রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

আর্ট অফ ফিকশন : ওরহান পামুকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

কল্পকাহিনির শিল্পশৈলী 
‘আর্ট অফ ফিকশন’ শিরোনামে আনজেল গারইয়া কুইনতানা’র সঙ্গে আলাপচারিতা 
প্যারিস রিভিউ পত্রিকা, সংখ্যা–১৭৫, হিমঋতু-২০০৫ 

অনুবাদঃ সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত 


ওরহান পামুকের জন্ম ১৯৫২ সালে ইস্তানবুলে, সেখানেই জীবনের দীর্ঘকাল অতিবাহিত। বর্ধিষ্ণু পরিবারের ছেলে তিনি। পারিবারিক ব্যবসা ছিল রেলপথ নির্মাণ, যার সূত্রপাত গণতান্ত্রিক-তুরস্ক গঠনের শুরুতে। পামুক পড়তেন ইস্তানবুলের রবার্ট কলেজে, যেখানে অভিজাত পরিবারের সন্তানেরা মূলত অসাম্প্রদায়িক এবং পাশ্চাত্য-ধারায় পড়াশোনা করতেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতে ছিল পামুকের চিত্রকলায় আগ্রহ, স্থাপত্যবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা করতে কলেজে ভর্তি হবার পর তিনি লেখালেখির জগতে মনোনিবেশ করেন, এবং বর্তমানে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত ও সবচাইতে জনপ্রিয় লেখক। 

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কেভদৎ বে অ্যান্ড হিজ সনস’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। এরপর ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হল ‘দ্য সাইলেন্ট হাউজ’। ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’ ১৯৮৫ সালে (ইংরিজি অনুবাদ ১৯৯১), ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ ১৯৯০ সালে (ইংরিজি অনুবাদ ১৯৯৪ সাল), ‘দ্য নিউ লাইফ’ ১৯৯৪ সালে (ইংরিজি অনুবাদ ১৯৯৭ সাল)। আন্তর্জাতিক আই-এম-পি-এ-সি ডাবলিন লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন ২০০৩ সালে মাই নেম ইজ রেড, ১৯৯৮ (ইংরিজি অনুবাদ ২০০১) উপন্যাসের জন্য। উপন্যাসটি রচিত ষোড়শ শতাব্দীর ইস্তানবুলের একটি হত্যা-রহস্যকে কেন্দ্র করে, যা বিভিন্ন সময়ে বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন বক্তার মুখে। উপন্যাসটিতে রয়েছে বিবিধ মাত্রার অন্বেষণ। একদিকে রয়েছে গণতান্ত্রিক-তুরস্ক, আন্তর্জাতিক মানচিত্রে যে দেশটির অবস্থান প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সম্মিলনে, সেই দেশের সার্বিক ও ঐতিহাসিক পরিচিতি, আভ্যন্তরীণ ঘোরপ্যাঁচ, অন্যদিকে ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি, দ্বৈতসত্তা ---তার প্রভাব ও সৌন্দর্য, মৌলিকতার কদর, সঙ্গে সংস্কৃতির মূলধারায় বাইরেকার কুপ্রভাবের আশংকা। ‘স্নো’, ২০০২ থেকে ২০০৪, উপন্যাসটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিচারধারার সংস্কারের পথে আলোকপাত করে লেখা। এটি সেই উপন্যাস, যেখানে তিনি প্রথমবার তুরস্কের সমসাময়িক চরমপন্থি রাজনীতিকে খোলাখুলি মেলে ধরেছেন। এই উপন্যাসের কারণে তাঁকে দেশত্যাগ করতে হয়। এমন কি নিজের পরিবারেও তাঁকে নানান মতবিরোধের সম্মুখিন হতে হয়। পামুকের সাম্প্রতিক লেখাগুলোর মধ্যে ‘ইস্তানবুলঃ মেমোয়রস অ্যান্ড দ্য সিটি’, ২০০৩ থেকে ২০০৫, তাঁর জীবনের বিশিষ্ট দুটি অধ্যায়, শৈশব ও যৌবনকালের ইস্তানবুল শহরের দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে লেখা। 

লন্ডনে নেওয়া ওরহান পামুকের এই আলাপচারিতা দুটো মুখোমুখি-বিভাগ আর কিছু চিঠিপত্রের আদানপ্রদানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ করা হয়েছে। প্রথম মুখোমুখি ২০০৪ সালের মে মাসে, যখন ‘স্নো’ উপন্যাসটি ব্রিটেনে প্রকাশিত হয়েছে সদ্য। হোটেলের এক খাস-ঘর বুক করা হয়েছিল। ফ্লুওরসেন্ট আলোয় সজ্জিত, ঘড়ঘড় আওয়াজ করা এ-সি মেশিন লাগানো একটা কর্পোরেট স্পেসে অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। একটু পর পামুক এলেন নীল শার্টের ওপর কালো কর্ডের জ্যাকেট আর কালো স্ল্যাক্স পরে। এসেই চারদিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এখানে আমরা মরে গেলেও কেউ খুঁজে পাবে না।‘ পরে সেই ঘর ছেড়ে হোটেলের লবিতে অতি আরামদায়ক নিভৃত একটি কোণ খুঁজে নিয়ে বসা হয়। তিন ঘন্টা একনাগাড়ে কথা চলে আমাদের, শুধু মাঝে কফি আর চিকেন স্যান্ডউইচ খাওয়ার বিরতিটুকু বাদ দিলে। 

২০০৫ সালে পামুক লন্ডনে আসেন তাঁর ‘ইস্তানবুল’ প্রকাশনার কারণে, সেবারও একই হোটেলের লবির অতি পরিচিত সেই কোণে আমরা ঘণ্টা দুয়েকের জন্য মুখোমুখি বসি। প্রথমদিকে তাঁকে তেমন আন্তরিক বলে মনে হচ্ছিল না, যদিও তার কারণ ছিল যথেষ্টই। দু’মাস আগে সুইস-পত্রিকা ‘ডের টাগর আনৎসাইগার’-এ তিনি তুরস্ক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘তিরিশ হাজার কুর্দ আর এক মিলিয়ন আর্মেনিয়ান নিহত হল, কিন্তু আমি ছাড়া এ বিষয়ে আর কারও কোনও বক্তব্য নেই।‘ পামুকের মন্তব্যের দরুন তুরস্কের জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমে অবিরাম তাঁর নামে বিরুদ্ধপ্রচার শুরু হয়। সর্বোপরি তুরস্ক-সরকার ১৯১৫ সালে দেশের ভেতর ঘটে যাওয়া আর্মেনিয়ান-গণহত্যাকে সত্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। কুর্দ-সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেশের ভেতর যে নিরন্তর সংঘাত চলছিল, সেসব কঠোর দমনমূলক আইন প্রণয়ন করে আটকানোর চেষ্টা করা হয়। জনগণের মধ্যে যে তীব্র চাঞ্চল্যের সূত্রপাত ঘটে তাঁর মন্তব্যে, সেই বিষয়ে মিডিয়া’র সামনে খোলাখুলি আলোচনায় বসতে যদিও নারাজ ছিলেন পামুক। যাই হোক, সুইস-সংবাদপত্রের অগাস্ট-সংখ্যায় পামুকের মন্তব্যের জন্য তুরস্ক-সরকার তাঁকে তুর্ক পেনাল কোডের ৩০১/১ ধারায় ‘তুরস্ক জাতির কলঙ্ক’ হিসেবে সাব্যস্ত করেন, যার শাস্তি তিন বছর অবধি কারাবাস। প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঝড় ওঠে। তুরস্ক-সরকারের বিরুদ্ধে ইয়োরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক পেন (PEN)-এর প্রতিবাদ তীব্র হতে থাকে। নভেম্বরের মাঝামাঝি পত্রিকার এই সংখ্যা যখন ছাপাখানায় পৌঁছে গিয়েছে, পামুক তখনও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হচ্ছিলেন, ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আদালতে নিজের মন্তব্যে একইরকম অবিচল রয়ে যাওয়ার জন্য। 


আনজেল : 
সাক্ষাৎকার দিতে কেমন লাগে আপনার? 

পামুকঃ 
কখনো কখনো বেশ বিচলিত বোধ করি, কারণ অর্থহীন প্রশ্নের জবাবে আমিও বোকাটে উত্তর দিয়ে ফেলি। এসব তুর্ক-ভাষায় যেমন ঘটে, তেমন ঘটে ইংরেজিতেও। আমি নিজে বাজে তুর্ক বলি আর অর্থহীনভাবে বকেও যাই। যদিও বইয়ের চাইতেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের জন্যেই আমি তুরস্কে বেশি আলোচিত। তুরস্কের রাজনৈতিক তর্কবাগীশ আর খবরের কাগজের কলমচিরা কেউই উপন্যাস পড়েন না। 


আনজেল :
ইয়োরোপ-আমেরিকায় তো আপনার বইয়ের কদর সার্বজনীন। তুরস্কে আপনার সমাদর কেমন? 

পামুকঃ 
সেই সুসময় আর নেই। আমার প্রথমদিককার বইগুলো যখন প্রকাশিত হচ্ছে, দেশের পুরনো ধারার লেখকরা একে একে দেহরক্ষা করতে শুরু করে দিয়েছেন। আমি নতুন লেখক, তাই আমি সমাদৃত হই। 



আনজেল : 
আপনি বলছেন আগের প্রজন্মের লেখক, কাদের কথা মাথায় রেখে বলছেন? 

পামুকঃ 
যে সমস্ত লেখকেরা সামাজিক দায়বদ্ধতার থেকে লিখতেন, যাঁরা বিশ্বাস করতেন সাহিত্য মানেই তাতে থাকবে নীতিকথা আর রাজনীতির কচকচি। তারা সোজাসাপটা বাস্তববাদী, কিন্তু অভিজ্ঞতাবাদী নন। 

তবে দরিদ্র কোনও দেশের লেখকেরা যেমন দেশের গুণকীর্তিতে নিজের প্রতিভার অপচয় করে থাকেন, আমি তেমনটা কখনো চাইনি। এমন কি কম বয়েস থেকেই আমি ফকনার, ভার্জিনিয়া উলফ, প্রুস্ত, এঁদের লেখা পড়তে বেশি পছন্দ করতাম। স্টাইনবেক আর গোর্কির মত সমাজ-বাস্তববাদী আমি হতে চাইনি। ১৯৬০-৭০ সালের সাহিত্য সেকেলে হয়ে পড়ছিল, তাই নতুন প্রজন্ম আমায় স্বাগত জানায়। 

৯০ সালের মাঝামাঝি আমার বইয়ের বিক্রি অত্যন্ত বেড়ে যায়, যা তুরস্কে কখনো কল্পনাই করা যেত না। তুর্ক সংবাদ-মাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আমার মধুচন্দ্রিমাও শেষ হয়ে যায়। তারপর থেকে আমার বইয়ের বিষয়বস্তু নয়, বইয়ের সমালোচনা আর বিরূপ প্রতিক্রিয়াই বইয়ের প্রচার আর বিক্রির কারণ হয়ে ওঠে। এখন দুর্ভাগ্যবশত আমি কুখ্যাত হয়ে উঠেছি নানা রাজনৈতিক মন্তব্যের কারণে। যেগুলোর অধিকাংশই আমার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারগুলোর থেকে অংশ বিশেষে তুলে নেওয়া। তারপর নির্লজ্জের মত একটু পাল্টে ফেলে সেগুলোকে সম্বল করেই অপপ্রচারে নেমেছেন তুরস্কের জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকেরা। তারা যে করে হোক প্রমাণ করে ছাড়বে, আমি কতটা আক্রমণাত্মক আর রাজনীতিগতভাবে কি প্রচণ্ড বোকা। তার ওপর, যত না বোকা আমি, তার চাইতেও বেশি তারা প্রমাণ করতে চায়। 


আনজেল :
তাহলে ওই দেশে আপনার জনপ্রিয়তার কারণেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে? 

পামুকঃ 
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বইয়ের বিপুল বিক্রি আর নানান রাজনৈতিক মন্তব্যের জেরেই আজ আমার এই শাস্তি। কিন্তু এ ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে চাই না। ব্যাপারটা কৈফিয়তের মত শোনাচ্ছে, পুরো ছবিটার উল্টো ব্যাখ্যা হয়েও দাঁড়াতে পারে। 


আনজেল : 
এত লেখালেখি কোথায় বসে করেন? 

পামুকঃ 
শুরুর থেকেই আমার ধারণা, যেখানে আপনি শোবেন বা সঙ্গীর সাথে থাকবেন, সেই জায়গা লেখার জায়গার থেকে আলাদা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সংসারের নানা নিয়মকানুন, খুঁটিনাটি আপনার কল্পজগতকে যে করে হোক ধ্বংস করে ফেলবে। আমার ভেতরে বাস করা দানবটাকেও মেরে ফেলবে। রোজকার একঘেয়ে গেরস্থালীর কাজ যদিও একটা ভিন্ন জগতের দিকে লোভাতুর করে তোলে আমাদের, যে জগতে এসে পড়তে পারলে পালিয়ে যাওয়া কল্পনাগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই জগতটা যে অধরা রয়ে যাচ্ছে। তাই অনেক বছর বাড়ির বাইরে একটা অফিস ঘরের মত করে রেখেছিলাম, যেখানে বসে আমি নিজের কাজ করতে পারি। পরে একাধিক ফ্ল্যাটও ব্যবহার করেছি একই কারণে। 

সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছিলাম আমেরিকাতে। আমার প্রাক্তন স্ত্রী কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পি-এইচ-ডি করছিলেন তখন। প্রায় তিন মাস মত ওদেশে থাকতে হয়েছিল। বিবাহিত ছাত্রছাত্রীদের আবাসনে উঠেছিলাম আমরা, যেখানে এক চিলতেও অতিরিক্ত পরিসর ছিল না। সংসারের ঝামেলাগুলো প্রায়ই নাজেহাল করে ছাড়ত আমাকে। মেজাজ বিগড়ে থাকত। সকালবেলায় স্ত্রীকে, বেরোলাম ---বলে বেরিয়ে পড়তাম, ঠিক যেন অফিস যাচ্ছি আমি। তারপর কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক হেঁটে আবার ফিরে আসতাম বাড়ি। লিখতে বসতাম। 

দশ বছর হল, বসফোরাসের একেবারে ধারে একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান পাই আমি, যেখান থেকে পুরনো-ইস্তানবুলের খুব সুন্দর নিসর্গ দেখা যেত। মনে হত, ইস্তানবুল সবচাইতে সুন্দর ওই ফ্ল্যাটের জানলা থেকেই। আমার পুরনো বাড়ির থেকে পঁচিশ মিনিটের হাঁটাপথ। আমার লেখার ঘরটা ছিল বইয়ে ভরা, আর ডেস্কের সামনেই ছিল বিরাট সেই নিসর্গ। প্রতিদিন, ধরুন প্রায়, দশ ঘণ্টা করে আমি ওই ঘরটাতে কাটিয়েছি। 


আনজেল :
দশ ঘণ্টা করে? 

পামুকঃ 
হ্যাঁ, আমি পরিশ্রমী। তাই খাটুনিটাকে উপভোগ করি। লোকে বলে আমি নাকি উচ্চাভিলাষী, হয়ত কথাটায় খানিক সত্যতা থাকতে পারে। কিন্তু আমি চিরকালই কাজের প্রেমে পড়ে যাই। লেখার ডেস্কে আমার একনাগাড়ে বসে থাকা, একটা বাচ্চার খেলনা নিয়ে মেতে থাকা, একই ব্যাপার। লেখা আমার কাছে অশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিশ্চয়ই, সেইসঙ্গে খুব মজাদার একটা খেলাও কিন্তু। 



আনজেল :
ওরহান, আপনার নামের একই নামে ‘স্নো’ উপন্যাসের সেই কথক, যে নিজেকে একজন করণিক বলে বর্ণনা করেছিল, সেও ঠিক আপনারই কাজের সময়ে ঘড়ি ধরে নিজের কাজে বসত। লেখার সময়ে আপনিও কি একইরকম ঘড়ি ধরে সব কিছু করেন? 

পামুকঃ 
ঔপন্যাসিকদের একটি করণিক-সুলভ মন থাকা খুবই জরুরি বলে মনে করি আমি, যা আবার কবিদের একেবারেই স্বভাববিরুদ্ধ। কবি হওয়াটা তুরস্কে একসময়ে অসম্ভব সম্মানের আর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রচলিত পথ বলে গণ্য হত। বেশিরভাগ ওটোমান সুলতান আর বড় বড় রাষ্ট্রনেতারা কবি ছিলেন। আজকের দিনে আমরা কবি বলতে যা বুঝি, ঠিক সেরকম নয় কিন্তু। লোকের সামনে নিজেকে বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করতে শত শত বছর ধরে কবি হওয়ার চল রয়েছে। ‘দিবান’ বা পাণ্ডুলিপিতে তাঁরা কবিতাগুলোকে লিখে রাখতেন। ওটোমান-কবিতাকে সরাসরি ‘দিবান-কাব্য’ বলতেও পারেন। অর্ধেকের বেশি ওটোমান রাজপুরুষেরা ‘দিবান’ লিখতেন নিয়মিত। সেই লেখার সূক্ষ্ম ও সুন্দর আদবকায়দা ছিল। ছিল অদ্ভুত নিয়ম আর আনুষ্ঠানিকতা। এসব অনেককাল ধরে একইভাবে চলে এসেছে, আর একঘেয়েও। এরপর পশ্চিমী-চিন্তার প্রসার ঘটতে শুরু করল তুরস্কে, পাশ্চাত্যের আধুনিক রোমান্টিকতার সঙ্গে পুরনো দিবান-কাব্যরসের মিশেলে তুরস্কের কবিরা স্বতন্ত্র কবিসত্তা লাভ করলেন। সত্যের জন্য মাথা খুঁড়ে মরাটাই তখন কবিদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াল। অবশ্যই সেটা কবিদের সম্মান বাড়িয়ে দিল একধাপে অনেকটাই। অপরদিকে দেখুন, একজন ঔপন্যাসিক অশেষ ধৈর্য নিয়ে লম্বা এক দূরত্বের অভিমুখে ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন। ঠিক পিঁপড়ের মত। দানবিক আর রোমান্টিক কার্যকলাপ করে একজন ঔপন্যাসিক আমাদের মুগ্ধ করতে পারেন না। আমরা তার ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দেখেই শেষ পর্যন্ত মুগ্ধতা লাভ করি। 


আনজেল : 
আপনি কখনো কবিতা লিখেছেন? 

পামুকঃ 
একথা প্রায়ই আমাকে জিগ্যেস করা হয়ে থাকে। কবিতা লিখতাম আঠেরো বছর বয়েস পর্যন্ত, একটা কবিতার বইও বেরিয়েছিল তুর্ক-ভাষাতে। কিন্তু আমি কবিতা লেখার অভিলাষ একদিন ত্যাগ করি। উপলব্ধি করেছিলাম, কবি হচ্ছেন সূক্ষ্মতম চিন্তাশক্তির কেউ একজন যার মধ্যে দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর কথা বলছেন। আপানাকে নিজেই কবিতার দ্বারা সারা জীবন অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হবে, আপনি কবিতাকে কখনো অবরোধ করতে পারবেন না। আমি কবিতাকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। কিছুদিন পর বুঝতে পারি, ঈশ্বর সাড়া দিচ্ছেন না আমার লেখায়। এতে আমি বিমর্ষ হয়ে গেছিলাম। তারপর ভাবতে বসলাম, যদি সত্যিই ঈশ্বর আমার মধ্যে দিয়ে কথা বলে ওঠেন ---তবে কি এমন কথা বলতে পারেন তিনি? খুব ধীরে ধীরে, গুছিয়ে গুছিয়ে সেগুলোকে নিজের মত করে লিখতে শুরু করি আমি, যাতে কিছু একটা বোধগম্য অর্থ বেরিয়ে আসে। সেটাই গদ্য লেখা, কল্পকাহিনি লেখা। আমার করণিক-জীবনের শুরু। অনেক ঔপন্যাসিক হয়ত করণিকের উপমাতে অখুশি হতে পারেন, কিন্তু আমি এটা মানি। আমার কাজ হল করণিকের কাজ। 


আনজেল : 
তাহলে যত দিন যাচ্ছে, গদ্য লেখাও কি আপনার জন্য ক্রমশ সহজতর হয়ে উঠছে বলবেন? 

পামুকঃ 
দুর্ভাগ্যের কারণেই, না। কখনো এমনও হয়েছে, আমার লেখার এক চরিত্র হয়ত বা কোনও একটা ঘরে ঢুকবে, কিন্তু কি করে তাকে সেই ঘরটাতে প্রবেশ করাব, ভেবে পাচ্ছি না। লেখক হিসেবে আমার আত্মপ্রত্যয় আরও বাড়ানো দরকার। যদিও সেই প্রত্যয় বিশেষ বিশেষ সময়ে অকেজো হয়ে যেতে পারে, যখন ধরুন কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আপনার লেখা নেই, চিন্তারও অবকাশ নেই, তখন শুধু কলমের অগ্রভাগে যা আসছে সেটাই লেখা হয়ে যাচ্ছে। ত্রিশ বছর ধরে কল্পকাহিনি লিখে যাচ্ছি, বলতে পারি, একটু হলেও উন্নতি নিশ্চয়ই করেছি। তবু মাঝেমাঝেই অন্ধগলির সামনে এনে আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় আমার লেখা, যার পর আর কিছু লেখার নেই। একটা চরিত্র একটা ঘরে ঢুকতে চাইছে, আর আমি কিছুতেই তাকে সেই ঘরে ঢোকাতে পারছি না, ত্রিশ বছর ধরে লিখেও এই অবস্থা! 

একটা বইকে অধ্যায় অনুসারে ভাগ করে দেওয়াটা, আমার লেখার অন্যতম গুরুতর একটা দিক। উপন্যস লেখার সময়ে, যদি আগে থাকতেই জানা থাকে কি লিখতে চলেছি, ---অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটাই হয় যদিও, পুরো গল্পটাকে লেখা শুরুর আগেই আমি অধ্যায় অনুসারে ভাগ করে নিই, তারপর যে অধ্যায়ে যেটুকু লেখার, ঠিক সেটুকু ভরে দিই। একেবারে প্রথম অধ্যায়ের থেকে লেখা শুরু করতে হবে, তারপর সেই অনুক্রমে লিখে যেতে হবে, এমনটা আমার নিয়মের মধ্যে পড়ে না। যখনই দেখি একটা বাধা পাচ্ছি, যদিও ব্যাপারটা লেখকদের জন্যে ভালো নয় মোটেও, সঙ্গে সঙ্গে অন্য অধ্যায়ের কোনও একটা জায়গায় চলে যাই। যেটা লিখতে আমার সেই সময়ে একটু হলেও ভালো লাগবে। 


আনজেল : 
বলতে চাইছেন যে, লেখা শুরুর অনেক আগেই পুরো বইটাকে আপনি মাথায় লিখে ফেলেন? 

পামুকঃ 
হ্যাঁ, বইটার প্রায় সব কিছুই। যেমন ধরুন, ‘মাই নেম ইজ রেড’, প্রচুর চরিত্র রয়েছে বইটাতে, সবগুলো চরিত্রের নামে কোনও না কোনও অধ্যায়ও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এবার লিখতে বসে, আমি তাদেরই কেউ একজন হয়ে যাই তখন। শেকুর-এর অধ্যায় যখন শেষ করলাম, সম্ভবত সপ্তম অধ্যায়, আমি লাফ দিয়ে কিন্তু একাদশ অধ্যায়ে চলে গেছিলাম। কারণ, একাদশে গেলে আবার শেকুর-এর কথা লিখতে পারব। শেকুর হয়ে থাকতে আমার বেশ লাগত। একটা চরিত্র হয়ে কিছুদিন থাকতে না থাকতেই আবার আরেকটা চরিত্র হয়ে উঠতে গেলে, মন খারাপও করে খুব। 

একমাত্র শেষতম অধ্যায়টা আমি সব সময়ে সবার শেষেই লিখি। কারণ, ওটা সুনির্দিষ্ট। নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাই, বারবার খোঁচাই, বল দেখি, কি হতে চলেছে একেবারে শেষে? আমিই একমাত্র, যে কি না এই চলতে থাকা কাহিনির সবটুকু জানে। তাই যতই শেষের পাতাগুলো এগিয়ে আসে, বারবার পুরনো অধ্যায়গুলোকে ফিরে ফিরে পড়ি। কোথাও কোথাও একটু পাল্টেও দিই। পুনর্লিখন করি। আবার করি। একেবারে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই খেলা চলতেই থাকে। 


আনজেল : 
লিখতে লিখতে কাউকে একটু পড়ানোর সুযোগ কি কখনো এসেছে আপনার লেখক-জীবনে? 

পামুকঃ 
জীবনের বিশিষ্টজন যারা, তাঁদেরকে আমি লিখতে লিখতে একটু পড়ে শোনাতে ভালোবাসি। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না আমার, যখন তাঁরা বলেন, আরও একটু পড়ে শোনাও, বা দেখি আজ সারাদিনে কি লিখলে? এতে করে শুধুমাত্র যে লেখা শেষ করার দায় বেড়ে যায়, তা নয়। এ যেন বাবা অথবা মায়ের সরাসরি অনুভূতি, পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলছেন, বাঃ বেশ হচ্ছে তো তোমার কাজ! তবে কখনো কখনো হয়ত কেউ বললেন, ‘ভালো হচ্ছে তোমার লেখা, কিন্তু বইটা আমি কিনব না।‘ অভ্যাসটিকে উঁচু নজরে দেখি আমি। এটিও একরকমের পাঠের আনুষ্ঠানিকতা। 

অনেক আদর্শ আর গুরুস্থানীয় লেখকদের মধ্যে, টমাস মানের কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। বাড়ির সকলকে নিয়ে তিনি একসঙ্গে বসে লেখা পড়ে শোনাতেন। স্ত্রী এবং ছয়টি বাচ্চা। ব্যাপারটাকে খুব তারিফযোগ্য বলে মনে করি আমি। যখন পরিবারের জ্যেষ্ঠতম মানুষটি নতুন কোনও গল্প বলতে শুরু করছেন। 


আনজেল : 
অল্প বয়েসে আপনি চেয়েছিলেন চিত্রকর হতে। কিন্তু লেখালেখির প্রেমে পড়ে পুরনো প্রেম ছবি-আঁকাকে ভুলে বসলেন আপনি, সেসব কবে ঘটল? 

পামুকঃ 
সেসব ঘটেছিল, তখন বাইশ বছর বয়েস হবে। যদিও সাত বছর বয়েস থেকেই চিত্রকর হবার বাসনা আমার মনে, বাড়ির সকলে সেটা মেনেও নিয়েছিল। সকলে ভেবে নিয়েছিল, আমি নির্ঘাত নামকরা এক চিত্রকর হতে যাচ্ছি। কিন্তু কি যে ঘটল ---একদিন উপলব্ধি করলাম, মাথার একটা স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেছে, আমি তড়িঘড়ি ছবি-টবি সব ফেলে প্রথম উপন্যাসটা লিখতে বসে গেলাম। 


আনজেল :
একটা স্ক্রু ঢিলে ছিল বলছেন? 

পামুকঃ 
বলতে পারব না, কি কারণে এসব ঘটেছিল। সম্প্রতি ‘ইস্তানবুল’ নামে যে বইটা প্রকাশ পেয়েছে, বইটার অর্ধেক আমার আত্মজীবনী ---ঠিক সেই ঘটনার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত, আর বাকিটা একটা সুদীর্ঘ প্রবন্ধ। এককথায় বললে, একটা বাচ্চার চোখে দেখা ইস্তানবুল শহর। অনেক নিসর্গ আর চিত্রকল্পে মিলেমিশে একাকার হয়ে যে দেখাটি আপন ভাবনায় সমৃদ্ধ হয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরের নিজস্ব রসায়ন। পুরোটাই কিন্তু একটা বাচ্চার চোখে দেখা, একটা বাচ্চার আত্মজীবনী। বইটার একেবারে শেষ বাক্যটি মনে পড়ছে কি? ‘আমি চিত্রকর হতে চাই না। বলে উঠলাম আমি। লেখক হতে চাই।‘ এর বেশি আর কিছু বলা হয়নি। যদিও পুরো বইতেই টুকরো টুকরো অজস্র ব্যাখ্যা ছড়ানো রয়েছে ওই শেষ বাক্যটির নামে। 


আনজেল : 
আপনার এই সিদ্ধান্ত, পরিবারের সকলে কি খুশি মনে মেনে নিতে পেরেছিলেন? 

পামুকঃ 
মা খুবই ভেঙে পড়েছিলেন। বাবা যদিও বুঝদার মানুষ ছিলেন, যুবা বয়েসে একটু-আধটু কবিতা লিখেছেন তিনি, মূল ফরাসি থেকে ভ্যালেরি’কে তুর্ক-ভাষাতে অনুবাদও করা আছে তাঁর। কিন্তু অভিমান করে সব কিছুই তিনি অল্পদিন পরেই দূরে ঠেলে দেন, যখন তাঁরই মত অভিজাত-বংশীয় যুবারা উঠতে-বসতে তাঁকে ব্যঙ্গ করতে শুরু করেন। 


আনজেল : 
আপনার পরিবার চিত্রকর হিসেবে আপনাকে মেনে নিতে রাজি ছিল, কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে নয় কেন? 

পামুকঃ 
সত্যিই তাই। কারণ তাঁরা কখনোই ভাবেননি আমি পুরোদস্তুর পেশাদার চিত্রকর হব। আমাদের পরিবার হল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের পরিবার। আমার পিতামহ এদেশের প্রধান প্রধান রেলপথগুলো বানিয়েছিলেন, যাতে করে অনেক টাকাও এসেছিল পরিবারে। আমার বাবা আর কাকারা সেই টাকা উড়িয়ে দিলেও, তাঁরাও কিন্তু সেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন, সেই একই বিদ্যায়তনে, ইস্তানবুল টেকনিকাল স্কুলে। আমিও যে একদিন সেই বিদ্যায়তনের দিকে পা বাড়াব, এটা প্রত্যাশিতই ছিল। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে, আমিও যাব, কিন্তু যেহেতু আমি আসলে শিল্পী, আমি স্থাপত্যবিদ্যা পড়ব। বাড়ির সকলে হাসিমুখে মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু পড়তে পড়তে কি যে হল, আমি ছবি আঁকা থামিয়ে দিলাম, উপন্যাস লিখতে শুরু করে দিলাম পুরোদমে। 


আনজেল : 
যখন ঠিক করে ফেললেন ছবি-আঁকার থেকে পালাবেন, ততদিনে প্রথম উপন্যাসটা আপনার মাথায় এসে গেছিল কি? ওটার তাড়নাতেই কি অমোঘ পলায়ন? 

পামুকঃ 
যত দূর মনে করতে পারি, কি লিখতে হবে না জেনেই ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলাম। এমন কি প্রথম যেদিন লিখতে শুরু করি, আমাকে বেশ কয়েকবার সব লেখা কেটে আবার নতুন করে কিছু একটা শুরু করতে হয়েছিল। নোটবুকগুলো এখনও আছে। এভাবে ছ’মাস গেলে, বড় একটা প্লট তৈরি করে ফেলি, যা পরবর্তীকালে ‘কেভদৎ বে অ্যান্ড হিজ সনস’ নামে প্রকাশ পায়। 


আনজেল : 
ওই বইটার ইংরেজি অনুবাদ নেই। 

পামুকঃ 
বইটা একটা বড়সড় পরিবারের কাহিনি নিয়ে লেখা। ফরসাইট সাগা, বা টমাস মানের বুডনব্রুকস-এর মত। বেশিদিন নয়, উপন্যাসটা শেষ করার অল্প কিছুকাল পরেই আমার পরিতাপ শুরু হয়। বড্ড বেশি পুরনো ধাঁচে লিখে ফেলেছি! ঊনবিংশ শতকের লেখা পড়ছি বলে নিজেরই মনে হচ্ছে। আমার এতটা পরিতাপের কারণ ছিল একটাই, কুড়ি-পঁচিশ বছর বয়েস থেকেই আমার মাথায় ঘুরত, যদি লেখালেখি করি তবে আধুনিক-যুগের লেখক হব। কিন্তু ত্রিশ বছর বয়েস যখন আমার, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রথম উপন্যাসটা প্রকাশিত হল, ততদিনে আমার লেখাতে ভীষণভাবেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রবেশ করে গেছে। 


আনজেল : 
যখনই ভেবেছেন আপনাকে আধুনিক-লেখক হতে হবে, পরীক্ষামূলক লেখা লিখতে হবে, কাউকে কখনো কি আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন? 

পামুকঃ 
আমার চিরকালের প্রিয় লেখক তলস্তয়, দস্তয়েইফস্কি, টমাস মান, স্তাঁদাল, এঁদের আমি তখন দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম। আমার চোখে সেরা হয়ে উঠলেন ভার্জিনিয়া উলফ আর ফকনার। এখন চাইলে সেই তালিকায় প্রুস্ত আর নবোকোফ’কেও ঢোকাতে পারি। 


আনজেল : 
আপনার ‘দ্য নিউ লাইফ’ উপন্যাস শুরু হয়েছিল ‘আমি একটা বই পড়েছিলাম, আর আমার পুরো জীবনটাই বদলে গেছিল’ ---বাক্যটা দিয়ে। বাস্তবে কোনও বই কি আপনার ওপর সেরকম ছাপ ফেলতে পেরেছে? 

পামুকঃ 
কুড়ি-বাইশ বছর বয়েসে ‘দ্য সাউণ্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি’ পড়া আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। বইটার একটা পেঙ্গুইন-সংস্করণ কিনেছিলাম আমি। কিন্তু বইটাকে বুঝে ফেলা কি যে শক্ত, আমার মত দুর্বল ইংরেজির জ্ঞান নিয়ে! পরে দেখলাম, বইটার চমৎকার একটা তুর্ক-ভাষাতে অনুবাদ রয়েছে। ডেস্কের ওপর তুর্ক-ভাষা আর ইংরেজি পাশাপাশি রেখে পড়া শুরু করে দিলাম আমি। একটা অনুচ্ছেদের অর্ধেকটা এক ভাষায় পড়ে, বাকিটা অন্য ভাষায় পড়তে থাকি। বইটা আমার ওপর ছাপ ফেলেছিল। যেটুকু বাকি ছিল ফেলতে, আমার নিজের লেখার স্বর তৈরি হল তা দিয়ে। প্রথমপুরুষে লিখতে শুরু করে দিলাম। তৃতীয়পুরুষে কাউকে লেখার চাইতে, নিজের আমি-র ওপর সেই চরিত্রটাকে আরোপ করে লিখতে আজও আমি সবচাইতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। 


আনজেল : 
বলছিলেন ---প্রথম উপন্যাস প্রকাশ পেতে বেশ কিছু বছর সময় লেগেছে? 

পামুকঃ 
কুড়ি-বাইশ বছর বয়েসে লেখালেখির জগতে আমার কোনও বন্ধু-বান্ধব ছিল না। ইস্তানবুলের একটা লেখক-গোষ্ঠীকেও চিনতাম না আমি। প্রথম বইয়ের জন্য প্রকাশক খুঁজে পাওয়ার একটাই উপায় ছিল, কোনও না কোনও সাহিত্য-প্রতিযোগিতায় অপ্রকাশিত-লেখা হিসেবে সেটিকে জমা দেওয়া, যদি সেটি পুরস্কার পায়, আর কোনও প্রকাশকের নজর দয়া করে যদি সেটির ওপর পরে। সেসময়ে তুরস্কে এই ধরনের প্রতিযোগিতা প্রায়ই হত। আমার লেখাটি সত্যিই পুরস্কৃত হল, আর খুব বড়, নামকরা এক প্রকাশক, অতি সুন্দর অঙ্গসজ্জায় অলংকৃত করে বইটাকে প্রকাশ করলেন। ওই সময়ে তুরস্কের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ যাচ্ছে, সেই প্রকাশক আমার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েও, বইটাকে শেষ পর্যন্ত বাজারে আনতে বেশ বিলম্বই করে ফেলেছিলেন। 


আনজেল : 
দ্বিতীয় বইয়ের ক্ষেত্রেও কি একইরকম ঘটেছিল, না কি তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হয়েছিল? 

পামুকঃ 
দ্বিতীয় বইটা ছিল খুবই রাজনৈতিক। কিন্তু প্রচারসর্বস্ব নয় একেবারে। প্রথম বই প্রকাশিত হবার অনেক আগে থাকতেই আমি দ্বিতীয় বই লিখছিলাম। প্রায় দুই-আড়াই বছর লেগেছিল ওটা লিখতে। আচমকা এক রাতে সেনা-অভ্যুত্থান ঘটল সারা দেশে। ১৯৮০ সাল। পরের দিন আমার প্রথম বইয়ের হবু-প্রকাশক জানালেন, তিনি বইটা এখনই ছাপতে রাজি নন, যদিও ইতিমধ্যে আমরা চুক্তিপত্রে সই করে ফেলেছি। বোঝা গেল, দ্বিতীয় যে বইটা নিয়ে আমি দিনরাত মেতে আছি, সেটিও একটা রাজনৈতিক উপন্যাস, তাই আগামী পাঁচ-ছয় বছরে সেটিও নিশ্চিত আলোর মুখ দেখতে পাবে না সেনা-বাহিনীর অনুমতি না পেলে। তবে শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াল? আমি কুড়ি কি বাইশ বছর বয়েসে প্রতিজ্ঞা করলাম লেখক হব, সাত বছর টানা লিখে গেলাম, যাতে তুর্ক-ভাষাতে আমার নামে প্রকাশ করার মত অন্তত কিছু লেখা হাতে থাকে, ...কিন্তু সব শেষ। এখন আমি ত্রিশের কোঠায়, একটা বইও প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা দেখছি না। কোনও একটা ড্রয়ারে ওই শেষ না-হওয়া রাজনৈতিক উপন্যাসটির আড়াইশো-তিনশো পাতার মত পাণ্ডুলিপি এখনও পড়ে আছে। 

সেনা-অভ্যুত্থানের অল্প কিছুকাল পর, হয়ত বা মন খারাপ কাটিয়ে উঠতেই, আমি তৃতীয় বইটা লিখতে শুরু করে দিই, যেটি ‘দ্য সাইলেন্ট হাউজ’ নামে আপনাদের কাছে পরিচিত। সেই বই, যেটা আমি ১৯৮২ সালে প্রথম বই প্রকাশের সময় থেকেই লিখতে শুরু করি। ‘কেভদৎ’ বেশ সমাদৃত হয়েছিল। যার অর্থ, দ্বিতীয় বইয়ের প্রকাশক পেতে খুব একটা অসুবিধে হবার কথা নয়। সেরকমই ঘটেছিল। দ্বিতীয় বই একদিন বেরোল, আসলে যা আমার তৃতীয় প্রকাশিত বই হবার ছিল। 

আনজেল : 
সেনা-শাসনের সময়ে আপনার বইয়ের কোন ব্যাপারটা প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল? 

পামুকঃ 
বইটাতে কিছু উচ্চবিত্ত তরুণ চরিত্র রয়েছে, যারা শখের মার্ক্সিস্ট। গরমের দিনগুলোতে বাবা-মায়ের সঙ্গে তারা রেজর্টে ছুটি কাটায়, বিলাসবহুল বাড়িঘর তাদের, এদিকে মার্ক্সিস্ট বলে গর্বের অন্ত নেই। সব সময়েই একে অপরকে ঈর্ষা করছে তারা, নিজেদের মধ্যে মারপিট করছে, আবার একসঙ্গে বসে কি করে প্রধানমন্ত্রীকে উড়িয়ে দেওয়া যায়, তার পরিকল্পনাও করছে। 


আনজেল : 
সেইসব স্বর্ণশোভিত বিত্তবান মার্ক্সিস্ট? 

পামুকঃ 
সাধারণ উচ্চবিত্ত তরুণসমাজ, এদিকে মেজাজে এই বয়েসেই ধনকুবের। এদের মধ্যেই সব কিছু ভেঙে ফেলা, গুড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যদিও আমি যে একেবারেই সঠিক বিচার করছি, এমনটা নাও হতে পারে। আসলে নিজের ফেলে আসা তারুণ্যের দিনগুলোর প্রেক্ষিতে দেখার চেষ্টা করছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া ---শুধু এই কারণেই বইটা নিষিদ্ধ হতে পারত। 

তাই ওটা আর শেষ করিনি। এদিকে লিখতে লিখতে আপনিও একদিন বেমালুম বদলে যাবেন। কিছুতেই আর পুরনো ব্যক্তিতে ফিরে আসতে পারবেন না। আগের মত লিখতে পারবেন না। লেখকের প্রতিটা বই-ই লেখকের জীবনের কোনও না কোনও একটি সময়কে তুলে ধরে। একেকটা উপন্যাসকে তাঁর অগ্রগতির দীর্ঘ পথের ধারে দাঁড় করানো একেকটা মাইলফলক বলে মনে করা যেতে পারে। কাজেই সে পথে আর ফিরে আসার উপায় নেই। কল্পকাহিনির স্থিতিস্থাপকতা একবার বিনষ্ট হলে, লেখা আর এগোবে না। 


আনজেল : 
বিশেষ কোনও ভাবনা নিয়ে যখন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বসেন, উপন্যাসের গড়ন কিভাবে ঠিক করেন? কখনো কি একটা ছবি, বা প্রথম একটি বাক্য দিয়েই সূচনা ঘটে? 

পামুকঃ 
কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে আমি একই গড়নে দুটো উপন্যাস লেখার ব্যাপারটা একেবারে পরিহার করি। চেষ্টা করি নতুন কিছু করার। যে কারণে অনেক পাঠকের থেকে আমায় শুনতে হয়েছে, আপনার অমুক উপন্যাসটা আমার খুবই পছন্দের ছিল, কিন্তু এটাও লজ্জার যে তমুক উপন্যাসটা আপনি আর সেভাবে লিখলেন না, অথবা আমি আপনার একটা উপন্যাসও পড়তাম না, যদি না অমুক উপন্যাসটা না লিখতেন ---শুনেছি, ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ সম্বন্ধে একথা অনেকেই বলেন। শুনলেই রাগ হয়ে যায় আমার। এটা একটা মজা, একটা চ্যালেঞ্জ, লেখার গড়ন আর শৈলী নিয়ে কত না পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়, সঙ্গে ভাষা, মনের ভাব আর মানুষের সত্তা নিয়েও, বইগুলোকে একে অপরের থেকে আলাদা করে লেখার এটাই তো কায়দা। 

বইয়ের বিষয়ভিত্তি আমার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও উৎস থেকে আসতেই পারে। যেমন ধরুন ‘মাই নেম ইজ রেড’, বইটাতে আমার এককালের চিত্রকর হওয়ার স্বপ্নগুলোকে ব্যক্ত করতে চেয়েছিলাম। লেখা শুরু করাটাই ছিল গোলমেলে, মতলব ছিল এক চিত্রকরকে কেন্দ্রে বসিয়ে একটানা গল্প বলে যাব। কিন্তু আমি সেই চিত্রকরকে আরও অনেক চিত্রকরের মাঝে মিলিয়ে দিই, যারা বিরাট এক চিত্রশালায় একসঙ্গে কাজ করছেন। তাতেই গল্পের মোড় গেল ঘুরে, কারণ এবার একসঙ্গে অনেক চিত্রকর কথা বলছেন। শুরুর দিকে ভেবেছিলাম, সমসাময়িক কোনও চিত্রকরকে নিয়ে লিখব উপন্যাসটা, পরে দেখলাম তুরস্কের সেই চিত্রকর নিজেই খুব দ্রুত পাল্টে পাল্টে যাচ্ছেন, ভীষণই পাশ্চাত্য ঘরানায় প্রভাবিত, অগত্যা পুরনো মিনিয়েচার-শিল্পীদের নিয়ে পড়লাম, সেটাই আমার উপন্যাসের বিষয়ভিত্তি খুঁজে এনে দিল। 

বিষয়ভিত্তির কিছু কিছু ব্যাপার অবশ্য কখনো-সখনো নিজের মত করেই আবিষ্কার করে নিতে হয়, আর খানিক নির্ভর করতে হয় গল্পের বুননের ওপর। এরকম হয় না কি, ধরুন আপনি এইমাত্র কিছু একটা দেখলেন, বা কিছু পড়লেন, কি সিনেমা দেখে এলেন, কিংবা ধরুন খবরের কাগজেই কিছু একটা পড়লেন, আর তৎক্ষণাৎ ভেবে ফেললেন, এবার আমি একটা আলুকে দিয়ে কথা বলাব, বা একটা কুকুর, বা গাছকে দিয়ে। আর যেই না এমন ভাবনা এল মাথায়, আপনি আপনার উপন্যাসের স্বাভাবিকতা আর মসৃণতা নিয়ে বেজায় ভাবতে শুরু করে দিলেন। মনে হতে লাগল, আশ্চর্য তো, ব্যাপারটা সত্যিই এতদিন কেউ করেননি। 

আসলে, এসব নিয়ে আমি বছরের পর বছর ভাবতে থাকি। মাথায় নতুন ভাবনা এলে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলোচনাও করি। আমার এরকম অনেক নোটবুক আছে যেগুলোর থেকে ভবিষ্যতে একেকটা উপন্যাস লিখে ফেলা যায়। কখনো-কখনো ওগুলোতে কিছু লেখা হয় না, কিন্তু যখনই পাতা ওল্টাই, বা কোনও নোটস লিখতে ওগুলোকে খুলি, মনে হয় এবার একটা উপন্যাস লিখে ফেলি। দেখেছি, যখনই কোনও উপন্যাস লিখতে লিখতে প্রায় শেষ করে এনেছি, মাথায় অন্য নোটবুকের পাতাগুলো ঘুরপাক দিতে শুরু করেছে। উপন্যাসটা শেষ করার পর শুধু দুমাসের বিরাম, তারপরই শুরু হয়ে যায় নতুন উপন্যাস। 


আনজেল : 
অধিকাংশ লেখকই ‘কি লিখছেন’ সে বিষয়ে আলোচনা করতে একেবারেই পছন্দ করেন না, আপনিও কি সেই বিশেষ গোপনীয়তা বজায় রাখতে ভালোবাসেন? 

পামুকঃ 
আমি গল্পের ভেতরকার বিষয় নিয়ে আলোচনা করি না কখনোই। কিন্তু বিশেষ কোনও পাঠক সমাগমে যদি কেউ জিগ্যেস করেন, এখন কি লেখা হচ্ছে, আমার ফ্রেমে বাঁধানো একটি চিরাচরিত জবাব রয়েছেঃ আজকের তুরস্কের পটভূমিকায় একটা উপন্যাস লিখছি। তাঁদের সামনেই মুখ খুলি, যারা আমায় বাক্যবাণে বিদ্ধ করবেন না। তাদেরকে একটু চমক দিতেও পছন্দ করি। এই উপন্যাসে মেঘকে দিয়ে কথা বলাব ভাবছি ---এরকমই কিছু হয়ত বলি। বুঝতে চেষ্টা করি লোকে এসব কথা কিভাবে নিচ্ছে। এসব কিন্তু একেবারেই শিশুসুলভ। যদিও এরকম কাণ্ড আমি প্রচুর ঘটিয়েছিলাম ‘ইস্তানবুল’ লেখার সময়ে। আমার মনটা তখন ঠিক একটা দুষ্টু বালকের মত হয়ে গিয়েছিল, যে প্রতিটি মুহূর্তেই বাবার সামনে প্রমাণ দিতে চায় আসলে সে কতটা চালাক। 


আনজেল : 
‘চমক’ কথাটার মধ্যে দিয়ে অন্য বিশেষ কোনও অর্থ বাহিত হচ্ছে না তো? 

পামুকঃ 
আপনি না হয় চমক দিয়েই শুরু করলেন, কিন্তু যদি সত্যিই আপনার ভেতর সাহিত্যিক আর নৈতিক সত্তা থেকে থাকে, একেবারে শেষে গিয়ে লেখাটি বড় কোনও সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতেই পারে। সাহিত্যের বলিষ্ঠ কোনও কাজ বলেও লোকে তাকে মনে রেখে দিতে পারে। 


আনজেল : 
বিশিষ্ট আলোচকেরা আপনার উপন্যাসগুলোকে প্রায়শই ‘অধুনান্তিক’ বলে চিহ্নিত করেন। যদিও, আমি মনে করি, আপনার কথনের অনেক কায়দাকানুনই পুরনো সাহিত্যের প্রেরণায় পাওয়া। যেমন, আপনি নিজেই ‘সহস্র এক আরব্যরজনী’ এমন কি আরও অনেক প্রাচ্যের ধ্রুপদী সাহিত্যের কথা উল্লেখ করে থাকেন। 

পামুকঃ 
এরও শুরু ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ থেকে, ততদিনে আমার বোর্হেস আর কালভিনো পড়া হয়ে গিয়েছে। ১৯৮৫ সালে আমি সস্ত্রীক আমেরিকা যাই, সেই প্রথম অশেষ সম্পদশালী ও সুবিদিত আমেরিকান-সংস্কৃতির মুখোমুখি হওয়া। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা, তুরস্কের একটি লোক আমি, যে লেখক হয়ে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, সেই কারণেই যেন আমেরিকার সঙ্গে সহজেই একাত্ম হয়ে গেলাম। তাই আফশোসও এল খুব তাড়াতাড়ি, ফিরে এলাম একেবারে শিকড়ে। আজকের প্রজন্মের থেকে আমার দেশ একদম নতুন কোনও সাহিত্য আশা করছে, এরকমই উপলব্ধি করেছিলাম দেশে ফিরে। 

বোর্হেস আর কালভিনো আমায় বাঁচিয়েছিলেন। আমাদের বহুপঠিত ইসলামি-সাহিত্যগুলো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আর রাজনৈতিক কচকচানিতে পরিপূর্ণ, তার ওপর রক্ষণশীলেরা সেই কবে থেকে সকলের চেনা ছকে আজও বোকার মত সেগুলোকে ব্যবহার করে চলেছেন, তাই ওগুলোর থেকে আমার যে কিছু পাওয়ার থাকতে পারে সে কথা আমি কোনোদিন ভাবতেই পারিনি। কিন্তু আমেরিকায় থাকাকালে ওই বইগুলোর কথাই মনে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল বোর্হেস আর কালভিনোর মত মন নিয়ে বইগুলোকে আরও একবার পড়া দরকার। অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ইসলামি-সাহিত্যের পাতা থেকে সাহিত্যগুণ আর রাজনৈতিক বুকনিকে আলাদা করতে পারা চাই, তবেই সাহিত্যের ঢঙ, চমক বললে চমক, আর রূপক-টুপকগুলোকে চিনে নেওয়া যাবে। তুরস্ক দেশটাতে উচ্চমানের অলঙ্কারখচিত কল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্য রয়েছে বহুদিনের, কিন্তু আমাদের সমাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ লেখকদের দাপটে সেই কল্পনার ভাঁড়ার কবে খালি হয়ে গিয়েছে। 

চীন, ভারত, আর পারস্যে কত যে রূপকথা রয়েছে, যেগুলো এক দেশ থেকে আরেক দেশে একটু পাল্টে পাল্টে স্রেফ মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে রয়েছে। ঠিক করে ফেললাম গল্পগুলোকে আমি ব্যবহার করব, আর নিয়ে আসব একেবারে আজকের ইস্তানবুলের পটভূমিকায়। এটাও কিন্তু একটা পরীক্ষা ---সব কিছুকে এক জায়গায় নিয়ে আসা, দাদ্যামার্কা কোলাজের মত, আর ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ হল এসবের ফল। সব পুরনো গল্প এক জায়গায় এসে মিলেছে, তারপর নতুন কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে। আগে থাকতে লিখে ফেলা সেই গল্পগুলোকে আমি ইস্তানবুল শহরে এনে ফেললাম, একটা গোয়েন্দা-গল্প ফাঁদলাম, লেখা হয়ে গেল ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’। লেখার বুননে কিন্তু সেই আমেরিকান-সংস্কৃতিই ছড়ি ঘুরিয়েছিল, আর আমিও পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কিছু করতে চেয়েছিলাম। তুরস্কের সমাজ আর তার অজস্র অভিযোগ নিয়ে একটি লাইনও খরচ করিনি, কারণ আমি নিজেই তার ভুক্তভোগী। আমি চেয়েছিলাম অন্যরকম কিছু করতে। 


আনজেল : 
সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে সমাজের জন্য প্রতিশ্রুতি রাখতে কখনও আগ্রহ হয়নি আপনার? 

পামুকঃ 
না। আমার খুব রাগ আগের প্রজন্মের ঔপন্যাসিকদের ওপর, বিশেষ করে আটের দশকের। ওঁদের প্রতি সবরকম শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, ওঁদের লেখা বিষয়ভিত্তিকতায় অতি সঙ্কীর্ণ এবং সবরকম গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট। 


আনজেল :
এবার তবে ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’-এর আগের সময়ে ফিরে তাকানো যাক। আপনার ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’ লেখার প্রেরণা কি? সেই বই, যেখানে আপনি একটি বিশেষ থিম ---ব্যক্তিত্ববদল-এর সূচনা করলেন, যা আপনার পরের সব বইতেই রয়ে গেছে। কেউ একজন অন্য একজন হয়ে গেল, ব্যাপারটা প্রায়শই দেখা যাচ্ছে আপনার কাহিনিতে, এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? 

পামুকঃ 
এটা অনেকটাই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার এক পিঠোপিঠি দাদা ছিল, আমার চাইতে মাত্র আঠেরো মাসের বড়। যে করে হোক, সে ছিল আমার বাবার মত, আমার ফ্রয়েডীয়ান বাবা, সেরকমই বলতে হয়। সে ছিল আমার সব অহং-এর বিপরীত একটি মানুষ, এক ধরনের অভিভাবকের প্রতীক। অন্য দিকে, তার সঙ্গে রেষারেষিও চলত খুব, আবার ভাইয়ে-ভাইয়ে যেমন বন্ধুত্ব থাকে, তারও কমতি ছিল না। বেশ এক জটিল সম্পর্ক। আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে বিশদে লিখেছিলাম ‘ইস্তানবুল’-এ। আমি ছিলাম একেবারে মার্কামারা তুরস্কের ছেলে, ফুটবলে ভালো ছিলাম খুব, তাছাড়াও সবরকম খেলাধুলোতে ছিল আগ্রহ। কিন্তু সে ছিল পড়াশোনাতে ভালো, অন্তত আমার চাইতে তো অনেকটাই। তাকে হিংসে যে করতাম না এমন নয়, আর সেও যে আমাকে বেশ ঈর্ষার চোখে দেখত, তাও অজানা ছিল না আমার। সে ছিল সহিষ্ণু আর দায়িত্ববান একটি ছেলে, বাড়ির গুরুজনেরা যে ধরনের ছেলেদেরকে সচরাচর পছন্দ করেন থাকেন। কিন্তু যখনই আমি খেলাতে মেতে থাকতাম, সে মন দিয়ে পড়াশোনা করে যেত। আমাদের রেষারেষি চলতেই থাকত, আর আমি তার মত হতে চাইতাম, ঠিক তার মতই আদর্শ মানুষ। সে যেন একটা উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমার সামনে। যদিও অসূয়া, ঈর্ষা, এগুলো মনে গেঁথে গিয়েছে ভালোই। শঙ্কিত থাকতাম, যাতে কিছুতেই তার ভেতরকার শক্তি বা জাগতিক সাফল্য আমাকে প্রভাবিত করতে না পারে। এটা আমার মনের বিশেষ এক জোর। আবার সচেতন থাকতাম সর্বক্ষণ, যাতে ঈর্ষা বা ওই জাতীয় অনুভূতিগুলোর সঙ্গে অচিরে দূরত্ব তৈরি হয়। নিজেকে বোঝাতাম, ওগুলো আসলে খারাপ জিনিস, তাই একদিন সভ্য মানুষের মতই দৃঢ়সংকল্প হয়ে ওগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে পড়লাম। বলছি না যে, আমি সত্যিই হয়ে উঠেছিলাম ঈর্ষার শিকার। কিন্তু ব্যাপারটা স্নায়ুর কেন্দ্রে বসে আজও আমাকে চালনা করে যাচ্ছে, সেইসঙ্গে অবশ্যই হয়ে উঠেছে আমার সব কাহিনির মূল ভিত্তি। ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’ উপন্যাসে দুটো মূল চরিত্রের মধ্যে ওই যে প্রায় আত্মপ্রবঞ্চনাকর এবং আত্মনিগ্রহকারী সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, এর মূলে রয়েছে আমার সঙ্গে আমার সেই দাদার সম্পর্ক। 

আবার অন্য দিকে দেখুন, ‘ব্যক্তিত্ববদল’ ব্যাপারটা ভেঙেচুরে হলেও তুরস্ক’কে প্রতিফলিত করাচ্ছে, সেই যখন তুরস্ক প্রথমবার পশ্চিমের মুখোমুখি হল। ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’ লেখা শেষ হবার পর উপলব্ধি করি, এই যে এত ঈর্ষা, অভিমান, প্রতি মুহূর্তে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাবার নিদারুণ শঙ্কা, ---সব কিছুই আসলে তুরস্কের নিজস্ব। পশ্চিমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার একান্ত অনুভূতি। ভালোই জানেন, পশ্চিমী হতে রীতিমত উৎসাহ দেওয়া হয় আবার ঠিকঠাক স্বদেশী হতে না পারলেও লাঞ্ছনার শেষ থাকে না। ইয়োরোপের প্রাণস্পন্দনকে স্পর্শ করতে গভীরে ঝাঁপ দিতে হয়, আবার শূন্যে ঝাঁপ দেওয়ার কারণে অনুশোচনাও হয়। মনের ভাবের এমন দ্রুত ওঠানামা আমাদের দুই পিঠোপিঠি ভাইয়ের সম্পর্কটাকে খুব মনে করিয়ে দেয়। 


আনজেল : 
আপনি বিশ্বাস করেন, তুরস্কের প্রাচ্য-মনের সঙ্গে পাশ্চাত্য-মনের যে নিরন্তর সংঘাত, আদৌ কোনোদিনও তা শান্তিপূর্ণ পথে মিটবে? 

পামুকঃ 
আমি আশাবাদে বিশ্বাসী। তুরস্কের দুটো ভিন্ন সত্তা, দু’রকমের সংস্কৃতি, দুটো আলাদা আত্মা নিয়ে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। মনে রাখবেন, সিজোফ্রেনিয়া মানুষের বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়। এতে করে, আপনি বড় জোর বাস্তবের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন, ---আমি কল্পকাহিনির লেখক, তাই ব্যাপারটাকে কিছুতেই খারাপ চোখে দেখে উঠতে পারছি না। তবু বলি, সিজোফ্রেনিয়ায় ধরলে ভয়ের কিছু নেই। যদি আপনি আপনার কোনও একটি সত্তা নিয়ে খুব বেশি বিব্রত হয়ে ওঠেন আর সেটিকে হত্যা করতে উদ্যত হন, স্বাভাবিকভাবেই আপনি বেঁচে থাকবেন একটিমাত্র সত্তার জোরে। সেটি কিন্তু হবে সিজোফ্রেনিয়ার চাইতেও ভয়ানক। এটাই আমার থিয়োরি। তুরস্কের রাজনীতির অভ্যন্তরেও আমি ব্যাপারটাকে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। বোঝাতে চেষ্টা করেছি দেশের সেইসব রাজনৈতিক হর্তাকর্তাদেরকে, যারা তুরস্কের দেহে একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট আত্মা, হয় পশ্চিমের, নতুবা পূবের, না হলে ঘোর জাতীয়তাবাদী একটি আত্মার জন্য গোঁ ধরে বসে রয়েছেন। এমন একটেরে দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই পছন্দ নয় আমার। 


আনজেল :
কিন্তু তাতে কি তুরস্ক ঠিকঠাক চলবে? 

পামুকঃ 
গণতান্ত্রিকতা যত বেশি গণতান্ত্রিক হবে, উদারনীতি হবে আরও আরও উদার, তুরস্কের মানুষ আমার চিন্তাভাবনাগুলোর সঙ্গে তত বেশি সহমত হবে। একমাত্র এই পথেই তুরস্ক একদিন ইয়োরোপিয়ান ইউনিয়নের সভ্যপদ পেতে পারে। উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে লড়ে টিকে থাকার এটাই পথ, আমরা-ওরা ধরনের কথাবার্তায় কর্ণপাত না করে এগিয়ে যাওয়ারও একমাত্র উপায়। 


আনজেল : 
কিন্তু তবু বলতে হয়, ‘ইস্তানবুল’ বইতে আপনি শহরটাকে যে অপূর্ব রোমান্টিকতায় চিত্রিত করেছেন, তাতে যে কারও মনে হতে পারে ওটোমান সাম্রাজ্যের দুঃখে আপনি বিলাপ করছেন। 

পামুকঃ 
ওটোমান সাম্রাজ্য নিয়ে কখনোই বিলাপ করিনি আমি। আমি পাশ্চাত্যধারার মানুষ। আমি খুব খুশি যে একদিন তুরস্কে পাশ্চাত্যকরণ ঘটেছিল। কিন্তু যে পথে মাথার ওপর ছড়ি ঘোরানো অভিজাত মানুষগুলো আর আমলারা নিজেদেরকে পশ্চিমী প্রথায় প্রশিক্ষিত করেছে, সেই সঙ্কীর্ণতার আমি তীব্র সমালোচনা করি। সবরকমের স্বদেশী চিহ্ন আর লোকপ্রথা দিয়েই যে একটা জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, সেটা করানোর মত মনের জোরের বড়োই অভাব ওদের। আবার শুধুমাত্র প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের জৈবিক মিলনে যে চমৎকার একটি সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া যেতে পারে, সে চেষ্টাও ওদের নেই। ওরা শুধু জানে, এদেশে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য রয়েছে। মিলেমিশে নয়, পাশাপাশি। একসময়ে সত্যিই এদেশে দাপটের সঙ্গে ছিল ওটোমান-সংস্কৃতি। যদিও সেটা ছিল এক ধরনের স্থানীয়-সংস্কৃতি, সময়ের স্রোতে যা একটু একটু করে অদৃশ্য হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দেখুন তাদেরই বা কি করার ছিল, যদিও বিশেষ কিছুই করতে পারেনি, তবু প্রাচ্যিয় অতীত আর পশ্চিমী বর্তমানকে মিলিয়ে দিয়ে, নকল না করে কিন্তু, তারা নিজেদের মত করে একটা স্থানীয়-সংস্কৃতির জন্ম দিতে পেরেছিল। আমার বইগুলোতে প্রায় সেই একইরকম প্রচেষ্টা করে গেছি আমি। আশা রাখি, পরের প্রজন্ম আরও ভালোভাবে ব্যাপারটাকে বুঝতে পারবে। ইয়োরোপিয়ান ইউনিয়নে তুরস্কের প্রবেশ ঘটলে জাতীয় সত্তার হানি হবে না এতটুকুও, বরং এতে আত্মপ্রত্যয় বাড়বে আরও, যা ভবিষ্যতে নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেবে। চাকরের মত পশ্চিমকে নকল করে, অথবা চাকরের মত ওটোমান-সংস্কৃতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও সমাধান হবার নয়। আপনাকে যা করার এগুলোকে নিয়েই করতে হবে, কোনও একটিকে নিয়ে খুব বেশিদিন মেতে থাকলে চলবে না। 


আনজেল : 
যদিও, ‘ইস্তানবুল’ পড়লে আপনাকেই বহিরাগত বলে মনে হতে পারে, নিজের শহরটাকে যেন বিদেশি বা পশ্চিমী চোখে দর্শন করিয়েছেন আপনি। 

পামুকঃ 
কিন্তু আমি আগেই ব্যাখ্যা করেছি কেন একজন পাশ্চাত্যধারায় শিক্ষিত তুরস্কের বুদ্ধিজীবী লোক, পশ্চিমী চোখেই দেশটাকে চিনতে চাইবেন ---ইস্তানবুল শহরটার ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়েই পশ্চিমের সঙ্গে পরিচিতি ঘটেছে আমাদের। কিন্তু সবসময়েই ছিল একটা দ্বৈত সত্তা, আমাদের নিজস্ব প্রাচ্যিয় ক্ষোভগুলোকে খুব সহজেই আলাদা করে নিতে পারবেন আপনি। প্রতিটা মানুষই একসময়ে ছিল পুরোপুরি পশ্চিমী, আবার কখনো পুরোপুরি পূবের ---বলতে গেলে, ক্রমাগত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাল্টে নেওয়া সত্তা। দুটিই সত্তা। এডোয়ার্ড সইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ তত্ত্ব আমার মনের কথা বলেছে। যেহেতু তুরস্ক কোনোকালেও উপনিবেশ ছিল না, তাই নিজের দেশ নিয়ে অতি-কল্পনা করে ফেলাটাও তুরস্কের লোকের পক্ষে দোষের কিছু না। তুরস্কের লোককে কখনোই পশ্চিমী-শাসকদের সামনে অপমানে মাথা নিচু করতে হয়নি, যা করতে বাধ্য করা হয়েছিল আরব আর ভারতের লোকদেরকে। মাত্র দু’বছরের জন্য বিদেশি শাসকের অধীনে এসেছিল ইস্তানবুল। তাও যে জলপথে তারা এসেছিল, সে পথে একদিন নৌকো ভাসিয়ে কেটে পড়ল। সুতরাং ব্যাপারটা যে দেশের আত্মায় দগদগে ঘা হয়ে জেগে রয়েছে, এমন নয়। কিন্তু যে ব্যাপারটা প্রকৃতই দেশের বুকে একটা চিরস্থায়ী ক্ষত রেখে গিয়েছে, সেটি হল ওটোমান-সাম্রাজ্যের পতন। কাজেই আমি কখনোই এমন শঙ্কা করি না, অনুভবও করি না, পশ্চিমের লোকেরা আমাকে করুণার দৃষ্টিতে দেখুক। যদিও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর লোকের মধ্যে পশ্চিমী হবার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। মনের মধ্যে ভয় ধরে গিয়েছিল যদি তাড়াতাড়ি পশ্চিমী না হয়ে ওঠা যায়, তবে কি হবে। এক ধরনের সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা জন্ম নিয়েছিল এই হুড়োহুড়ির ফলে, যা আমাদের অনেক আগেই বিবেচনা করে দেখা উচিত ছিল, যার এক সামান্য অংশ আমি হয়ত লিখে ফেলতে পেরেছি। 

অন্য দিক দিয়ে দেখলে, এই ক্ষত আদৌ সেরকম কোনও ক্ষতই নয়, যে ক্ষত দুশো বছরের পরাধীন দেশের বুকে আঁকা থাকে, উপনিবেশিতের আত্মায় জেগে থাকে। তুরস্কের মানুষ কোনোদিনও পশ্চিমী-শাসকের কারণে অবদমিত ছিল না। তবু যে অবদমন নিয়ে তারা আজ বেঁচে রয়েছে, সেটি নিজের ভেতর নিজের হাতে বপন করা। আমরা নিজের হাতে নিজের দেশের ইতিহাস মুছে ফেলেছি, কারণ ওগুলো সত্যি সত্যিই ঘটেছিল। এই ধরনের অবদমন দেশের সত্তাকে অনেকটাই ভঙ্গুর করে তোলে। তবে ওই যেচে ঘাড়ে নেওয়া পাশ্চাত্যকরণের জন্যেও মানুষের মনে বিচ্ছিন্নতা এসেছে। ভারতীয়রা দেখেছে অত্যাচারীর মুখ কেমন দেখতে হয়, আর তুরস্কের থেকে পশ্চিম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই, যে পশ্চিমকে অন্ধের মত অনুকরণের চেষ্টা হত। মনে করে দেখুন, ৫০ কি ৬০-এর দিনগুলোর কথা। ইস্তানবুল-হিলটনে কোনও বিদেশি এসে উঠলে, পরদিনই ব্যাপারটা খবরের কাগজের পাতায় চলে আসত। 


আনজেল :
আপনার কি মনে হয় প্রামাণ্য নথি বলে সত্যিই কি কিছু আছে, বা সেরকম কিছু থাকা উচিত? পশ্চিমী একটা প্রামাণ্য নথির কথা আমরা শুনেছি, অ-পশ্চিমী প্রামাণ্য নথি তবে কোনটা? 

পামুকঃ 
হ্যাঁ একটা আছে। কিন্তু সেটাকে আরও গভীরে পড়তে হবে, বাড়িয়ে তুলতে হবে, লোকজনকে পড়াতে হবে, আলোচনায়-সমালোচনায় বিদ্ধ করতে হবে, তবেই সেটা গ্রহণযোগ্য হবে। এই মুহূর্তে চেনাজানা প্রাচ্যিয় সবগুলো নথি ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে রয়েছে। অশেষ গুরুত্বপূর্ণ সেসব নথি ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র, কিন্তু একটা লোক নেই যে সবগুলোকে একত্র করে সাজাবে। পারস্যের ধ্রুপদী সাহিত্য, ভারতের সুপ্রাচীন সাহিত্যসম্ভার হয়ে চীন, জাপান, এসব দেশের নিজস্ব নথিগুলোকে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ না করলে প্রামাণ্য নথির জন্ম হবে না। তাই ওই নথিটা আজও পশ্চিমের হাতে রয়ে গিয়েছে। ওদের থেকেই চেয়েচিন্তে আমরা পড়ি, বুঝতে না পারলে ওদেরকেই যা জিগ্যেস করার জিগ্যেস করি। 


প্রশ্নঃ 
উপন্যাস ব্যাপারটা একেবারেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির থেকে উদ্ভূত, পূবের নিজস্বতায় কখনো এর কি কোনও অস্তিত্ব ছিল? 

পামুকঃ 
আজকের আধুনিক উপন্যাস, প্রাচীনকালের ‘এপিক’ থেকে ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। একেবারেই অ-প্রাচ্যিয় ব্যাপার-স্যাপার। কারণ একজন ঔপন্যাসিক হলেন সেই লোকটা যে আদতে কোনও দলের লোক নন, কোনও দলের আদিম স্বার্থে-পরার্থে যার আগ্রহ নেই, লাভ নেই ক্ষতি নেই, সর্বোপরি তিনি চিন্তা করেন, বিচার-বিবেচনা করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যা তিনি বাস্তবে করেন না। যখনই তাঁর চেতনা তাঁর চেনা বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, চেনা দল চেনা সমাজে তিনি হয়ে যাবেন অচেনা, তিনি তখন বহিরাগত, একলা একটি মানুষ। একজন বহিরাগত মানুষের লুকোছাপা ধরনের দৃষ্টিতে উপন্যাসের সৌন্দর্য আরও খোলে। 

যদি একবার পৃথিবীটাকে দেখার এহেন স্বভাবগুলো আয়ত্ত করতে পারেন আর লুকোছাপা-মার্কা কথনে পারদর্শী হন, দেখবেন সমাজ থেকে নিজেই বিচ্ছিন্ন হতে চাইছেন। ‘স্নো’ লেখার আগে আগে আমি এভাবেই নিজেকে দেখতে চাইছিলাম। 


আনজেল :
‘স্নো’ হচ্ছে আপনার সবচাইতে গুরুপাক রাজনৈতিক উপন্যাস, এটা লিখলেন কি করে? 

পামুকঃ 
৯০-এর দশকের মাঝামাঝি যখন সবে বিখ্যাত হতে শুরু করেছি, দেশে তখন কুর্দিশ-গেরিলাদের সঙ্গে জোর যুদ্ধ চলছে। ওদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল দেশের বুড়ো বামপন্থী লেখকেরা, সঙ্গে তরুণ মুক্তিবাদী লেখকরাও যোগ দিয়েছিল। ওরা চাইছিল, আমিও ওদের সঙ্গে থাকি, কুর্দিশ-যোদ্ধাদের সাহায্যে কিছু করি। পিটিশনে স্বাক্ষর করতে না করতে ওরা আমাকে এমন সব রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে অংশ নিতে জোরজার শুরু করল, যা আমার রাজনৈতিক চেতনার একেবারেই বাইরে। 

দুদিন বাদেই যখন প্রচারসর্বস্ব এই নব্য প্রতিষ্ঠানটি বিরোধীদের পাল্টা-প্রচারে ধ্বসে যায়, ---সেটি আবার এমন এক প্রচার যাতে অনেকেরই চরিত্রহনন করা হয়েছিল, দেখি, ওদের সঙ্গে সঙ্গে আমার নামও আসছে। আমাকে ওদের দলেরই ভাবা হচ্ছে। আমি তো রেগে আগুন। কিন্তু একটু পরেই মনে হল, আমি নিজে কেন তবে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখছি না, যে লেখার মধ্যে দিয়ে নিজের জটিলতা আর দ্বিধাদ্বন্দ্বগুলোকে লোকের সামনে মেলে ধরতে পারব। তুরস্কের উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা আমি, এখন আমাকে সেইসব লোকের সঙ্গে এক আসনে বসানো হচ্ছে, যাদের রাজনৈতিক সত্তার প্রতি আমার আস্থা কিনা এতটুকু নেই! আমি শুধুমাত্র কল্পকাহিনির শিল্পশৈলীতে বিশ্বাস করি। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও সত্যি, এভাবেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বহিরাগত। নিজেকে বোঝাই, একটা রাজনৈতিক উপন্যাস লেখা খুব দরকার। ‘মাই নেম ইজ রেড’ শেষ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওই নতুন লেখাটা লিখতে শুরু করি। 


আনজেল : 
কাহিনির পটভূমি হিসেবে ছোট্ট শহর কর্স-কে বেছে নিলেন কেন? 

পামুকঃ 
তুরস্কের সাংঘাতিকরকমের শীতল শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওই শহরটা। সঙ্গে দরিদ্র শহরগুলোর মধ্যেও অন্যতম। আটের দশকের শুরুতে দেশের খুব জনপ্রিয় এক খবরের কাগজের একেবারে প্রথম পাতায় কর্স-এর দারিদ্র্য নিয়ে বড় করে লেখা বেরিয়েছিল। একজন একবার হিসেব করেও দেখিয়েছিলেন, মোটামুটি এক মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি টাকা জমাতে পারলে আপনি পুরো শহরটাকে কিনে ফেলতে পারেন। আমি যখন প্রথম ওখানে যাই, রাজনৈতিক আবহাওয়া মোটেও আরামপ্রদ ছিল না। শহরের আশাপাশটায় কেবল কুর্দ’রা বাস করে, তবে শহরের ভেতর আপনি কুর্দ’দের সঙ্গে আজারবাইজানি আর তুরস্কের লোকও পাবেন, কে আছে আর কে যে নেই। রাশিয়ান আছে, জার্মান’ও আছে। আছে ধর্মীয় বৈষম্য। শিয়া আর সুন্নি। ওই সময়ে সরকারের সঙ্গে কুর্দিশ-গেরিলাদের লড়াই এতটাই চরমে উঠেছিল, সাধারণভাবে ওখানে বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি পেত না কেউই। আমি জানতাম, একজন ঔপন্যাসিক হয়ে আমার পক্ষে কর্স-এ ঢোকা সম্ভব নয়, পরিচিত এক খবরের কাগজের সম্পাদককে গিয়ে ধরলাম, সে প্রেস-পাশ হাতে ধরিয়ে দেওয়াতে তবেই ওই শহরে ঢোকার অনুমতি মিলেছিল। সাংবাদিকের ভূমিকায়, যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে আমার কর্স-এ যাওয়া। সেই সম্পাদক-মশাই ছিলেন যথেষ্ট প্রভাবশালী। শহরের মেয়র আর উচ্চ পুলিশ-কর্তাদেরকে আগাম জানাতে কিন্তু তিনি ভোলেননি আমার কর্স-এ পদার্পণের খবর। 

শহরে ঢুকে আমি সকলের আগে মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাত করি, পুলিশ-চিফের সঙ্গেও দেখা করে করমর্দন সারা হয়ে যায়, যাতে আমাকে রাস্তায় একলা ঘুরতে দেখে আচমকা পুলিশ তুলে নিয়ে যেতে না পারে। বাস্তবে কিন্তু সেরকমই ঘটেছিল। একদল পুলিশ আমাকে দেখতে পেয়ে কোনও ওজর-আপত্তি না শুনে প্রায় জিপে তুলে নিতে যাচ্ছিল, সম্ভবত মারধোর করে একটু হাতের সুখ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আমিও গলা ফাটিতে বলতে শুরু করলাম, তোমরা জানো না, তোমাদের মেয়র মিঃ অমুক আমার বন্ধু, পুলিশ চিফ মিঃ তমুক আমার বিশেষ পরিচিত, …ওরা ভয় পেয়ে আমাকে ছেড়ে বেঁচেছিল সেদিন। এভাবে প্রায় প্রথম দিন থেকেই আমি কর্স-এ আগত অতি সন্দেহভাজন একটি চরিত্র হয়ে উঠেছিলাম। কারণ, তুরস্ক শুধুমাত্র খাতায়-কলমে একটি স্বাধীন দেশ, এই সেদিন পর্যন্ত, ১৯৯৯-তেও দেখা গেছে, বহিরাগত কি বিদেশিদেরকে সন্দেহ করা হচ্ছে, হেতুহীন নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। মনে হয়, এখন একটু হলেও কমেছে এই ব্যাপারগুলো। 

উপন্যাসটির বেশিরভাগ চরিত্র, স্থান, ঘটনাবলি, বাস্তব। এমন কি পরিসংখ্যানের দিক দিয়েও। স্থানীয় যে খবরের কাগজটার কথা লিখেছিলাম প্রতিদিন যার দুশো বাহান্ন কপি বিক্রি হয়, বাস্তব কিন্তু তাই-ই। কর্স-এ গেছিলাম আমি ক্যামেরা আর ভিডিয়ো-রেকর্ডার নিয়ে। আমার কাজই ছিল যা দেখছি সব ছবি তুলে নেওয়া, আর ইস্তানবুলে ফিরে বন্ধুদেরকে ওগুলো মহা উৎসাহে দেখানো। বন্ধুরা ধরেই নিয়েছিল, আমার মাথাটা নির্ঘাত বিগড়েছে। কিন্তু এরপর আরও অনেক কিছুই ঘটেছিল ওখানে, সেগুলোও সত্যি। যেমন ধরুন, পত্রিকার এক সম্পাদকের সঙ্গে ক-এর সেই সংলাপ, ---উপন্যাসের পাতায় লিখেছিলাম। সেই সম্পাদক ক-কে বললেন, আমি জানি তুমি গতকাল গোটা দিনটায় কি কি করেছ, ক খুবই অবাক হয়ে জানতে চাইল তুমি জানলে কি করে, সম্পাদক তখন জানালেন যে তিনি পুলিশের ওয়াকি-টকিতে সারাদিন কান পেতেছিলেন, আর পুলিশ সারাদিন ক-কে ছায়ার মত অনুসরণ করে গেছে। সংলাপসমেত পুরো ঘটনাটাই নির্ভেজাল সত্যি। পুলিশ আমাকে বিনা কারণেই অনুসরণ করা অভ্যাস করে ফেলেছিল। 

একবার কর্স-এর এক টেলিভিশন-সঞ্চালক আমাকে টিভির পর্দায় এনে হাজির করলেন, ঘোষণা করলেন, বিখ্যাত এই লেখক আমাদের জাতীয় খবরের কাগজে কর্স-এর ওপর একটা প্রবন্ধ লিখতে চলেছেন। ব্যাপারটা যে আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এল, সঞ্চালক-ভদ্রলোক হয়ত বা নিজেও আন্দাজ করতে পারেননি। পুরসভার নির্বাচন সামনে। আমার জন্য কর্স-এর বাড়িতে বাড়িতে দুয়ার খুলে গেল। সকলেই যেন আমাকে কিছু না কিছু বলতে চাইছেন, চাইছেন আমি যেন তাদের কথাগুলো আমার প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করি। সারা দেশ জানুক, দেশের সরকার জানুক, কি অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে বেঁচে রয়েছে কর্স-এর মানুষ। তারা শুধু জানতেন না, প্রবন্ধ নয়, আমি একটা উপন্যাস লিখতে কর্স-এ এসেছি। এটা আমার স্বীকারোক্তি, এই দ্বিচারিতার কারণে নিজের ওপর নিজেই রুঢ় হয়ে উঠছিলাম, নিষ্ঠুরতাও দেখেছি নিজের মধ্যে। কর্স-এর ওপর কয়েকটা প্রবন্ধ লিখব, সেরকম পরিকল্পনা কিন্তু এখনও রয়েছে আমার। 

চার বছর পার করে দিয়েছি। অনেকবার এসেছি গেছি। একটা কফিশপ ছিল, যেখানে বসে আমি লিখতাম বা কিছু নোটস নিতাম। আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধুকে একবার জোর করে টেনে এনেছিলাম। বলেছিলাম, তুষারের সময়ে কটা দিন কর্স-এ কাটিয়ে যাও, এতো সুন্দর তুষারের শহর কোথাও পাবে না। সে ওই ছোট্ট কফিশপের ভেতর একবার নাকি শুনতে পেয়েছিল, লোকজন ফিসফিস করে বলাবলি করছিল, আমি যখন লিখছিলাম, এই লোকটা ঠিক কি জাতীয় প্রবন্ধ লেখে? এতদিন লাগিয়ে দিচ্ছে! আরও তিনটে বছর গড়িয়ে গেছে, উপন্যাস বেরিয়ে গেছে, এবার কর্স-এ গেলে লোকে আমাকে আর ছেড়ে কথা বলবে না। 


আনজেল :
এই বইয়ের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? 

পামুকঃ 
‘স্নো’ বেরনোতে, তুরস্কের রক্ষণশীল ---অর্থাৎ ইসলামি-রাজনীতির লোকজন, আর অসাম্প্রদায়িক মুক্তিবাদী, সকলেরই বুক ভেঙে গেছে। বইটাকে নিষিদ্ধ করা, বা ছলছুতো করে আমাকে লাঞ্ছনা করার চেষ্টাটাই বড় কথা নয়, প্রায় প্রতিদিনই তাদের তরফে বইটাকে আক্রমণ করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নানান লেখা চোখে পড়ত আমার, যেগুলো পড়লে বোঝা যেত, তাঁদের মন একেবারেই বিমর্ষ। অসাম্প্রদায়িকেরা অভিমান করে বসলেন, কারণ আমি স্পষ্ট বলেছি তুরস্কের মত দেশে কেউ যদি অসাম্প্রদায়িক-চরমপন্থি হন, তবে তিনি কোনও না কোনওভাবে গণতন্ত্রের মূল্য চুকিয়ে এসেছেন, ভুলে গিয়েছেন, তাঁর আসলে গণতান্ত্রিক হবার ছিল। তুরস্কে অসাম্প্রদায়িক ক্ষমতার উৎস হল সেনাবাহিনী। যে ক্ষমতা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, আর প্রাচীন যে সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি ছিল, সেটাকেও শেষ করেছে। যদি আপনার দেশের রাজনীতির আঙিনার সবটুকু অধিকার করে বসে থাকে সেনাবাহিনী, সব ব্যাপারে নাক গলায়, তবে তো দেশের লোকের আত্মপ্রত্যয় এমনিই তলানিতে এসে ঠেকবে। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করে দেবে, সব কিছুর সমাধান একমাত্র সেনাদের হাতে আছে। একটা কথা প্রায়ই আজকাল কানে আসে, এদেশের অর্থনীতি নাকি জঞ্জালে পরিপূর্ণ! এবার তবে সেনাবাহিনীকে ডাকা হোক যুদ্ধকালীন তৎপরতায় জঞ্জাল সাফাইয়ের জন্য! তারা করেও দেবে নিঃশব্দে। যেভাবে ওরা সবার অলক্ষ্যে দেশের সহিষ্ণুতাটুকু ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে। সন্দেহজনক লোক দেখলেই বিনা কারণে আজও লাঞ্ছনা করা হচ্ছে। হাজার-হাজার লোক জেলের ভেতরে। সব কিছুই কিন্তু নতুন একটা সেনা-অভ্যুত্থানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই এদেশে প্রতি দশ বছরে একটা করে সেনা-অভ্যুত্থান ঘটে। কাজেই, অসাম্প্রদায়িকেরা কতটা কি করতে পারবেন দেশের জন্যে, আমি সন্দিহান। আরেকটা কথা, ইসলামি-রাজনীতির লোকেদের মধ্যে আমার উপন্যাসে মনুষ্যত্ব দেখানো রয়েছে বলে, ওদের আমার ওপর চটে থাকার আরও একটা কারণ রয়েছে। 

ইসলামি-রাজনীতির বিশিষ্টজনেদের অভিমানের কারণ হল, আমি আমার উপন্যাসে দেখিয়েছি, কোনও এক ইসলামি-রাজনীতির লোক বিয়ের আগেই যৌন-জীবন উপভোগ করেছেন। ওঁরা সরল মনের মানুষ। তবে আমাকে নিয়ে বরাবরই ওঁরা মাথা ঘামান, নতুন কিছু নয়। আমি ওঁদের সংস্কৃতি থেকে উঠে আসেনি। আমার মুখের ভাষা থেকে হাবভাব, এমন কি চেহারা পর্যন্ত ওঁদের চোখে পশ্চিমী ঠেকে, তবে আমি কি করে ওঁদের সব গোপন কিছু জেনে ফেলছি? ওঁদের নিয়ে লিখছি? ওই যে বললাম, আসলে ওঁরা সরল। বুঝতে পারেন না আদপে আমি ঠিক কি বোঝাতে চাইছি। ওঁদের এই বোঝা-না-বোঝার পালাটাও আমার উপন্যাসে লেখা রয়েছে। 

কিন্তু এর বেশি আর বলতে চাই না। বলতে পারি, বেঁচে গিয়েছি। ওঁরা সকলেই বইটা পড়েছেন। হয়ত অনেকে রেগে কাঁই হয়ে গেছেন, তবে এটাই সবচাইতে বড় উদারতার লক্ষ্যণ যে, ওঁরা শেষ অবধি আমাকে আর আমার বইটাকে মেনে নিয়েছেন ঠিক ওঁদের মত করেই। কর্স-শহরে প্রতিক্রিয়া শুনেছিলাম দু’ধরনের হয়েছে। একদল বলছেন, একদম ঠিক, উনি যা লিখেছেন একেবারে বাস্তব। অপরপক্ষ, সম্ভবত তুরস্ক-জাতীয়তাবাদী, খুবই চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা মনে হয়, কেন আমার উপন্যাসে আর্মেনিয়ান’দের উল্লেখ রয়েছে। সেই যে টিভি-সঞ্চালক, যে ভদ্রলোক আমাকে কর্স-টেলিভিশনে একটুক্ষণ মুখ দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তিনি আচমকা এক কাণ্ড করে বসলেন। একটা প্রতীকী কালো ব্যাগে আমার বইটাকে পুরে তিনি আমাকে পাঠালেন, আর টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, আমি নাকি তলে তলে আসলে আর্মেনিয়া’র চর। ব্যাপারটা খুব হতাশকর কিন্তু। আমরা সত্যিই একটা ভীষণ গেরামভারী গোছের জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির জোরে বেঁচে আছি। 


আনজেল : 
এই বইটা রুশদি’র বইয়ের মত আপনার জীবনে প্রবল ঝঞ্ঝাটের কারণ হয়ে উঠবে না তো? 

পামুকঃ 
না, একেবারেই না। 


আনজেল : 
বইটা পাঠককে অসম্ভব বিষণ্ণ করে দেয়, বলতে গেলে প্রায় জীবনকে না-বলে দেওয়া একটি বই। গোটা বইতে একটিই চরিত্র ---ক, যে সকলের কথা বুঝতে পারত, সেও শেষে সকলের চোখে অবহেলার পাত্রে পরিণত হল। হারিয়ে গেল। 

পামুকঃ 
ঔপন্যাসিক হিসেবে আজকের তুরস্কে আমার অবস্থান নিয়ে হয়ত সেসময়ে একটু বেশিই জল্পনা-কল্পনা করতাম। ক জানত যে কেউই তাকে পাত্তা দেয় না, তবু সে সকলের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেত, কথাবার্তা-সংলাপ সব কিছুকে উপভোগ করত। বেঁচে থাকার স্পৃহা ছিল তার সাংঘাতিক। শেষে সকলে ক-কে বর্জন করে, পশ্চিমের গুপ্তচর সন্দেহে, বিশেষ ওই সন্দেহটি আমাকে যে আজ পর্যন্ত কতবার করা হয়েছে, হিসেব নেই। 

তবে বিষণ্ণতা রয়েছে সত্যিই, মেনে নিচ্ছি। সেইসঙ্গে যে রসবোধও রয়েছে প্রচুর। লোকে যখন বলে, আপনার উপন্যাসটি আমাদের বিষণ্ণ করে তোলে পড়ার শেষে, আমি বলি, মজাগুলো মজার মত লেগেছে তো? ওই বইতে মজার-মজার ব্যাপার রেখেছি সর্বত্র, আমার উদ্দেশ্য অন্তত তাই ছিল। 


আনজেল : 
সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আপানাকে বেশ বিপদেই ফেলেছে। এরপর আরও বিপদে ফেলাটাও বিচিত্র নয়। এটা কিন্তু কাছের সম্পর্কগুলোর থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যা পরে আপশোসের কারণ না হয়। 

পামুকঃ 
হ্যাঁ, কিন্তু ব্যাপারটা খুব সুন্দর। যখন আমি কোথাও যাচ্ছি, বা লেখার ডেস্কে একলা নই, খানিকবাদে মন খারাপ করে আমার। সবচেয়ে আনন্দে থাকি যখন আমি আমার ঘরে একেবারে একা, এবং কিছু না কিছু কাজ করছি। শিল্পের প্রতি, শৈলীর প্রতি, যত না আমার দায়বদ্ধতা, তার চাইতেও বড় যেন নিজেকে একলা করার দায়। এভাবেই চালিয়ে নিয়ে যাই, জানি, লিখতে লিখতে কাজটা একদিন ছাপা হয়ে বেরোবে, আমার দিবাস্বপ্ন সার্থক করবে। লেখার ডেস্কে নিজেকে একলা দেখতে চাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সঙ্গে চাই ভালো জাতের কাগজ আর ফাউন্টেইন পেন, যেমন স্বাস্থ্যের কারণে অনেকেই ঘুমের ওষুধের যোগান রাখেন, সেরকম। এই একটি কাজে আমি কিন্তু একেবারেই দায়বদ্ধ। 


আনজেল : 
তবে, এত লেখেন কার জন্য? 

পামুকঃ 
জীবন যেহেতু ক্রমে ছোট হয়ে আসছে, প্রশ্নটা আমরা প্রত্যেকে নিজেদেরকে প্রায়শই করে থাকি। আমি এখনও পর্যন্ত সাতটা উপন্যাস লিখেছি। মরার আগে আরও সাতটা লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু, জীবন যে সত্যিই খুব ছোট। এর বেশি উপভোগ করার মত কিছু আছে কি? একেকসময়ে নিজেকে বেশ চাপ দিয়ে ফেলি, কেন এসব করছি আমি? এসবের মানে কি? আগেই বলেছি, আমার প্রথম উদ্দেশ্য হল নিজেকে ঘরের মধ্যে একলা করা, দ্বিতীয়টি প্রায় বালকসুলভ এক ধরনের জেদ বলতে পারেন, নিজেকে দিয়ে আবার একটা ভাল উপন্যাস লিখিয়ে নেওয়া। লেখকের চিরন্তন হয়ে বেঁচে থাকা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে প্রচুর। শেষ দুশো বছরে যত বই লেখা হয়েছে, সেগুলোর কতগুলো আমরা আজকাল পড়ি বলুন তো? জগতটা বদলাচ্ছে যেভাবে, আজকের দিনে লেখা বইগুলো আগামী একশো বছরের মধ্যেই লোকের বিস্মরণে চলে যাবে। অল্প কয়েকটা হয়ত পঠিত হবে তখন। আর দুশো বছর পর, হাতেগোনা পাঁচটা মাত্র বই হয়ত বেঁচে থাকবে। দুশো বছর বাদে আমার বই লোকে পড়বে কি পড়বে না, সেকথা ভেবে এখন আমি উতলা হব কেন? বেঁচে থাকতে লোকে পড়ছে কি না, সেটাই যথেষ্ট চিন্তার নয় কি? এখন না পড়লেও ভবিষ্যতে সকলে পড়বে, এমন সান্ত্বনারই বা কি প্রয়োজন? এসব চিন্তা প্রায়ই মাথায় আসে, লেখাও চলতে থাকে। জানি না কেন। কিন্তু আমি হাল ছাড়ি না। আমার বই ভবিষ্যতে আরও বেশি করে লোকে পড়বে, এই সান্ত্বনাটুকু কিন্তু একরকমের বেঁচে থাকার আনন্দ এনে দেয়। 



আনজেল :
তুরস্কে এই মুহূর্তে সবচাইতে বেশি বিক্রি হয় আপনার বই। কিন্তু ওই দেশে বিক্রির তুলনায়, বিদেশে আপনার বইয়ের চাহিদা এবং কাটতি অনেক অনেক বেশি। ইতিমধ্যেই চল্লিশটা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে আপনার লেখা। আরও বড়, কিংবা বিশ্বজনিন পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন কি? বা সাম্প্রতিককালে একেবারে অন্য মাত্রার পাঠকসমাজকে কি সকলের আগে প্রাধান্য দিচ্ছেন? 

পামুকঃ 
আমি খুব ভাল করে জানি, আমার পাঠক এখন আর পুরোদস্তুর দেশের মানুষ নন। যখন প্রথম লেখা শুরু করি, তখন থেকেই হয়ত বা আমার মধ্যে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছোনোর অভিপ্রায় ছিল। পেছন থেকে সাবধানবাণী কানে আসত বাবার। ওঁর কিছু পুরনো লেখক-বন্ধুর উদাহরণ টেনে বলতেন, এদের লেখা বইগুলো দেশের বাইরে কিন্তু কেউ পড়ে না, এঁরা প্রকৃত স্বদেশী লেখক। 

কোনও বিশেষ এক ধরনের পাঠকসমাজকে সচেতনভাবে মাথায় রাখলেই যত সমস্যা, সে দেশী পাঠক হন, কি আন্তর্জাতিক। সম্প্রতি এই জাতীয় সমস্যাগুলোকে সরাতে পারছি না। শেষ দুটো বই বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ করে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। এই পাঠকসমাজকে অবহেলা করতে তো পারবই না, বরং অতিরিক্ত সচেতন আমি ওঁদের নিয়ে। আবার অন্যদিক দিয়ে ভাবলে, ওঁদেরকে খুশি করার কোনও দায় আমার নেই। এটাও মনে হয়, যদি সেটা করতেও চাই, পাঠক ধরে ফেলবেন। তাই শুরু থেকেই আমি বেপরোয়া। যখনই দেখি পাঠক আমার থেকে কিছু না কিছু প্রত্যাশা করছে, আমি পালিয়ে যাই। তারপর নতুন করে শুরু করি, বাক্যের গড়ন পর্যন্ত বদলে ফেলি, যাতে পাঠক আমাকে নতুন করে খুঁজে পেয়ে চমৎকৃত হন, সঙ্গে নিজেদের নতুন কিছু পড়ে ফেলার পুরনো অভ্যাসটাও ঝালাই হয়ে যায়। এই কারণে বোধহয় এত দীর্ঘ সব বাক্য লিখি উপন্যাসে। 


আনজেল : 
তুরস্কের বাইরের দেশের পাঠকের চোখে আপনার স্বকীয়তা হল কতটা তুরস্কীয় হতে পেরেছেন আপনি লেখাতে, তুরস্কের পাঠকের জন্যেও কি তাই? এক্ষেত্রে স্বকীয়তার কোনও ফারাক রয়ে যাচ্ছে কি? 

পামুকঃ 
এটা একটা সমস্যা বলতে পারেন। হ্যারল্ড ব্লুম যাকে বলেছেন ‘অ্যাংজাইটি অফ ইনফ্লুয়েন্স’। সব লেখকের মত আমারও ব্যাপারটা ছিল, বিশেষ করে কম বয়সে। বছর ত্রিশেক তখন হবে, দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেছিল যে আমার ওপর তলস্তয় আর টমাস মানের গুরুতর প্রভাব পড়েছে, ---ঠিকই করে ফেলেছিলাম জীবনের প্রথম উপন্যাসে আমি ওঁদের মত ধ্রুপদী এবং অভিজাত ধরনের গদ্য লিখব। শেষ পর্যন্ত গদ্য জিনিসটা যেভাবে মূর্ত হয়ে উঠল আমার লেখাতে, সেটি লেখার শৈলী বদলে বদলে এগোতে থাকার প্রত্যক্ষ ফল। এর কারণ, আমি পৃথিবীর বিশেষ এই প্রান্তে বসে লেখক হতে চাইছি, ইয়োরোপের থেকে অনেকটাই দূরে, ---অন্তত সে সময়ে সেরকমই দূর বলে মনে হত। সেইসঙ্গে এক বিশেষ ধরনের জলবায়ু আর বিশেষ ধরনের সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠা বিশেষ এক ধরনের মানুষই হবেন আমার পাঠক। এই ব্যাপারগুলোই আমাকে স্বকীয়তা এনে দেয়। একটু সস্তায় বাজিমাত হল হয়ত, কিন্তু আমি স্বকীয় হয়ে উঠলাম। পাশাপাশি কাজটা বেশ কঠিনও, কারণ সাহিত্যের শৈলী এক দেশের থেকে আরেক দেশে এমনি এমনি যায় না, অনুবাদও হয় না। 

স্বকীয় হবার ফর্মূলা কিন্তু খুব সহজ। এমন দুটো জিনিসকে একসঙ্গে করে লিখে দিন, যা আগে কখনো করেননি কেউই। যেমন ধরুন, ‘ইস্তানবুল’ বইটা। পুরনো একটা শহর নিয়ে প্রবন্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হল, এর আগে বেশ কিছু বিদেশি লেখক এই শহরটাকে দেখেছেন, লিখেও গেছেন, যেমন ধরুন ফ্লবেয়র, নেরভাল, গোঠিয়ে, তাঁদের দেখা পরবর্তীকালে তুরস্কের লেখকদেরকে কতটা প্রভাবিত করতে পেরেছে? এই প্রবন্ধে ইস্তানবুলের রোমান্টিক নিসর্গে যেটিকে একসঙ্গে করে দেওয়া হয়েছে, সেটি হল আত্মজীবনী। অবশ্যই যা আগে কখনো কেউ করেননি। একটু ঝুঁকি নিলে আপনিও নতুন কিছু লিখে ফেলতে পারবেন। আমি শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত সচেতন থেকেছি, যাতে ‘ইস্তানবুল’ একেবারেই স্বকীয় একটি বই হয়ে ওঠে। জানি না, কতটা কি করতে পারলাম। ‘দ্য ব্ল্যাকবুক’ নিয়েও একই কথা বলব। প্রুস্তের নস্টালজিক গদ্যে এসে মিলেছে ইসলামি উপকথা, লোকশ্রুতি, রূপক, হেঁয়ালি আর রহস্য। সব কিছুকে নিয়ে ফেললাম ইস্তানবুলে, তারপর দেখুন কি হয়। 


আনজেল :
‘ইস্তানবুল’ পড়লে মনে হয় আপনি বরাবরই খুব একলা। এমন কি আধুনিক তুরস্কেও একজন লেখক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই একাকিত্বের জীবন কাটিয়েছেন। এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠেছেন এবং দিনের পর দিন থেকে গেছেন, যার থেকে আপনি অনেককাল আগেই থাকতেই কার্যত বিচ্ছিন্ন। 

পামুকঃ 
যদিও আমি একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়েছি, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশারও শিক্ষা পেয়েছি, কিন্তু কিছু দিন পরেই অনুভব করেছি এবার নিয়মগুলোকে ভাঙার সময় এসেছে। একটি আত্ম-ধ্বংসী সত্তা বাস করে আমার ভেতর, যা প্রচণ্ড রাগের মাথায় আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রিয় মানুষজনের সান্নিধ্য এড়াতে চাইলে মানুষ যা যা খারাপ কাজ করে থাকে, আমি সেগুলোই করি। একটা বয়সে ভাবতাম, এত লোকজন, জনসান্নিধ্য, সব বোধহয় আমার কল্পনাশক্তিকে নষ্ট করে দিতে চাইছে। কল্পনাশক্তিকে চাঙ্গা রাখতে হলে আমাকে একাকিত্বের যন্ত্রণা নিতে হবে। তবেই আমি ভাল থাকব। আবার তুরস্কের মানুষ বলেই বোধহয়, পরের মুহূর্তে ভালোলাগার মানুষগুলোর একটু খবরাখবর নিতে ইচ্ছে করে, এই খবর নেওয়ার জগতটাও হয়ত এতদিনে ধ্বংস করে ফেলেছি। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় ‘ইস্তানবুল’ লেখার পর ---কেউই কারও মুখ দেখি না আর। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় দীর্ঘ দিন পর পর। সাম্প্রতিক কিছু কথাবার্তা কি মন্তব্যের কারণে হোক, তুরস্কের জনসাধারণের সঙ্গেও আমার সম্পর্ক খুব সহজ কিছু নয়। 


আনজেল : 
আরও কতটা তুর্ক হতে পারেন বলে মনে হচ্ছে, এর পরেও? 

পামুকঃ 
প্রথমত বলে রাখি, তুর্ক-বংশে জন্ম আমার। খুব খুশিও আমি তা নিয়ে। তবে আন্তর্জাতিক নজরে আরও বেশি মাত্রায় তুর্ক বলে পরিচিতি পেয়েছি, যত না আমি নিজে। আমি একজন তুরস্কের লেখক, এটাই কিন্তু আমার প্রধানতম পরিচয়। প্রুস্ত যখন প্রেমের কথা লিখেছেন, লোকে ওঁর লেখায় সার্বজনীন প্রেমের অনুভূতি পেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু আমি যখন প্রেমের কথা লিখি, লোকে বলে, এতো তুরস্কের প্রেম! আমার লেখা প্রথম অনুবাদ হল যখন, সবচাইতে খুশি হয়েছিল আমার দেশের লোকেরা। তাঁরা চিরকালই আমাকে একান্ত কাছের কেউ মনে করেছেন। তুর্ক হয়ে জন্মানোর চাইতেও কাছের। যেদিনই আপনি আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পাবেন, আপনার তুর্ক-অস্তিত্ব জ্বল জ্বল করে ফুটে উঠবে। সেই তুর্ক-অস্তিত্বকে সোনার অক্ষরে লিখে রাখবেন তুর্ক’রাই। নতুন করে আরেক প্রস্থ আপনাকে স্বীকৃতি দেবে। এরপর আপনার স্বদেশী সত্তাটিকে একদিন নিজেরই হয়ত অচেনা ঠেকতে পারে, কারণ চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে আপনার সত্তাটির। সত্যি মিথ্যে সব যেন কেউ বা কারা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। আমার লেখায় শিল্পসত্তার খোঁজ না করে, কিভাবে তুরস্ক নামের দেশটাকে বিশ্বের সামনে মেলে ধরছি আমি, সেটাই তাঁদের একমাত্র ভাবনা। ব্যাপারটা আমাকে আজও দেশের মাটিতে প্রচণ্ড অসুবিধেয় ফেলে দেয়। প্রেস আর মিডিয়ার প্রচারের চোটে, যারা কোনোদিন আমার একটা বইও পড়েননি, সবার আগে তাঁরাই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকেন, সাম্প্রতিকতম উপন্যাসে আমি বাইরের পৃথিবীর সামনে তুরস্কের কোন গোপন কথাটা ফাঁস করে দিতে চলেছি। সাহিত্যে ভালোর পাশাপাশি থাকে খারাপ, দেবদূতের আশেপাশেই ঘোরে দানব, আরও কত কি, ...কিন্তু তাঁরা শুধু দানবের ভয়টুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে ভালবাসেন। 



ইউটিউবে ওরহান পামুকের কয়েকটি সাক্ষাৎকার

Orhan Pamuk: The Secret to Writing is Rewriting

সময় : ৩০৩৪ মিনিট

সময় : ২৩.৩৪ মিনিট

Orhan Pamuk | A Strangeness in My Mind

সময় : ১.০০.০৩ মিনিট
সময় : ৫৮.০৩ মিনিট






অনুবাদক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
গল্পকার। অনুবাদক। বাচিক শিল্পী।
কোলকাতায় থাকেন

২টি মন্তব্য:

  1. চমৎকার অনুবাদ, এক বসায় পড়া শেষ করলাম

    উত্তর দিনমুছুন
  2. সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত একটি অসাধারণ কাজ করেছেন। চমৎকার ঝরঝরে অনুবাদ। অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

    উত্তর দিনমুছুন