রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

ময়ূরী মিত্র'র তিনটি গল্প : মাগো--বিন্দু হয়ে রব, দস্যু একটা এবং অগ্নিকুণ্ডে সখা যাস না

 

১.  মাগো --বিন্দু হয়ে রব 


তখনো পাকেনি মন | ঘুনপোকা ঘাঁটেনি মগজ | তখনো দুঃখ জমলে আকুল হই | রাগ উথললে ঝোড়ো হওয়ার মতো বয়ে চলি | শনশন | মোটকথা দুখে সুখে সুশীতল মার্জিত থাকাটা তখনো শেখা হয়নি আমার | তো এমনই জমাট সবুজ এক মন নিয়ে গিয়েছিলাম বাচ্চা ছেলেটার মুখেভাতে |

যতদূর মনে পড়ে বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে এসেছি তখন | কোনোকালে যে আর ছেলেপিলে হবে না আমার এ বুঝেছি | বিশ্বাস করো আর না করো ---- এই না হওয়া নিয়ে কখনো মুখ কালো করতাম না আমি | বাড়তি কোনো অভাব দিয়ে অহরহ খুঁচিয়ে মারতাম না নিজেকে | সবসময় বিশ্বাস করতাম আমার থিয়েটার , আমার ভুবনভরা শিশুর দল অনন্তকাল পূর্ণ রাখবে আমায় | সেসময় আত্মীয় বন্ধুর ছেলেপিলে হলে বড় আনন্দ হতো আমার | আনন্দ করেই দেখতাম পড়শিবাড়ির দেবশিশুদের | তেমন করেই গিয়েছিলাম আমার এক আত্মীয়ের ছেলের অন্নপ্রাশনে | উপহার একটি পৃথিবী আকারের লাল টুকটুকে বল | মানে ওপরে নিচে চ্যাপ্টা গোল বল। অদ্ভুত আকার দেখেই কিনেছিলাম বাচ্চাটার জন্য | হয়ত আগামী দিনে পৃথিবীকে বোঝবার সুবিধে করে দেয়ার জন্য | শিশুকে সর্বদা যে নিপুণ কিছুই দেখাতে হবে তার কী মানে ! বরং খুঁতো জিনিষ দিয়ে শিশুর নিখুঁতকে বানানোর ক্ষমতাও ত বাড়ানো যায় | আর সত্যিই তো , পৃথিবী নিখুঁত কিছু নয় | আকারেও নয় | গুণাগুণে ত নয়ই | বাচ্চাদের নিয়ে চিরকালই বড্ড ভাবি আমি | ভালো লাগে |
●● , যুক্তি আমার যাই হোক সেদিন ওই চ্যাপ্টা বল
পেয়ে নেমন্তন্ন বাড়ির গরবিনী পুত্রবতীর প্রথম কথা ---" দুদিক চ্যাপ্টা হয়ে গ্যাছে এরকম বল আনলি ক্যানো ? ওহ !ছেলেপুলেদের বল পুরো গোল হয় জানবিই বা কী করে তুই ! " ---. দাঁত বের করে সামলে যাচ্ছি ভেতরটাকে ! বারবার ভাবছি ---না না ও নিশ্চয়ই "এটা '"ভেবে "ওটা " বলেনি | হাসি
দেখে ছেলের মার সংশয় আরো বাড়ল |---" এতো হাসছিস ক্যানো ? হেসেখেলে থিয়েটারে লাফিয়ে কতটুকু আনন্দ পাবি ? পেলেও সে আনন্দ চিরকাল রয়ে যাবে তোর ? ওরে তার চেয়ে বরং একটা অনাথ শিশু টিসু দ্যাখ না পাস কিনা | শিশু বুঝি টিস্যু পেপার | মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার জন্যই যেন তার দরকার | বোঝাতেই পারিনি আজো --- শিশু কেবল মায়ের নয় --সে তার নিজের --সে মহান এক বিশ্বের| 

সেদিন সে মুখেভাতের অন্ন বিলোনো মায়ের কথায় এই প্রথমবার একটি সামান্য বস্তু নিজের করে না পাওয়ার জ্বালায় ভেতরটা পুড়ে ফেটে লাগলো আমার | সামান্য দূর থেকে বিষচোখে মাপতে লাগলাম আমারই কোনো এক আত্মজনের পুত্রসুখ !ভুলে গেলাম একটু আগেই আমার ভুলভাল বলটা পেয়ে কেমন হাসছিল বাচ্চাটা | সব ভুলে কেবল মনে মনে প্রমাণ করতে লাগলাম নিজেকে নিজের কাছে | কী বলেছিলাম সেদিন মনে মনে ? হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে আমার স্পষ্ট | আমি বলতে চাইছিলাম ----
" এই দ্যাখ হতচ্ছাড়া মা | আমি তোর থেকেও ভালো আছি রে শালা ! বাচ্চা পয়দা করে কী এমন বড় কাজ করেছিস রে তুই ? " 

--- ফুলমালায় সাজানো সেদিনের সেই শিশুটির সামনেই ক্রমশই একটি নোংরা কুচুটে বুড়ি হয়ে যাচ্ছিলাম | বেঁকে চুরচুর এক ক্লিষ্ট | সেই প্রথম ও শেষবার একটি জিরোন কান্না চেয়েছিলাম আমি | জিরোন কান্না ! নিজেকে ফুরসত দেবার কান্না | পরিষ্কার ঝরঝরে হয়ে যাবার ফুরসত | মনে হয়েছিল --পাপচিন্তা করে সদ্য অন্ন খাওয়া শিশুকে অপমান করলাম আমি ? এখুনি যে দরকার কান্নাটার | 

পরদিন থিয়েটারের শো বাদা অঞ্চলে | সাথীদের চোখ এড়িয়ে ঝোপঝাড়ে ভরা মাঠে ঠ্যাং ছড়িয়ে কাঁদছিলাম | গনগনে হচ্ছিলাম ক্রমশ | যৌবনে বুঝি মনের সবুজ দানার সাথে সাথে ভিজে ভাবটাও বেশি জমে | কাঁদতে কাঁদতেই দেখলাম মাঠ দিয়ে আসছে গাঁয়ের দুই বয়স্ক মুসলিম রমণী | অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ---" একা একা ঘাসে মুখ ডুবিয়ে কাঁদ কেন মা ?" 

গলগল করে বললাম | বলে দিলাম আমার সবটা | সবটা | আমাকে প্রায় কোলে টেনে নিয়ে দুপাশে বসলেন আমার দুই বুড়িমা | বিশাল কিছু বলেননি তাঁরা | ধাক্কা মেরে বলেননি -- কত বড় অসাম্প্রদায়িক তাঁরা | আমার কপালের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে আর ঠিক আমারই মতো করে কাঁদতে কাঁদতে কেবল বলেছিলেন --"আল্লা যখন একা করেছেন তোমায়,একা একা সুখ পাবার কায়দাটাও শিখিয়ে দেবেন তিনি | নিশ্চয় দেবেন | " 

জুড়োলাম আমি | ধন্য হলো আমার গোটা জীবন ! আহাহা ! আমার এমন হিরেমুক্তয় গাঁথা দেশবাসী | তাঁদেরই কিনা দেশনেতারা ভিড়িয়ে দিলেন মারদাঙ্গায় | ভূমির জন্য আজ গড়াগড়ি | 

দেশমাতা কেঁদে বলে ধিক | শতধিক ! 
আমার মুক্তামালা গেল ছিঁড়ে | 
......................................................................................................................................

২.   দস্যু একটা 


একইরকম ভাবে বইতে থাকা দিন | চলছে তো চলছেই | এর মধ্যে একআধটা দিন যদি এদিকওদিক হয়ে যায়, বেশ লাগে আমার | এমন নয় যে adventure খুব পছন্দ করি আমি | কিন্ত ছুটে আসা দমকা বাতাসের জন্য লোভী হয়ে ওঠাটাকে কিছুতে ধামাচাপা দিতে পারি না | 

সেবার মোটরপথে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাচ্ছি | ডিসেম্বরের শেষে মেঘ বৃষ্টি সমান বাঁদরামি লাগিয়েছে | খবর এলো রাস্তা জুড়ে ধস নেমেছে | গাড়িঘোড়া বন্ধ | শিলিগুড়ির মানুষ বললেন, " আজ যেও না | কাল মেঘ কাটুক | রোদ উঠলে রওনা দিও | " 

দার্জিলিং যে বিশেষ পছন্দের এমন নয় | তবু সেদিন বৃষ্টিপথে পাহাড় পেরোতে বড় মন করলো | উস্কে দিলো পাহাড়ি ড্রাইভার | হাড় মাংস কোনোটাই তার ঠিকঠাক পরিমানে নয় | হাঁটছিল , চলছিল ----মনে হচ্ছিল ক্ষিপ্র বাতাস হুটপাটিয়ে মরছে | তার মজাটে চোখ বিব্রত করছিল আমায় | ভয় পেতে দেখে ফিচেল হাসির মাত্রা বাড়িয়ে বললে , ' যাবেন তো চলুন ---একটা টায়ার এক্সট্রা নিয়ে নি |" 

একটি টায়ার দিয়েই ধস টপকাবে বখাটেটা | যাচ্ছি বর্ষার মাঝ দিয়ে | খানিক পথ পেরোতে আঁধার ছাইল | পাল্লা দিয়ে বৃষ্টিস্রোত | বৃষ্টিঢেউয়ে গাড়ির ভেতরবার , সামনেপিছে একাকার | ----" আরে ওই ছেলে ! পৌঁছোবো কী ভাবে? কাল ফিরবই বা কোন পথে ? " ছেলেটা সান্ত্বনা দিলো ঠিক তার মত করেই | ---" ধরুন , দুটোর কোনোটাই না হতে পারে | কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়িটা গড়িয়ে যেতে পারে খাদে | আর সেই চান্সটাই ষোলআনা | " 

--- " কী মুশকিল ! পৌঁছে দিতে পারবে না তো বলোনি কেন আমায় ? " -----" ওহ !
ম্যাডাম! পৌঁছে দেব তা তো বলিনি ! বলেছি যেতে পারব আপনাকে নিয়ে | এহে হে হে ! ঠান্ডায় ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে তো আপনার ! ব্যাগে ক্রিম আর মেয়ে- আয়না নেই ? বার করে আয়না মিলিয়ে ঠোঁটে ক্রিম লাগান চট করে !" 

ঠাস করে দেবো একটা ? যত ভাবছি ততই ভিজছি | অন্যমনস্কতায় বারিষ ঢুকছে শরীরের গলিতে | ----" হাঁ হয়ে গেলেন যে ! না থাকে তো লিপস্টিক লাগিয়ে নিন না খানিকটা | নাহলে ঠোঁট খুলে হাতে চলে আসবে | আর যাচ্ছেন বেড়াতে ---লিপস্টিক লাগাননিই বা কেন ? লাগান লাগান ! লালে বেশ খুলবে আপনার ঠোঁট ! " 

----" শালা ! হতচ্ছাড়া মাতাল ! এই জমাট আঁধারে লিপস্টিক মনে এল তোর ? " ---থামা নেই তার | ----" কেন ? এখনো তো গাড়ি চলছে---বেঁচেও আছেন ! ঠোঁট রাঙাতে কি আপত্তি !" 

সেযাত্রায় দার্জিলিং যেতে পারিনি | কার্শিয়াং -এর একটি হোটেলে আটকে ছিলাম সারারাত | ঘর থেকে দেখছিলাম --শিলাবর্ষার মাঝে উন্মাদ নাচ নাচছে ফাজিল দস্যু | আর লেপের নরম তাপে আমার জেগেছিল ভয় ---কাল যদি সূর্য উঠে পড়ে ? নিরাপদ প্রকৃতিতে যদি মনে মরে যায় ছেলেটা ! ওহ ! কাল সকাল ! তখন তো আমার ঠোঁটের ষাঁড়রক্ত লিপস্টিকও ফ্যাকশে | ফিরেও তো চাইবে না পাহাড়ের যুবক! জীবনের রস রসাতলে যাবে জীবনের তাপে ? বাহারি ঠোঁটে ধরবে শত ফাটল !


..................................................................................................................................................
৩. অগ্নিকুণ্ডে সখা 
যাস না 


সেবার খুব ভোরে গড়িয়াহাটে সুন্দরম থিয়েটার দলে রিহার্সালে যেতে হয়েছিল | এতো ভোরে মেট্রো পাবো না জেনে ট্রেন ধরলাম | শিয়ালদায় নেমে আবার ট্রেন বদলে বালীগঞ্জ নামবো এই প্ল্যান | শিয়ালদহ থেকে আমার সাথে ট্রেনে উঠলেন এক গায়ক | দেখলাম গায়ক বেশ গুছোনো মানুষ | নিজেই বক্স ফিট করেছেন কামরায় | নিজের মনপসন্দ জায়গায় | নিজের শিল্প পরিবেশনের ক্ষেত্র বাছায় শিল্পীর চোখে যেমন একটি পূর্ণ হাসি ফোটে , বিশ্বাস উজ্জ্বল হয় ---ওমন চোখই দেখেছিলাম তাঁর বক্স ফিটিংয়ের সময়| 

দেখলাম গান গেয়ে যাত্রীদের থেকে পয়সা নেয়ায় তাঁর যত না ঝোঁক তার থেকেও অনেক বেশি মন দিয়েছেন গানটা সঠিক ও সুন্দর করে গাওয়ায় | খুব নিষ্ঠা নিয়ে চোখ বুঁজে রবীন্দ্রসঙ্গীতের শব্দগুলোর উচ্চারণ ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন | পারছেন না , তাও কী চেষ্টাটাই না করছেন ঐটুকু সময়ের মধ্যে| 

এরপর শ্যামাসঙ্গীত | মুখে চোখে ভক্তি ভাব তখন প্রবল গায়কের | ট্রেন ছুটছে পার্কসার্কাসের খ্রিস্টান কবরখানার পাশ দিয়ে | ওমা দেখি কি , মুখের শ্যামাভক্তি অবিকল রেখে একটি নির্ভুল খ্রিস্টানি প্রণাম সেরে নিচ্ছেন গায়ক | ঐ যেমন করে ওরা বুকের কাছে ক্ৰশ আঁকে , ওরকম | মুখে কালী --প্রণাম ভুবনসখা খ্রিস্টকে | বুঝলাম --- উদ্দেশ্য বোধহয় দেশের সব বন্ধুর শান্তি কামনা | মানুষের নির্ভেজাল ভালো চাইছেন এক ভিখারী গায়ক | 

ক্রস আঁকা সেরে দুইগুন মন নিয়ে ফিরলেন কালীর গানে --শ্যামা মা কি আমার কালো | জানলেনও না এই ছোট্ট যাত্রাপথে চট করে কত্ত বড় কাজটি তিনি করে ফেললেন | শুধু আমি নই , ট্রেনের অনেক মানুষই সেদিন অবাক হয়ে দেখেছিলেন এক গরিবের এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে অনায়াস ভ্রমণ | শুদ্ধতা মানুষ স্পষ্ট টের পায় --- তাই দ্রুত পাশ কাটাতেও চায় | প্রসঙ্গ ছাড়া হয়ে যাচ্ছি কি ? দৌড়ে চলা যানে মানুষ যেমন তাঁকে না দেখে পারছিলেন না তেমনি বেশিক্ষণ তাকাতেও চাইছিলেন না | হা হা হা |

গায়কের সেদিন মনের ভ্রমণ --- কখনো গান গাইতে গাইতে কখনো বা দুহাতে গাওয়া গানের মজুরি ধরে| যে কোনো একটি মানুষকে -- জীবিত বা মৃত অবস্থায় ভালোবেসে চলার এই না লেখা ধর্ম আমাদের দেশের সাধারন মানুষের হাড়েমাসে |

ভয় হয় | বড় ভয় হয় আজকাল | জাত ধর্মে অন্ধত্ব বা ঔদার্য প্রমাণে অহরহ ব্যস্ত দেশনেতারা সাধারণের স্বাভাবিককে না স্বমূলে ছিঁড়ে ফেলে | গা গা আরো গেয়ে চল ! এক মনে গা ব্রহ্মখৃষ্টের গান | ছুটুক ট্রেন | ছড়াক লালন | যে বলবে থামতে তারে পাঠা রসাতলে ! নরকের আগুনে আজি টাটকা শালুকফুল |



লেখক পরিচিতি
ডঃ ময়ূরী মিত্র
কলকাতায় থাকেন।
অভিনেত্রী। গল্পকার। 

৩টি মন্তব্য:

  1. তিন গল্পই অসাধারণ। ময়ূরীদেবীর ভাবনা চিন্তা কে কুর্নিশ করি ।তার অভিজ্ঞতা থেকে কলমে বেরিয়ে আসে কুচোনিমকির মতো কুচো গল্প। পড়লে মনটা ভরে যায়।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. প্রথম গল্প পড়েই চোখ ভরে গেল পানিতে...বড়ো মনোরম

    উত্তর দিনমুছুন