রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকার : দি আর্ট অফ ফিকশন


বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নারী লেখক জয়েস ক্যারল ওটসের জন্ম ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্কের লকপোর্টে। ছোটবেলায় দাদির কাছ থেকে উপহার পাওয়া টাইপরাইটারে লেখালেখির শুরু হলেও তিনি সেই বয়সের কথা এখন আর মনে করতে পারেন না যে ঠিক কখন থেকে লেখা অর্থাৎ গল্প বলা শুরু। তিনি একের পর এক উপন্যাস লিখেছেন, গল্প লিখেছেন। তার রচনার পরিমাণ বিপুল- ৫৬টি উপন্যাস, ৮ টি গল্প সংকল্পনসহ বেশ কিছু নাটক এবং প্রবন্ধ। রবার্ট ফিলিপসের নেওয়া জয়স ক্যারল ওটসের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় প্রখ্যাত সাময়িকী দ্য প্যারিস রিভিউ-এ, ১৯৭৮ সালের শরৎ-শীত সংখ্যায়। গল্পপাঠ-এ মূল্যবান এ সাক্ষাৎকারটি সম্পুর্ণ অনূদিত হলো।


দি আর্ট অফ ফিকশন
জয়েস ক্যারল ওটস-এর প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকার
অনুবাদ এমদাদ রহমান

জয়েস ক্যারল ওটস এমন একজন লেখক যার লেখালেখি পরিমাণে বিপুল, লেখক হিসেবে যিনি নিজের কাজের প্রতি অধিকমাত্রায় নিবেদিত, নিরহঙ্কার এবং পরিশ্রমী; তাঁর নানা ঘরানার বইয়ের তিনজন প্রকাশক আছেন— যাদের একজন কথাসাহিত্যের, একজন কবিতার এবং অন্য একজন প্রকাশকও আছেন যিনি তাঁর ব্যতিক্রমী লেখাগুলো প্রকাশ করে থাকেন, সেসব বই হচ্ছে নানামাত্রিক গদ্য যেমন দিনলিপি, সমালোচনা এবং নিজের লেখা সম্পর্কিত গদ্য, যে-লেখা প্রকাশের জন্য অন্য প্রকাশকদের তিনি সময় দিতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ‘অন্টারিও রিভিউ’-এর জন্যও তিনি কাজ করেন, নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ‘অন্টারিও রিভিউ’ সম্পাদনা করেন তাঁর স্বামী, ওটস সেখানে সম্পাদনা সহকারী। 

ওটসের ব্যক্তিত্ব আকর্ষণীয়, দেখতে হালকা-পাতলা গড়নের হলেও তাঁর কালো চুল এবং বড় বড় অনুসন্ধানী চোখ তাঁকে লেখক হিসেবে প্রকশে উন্মুখ থাকে সব সময়; আকর্ষণীয় হলেও তিনি ফটোজেনিক নন, যে-ছবিতে তিনি তাঁর সহজাত ব্যক্তিত্বে মূর্ত হয়েছেন, আজ পর্যন্ত একটি ছবিও আমি দেখিনি। তিনি অন্তর্মুখী, নির্লিপ্ত, কিছুটা উদাসীন, ইতিমধ্যে তাঁর বেশ কিছু বইয়ের প্রকাশ যার মধ্যে আছে উপন্যাস, গল্প, নাটক; এবং ‘ন্যাশনাল বুক এ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার পরেও তিনি নিজেকে খোলসের ভেতর রাখতে চান, নিজের ভেতরে নৈঃশব্দ্যের আরাধনা করেন এবং লেখক-জীবন যাপন করেন।

এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হয়েছিল উইন্ডসর-এর বাড়িতে, ১৯৭৬-এর গ্রীষ্মে, স্বামিসহ প্রিন্সটনে তাদের চলে যাওয়ার আগে। আলাপে তাঁর বলার কোমল স্বরটি ছিল একজন প্রকৃত চিন্তাশীল মানুষের। সাক্ষাৎ করতে আসা যে কারও মনে হতে পারে যে লেখক ওটস নিখুঁতভাবে গঠিত বাক্য ছাড়া কিছুতেই কথা বলবেন না। তিনি আমার সমস্ত প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর দিচ্ছিলেন সোফায় বসে, কোলে ছিল তাঁর প্রিয় পার্সিয়ান বিড়াল। ওটস নিঃসন্দেহে বিড়ালপ্রেমী, সম্প্রতি প্রিন্সটনের বাড়িতে আরও দুটি বিড়ালছানা নিয়ে এসেছেন। 

ডেট্রয়েটের তীরে বসেও আমাদের আলাপ চলল, কয়েকঘণ্টা ধরে; জানালেন এখানে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে চান, দিক্চক্রবাল আর নৌকোগুলো দেখতে দেখতে গল্পের চরিত্রদের নিয়ে ভাবতে চান যাদের তিনি লেখায় এতদিন ধরে এঁকেছেন, আরও আঁকবেন। এখানে বসে তিনি জীবনের অন্তরঙ্গ তরঙ্গটিকে আত্মায় ধরতে চান, তাঁর মানসপটে দেখতে চান তাঁর চরিত্রদের; তারপর লেখার ঘরেন গিয়ে কাগজে লিখে ফেলতে চান স্বপ্নের লেখাটিকে- কাগজের বুকে; তাঁর লেখার ঘরটি নদীমুখী।

নিউ ইয়র্কে, ১৯৭৬-এর ক্রিসমাসেও আমাদের আলাপ চলছিল, যখন ওটস এবং তার স্বামী একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন, যা ছিল ওটসেরই লেখালেখির ওপর; সেমিনারটি ছিল ‘মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ এসোসিয়েশন’-এর সে-বছরের সম্মেলনের একটি অংশ। ওটস এই সাক্ষাৎকারের বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন চিঠিতে; তাঁর মনে হয়েছিল উত্তরগুলো কেবলমাত্র লিখে দিলেই ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা ছাড়াই ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন তা তিনি বলতে পারবেন।


সাক্ষাৎকারী :
এই প্রশ্নটি দিয়েই আমরা আলাপ শুরু করতে পারি : আপনার বিরুদ্ধে বারবারই এই অভিযোগ ওঠেছে যে আপনি বেশি লেখেন! 

ওটস :
লেখকের জন্য বেশি লেখা এমন এক ব্যাপার সত্যিকার অর্থেই যার কোনও তাৎপর্য নেই, এতো সমালোচনারও কিছু নেই; তাহলে? এখানে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো একজন লেখকের কাজ কতটা শক্তিশালী, মনে রাখবার মতো তেমন বই তাঁর ক’টি? দেখুন, পুরো ব্যাপারটিই এমন, আমরা লেখকরা প্রচুর লিখছি, একের পর এক বই করছি যেন বহুদিন টিকে থাকে এমন একটি বই লিখতে পারি। একজন তরুণ লেখক কিংবা ধরুন একজন উদীয়মান তরুণ কবিকে তাঁর প্রথম অসামান্য কবিতাটি লিখবার আগে কয়েকশ কবিতা লিখে যেতে হয়। প্রতিটি বই যেভাবে লিখিত হয়, তা লেখকের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকেই প্রকাশ করে, প্রতিটি নতুন বইই লেখকের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে আর লেখক সব সময়ই অনুভব করেন যে লেখা হচ্ছে তাঁর জীবনের এমন এক কাজ, যে-কাজের জন্যই কেবল তাঁর জন্ম হয়েছে। তারপর দিনে দিনে, যেভাবে বছরগুলো পার হয়, ততোই লেখক তাঁর লেখায় জটিল হতে থাকেন, লেখক ততো নির্মোহ হয়ে তাঁর সৃষ্টিকে বিচার করার সুযোগ পান; তিনি আত্মসমালচক হয়ে ওঠেন। 

এই মুহূর্তে আমি ভাবতে পারছি না কী বললে আরও যথাযথ বলা হবে। যারা মনে করেন আমি প্রচুর লিখি, এমন সমালোচকদের অবজ্ঞাপূর্ণ অবস্থানের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলতে পারি তারা যা বলেন তা ভুল বলেন কেননা তারা হয়ত মনে করেন- আমার সর্বশেষ প্রকাশিত বইটির যখন সমালোচনা করবেন, তার আগে আমার আগের বইগুলো পড়তে হবে। (আমার তো মনেই হয় যে এ-কারণে তারা বিরক্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখান)। একটি বই সব সময়ই আলাদা অন্য বইয়ের থেকে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, এবং স্বতন্ত্র; সে একা একাই আপন শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে; সুতরাং এটা কোনও বিবেচনারই বিষয় নয় যে বইটি লেখকের প্রথম বই না দশম বই না পনেরতম।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার যারা সমালোচক- তাদের মন্তব্যগুলো পড়ে দেখেন? কোনও দিন কোনও বই-রিভিউ থেকে নেওয়ার মতো কিছু পেয়েছেন?

ওটস :
রিভিউগুলো যে পড়ি না তা নয়, মাঝে মাঝে পড়ে দেখি; আবার আমাকে যেসব সমালোচনামূলক গদ্যগুলো পাঠান হয়, সেসবও পড়ি। সমালোচনামূলক লেখাগুলো নিজ গুণে গুণান্বিত হয়ে থাকে! তবে, হ্যাঁ, এটা জেনে ভালোই লাগে যে কেউ একজন লেখা পড়েছে এবং পাঠকৃতি জানিয়েছে। বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছে, পড়ে আন্দোলিত হয়েছে, বুঝতে পেরেছে আর আমার প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে বেশ সারগর্ভ একটা পাঠকৃতি লিখেওছে- এমনটা অবশ্য মনে হয় না...বেশিরভাগ রিভিউ যে দৌড়ের ওপর লেখা, মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া, আর নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে না পারা- এটাই প্রকট থাকে খুব। ফলে, এসব রিভিউ একজন লেখক যদি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেন তাহলে নিশ্চিত যে তিনি বিভ্রান্ত হবেন। আবার এটাও ঠিক- এক দু’জন ব্যতিক্রম বাদ দিলেও লেখকরা সময়ে সময়ে হাততালি দিয়ে নিজেকে বাজান, নিজেকে আলোচনায় রাখেন। আমার কাছে এসব অভিজ্ঞতাও দারুণ কিছু। এসব কী লেখককে বাঁচিয়ে রাখে, রাখতে পারে? একদিন সে লেখকের লেখার কথা কেউ বলে না এমন কি তার মৃত্যুর পর আর পাঠকও থাকে না। আমার মতো একজন লেখক, যার বেশ কয়েকটি বই বেরিয়েছে, তার একটা শক্ত খোলস থাকা দরকার, নির্লিপ্তি দরকার, আত্মগোপন দরকার; অন্যের কাছ থেকে মৌখিক আক্রমণ বা সমালোচনাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতাও থাকা দরকার, হয়তো সে লেখকের ভেতরে, তার অন্তর্জগতে বাস করছে এক দুর্বল ডানাওলা কিন্তু খুব আশাবাদী এক প্রজাপতি! 


সাক্ষাৎকারী :
আবারও ‘প্রচুর লেখা’র প্রসঙ্গে আসি, কখনও কি হাতে না লিখে যন্ত্রের সাহায্য নিয়েছেন? 

ওটস :
না। অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? আমি শেষ দিকের কয়েকটি উপন্যাস প্রথমে হাতে লিখেছি। ‘দ্য এসাসিন্স’-এর বেলায় হলো কী- খসড়া পৃষ্ঠা আর নোট মিলে বিরাট এক তালগোল পাকানো অবস্থা তৈরি হয়ে গেল যা ছিল রীতিমতো ভয়ংকর ব্যাপার, আমার কাছে; সব মিলিয়ে প্রায় আট শ পৃষ্ঠার এক স্তূপ, হাজারখানেকও হতে পারে। এই কথা মনে করাটাই আমার জন্য উদ্বেগের। ‘চাইলওল্ড’ উপন্যাসটি অবশ্যই হাতে লেখার দরকার ছিল; লিখেওছি। 

আমার বেলায় যা কিছুই লিখি না কেন, তা হাতে লিখলেই লেখাটি তাঁর প্রকৃত অভিব্যক্তি খুঁজে পায়, টাইপরাইটারকে তখন আমার দূরের, প্রায় অচেনা কিছু মনে হতে থাকে, যেন তাঁকে আমার দরকারই নেই। টাইপরাইটার এক এলিয়েন যা আমার জন্য নয়। আমার প্রথম উপন্যাসগুলি একটি টাইপরাইটারে লেখা ছিল: প্রথম খসড়াটি সরাসরি মাধ্যমে, তারপরে সংশোধনগুলি, তারপরে চূড়ান্ত খসড়া। তবে আমি আর এটি করতে পারি না।

যন্ত্রের ভেতর দিয়ে আমি আমার ভাবনাকে ঠিক ধরতে পারি না, যন্ত্র মোটেই আবেদন তৈরি করতে পারে না। হেনরি জেমসের শেষ দিকের লেখাগুলো আরও ভাল হত যদি তিনি তাঁর সহকারীকে বলতেন, আর সহকারী লিখে ফেলতেন। একটি সাধারন বক্তৃতারও যদি পরে লিখিত গদ্যের রূপ দেওয়া হয়, তাহলে দেখবেন বাচালতা পরিহার করা গেছে, লেখাটি নির্মেদ হয়েছে, যার আবেদন হয়তো বহুদিন ধরে মানুষের ভেতর ক্রিয়াশীল থাকবে।

আমার প্রথম উপন্যাসটির পুরোটাই টাইপরাইটারে লিখেছিলাম : প্রথম খসড়া, তারপর সংশোধন, তারপর চুড়ান্ত খসড়া- এভাবে কাজটি শেষ হয়েছিলন, কিন্তু পরের লেখাগুলোয় আমি আর এসব করিনি, হাতেই লিখেছি, লেখায় যন্ত্রের ব্যবহার সত্যিই অসহ্য। 


সাক্ষাৎকারী :
পুনরাবৃত্তি কি আপনাকে কখনও চিন্তায় ফেলে দেয়—আপনার প্রচুর লেখার কথা মনে রেখেই বলছি — কোনও একটি দৃশ্য লিখলেন, পরে মনে হলো এমন তো আগেও লিখেছেন কিংবা একই চরিত্র আবারও এসে গেছে, এরকম পুনরাবৃত্তি...

ওটস :
মেইভিস গ্যালান্ট, জন চিবার—এই মুহূর্তে যাদের নাম মনে আসলো — এদের মতো কয়েকজন লেখক আছেন যারা কখনওই তাদের নিজেদের লেখা পড়তেন না; আবার দেখুন- এমন লেখকও কতো আছেন যারা নিজের লেখার প্রতি খুবই মনযোগী ছিলেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন, বার বার পড়ে যেতেন। আমি এ দুই শ্রেণির লেখকের মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থান করি, মানে আমার মনে হয় আমি এদের মাঝখানে কোথাও আছি। যদি মনে হয় যে ঠিক একই দৃশ্য আগেও লিখেছি, একই রকম বাক্য আগেও লিখেছি, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারব, একটুও দেরি হবে না। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনি কোন ধরণের কাজের শিডিউল অনুসরণ করেন?

ওটস :
লেখালেখি নিয়ে আমার নির্দিষ্ট কোনও সময়সূচি নেই; তবে, দিনের শুরুতে, কিছু খাওয়ার আগেই লেখা দিয়েই যাত্রা শুরু করি, এটা প্রায়ই হয়, আমি লেখা দিয়েই দিনের শুরুটা করতে পছন্দ করি বহুদিন ধরে। কখনও এমন হয়, লেখা এমন তরতরিয়ে চলতে থাকে যে আমার আর কিছুই তখন মনে পড়ে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোন দিক দিয়ে পার হয়ে যায় টের পাই না, এরকম টানা লিখবার চমৎকার দিনগুলিতে দুপুরের একদম শেষ দিকে কিছু একটা খাওয়া হয়। যেদিন ক্লাস নেওয়ার থাকে, যে-দিনগুলিতে আমাকে ক্লাসে পড়াতে হয়, সেসব দিনে আমি সাধারণত প্রথম ক্লাসের আগে ঘণ্টাখানিক কিংবা কখনও পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জন্য হলেও লিখতে বসি, কিন্তু আমার লেখার জন্য ধরাবাঁধা সময়সূচি নেই; এবং এই মুহূর্তে, আপনাকে সত্যি কথাটা বলি, সবকিছু ছাপিয়ে বরং এখন কিছুটা বিষাদ এবং হতাশায় ভুগছি, অস্বস্তি বোধ করছি, সেটা এমন যেন আমি এখন আর লেখকই নই কিংবা আর লেখায় ফিরতে পারব না, লাইনচ্যুত হয়ে পড়েছি এমন একটা কষ্টদায়ক অনুভূতি, কিংবা লেখালেখির জগৎ থেকেই হারিয়ে গেছি এমনটা মনে হচ্ছে, তার কারণ কি জানেন? কয়েক সপ্তাহ আগে আমি একটি উপন্যাস শেষ করেছি কিন্তু অন্যটি এখনও শুরু করতে পারিনি, কেবল মাত্র নোটবুকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু টুকে রাখা লাইন ছাড়া। 


সাক্ষাৎকারী :
লেখালেখির জন্য আপনি কি মানসিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজনীয় মনে করেন? নিজের যে কোনও মানসিক অবস্থায়ও লেখায় বসতে পারেন? তখন যা কিছু লিখছেন, তাতে কি মনের সে অবস্থার একটা ছাপ পড়ে যায়? আপনি কীভাবে এই অবস্থাকে বর্ণনা করবেন যেখানে আপনি দিনের শুরু থেকে একটানা বিকেল পর্যন্ত লিখতে পারেন?

ওটস :
লেখককে মন মেজাজ, ভাব কিংবা মুড, যাই বলুন না কেন, এ-সম্পর্কে অবশ্যই নির্মম এবং কঠোর হতে হয়। দেখুন, এক অর্থে কিন্তু লেখাই মনের মধ্যে একটা বিশেষ ভাবের বা মেজাজের জন্ম দেয়। শিল্প যদি, এমন সত্যিই এমন হয় যে--আমি যা আজীবন বিশ্বাস করে এসেছি--শিল্প যদি এমন হয় যে এটা সত্যিকার অর্থেই এমন এক ব্যাপার যা মানুষের কল্পনার অধিক, কিছুটা অলৌকিক, মানসিক ক্রিয়াপ্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ব্যাপার বা ঘটনা কিংবা কাজ হয়ে থাকে— সাহিত্য শিল্পের এমন একটি মাধ্যম, যার ভেতরে আমরা সমস্ত রকমের সীমিত ধারণা বা সীমাবদ্ধ চিন্তা থেকে বের হয়ে অসীমে যাত্রা করি, যা হতে পারতো কিন্তু হয়নি, তা নিয়ে কারবার করি, সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাই, এবং যা কি না সমস্ত রকমের সীমাবদ্ধতা এবং সংকীর্ণতা থেকে আমাদের মনকে মুক্ত করে দেয়, দেখুন, তখন কিন্তু আর লেখকের মনে মেজাজে বা আবেগে কী ঘটে চলেছে বা চলছে তাতে বেশি কিছু যায় আসে না বা সেটা তখন আর খুব বড় বিষয় হয়ে ওঠে না। এ বিষয়টিকে আমি সত্য বলে মনে করেছি : নিজেকে যখনই আমি পুরোপুরি নিঃশেষ মনে করেছি, শ্রান্ত ক্লান্ত মনে করেছি, যখনই আমি আমার আত্মাকে খেলার তাসের মতো পাতলা এক টুকরো কাগজ বলে অনুভব করেছি, করি, যখন মনে হয়েছে পাঁচ মিনিটের জন্যও সহ্য করার মতো কিছুই নেই, ঠিক তখনই আমি নিজেকে লেখাতে বাধ্য করি; জোর করে লিখতে বসি... এবং তারপরই আমার ধ্যান জ্ঞান সব লেখায় নিবদ্ধ হয়, লেখা এবং একমাত্র লেখাই চারপাশটাকে বদলে ফেলে। জয়েস তাঁর ইউলিসি লিখবার নিহিত কাঠামোটি সম্পর্কে বলেছিলেন, যে-ইউলিসিসকে তিনি হোমারের মহাকাব্য ওডিসির সমান্তরালে রচনা করেন। ইউলিসিসে বর্ণিত হয়েছে মহান এক গ্রিক বীরের কথা যিনি ট্রয়ের যুদ্ধ জয় শেষে মাতৃভূমি ইথাকায় ফিরে যাচ্ছেন, জয়েসের উপন্যাস পৌরাণিক আখ্যান থেকে মানবিক আখ্যানে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর সৈন্যদের পার হওয়ার জন্য যে সেতুটি তৈরি করছেন তাঁর নির্মাণ যথার্থ হলো কি না তা নিয়ে চিন্তা করেন নি। সৈন্যদের সেতু পার হয়ে যাওয়ার পর সেটা ধ্বসে পড়লে কী এসে যায়? আপনি যা লিখছেন, সে লেখায় যদি আপনার মনের অবস্থার ছাপ পড়ে যায়? হ্যাঁ, জয়েসের মতো অন্য একজন লেখকও হয়তো এটা মনে করতে পারেন যে তাঁর লেখায় নিজেকে নিজের মন মেজাজের ছাপ যদি পড়েও, তাতে কী এমন এসে যায়! একবার যদি সৈন্যরা তীব্র জলস্রোত পার হয়ে যেতে সমর্থ হয়, তাতেই মুক্তি, তাতেই লেখার গভীর আনন্দ।


সাক্ষাৎকারী :
যখনই একটি উপন্যাস লেখা শেষ হয়, তখন কী ঘটে? পরের উপন্যাসটি, যা তখনও লিখিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে, সেটা লিখতে শুরু করেন? উপন্যাসটি লিখবার সমস্ত কিছু কি তৈরি করাই থাকে? কিংবা নিজে থেকেই যা কিছু একটা লেখা নিজের ইচ্ছে মতো শুরু করতে পারেন? 

ওটস : 
যখন একটি উপন্যাস লেখা শেষ হয়, তখন তাকে এক পাশে ফেলে রাখি, সেদিকে আর তাকাই না; বরং তখন গল্প লিখতে শুরু করি। সদ্য সমাপ্ত উপন্যাস পাশেই পড়ে থাকে! কিংবা অন্য কোনও দীর্ঘ লেখার কাজে হাত দিই, সে হতে পারে উপন্যাস- আমার কাজ এভাবেই এগিয়ে চলে। এভাবে তখন একটি উপন্যাস শেষ করি, তখন আবার আমি আগের উপন্যাসটিতে ফিরে আসি এবং উপন্যাসের বহু অংশ পুনর্লিখিত হতে থাকে আর ঠিক সেই সময়টায় এই মাত্র শেষ করা দ্বিতীয় উপন্যাসটি হয়তো পড়ে আছে ডেস্কের ড্রয়ারে। আবার কখনও আমি দুটি উপন্যাস নিয়েই এক সঙ্গে কাজ করি, যদিও তখন একটি উপন্যাস অন্যটিতে কিছুটা হলেও সম্পাদনায় বাধা তৈরি করে, একই সঙ্গে দুটো উপন্যাসের কাটাছেঁড়া কষ্টকর হয়ে ওঠে। আমি আবিষ্কার করেছি যে লেখা, সংশোধন, আবার লেখা, আবার সংশোধন এসবের মধ্যে যে রিদম বা ছন্দ থাকে, তা যেন আমার চরিত্রের সঙ্গে অনেকটাই মানিয়ে গেছে। যেন আমি এসবে আনন্দ পাই, যেন এসবেই আমার লেখকজীবনের পূর্ণতা! আমার মধ্যে এটা ভাববার প্রবণতা বেশি যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনর্পাঠ বা পুনর্বিন্যাসের শিল্পে আরও বেশি মাত্রায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ব, এবং এমন একটি সময় হয়তো আসতে পারে যখন আমি পুনর্লিখনের ভয়ে উপন্যাস লেখাই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববো। দেখুন, আমার পরবর্তী যে উপন্যাসটি প্রকাশিত হবে, আনহোলি লাভস, সেটা লিখিত হয়েছে আমার ছোটবেলার সময়টিকে নিয়ে; পুরো লেখাতিকেই আমি বার বার পড়েছি, পড়ে পড়ে প্রায় পুরোটাই আবার লিখেছি, এবং দেখুন, গত বসন্তে এবং গ্রীষ্মেও আবার কাটাছেঁড়া করেছি, আবার নতুন করে লিখেছি। নাছোড়বান্দার মতো দ্রুত এবং একটানা লেখার জন্য আমার খ্যাতি সত্ত্বেও, আমি কিন্তু যে কোনও লেখাকে বারে বারে পড়ি, পড়ে পড়ে সংশোধনের পর সংশোধন করতেই থাকি, করতেই থাকি এবং আমি এমন এক লেখক যে নিজের লেখাকে বারবার কাটাছেঁড়া কিংবা সংশোধনের পক্ষে, যা নিজের লেখালেখির মধ্যকার একটি অতি প্রয়োজনীয় শিল্প, যাকে আমি আমার প্রবণতা হিসেবেই গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছি।


সাক্ষাৎকারী :
ডায়রি লেখেন?

ওটস :
মাঝখানে কয়েক বছর জার্নাল লিখেছি। এসব লেখা হচ্ছে নিজেই নিজের উদ্দেশ্যে কিছু লেখা বা নিজেকে নিজে চিঠি লেখার মতো একটা ব্যাপার যার প্রধান বিষয় হচ্ছে- সাহিত্যের নানাদিক। নিজের ভেতরে নিজের জীবনাভিজ্ঞতায় আমার অনুভূতির পরিসর কতটা বিস্তৃতি পাচ্ছে- তাই লিখতাম। যেমন, ধরুন- আমি একটি উপন্যাস সবে শেষ করেছি, তখন ভাবতে বসতাম এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আমার অনুভব, উপলব্ধি কতটা তীব্র ছিল, লেখা কতোটা আনন্দদায়ক ছিল, কতোটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমি দেখতাম যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, বাস্তবতার দিক থেকে সে অভিজ্ঞতা বিভিন্নরকম, যেমন : আমি যেন কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি বা হতাশায় ডুবতে শুরু করেছি, আমার মধ্যে জড়তা এসে গেছে, ব্যর্থ হয়ে গেছি, এবং ডিপ্রেশনে ভুগছি। 

সাম্প্রতিক উপন্যাসগুলোর এমন কতোগুলো পৃষ্ঠা রয়েছে যে পৃষ্ঠাগুলোকে কম করে হলেও সতেরোবার লিখেছি এবং একটি ‘দি উইন্ডোস’ এমন একটি গল্প, হাডসন রিভিউ-এ প্রকাশের আগে তো বারবার লিখেছি, আবার কেটেছি, আবার লিখেছি, প্রকাশের পরেও নতুন করে লিখেছি এবং পরে উভয়ই সংশোধন করেছি এবং আমার এগুলিতে অন্তর্ভুক্ত করার আগে আবার কিছুটা সংশোধন করেছি গল্পের পরবর্তী গল্প বইয়ে দেওয়ার আগে — মনে হচ্ছিল আমার ভেতরে এমন এক শূন্যতা, এমন এক হতাশাবোধের জন্ম হতে চলেছে যা হয়তো অনন্তকালেও শেষ হবে না।

যাই হোক, কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপারটা কেটে যায়, হতাশার কথা আর মনেও থাকে না। আমার অনুভূতিগুলি স্স্ফটিক-স্বচ্ছ হয় (বা, পুরাণ কাহিনি ও রূপকথায় পরিণত হয়) হালকা কোনও জটিলতায়, গভীর-জটিল-কিছুতে নয়। সকলে প্রত্যেকে আমরা জার্নাল লিখি বা দিনপুঞ্জি লিখি নানা কারণে, তারপরও আমি মনে করি- আমাদের লেখকদের সবার মাঝেই একটি সাধারণ মিল আছে যে বছরের পর বছর ধরে বিস্ময়কর যে-নিদর্শনগুলি আমাদের ভেতর জন্ম নেয়, যেসব মহান ভাবনার জন্ম হয়, দৃশ্যের জন্ম হয়, লতাপাতা ফুল ইত্যাদির চিত্রবিচিত্র বক্ররেখার মতো কিংবা লীলায়িত ব্যালে নাচের ভঙ্গিমায়, কিংবা জন্মের পর আবারও হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে, আবার হারায়- তা হচ্ছে একটি কালজয়ী উপন্যাস কিংবা মোটাদাগে একটি ভালো উপন্যাস। আমার জার্নালের স্বরটি ঠিক তারই মতো যাকে আমি খুঁজে বেড়াই, আর যাকে খুঁজে পাই, যে আপনাকে এ কথাটিই শুধু বলবে- আমি যখন ফিকশন লিখবো না তখন এই স্বরেই আমি চিন্তা করি কিংব আ ধ্যান করি।


সাক্ষাৎকারী : 
লেখালেখি ও শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিদিনের ভ্রমণ, হাঁটাহাঁটি, সঙ্গীত- এসবের মধ্যে কোন বিশেষ কাজটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? আমরা জানি আপনি একজন অসামান্য পিয়ানোবাদক?

ওটস :
হ্যাঁ, আমরা প্রচুর ভ্রমণ করি, সাধারণত গাড়িতে করে। বহুবার আমরা মহাদেশ পাড়ি দিয়েছি, ধীরে ধীরে, দক্ষিণে ঘুরে বেড়িয়েছি, দক্ষিণ এবং নিউ ইংল্যান্ডে; আর অবশ্যই নিউ ইয়র্কের আত্মার গভীর ছুঁতে চেয়েছি যেন তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসায় অনুভব করা যায় আর ছিল এমন কিছু খুঁজে বেড়ানো যাকে বলা যায় প্রেমময় অনুসন্ধান, আর পিয়ানোবাদক হিসেবে আমি নিজেকে এক ‘অত্যুৎসাহি আনাড়ি শিল্পী’ মনে করি, যাকে যে কোনও ভুলের ভুলের বারবার ক্ষমা করা যায়, ঠিক তেমন একজন। এছাড়া আমিও আঁকতে পছন্দ করি, গান শুনতে পছন্দ করি, এবং কোনও কিছুই না করে মাঝে মাঝে প্রচুর সময় নষ্ট করে ফেলি, যে-হারানো সময়কে আমি কিছুতেই দিবাস্বপ্ন বলা যায় বলেও মনে করি না।

ঘরবাড়ির কিছু কিছু কাজও আমি করতে পছন্দ করি, খুব সাহসী হয়ে বলতে চাই, এ কাজে আমি আজকের দিনে অনেক অনেক বেশি মনযোগী। আমার প্রবল ঝোঁক রয়েছে রান্নার প্রতি, চারাগাছের যত্ন নেওয়ার প্রতি, ফুলবাগানের প্রতি; সাধারণ এই ঘরোয়া কাজগুলো তো আছেই, তাছাড়া আমার প্রচণ্ড ভালো লাগে শপিংমলগুলোয় ইতস্তত ঘুরে বিচিত্র সব মানুষ দেখা এবং তাদের পর্যবেক্ষণ করা, তাদের কথোপকথনের বিভিন্ন ভঙ্গি আত্মস্থ করা, তাদের পোশাক পরিচ্ছদের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা, তাদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও কথাবলার ধরণ খেয়াল করা। এসব প্রতিদিনকার কাজের মধ্যেই পড়ে। অবিরাম হেঁটেচলা আর গাড়িতে করে এদিক সেদিক যাওয়া- একজন লেখক হিসেবে এ হচ্ছে আমার জীবন যাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনাকে এখানে যা কিছু বললাম, এসব করা ছাড়া নিজেকে আমি লেখক ভাবতে পারি না। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনার লেখা নিজে প্রচুর আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে, আপনি লিখে প্রচুর সম্মানী পেয়ে থাকেন, তারপরও শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। কেন?

ওটস :
উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিনই আমার ব্যস্ততায় কাটে, তার মানে- আমার ওপর তিনটি কোর্সের দায়িত্ব বর্তেছে, যার একটি- ক্রিয়েটিভ রাইটিং, আরেকটি হলো- স্নাতকদের সেমিনার (আধুনিক যুগের); এবং তৃতীয়টি স্নাতক শ্রেণির কোর্স, যেখানে প্রাণবন্ত ১১৫ জন শিক্ষার্থীর, যাদের সঙ্গে সামনে কথা বলা আমার জন্য দারুণ এক ব্যাপার, দারুণ উদ্দিপক; তা হলে কী হবে, আমি তৃপ্তি পাই না, সন্তুষ্ট হতে পারি না। উইন্ডসর ক্যাম্পাসে অনুষদ এবং শিক্ষার্থীদের দারুণ এক সম্পর্ক রয়েছে যা বেশ ইতবাচক। 

এখানে যারা পড়ান, তারা ভালো করেই জানেন যে আপনি কখনওই একটি টেক্সটের সত্যিকার অভিজ্ঞতা পাবেন না, পড়াতেও পারবেন না, যতক্ষণ না আপনি নিজে বিস্তারিত না পড়ছেন, অত্যন্ত তুখোড় মেধাবিদের ক্লাসে। এখান আমাকে ন’জন স্নাতক শিক্ষার্থীর সঙ্গে জয়েসের লেখালেখি নিয়ে ক্লাসের পর ক্লাস করে যেতে হচ্ছে, প্রতিটি সেমিনার হয়ে উঠছে প্রাণবন্ত, উত্তেজনাপূর্ণ (এবং অতলস্পর্শী); এজন্যই আমি, অকপটে বলছি- শিক্ষকতায় আছি, আমি কিছু করার চেয়ে একাজটিতেই আমার জন্য অপার আনন্দ।


সাক্ষাৎকারী :
এ-কথাটি অনেকেই জানি যে আপনার অধ্যাপক-স্বামী আপনার বেশিরভাগ লেখাই পড়েন নি। কেন তিনি আপনার লেখা পড়েন না? বিশেষ কোনও কারণ আছে কি?

ওটস :
একজন অধ্যাপকের নিজস্ব ব্যস্ততা থাকে, রে-ও (রেমন্ড জোসেফ স্মিথ) ব্যস্ত, তাঁকে ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়, অন্টারিও রিভিউ সম্পাদনা করতে হয়, এর বাইরে আরও কিছু কাজ যে তাঁকে করতে না তা নয়; এতো ব্যস্ততার মাঝে আমার লেখা সে পড়বে কখন! রে সত্যিই সময় পায় না। মাঝে মাঝে আমি তাঁকে আমার বইয়ের রিভিউ দেখাই তাঁকে, সে তখন এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে, অবশ্য খুব সংক্ষিপ্তই হয় সেসব কথা। আমি অবশ্য অন্য লেখকদের সঙ্গে নিজের লেখালেখির ব্যাপারে যোগাযোগের কথাও ভেবেছি, যাতে তাদেরকে লেখা পড়াতে পারি, তাদের মন্তব্য শুনতে পারি, কিন্তু কোনও কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। উইন্ডসরে এমন কয়েকজন লেখক আছি আমরা যারা পরস্পরের লেখা কবিতা পড়ি কিন্তু সে অর্থে ক্রিটিক টা আর হয়ে ওঠে না, নিজেদের মধ্যে ক্রিটিক-চর্চা না থাকলে থেমে যেতে হয়। এখানে, উইন্ডসরেও তেমন- পড়ার চেয়ে সমালোচনা কম। যৎসামান্য। আমি সত্যি কথাটিই বলছি, খোলাখুলিভাবে- আমি কখনও নিজেদের লেখা পড়ে পুরোপুরি প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হইনি, যথাযথ ক্রিটিকও করতে পারিনি কেননা, এর মধ্যে আমি হয়তো নতুন উপন্যাস লিখতে শুরু করে দিয়েছি। লিখতে বসে পড়লে মাথায় সমালোচনা থাকলেও আর প্রকাশ করা সম্ভব হয় না, মাথার ভেতরেই থেকে যায়। তবে, লেখায় ডুবে গেলেও নিজের মতামত যে একদমই দেওয়া হয় না, তাও নয়, সাক্ষাতে তা বলা হয়, কখনও অবশ্য লিখেও দেওয়া হয়।


সাক্ষাৎকারী :
আপনি কি কখনও কোথাও নিজেকে আগন্তুক বা নির্বাসিত মনে করেছেন?

ওটস :
এক অর্থে তো আমরা অবশ্যই নির্বাসিত। আমার মনে হয় কী জানেন, আমরা যদি ডেট্রয়েটেও থাকতাম, তাহলেও নিজেদের নির্বাসিত ভাবতাম। ভাগ্যক্রমে, উইন্ডসরে সব দিক থেকেই একটি আন্তর্জাতিক অর্থাৎ কসমোপলিটান কমিউনিটি রয়েছে, এখানে আমাদের কানাডিয়ান সহকর্মীরা তীব্র কিংবা সংকীর্ণ- কোনও দিক থেকেই জাতীয়তাবাদী নয়। এতোটা স্বদেশপ্রীতিও তাদের মধ্যে নেই, বহুজাতিক মনন রয়েছে তাদের।

তবে আমাকে এ ব্যাপারটি বিস্মিত করে — প্রত্যেকেই কি নিজেদের নির্বাসিত ভাবেন? সবার ভেতরেই কি নির্বাসনের বোধ আছে? আমি যখন নিউইয়র্কের মিলারপোর্টের বাড়িতে আসি, কাছের লকপোর্টে ঘুরতে যাই, তখন চারপাশটাকে এতো অপরিচিত লাগে, প্রতিদিন ঘটতে থাকা পরিবর্তনগুলি নিজেকে এখানে একজন বহিরাগত মানুষ বলে ভাবিয়ে ছাড়ে যেন আমি এক আগন্তুক। এভাবে সময়ের একমুখী ধাবমানতা আমাদের সকলকে নির্বাসিতে পরিণত করে। সময় মাঝে মাখে এমন এক কমিক পরিস্থিতি তৈরি করে, মানুষ যুথবদ্ধ থেকেও একা হয়ে যেতে পারে, নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারে, আগন্তুক হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থাকে আমার ট্রাজেডি মনে হয়। উইন্ডসরে তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল কমিউনিটির বাস, আর অদ্ভুতভাবে আমি ও আমার স্বামী এখানে, এই উইন্ডসরেই অন্য কোথাও জায়গার চেয়ে ভালো থাকি, অপরিচয়ও থাকে না।


সাক্ষাৎকারী :
কখনও খুব সচেতনভাবে শুধুমাত্র লেখালেখি করবেন বলে জীবনযাপনকে বদলে ফেলেছিলেন?

ওটস :
জীবনধারা পাল্টে ফেলা বা জীবনযাপন লেখার জন্য নিয়ন্ত্রণ- তেমন একটা হয়নি। প্রকৃতিগতভাবে আমি কিছুটা গোছানো, ছিমছাম, সুশৃঙ্খল, দৃষ্টিশীল, এবং খুঁতখুঁতে এবং অন্তর্মুখী, তাই যখনই লেখালেখির জন্য জীবনযাপনের ধারাকে বদলাতে চেয়েছি তখনই তা আরও জটিল হয়েছে, নির্ভার হয়নি। ফ্লোবের বলতেন লেখকরা বেঁচে থাকুন বুর্জোয়াদের মতো; এক সময় আমি ছিলামও এমন বুর্জোয়া জীবনধারায়, কিন্তু দেখুন- এভাবে হয় না; এভাবে বদলাতে চাইলেও কিছুই বদলায় না। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনি বেশ কিছুদিন লন্ডনে ছিলেন, সেখানেই ‘ডু উইথ মি হোয়াট ইয়্যু উইল’ উপন্যাসটি লিখেছেন, ডরিস লেসিং, মার্গারেট ড্র্যাবল, কলিন উইলসন, আইরিস মারডক প্রমুখ লেখকের সঙ্গে সেখানে আপনার ঘনিষ্টতা হয়েছে; তাদের কথা আপনি বলেছেন, তাদের লেখার রিভিউ করেছেন। একটা কথা কি বলবেন- এখানে আপনার যে অভিজ্ঞতা তার নিরিখে ইংল্যান্ডের সমাজে এইসব লেখকের ভূমিকাটি কেমন- বলে আপনার ?

ওটস :
ইংরেজ ঔপন্যাসিকরা প্রত্যেকেই সমাজ নিরীক্ষক, পর্যবেক্ষক, (সমাজ বলতে আমি কিন্তু সেই বৃহত্তর সমাজকে বোঝাই নি কিন্তু, সাধারণ অর্থে আমরা সমাজ বলে যাকে ধরে নিই, তার কথাই বলছি।) তবে- লরেন্সের মতো (তাঁকে পুরোদস্তুর ইংরেজ বয়া যাবে না) এক দু’জন লেখক ছাড়া অন্য লেখকরা জীবনযাপনের মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিমানুষের বেঁচে থাকবার তাড়না ইত্যাদির চিত্রায়নের প্রতি তীব্র আগ্রহ দেখা যায় না। কিন্তু সেখানে অসামান্য উপন্যাস লেখা হয়েছে। ডরিস লেসিং এমন কিছু বই লিখেছেন যে-বইগুলোকে মোটেও কোনও শ্রেণিতে ফেলা যায় না; ফিকশনাল প্যারাবল, অটোবায়োগ্রাফি, এলিগরি…ঠিক তেমনই জন ফাউস এবং আইরিশ মারডক।

এদিক থেকে আমার মনে হয় মার্কিন উপন্যাসগুলো একেবারেই ভিন্ন। এখানে আমরা কাঠামো ভেঙে ফেলতে পারি, ফর্ম বা রীতি বদলে ফেলি; ঝুঁকি নিয়েই আমরা উপন্যাস লিখতে বসি বলেই আমাদের উপন্যাস উদ্দাম, আরও বন্য, আরও অনুসন্ধানী, এবং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে (ইন্টেলেকচুয়াল লাইফ) আমরা উপন্যাস থেকে দূরে রাখি যা হাক্সলি’র লেখার মতো খণ্ডিত কিছুকে প্রকাশ করে না, ধারণ করে না এবং পাঠককেও ভয় পাইয়ে দেয় না, মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে না; কিংবা আমাদের উপন্যাস ইংল্যান্ডের সি পি স্নো’র মতোও নয়, যা আমার কাছে একঘেয়ে। 


সাক্ষাৎকারী :
ওয়ান্ডারল্যান্ডের ইংলিশ সংস্করণটি শেষ হয়েছে অন্যভাবে যা মার্কিন সংস্করণ থেকে ভিন্ন। এমন কেন? আপনি কি প্রকাশিত লেখাকে প্রায়ই ঘষামাজা করেন? শেষটা বদলে ফেলেন?

ওটস :
এ উপন্যাসটিকে আমি বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলাম, বিশেষ করে উপন্যাসটি প্রথমে যেভাবে শেষ হয়েছিল, প্রকাশের পর আমার মনে হতে লাগল যে এভাবে শেষ করাটা উচিৎ হয়নি, আমি যেন ঠিক এভাবে সমাপ্তি টানতে চাইনি। তাই বলে যে আমি প্রকাশিত অন্য লেখাগুলো বদলে ফেলি তা নয় (তবে অবশ্যই- গল্পগুলোকে বারবার ঘষামাজা করি, আবার লিখি, আবার কাটি; বইয়ে দেওয়ার আগে বারবার গল্পের পুনর্লেখার এ কাজটি আমি করি)।


সাক্ষাৎকারী :
আপনি মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের মতো বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন যা অধিকতর বিশেষায়িত। এ ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল? 

ওটস :
প্রচুর পড়তে হয়েছে। বিগত বছরহুলোয় আমি শরীরে এমন অসুখের এমন কিছু অদ্ভুত লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলাম যে আমার একজন চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ জরুরি হয়ে পড়ে। এক সময় আমাকে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও যেতে বলা হয়। তখন কিছুটা ভয় পাই। নার্ভাস হয়ে পড়ি। তখন কিছুটা নার্ভাসনেস আর কিছুটা কুসংস্কারের কারণে এ জাতীয় রোগ সম্পর্কিত জার্নালগুলি পড়তে শুরু করি। আর পড়তে পড়তে এটা অনুভব করি যে আমার কিছু হবে না, নিরাময়ের উপায় আছে।


সাক্ষাৎকারী :
ওষুধ এবং চিকিৎসা নিয়ে লেখা ছাড়াও, আপনি আইন, রাজনীতি, ধর্ম, জনপ্রিয় খেলা এবং দর্শকদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন: আপনি কি সচেতনভাবে কাজটি করছেন? মার্কিন জীবনকে সব দিক থেকে ধরবার পরিকল্পনা থেকে করেছেন?

ওটস : 
খুব সচেতনভাবে যে করছি, তা নয়। মৃত্যুচিন্তার অভিঘাত আমার ভেতর ‘ওষুধ এবং চিকিৎসা’ নিয়ে যে মহান অনুভবটি দিয়েছিল তাতে আমি গভীরভাবে তাড়িত হই, আমি হাসপাতাল, অসুস্থতা, চিকিৎসক, মানুষের মরতে থাকা, মৃত্যুর জগৎ, আর এসবের বিরুদ্ধে মানুষের নিত্যদিনের প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা- আমাকে ভাবিয়ে তোলে। (আমাদেরই এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, যিনি আমার খুব প্রিয় ছিল ছিলেন, সব সময় আমি যার কাছে কাছে থাকতাম, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে একটু একটু করে মারা গিয়েছিলেন।) ‘মৃত্যু’ নিয়ে মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, যে অসহায় আত্মসমর্পণ সমসাময়িক কালেও দেখা যাচ্ছে, মৃত্যু নিউএ অধুনা যে ভাবনা মানুষ ভাবছে- আমি সেসব নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি, নিজের ভেতরে মৃত্যুকে ধারণ করেই যেন আমি কাজটা করতে চেয়েছি। 

আমার অবিরাম চেষ্টা ছিল একটি কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে, এবং আমাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দিয়ে দেওয়ার, উপন্যাসে রূপকের জন্ম দেওয়ার, উপন্যাসটিকে লিখে ফেলা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল, পাঠকদেরও পড়তে অসুবিধা হয়েছিল।

আইন কানুন সম্পর্কে ষাটের দশকে আমরা যেসব চিন্তাভাবনা করছিলাম তা অনেকটাই এরকম ছিল : ‘আইন’ ও ‘সভ্যতা’র মধ্যে কী সম্পর্ক, ‘আইন’ বাদ দিয়ে সভ্যতার কাছে আমরা কী আশা করতে পারি, আমাদের ঐতিহ্য থেকে যে আইনের জন্ম হয়েছে, সে আইন সহ সভ্যতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী ? অধিকতর ব্যক্তিগত বিষয়গুলো ‘অপরাধ’ এবং ‘অপরাধবোধ’-এর মতো বড় ইস্যুর সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়;এখান থেকেই আমার মনে হতে থাকে যে আমি এমন একটা কিছু লিখব যা হবে সংবেদনশীল, তাৎপর্যপূর্ণ, যা একদম ব্যক্তিগত গণ্ডিকে ছাপিয়ে যাবে, যাতে আমি এমন কিছু দেখাতে পারব- যা আমরা দিনের পর দিন যাপন করছি, যার সঙ্গে অনেকেই একাত্ম হবেন, পড়বেন, নিজেকে খুঁজবেন; কিন্তু দুর্ঘটনাক্রমে নিজেকে আবিষ্কার করলাম যে আমি এমন এক নারীর কথা লিখছি পুরুষের জগতে যে নারী (এলিনা) জন্ম থেকেই জীবন বঞ্চিত, জন্ম থেকেই যে বিকৃত আচরণের শিকার হয়েছে, ধীরে ধীরে আইনের প্রতি যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে, বাবা যাকে অবহেলা করবে, মা থাকবে যার প্রতি অমনোযোগী, যে নারীর জীবন কাটবে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অন্যের আদেশ মেনে মেনে; অপরাধ যৌনতা শাস্তি বঞ্চনা অবহেলা আইন ভঙ্গ- ইত্যাদি নিয়ে একটা কিছু লেখা যা হয়ে উঠবে একটি উপন্যাস, এভাবে ‘ডু উইথ মি হোয়াট ইউ উইল’ প্রকাশিত হয়েছিল। 


সাক্ষাৎকারী :
এটি নিছক জটিলতার বিষয় নয়। কেউ একজন মনে করতে পারে যে আপনার আখ্যান (ফিকশন) জরুরি বিষয় হয়ে উঠছে, অনেক বেশি মনোগত, সাব্জেক্টিভ এবং বাইরের জগতের ডিটেইলস তাতে অনেক কম থাকছে, বিশেষ করে ‘চাইল্ডওল্ড’; জানতে চাই চাইল্ডওল্ড-কে ‘কাব্যিক উপন্যাস’ লেখার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা ছিল, নাকি এ একটি দীর্ঘ কবিতাই?


ওটস :
আমি এভাবে ভাবছিই না, মনে করছি না যে ‘চাইল্ডওল্ড’ অন্তর্মুখী, বাইরের জগতের ডিটেইলসের প্রতি সে মনযোগী নয়, উদ্বিগ্ন নয়। প্রকৃতপক্ষে, এ উপন্যাসটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে ভিজ্যুয়াল ডিটেইলস দিয়ে প্রস্তুত- জগতের অপার নৈঃশব্দ্য, বার্টলেটদের নিজস্ব খামার এবং তাঁদের সেই ছোট্ট শহরটি তারা যেখানে থিতু হয়েছে; তবে, আপনিই ঠিক, সত্যিই বলেছেন যে ‘চাইল্ডওল্ড’ ‘কাব্যিক উপন্যাস’। উপন্যাসের ফর্মের ভেতরে আমি আসলে একটি গদ্য কবিতার জন্ম দিতে চেয়েছিলাম, কিংবা গদ্য কবিতার ফর্মের মধ্যে লিখতে চেয়েছিলাম একটি উপন্যাস। 

এ উপন্যসটি লিখতে গিয়ে আমার কাছে উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়টি ছিল- কবিতার চিত্র-কেন্দ্রিক-কাঠামো এবং উপন্যাসের বর্ণন কেন্দ্রিক কাঠামো ও রৈখিক কাঠামো, যা কি না আন্তঃব্যক্তিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় উপন্যাস গড়ে ওঠে- আমাকে তার মোকাবেলা করা, সে টেনশন দূর করা। অন্যভাবেও বলা যায়- কবিতা চিত্রকল্প বা প্রমিতা, নির্দিষ্ট কিছু জিনিস অথবা সংবেদন অথবা বা অনুভূতির দিকে ফোকাস করে, কাব্যিক-আখ্যান তখন সময় এবং স্থানের গতির প্রতি ফোকাস করে। একটি জোর দেয় স্থিতির প্রতি, অন্যটি আন্দোলন বা চলনের প্রতি। ফলে আমার মধ্যে এমন এক টেনশনের জন্ম হয় যা উপন্যাস লেখাকে চ্যালেঞ্জে পরিণত করে ফেলে। আমি মনে করি এ কাজটি পরীক্ষামূলক কাজ, তবে আমি আমার কাজ সম্পর্কে এমন ভাবনায় লজ্জিত হই, দ্বিধান্বিত থাকি- নিজের ভেতর এমন আত্ম-চেতনার জন্ম দিতে চাই না যে আমার সম্পর্কে কেউ এটা যেন না ভাবে যে আমি একজন ‘এক্সপেরিমেন্টাল’ লেখক। সমস্ত লেখাই এক্সপেরিমেন্টাল।

নিজের স্বার্থে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমার খুব একটা আগ্রহ নেই, তাতে নিজেকে কী মনে হয় জানেন? মনে হয় আমি এখনও পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি মানে এখনও ষাটের দশকের গোড়ায় পড়ে আছি ঠিক যখন ‘ডাডাইজম’ আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, পুনর্জীবন পেয়েছিল। এক অর্থে আমরা সকলেই ফিনেগানস ওয়েক-পরবর্তী লেখক এবং জয়েস এবং কেবল জয়েসই এমন এক লেখক যিনি সবচে সফল আর দীর্ঘ পরীক্ষাটি করে গেছেন। এমন ভয়ঙ্কর কাজ আর কে করতে পারতেন?

সমস্যাটি হলো অলোকসামান্য, কালোয়াৎ ও শিল্পসফল উপন্যাস মনীষা এবং প্রজ্ঞাকে স্পর্শ করতে চায়, তার আবেদনের জায়গাটি হচ্ছে মননগভীরতা, বুদ্ধি; যেখানে একজনের আবেগের স্থানটি ঝাপসা, সহজে বোঝা যাবে না। আমি যখন ছাত্রদের সামনে ফিনেগানস ওয়েকের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা উচ্চস্বরে পড়ি, আর ধীরে ধীরে সেই গৌরবান্বিত এবং হৃদয়মথিত চূড়ান্ত পর্বে চলে আসি (“But you're changing, acoolsha, you're changing from me, I can feel”) তখন আমার কেবলই মনে হতে থাকে যেন উপন্যাসের আত্মাকে অনুভব করছি, প্রায় অপ্রত্যাশিত সুন্দর সংবেদনটি আমাকে তাড়িত করছে, আমাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে; তবে এটা ভাবা বোকামিই হবে যদি মনে করি যে গড়পড়তা পাঠক, এমনকি গড়পড়তা মেধাবী পাঠক, ফিনেগানস ওয়েক-কে পড়তে কষ্ট করতে রাজি হবে। 

এ উপন্যাসের ঘনবুনট নিবিড় পৃষ্ঠাগুলির মধ্যে লেখকের আবেগমথিত এবঙ প্রজ্ঞাময় হৃদয়টি যেন খোদাই করা হয়েছে, সে হৃদয়টি এক জিনিয়াসের, যার কীর্তি কালজয়ী। ‘ইউলিসিস’ আমাকে আরও বেশি টানে, আবেদন করে। ইউলিসিসের প্রকৃতিবাদ ও প্রতীকের মনোমুগ্ধকর সংশ্লেষণটি আমার মেজাজের সঙ্গে খুব যায়। আমি কিছু বই লেখার চেষ্টা করেছি সাহিত্য-মনস্ক পাঠকদের জন্য, যাতে পাঠকের মধ্যে স্থির কিছুর জন্ম না হয়; এমন একটি বইই হয়তো লিখে চলেছি- যা কেবলই বিভ্রমের জন্ম দেবে, চোখের দেখায় ইল্যুশন হবে। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনার লেখায় হিউমার কম যা কোনও কিছুকে প্যারোডিতে পরিণত করে। আপনার কিছু কিছু বই, যেমন- এক্সপেন্সিভ পিপল, দ্য হাংরি ঘোস্ট, এবং ওয়ান্ডারল্যান্ড-এর কিছু কিছু জায়গা হেরল্ড পিন্টারের মতো অ্যাবসার্ড হিউমারের দেখা মেলে। অ্যাবসার্ড অংশগুলি তাদের অযৌক্তিক হাস্যরসে পিন্টারকে মনে পড়িয়ে দেয়। আপনাকে পিন্টার কোনওভাবে প্রভাবিত করেন? আপনি নিজেকে কি কমেডিক লেখক মনে করেন?

ওটস :
আমার লেখায় কিন্তু প্রথম থেকেই এক ধরণের কৌতুকরস ছিল, তবে তার প্রকাশ ছিল অত্যন্ত সংযত, কিংবা ভাবলেশহীন। পিন্টার কখনও আমাকে খুব কৌতুক দিয়ে মজাতে পারেননি। তিনি কি সত্যিই ট্র্যাজেডি লিখছেন না?

একসময় আমি আয়নস্কো পছন্দ করতাম। আর কাফকা। আর- ডিকেন্স (কাফকা যার কাছ থেকে নির্দিষ্ট কতগুলো বিষয় নিয়েছিলেন, যদিও তিনি সেগুলি ভিন্নভাবে তাঁর লেখায় ব্যবহার করেন)। আমার কাছে ইংরেজি বিদ্রুপ (স্যাটায়ার) গুরুত্বপূর্ণ; কিম্ভূতকিমাকার, উদ্ভট, নিরর্থক বা হাস্যকর যা-ই হোক তা কখনওই ট্র্যাজিক নয় যা কমিক স্পিরিটের অন্তর্গত। উপন্যাসের এই দুটিকেই দরকার হয়। উপন্যাস ট্রাজেডি ও কমেডি- উভয় দ্বারাই পরিপুষ্ট হয় এবং উভয়কেই আকুল হয়ে শুষে নেয়।


সাক্ষাৎকারী :
কাফকার কাছ থেকে কী নিলেন?

ওটস :
বিভীষিকাকে ঠাট্টা করা। নিজেকে কম গুরুত্ব দেওয়া।


সাক্ষাৎকারী :
জন আপডাইকের লেখায় ‘সহিংসতার অভাব’ আছে বলে অভিযোগ করা হয়। আপনি প্রায়শই অভিযুক্ত হোন অতিমাত্রায় চিত্রিত করার দোষে। আপনার লেখায় সহিংসতার ভূমিকা কী?

ওটস :
আজ পর্যন্ত যত লেখা আমি লিখেছি, সে পৃষ্ঠাগুলো দেখুন, দেখবেন- সেসব পৃষ্ঠা থেকে ‘হিংসাত্মক’ ঘটনাগুলি যেন তাদের ভেতর থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে; আমি বরং এ সন্দেহ করি যে শব্দের তাৎপর্যময় কিংবা অর্থবোধক সেন্স থেকে আমি একজন হিংস্র লেখক, আক্রমণকারী লেখক। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, তাঁদের উপন্যাসে সহিংসতা, হিংস্রতা খুব কম, ষাটের দশকে ডেট্রয়েটের পটভূমিতে লিখিত উপন্যাসগুলোর অভিপ্রায়ই এমন যে উপন্যাস যেন স্বাভাবিক জীবনকে পোট্রে করে, প্রাকৃতিক থাকে, কিন্তু বাস্তব জীবন অনেক বেশি বিশৃঙ্খল।


সাক্ষাৎকারী :
কোন বইটি লিখতে গিয়ে আপনি সবচে বেশি সমস্যায় পড়েছিলেন? কোনটি সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করেছে বা আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছেন?

ওটস :
‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’ এবং ‘দি অ্যাসাসিন’- এই দুটি বইই ছিল লেখার ক্ষেত্রে সবচে বেশি জটিলতা সৃষ্টিকারী। ‘এক্সপেনসিভ পিপল’ ছিল সবচেয়ে কম কঠিন আর আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘চাইল্ডওল্ড’কে খুব পছন্দ করি, কেননা এই বইটি তাঁর শুরু থেকেই এক বিপুল বৈচিত্রে পূর্ণ জীবনকে উপস্থাপন করে--আলোকরশ্মির বর্ণালি বিচ্ছুরণের মতো--স্মৃতি এবং কল্পনা দিয়ে তৈরি এক সম্পূর্ণ পৃথিবীকে, যাতে থাকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের একত্রিত এক মিশ্রণ। ব্যাপারটি আমাকে সব সময়ই বিস্মিত করে দেয়- লোকে আমার উপন্যাসটি গ্রহণ করেছে এবং তারা উপন্যাসটিকে প্রশংসনীয় মনে করে, এর কারণ আমার এমন এক গোপন আর ব্যক্তগত মনে হয়... একজন লেখক তাঁর জীবৎকালে কেবল একবারই এমন একটি মহৎ লেখা লিখে ফেলতে পারেন! 

এ বইগুলি ছাড়াও, ‘ডু উইথ মি হোয়াট ইয়্যু উইল’ আমাকে কিছুটা আনন্দিত করেছে; আর অবশ্যই, মাত্রই লিখে শেষ করেছি, ‘সন অফ দ্য মর্নিং’ উপন্যাসটির কথা আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, যার সঙ্গে গভীর নৈকট্য অনুভব করছি (সাধারণত আমি মনে করি- সদ্য সমাপ্ত বইয়ের জন্য আমরা লেখকরা সব সময়ই বিশেষ টান অনুভব করি, বইটিকে মায়া করতে চাই, করি না? অবশ্যই করি, এমনকিছু স্পষ্ট কারণেই)। তারপরে এই মায়া কেটে গেলে আমি ‘দ্যাম’ উপন্যাসের জুল, মোরেন এবং লোরেত্তার কথা ভাবতে ভাবতে অবাক হয়ে যাই এটা মনে করে যে এই উপন্যাসটি সম্ভবত এখনও আমার প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি।


সাক্ষাৎকারী :
আপনি কার জন্য লেখেন- নিজের জন্য, বন্ধুদের জন্য, অচেনা পাঠকের জন্য? আপনি কি আপনার লেখার কোনও প্রকৃত পাঠকের কথা কল্পনা করেন? 

ওটস :
হ্যাঁ, এমন কিছু গল্প আমার আছে, যেমন- ‘দ্য হাংরি ঘোস্ট’ লিখেছিলাম একাডেমিক লোকদের জন্য, এবং আরও নির্দিষ্ট কিছু পাঠকের জন্য। এর বাইরে যা হয়- গল্পটি লেখক নিজেই নিজের গরজে লেখেন, গল্পটি লিখিত হতে চায়; আমি যা বলতে চাইছি তা হলো- লেখক লেখাটি নিজের জন্যই লেখেন, কিন্তু কীভাবে? সে প্রক্রিয়াটি হলো- ‘চরিত্র’ নিজেই নিজের ‘কন্ঠস্বর’ নির্ধারণ করে, নিজেই কথা বলে এবং তখন আমাকে, অর্থাৎ লেখককে অবশ্যই তাকে অনুসরণ করতে হবে। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনি ইয়ুঙের কথা বলেন। ফ্রয়েডও কি প্রভাবিত করেছেন? কিংব আ লেইঙ?

ওটস :
ফ্রয়েড সবসময়ই সীমাবদ্ধ এবং পক্ষপাতিত্বে ভরপুর; ইয়ুঙ এবং লেইঙ-কে আমি সাম্প্রতিক বছরগুলিয় পড়েছি। সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় নীটশেকে আবিষ্কার করলাম, নীটশে-প্রভাবে প্রভাবিত (অবশ্যই তিনি ফ্রয়েডের চেয়ে অনেক উত্তেজিত করেন, উদ্দীপিত করেন) হয়ে আমি কিছু লিখিও যাকে খুব সহজেই ‘নীটিশিয়ান’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সেটা কীভাবে হয়েছে, আমি জানি না, খুব সচেতনভাবেই আমি জানি না। আমার বেলায় হয় কী, গল্পগুলো সাধারণত এমনভাবে শুরু হয়, বা শুরু হয়ে যেতে পারে, চরিত্র ও পারিপার্শ্বিকতার (সেটিংস) মধ্যে কিছু জাদুকরী (ম্যাজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন) কিছু একটা ঘটার মধ্যে। আমার এমনও কিছু গল্প আছে (যদিও কোনগুলো, আমি বলব না) যা এতোটাই ম্যাজিক্যাল হয়ে ওঠে যে পুরোপুরি তাদের সেটিং থেকে বের হয়ে পড়ে। 


সাক্ষাৎকারী :
আপনার প্রথম দিকের গল্প উপন্যাসগুলোয় ফকনার এবং ফ্ল্যানারি ও'কনোরকে পাওয়া যেত, আপনার ওপর তারা বেশ প্রভাব ফেলেছিলেন বলেই মনে হয়েছে। এই প্রভাবকে আপনি স্বীকার করেন? আর কেউ এমন আছেন?

ওটস :
দেখুন, আমি তো বহু বছর ধরেই পড়ছি, পড়ে চলেছি, আর আমাকে প্রভাবিত করার মতো ছিলেনও অনেক, যার বিস্তারও অনেক— এক্ষেত্রে, উত্তর দেওয়া আমার জন্য কঠিন হবে। একটি প্রভাবের কথা যা আমি খুব কমই বলেছি, তিনি হচ্ছেন হেনরি ডেভিড থরো, যাকে আমি বয়ঃসন্ধিকালের সংবেদশীল সময়টায় পড়েছিলাম, এবং হেনরি জেমস, এবং অবশ্যই ও'কনোর এবং ফকনার, আর- ক্যাথরিন অ্যান পোর্টার এবং দস্তয়েভস্কি। এক অদ্ভুত মিশ্রণ।


সাক্ষাৎকারী :
আপনার একটি বইয়ের নাম ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’ এবং অন্যান্য কিছু লেখার নাম ও লেখার মধ্যে এক বিশেষ বিভ্রম আছে, যাকে ইল্যুশন বলা যায়, যার অনেকটাই, কারও মনে হতে পারে লুইস ক্যারল-এর লেখার সঙ্গে সাদৃশ্য আছে, একটা কোথাও যেন ঐক্যও আছে, একটা সংযোগ আছে। এটা একটু ব্যাখ্যা করবেন? সংযোগটি কী, এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু?

ওটস :
‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ আর ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’ ছিল আমার পড়া অসামান্য দুটি বই। কী আছে তাঁর লেখায়- হিউমার, হরর, অযুক্তি, রসবোধ এবং ন্যায়বিচারের দুর্দান্ত মিশ্রণ, যা সব সময়ই আমাকে আকর্ষণ করেছে, আবেদন তৈরি করেছে। গত বছর স্নাতক ক্লাসে ক্যারলের বইগুলো পড়ানোর সময়টা আমার জন্য ছিল এক দুর্দান্ত উদযাপন।


সাক্ষাৎকারী :
শিশু বয়সে এমন কিছু হয়েছিল, যার কারণে ভয় পেয়েছিলেন?

ওটস :
সম্ভবত আমি অনেক কিছুতেই ভয় পেয়েছিলাম, বেশিরভাগ বাচ্চারাই তো কিছু না কিছু ভয় নিয়েই বেড়ে ওঠে। শিশুদের জন্য যা স্বাভাবিক- যা কিছু অজানা, অচেনা, তার প্রতি ভয়, যা হয়তো ক্যারলের কিছু চরিত্রও এড়াতে পারেনি; রূপক ছাপিয়ে শিশুমন ভীত হয়ে পড়ে। হারিয়ে যাওয়ার ভয়, ব্যথা। কিন্তু দেখুন, ক্যারল আমাকে ভয় কাটাতে সাহায্য করছিলেন। আমি তাঁর দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিলাম। প্রচণ্ড চঞ্চল আর দুষ্টু স্বাভাবের বাচ্চা ছিলাম আমি- যা আমার নিজের সম্পর্কে বলা একটি গোপন রহস্য।


সাক্ষাৎকারী :
আপনি অল্প বয়সে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। এর পেছনে কি আপনার পরিবারের উৎসাহ ছিল? আপনাদের পারিবারটি কি শিল্পচর্চায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল?

ওটস :
পরবর্তী বছরগুলিতে যদিও বাবা-মা শিল্পসৌন্দর্যের উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু তারা তাদের যৌবনে এবং তাদের সন্তানদের তারুণ্যের সময়ে, কেবলমাত্র কাজ আর কাজ ছাড়া অন্য কিছুতেই তাদের মনোযোগ কাড়ত না; তাদের সে সময় ছিল না। একটা পর্যায়ে আমি সৃষ্টিশীল হয়ে উঠি বাবা-মা, দাদি এবং আমার শিক্ষকদের কারণে, তারা নিরন্তর উৎসাহ দিতে থাকেন। আমি কিছুতেই মনে করতে পারি না যে প্রথম কখন গল্প বলতে শুরু করেছিলাম--ছবি এঁকে, তখন প্রকাশের ধরন এমনই ছিল; তবে আমি অবশ্যই তখন খুব ছোটোটি ছিলাম। গল্প বলার ব্যাপারটা ছিল এমন এক সহজাত প্রবর্তনা যাকে আমি প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দে নিজের ভেতর মূর্ত হতে দেখেছি।


সাক্ষাৎকারী :
আপনার বেশিরভাগ লেখা ১৯৩০-এর দশককে ঘিরে, সে এমন এক সময়কাল যখন আপনি সবেমাত্র শিশু। সেই সময়টি কেন আপনার কাছে লেখার বা জীবনকে বোঝার পক্ষে এত গুরুত্বপূর্ণ?

ওটস :
যেহেতু আমি ১৯৩৮-এ জন্ম নিয়েছি, সেজন্য এ দশকটি আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, অর্থবহ। এই দশকটি আমার মা বাবার কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ, এ সময়েই তারা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পর্বটি পার করছেন, তাদের আলাদা একটা জগত আছে, যে জগতে আমি এসে গেছি, তারাও তরুণ। ত্রিশের দশকটি আমার কাছে এখনও বেঁচে বর্তমান, এখনও হারিয়ে যায়নি, বা মা এবং দাদা দাদির স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল সবকিছু, সেই সময়ের বইপত্র এবং সিনেমায় সে সময়টা স্থির হয়ে আছে যেন। কিন্তু তার আগের সময়টা? বিশের দশক? এ অনেক দূরের। পুরোপুরি হারিয়ে গেছে! আমার কল্পনাশক্তিও এত প্রখর নয় যে এত দূরের একটা সময়কে ফিরে পেতে পারি। 

সে সময়কে আমি বা মা’র কাছ থেকেই দেখে নিতে চেয়েছি, চিহ্নিত করতে চেয়েছি কিন্তু সন্তোষজনকভাবে কিছু পাইনি। আমার জন্মের আগে তারা যেভাবে জীবনযাপন করেছিলেন তাকে কোনওরকমে, আবছাভাবে বুঝতে পারি বলে মনে হয়, অবশ্যই কল্পনায়। আমার বাবা বা মা’র কিছু কিছু স্মৃতির সঙ্গে নিজের অন্তরঙ্গতা অনুভব করতে পারি, মনে হয় এখানে আমিও আছি, এই স্মৃতি তো আমারও। পুরানো ফটোগ্রাফ দেখবার সময় বা মা’র সঙ্গে আমিও আছি- এমনভাবে সমসাময়িক হওয়ার অনুভূতিতে বার বার আক্রান্ত হয়েছি — যেন তাদের আমি সেই কিশোরবেলা থেকেই চিনি। অদ্ভুত শোনাচ্ছে? আমি বিস্মিত হই এটা ভেবে যে অন্যরা কীভাবে এসব না জেনে তাদের পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিগুলোর কথা বলতে পারে! 


সাক্ষাৎকারী :
সিরাকিউজে (বিশ্ববিদ্যালয়) আমরা যখন স্নাতক শ্রেণির ছাত্র ছিলাম, ততোদিনে সেখানে কিংবদন্তির মতো কিছু কথার জন্ম হয়ে গিয়েছিল। এমন কিছু কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল যে যখনই আপনি একটি উপন্যাস শেষ করবেন, সঙ্গে সঙ্গেই আগের লেখা কাগজগুলোর পেছন দিকে আরেকটি লিখতে শুরু করবেন। কাগজের উভয় পৃষ্ঠা ভরে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন এবং তখন নতুন কাগজের কাছে পৌঁছাতে চাইবেন। সিরাকিউজে থাকতে থাকতেই কি সচেতনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে লেখক হতে যাচ্ছেন?

ওটস : 
লেখালেখিটা কিন্তু হাইস্কুলে থাকতেই শুরু হয়, তখন হাত পাকানো চলছিল, খুব সচেতনভাবেই নিজেকে উপন্যাসের পর উপন্যাস লেখার ট্রেনিং দিয়েছিলাম; উপন্যাগুলো শেষ হতেই ছুঁড়ে ফেলে দিতাম। আমার মনে আছে- হেমিংওয়ের ‘ইন আওয়ার টাইম’ (তখনও ডাবলিনার্স পড়িনি) গল্প সংকলনটিকে মডেল ধরে, তিনশ পৃষ্ঠার একটি বই লিখে ফেলি যা ছিল হেমিংওয়ের গল্পের চেয়েও বেশি রোমান্টিক। মনে আছে ফকনারের ‘দ্য সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি’-কে মডেল ধরে সেসময় আমার লেখা বিশাল এক উপন্যাসের কথা যা ছিল কয়েক খণ্ডে বিভক্ত… সবই ছিল পরীক্ষা! পরে পরীক্ষাগুলো ফেলে দিয়েছিলাম, এখন আর মনেও করতে চাই না।

আমার জন্য একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক- দু-দিক থেকেই সিরাকিউজ রোমাঞ্চকর এক স্থান ছিল যেখানে আমি চার বছরে মাত্র কয়েকদিন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলাম, যে ক্লাসগুলো ইংরেজির ছিল না। 


সাক্ষাৎকারী : 
‘বাই দ্য নর্থ গেইট’ (১৯৬৩) আপনার প্রথম বই, ছোটো গল্পের; তখন কিন্তু গল্পই লিখছেন শুধু। ছোট গল্পের প্রতিই কি আপনার বেশি পক্ষপাত, ভালবাসা? আপনি কি পুরোনো সেই প্রবাদটিকেই ধরে আছেন যে উপন্যাসের চেয়ে ভালো একটি গল্প লেখা আরও কঠিন?

ওটস :
ছোট বা সংক্ষিপ্ত বিষয়ের চিকিৎসাও সংক্ষিপ্ত হয়। উপন্যাসের মতো কঠিন কিছুই নেই- এটা তারাও জানেন যারা লিখতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু ছোট গল্প হচ্ছে আমাদের এমন এক প্রিয় ব্যাপার যাকে উপন্যাসের একটি সাধারণ পর্বের চেয়েও অসামান্য করে তোলা যায়। 

তারপরও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমি খুব বেশি শর্ট ফিকশন লিখিতে পারি নি। এর পেছনের কারণটি ঠিক কী, আমি জানি না। আমার সমস্ত শক্তি যেন দীর্ঘ কাজের জন্য- এটা দেখতে পাচ্ছি। সম্ভবত আমি সব সময় একক একটি কাজ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি, উপন্যাসগুলো লিখে ফেলেছি- একের পর এক; সাধারণত উপন্যাসের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেছি, প্রতিটি পৃষ্ঠা প্রতিটি পর্বকে গভীর ধ্যানে নিখুঁত (পারফেক্ট) করার চেষ্টা করছি।


সাক্ষাৎকারী :
তারপরও বলবো- আপনি এ সময়ের সিরিয়াস মার্কিন লেখকদের তুলনায় অনেক বেশি গল্প লিখেছেন। আমার খুব ভাল করেই মনে আছে, আপনি যখন ‘দি হুইল অফ লাভ’ বইয়ের জন্য ২১টি গল্প বাছাই করবেন, প্রথম গল্পের বইয়ের পর বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বেশকিছু গল্প থেকে বাছাই করতে লাগলেন, মোট নব্বুইটি গল্প থেকে একুশটি গল্প আপনি বইয়ের জন্য নিলেন। বাকি গল্পগুলোকে কী করবেন? পরের সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করবেন? অগ্রন্থিত গল্পগুলোকে বইয়ে দেবার পদ্ধতিটি কী?

ওটস :
যদি আমি কোনও একটি গল্পের ব্যাপারে সিরিয়াস থাকি, তাহলে সে গল্পটিকে অবশ্যই বইয়ে রাখব, তা না করলে হয়তো তার কথা আমি ভুলেই যাব। ব্যাপারটা কবিতা এবং রিভিউ এবং প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও সত্য। তো, হলো কী- আমি ‘হুইল অফ লাভ’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু আমার কাছে এখনও তাদের আবেদন আছে, গুরুত্ব আছে- এমন বেশ কয়েকটি গল্প নির্বাচন করলাম, যাদের মধ্যে ‘বিষয়গত’ ঐক্যও আছে; পরে- তাদেরকে ‘দ্য সিডাকশন এন্ড আদার স্টোরিজ’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করলাম। গল্পের প্রতিটি সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোয় একটা প্রধান থিম থাকে, তাতে একটি বইয়ের গল্পগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়, বইটিও সেভাবেই গড়ে ওঠে; যেন প্রতিটি গল্পেই একটা হারমোনিয়াস ব্যাপার আছে; ‘কেন্দ্রীয় থিম’ কিংবা ‘প্রধান থিম’ নিয়েই বইটি গড়ে ওঠে; যেন পাঠক কোনও খণ্ডিত কিছু পড়বেন না, পড়বেন একটা ‘সমগ্র’; সংকলনে গল্পগুলোর বিন্যাসটি এমন হবে যেন সব এক সুতোয় বাঁধা, যেখানে অপরিকল্পিত কিছুই নেই, বিশৃঙ্খলা নেই।


সাক্ষাৎকারী :
আপনি পান করেন বা চেতনা-প্রসারণকারী বিশেষ কোনও ওষুধ?

ওটস :
না, এমনকি চা-ও (ক্যাফেইনের কারণে ) কড়া লিকারের কারণে আমি খেতে পারি না। মনে হয় আমি অন্যরকম এক সংবেদশীলতা নিয়ে জন্ম নিয়েছি! 


সাক্ষাৎকারী :
আগে আপনি ‘দ্য এসাসিন্স’ উপন্যাসের হো পেট্রির কথা উল্লেখ করেছেন, যে আপনার অন্যতম একটি চরিত্র যার মাথার ঠিক নেই, পাগল। পেট্রির মতো এমন প্রকৃত পাগলকে কীভাবে পেলেন? 

ওটস :
দুর্ভাগ্যবশত, আমি এমন স্বল্প সংখ্যক লোকের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি যাদের কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ, যাদেরকে মানসিক দিক থেকে অশান্ত বিবেচনা করা যায়; অন্যরা স্ট্রেঞ্জার- অপরিচিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত।

এই তো সেদিন, ক্যাম্পাসে গিয়েছি, কিন্তু ক্লাস করতে পারিনি, আমাকে ক্লাসে যেতে দেওয়া হয়নি; হয়েছে কী- আগের রাতে আমার এক ছাত্রকে এক অত্যন্ত রাগান্বিত, ক্রুদ্ধ ব্যক্তি ফোন করে বলেছে যে সে আমাকে খুন করতে চায়। বিভাগীয় প্রধান, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা প্রধান এবং উইন্ডসর সিটি পুলিশের সঙ্গে আমাকে কয়েক ঘণ্টা কাটাতে হয়েছিল যা ছিল বিব্রতকর এবং গোলমেলে ব্যাপার । এটি প্রথমবারের মতো কেউ আমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দিল, যদিও এমন হুমকি নতুন নয়, এর আগেও আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে, তবে সেসব হুমকি এতোটা স্পষ্ট ছিল না, সরাসরি ছিল না, আর আমিও সেসব পাত্তা দেইনি। 

যে লোকটি আমার ছাত্রকে কল করেছিল সে ছিল সকলের কাছে অপরিচিত, এমনকি উইন্ডসরের বাসিন্দাও সে নয়। আমার প্রতি কেন সে এতো ক্ষেপে গেল তার কিছুই আমি বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু মানসিক অসুস্থ কারও জন্য কি কোনও কারণের দরকার হয়? 


সাক্ষাৎকারী :
আপনার কোনও লেখা কি আত্মীয় কি বন্ধু-স্বজনদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল, যাদের আপনি সচেতন কিংবা অবচেতনে লেখায় ব্যবহার করেছেন?

ওটস :
আমার বাবা-মা (এবং ছোটবেলার আমি ) খুব অল্পই ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এ আছি, এ ছাড়া আমার লেখার কোথাও পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের কোনও উপস্থিতি নেই, পোট্রেট নেই। মা বাবা দু’জনই (যেন আদর করছেন, এমনভাবে) আমার গল্প এবং উপন্যাসগুলোর ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন, কীভাবে লিখলে আরও ভালো হবে- বলতেন। আমার লেখায় আমার ব্যক্তিগত স্বভাবের কিছুই নেই, ব্যক্তিগত আমি- কোনও দিনই লেখায় থাকতে চাইনি, দরকার মনে করিনি।


সাক্ষাৎকারী :
জনপ্রিয় হওয়ার অসুবিধাগুলো কি কি? 

ওটস :
জনপ্রিয়তা নিয়ে আমি কোনওদিনই ভাবিনি, বিশেষত এখানে- উইন্ডসর-এ, এখানে দু’টি বড় বইয়ের দোকানের একটি কোলস্‌, যারা আমার বই রাখে না, একটিও পাবেন না। যারা আমাকে চেনেন, জানেন, যারা আমার লেখা পড়েন- সংখ্যায় তারা কম। এও আমার জন্য উপকারি- এই না চেনাটা; ক্যাম্পাসে আমি অনেকের ভিড়ে অদৃশ্য থাকতে পারি, নগরীর কোলাহল আমাকে ঘিরে ফেলে না, শান্ত নৈঃশব্দ্যে আমি জীবন ও মানুষের চলন দেখতে দেখতে লিখে চলি, লেখা উপভোগ করি…


সাক্ষাৎকারী :
আপনার কি কোনও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা আছে?

ওটস :
সীমাবদ্ধতা আছেই; সে আমার লাজুক স্বভাব। এ আমাকে সব সময় দ্বিধান্বিত করে রেখেছে, আমার বহু কাজে বাধা দিয়েছে। এখানে, এই উইন্ডসরেও আমি এ জন্য ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না।


সাক্ষাৎকারী :
লেখক হিসাবে আপনার মধ্যে গোপনীয় বা চোখে পড়ে এমন কোনও খুঁত বা দোষ আছে কি?

ওটস :
আমার সবচেয়ে স্পষ্ট ত্রুটি হলো...এতো স্পষ্ট যে, যে কেউ সহজেই ধরতে পারে অথবা টের পায় আর আমার সেই খুঁত কিংবা দোষ যা-ই আছে তা আমার কাছে এমন এক গোপন যা আমাকে নিয়ত আনন্দে রাখে, আমাকে সুখি রাখে; আমার সমস্ত খুঁত আমার সুখেই গোপন থাকে। 


সাক্ষাৎকারী :
নারী লেখক হওয়ার সুবিধাগুলো কী?

ওটস :
সুধিধা! সম্ভবত সুবিধাগুলোকে গুণে শেষ করা যাবে না তারা সংখ্যায় এতো বেশি। নারী হওয়ার কারণে, গণমাধ্যমে লেখকদের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় এমন সারিতে শ্রেণিবিন্যস করার ক্ষেত্রে পুরুষ সমালোচকরা আমাকে কখনওই পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেন নি; আমি সমস্ত রকমের শ্রেণি কিংবা প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় সারির লেখক হওয়ার চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। লেখক সারির প্রথম দিকে থাকবার প্রতিযোগিতার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ নেই, ধারণাও নেই; রিঙের অন্য প্রতিভাদের সঙ্গে লড়াই করে হেমিংওয়ে কিংবা অনুকরণকারী মেইলারের দ্বন্দ্বের থেকেও আমার লালায়িত হওয়ার কিছু খুঁজে পাই না। একটি শিল্পকর্ম, আমার ধারণামতে, কখনওই অন্য একটি শিল্পকে হটিয়ে জায়গা দখল করে না। 

নারী হয়ে জন্ম হওয়া আমাকে নির্দিষ্ট কিছু অদৃশ্যতা বা অলক্ষ্যতার দিকে নিয়ে যায় এলিসনের ইনভিজিবল ম্যান’-এর মতো। (আমার সে দীর্ঘ জার্নালটি, যা এখন অবধি কয়েক'শ পৃষ্ঠার মতো লিখিত হয়েছে, যার শিরোনামটি হয়েছে ‘ইনভিজিবল ওম্যান’। এমন নামের কারণ- একজন নারীর উপস্থিতিকে বড় যান্ত্রিকভাবে বিবেচনা করা হয়, অন্যরা তাকে যে রূপে কল্পনা করে তার বিপরীতে নারী নিজেকে আত্মগোপন করতে পারে। সে নিজেকে নিজে যততুকু জানে, বোঝে, তার বিপরীতে অন্যরা নারী সম্পর্কে যা ভাবে এর মধ্যে একটা অলক্ষ্যতা থেকে যায়, দেখাটা বহুলাংশে খণ্ডিত হয়ে থাকে। আমি কখনওই আমার বাইরের চেহারার সঙ্গে নৈকট্য অনুভব করি না, কোনও সংযোগ অনুভব করি না এবং প্রায়শই ভেবে থাকি যে এ আমার এক অন্য রকমের স্বাধীনতা উপভোগ, মানুষ হিসেবে, সে মানুষ লেখক হোক কি না হোক, এবং এভাবে নিজেকে উদযাপন করা যায়। 


সাক্ষাৎকারী :
পুরুষের দৃষ্টিকোণ (পয়েন্ট অফ ভিউ) থেকে লিখতে কোনও অসুবিধা হয়?

ওটস :
একদমই না। আমি আমার যে কোনও পুরুষ চরিত্রের প্রতি ঠিক ততোটাই সহানুভূতিশীল যতোটা আমি আমার নারী চরিত্রদের প্রতি অনুভব করি। বহু দিক থেকেই আমার কিছু কিছু পুরুষ চরিত্রের প্রতি আমি নৈকট্য বোধ করি, আমার মেজাজের, মানসিক ধাতের মধ্যে তারা একাত্ম হয়ে যান। ‘সন অব দ্য মর্নিং’-এর নাথান ভিকরির কথাই ধরুন। উদারহণ দিতেই এখানে উল্লেখ করলাম; তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে বলে বোধ করি। ‘দ্য কিংডম অফ গড’-এর চরিত্ররাও আমার আপন সত্ত্বার এক একটি অংশ।


সাক্ষাৎকারী :
লেখক নারী না পুরুষ গদ্যে কি সেটা বুঝতে দেওয়া উচিৎ?

ওটস :
কখনওই না। 


সাক্ষাৎকারী :
নারী চরিত্রের চিত্রায়ণে কোন পুরুষ লেখকরা বিশেষভাবে সফল হয়েছেন?

ওটস :
তলস্তয়, লরেন্স, শেক্সপিয়ার, ফ্লোবের...সত্যিই এমন লেখক কম; আবার এটাও দেখুন, খুব কম সংখ্যক নারী লেখকই পুরুষদের চিত্রায়ণে সক্ষম হয়েছেন।


সাক্ষাৎকারী :
লেখালেখি উপভোগ করেন? আনন্দ পান?

ওটস :
নিশ্চয়ই, লেখালেখিকে সত্যিই উপভোগ করি, প্রচণ্ডরকম; দেখুন, লিখতে গিয়ে মাঝেমাঝে আমার যা হয়...যখন আমি একটি লেখার কাজ শেষ করেছি এবং এখনও নতুন কাজে এখনও হাত দিতে পারিনি, ঠিক তখন আমার মানসিক অবস্থা এমন নাজুক হয়ে পড়ে, সত্যিই আমি যেন এই জগত থেকেই বিচ্ছিন্ন মানুষ! তখন আমি এমন কিছু অনুভব করি যেন হঠাৎ কিছু হারিয়ে ফেলেছি, যেন আমি উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছি, এবং বারবার যেন চারপাশ থেকে আমার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে; আমি আবেগতারিত হয়ে পড়ছি অকারণে। আমরা, যারা লেখালেখি করি, আমরা নিজেদের এই বিশ্বাস থেকেই লেখার কাজটা করছি যেন কিছুটা হলেও মানুষের জন্য সমাজের জন্য আমাদের মতো করে দায়িত্ব পালন করছি, কাজ করছি, যদিও লেখক হিসেবে, পাঠক হিসবে কিংবা সমাজের প্রতি আমার প্রতিক্রিয়া হয়ত খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়। 

ফ্লোবেরের এই কথতিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিই, তিনি বলছেন- আমাদের সৃষ্ট শিল্পের মধ্যেই পরস্পরকে আমরা ভালবাসব ঠিক যেমন ঈশ্বর সৃষ্ট শিল্পও ভালোবাসার গভীর বন্ধনে জড়িয়ে থাকে। পরস্পরের সৃষ্টিকে সম্মান দেখানো যেন আমরা এমন কিছুকে সম্মান করছি শ্রদ্ধা করছি যে সৃষ্টি অত্যন্ত গভীর হয়ে আমাদের সবার মাঝে বিরাজ করছে আমাদের সকলকে এক সঙ্গে যুক্ত করছে এবং করে আমরা এমন কিছুকে সম্মান করি যা আমাদের সকলকে গভীরভাবে সংযুক্ত করেও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেও আলিঙ্গন করছে।

লেখালেখি অবশ্যই আমাদের অনেক কাজের মধ্যে এমন একটি কাজ, এতো বিস্তৃত, বিস্তীর্ণ কাজ যা আমাদের জীবনকে, যাপনকে, আরও বড় করে দেখলে- সমগ্র মানবজীবনকে তৈরি করে, গঠন করে, পূর্ণ করে। যিনি লিখছেন, মনে হবে তিনি আমাদের অনেকের মধ্যে এমন একজন লোক, যিনি ধ্যানে পড়েছেন, যিনি গভীর মনোযোগে সৃষ্টি করছেন যেন তিনি নিয়তি দ্বারা কেবল লেখার জন্যই নির্দিষ্ট হয়েছেন। লিখতে এসে আমি অবচৈতন্য বা নির্জ্ঞানের প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখতে চাইলাম, অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিলাম কীভাবে অহম-কে, অহংবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, নিজের ভেতরের বোঝাপড়ার দ্বন্দ্বগুলোকে দেখতে হয়, তখন থেকেই আমি কখনও নিজেকে এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাধ্য করি না যা আমাকে ভেতরে ভেতরে শূন্য করে দেবে, জীবনের অপার রহস্যয়তা থেকে যে উত্তর আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে। জীবন হলো শক্তি এবং এই শক্তিই সৃষ্টিশীলতা, সৃজনশীলতা- সমস্ত কিছু; আর এমনকি আমরা যখন একক ব্যক্তি হিসাবে দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যাই, তখনও সৃষ্টি চলতে থাকে; সেই শক্তি শিল্পকর্মের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতা দিতে থেকে যায়, অব্যাহত থাকে, এবং শিল্পকর্মটি মুক্তির অপেক্ষায় থাকে, অপেক্ষায় থাকে কেউ একজন ঠিক আসবে এবং তাঁকে পূর্ণতা দেবে।

ইউটিউবে জেমস জয়েস ক্যারলের সাক্ষাৎকার দেখুন
সময় : ৩.০৪ মিনিট

সময় :৪.০৩ মিনিট

সময় : ৩.৪৪ মিনিট

সময় : ৫.৪০ মিনিট






অনুবাদক পরিচিতি
এমদাদ রহমান
বাংলাদেশের সিলেটে বাড়ি। 
এমদাদ রহমান প্যারিসে থাকেন। 
গল্পকার। অনুবাদক। 

২টি মন্তব্য:

  1. মনেই হলো না অনুদিত কিছু পড়ছি। এমদাদ রহমানকে অভিনন্দন এমন সাবলীল কাজটির জন্য। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার তবে ক্লান্তিকর নয়। সঙ্গের লিংকগুলো বাড়তি পাওনা যেন। আমি একটা দেখলাম on writing characters... লেখকদের জন্য বেশ প্রনোদনার খোরাক আছে।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. খুবই ভাল লাগলো অনুবাদটি পড়ে। এক নাগারে পড়ার মতোন।

    উত্তর দিনমুছুন