রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

গৌতম মিত্রর জার্নাল : প্রস্থানভূমি



আসলে সমস্ত লেখকেরই বোধহয় একটা 'পয়েন্ট অব ডিপার্চার' বা 'প্রস্থানভূমি' থাকে।এই সেই বিন্দু যেখান থেকে শুরু হয় তাঁর উড়ান।এটা একধরণের মোমেন্টাম। লেখকের আজন্ম লালিত বিশ্বাস যাতে ন্যস্ত থাকে।তাঁর যাবতীয় লেখালেখি এই বিন্দুতে এসে পরস্পরের মুখ দেখে।ডানায় শিকড় আর শিকড়ে ডানা যুক্ত হয়।

জেমস জয়েসের যেমন 'এপিফ্যানি'।তিনি ধর্মীয় অনুশাসন না মেনে গির্জার বাইরে শব্দটিকে এনে ব্যবহার করেছেন।এটি এমন এক বিদ্যুৎ-মুহূর্ত বা ক্ষণপ্রভা যখন তুচ্ছ কোনও বিষয় সত্যের আলোকে আলোকিত হয়ে ওঠে।তুচ্ছের মধ্যে মহৎকে সহসা দেখতে পায়।'ইউলিসিস' এই সত্যে উদ্ভাসিত।

লোরকার যেমন 'দুয়েন্দে'! দুয়েন্দে কী? লোরকায় ভাষায়, 'উকার, গুয়াদদলেতে, সীল বা পিথুয়েরগা নদীর মধ্যবর্তী বিস্তৃত পশুচারণ-ক্ষেত্রে যদি কেউ ঘুরে বেড়ায় তাহলে কখনও কখনও তার কানে আসবে, 'এখানে প্রচুর দুয়েন্দে ছড়ানো।' মানুয়েল তোরেস, এক মহান আন্দালুসীয় গায়ক, একবার আরেকজন গাইয়েকে বলেছিলেন, 'তোমার গলা আছে, সৌকর্য আছে, কিন্তু তুমি কখনও সাফল্য পাবে না, কারণ তোমার কোনও দুয়েন্দে নেই।' দুয়েন্দের সংজ্ঞা এইভাবে নির্দেশ করা যায়, 'এমন এক রহস্যময় এষণাশক্তি যা সকলেই অনুভব করে, কিন্তু কোনও দার্শনিকই যা ব্যাখ্যা করেননি।'

ওরহান পামুকের যেমন 'হুজুন'! মধ্যরাতে বাড়ি ফেরা ফেরিওয়ালার হ্যাজাকের আলোকে হুজুন বলেছেন পামুক।এক বিষণ্ন একাকী পাগল পাগল আলো।এই আলোয় পামুক তাঁর শহরের আত্মাকে খুঁজেছেন।তাঁর চরিত্রেরা বড্ড অশরীরী।ছায়া ছায়া।

গার্সিয়া মার্কেজ পরিবারের সঙ্গে প্রথম তুষারপাত দেখতে যাচ্ছিলেন।কীভাবে তাঁর উপন্যাস শুরু করবেন কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।দিশা পাচ্ছিলেন না।পথে যেতে যেতে তাঁর ঠাকুরমার গল্প বলবার স্টাইলের কথা মনে এল।তিনি লাফিয়ে উঠে গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ির পথে চললেন।শুরু হল এক কিংবদন্তি উপন্যাস।এটিই মার্কেজের প্রস্থানভূমি।

ইসাবেল আইয়েন্দে তাঁর 'দ্য হাউজ অব দি স্পিরিট' উপন্যাসটি হয়তো কোনওদিনই লিখতেন না।যদি না হঠাৎ আলোর ঝলাকানি হিসেবে তাঁর ঠাকুমা ঠাকুরদার লেখা চিঠি হাতে পৌঁছত।সারা ঘরময় যেন চিঠিগুলো উড়ে বেড়াতে শুরু করল।

রাইনার মারিয়া রিলকে একটি দোকানের শোকেসে অর্ফিয়ুসরূপী পুতুল দেখে 'সনেটস টু অর্ফিয়ুস' লিখেছিলেন বা দুয়নো দুর্গে বসে 'দুইনো এলিজি' লিখেছিলেন। এখানে স্থান(দুইনো) ও পাত্র (অর্ফিয়ুস) নেহাত তুচ্ছ নয়।যেন সৃষ্টির স্ফুলিঙ্গ।

এরিখ আওয়েরবাখের প্রবাদপ্রতিম বই 'মাইমেসিস'- এর শুরুতে লিখছেন, হোমারের 'ওডিসি'-তে ওডিসিয়াস বহুদিন পর দেশে ফিরছেন আর তার পায়ের জন্মদাগ দেখে পুরনো দাসী ইউরিক্লিয়া তাকে চিনে ফেলছেন।এই 'জন্মদাগ' আওয়েরবাখের মতে 'an independent and exclusive present'! পূর্ণ আলো।

এটা একটা ম্যাজিক।কখন কোথায় কবে কীভাবে একটা লেখা শুরু হবে কেউ আগাম বলতে পারেন না।পরিত্রাণহীনভাবে জাস্ট হয়ে ওঠা।

'একটি মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়'! 

জীবনানন্দ দাশের কাছে তা 'মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা' অথবা 'অপরিহার্য দূরদর্শিতা ও ধীশক্তি'!

জীবনানন্দের ভাষাতেই বলি:

'এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায় নাকো আর'!




ছবি: এস.এইচ.রাজা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন