সোমবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২১

পুরুষোত্তম সিংহ'র আলোচনা : সাগুফতা শারমীন তানিয়ার গল্প



দেবেশ রায় ‘উপন্যাস নিয়ে’ গ্রন্থে লিখেছিলেন—“দুনিয়ার খবর রাখতে গিয়ে নিজেদের খবর আমাদের বড় একটা রাখা হয় না, নিজেদের লেখা ভাল করে পড়াও হয় না, নিজেদের লেখা ভাল করে বুঝে নেয়ার জন্যে নতুন নতুন দিক থেকে চিন্তার সময় সুযোগও ঘটে না।“ (দে’জ, পৃ. ৪২ ) আমরা দুনিয়ার খবর রাখিও না, নিজেদের লেখা ভালো (মন্দ করেও) করেও পড়া হয় না। আমরা ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীব। খাই দাই ঘুমাই আড্ডা মারি। তক্তপোষে বসে তাস খেলাও (রবীন্দ্রনাথ কথিত) হয় না, বরং ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ফোন গুঁতোই। গুঁতোর চোটে ফোন গরম হলে বা চার্জ শেষ হলে পড়তে বসি। কেন পড়া হয়না ? শুনে নেওয়া যাক রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের আখ্যান থেকে একটি অংশ—“শিল্পবিমুখ কামাইয়ে উদাসীন উত্তম-সুচিত্রা যুগের বাঙালিরা এর বিশেষ কিছুই জানে না। বাংলা গল্প-উপন্যাসের, বাংলা লেখার পাঠক বলতে আবার তারাই। তরুণ প্রজন্ম যেসব বিদ্যে শিখে করেকম্মে খায় সেসবের চাপ অনেক, সেইসব বিষয়ে রোজ ভুরিভুরি ইংরেজি বই বেরোচ্ছে, নিজেদের পেশাগতভাবে আপটেড রাখতে তারা এতই হিমসিম যে হেগে ছোঁচনোর টাইম পায় না, সেই তারা বাংলা গল্প/ উপন্যাস-লেখা নিয়ে ফালতু কচলাতে যাবে কেন।“ (অপারেশন রাজারহাট, চর্চাপদ, পৃ. ১১৮) 

আগে সাগুফতা শারমীন তানিয়ার গল্প পড়িনি। পড়া গেল কুলদা রায়ের সুবাদে। সাগুফতা শারমীন তানিয়ার ‘দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ’ গল্পগ্রন্থ নিয়ে এই লেখার অবতারণা। 

প্রথম গল্প ‘আঁধারের রূপ’। বলা ভালো বিনু আন্টি ও বুবলির গল্প। বুবলির স্মৃতিচারণার গল্প। স্বদেশভূমি থেকে বহুদূরে থাকা এইসব লেখকরা স্মৃতিচারণায় স্বদেশভূমিতে ডুব দেবেন এটাই স্বাভাবিক। নিজের কৈশোর, বাল্যজীবনকে আর একবার দেখে নিতে চাইছেন। বিনু আন্টির কাছে বুবলি উল বোনা শিখেছিল। আসলে সে জীবনের মালা গড়া শিখেছিল। জীবনও যেন সুঁচ সুতোর খেলা। সেলাই টা ঠিক মতো না হলেই মুশকিল। সবাই পারে না। কেউ মাঝপথে খেই হারায়। জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। তবে এ অন্ধকার ক্ষণিক। অবিরাম চলে আলোর খেলা। অন্ধকার ক্ষণিক হলেও তার রেশ যেন থেকে যায়। জীবন থেকে হারিয়ে গেছে বিনু আন্টি। সংসারে পা দেওয়া বুবলির আজও মনে পড়ছে বিনু আন্টিকে। একটি পারিবারিক স্মৃতিচারণমূলক গল্পের মধ্যেও লেখিকা রাষ্ট্রের খবর দিয়ে দেন। গল্পের বয়ানে উঠে আসে—“সেকালে রাতের খবর ভেসে আসতো টিভি থেকে, এরশাদ আর তার মন্ত্রীদের নিয়ে অনেক কথা থাকতো, সব বাক্যের শেষে থাকতো ‘করতে হবে’, ‘আহ্বান জানান’ আর ‘জোর দেন’।“ ( দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ, পৃ.৫) অন্ধকারের রূপ স্পষ্ট করতে লেখিকাকে আনতে হয়েছে ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ। আসলে এগুলি ধ্রুবক। স্মৃতি তো আঁধারেই ডুব যায়। মাঝেমাঝে আলো ফেলে কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা তুলে আনতে হয়। আজ বুবলি তুলে এনেছে বিনু আন্টিকে। 

‘একটি পার্শ্বচরিত্রের গল্প’ আখ্যানে অনবদ্য ভাবে লেখিকা ইতিহাসের ধূসর জগতে প্রবেশ করেছেন। আসলে ইতিহাস কেউ ভোলে না, ভোলার ভান করে। ব্যক্তির ক্ষত ব্যক্তি যতই ভোলার চেষ্টা করুক তার রেশ থেকে যায়। আত্মকথনের মধ্য দিয়ে কথক প্রবেশ করেছেন অতীতের জগতে। যেখানে ছিল মুর্শিদকুলি খাঁ’র অত্যাচারের বিবরণ। আপাত দৃষ্টিতে গল্পটিকে অলীক বাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভিতরে একটি গভীর সত্য আছে। যে সত্য অত্যাচারের ইতিহাস বা ইতিহাসের অত্যাচার। এই অত্যাচার থেকে ব্যক্তিও মুক্ত নয়। তাই ইতিহাস ভুলতে চাইলেও দানেশের টিয়াপাখি ভুলতে দেয় না। গল্প থেকে সামান্য উল্লেখ করি— 

“শুধু আন্ধার ভেদ করে দানেশের চশম্‌খোর টিয়াপাখি ফুকরে ওঠে—‘দুই কানকাটা শাহদানা।‘ 

‘চোপরাও!’ বলি আমি। পরে ভাবি, আহা লোকে ভুলে যাবে, যেমন ভুলে যায় রাজরাজড়ার নানান গল্প, যেমন ভোলে দারুণ দুঃখ...পাখিও এই ডাক ভুলে যাবে, মুফতে একটা প্রাণ নষ্ট করি কেন।“ (একটি পার্শ্বচরিত্রের গল্প, তদেব, পৃ. ১১) 

ব্যক্তি নিজের ক্ষত ভুলে থাকতে চাইছে। কিন্তু ইতিহাস ভুলে থাকতে দেয় না। এও এক নিয়তি। তেমনি রয়েছে ক্ষমতার ইতিবৃত্ত। নবাবের হাতে জখম হওয়া কথক ইচ্ছা করলেই টিয়াপাখিকে মেরে ফেলতে পারেন। কিন্তু মারেননি। কেননা মারলেও সে ক্ষত শুকিয়ে যেত না। ইতিহাসের ধারা এমনই। কাল তা প্রবাহিত করে চলে। হয়ত কালের গর্ভে সবই তলিয়ে যায়। তবুও কিছু বেঁচে থাকে। তাই নিয়ে গড়ে ওঠে গল্প। গল্পের ক্যানভাস। ‘অনুপান’ গল্পে বাস্তব-অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, মায়াবাস্তব, কুহেলি বাস্তব সব মিলে মিশে রয়েছে। এক অলীক বাস্তবের মধ্য দিয়ে তিনি ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন। আপাতভাবে গল্পের কোন শেষ নেই। মনে হয় যেন মাঝপথে এসেই গল্প শেষ। সেটাই স্বাভাবিক। উত্তর আধুনিকতা সেই স্বাধীনতা আজ দিয়েছে। গল্প শুরু হয়েছে ‘আদর্শ হোমিও হল’এর আমজাদ মিয়া ও ‘শক্তি ঔষধালয়’ এর জীবনকৃষ্ণ হালদারকে দিয়ে। গল্পের শুরুতে মনে হয়েছিল লেখিকা বুঝি তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’ প্যাটানে বা ওই ধরণের কোন গল্প অবতারণা করবেন। কিন্তু না আমাদের ধারণা ভুল। তিনি জীবনকৃষ্ণকে সামনে রেখে এক মায়াবাস্তবে ভেসে গেছেন। তবে সেই অলীক বৃত্তান্তের মধ্যে প্রবলভাবে বাস্তব উঁকি দিয়েছে। আসলে তিনি জীবনকৃষ্ণ হালদারের জীবনবৃত্তান্ত রচনা করতে চেয়েছেন। ফলে এসেছে প্রেমিকা তন্দা ও স্ত্রী পারুলবালা। মাঝেমাঝে কেশরীলাল এসে গল্পের বিচ্ছিন্নতায় সুতো বেঁধে দিয়ে গেছেন। লেখিকার মতে কেশরীলাল যেন স্বর্ণসিন্দুরের মতো। এসেছে চার্চের প্রসঙ্গ, ধর্ম রূপান্তরের প্রসঙ্গ ও ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গ। গল্পের বয়ানে পাই— 

“জীবনকৃষ্ণ হালদার বুঝে পেল না সারাদিন সারাক্ষণ ঈশ্বরের কাছে মানুষের এত কী চাইবার থাকতে পারে, কত অনুনয়, কত সন্তাপের পরে ঈশ্বরের মন গলে। নাকি ঈশ্বরের পুঞ্জাক্ষি আর চির-অভুক্ত হৃদয় কুমারী নারীর অবিরাম বেদনা দেখে আমোদ পায়? আনন্দবিকৃত ঈশ্বরের মুখটা ভাবতে ভাবতে বেণু সর্বরোগহর ত্রিফলা চূর্ণ বেচে, খিটখিটে মাস্টারনীকে বেচে মধ্যনারায়ন তৈল। হনহনিয়ে হেঁটে আসা মুখচুন খদ্দের দেখেই বুঝে নেয় এ বীর্যস্তম্ভের রোগী।“ (অনুপান, তদেব, পৃ. ১৩) 

গল্পের ভাষা বড় মায়াবী। চিত্ররূপময় বাক্য ও উপমার জালে বন্দি করে লেখিকা পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন। জীবনকৃষ্ণ তন্দাকে পায়নি। বিবাহ করেছে পারুলবালাকে। এও যেন এক নিয়তি। কেননা তন্দা এক রুমালে লিখে দিয়েছিল পারুল। জীবনকৃষ্ণ ও পারুলবালাই যেন ঔষধ আর অনুপযুক্ত অনুপান। ইতিহাসের জগতে ডুব দিয়েছেন ‘কুড়ি-কুড়ি বছরের পরে’ গল্পে। নারীর ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা তুলে ধরেছেন এই আখ্যানে। একজন নারী হয়ে নারীর ক্ষত-বিক্ষত চিত্রটিই বুঝবেন এটাই তো স্বাভাবিক। তেমনি মহাকাব্যের জগতে নারীর যে বর্জিত, অবহেলিত অবস্থা তা লেখিকাকে ভাবিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’। সেই উপেক্ষিতাদের হৃদয় চিত্রণ করেছেন পরবর্তীকালের লেখিকারা। ট্রয়ের রাজা অডিসিউস ও রানি পেনেলোপিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে এই আখ্যান। ইতিহাসের ধূসর জগতের চিত্র ফুটে উঠতে দেখি। লেখিকা সেই ধূসর জগতে আলো ফেলেছেন। রানি থেকে অডিসিউস দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন। রিপুময় পুরুষের নানা প্রবৃত্তি। মজেছিলেন ক্যালিপেসাকে নিয়ে। বিচ্ছিন্ন জীবনের গল্প শুনিয়েছেন রাজা। কিন্তু রানি? বিচ্ছিন্ন জীবনে তিনি শুধু পশম বুনে গেছেন। ব্যক্তিমাত্রই কামনা-বাসনা থাকে। সেখানে নারী পুরুষের কোন ভেদ নেই। সেই ক্ষত-বিক্ষত অবস্থাটি দেখতে পাই। গল্পের ভাষাটি বড় জীবন্ত। তৈমুর মামাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘বধির যবনিকা’ গল্পটি। আত্মস্মৃতিতে লেখিকা ভেসে গেছেন। নিজের হারানো অতীতের সন্ধান করেছেন। জীবন কমেডি বা মেলোড্রামা নয় ট্র্যাজেডি। ব্যক্তির পতনই মানুষের স্মৃতিরেখায় গভীর চিত্র এঁকে দেয়। যেমন দিয়েছিল তৈমুর মামা। বাড়িতে যখন সন্তানদের মিল রেখে রেখে নাম রাখা হত সেখানে তৈমুর ব্যতিক্রম। কথকের সঙ্গে তৈমুরের সম্পর্ক কী সে প্রশ্ন তুলেছেন গল্পের শেষে। সে সম্পর্ক আমরা জানতে চাই না বরং তৈমুরের পরিণতি আমাদের বেদনাবিদ্ধ করে। সেইসঙ্গে আছে কথকের বড় হয়ে ওঠার একটি চিত্র। সাগুফতা শারমীন তানিয়া বেশিরভাগ গল্পের প্রেক্ষাপটে রয়েছে ফেলে আসা জন্মভূমি। সেটাই স্বাভাবিক। 

‘দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ’ প্রেমের গল্প। বাল্যপ্রেমের গল্প। নায়কের আত্মচেতনার গল্প। সুপ্তচেতনা কীভাবে ধীরে ধীরে ভ্রান্তিতে পরিণত হল তা লেখিকা দেখিয়েছেন। বাল্যপ্রণয় সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই স্মরণীয় পংক্তির কথা আমরা জানি। সুবল-মুনিয়ার মধ্য দিয়ে সেই ভ্রান্তির ছলনা ফুটে উঠেছে। তেমনি আছে প্রবাহিত সময়। ‘বিদ্যাবিতান’এর সত্যকাকু দেশত্যাগ করেছে। বিদ্যাবিতান হয়েছে ইসমাইলচাচার আলহামরা বইঘর। বইঘর থেকে স্টারলাইট ভিডিও, তা পরিবর্তন হয়ে ইলেকট্রিক সারাইয়ের দোকান থেকে স্টুডিও আলোছায়া। এই পরিবর্তন দেখে চলেছে সুবল। এই পরিবর্তন দেখতে দেখতে সে বাল্য থেকে যৌবনে প্রবেশ করেছে। হরির মিষ্টির দোকান উঠে গেছে। সেদিনের ছোট মুনিয়া আজ হয়ে গেছে আর্টিস্ট। দিলশাদ আফরোজ মুনিয়া থেকে শুধু ‘দিল’। পর্দায় সে অন্যের সঙ্গে ঘর করছে, সংসার করছে। সবুল রয়ে গেছে সেই দুলালের বইয়ের দোকানেই। সুবল দাসের সঙ্গে মুসলিম মুনিয়ার বিবাহ সম্ভব নয়। প্রেমও নয়। লেখিকাও সে পথে যাননি। বরং তার লক্ষ্য সুবল। সংস্কৃতির রূপান্তর কীভাবে ঘটে যাচ্ছে তা সুবল দেখেছে। সুবলের সুপ্তচেতনা আজ ভেঙেছে। তবুও সে গর্ববোধ করে মুনিয়ার প্রেমিক হিসেবে। মানুষ নিজের চেতনবিশ্বে নিজেই সম্রাট, নিজেই শাজাহান ইত্যাদি ইত্যাদি। এই একলা ভাবার মধ্যে হয়ত একপ্রকার সুখ আছে, আনন্দ আছে। যে সুখ সাগরে ভর করে হয়ত একটি জীবন দিব্যি হেসে খেলে পার করে দেওয়া যায়। সবুলরাও হয়ত তাই করবে! 

‘কূর্মবৃত্তি, আরেকরকম’ ভিন্ন স্বাদের গল্প। লেখিকা গল্পের শিরোনামে ‘আরেকরকম’ শব্দটি ব্যবহার করে প্রথমেই বুঝিয়ে দেন গল্পটি পৃথক। জগতে বেঁচে থাকতে মানুষ নানা চুরি করে, মিথ্যে কথা বলে। এইসব চুরির হয়ত কোন মূল্য নেই। তবুও এই চুরিতে বাঁচার আনন্দ আছে। শৈশবের নির্মল আনন্দ আছে। চুনি ও চুনির দাদাজান অহেতুক কিছু চুরি করে বেঁচে থাকতে চেয়েছে, বাঁচার আনন্দ পেতে চেয়েছে। কেরাম, লুডু খেলতে বসে চুরি করেছে। দাদাজান কখনও মিথ্যা গল্প বলে চলে। জীবনের আনন্দ খুঁজে পেতে তিনি যেন গল্প তৈরি করেন। জীবন তো বিষাদে ভরা। সেখান থেকে বাঁচার রসদ খুঁজে নিতে হয়। চুনির মাতা নেই, দাদাজানও ভালোবাসার প্রেমিকাকে বিবাহ করতে পারেননি। লেখিকা বিচ্ছিন্নভাবে সময় যন্ত্রণাকে প্রবেশ করিয়ে দেন। উঠে আসে ঘটি-বাঙালের দ্বন্দ্ব। যে দ্বন্দ্বের কারণে দাদুর বিবাহ হয়নি। তেমনি আছে অখণ্ড চেতনা। এপার-ওপারে বিশ্বাস নেই দাদুর। দাদু শেষ পর্যন্ত প্রেমিকার নাম বলেছে। চুনিও বড় হয়ে উঠেছে। রয়েছে হিংস্র দৃষ্টি— 

“যেমন বলছি, চুনিকে পথেঘাটে উত্যক্ত করবার লোক আছে। তার উঠন্তি বুকে ছোবল দিয়ে কেরামের গুটি ছোঁ মারতে গিয়ে লেগে গেছে এমন ভান করার রোগাটে হাতের লোক আছে। দাদাজান মরে গেলে চুনির বিয়েতে দেবার মতন আসলেই কিছু রেখে যাবে কি না সেইসব সামাজিক দুশ্চিন্তা আছে। চুনির দাদাজানের জন্য রাতের বেলা ভয়ে জাগিয়ে রাখবার স্মৃতি আছে (সবচেয়ে প্রত্যক্ষ-দর্শী হিসেবে নিজের কাছেও আবৃত্তি করতে যা ভয় হয়), চোরের লুটপাটের আওয়াজ আছে, ‘সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে’ বলে দুয়ারে ঢ্যাঁড়া দেয়ার লোক আছে। এইসব থেকে যে কচ্ছপের খোলে গিয়ে তারা দুই উঞ্ছজীবী লুকায়, তার নাম অতীতকাল।“ (কূর্মবৃত্তি, অতীতকাল, তদেব, পৃ. ৬৯) 

বাইরের হিংস্র প্রবৃত্তি থেকে বাঁচতেই তারা কি কূর্মবৃত্তির আশ্রয় নেয় না অন্য কিছু? নাকি নিজস্ব বৃত্তির মধ্যে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নেয়! জগতে ভুলে ভরা, মস্তবড় এক গোলকধাঁধা। সেই গোলকধাঁধা থেকে বাঁচতেই নিজস্ব বৃত্ত গড়ে তুলতে হয়। দাদু-নাতি পৃথক ভূগোল তৈরি করে বেঁচে থাকে। বর্হিবিশ্বের সম্মুখীন হয়ত হতেই হবে একসময়। তবুও যতটা নিজেদের আড়াল করে রাখা যায়, যাবতীয় রহস্যের ভণ্ডামি ভুলে থাকা যায় ততই আনন্দ। পুরাণের নারী চরিত্রদের ( দ্রৌপদী, শকুন্তলা, সীতা, কপালকুণ্ডলা) নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘উত্তরাত্তর কান্ড’ গল্পটি। কাহিনি প্রবাহিত হয়ে যায় যুগ থেকে যুগান্তরে। পুরাণের কাহিনি নিয়ে কখনও লেখক বিনির্মাণে এগিয়ে যান। এই আখ্যানে পুরাণের চরিত্রগুলির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কাহিনি এগিয়ে গেছে। পুরাণের চরিত্রগুলির মধ্যেই কেউ খুঁজে পেয়েছেন আদর্শ জননী, পতিব্রতা স্ত্রী, গৃহিণী। সেই চরিত্রগুলি নিয়েই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাহিনি নির্মিত হয়েছে। নারী চরিত্রগুলি নিজেদের আত্মযন্ত্রণার কথা বলেছে, নিজেদের ত্যাগ-তিতীক্ষার কথা বলেছে। প্রতিবাদ তো ছিলই, লেখিকা আবার নতুন দৃষ্টিকোন থেকে তা উপস্থাপিত করেন। মিশে থাকে নারীচেতনার কণ্ঠ। চরিত্রগুলি কালে কালে কীভাবে রূপান্তরিত হয় সে বয়ানে লেখিকা জানান— 

“আমার ঠিক এইরকম নিরাপদ পুরুষমানুষ রোচে না রে মৈথিলী। ভেবে দ্যাখ, কর্ণের স্ত্রী হলে এই মলাটবদ্ধ জীবনটায় আমাকে কে চিনতো, যজ্ঞে-রাজসভায়-যুদ্ধে-উৎসবে কোথায় আমি এমন অসামান্য মহিমা পেতাম? আমার দ্যুতক্রীড়াপণ্য হওয়া চাই, রজস্বলাদশায় হঠকারীদের লাঞ্ছনা চাই, অবদমিতকাম বীরের মুখে শোনা কটুকথা চাই, আমার চাই প্রতিশোধের নরমেধযজ্ঞে রক্তস্নান। যুগের পর যুগ ধরে নৈলে আমায় নিয়ে কে লিখতো আখ্যান, কে বানাতো এতসব সিরিয়াল? কি হতো রূপা গাঙ্গুলির?” (উত্তরাত্তর কান্ড, তদেব, পৃ. ৬৪) 

‘মধুবাতা ঋতায়তে’ একটি নারীর ট্র্যাজিক পরিণামের গল্প। গল্প বর্ণিত হয়েছে ওয়াকিল ইসলামের জবানিতে। আকুলকাকার মেয়ে লুবনা। লুবনা ভেসে গেছে তিস্তার জলে। ছোটবেলা থেকেই কথায় একপ্রকার জড়তা ছিল লুবনার। সারাজীবন ধরে পদদলিত হতে হয়েছে তাঁকে। যার হাত ধরেছে সেখানেই প্রতারিত হয়েছে। এই সংসারে যেন প্রতারিত হবার বড় ফাঁদ পাতা রয়েছে। নারী হলে শিয়ালের মতো পুরুষ সমাজ যেন সমস্ত দিক থেকে আক্রমণ করতে চায়। চেন সিস্টেমে একের পর এক আক্রমণ নেমে আসে— 

“সাজিদ হুসেনের অবর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য ভাল ইস্কুল খোঁজা যাবে না। সাজিদ হুসেনের অবর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য ভাল ইস্কুল খুঁজতে এসে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া যাবে না। সাজিদ হুসেনের অবর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য ভাল ইস্কুল খুঁজতে এসে ভ্যাবাচ্যাকা খেলে ওকে দেখতে ছেলেধরার মতো দেখাবে। সাজিদ হুসেনের অবর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য ভাল ইস্কুল খুঁজতে এসে ভ্যাবাচ্যাকা খেলে ওকে দেখতে যদি ছেলেধরার মতো দেখায় তাহলে ওকে সবজিওয়ালা-লন্ড্রির লোকটা-মাদ্রাসার ছাত্র-তালগাছওয়ালা বাড়ির নতুন ভাড়াটিয়া এইরকম সব্বার হাতে গণপিটুনি খেতে হবে।“ (মধুবাতা ঋতায়তে, তদেব, পৃ. ৭৩) 

লুবনারা সভ্যতা থেকে হারিয়ে গেছে। বলা ভালো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হারিয়ে দিয়েছে। লেখিকা নারী হয়ে নারীর সমস্যাগুলি জরুরি ভিত্তিতে তুলে ধরেছেন। কোন গল্পের ক্যানভাসই বড় নয়। বিশেষ কোন জটিল সমস্যা নিয়ে অবতীর্ণ হননি। সাধারণ ভাবে নারীর সাধারণ জীবনের কথাই বলেছেন। তবে ভাষাটি বড় জীবন্ত। উপমাবহুল ও চিত্ররূপময়। গদ্যের চলন অতি দ্রুত। বিশেষ কোন জীবনদর্শন বা প্রবণতা নেই। তবে গল্পের ভূগোল প্রসারিত। ইতিহাসের জগত থেকে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, তিস্তা, স্বদেশভূমি হয়ে বিদেশ। ইতিহাস, মিথের জগত থেকে বাস্তবের ভূমিতে প্রবেশ করেন। আবার কখনও বাস্তবের ভূমি থেকে ইতিহাস, মিথের জগতে হারিয়ে যান। এই দুই জগত থেকে তিনি একটি সত্য আবিষ্কার করেন। যে সত্যে মিশে থাকে নারী জীবনের নানা পদদলিত যন্ত্রণাকাতরতা, মর্মবেদনা।





লেখক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ
প্রবন্ধকার। গবেষক। পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন