রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

নোবেল বিজয়ী হ্যারল্ড পিন্টারের (Harold Pinter) নাটকের ভাবানুবাদ : “নয়া বিশ্ব নীতি”



--দেশীয় প্রেক্ষাপটে ভাবানুবাদ করেছেন রুমী হক

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~


[ একজন লোক চেয়ারে বসে আছে। তার চোখ বাঁধা। পেছনে দু’হাতও আড়মোড়া ক’রে বাঁধা। আর দু’জন লোক, লতিফ ও মোখলেছ, চোখবাঁধা লোকটির দিকে ফিরে দাঁড়ানো ]


লতিফ: এর সম্পর্কে সবচাইতে মজার ব্যাপারটা কী, জানো তো?

মোখলেছ: কুন ব্যাপার, শ্যার?

লতিফ:
এই যে আমরা তাকে কী করতে যাচ্ছি, সে ব্যাপারে তার কোন ধারণাই নেই।

মোখলেছ: না শ্যার, কুনো ধারণাই নাই।

লতিফ: হুম... কোনো ধারণাই নেই। মানে, আমরা তাকে যা যা করতে পারি, যত ধরনের জিনিস করতে পারি, তার কোনোটার ব্যাপারে কোনো ধারণাই তার নেই।

মোখলেছ: জ্বী শ্যার, আমরা যা যা করতে পারি...

লতিফ: হুম... যা যা আমরা করবো। মানে, সবক’টা না হলেও কয়েকটা তো করবোই। আমরা কয়েকটা করবো।

মোখলেছ: জ্বী শ্যার, অনেক সময় দেখা যায় আমরা সব কয়টাই কইরা ফেলাই!

লতিফ: না না তাতে আবার কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

মোখলেছ: কী যে কন্ শ্যার! এগুলা কত দেখলাম, শ্যার!

লতিফ:
আচ্ছা, তুমি‘স্যার’ শব্দটা এখনো পর্যন্ত ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারলে না, এটা কিরকম ব্যাপার? তোমার এই ‘শ্যার’ ডাক শুনলে নিজেরে কেমন যেন ষাঁড় ষাঁড় মনে হয়।

মোখলেছ: সরি শ্যার, মানে ছ্যার।


[চোখবাঁধা লোকটিকে তারা আরেকটু কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষন করে। লোকটি স্থির হয়ে বসে আছে ]



লতিফ:
তো সে যাই হোক, ব্যাপার হলো সে এখন আমাদের হাতে। এই যে সে এইখানে চুপচাপ বসে আছে, অথচ আমরা তাকে কি করতে যাচ্ছি সে সম্পর্কে তার বিন্দু মাত্র ধারণা নেই।

মোখলেছ: [গলা খাঁকারি দিয়ে] তার দুই-এক বিন্দু ধারণা কিন্তু থাকতেও পারে, ছ্যার।

লতিফ: দুই-এক বিন্দু ধারণা? হুম তা ঠিক। তা থাকতেও পারে।


[লতিফ বসে থাকা লোকটির ওপরে ঝুঁকে দাঁড়ায় ]

লতিফ: কি মিয়া, তুমি কী বলো? কোন ধারণা আছে?


[লোকটি নীরব। লতিফ সোজা হয়ে দাঁড়ায় ]

লতিফ: আচ্ছা, ব্যাপারটা এভাবে দেখা যেতে পারে - তার সম্ভবত: অতি সামান্য ধারণা আছে যে আমরা তাকে নিয়ে কী করবো, যা আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই করতে যাচ্ছি।

মোখলেছ: খালি তারেই না ছ্যার! তার বউয়ের কথা ভুইলা গেলেন? আমরা তার কচি ডাবের মতন বউরে কি করতে যাইতেছি সে ব্যাপারেও কিন্তু তার সামান্য ধারণা আছে।

লতিফ: হ্যাঁ তার সামান্য কিছু ধারণা আছে হয়তো। সে কিছুটা ধারণা হয়তো পেয়ে গেছে ইতিমধ্যে। মোটকথা, কাগজগুলো তো সে পড়েছে, তাই না ?

মোখলেছ:
কুন কাগজ, ছ্যার?

লতিফ: ও হ্যাঁ, তাইতো! কোন কাগজ? কিসের কাগজ?

মোখলেছ [বসে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়ে] : এই চুদির পুতরে তো আমি চিনতেই পারলাম না। করে কি সে? নাস্তিক ফাস্তিক? নাকি চাষা-ভূষা? নাকি ইনুভার্সিটির পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসার?

লতিফ: সে হয়তো ‘চাষা-ভূষাদের পরিসংখ্যান’ বিভাগের প্রফেসর। হা! হা! হা!

মোখলেছ: সত্যি নাকি, ছ্যার? আর তার বউ?

লতিফ: মেয়েমানুষের পরিসংখ্যানের দিকে তেমন ঝোঁক থাকে না।

মোখলেছ: এইটা তো জানতাম না, ছ্যার। আমার মায়ের সাথে এইসব নিয়া প্রচুর আলাপ হইতো।

লতিফ: কোনসব নিয়ে?

মোখলেছ: এইযে আপনে বললেন, পরিসংখ্যানে মেয়েদের ঝোঁক থাকে কি না, সেইসব নিয়া।

লতিফ:
তো, উনি কী বলেছিলেন?

মোখলেছ: উনি বলছিলেন যে....

লতিফ: হ্যাঁ, কী বলছিলেন?

[সামান্য বিরতির পরে ]

মোখলেছ: আসলে ছ্যার, আমার মনে নাই উনি কি বলছিলেন।

[বসে থাকা লোকটির দিকে ফিরে ] শালা মাদারচোদ!

লতিফ: শালা শুয়োরের বাচ্চা! আচ্ছা, গাড়িতে সব উঠিয়েছো? ব্যাগটা উঠিয়েছো?

মোখলেছ: কুন ব্যাগ, ছ্যার?

লতিফ: কোন ব্যাগ আবার? আলামতের ব্যাগ।

মোখলেছ: জ্বী ছ্যার।

লতিফ: আমার টেবিলের নীচে বোতল আছে। কড়া মাল। বোতলটাও গাড়িতে উঠাও।

মোখলেছ: জ্বী ছ্যার। [মোখলেছ বোতল হাতে ফিরে আসে ] আজকে কুন দিকে যাবেন ছ্যার?

লতিফ: এত কথার দরকার কী? যেদিকে সুবিধা মনে হয়, যাবো।

মোখলেছ: নদীর দিকেই চলেন ছ্যার। কাজের শেষে খোলা হাওয়ায় বড় কইরা নি:শ্বাস নিবেন আর মাল খাইবেন।

লতিফ: চুপ থাকো।

[বসে থাকা লোকটির চেয়ারের চারদিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ]

মোখলেছ: মেজাজটা সবচাইতে খারাপ হয় ক্যান জানেন, ছ্যার?

লতিফ: কেনো?

মোখলেছ: এই যে আমাদের চারদিকে কি হইতাছে তার কিছুই আমাদের জানা নাই। এই যে এই চুদির ভাই...

লতিফ: একটু আগেই কিন্তু তুমি তাকে চুদির পুত ডাকছিলে...

মোখলেছ: মানে, ছ্যার?

লতিফ: কিছুক্ষণ আগে তুমি তাকে চুদির পুত ডাকলে না? আর এখন ডাকছো চুদির ভাই? কতবার বলবো যে তোমাকে নিজস্ব একটা নিয়ম একবার ঠিক করে নিয়ে তার সাথে লেগে থাকতে হবে। এক্ষুনিডাকবে চুদির পুত, আবার পরক্ষণেই সে হয়ে যায় চুদির ভাই? তোমার নিয়মের সাথে তো এটা পরস্পরবিরোধী। এরকম পরস্পরবিরোধী যুক্তি নিয়ে তুমি কোনো ভাষাগত আলোচনায় গেলে মুখ দেখাতে পারবে না বলে রাখলাম। আর আমি তো জানি তোমার কাছে ভাষার স্হান কত ওপরে।

মোখলেছ: ঠিক বলেছেন ছ্যার, ভাষার স্হান আমার কাছে অনেক উপরে।

লতিফ: হুম... এই যে এই লোকটার কথাই ধরো। এর একটা ফার্স্ট ক্লাস উদাহরণ সে। কী বলছি বুঝতে পারছো তো? এখানে আসার আগে সে ছিল এক বিগ শট। দিনরাত সে কথার ফুলঝুড়ি ফুটিয়ে গেছে, প্রচলিত ধারণাগুলিকে প্রশ্ন করতে কখনো পিছ পা হয়নি। আর এখন? যেহেতু সে বুঝে গেছে তার অদৃষ্টে কী আছে, তাই রীতিমতো হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে সে। এইতো মাত্র সেদিন, এই লোকটিই ছিল একজন দৃঢ় বিশ্বাসী লোক, তাই না? একজন নীতিবান মানুষ। আর এখন? এখন সে এক সামান্য চুদির পুত!

মোখলেছ: কিংবা এক চুদির ভাই।

লতিফ: আর তাকে নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া এখনো শেষ হয় নি। সত্যি বলতে কি আমরা এখনো শুরুই করিনি।

মোখলেছ: কথা ঠিক, ছ্যার। তারে নিয়া আমাদের বোঝাপড়া শেষ তো দুরের কথা, শুরুই হয় নাই।

লতিফ: এমনকি তার স্ত্রীও এখনো এখানে এসে পৌঁছায় নি।

মোখলেছ: এক্কেরে ঠিক ছ্যার। তারে নিয়া আমাদের বোঝাপড়াই হয় নাই। আর তার বউরে নিয়াও আমাদের কোন কার্যক্রম এখনো শুরুই হয় নাই।

লতিফ: আমরা এখনো কিছু শুরুই করিনি 

[মোখলেছ হঠাৎ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ]

আরে কী ব্যাপার, তুমি কি কাঁদছো নাকি?

মোখলেছ: ছ্যার, আমার সারা শরীর কেমন শিরশির করতেছে। আমার খুব ভাল লাগতেছে ছ্যার, খুব ভাল লাগতেছে! [মোখলেছ লতিফের কাঁধ জড়িয়ে ধরে ] আপনেরে একটা কথা বলতে চাই, ছ্যার। আমারে বলতেই হইবো এই কথা। আপনেরে ছাড়া আর কাউরে এই কথা আমি বলতে পারুম না ছ্যার!

লতিফ: ঠিক আছে, ঠিক আছে, বলো কী বলতে চাও।

[সামান্য বিরতির পরে ]

মোখলেছ: আমার নিজেরে খুব পবিত্র মনে হইতেছে, ছ্যার। ভীষণ পবিত্র।

লতিফ: তুমি একদম ঠিক বলেছো। তোমার নিজেকে পবিত্র লাগারই কথা। কেন জানো?

মোখলেছ: ক্যান ছ্যার?

লতিফ: কারন তুমি এই দেশটাকে, এই জগতটাকে গণতন্ত্রের জন্য পরিষ্কার করছো, পূত পবিত্র করছো।

[তারা একে অপরের চোখের দিকে তাকায় ] এসো, তোমার সাথে হাত মেলাই।

[লতিফ মোখলেছের সাথে করমর্দন করে। তারপর বুড়ো আঙুল তুলে চেয়ারে বসা লোকটির দিকে ইঙ্গিত করে ] সেও হাত মেলাতে যাচ্ছে তোমার সাথে.... [হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ] এইতো, প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই।




অনুবাদ পরিচিতি
রুমি হক
কবি ও অনুবাদ।
ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকেন।







Harold Pinter

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন