রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

রঞ্জনা ব্যানার্জী'র দুটি গল্প: অভ্যাস ও শ্যামা


১. অভ্যাস


আমি খেয়াল করিনি, দীপই দেখালো আমাকে---স্বর্ণা!

ফিরছিলাম সীতাকুণ্ড থেকে। চন্দ্রনাথ মন্দিরে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে অতিথি---দীপের জ্যাঠামশাই আর জ্যাঠিমা। কলকাতা থেকে এসেছেন মাতৃভূমি দর্শনে। বাড়বকুণ্ডে এসেই গাড়ির টায়ার বসে গেল। কী ঝক্কি! ড্রাইভার খবর নিয়ে জানালো কাছেই একটা গ্যারেজ আছে। মেকানিকের খোঁজে ওকেই পাঠানো হলো। মাথার ওপর সূর্য---গরমে সেদ্ধ হওয়ার চেয়ে সামনে কোনো দোকানে গিয়ে বসলেই হয়! দীপকে গাড়ির পাহারায় রেখে আমি জ্যাঠামশাই, জ্যাঠিমাকে নিয়ে এগোলাম। 
একটু হাঁটতেই এই চায়ের স্টল। গাছের ছায়ায়, কাঠের বেঞ্চে বসে গরমাগরম ডালপুরি আর চা খাচ্ছিলাম। একটু পরে দীপও যোগ দিলো। মেকানিক পাওয়া গেছে, কাজ চলছে। 

ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়ে---হুশহাশ গাড়ি দু’দিকেই। 

একটা সাদা 'করোলা' এসে থামলো আমাদের সামনে। ড্রাইভারের দিকের কাচ নামিয়ে শুদ্ধ বাংলায় তরুণী জলের বোতল চাইলো। তখনই দীপের গুঁতো। আমার পুরো মনোযোগ প্লেটের ডালপুরিতে; মাথা তুলতেই দেখি 'সে'! দোকানি ছেলেটার কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে বোতল নিচ্ছে আর তক্ষুণি আমাদের চোখাচোখি। ভূত দেখলো যেন, ‘আপা, আপনি!' গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে কিছু বললো সহযাত্রীকে। দরজা খুলে বেরুলেন তিনিও। ভদ্রলোকের হাতে সাদা ছড়ি। বিদেশি---কালো চশমায় চোখ ঢাকা। ‘আমার স্বামী---স্টেফেন।' ভদ্রলোক হাত তুললেন। আমি তখনও পাথর। কত খুঁজেছি... পুলিশে ডায়েরি করা হয়েছিল! তিন বছর আগের কথা অথচ মনে হয় এই তো সেদিন!

আট বছর আগে ও 'ছুটা বুয়া' হিসেবে ঢুকেছিল আমার বাড়িতে---ওর মায়ের জায়গায়। 'আমেনা বুয়া' ওর মা, আমাদের বিল্ডিংয়ের পাঁচ ফ্ল্যাটের ঠিকে ঝি। সবাই আমেনাকে ভালোবাসতাম। চুকলি করতো না। কাজে ফাঁকি দিতো না। হঠাৎ 'পেটে ব্যাদনা' নিয়ে ভর্তি হলো হাসপাতালে---গলব্লাডারে পাথর। সবাই সাহায্য করলাম; কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আমেনা বুয়া আর কাজে ফিরলো না। বদলি হিসেবে দিয়ে গেল মেয়েকে। 

রোগা লিকলিকে, বয়স টেনেটুনে ষোলো কি সতেরো---এক বাচ্চার মা। ফ্ল্যাটের অন্যেরা খুব একটা ভরসা পেল না, যে যার মতো ব্যবস্থা করে নিলো। আমার তখন দিশেহারা অবস্থা। রাতদিনের কাজের মেয়েটা সাতদিনের জন্যে বাড়ি গিয়ে আর ফেরেনি! ৯টা-৫টা'র চাকরি আমার। শাশুড়ি আছেন, কিন্তু সকালে সব গোছগাছ করে বেরুতে আমার দম বেরিয়ে যায়। ফিরতে একটু দেরি হলেই শাশুড়ির মুখ আঁধার। দীপ একটা শিপিং কোম্পানিতে কাজ করে। বাড়ি ফিরেই ঘর অন্ধকার করে টিভি চালিয়ে হুইস্কি নিয়ে বসে; কুটোটি নাড়ে না। কুট্টুসের তখন তিন চলছে। অসম্ভব চঞ্চল। পনেরো দিনের মাথায় স্বর্ণার কাজ দেখে আমি মুগ্ধ; টাকা বাড়িয়ে কাজের সময় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা করে নিলাম। একটানা পাঁচ বছর ছিল। কুট্টুসকে স্কুলবাসে তুলে দেওয়া, বাড়ি আনা থেকে শুরু করে ঘর সামলানো, ছোটখাটো বাজার-সদাই, কাপড়কাচা---সবই করতো। কেবল রান্নাটা আমি। কুট্টুসকে দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে সেলাই নিয়ে বসতো, অর্ডারি কাজ। বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু সেদিন কী যে হলো! 

তিন দিনের কনফারেন্সে ঢাকা যাব, সকালে ট্রেন। স্বর্ণার দেখা নেই। এমন তো করে না কখনও! হয়তো বাচ্চার অসুখ। গজগজ করতে করতে কুট্টুসকে দীপ বাসে তুলে দিয়ে এলো। কিন্তু আনবে কে? আমার শাশুড়ি বাতের ব্যথায় কাহিল। দীপকে কামাই দিতেই হলো। ঢাকায় নেমেই ব্যস্ত হয়ে গেলাম কনফারেন্সে। রাতে হোটেলে ফিরেই শুনি রহিম মিয়া মানে স্বর্ণার বর, স্বর্ণার খোঁজে বাড়ি এসেছিল। কী ঝামেলা! তিন দিন নয়, দু’দিনের মাথাতেই ফিরতে হলো। তারপর থানা-পুলিশ, রাজ্যের অশান্তি। 

স্বর্ণাকে আর পাওয়া গেল না। 

কুট্টুস সেভেনে! ছবি দেখাই ফোনে। ওর চোখ ছলছল। প্রচণ্ড কৌতূহল সত্ত্বেও আমার কিছুই জানা হয় না। যাওয়ার সময় সেধে আমার মোবাইল নম্বর সেভ করে ও। 

চাকা ঠিক করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমাদের প্রায় মাঝরাত। 

লম্বা দিন গেল একটা! সারা রাস্তা ভেবেছি স্বর্ণাকে। ফ্রেশ হয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখি দীপ ওর হুইস্কি সাজাচ্ছে। এসএমএসটা আসে তখনই : রহিম মিয়াকে স্টেফেন দোকান করে দিয়েছে; নতুন বৌ-বাচ্চা নিয়ে সে ভালোই আছে। ছেলেটা কক্সবাজারে ওর সঙ্গেই থাকে; স্টেফেন দত্তক নিয়েছে।

স্টেফেনের সঙ্গে পরিচয় 'সেলাইদিদি'র বাড়িতেই। রহিম মিয়ার কাছে ও ডালভাতের মতোই একটা অভ্যাস ছিল। প্রতি রাতে মদ খেয়ে গায়ে হাত তুলতো, তারপর সেই শরীর নিয়ম করে ভোগ করতো। স্টেফেন ওকে ভালোবাসে, মানুষ ভাবে।


টেলিভিশন চলছে---নীলচে আলোয় দীপকে ভীষণ অচেনা লাগছে। বরফের উপর সোনালি হুইস্কি আওয়াজ তোলে! একটু পরেই অভ্যাস মতো আমাকে নয় আমার শরীর খুঁজবে ও...



২.

শ্যামা     


ড্রইংরুমের মেঝেতে উবু হয়ে বসে বমি করছে শ্যামাচরণ। বাবুয়া কিংবা ম্যাডাম কিছু বলছে---খুব সম্ভব আকরামকে ডাকছে। শ্যামার কানে যাচ্ছে না। ওর পৃথিবীটা দুলছে অবিরাম। এত দিনের চুপকথারা বোলতা হয়ে হুল ফোটাচ্ছে।

সেই কবে মাইটানা বয়সে মায়ের কোলে চড়ে ঢুকেছিল এ বাড়িতে! বড় বড় চোখের শ্যামাকে সবার তখন কৃষ্ণঠাকুরের মতোই লাগতো। একটু বড় হতেই কৃষ্ণতে রাধার খোঁজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবং ওর জীবনটাও পাল্টাতে শুরু করেছিল। 

বিশ মিনিট আগেও আজকের দিনটা রোজকার দিনের মতোই ছিল। রান্নাঘরে বাবুয়া আর বাবুয়ার সেই বন্ধুর জন্য পাকোড়া ভাজছিল শ্যামাচরণ। তারও আগে স্নান-সন্ধ্যা সেরে দোতলায় গৃহলক্ষ্মীকে ফুল দিতে গেলে ম্যাডাম জানিয়েছিল বুয়ার জ্বর। বুয়া না-এলে সকালের ব্রেকফাস্ট বানানোর ভার শ্যামাচরণের। দুপুর-রাতের রান্না করে মিনতির মা। সে আসবে আরও বেলা করে। বাবুয়া অফিস যাবে। টোস্ট আর অমলেট টেবিলে লাগাতে হবে পনেরো মিনিটের মধ্যে। মনে মনে বুয়াকে শক্ত গাল পেড়েছিল শ্যামাচরণ। কাল ছাদের কোণে আকরামের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করছিল আর আজ জ্বর!

ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলেই জামা পাল্টাতে এসেছিল নিজের ঘরে। গেটের আওয়াজে জানালার কাছে উঁকি দিয়েছিল; আকরাম কথা বলছে কারো সঙ্গে---চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। ওপরের টিভিতে তখন কেউ গাইছিল, 'অপার হয়ে বসে আছি...।' মিনিটখানিক পরেই জানালাজুড়ে আকরামের মুখ, 'ম্যাডাম ডাকে।' তারপরই, 'সাঁইয়া দিল মে আনা রে, আ কি ফির না যা না রে...' গাইতে গাইতে চোখ টিপেছিল। 'শুয়োর!' মনে মনে খিস্তি করেছিল শ্যামা।

রান্নাঘরে ঢুকেই জেনেছিল অতিথি দুপুরে খেয়ে যাবেন। পাবদা মাছ আর খাসির মাংস ফ্রিজ থেকে বার করতে করতে ম্যাডাম বললেন, 'টোস্ট, অমলেট দাদার বন্ধুর জন্যেও ক’রো, সাথে কটা ফুলকপির পাকোড়া ভেজে দিও।' এই সক্কালে পাকোড়া! বিরক্ত হলেও মুখ সোজা করে পেঁয়াজ কাটছিল শ্যামাচরণ! 'টেবিলে দিও না, ট্রলিতে সাজিয়ে ড্রইংরুমে নিয়ে এসো', বলতে বলতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ম্যাডাম। 

মিনিট কুড়ি পরে ট্রলি ঠেলে ড্রইংরুমে পা দিতেই, 'পল্লব, চিনেছিস?' নামটা শুনেই শ্যামাচরণ শক্ত হয়ে গিয়েছিল। 

'ও মাই গড! হি ইজ স্টিল হিয়ার...', এরপর ঘর কাঁপিয়ে সে কী হাসি!

শ্যামাচরণের চোখের সামনে জেগে উঠেছিল পনের বছর আগের সেই দুপুর! বৌদিমণি আর দাদা পিকনিকে---কক্সবাজারে। ঘরভর্তি বন্ধু নিয়ে এসেছিল বাবুয়া। শ্যামাচরণকে হঠাৎ তলব। ঘরে ঢুকতেই আট-ন'জন মিলে চেপে ধরেছিল। পল্লব সবার আগে চড়েছিল, 'কাম অন, শ্যামা কাকা; বি এ স্পোর্ট!' শ্যামাচরণ অবাক হয়ে দেখছিল বাবুয়াকে। এই বাবুয়াকে পিঠে নিয়ে কতবার ঘোড়া হয়ে হাঁটুর চামড়া খসিয়েছে শ্যামা! হাতের উপর লাটিম ঘোরানোর কায়দা শেখাতে দুপুর পার করেছে। রামায়ণের গল্প শুনিয়েছে সিঁড়িঘরে ওর ছোট খাটটাতে বসে। সেই বাবুয়া নির্বিকারে ভিডিও করছে ওর বন্ধুদের কামক্রিয়া! সাত দিন অসহ্য যন্ত্রণায় শ্যামাচরণ তলিয়েছে, জেগেছে। বাবুয়া পালিয়েছিল বন্ধুর বাড়িতে। সাত দিন পরে চোখ খুলে দেখে বৌদিমণি হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে, 'মাফ করে দে, শ্যামা!' চোখ ভরে গিয়েছিল জলে। 'ছি ছি! বৌদিমণি...' বাবুয়ার বাবা থোক টাকা দিয়ে হুকুম করেছিলেন, 'খবরদার কাউকে বলবি না।' ঠিক বড়বাবুর মতো! ন’বছর বয়েসে বড়বাবু এক টাকা পঁচিশ পয়সায় কিনেছিলেন চুপকথা আর চব্বিশে তাঁর ছেলে নোটের বান্ডিলে। বাবুয়াকে দার্জিলিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 

দু’হাতে মাথা চেপে মেঝেতে ধপ্‌ করে বসে পড়ে শ্যামা।পৃথিবী দুলছে। বুড়ো বড়বাবুর ডাক কানের ভেতরে আছড়ে পড়ছে, 'শ্যামা, কোমরটা একটু মেজে দিয়ে যা তো।'

উঠোনে মার্বেল ছড়িয়ে একা একাই খেলছিল ন’বছরের শ্যামা। ভরদুপুর। সারা বাড়ি ঝিমিয়ে ; কেবল বড়বাবু বারান্দায় গড়গড়া টানছেন। মার্বেল ঠুকে গর্তে ফেলে একা একাই উল্লাসে মাতছিল শ্যামা। হঠাৎ ডাক! কোমর থেকে ক্রমশ কুঁচকির কাছে তারপর আরও গহীনে বড়বাবু নিজেই হাতে হাত রেখে ওকে গলি ঘুপচিতে ঘোরাচ্ছিলেন। ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মিনিট পনেরো পরে যখন ছাড়লেন, এক টাকা পঁচিশ পয়সা গুঁজে দিয়েছিলেন হাতে, 'খবরদার! কাউকে বলবি না।' এক টাকা পঁচিশ পয়সা! গলির মোড়ে খয়েরি হিমহিম কাঠিতে গাঁথা আইসক্রিম! মুখে পুরলেই স্বর্গ! কাউকে বলেনি শ্যামা।

বৌদিমণি ক্যান্সারে ভুগে দেহ রাখলেন। আর বাবুয়ার বাবা হঠাৎ এক ভোরে বুকে ব্যথা নিয়ে চলে গেলেন ওপারে। বাবাকে পুড়িয়ে শ্মশান থেকে ফিরে বাবুয়া শ্যামাচরণের কাঁধে মাথা রেখে বুক ভেঙে কেঁদেছিল। আর সেই কান্নার জলে বাবুয়ার ওপর থেকে সব ক্ষোভ ধুয়ে গিয়েছিল শ্যামার।

ম্যাডামের সাত মাস চলছে। দু’মাস পরেই নতুন মালিক আসবে পৃথিবীতে। পেট ঘেঁটে সব বেরিয়ে আসে শ্যামার। ম্যাডাম আঁতকে ওঠেন 'ডিসগাস্টিং'! 

শ্যামাচরণ উবু হয়ে বমি করতেই থাকে... 


                                   


লেখক পরিচিতি:
রঞ্জনা ব্যানার্জী
গল্পকার। অনুবাদক। 
কানাডাতে থাকেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. কী অদ্ভুত জীবন মানুষের! ১ নম্বরটা পড়লাম এখন। ভাললাগাটুকু থাকুক, ২ পরে পড়বো...

    উত্তর দিনমুছুন