মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

গল্পের রিলে রেইসে : নাহার মনিকা



সংক্ষেপে, মানুষের যাপিত জীবনই গল্প। 

আমাদের চারপাশের মানুষ, তাদের দুঃখ, আনন্দ, বিষাদ, আকুলতা, ক্রোধ, আক্রোশ, আন্দোলন, রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রেম, ভালোবাসা, মোহ, বিরহ আরো আরো যা কিছু দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য অনুভবের সম্ভব-অসম্ভব সবই গল্পে আছে, থাকে। 

গল্প এমনসব অবস্থা, সময়কে ধারণ করে যা কখনো স্থির, কখনো চলমান, তীক্ষ্ণ তীব্র কোন সংরাগের কথা বলে চলে। গল্প যেমন মানুষের কথা, তৃণলতার কথা বলে তেমনি মহাকালের সঙ্গে এদের সম্পর্কের কথাও বলে। গল্প জীবনের সেই পৌনঃপূনিকতা যা সমাজ মানসকে বুঝতে সাহায্য করে। 

গল্পের মধ্যে যে বহুমুখীনতা আছে তাতে করে গল্পের পাঠক ও লেখক হিসেবে উভয় তরফ থেকে প্রত্যাশা করার বিষয় দেখতে পাই। 

নির্মাণশৈলী, ভাষা, চরিত্র, সংলাপ ইত্যাদি নিয়ে গল্প শুরু থেকে অনেক পথ পার হয়ে আজকের যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে নিরীক্ষা ও ফলাফল সম্পর্কে সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই জানে। 

আজকের ফর্মে আসার জন্য গল্পকে কথকের মুখ থেকে খাগের কলমে নামতে হয়েছে। যেমনটা সবাই জানি যে, সাহিত্যের আদি ধারা হচ্ছে কবিতা, পারফর্মিং আর্টের অংশ হিসেবে নাটক, আরও পরে গদ্য। বলা হয়, ছোটগল্প কথা সাহিত্যের আধুনিকতম প্রকার। জীবনের তীক্ষ্ণ নিবদ্ধ বোধকে নতুন মাত্রা দিতে জীবনের গভীরে প্রোথিত দর্শনের কথা বলে গল্প। 

কত রকমেই তো গল্প লেখা হয়- যেমন, সরাসরি অথবা নৈর্ব্যক্তিক। শুধু কাহিনী বা ঘটনা সমৃদ্ধ গল্পের ধারা অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছে। গল্পহীন গল্প, গল্পের আড়ালের গল্প লেখার প্রবণতাও নতুন কিছু না। এখন স্রেফ একটি বলার ভঙ্গি দিয়ে কোনো পরিস্থিতি বা পর্যবেক্ষণের সফল উপস্থাপনও একটি গল্প হতে পারে। সব গল্পকারের অন্বিষ্টও এক না, আবার শুধুমাত্র কাহিনী বা ঘটনা বর্ণনাই নয়, ভাষাভঙ্গী ও আঙ্গিকও বিবেচনায় রাখা জরুরী। 

তো, নির্মাণপ্রক্রিয়া, চরিত্র, বর্ণনা, সংলাপ সবমিলিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় গল্প দেশ-কাল-ভাষা-সংস্কৃতি ভেদে আলাদা। কিন্তু আলাদা হলেও গল্প সামগ্রিকভাবে একটি শহর বা গ্রামাঞ্চলের মত সর্বাঙ্গে নানারকম ইমারত বা প্রকোষ্ঠ নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলছে, যাকে আমরা গল্পের জগত বলি। গল্পের এই প্রবাহ কোথায় গিয়ে পৌঁছুবে তা অনুমান করাও খুব দুঃসাধ্য কিছু না, যেহেতু মানুষ ও তার সংস্কৃতির প্রতিসরণ গল্পের শরীরে সেঁটে থাকে। 

গল্পের ইমারত বানাতে স্থপতি অর্থাৎ গল্পকার সব রকম উপকরণ ও সরঞ্জাম নিয়ে বসে, তবে সেসব যদি মাপে ও গুণে বিশ্বস্ত না হয় তাহলে দক্ষ স্থপতিও তার নির্মাণকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। আমার মতে, গল্প নির্মাণের প্রক্রিয়ায় সবচে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই বিশ্বাসযোগ্যতা, যা দিয়ে অতিপ্রাকৃত, যাদুবাস্তব, পরাবাস্তব, আধিভৌতিক, ভৌতিক অথবা নিরেট বাস্তব যা ই সৃষ্টি করা হোক না কেন পাঠকের পাতে তা প্রকৃত ও বিশ্বস্ত হিসেবে দেয়া যায়। 

গল্পকার আসলে কি বলতে চায়? শুধুই কাহিনী? ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি? 

গল্পকার সম্ভবত নিরন্তর অপূর্ণতা নিয়ে নিজের কথা বলার জন্য একটি নিজস্ব জগত তৈরী করে। গল্প জগতে তার অনুষঙ্গ, যা দিয়ে নিজস্ব অপূর্ণতাকে অর্থপূর্ণ করতে গল্প লিখে চলে। 

গল্পের বিষয় বা প্লট ধরা যাক, গাছের শেকড়ের মত। শাখাপ্রশাখা সমেত গাছকে স্থির দাঁড় করিয়ে রাখে। কিন্তু একহারা কাহিনী ছাড়াও তো গল্প হয়। প্লটের মধ্যে পড়ার কৌতুহল উস্কে দেওয়ার উপাদান চাই, মানে দরজা খুলেই যেন বাড়ির ভেতরের আবহ টের পাওয়া যায়, তার অর্থ এই না যে পাঠক প্রথম প্যারা পড়েই পুরোটা আঁচ করে বসবে। 

কী ভাষায় লিখলেন, কথ্য কি সাধুভাষা, মানুষের মুখের কথা কি বইয়ের ভাষা এটা গল্পকারের সিদ্ধান্ত, তার হাতেই ভাষার জীয়ণ-মরণ কাঠি, কোথায় স্পর্শ করলে গল্পে প্রাণ জেগে উঠবে তা শুধু গল্পটি পাঠ করেই জানা সম্ভব। তবে ভাষাকৌশলের কাছে পাঠকেরও নিজেকে তৈরী করতে হয়। তেমনি গল্পের বিষয়ের ওপরে আলো কিংবা অন্ধকারের প্রভাবটিও পাঠকের মনোযোগ দাবী করতে পারে। 

গল্পকার ও প্লটের মধ্যে গল্প একটি সাঁকো’র কাজ করে বলে আমার মনে হয়। নিজেকে প্রকাশ করতে গল্প নামের বাহনে চেপে বসেন গল্পকার, তারপর সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যান একটি পটভূমি বা বিষয়কে, জগতের সঙ্গে তার বিষয়ের অদৃশ্য কিংবা দৃশ্যমানতায় আটকা পড়ে গল্পটির দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। 

একজন পাঠক যখন প্রকৃত একটি গল্প পাঠ করে, তখন সে অচেনা একটা অনুভবের মুখোমুখি হয়, পাঠককে হরণ কিংবা দখল করে নেয় গল্প। সে গল্প তখন মানচিত্রের সীমানা, প্রচলিত বিশ্বাসকে ছাড়িয়ে যায়। পাঠক মানসে পরিবর্তনের এমন ছাপ ফেলে যাওয়াই বুঝি গল্পের কাজ! 

গল্পের সঙ্গে শিল্পের আর আর শাখারও গাঁট-ছড়া বাঁধা আছে। গল্প থেকে চিত্রকলা হয়, চলচ্চিত্র হয়, সঙ্গীত হয়, আবার এসব থেকে গল্প হয়। একটি প্রকৃত গল্প দিয়ে এই রিলে রেইস খেলা সম্ভব। আমি ব্যক্তিগতভাবে গল্পকে ঘিরে এই রিলে রেইসটি পছন্দ করি। 

খোদ গল্পকেই যদি একটা চরিত্র হিসেবে ধরে নেই, তাহলে দেখবো গল্পের জন্যও চারপাশে আরো গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে চরিত্রের ভেতর কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা মিলে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই গল্পে তার সমাজের, রাষ্ট্রকাঠামোর,ও রাজনীতির প্রভাব এসে পড়ে, যে কারণে ভিন্ন ভিন্ন দেশে গল্পের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও গল্পের আঙ্গিক, নির্মাণশৈলী ভ্রমণ করে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে যায়, আর প্রাচ্যের লেখকেরা পেয়ে যায় যাদুবাস্তবতা, বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকাশ কিংবা অন্যান্য গল্প লেখার কলাকৌশল। গল্পকে নিজস্ব অনুভব দিয়ে গল্পকারের আঁকার চেষ্টা সম্পূর্ণ হলেও হতে পারে, না ও হতে পারে। গল্পটির পরিপূর্ণতা নির্ভর করে জীবনের কতটা অতল খনন করে মানুষ ও তার অস্তিত্বের সত্যি তুলে আনা হচ্ছে। 

গল্পকারের সঙ্গী গল্প, সে সূত্রে গল্পের চরিত্ররাও তার সঙ্গে বসবাস করে। অন্তত যখন এবং যতক্ষণ গল্পটি লেখা হয় তখন এবং ততক্ষণ। তবে নিজের সৃষ্ট চরিত্ররাও কখনো জবাবদিহিতা চাইতে পারে, বা দাবীদাওয়া বাড়াতে পারে। যেমন হারুকি মুরাকামি তার গল্পের চরিত্রদের স্বপ্নে দেখেন না, বরং চরিত্ররা চিৎকার করে তার ঘুম ভাঙ্গায়, বলে ‘এই এটা ঘুমের সময় না! আমাকে তুমি ভুলে যেতে পারো না, এখনো অনেক লেখার বাকী আছে!” তার চরিত্রের কণ্ঠস্বরে অভিভূত হয়ে হারুকি নিজেকে একটা উপন্যাস লিখতে দেখেন। অর্থাৎ তখন তার গল্প এবং উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্যে একের পর এক লিখিত হওয়ার জন্য একটা রাসায়নিক সংযোগ তৈরী হয়। লেখালেখি নিয়ে, নির্দ্দিষ্ট করে বললে গল্পের সঙ্গে হারুকি মুরাকামি’র এই যে রাসায়নিক সংযোগ সেটা আমাকেও আকৃষ্ট করে। 

গল্প কি আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে মানুষের স্পৃহাকে উস্কে দেয়? 

মানুষের তীক্ষ্ণ, তীব্র অনুভূতির অনুবাদ, যেখানে লেখক নিজস্ব কল্পনাশক্তি গল্পের চরিত্রদের সত্তায় মিশিয়ে দিতে পারে। গল্পকার যেখানে সতর্ক ও সৎ, তখন পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে গল্পের গভীর সম্পর্ক তৈরী হয়, যে সম্পর্ক পাঠকের বোধের দেয়ালে ধাক্কা দিতে পারে। প্রকৃত গল্পে কোথায় যেন একটা বিধিমালা আছে, চেতনাকে শাণিত করার কাজটি অলক্ষ্যে করে যায়। 

গল্পের কতরকম ধরন- এক/বহুরৈখিক গল্প, যেখানে গল্প নেই কিন্তু গল্পের সমাহার আছে, কোন নির্দিষ্ট কাহিনী নেই, গল্পের আড়ালের গল্প, যেগুলো লেখা নেই, কিন্তু পাঠক পড়তে গিয়ে কল্পনা করে নিতে পারে। অর্থাৎ পাঠকেরও গল্পের সঙ্গে একটা সংযোগ ঘটানোর প্রায়োগিক প্রাসঙ্গিকতার দায় আছে। গল্প যে সংবেদনশীলতা তৈরী করে সেই সংবেদনশীলতা বা আবেগের জায়গাটা ধরতে পারাও পাঠকের কাজ। 

তবে যত কথাই বলি না কেন, সাদাসিধা করে দেখলে পাঠের আনন্দই গল্পের মূলকথা। একটা উত্তুঙ্গ অনুভবের কাছাকাছি পৌঁছানো। পাঠক হিসেবে আমি গল্পের কাছে সে আনন্দ প্রত্যাশা করি। পাঠের আনন্দ না থাকলে গল্প না পড়ে সিনেমা বা সার্কাস দেখলেই তো হয়! 

একজন গল্পকার হিসেবে গল্পের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একটু বিচিত্র। সংসার থেকে দূরে বসবাস করা চাকুরীজীবির মত, যার সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্র সংসার। গল্প আমার রেখে আসা সংসার। যখনই সময় করতে পারি সেখানে ছুটে যাই। কাঠাল গাছের মোটা ডালে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা পিড়িতে বসে দুলে দুলে সংসারের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখি, আনন্দ বিষাদের রস নিংড়ে নেয়ার চেষ্টা করি। আবার যখন কর্মদেশে ফিরি, তখনো গল্প আমার সব সময়ের মর্মসঙ্গী। লেখার প্রক্রিয়া উপভোগ করি, আর সে লেখা পাঠকের পছন্দ হলে তো কথাই নেই! 

আমি অপেক্ষা করি যে গল্পও আমাকে দিয়ে নিজেকে লিখিয়ে নেবে। গল্পের বিষয় বা কণ্টেন্ট এর প্রসঙ্গে চারপাশ আর অভিজ্ঞতার তারে ঝুলে থাকা মানুষের গল্প, কিংবা কোন সংবাদ, এসব যথেষ্ঠ জোরদার হতে হবে যাতে আমি ‘গল্পকার’কে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারে। 

সেই সঙ্গে এও চাই যে, আমার গল্প বা গল্পের চরিত্ররা আমাকে নির্ঘুম রাখুক, আমার সঙ্গে কথা বলুক, এবং আরো লিখিয়ে নিক, এবং স্বপ্নে কিংবা জাগরণে তাদেরকে অন্য গল্পে ফিরিয়ে আনতে তাড়া দিক। 

কাকতালীয়ভাবে, এ যাবত আমার গল্পের বেশ কিছু চরিত্রের ক্ষেত্রে এ ব্যপারটি ঘটেছেও। 

অন্তর্জগতের কল্পনা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি’তে লেখা আমার গল্পের চরিত্রেরা উদ্বিগ্নতা নিয়ে প্রায়ই ফিরে আসে। ‘যুদ্ধ ও হরণের দিন’ এর তিথি, ‘চারিদিকের রোদের হাহাকারের’ শিরিন, মুরাদ, কিংবা আরো পরের যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে আবার মাথাচাড়া দেয়া মৌলবাদের সুক্ষ্ণ বলয় থেকে মুক্ত নয় এমন সময়ের ‘ডানায় বাহানা’ গল্পের অমিয়া, ঘটনাচক্রে যার নাম সামিয়া হয়ে গেছে, ‘পলায়নপর’ গল্পের মা’য়ের চরিত্র নিয়ে, কিংবা ‘আড়াল’ গল্পের তোজো, অথবা ‘ঘূর্ণাবর্ত’ গল্পের মুখচোরা যুবকটি কিছুদিন পরপর আলোড়ন তুলে নাড়া দিয়ে যায়, বলে “আমাদেরকে নিয়ে কি আরো গল্প লেখা যায় না!” 

নিশ্চইয়ই যায়। এই গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট বিরাট ক্যানভাসের আংশিক আখ্যান বলেই সম্ভবত তারা পরের সিক্যুয়েল দাবী করে বসে। গল্পকার হিসেবে আমিও উপলব্ধি করি যে গল্পের এ প্রেক্ষাপট নিয়ে আরো গল্প লেখার অবকাশ আছে। যখন তা থাকে না তখন চরিত্ররা সম্ভবত নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন গল্পকারকে জাগিয়ে দেয়ার দায় তাদের নেই। 

সাধারণত, একজন গল্পকার নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঘরানায় থেকেই সম্ভবত গল্প নির্মাণ করে। আমি চারপাশের ঘটে যাওয়া সকল ঘটনাবলির মধ্যে সবরকম ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক অন্ধত্বের প্রশ্নে আমার ব্যক্তিগত চিন্তা আমি আমার লেখায় তুলে ধরি। তবে গল্প বলার জন্য তথ্য বা তত্ত্ব দিতে একদম পছন্দ করি না। গল্পতো আদি এবং অন্তে গল্পই। পাঠককে নিবিষ্ট রাখা, এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে আনন্দ-বিষাদ দিয়ে ভাবিয়ে তোলার কাজ। সরাসরি তথ্য সরবরাহ করে গল্প ও গবেষণার তফাৎ ঘোচানো আমার ঘোর অপছন্দ। 

আমার এ যাবৎ লেখা গল্পগুলি থেকে বলতে পারি, কিছু গল্প বিচ্ছিন্ন হলেও প্রেক্ষাপট এক হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে ধারাবাহিকতা আছে, একধরণের রিলে রেসের মত ধারাবাহিকতা। উদাহরণ হিসেবে বলি- আমি নিজে দেশের বাইরে থাকি বলে অভিবাসী জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই। অধিকাংশ গল্প আমার চারপাশে উড়ে ঘুরে বেড়ায়। উদাহরণ দেই- ‘ফুড়ুৎকার’ দেশ থেকে আসা অভিবাসী রেফ্যুজি ক্লেইমেন্ট পরিবারের গল্প। সেখানে এখানকার বাংলা কাগজের বিশাল বিজ্ঞাপন পাতার কথা উল্লেখ করেছি। এ বিজ্ঞাপন পাতা আমাদের দেশের বিজ্ঞাপন পাতা থেকে আলাদা। এ পাতা ঘিরে বাংলাদেশী কম্যুনিটির জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, লোক্যাল পলিটিক্স আবর্তিত থাকে। আর এ পাতা জুড়ে আমার গল্পের চরিত্ররাও ঘোরাফেরা করে। ‘ফুড়ুৎকার’ গল্পের চরিত্র অনুর দেখা কমিউনিটির ট্যাবলয়েড পত্রিকার বিজ্ঞাপনী পাতায় আমি পেয়ে যাই ‘অনুষঙ্গ’ গল্পের শম্পাকে নির্মাণের প্রয়াস পাই। ‘সবুজ নির্বীষ সাপের মত’ গল্পের নারীটি, ‘রোলার কোষ্টার’ গল্পের শিমূল’ এরা সব ঐ বিজ্ঞাপনের পাতা থেকে উঠে আসা মানুষ, যাদেরকে আমি কোনদিন চাক্ষুস না করলেও তারা আমার চারপাশে হেঁটে ফিরে বেড়ায়। 

লেখা গল্প এবং এখনো লিখিত না হওয়া গল্পের চরিত্ররা মাঝে মাঝে আচমকা আমাকে থামায়। জানতে চায় যে কবে তারা রচিত হবেন! 

সবশেষে বলি- প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মহাশূন্যের, শূন্যতার কোন যোগসূত্র আছে কি না তা অনুভব করতে হলে আমাদেরকে যে সুকুমারবৃত্তির আশ্রয় নিতে হয়, আমার মতে তার নাম শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য। গল্প দিয়ে আমরা চেনা জগতকে অচেনার মত করে ধরতে চাই। অন্তর্জগতের কল্পনা হচ্ছে গল্পকারের স্বাধীনতা, সে স্বাধীনতা প্রকৃতির শক্তির মত, গল্পকার সে জগতের একচ্ছত্র আধিকারিক। আদিকাল থেকে পৃথিবীজুড়ে গোত্র-বর্ণ-জাতি ভেদে মানুষ তাদের গল্প রেখে গেছে। রেখে যেতে চায়। গল্পের মধ্যে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, আবার গল্প ও গল্পের চরিত্ররা মানবজীবনের স্রোতে জীবন্ত হয়ে ঢুকে পড়ে। গল্পের লেখক, পাঠক এবং শিল্পের অন্যান্য শাখার সঙ্গে গল্পের যে রিলে রেইস, সে বিশাল প্রবহমানতায় গল্পকার হিসেবে আমিও একজন। 




লেখক পরিচিতি
নাহার মনিকা
গল্পকার। কবি।
কানাডায় থাকেন। 

প্রকাশিত বই--
উপন্যাসঃ 
মন্থকূপ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯)।
 বিসর্গ তান (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)। 

গল্পগ্রন্থঃ দখলের দৌড় (পুথিনিলয় ২০১৯)। 
জাঁকড় (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪)।
পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)।

কাব্যগ্রন্থঃ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল (বাংলামাটি প্রকাশন, ২০০৭)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন