃগালের যাম ঘোষণা । বৃক্ষচ্ছায়া থেকে প্রথমে বার হয়ে আসে প্রৌঢ় মানুষটির চেহারা, তারপরে তাকে অনুসরণ করে বার হয়ে আসে তরুণ । জ্যোৎস্না এখন অবারিত হয়ে পড়েছে তাদের মাথায় মুখে বাহুতে উত্তরীয়ে । 

প্রৌঢ় চলে যান পশ্চিমমুখে, আর তরুণ চলতে থাকে দক্ষিণে । হ্রদ থেকে বেশ কিছু দূরে তাদের গ্রাম । হ্রদ ও গ্রামের মধ্যবর্তী স্থান সমতল, কিছুটা অংশ কৃষিজমি, কিছুটা পশুচারণক্ষেত্র, আর বাকীটা ঝোপজঙ্গল । 

তরুণ হাঁটতে হাঁটতে চারণক্ষেত্রের মাঝখানে এসে পড়ে । স্থানটি ভারী সুন্দর, বড়ো বড়ো গাছে ঘেরা কোমল তৃণাবৃত প্রান্তর । গাছের পাতার ছায়াজাল আঁকা জ্যোৎস্নায় বসে পড়ে তরুণ, উত্তরীয় খুলে ভাঁজ করে ঘাসের উপরে রাখে । তার উপরে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে । চাপা কান্নার মতন শব্দ শোনা যায় । কিন্তু রাতচরা পাখির তীক্ষ্ণ আওয়াজে সেই শব্দ হারিয়ে যায় । 

মাঠের অন্যদিক থেকে একজন আসছে, দূর থেকে তার চলন্ত অবয়ব দেখা যায় আবছা । সে আসে, আরও এগিয়ে আসে । পিঠের ঝোলা থেকে একটি বাঁশি বের করে এনে ফুঁ দেয় । বাতাস কাঁপিয়ে সুরতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে থাকে । শায়িত তরুণ সচকিত হয়ে উঠে বসে । কোমরবন্ধ থেকে সেও বার করে আনে একটি বাঁশি, বাজাতে শুরু করে । দুই বাঁশির আলাপ চলতে থাকে মধ্যরাত্রির জ্যোৎস্নার ভিতরে । 

চলমান অবয়ব এখন আরও কাছে । জ্যোৎস্নায় মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষটির । অনাবিল তরুণ মুখ, চোখে স্বপ্নাচ্ছন্নতা । মাথার কুঞ্চিত কেশ অগোছালো হয়ে ছড়িয়ে আছে কাঁধে, গলায়, পিঠে । আরো কাছে এসে সে বাঁশি থামায় । বলে, "কী রে শতরূপ, আজও খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাবি বুঝি? " 

মাঠে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল যে তরুণ, সেও বাঁশি থামায় । অল্প হেসে বলে, "যাযাবর বংশের ছেলে যে! ঘরে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে । কিন্তু সপ্তক, তুই কেমন করে জানলি যে আমি এখানে? " 

"আমি জানতাম না । দিব্যি ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম । হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুঝলাম স্বপ্নও ভেঙে গিয়েছে । স্বপ্নে কী দেখছিলাম জানিস? একটা মস্তবড় লেজওয়ালা নীলডানার পাখি এই মাঠটার উপরে চক্কর কেটে উড়ছে আর মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে ডেকে উঠছে । তাই ভাবলাম একবার দেখে আসি সত্যি সত্যি সেখানে কিছু হয়েছে নাকি । " 

শতরূপ হেসে ফেলল । বলল, "তুই মহা বিচ্ছু । সবসময় গল্প বানাস । ছোট্টো থেকে এই স্বভাব তোর । " তারপর হঠাৎ এদিক ওদিক দেখে নিয়ে চাপাস্বরে ষড়যন্ত্রীর মতন বলে, "অমিতায়ু কিছু বলেছে তোকে? কোনো সংবাদ পাঠিয়েছে?" 

সপ্তক বসে পড়ে । পোশাকের ভেতর থেকে একটা মোড়ক বের করে শতরূপের হাতে দেয় । তারপরে আবার আগের মতন বাঁশি বাজাতে শুরু করে । শতরূপ কিন্তু আর বাঁশি বাজায় না । সপ্তকের দেওয়া মোড়কটা নিজের পোশাকের ভিতর ঢুকিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় । কোনো কথা না বলে কোমর ঝুঁকিয়ে সপ্তকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করে । 

সপ্তক নির্বিকারে বাঁশি বাজিয়ে চলে, যেন সে আগে থেকেই সব জানতো এরকম হবে । রাত্রি বয়ে যেতে থাকে শন শন, মধ্যরাত পেরিয়ে জ্যোৎস্না যেন আরো অলৌকিক এখন । বাঁশিতে নৈশ রাগিণীর আলাপ চলে, ঝিল্লীঝঙ্কার যেন এই আলাপের পশ্চাৎপট রচনা করেছে । 

ভোরবেলা আসে এক তরুণী । সে সদ্যোস্নাতা, তার সিক্ত কুন্তলরাশি ছড়িয়ে আছে সমস্ত পিঠ আচ্ছন্ন করে, যেন প্রতিমার চালচিত্র । 

সপ্তক মাঠের ঘাসের উপরে ঘুমিয়ে পড়েছে । বাঁশিটি পড়ে আছে পাশে । দূর থেকে মাঠের উপরে মানুষ পড়ে থাকতে দেখে মেয়েটি শঙ্কিত হয়ে ওঠে । প্রায় দৌড়ে কাছে এসে সে ঝুঁকে পড়ে, দেখতে পায় নিয়মিত ছন্দে নিঃশ্বাস পড়ছে । হ্যাঁ সাধারণ ঘুমেই ঘুমিয়ে আছে, চিরঘুম নয় । সে নিশ্চিন্ত হয় । 

মেয়েটির মুখ দেখে বোঝা যায় যে সে চিনতে পেরেছে সপ্তককে । সে নতজানু হয়ে বসে সুপ্ত সপ্তকের পাশে । ডানহাতে মৃদু ঠেলা দেয়, বলে, "সপ্তক, সপ্তক, ওঠো । আরে এইখানে এভাবে কেউ ঘুমোয়? ঘরে চলো ।" 

ঘুমজড়ানো গলায় কী যেন বলে সপ্তক, পাশ ফেরে । তারপরেই ঘুম ভেঙে যায় তার । পুরোপুরি চোখ খুলে সে দেখতে পায় কার মুখ তার মুখের উপরে ঝুঁকে আছে । তড়াক করে উঠে বসে সে, বলে, "আরে কী কান্ড! ফুলি? তুই এখানে?" 

মেয়েটির নাম ফুল্লরা, আত্মীয়বন্ধুরা সবাই নামটাকে ছোটো করে ফুলি বলে ডাকে । ফুল্লরা হাসে, বলে, "আরে আমিও তো তাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম, তুমি এখানে কেন? সারারাত এইখানেই ঘুমিয়েছ নাকি? তা অবশ্য হতেই পারে, তুমি তো আবার দিব্যোন্মাদ না কী যেন বলে, তাই ।" কথা শেষ করে মুখে আঁচল চেপে হাসতে থাকে ফুল্লরা । 

সপ্তক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে ফুল্লরার দিকে । যেন প্রথম দেখছে । কত বদলে গিয়েছে ফুল্লরা! সেই বছর পাঁচেক আগের বালিকা ফুল্লরা যার সঙ্গে সপ্তক খেলাধূলো করতো মাঠে অন্য বালকবালিকাদের সঙ্গে, সেই ফুল্লরা এখন পরিপূর্ণা নারী! এই কয়েক বছরে যেন গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে গিয়েছে। মেয়েদেরই কি এমন হয় শুধু? সপ্তকও কি এত বদলে গিয়েছে এই কয়েক বছরে? 

অবাক হয়ে চেয়ে থাকা সপ্তককে সে বলে, "কী হল, ভুত দেখলে নাকি দিনের বেলা ? এমন গোল্লা গোল্লা চোখ করে চেয়ে আছো যে ! " 

সপ্তক তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলে, "ভুত না, পেত্নী । জলজ্যান্ত । সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে ।" হাসতে থাকে সপ্তক । 

ফুল্লরাও হাসতে হাসতে বলে, "পেত্নী না, ভালো করে দ্যাখো । এ হল শাঁকচুন্নী ।" 

সপ্তক চোখ সরু করে ভালো করে দেখার অভিনয় করে । তারপর বলে, "হুঁ, তাই তো দেখছি । শঙ্খচূর্ণী । তা, এত ভোরে এই মাঠে কেন রে ফুলি? " 

ফুল্লরা বলে, "দহিন ঝর্ণা থেকে স্নান করে এই মাঠ দিয়েই তো ফিরি, এখান দিয়েই তাড়াতাড়ি হয় । যাবার পথে পুজোর ফুল তুলে নিয়ে যাবো কুসমীদের বাগান থেকে । এই দ্যাখো হাতে সাজি । " হাতের খালি সাজি তুলে দেখায় সে । 
সপ্তক বলে, "রোজ এত ভোরে স্নান করে ফুল তুলে নিয়ে গিয়ে পুজো দিস তুই? মন্দিরে? নাকি গৃহবেদতার পুজো? " 

ফুল্লরা বলে, "বাড়ির উঠোনের তুলসীমঞ্চে ফুলজল দিই আর তারপর গৃহদেবতার পুজো ।" 

সপ্তক কেমন উদাস সুরে বলে, "আমি পুজো দিই নি কোনোদিন । মা দেন । আমি শুধু প্রসাদ নিয়ে কৃতার্থ । " 

ফুল্লরা বলে, "কে বলেছে তুমি পুজো দাও না? তুমি পুজো দাও সুরের দেবতাকে । তোমার বাঁশি বাজিয়ে পুজো দাও ।" 

সপ্তক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, অস্ফুটে বলে, "তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস ফুলি । কেমন সুন্দর চিন্তা করতে আর কথা বলতে শিখেছিস !" 

ফুল্লরা হাসে, বলে, "হ্যাঁ, বড় হয়ে গিয়েছি আমরা দু'জনেই । আমি এবারে যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে । তুমিও ঘরে যাও, তোমার মা হয়তো চিন্তা করছেন । " 

সপ্তক বলে, "হ্যাঁ, এবারে ফিরবো । মা তো বাড়ি নেই, আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছেন সুবর্ণগিরিতে । দু'দিন পর ফিরবেন ।" 

ফুল্লরা তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে রওনা দেয় কুসমীদের বাগানের দিকে । পুবের নরম রোদ্দুর তখন আস্তে আস্তে ঝকমকে হয়ে উঠছে । 


২ 

সেই সময়েই বৈশ্রবণা হ্রদের উত্তরে কৃষ্ণগিরির বন্ধুর পার্বত্য পথে কঠিন চড়াই পার হয়ে উপরে উঠছিল শতরূপ । কৃষ্ণগিরির মাঝামাঝি উচ্চতায় অবস্থিত গুহাপ্রাসাদের দিকে তার যাত্রা । সেইখানেই প্রভুর দেখা পাওয়া সম্ভব । 

বৈশ্রবণা হ্রদের পূর্বতীরে সুবর্ণগিরি, উত্তরতীরে কৃষ্ণগিরি আর পশ্চিমতীরে চন্দ্রগিরি । দক্ষিণ দিকে কোনো পাহাড় নেই, একটি প্রাকৃতিক বাঁধ আছে পাথরের । দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁধ ফুরিয়ে গিয়েছে, সেখান থেকে একটি ক্ষুদ্র নদী বেরিয়ে এসেছে, সেই নদী সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত । নদীর নাম দয়া । এই দয়া নদী চলে গিয়েছে ফুল্লরা সপ্তকদের গাঁয়ের বুক চিরে । গাঁয়ের নাম তরুবীথি । 

সপ্তকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেনি শতরূপ, তখনই রওনা দিয়েছে । হ্রদের পূর্বতীর বরাবর এগিয়েছে সে সুবর্ণগিরির কোলে কোলে । জ্যোৎস্নায় পথ দেখতে অসুবিধে হয় নি । ভোরে কৃষ্ণগিরির পায়ের কাছে এসেছে । তারপর এখন কঠিন চড়াই পার হয়ে উঠছে । 

অমিতায়ুর পাঠানো মোড়কের মধ্যে ছিল সনাক্তকরণচিহ্নওয়ালা একটি চিঠি । সংকেতে লেখা । সেই চিঠি শতরূপ পড়েছে চলতে চলতেই । চিঠিতে লেখা ছিল আজ দ্বিপ্রহরে গুহাপ্রাসাদেই পাওয়া যাবে প্রভুকে, সেখানে অমিতায়ু ও উপস্থিত থাকবে । 

প্রকাশ্যে অমিতায়ু প্রভুর বিশ্বস্ত অনুচর । কিন্তু তাঁর নিজের গোপণ একটি দল আছে, যে দল গোপণে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রভুর নিষ্ঠুর শাসন থেকে স্বাধীন হবার জন্য । শতরূপ অমিতায়ুর গোপণ দলের কর্মী । 

এই বৈশ্রবণা হ্রদের চারদিকের সমগ্র অঞ্চলের শাসনকর্তা এই প্রভু । তাঁর রাজধানী কৃষ্ণগিরির উত্তরের অরণ্য পার হয়ে এক বিশাল অধিত্যকায় । কিন্তু কৃষ্ণগিরিতে তাঁর গোপণ গুহাপ্রাসাদ রয়েছে, অল্প কিছু বিশ্বস্ত অনুচরই শুধু তা জানে যারা সেখানে অবস্থান করে সর্বদা । প্রভু আজকাল অধিকাংশ সময়ই কাটাচ্ছেন গুহাপ্রাসাদে । 

সামনে তাঁর এক মারাত্মক পরিকল্পনা । দু'দিন পর পূর্ণিমা । সেইদিন সন্ধ্যায় তিনি তাঁর প্রকৌশলীদের সাহায্যে বৈশ্রবণা হ্রদের দক্ষিণের প্রাকৃতিক বাঁধ বিচূর্ণ করে তরুবীথির মতন কিছু গ্রাম ও সন্নিহিত সমস্ত দক্ষিণাঞ্চল জলপ্লাবিত করে দেবেন । কারণ তিনি হ্রদকে জলশূন্য করতে চান । হ্রদের তলদেশে নাকি মূল্যবান খনিজের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । সেই খনিজ উত্তোলনের জন্য যদি তরুবীথির মতন কয়েকটি গ্রামের মানুষদের ভিটেমাটি তলিয়ে যায় তাহলে সে আর এমনকি? নাহয় কয়েক সহস্র মানুষের আশ্রয় গেল, কিন্তু তারা তো সংখ্যা বই আর কিছু নয় তাঁর কাছে? তার উপরে সম্প্রতি গ্রামবাসীরা রাজকরও দিতে চাইছে না ফসল ভালো না হওয়ায় । এইভাবে জলে ডুবিয়ে প্রজাশাসনও হবে আবার মূল্যবান খনিজসম্পদও লাভ করা যাবে । যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা পড়বে । 

গত রাত্রে যে প্রৌঢ় ব্যক্তির সঙ্গে শতরূপের কথা হচ্ছিল, তাঁর নাম সংবর্ত । তিনি প্রভুর একজন মন্ত্রণাদাতা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণাদাতা । আগে তিনি তরুবীথির বাসিন্দা ছিলেন, এখন সুবর্ণগিরিতে থাকেন । 

সংবর্তের আর একটা পরিচয়ও আছে । সম্পর্কে তিনি শতরূপের বাবা, কিন্তু পুত্রকে পরিত্যাগ করেছেন। শতরূপ তার আগে থেকেই অবশ্য বাড়িতে বেশি থাকতো না, স্বাধীনতাকামী দলে গোপণে যোগ দিয়েছিল। সংবর্ত জেনে ফেলার পরেই সংঘর্ষ, পরিণামে শতরূপের বাড়ি থেকে একেবারে বিতাড়িত হওয়া । তারপর সংবর্তও পরিবারের বাকীদের নিয়ে গ্রাম ত্যাগ করে সুবর্ণগিরিতে নতুন আবাস নিলেন । 

কয়েক মাস আগে আবার পিতাপুত্রের নতুন করে যোগাযোগ ঘটেছে নানা ঘটনার আবর্তে । গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার শতরূপের সঙ্গে দেখা হয়েছে সংবর্তের । পর পর দু’বছর ভালো ফসল না হওয়ায় তরুবীথিসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ প্রভুকে ফসল দিতে রাজি হয় নি রাজকর হিসেবে । তার পরিণামে কোথাও কোথাও জোরজুলুম শুরু হয়েছে প্রভুর পক্ষ থেকে । এইসব নিয়ে নানা নৈতিক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছেন সংবর্ত । আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে । পুত্র যে পথে গিয়েছে তাকে আগে ভুল পথ মনে করেছিলেন তিনি, কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে । 

অমিতায়ুর কাছ থেকে প্রভুর মারাত্মক পরিকল্পনার কথা জেনে শতরূপ প্রথমে যোগাযোগ করে সংবর্তের সঙ্গে । সংবর্ত যদি কোনোভাবে নিবৃত্ত করতে পারেন প্রভুকে, সে সেই আশা করছিল । কিন্তু তা সম্ভব নয় জেনেই সে এখন চলেছে স্বয়ং বাঘের ডেরায় । হ্যাঁ, তার নিজের জীবনের ঝুঁকি আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে না গিয়ে পারছে না । 

শতরূপের মন কেবল তরুবীথি আর আশেপাশের গ্রামগুলোর মানুষদের নিয়ে উৎকন্ঠিত ছিল বলে সে একটুও তলিয়ে অন্য কিছু ভাবতে পারছিল না । নাহলে অমিতায়ুর গোপণ চিঠিটি পড়ে সে একবারের জন্য হলেও থমকে দাঁড়াতো । 

কৃষ্ণগিরিতে আরোহণ করতে করতে সে একবার একটু বিশ্রাম নিল পথের ধারে । আকাশ খুব পরিষ্কার, কৃষ্ণগিরির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ শ্যেনকূট ঝকঝক করছে নীল আকাশের পটভূমিতে । 


শ্যেনকূটের দিকে চেয়ে শতরূপের মনে হল কিংবদন্তীতে শ্যেনকূটকে খুব রহস্যময় বলা হয় । দূর থেকে শ্যেনপক্ষীর মুন্ডের মতন দেখানো শিলাময় চূড়াটির দিকে চেয়ে শতরূপ ভাবল, কী রহস্য আছে ওখানে? এই শান্ত সকালে মৌন গিরিশৃঙ্গটির দিকে চেয়ে দেখলে কোনো রহস্যময়তা তো চোখে পড়ে না! শুধুই একধরণের উদাসীন রুক্ষ সৌন্দর্য চোখে পড়ে । 

একঝাঁক পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে বেরিয়ে এল পথের পাশের জঙ্গল থেকে । শতরূপের মাথার উপর দিয়ে সোজা উড়ে চলে গেল পশ্চিমের দিকে । 

ওদের ডাকেই ভাবনার ঘোর ভেঙে গেল শতরূপের, মনে পড়ল তার দ্রুত গিয়ে পৌঁছতে হবে প্রভুর গুহাপ্রাসাদে । সেখানে কতরকমের বাধা অপেক্ষা করছে প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার আগে, সেই হিসেব করা ছেড়ে দিয়েছে সে । জীবন বাজি রেখেই তো এই খেলায় একদিন নেমেছিল, তাহলে এখন দ্বিধা করে লাভ কী? 

আবার চলতে শুরু করে সে, কঠিন চড়াই ভেঙে উঠতে থাকে উপরে । ওই দূরে বুঝি দেখা যায় আভাস । "চলো, চলো, চলো, আর থামা নয়", নিজেকে বলতে থাকে সে । 



দ্বিপ্রহরে গুহাপ্রাসাদে প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল শতরূপের । প্রভু বসে আছেন কালো পাথরের সিংহাসনে, তাঁর চারপাশে অনুচরেরা । সাক্ষাৎপ্রার্থী শতরূপকে একরকম বিনা বাধাতেই প্রভুর সামনে উপস্থিত করেছে রক্ষীরা । 

না, অনুচরদের মধ্যে অমিতায়ুকে দেখতে পেল না শতরূপ । সে কি ইচ্ছে করেই অনুপস্থিত? 

প্রভু প্রৌঢ়বয়সী, কিন্তু অসাধারণ মজবুত চেহারা । শক্ত চৌকো মুখে দর্প আর বিজয়লাভের স্পৃহার যুগলবন্দী । ঝকঝকে চোখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অপরিসীম নিষ্ঠুরতা ঝিকিয়ে উঠছে । শতরূপ কেমন এক অদ্ভুত বিস্ময়ে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল । এঁরাই কেন যুগে যুগে অসংখ্য মানুষের ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়ায়? 

ক্রূর হাসি হেসে মোলায়েম গলায় প্রভু বললেন, "আমার সভায় স্বাগত হে যুবক । নাম বলো, পরিচয় দাও। আমার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলে কেন ? " 

ধীরে ধীরে শতরূপ বলে, "নাম শতরূপ । দেবার মত পরিচয় কিছু নেই । আপনার সাক্ষাৎ চেয়েছিলাম ---" কথা শেষ করতে পারে না সে, প্রভু অট্টহাস্য করে ওঠেন । বলেন, "শতরূপ! তোমার পরিচয় জানি আমি । আমার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী গুপ্তসমিতির তুমি একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য । তোমাকে এইবার কী করা হবে জানো?" 

দুই দিক থেকে দু'জন রক্ষী এগিয়ে আসে । শতরূপ বন্দী হয় কয়েক মুহূর্তের মধ্যে । তারপর সে দেখতে পায়, পাশের একটু গুহা থেকে আরো বহু বন্দীকে আনা হচ্ছে সভায়, সকলেই তাদের গোপণ দলের । 

দীর্ঘ্শ্বাস ফেলে সে ভাবে, সবকিছু জানাজানি হল কেমন করে? তাহলে কি অমিতায়ুকে বড্ড বেশিই বিশ্বাস করেছিল তারা? তারই মূল্য দিতে হচ্ছে? অমিতায়ু নিজেই প্রভুর গুপ্তচর ছিল তাহলে? আজকের এই পুরো ব্যাপারটাই তাহলে ফাঁদ? 

একজন বন্দীকে নিয়ে বসানো হল প্রভুর সিংহাসনের সামনে একটু দূরে একটি পাথরের উপরে । তারপর বন্দীর পিঠের বস্ত্রাবরণ সরিয়ে শুরু হল কশাঘাত । শাঁই করে বাতাস কেটে শপ্পাং করে রক্ষীর চাবুক আছড়ে পড়ল হতভাগ্যের খোলা পিঠে, আর্তনাদ করে উঠল সে, যন্ত্রণায় পিঠটা বেঁকে গেল । কাঁপতে কাঁপতে আবার পিঠ সোজা করতেই আবার আছড়ে পড়ল প্রচন্ড চাবুক । আবার যন্ত্রণায় বেঁকে গেল পিঠ । কিছুক্ষণের মধ্যেই দাগড়া দাগড়া লাল দাগ ফুটে উঠল পিঠ জুড়ে । গোটা দশ বারো চাবুক খেয়ে বন্দী অচেতন হয়ে পড়ল । তখন তার অচেতন দেহ পাশে সরিয়ে দিয়ে পরবর্তী বন্দীর উপরে একইরকম শাস্তি চলল । একে একে প্রতিটি বন্দীকে যেতে হল সেই ভয়ানক শাস্তির মধ্য দিয়ে । 

সবার শাস্তি হয়ে গেলে বিশাল একটি গুহার অভ্যন্তরে শিকল বাঁধা বন্দীদের নিয়ে রাখা হল । সূচীভেদ্য অন্ধকার । কিন্তু কোথা থেকে তিরতির তিরতির আওয়াজ আসছে । হয়তো কোনো পার্বত্য ঝর্ণার শব্দ । 

নীরেট অন্ধকার মধ্যে প্রহারজর্জরিত দেহে পাথুরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল শতরূপ । দৈহিক ব্যথাবোধ অসাড় হয়ে গিয়েছিল তার, শুধু মনের মধ্যে তীক্ষ্ণ কাঁটার খোঁচার মতন বিঁধছিল অমিতায়ুর কথা । এইরকম ভাবে সহযোদ্ধাদের বিশ্বাস ভাঙল অমিতায়ু? নাকি মিথ্যে সন্দেহ করছে সে? কিন্তু দলের এতজনকে গোপণ পত্র পাঠিয়ে এখানে টেনে আনার অর্থ তাহলে কী? 

অন্ধকারের মধ্যে চোখ খোলা রাখার অর্থ হয় না । চোখ বুজে চুপচাপ চিন্তা করছিল শতরূপ । মাঝে মাঝে সহবন্দীদের কাতরোক্তি কানে আসছিল । আর সেই তিরতিরে ঝর্ণাটির অক্লান্ত ধ্বনি । চুপ করে বসে থাকতে থাকতে শতরূপ ভাবছিল তিরতিরে শব্দটা কি কিছু বলতে চাইছে তাকে? 

শ্যেনকূটের কিংবদন্তীটা মনে পড়ছিল ওর । ছোটোবেলায় শোনা গল্প । এক বৃদ্ধ গল্প বলছেন, তাঁর সামনে বসে আছে বালক শতরূপ, আরো অনেক তারই বয়সী বালকবালিকার সঙ্গে । এতকাল পরে আবার সেই বৃদ্ধের কম্বুকন্ঠ যেন শুনতে পেল শতরূপ । তিনি বলছেন, "বহু বহু বহু বছর আগের কথা । ঐ যে শ্যেনকূট, কৃষ্ণগিরির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, সে তখন এইরকম ছিল না । অনেক ছোটোখাটো ছিল তখন কৃষ্ণগিরি, আর শ্যেনকুট তখন ছোট্টো একটা সবুজ চূড়ামাত্র । সুবর্ণগিরি আর চন্দ্রগিরির অস্তিত্বই তখন ছিল না । বৈশ্রবণা হ্রদও তখন ছিল না । কৃষ্ণগিরি তখন ছিল ঘন অরণ্যে আচ্ছন্ন, যেন রহস্যময় পরীদের রাজ্য । 

একবার সেই অরণ্যে শোনা গেল আশ্চর্য গান । সঙ্গে অদ্ভুত বাজনা, যেন মাটির তলা থেকে উঠে আসছে বাজনার শব্দ । প্রতিদিন দলে দলে পাখি অরণ্য ছেড়ে উড়ে চলে যেতে লাগলো দক্ষিণের দিকে । এইভাবে কিছুদিন কাটল । 

তারপর এক সন্ধ্যায় গোল চাঁদ উঠল, লাল রঙের চাঁদ । শ্যেনকুট থেকে তখন ধোঁয়া বের হচ্ছে । একদল কালো পাখি উড়ে এল কেজানে কোথা থেকে । অরণ্যে তখন সেই গান আরো জোরালো হয়েছে । মাটি কাঁপতে শুরু করল । 

তারপরে এল সেই প্রলয়মুহূর্ত, শ্যেনকূট বিস্ফোরিত হল । আগুন জ্বলে উঠল অরণ্যে । প্রচন্ড ঝড়ে দুনিয়া ঢেকে গেল । লাল চাঁদ হারিয়ে গেল ঘন অন্ধকারে । 

কতদিন চলল সেই প্রলয়কান্ড আর অন্ধকার দিবারাত্রি, কেউ সেই হিসেব রাখে নি । প্রলয়ের পরে যখন আবার সূর্য উঠল, তখন দেখা গেল কৃষ্ণগিরি অনেক উঁচু হয়েছে, ভাঙা শ্যেনকূটের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে নতুন একটি চূড়া, আর পুবে পশ্চিমে উঠে এসেছে সুবর্ণগিরি আর চন্দ্রগিরি । আর এই তিন পাহাড় ঘেরা মাঝখানের নিচু অংশে দেখা দিয়েছে বিশাল বৈশ্রবণা হ্রদ । " 

আহত দেহে গভীর ক্লান্তি আর অন্ধকার জড়িয়ে ওভাবে বসে বসে স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে শতরূপের কত ঘন্টা কাটল কেজানে! সময়ের বোধ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল তার । একসময়ে গভীর নিদ্রা এসে সব জুড়িয়ে দিল । 



কেজানে কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, কাঁধের কাছে একটা নাড়া খেয়ে চমকে ঘুম ভাঙল শতরূপের । চোখ মেলেই আবার চোখ বন্ধ করতে হল । যে ব্যক্তি তাকে জাগিয়েছে তার হাতে মশাল জ্বলছে, সেই আলোয় গুহার খানিকটা আলোকিত । 

আস্তে আস্তে আবার চোখ খুলল শতরূপ । কিছু বলার উপক্রম করতেই মশাল হাতে লোকটি ঠোঁটে আঙুল রেখে কথা বলতে নিষেধ করল । তারপর ইঙ্গিত করল উঠে দাঁড়াতে । শতরূপ উঠে দাঁড়ালে শিকল খুলে দিল লোকটি । ইঙ্গিত করল তাকে অনুসরণ করতে । 

শতরূপ একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখল, শায়িত সহবন্দীরা অনেকেই নেই তাদের জায়গায় । তাহলে কি গোপণে কেউ এক এক করে মুক্ত করছে তাদের? নাকি এইভাবে নিয়ে গিয়ে গুপ্তহত্যা করা হচ্ছে? 

অর্ধঘুমন্ত ক্লান্ত মগজে আর বেশি ভাবার সামর্থ্য ছিল না শতরূপের । একরকম যন্ত্রের মতই সে অনুসরণ করল মশালধারী ব্যক্তিকে । যে পথে তাদের ঢোকানো হয়েছিল, সেই পথ নয়, অন্য একটা সংকীর্ণ পথে লোকটি নিয়ে চলল ওকে । 

সংকীর্ণ পথে মশালধারীকে অনুসরণ করে চলতে চলতে শতরূপের একবার মনে হল কিছু জিজ্ঞাসা করে লোকটিকে । তারপরেই আবার ভাবল থাক, কী হবে বৃথা বাক্যব্যয় করে? যা হবার তা তো হবেই । সে এখন নিয়তিতাড়িত এক প্রাণী মাত্র, কোনোকিছুই তো আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই! 

পথটি সোজা নয়, মাঝে মাঝেই বাঁক নিচ্ছে । তিরতিরে ঝর্ণাটির ক্ষীণ ধ্বনি কিন্তু এখনও কানে আসছে শতরূপের । শব্দের ক্ষীণতা মাঝে মাঝে কমছে, মাঝে মাঝে বাড়ছে । এক বাঁকে এসে তিরতিরে ঝর্ণার শব্দটা স্পষ্ট হয়ে উঠল, যেন সামনেই সেটা । তারপরেই শতরূপ দেখল, হ্যাঁ, তারা বেরিয়ে এসেছে খোলা আকাশের নিচে । 

আকাশে প্রায় পূর্ণ চাঁদ । জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে দিকদিগন্ত । সামনেই একটি ঝর্ণা, ঝর ঝর করে ঝরে পড়ছে নিচের গোল জলকুন্ডে । ছিটকে ওঠা লক্ষ লক্ষ জলবিন্দুতে জ্যোৎস্না যেন লক্ষ লক্ষ হীরের ফুল ফুটিয়ে তুলছে । 

মশালধারী ব্যক্তি এতক্ষণে প্রথম কথা বলল । মৃদু চাপাস্বরে সে বলল, "আপনাকে এই স্থান পর্যন্ত পৌঁছে দেবার দায়িত্ব ছিল আমার । এইবারে আর একজন আসবে । আপনাকে তার হাতে তুলে দিয়ে আমি ফিরে যাবো ।" 

শতরূপ মুগ্ধ হয়ে জ্যোৎস্নাস্নাত ঝর্ণা দেখছিল । তার কাছে বাকী সব তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে । একটু আগেও তো জানত না আর কোনোদিন অপরূপা পৃথিবীকে সে দেখতে পাবে কিনা! এখন ওর কাছে সবই অপ্রত্যাশিত উপহারের মতন, অতিরিক্ত পাওয়া । হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই মরতে হবে, কিন্তু শতরূপের আর তাতে কিছু যায় আসে না । 

সে হেসে মশালধারীকে বলল," কী সুন্দর, না? এই ঝর্ণা, এই জ্যোৎস্না- কী সুন্দর! আগে এভাবে কোনোদিন বুঝিনি ।" 

মশালধারী লোকটি শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল, একটু সামলে নিয়ে সে বলল, "আপনি আশ্চর্য মানুষ । আর হয়তো আমাদের দেখা হবে না কোনোদিন, আপনাকে একটা জিনিস যদি দিতে চাই, নেবেন?" 

শতরূপও এবার অবাক হল, বলল," কী জিনিস?" 

লোকটি নিজের বাহু থেকে খুলে দিল একটি অঙ্গদ, বলল, "এতে একটি পাথর বসানো আছে, পাথরে একটি মুখ খোদাই করা । এ পৃথিবীতে যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার মুখ । সে চলে গিয়েছে আমাকে ফেলে, আমিও কয়েকদিন পর রওনা হব । তার আগে তাই এটা দিয়ে যেতে চাই আপনাকে । পৃথিবীকে এত ভালোবাসেন আপনি, পৃথিবী আপনাকে ভালোবেসে ধরে রাখবেই । তার সঙ্গে রয়ে যাবে এটা, অনেক অনেকদিন পর আপনি আপনার প্রিয় সন্তানদের মধ্যে কারুর হাতে এটা দিয়ে বলবেন, 'এক হতভাগ্য দুঃখী এটা দিয়েছিল । সে বেচারা ভালোবাসতে গিয়ে পথ ভুল করে অন্ধকারে চলে গেল, হয়ে গেল ঘাতক । কিন্তু এই পাথরটার মধ্যে ভালোবাসা বেঁচে আছে, তাই একেবারে আঁধারে হারিয়ে যাবার আগে আমায় দিয়ে গিয়েছিল ।' " লোকটি কাঁদছিল, শতরূপ স্তব্ধ হয়ে অঙ্গদটি হাতে ধরে দাঁড়িয়েছিল । 

লোকটি চোখ মুছে ব্যস্ত গলায় বলল, "সময় নেই । আসুন আপনাকে গোপণ রাস্তা দেখিয়ে দিই । সেই পথে সোজা আপনি গ্রামে চলে যান । যে ঘাতক এখানে আসার কথা, যার হাতে আপনাকে তুলে দেবার কথা আমার, সে আসার আগেই আপনি পালান ।" 

শতরূপ বলে, " কিন্তু আপনার কী হবে? " 

লোকটি বলে, "আমার কিছু হবে না, আমি ঠিক সামলে ফেলবো । সময় নেই । আসুন ।" 

গোপণ রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে লোকটি বিদায় নিল । সেই রাস্তায় চলতে চলতেই অঙ্গদটি বাহুতে পরে নিল শতরূপ, হাতে রাখলে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যেতে পারে । এ অমূল্য সম্পদ হারিয়ে ফেলা চলে না । 

পাহাড়ী পথে চড়াই আর উৎরাই একের পর এক । শতরূপ থামে না, মাঝে মাঝে একটু একটু জিরিয়ে নিয়ে চলতেই থাকে । চাঁদ ঢলে পড়ে পশ্চিমে, রাত শেষ হয়ে আসতে থাকে । সকালের মধ্যে তরুবীথি গাঁয়ে পৌঁছতেই হবে তাকে । 


ভোর-ভোর সে পৌঁছয় গাঁয়ের প্রান্তে সেই মাঠে, যে মাঠে আগের রাত্রে সপ্তকের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। আজও দহিন ঝর্ণায় স্নান সেরে কাপড় বদলে পিঠে ভেজা চুল মেলে ফুল্লরা আসছে ফুলের সাজি হাতে নিয়ে । আজ তার কাঁখে জলভর্তি কলসীও আছে একটি । 

দূর থেকেই চিনতে পারল শতরূপ, দৌড়ে গেল তার সামনে । সেও ফুল্লরার খেলার সাথী ছিল একসময় । ছিন্নবসন ধূলিধূসরিত ক্লান্ত ক্ষতবিক্ষত শতরূপকে দেখে ফুল্লরা স্তম্ভিত হয়ে গেল । শতরূপের সমস্ত দেহ অবশ হয়ে আসছিল এতক্ষণে, সে কোনোক্রমে বলল, "ফুলি, সপ্তককে খবর দিতে পারবি? বলবি শতরূপ এসেছে ।" এইটুকু বলেই সে অচেতন হয়ে পড়ে গেল ভূমিতে । 

কলসীর থেকে আঁজলা ভরে জল নিয়ে শতরূপের মুখে ঝাপ্টা দিয়ে দিয়ে জ্ঞান ফেরালো ফুল্লরা । তারপর ওকে উঠিয়ে বসিয়ে জলপান করিয়ে কিছুটা সুস্থ করে সাজি কলসী সব রেখে ছুটে গেল সপ্তকের বাড়ির দিকে । 

সপ্তক ছিল না বাড়িতে । বিশ্বাসঘাতক অমিতায়ুর প্রেরিত গুপ্তঘাতক তকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অরণ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল । 

ফুল্লরা ফিরে এসে জানাল সপ্তক নেই বাড়িতে । শুনে শতরূপ উঠে দাঁড়াল । বলল, "ফুলি, যা করার আমাদেরই করতে হবে । গাঁয়ের ঘোর বিপদ । এ গাঁ জলপ্লাবিত হয়ে যাবে । বৈশ্রবণা হ্রদ সেঁচে সেই জলে তরুবীথি আর আশপাশের গ্রাম ডুবিয়ে দেবার পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রভু, কার্যকর হবে আজ সন্ধ্যে থেকে । গাঁয়ের সবাইকে সময় থাকতে পালাতে হবে দক্ষিণের দিকে । তুই তোদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে নিয়ে পশ্চিমপাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বল । আর আমি যাচ্ছি পুবপাড়ার দিকে ।" 

ফুল্লরা অবাক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অবিশ্বাস করে নি । শতরূপের গলার স্বরে, চোখমুখের ভাবে এমন কিছু ছিল যাতে তাকে অবিশ্বাস করা যায় না । সে রাজি হয়ে ছুটে গেল বাড়ির দিকে । ততক্ষণে শতরূপ রওনা দিয়েছে পুবপাড়ার দিকে । 



পূর্ণিমার সন্ধ্যা আসন্ন । তরুবীথি গাঁয়ের প্রায় সবাই এখন গাঁ থেকে অনেক দূরে, দক্ষিণের একটি মালভূমির উপরে । দয়া নদীর পাশ দিয়ে দক্ষিণে চলতে শুরু করেছিল সবাই বেলা প্রথম প্রহরেই । একদল পদব্রজে, অন্যদল নদীর উপর দিয়ে নৌকায় । একটুও থামে নি কোথাও । বিকেল বিকেলই সবাই চলে এসেছে অনেক দূর । 

মালভূমিটির কাছে এসে আরোহণ । নৌকারোহী দলও নৌকা নদীর কিনারে বেঁধে এই পদাতিক দলের সঙ্গে যোগ দিল, একসঙ্গে সবাই উঠতে শুরু করল । অনেকটা উপরে উঠে চূড়া, বেশ চওড়া সমতল স্থান। তখন সূর্যাস্ত আসন্ন । শতরূপের নির্দেশে সবাই ওখানেই রাত্রিযাপনের উদ্যোগ নিল । এখন তারা নিরাপদ দূরত্বে । 

একঝাঁক পাখি হঠাৎ কেমন অদ্ভুতভাবে ডাকতে ডাকতে কাছের গাছগুলো থেকে উড়াল দিল একইসঙ্গে, সোজা উড়ে চলল দক্ষিণে । অদ্ভুত ব্যাপার, এইরকম সময় এইভাবে এরা আশ্রয়বৃক্ষ ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে কোথায়? দূর থেকে দেখা গেল বিশাল এক বুনো হরিণের পাল ছুটে চলেছে দক্ষিণে । 

মালভূমির উপর থেকে এরা এসব দেখে অবাক আর সন্ত্রস্ত । অদ্ভুত সব কান্ড হচ্ছে চারপাশে! এসব কি কোনো মহা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? 

শতরূপ মালভূমির প্রান্তে দাঁড়িয়ে চেয়ে ছিল সূর্যাস্তদিগন্তের দিকে । সূর্য তখন দিগন্তরেখা স্পর্শ করেছে । সে ফিরে তাকাল পূর্বদিগন্তের দিকে । হ্যাঁ, উঠে আসছে পূর্ণচন্দ্র । সেই চাঁদ উজ্জ্বল লাল! একেবারে সেই কিংবদন্তীতে বর্ণিত রক্তবর্ণ চাঁদের মতন । 

ভূমিকম্প শুরু হল । শতরূপ চিৎকার করে সবাইকে মাটিতে শুয়ে পড়তে বলল । ওর বলার দরকার ছিল না, অনেকেই ততক্ষণে উপুড় হয়ে শুয়ে মাটি আকঁড়ে ধরেছে । দূর থেকে প্রচন্ড শব্দ এল, মাটির কাঁপুনি বেড়ে গেল । তারপরে ধুলোর ঝড় শুরু হল, লাল চাঁদ ঢেকে গেল ধুলোমেঘে । 

কতক্ষণ তারা ওভাবে পড়ে ছিল, কতক্ষণ চলেছিল ভূমিকম্প আর ঝড়, কেউই ঠিক করে বলতে পারবে না । একসময়ে ভূমিকম্প থামল, ঝড়ের বেগ কমে এল, তারপরে বৃষ্টি শুরু হল । 

বৃষ্টি যখন থামল, তখন ভোর হচ্ছে । আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল আস্তে আস্তে । মালভূমির উপর থেকে তারা দেখল, একরাত্রের মধ্যে সমস্ত অঞ্চলটি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে । শ্যেনকূট বিস্ফোরিত হয়ে পাতালের জল উঠে এসেছে সেই পথে, বৈশ্রবণা হ্রদ বিশাল বিশালতর হয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে চারপাশের সমস্ত নিম্নভূমি । সবটাই এখন এক বিরাট হ্রদ । 

সেই বিশাল বৈশ্রবণাকে বিদায় জানিয়ে দয়া নদীর স্রোতোধারা অনুসরণ করে এই মানুষের দল এগিয়ে চলল দক্ষিণে, আরো দক্ষিণে । তাদের অগ্রভাগে শতরূপ আর ফুল্লরা । তারা জানে, কোথাও সুন্দর এক দেশ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য । 

স্থির ধৈর্য্যে বৈশ্রবণাও অপেক্ষা করে থাকে, বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখে ডুবে যাওয়া জনপদের চিহ্ন সব । একদিন হয়তো এই চলে যাওয়া মানুষদের সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে আসবে পূর্বজদের জন্মভূমির দিকে । সময়ের ধারা বয়ে চলে, বয়ে চলে, বয়ে চলে..... 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন