মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

আনিসুজ্জামানের গল্প : গল্পের গল্প



বহুদিন পর ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় বাদলের দিনে হাঁটতে বেরিয়ে আনিসের মনে পড়ে যাবে সেই বিকেলের কথা, যে বিকেলে দেড় ঘণ্টা হেঁটে খুজে পেয়ে বন্ধুর দরজায় টোকা দেয় আর ছোট্ট এক ছেলে মুখ বের করে জিজ্ঞেস করে–কি চান? সে অবাক হয়ে যায় এতটুকু বাচ্চার মুখে এই প্রশ্ন শুনে। সত্যিই তো কি চায় আনিস! উত্তর না খুঁজে তখনই উল্টো প্রশ্ন করে, তোমার নাম কি? সে জানত বন্ধুর দু'ছেলের একজনের নাম গল্প আরেকজনের নাম গদ্য, কিন্তু কোনটা যে কে তা সে সবসময়েই গুলিয়ে ফেলে। আর এই তো প্রথম ওর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা। এর আগে তো শুধুমাত্র ফেসবুকে ওদের ছবি দেখেছে।

--গল্প, আমার নাম গল্প, আপনি কে?-পাল্টা প্রশ্ন আসে।

--আমি তোমার চাচ্চু, আনিস, তোমার কাছে এসেছি, এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে ও কি বলে শোনার জন্য তাকিয়ে থাকে।

গল্প দরজা খুলে ভেতরে আসার ইঙ্গিত দিয়ে বলে, তাই বলে ভাববেন না আমি অপরিচিত কাউকে ঢুকতে দিই। আপনার কথা বাবা বলেছেন, ছবিও দেখছি; তবে আজ আসবেন সেটা বাবা বলেনি। তাই প্রথম দেখে আমি চিনতে পারিনি। এই কারণে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি চান। বাবা এক্ষুণি এসে পড়বে। মা রান্না করছে। গল্প ব্যাখ্যা করে। আনিস আরও অবাক হয়ে ছেলেটার বয়স সম্মন্ধে সন্দিহান হয়ে পড়ে। ড্রয়িংরুমে বসলে মাথাভরা একরাশ চুল ঝাঁকিয়ে হাল্কাপাতলা গল্প ঠিক ওর সামনে এসে বসে।

বাবা যতক্ষণ না আসে তোমার সঙ্গে গল্প করি। গল্পকে আনিস বলে।

গল্প যা বলে সব কিন্তু গল্প না। অনেক সত্যি কথাও বলে। তবে মাত্রই যে বলল মা রান্নাঘরে, এইটা সত্যি না, গল্প। মা আসলে বাজারে গেছে।

--মিথ্যা বললে কি গল্প হয়? আনিস ধরিয়ে দিতে চায় গল্প যেটা বলেছে সেটা মিথ্যা।

--মা ঘরে আছে কি নেই, এটার সঙ্গে সত্যমিথ্যার সম্পর্ক নেই, এই কারণে এটা গল্প। গল্পের ত্বরিত জবাবে আনিস চুপ করে যায়। কথা খুঁজে না পেয়ে সে তখন জিজ্ঞাসা করে, তোমার প্রিয় গল্পের নাম কি বলবে আমাকে?

--আমার প্রিয় গল্পের কোনো নাম নেই। তবে গল্পটা আছে, আপনাকে দেখাতে পারি। গল্প বলে।
--দারুণ ব্যাপার হবে, এই প্রথম গল্প চোখে দেখব। আনিস মজা করার ঢঙে বলে।

কেন, এতক্ষণ যে আমাকে দেখলেন? গল্প সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে দেয়ালের দিকে ইশারা করে। আনিস দেখে একটা দেয়াল ঘড়ি, অচল, সেঁটে আছে।

--ঘড়ি?

--আপনার কাছে এখন পর্যন্ত ওটা ঘড়ি, কিন্তু ওটার কাহিনি শুনলে গল্প হয়ে যাবে।

--তাহলে তো শুনতেই হয়। আনিস বিস্ময় নিয়ে তাকাই ঘড়িটার দিকে।

--আপনার আগ্রহ কিছুটা কমলে বলব। বলে গল্প উঠে দরজাটা খুলে দেয়। গল্পের বাবা ভেতরে আসে। আনিসকে সঙ্গে নিয়ে রিডিংরুমে যায়। আনিস ওর সঙ্গে বসে। বলে, গল্প খুব ম্যাচিউর হয়েছে।

--বেশি ম্যাচিউরিটি গল্পের জন্য ভালো না। আমি সবসময় গল্পের কাছে একটা সরল বিষয় প্রত্যাশা করি। গল্প যেন নিজে থেকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা না করে। গল্পের বাবা বলে।

--কিন্তু আমি চাই গল্পটার একটা স্বাধীন অস্তিত্ব থাকুক। লেখকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুক। আনিস যোগ করে।

--কিন্তু যদি গল্প নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে বসে? চিন্তাকে বদলে দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে?

আনিস হাসতে হাসতে বলে, আমি লেখকের ক্ষমতায় বিশ্বাসী না, তবে গল্পের ক্ষমতাকে আমি সমীহ করি। কিন্তু সেটা মৃদুভাবে নাড়া দিয়ে যাবে। একটা সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করবে। আনিস বলে।

--গল্পকে হতে হবে মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের মতো, সুরটা ধরিয়ে দেবে, কিন্তু শিল্পীর মতো লিরিকটা গেয়ে দেবে না। গল্পের বাবা যোগ করে।

--আমি নিজেও এই কারণে চাই গল্প যতটা সম্ভব চুপ থাকুক, নৈঃশব্দ তৈরি হোক শব্দের ভেতর দিয়ে, ভাষার ভেতর দিয়ে আলো আর অন্ধকারে হাঁটার পথটা তৈরি করে দিক। আনিস টেবিলের উপর রাখা গল্পগুচ্ছ তুলে নিয়ে বলে।

--চুপ থাকলে শব্দ কেমন করে তৈরি হবে আঙ্কেল? পেছন থেকে এসে গল্প প্রশ্ন করে। ও মুখ টিপে হাসে। বোঝা যায় দুষ্টুমি করছে।

--চুপ থেকে শব্দ তৈরি করার খেলাটাই তো প্রকৃত গল্পের কাজ। আনিস বলে।

--জানি তো, আমাদের ঘড়িটা এটা পারে। গল্প ফের ঘড়ির প্রসঙ্গ তোলে।

--তাহলে ঘড়ির গল্পটা এবার শুনি? আনিস গল্পকে ধরে কোলের কাছে টেনে নেয়।

--কোন ঘড়ি? আনিসের বাবা প্রশ্ন করে।

--বাইরে দেয়ালে যেটা আছে।

--কিন্তু বাইরে তো কোনো ঘড়ি নেই। এ বাসাতে কোনো দেয়াল ঘড়ি নেই। একটা ছিল, অনেক পুরাতন, কাজের মেয়েটা ঝুল ঝাড়তে গিয়ে ভেঙে ফেলেছে। গল্পের বাবা বলে। 

আনিস বাইরে ঘরে বেরিয়ে এসে দেখে সত্যিই কোনো দেয়ার ঘড়ি নেই। যেখানে দেখেছিল সেখানে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে, তাও গত বছরের। আনিস বিস্ময় নিয়ে গল্পের দিতে তাকায়। গল্প আর ওর বাবা পরস্পরের দিতে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।

মাটি, গল্পের মা আসে। গদ্যকে ডাক্তারের কাছে নিয়েছিল। সামান্য সর্দি-জ্বর। আনিসকে নিয়ে ওরা খেতে বসে। ডাইনিং টেবিলের উপর ঝুলন্ত ক্যালেন্ডারের দিকে বারবার আনিসের চোখ চলে যায়।


দিনটা ছিল বাদলা শীতের ডিসেম্বরের শেষ। তাপমাত্রা উনচল্লিশ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হলেও আনিস তক্কে তক্কে ছিল কখন হাঁটতে বেরুবে। ডাক্তার পইপই করে বলে দিয়েছে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে হয় দাওয়াই খেতে হবে নতুবা পরিমিত খাবার ও সপ্তাহে কমপক্ষে একশত পঞ্চাশ মিনিটের ব্যায়াম। যদিও ওর দ্বিতীয়টাই পছন্দ তারপরও ঘরে যন্ত্রপাতি থাকলেও নিতান্তই বাধ্য না হলে সে বাইরে হাঁটাহাঁটিটাই পছন্দ করে।

সে থাকে এক পাহাড়ি অঞ্চলে গাছগাছালি ভরা উপত্যাকায় যেখানে হাজার বছর ধরে খুমিয়াই উপজাতিরা বাস করত। এখনও ওর বাড়িতে খমিয়াইদের শিকার করার পাথরের অস্ত্রপাতিসহ প্রচুর দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিষপত্র পাওয়া যায়। তবে এখন ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন নাম দেয়া ছোট্ট এক কোনায় অবশিষ্ট দু চারঘর খুমিয়াই ছাড়া অন্য কোথাও ওদের দেখা মেলে না। সাদা চামড়া ছাড়া অন্য কোন গায়ের রঙও বিরল। আট বছর আগে যখন ও প্রথম বাড়িটা কিনেছিল তখন রাস্তায় বেরুলে সবাই ওর দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাতো। এখন আর অতটা হয় না।

মেঘের ফাঁকে সূর্য একটু উঁকি দিলেই ও বেরিয়ে পড়েছিল। উঁচুনিচু বন্ধুর রাস্তার থামুন লিখা চৌরাস্তা পর্যন্ত দূরত্ব ১.৩২ মাইল। ওই পর্যন্ত গিয়ে সে ফিরে আসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে গায়ে চড়ান মোটা গাউনটার হুড মাথায় টেনে .৩২ মাইল হেঁটে ভারী গেটটা বোতাম টিপে খুলে বড় রাস্তায় দানে মোড় নেয় সে। কোভিডের কাল বলে একটা মাস্ক হাতে নিতে ভুলে নাই সে। কিছুটা হাঁটলে হাতের ডান দিকে চোখে পড়ে বছরের প্রথম দিকে লাগানো “ Keep America Great” সাইনবোর্ডটা যেটাকে এখনও সরানো হয়নি। ইচ্ছে করেই তাকায় রাস্তার বাম দিকের সাইনবোর্ডটার দিকে যেটাকে লাগানো হয়েছে মাস তিনেক আগে: Black Live Matter!

ওগুলোকে ছাড়িয়ে গল্পের কথা ভাবতে ভাবতে জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলে। এখানে সেলফোন সিগন্যাল না থাকলেও অভ্যেসবশত ই ফোনটা সাথেই আছে, গুণে চলছে ওর প্রতিটি পদক্ষেপ। চৌরাস্তায় পৌছুতেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় আবার। এই শীতে ভিজে গেলে করোনাতে না মারা গেলেও কেউ নিউমোনিয়া ঠেকাতে পারবে না। রাস্তার দুপাশে প্রচুর ওকগাছ থাকলেও নিচে দাঁড়ালে ভিজে যাচ্ছে। হাঁটুতে সমস্যা আছে বলে ওর দৌড়ান বারণ। আরও দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। বৃষ্টির সাথে ছোট ছোট শিল পড়া শুরু হয়। আর থাকে না পেরে দৌড় শুরু করে। সামনের রাস্তাটা সোজা। সামনে যেতে যেতে সরু হয়ে গেছে আর একেবারে শেষ মাথায় সাইনবোর্ডদুটি একসাথে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটুর ব্যথা অগ্রাহ্য করে আরও দ্রুত ছুটতে থাকে। ওখানে ওকে পোঁছতে হবে, যেভাবেই হউক না কেন।

রাস্তার দুপাশে কিছু দূরে দূরে ট্রাফিক সিগনালের পোলে কারা যেন একটা করে দেয়াল ঘড়ি সেঁটে গেছে!
গল্প কি এভাবেই হয়? 

1 টি মন্তব্য: