মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

হারুকি মুরাকামি'র গল্প লেখার গল্প : আমার ‘কিচেন টেবল ফিকশন’ জন্মের ইতিকথা



অনুবাদ : আলভী আহমেদ

ভূমিকা: 

হারুকি মুরাকামির তুলনা কেবল তিনিই। দেশকালের সীমানা পেরোনো এই বিখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার গল্প বলার সরল গদ্যভাষা, বিষয়বস্তু, আর জাদুকরি ঢঙের কারণে দুনিয়াব্যাপী খুবই জনপ্রিয়। পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রীত আর আলোচিত লেখকদের মধ্যে তাঁর নাম অগ্রগণ্য। 

‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’–এ লেখকের প্রথম উপন্যাস। প্রথম সাহিত্য রচনার চেষ্টা। ৪১ বছর আগে এই উপন্যাসের মাধ্যমেই সাহিত্য রচনার আনন্দময় ভুবনে যাত্রা শুরু করেন তিনি। জাপানে উপন্যাসটা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘গুঞ্জো’ নামে একটা সাহিত্য পত্রিকায়। এটা ১৯৭৯ সালের জুন মাসের ঘটনা। পরের মাসেই এটা বই আকারে বের হয়। সে সময় বইটা বেশ আলোড়ন তোলে পাঠকের মধ্যে। কিজুকি ওমোরি নামে এক চলচ্চিত্র নির্মাতা এটা নিয়ে ১৯৮১ সালে একটা চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। 

মুরাকামি তাঁর নিজের অনেক লেখায় এবং সাক্ষাৎকারে ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ লেখার ইতিহাস বলেছেন। এটা নিয়ে ২০১৪ সালে প্রায় আড়াই হাজার শব্দের একটা নিবন্ধ লেখেন তিনি। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘দ্য মোমেন্ট আই নিউ আই উড বি আ নভেলিস্ট’ শিরোনামে লেখাটা প্রকাশিত হয়। প্রথম দুটি উপন্যাসের সংকলন ‘উইন্ড/পিনবল’-এর ভূমিকায়ও লেখাটা পাওয়া যাবে। নিবন্ধটার নাম ‘দ্য বার্থ অব মাই কিচেন টেবল ফিকশন’। বলা ভালো, ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’কে তিনি বরাবরই ‘কিচেন টেবল ফিকশন’ বলে থাকেন। আসুন, মুরাকামির মুখেই শুনি তার লেখালেখির গল্প। অনুবাদ করেছেন আলভী আহমেদ। 


আমার ‘কিচেন টেবল ফিকশন’ জন্মের ইতিকথা 

বেশির ভাগ মানুষই…এই পর্যন্ত লিখে আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। ‘বেশির ভাগ মানুষ’ বলতে আমি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছি? সম্ভবত, আমি এখানে জাপানের মানুষের কথা বলেছি।
জাপানের বেশির ভাগ লোকেরই জীবনধারণের একটা নির্দিষ্ট ছক আছে। তারা প্রথমে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে। তারপর কোনো একটা কাজ খুঁজে নেয়, চাকরিবাকরি করে। এভাবে বেশ কিছুদিন পার করে দেওয়ার পরে একসময় তারা বিয়েশাদি করে থিতু হয়। আমি নিজেও জীবনের এই মুখস্থ ছকটাই অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম। অথবা, ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যেতে পারে যে আমি অন্তত ভেবেছিলাম, আমি এ রকম কিছু একটাই করব। 

কিন্তু বাস্তবে একটু উনিশবিশ হয়ে গেল। প্রথমে আমি দুম করে একদিন বিয়েটা করে ফেললাম। তারপর চাকরি নিলাম। সবশেষে কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলো। একজন আদর্শ জাপানি নাগরিক যে সিঁড়িটা ভেঙে জীবনের ওপরের দিকে ওঠে, আমি মোটামুটি সেই সিঁড়ির ওপর দিক থেকে নিচের দিকে নামলাম। 

চাকরিবাকরি করাটা আমার কোনো দিনই পছন্দ ছিল না। অচিরেই কাজটা ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে জাগল। কিন্তু ছেড়ে দিলে চলবে কী করে? ভাবছিলাম, নিজে কিছু একটা ব্যবসাপাতি দাঁড় করাব। স্বাধীনভাবে কিছু একটা করব। 

এখন ব্যবসাটা কী ধরনের হতে পারে? আমার ইচ্ছে ছিল, একটা কফিশপ চালু করব, যেখানে মানুষ জ্যাজ মিউজিক শুনতে আসবে। সঙ্গে তারা কফি, স্ন্যাকস এবং অন্যান্য ড্রিংকসও খেতে পারবে। কফিশপ কাম বারটাইপের একটা ব্যাপার। এটাকে আপনারা ‘যেমন খুশি তেমন আইডিয়া’ও বলতে পারেন। এ রকম পরিকল্পনা যখন করছিলাম, তখন এটা থেকে কত টাকা আসতে পারে, সেটা নিয়ে ভাবিনি একবারও। ভেবেছিলাম, এ রকম একটা ব্যবসা দাঁড়া করতে পারলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমার পছন্দের মিউজিক অন্তত শুনতে পারব। 

সমস্যাটা হলো, ব্যবসা করতে মূলধন বলে একটা ব্যাপার খুবই জরুরি বিষয়। আমার বা আমার স্ত্রীর কারওরই কোনো টাকাপয়সা ছিল না। 

তিনটা বছর আমরা গাধার মতো খাটলাম। মাঝেমধ্যে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটা চাকরি করেছি। যতদূর পারা যায়, ব্যবসার জন্য টাকা জমানোর চেষ্টা করলাম। মোটামুটি কিছু টাকা জমে গেল। এরপর আমি যাকে সামনে পেলাম, মোটামুটি তার কাছ থেকেই টাকাপয়সা ধার করলাম। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউই বাকি রইল না। ব্যাংক থেকেও একটা ছোটখাটো লোন পেয়ে গেলাম। 

এরপর সব টাকা এক করে আমরা টোকিওর পশ্চিম দিকের শহরতলির কোকুবুনজিতে একটা ছোট্ট কফিশপ কাম বার দিলাম। জ্যাজ ক্লাবের মতো। জায়গাটাকে মূলত আমরা একধরনের স্টুডেন্ট হ্যাংআউটের আদল দিতে চেয়েছিলাম। সেটা ছিল ১৯৭৪ সালের ঘটনা। 

এখন যেমন কোনো একটা ব্যবসা শুরু করতে অনেক টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়, সেই আমলে ততটা প্রয়োজন পড়ত না। আমাদের মতো তরুণেরা যারা চাকরি করবে না বলে ঠিক করেছে, তারা শহরের অলিতেগলিতে অল্প মূলধনে এ রকম ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিল। ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে বইয়ের দোকান, স্টেশনারি শপ—সব ধরনের ব্যবসা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। 

কোকুবুনজির আকাশে-বাতাসে তখন একধরনের প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। কফিশপের আশপাশে বেশ কিছু কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। কফি খেতে আসে, আড্ডা দেয়। আমরা যারা ওই এলাকায় এ রকম স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেছিলাম, তাদের অনেকেই কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় নেতা-কর্মী। সে সময় অনেকেই পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছিল। সে যুগে চাইলে, সিস্টেমের মধ্যেও ছিদ্র বের করা যেত। 

নিজেকে বোঝালাম, তুমি অসাধারণ কিছু একটা লিখবে, এই ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। উপন্যাসের আঙ্গিক ও কাঠামোগত বিষয়গুলো ভুলে যাও। সাহিত্য লেখার চেষ্টা কোরো না, মনের কথাগুলো লিখে ফেলো। 

আমার মা-বাবার বাড়িতে একটা আপরাইট পিয়ানো ছিল, যেটা বড় গ্র্যান্ড পিয়োনোর চেয়ে সাইজে সামান্য ছোট। একটু কম জায়গা খায়। একদিন গিয়ে পিয়ানোটা নিয়ে এলাম এবং সেটা আমাদের কফিশপে সেট করলাম। ইচ্ছে ছিল, ছুটির দিনগুলোতে লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা করব। 

সে সময়ে কোকুবুনজিতে অনেক উঠতি তরুণ জ্যাজ মিউজিশিয়ান ছিল, যারা খুব অল্প টাকায় আনন্দের সঙ্গে (আমি অন্তত সে রকমই ভাবতাম) লাইভ পারফরম্যান্স করতে রাজি হয়ে যেত। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে বিখ্যাত মিউজিশিয়ান হয়েছেন। এত বছর পরে আমি যখন টোকিওর বড় বড় জ্যাজ ক্লাবে যাই, মাঝেমধ্যে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে।


আমাদের সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল। একটু একটু করে মানুষের ধার–দেনা শোধ করে দিচ্ছিলাম। ব্যাংক লোনের কিস্তিও সময়মতো শোধ করতাম। যদিও এ জন্য পরিশ্রম করতে হতো খুব। একবারের একটা গল্প বলি।

পরদিন আমাদের ব্যাংকের কিস্তি শোধ দেওয়ার কথা। কিন্তু পুরো টাকাটা জোগাড় হলো না। কিছু টাকা কম পড়ে গেল। আমি আর আমার স্ত্রী এটা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়লাম। সারা দিন ভাবলাম। বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করলাম টাকা জোগাড়ের। কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারলাম না। গভীর রাতে যখন বাড়িতে ফিরছি, হঠাৎ রাস্তায় কিছু টাকা পড়ে থাকতে দেখলাম।

এটা স্বর্গীয় কোনো ব্যাপার ছিল কি না আমি জানি না, কিন্তু যে পরিমাণ টাকা আমাদের কম পড়েছিল, রাস্তায় পড়ে থাকা টাকার অঙ্কটা ঠিক তত (জীবনে বহুবার এ ধরনের অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি আমি হয়েছি)। যেহেতু পরের দিনই ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার শেষ দিন, ওই টাকাগুলো রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিলাম আমরা। জাপানের একজন সৎ নাগরিক রাস্তায় ও রকম টাকা পড়ে থাকতে দেখলে, সেগুলো তুলে নিয়ে পুলিশের কাছে জমা দিয়ে দিত। কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি শোধ করা নিয়ে আমাদের মধ্যে এত টেনশন কাজ করছিল যে এ ধরনের সুন্দর একটা সেন্টিমেন্টকে আমরা সচেতনভাবে পাশ কাটিয়ে গেলাম।

বুঝতেই পারছেন, জীবনটা খুব কঠিন ছিল তখন। সারা দিন ধরে ব্যবসার হিসাবপত্র রাখা, জিনিসপত্র পরীক্ষা করা, কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কফি কিংবা ককটেল বানানো, কিচেনে স্যান্ডউইচ তৈরি, গভীর রাতে দোকান বন্ধ করা—সবকিছু আমাদেরই করতে হতো। পরে অবশ্য একটা সময়ে গিয়ে কাজে সাহায্য করার জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট রাখার সামর্থ্য আমাদের হয়েছিল। 

তবু বড় আনন্দ নিয়ে বেঁচে ছিলাম। বয়সটা আমাদের পক্ষে ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সারা দিন আমার পছন্দের গান শুনতে পারতাম। আমার নিজের রাজ্যে আমি নিজেই রাজা ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি ট্রেনের জন্য দৌড়াই না, দিনের মধ্যে তিন-চারটা বিরক্তিকর মিটিং অ্যাটেন্ড করি না, ভিড়ের বাসে গাদাগাদি করে মানুষের ঘামের গন্ধ নিই না, যে বসকে দুচোখে দেখতে পারি না, তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। নিজের রেস্টুরেন্টে কাজ করি, মিউজিক শুনি আর মানুষ দেখি। মজার সব মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বড় ভালো লাগে।

কয়েক বছর পরে আমাদের বাড়িওয়ালা বিল্ডিংটা ভেঙে দিয়ে নতুন করে বানাবেন বলে ঠিক করলেন। তিনি আমাদের বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিলেন। পুরোনো জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে টোকিওর কেন্দ্রে সিবুয়া স্টেশনের পাশে সেনদাগায়া বলে একটা জায়গায় নতুন করে আমাদের জ্যাজ ক্লাবটা শুরু করলাম। নতুন জায়গাটা খুব একটা বড় ছিল না। আবার তেমন ছোটও না। সেখানে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো রাখার মতো জায়গা ছিল। কিন্তু এই পরিবর্তনটুকুর জন্য আমাদের আরও কিছু ধারদেনা করতে হলো। সুতরাং, জীবন কোনোভাবেই সহজ হলো না।

যখন ফিরে দেখি তখন মনে হয়, কী অমানুষিক পরিশ্রমটাই আমরা করতাম তখন! যে বয়সে মানুষ আরাম-আয়েশে, হাসিঠাট্টায় দিন কাটায়, সে বয়সে আমরা রেসের ঘোড়ার মতো ছুটেছি। ফাঁকা সময় প্রায় খুঁজেই পেতাম না। যেটুকু পেতাম, বই পড়তাম। গান শুনতে শুনতে বই পড়া আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার। আমি মাঝেমধ্যে খুব ব্যস্ত থাকতাম, কখনো হতাশায় ভেঙে পড়তাম, আশার আলো দেখতে পেতাম না, কিন্তু বই পড়ার আনন্দটুকু কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারেনি।

অবশেষে একটা পর্যায়ে গিয়ে, আমাদের সেনদাগায়া জ্যাজ ক্লাবটা দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু সেটা নিয়ে আনন্দ করার কোনো সুযোগ ছিল না। বহু লোক তখনো আমাদের কাছে টাকা পেত। তবু শেষ পর্যন্ত এটা মনে হয়েছিল যে আমরা ঠিক পথেই আছি।

দিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসের এক বিকেল। রৌদ্রোজ্জ্বল একটা দিন। জিঙ্গু স্টেডিয়ামে বেসবল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। আমার জ্যাজ ক্লাব থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথে মাঠটা। সেন্ট্রাল লিগের খেলা ছিল সেদিন। মৌসুমের ফার্স্ট ম্যাচ। খেলবে ইয়াকুল্ট সোয়ালো আর হিরোশিমা কার্প নামে দুটো দল।

আমি তখন ইয়াকুল্ট সোয়ালোর একজন বড় সমর্থক। যে সময়টায় কথা বলছি, তখন হিরোশিমা কার্প বড় দল হলেও সোয়ালো খুবই দুর্বল একটা দল ছিল। দলের টাকাপয়সা তেমন নেই। সুতরাং দলবদলের বাজারে তারা নামীদামি কোনো খেলোয়াড় দলে ভেড়াতে পারত না। এ কারণে তেমন জনপ্রিয় ছিল না। তাদের খেলাগুলোতে মাঠ মোটামুটি ফাঁকাই থাকত। সে সময়ে বিকেলে হাঁটাহাঁটির বদলে আমি প্রায়ই খেলা দেখতে মাঠে চলে যেতাম।

তখন মাঠটাতে দর্শকের খেলা দেখার জন্য কোনো সিট ছিল না। একটা ঘাসে ঢাকা ঢাল ছিল। সেই ঢালের ওপর শুয়ে বসে আরাম করে খেলা দেখত মানুষ। বিয়ার খেতে খেতে খেলা দেখার একটা চমৎকার ব্যবস্থা।

আকাশে সেদিন এক ফোঁটা মেঘ ছিল না। মৃদু হাওয়া বইছিল। হাতে ধরা বিয়ারটা ঠিক যতটা ঠান্ডা হওয়া সম্ভব, ঠিক ততটাই ঠান্ডা ছিল।

সোয়ালোর হয়ে ওপেনিং ব্যাটার ছিল ডেভ হিলটন নামে এক আমেরিকান খেলোয়াড়। সে বছরই যোগ দিয়েছিল দলে। হিলটন ঠিক মাঝ ব্যাটে একটা ভালো হিট করেন। ব্যাটের ঠিক মাঝখানে বল লাগলে যে রকম শব্দ হয়, সে রকম একটা শব্দ পুরো স্টেডিয়ামে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এবং সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়, আমি একটা উপন্যাস লিখতে পারব।

আমি জানি না, ঠিক কী কারণে কথাটা আমার মনে হয়েছিল। পরে অনেক ভেবেও আমি এ রকম অদ্ভুত একটা কথা মনে হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। সম্ভবত, সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে কোনো একটা কিছু উড়ে এসেছিল আমার দিকে। যাহোক, সেই উড়ে আসা ভাবনাটাকে আমি ক্যাচের মতো করে শক্ত হাতে মুঠোবন্দী করি। মুহূর্তটাকে স্বর্গীয় একটা কিছু বলে আমার মনে হয়। আমার জীবনটা মুহূর্তে বদলে যায়।

খেলা শেষে আমি ট্রেনে করে শিঞ্জুকু স্টেশনে যাই এবং সেখান থেকে কিছু লেখালেখির কাগজ আর একটা সেইলর ফাউন্টেন পেন কিনে ফেলি। সে যুগে এখনকার মতো ওয়ার্ড প্রসেসর বা কম্পিউটার ছিল না। যা কিছু লেখার, সেগুলো মানুষকে কাগজে-কলমে লিখতে হতো।

সে রাতেই লেখা শুরু করি। সেই অনুভূতি এখন আর লিখে বোঝাতে পারব না। আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অনেক বছর পর সেই রাতে আমি ফাউন্টেন পেন হাতে নেই। এরপর প্রতি রাতে কাজ থেকে এসে আমি আমার কিচেন টেবিলে বসে যেতাম এবং লেখার চেষ্টা করতাম। ওই অল্প কয়েক ঘণ্টা সময়ই ছিল আমার একমাত্র ফাঁকা সময়। না ঘুমিয়ে সে সময়ে আমি লিখতাম। সেটা ছিল ১৯৭৮ সালের বসন্তকাল। ছয় মাসের কিছু বেশি সময় লাগিয়ে আমি শেষ করি ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’।

যেদিন আমি লেখাটা শেষ করি, সেদিন বেসবল সিজনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। সারা বছর ধরে হারতে থাকা ইয়াকুল্ট সোয়ালো অবিশ্বাস্যভাবে সেন্ট্রাল লিগ জয় করে নেয়।

‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ একটা ছোট আকারের লেখা। এটাকে নভেল না বলে নভেলা বলা যেতে পারে। তারপরও এটা লিখতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। পরিশ্রম হয়েছিল অনেক। কারণ, লেখালেখির জন্য আমার হাতে কোনো সময় ছিল না। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য আমাকে অন্য কাজ করতে হতো।

প্রাসঙ্গিকভাবে আরও দু-চারটে কথা বলতে হয় এখানে। সেগুলো আমার পড়ার অভ্যাস নিয়ে। আমি মোটামুটি সব কিছুই পড়তাম। তবে সবচেয়ে প্রিয় ছিল ক্লাসিক রুশ সাহিত্য আর মার্কিন হার্ড-বয়েলড ডিটেকটিভ সিরিজ। সমসাময়িক জাপানিজ সাহিত্যের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ আমার মধ্যে কাজ করত না। এ কারণে খুব বেশি পড়াও হয়ে ওঠেনি। আমি ভালো করে জানতামই না, জাপানে তখন ঠিক কী ধরনের সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, মানুষ কী ধরনের লেখা পড়ছে। সংগত কারণেই জাপানি ভাষায় ফিকশন লিখতে বসে বুঝে উঠতে পারলাম না, আমি সেটা কীভাবে লিখব।

কয়েক মাস ধরে আমি মোটামুটি অনুমানের ওপর ভরসা করে চালিয়ে গেলাম। এরপর সেই লেখাগুলো যখন পড়তে বসলাম, তখন মনে হলো, উপন্যাসের আঙ্গিক ও কাঠামো ঠিক আছে, কিন্তু সেটা পড়তে বেশ বিরক্ত লাগছে। এই উপলব্ধিটা আমার ভেতরটাকে একদম ঠান্ডা করে দিল। যেন আমি বরফের মতো জমে গেলাম। চেতনাগুলো অসার হয়ে এল। ভাবলাম, একজন লেখকের নিজের লেখা পড়তেই যদি মজা না লাগে, পাঠকের কি দায় আছে সেটা পড়ার...।
সাধারণত এ অবস্থায় সবাই হাল ছেড়ে দেয়। আমি ছাড়লাম না। জিঙ্গু স্টেডিয়ামে ঘাসের মধ্যে শুয়ে থাকা অবস্থায় যে অনুভূতিটা আমার মধ্যে বাসা বেঁধেছিল, সেটা তখনো বাস্তুহারা হয়নি। 

একটা লোক জীবনে কিছুই লেখেনি। সে হুট করে কাগজ কলম নিয়ে একটা অসাধারণ কিছু লিখে ফেলতে পারবে না। পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমি মূলত একটা অসম্ভবের পেছনে ছুটছিলাম। নিজেকে বোঝালাম, তুমি অসাধারণ কিছু একটা লিখবে, এই ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। উপন্যাসের আঙ্গিক এবং কাঠামোগত বিষয়গুলো ভুলে যাও। সাহিত্য লেখার চেষ্টা কোরো না, মনের কথাগুলো লিখে ফেলো।

কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। নতুন একটা কিছু শুরু করতে হলে, আমাকে প্রথমে পুরোনো ব্যাপারগুলো ভুলে যেতে হবে। আমি প্রথমেই আমার এত দিন ধরে কষ্ট করে লেখা পাণ্ডুলিপিটা ছুড়ে ফেলে দিলাম। ফাউন্টেন পেন তুলে রেখে ক্লজেট থেকে বের করলাম আমার পুরোনো অলিভেটি টাইপরাইটার।

এবার আমি সেই কথাগুলোই লিখলাম, যেগুলো মনের ভেতর থেকে আসে। জাপানিজের বদলে আশ্রয় নিলাম ইংরেজি ভাষার। এমন নয় যে, ইংরেজিতে আমি মহা পণ্ডিত ছিলাম। আমার শব্দভান্ডার ছিল সীমিত। বাক্যরীতি নিয়েও যথেষ্ট সমস্যা ছিল। কিন্তু এই সমস্যাগুলো আমার জন্য শাপে বর হয়ে এল। যেহেতু আমি জটিল ভাষায় গল্পটা বলতে পারব না, জটিল করে গল্পটা ভাবাও আমার বন্ধ হয়ে গেল।

জটিল বাক্যরীতির বদলে আমি ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করতে শুরু করলাম। এবং আবিষ্কার করলাম যে, আমার জানা সীমিত কিছু শব্দ দিয়েই লেখা বেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন কোনো শব্দ আমি লিখলাম না, যেটার অর্থ বের করার জন্য অভিধান ঘাঁটার প্রয়োজন পড়ে। ফলে বেশ সরল এক গদ্য তৈরি হলো। একেবারে আমার নিজস্ব গদ্যভাষা।

জাপানে আমার জন্ম এবং সেখানেই আমি বেড়ে উঠেছি। তাই আমি যখন জাপানিজে কথা বলি বা ভাবি, আমার মধ্যে শব্দের বন্যা বয়ে যায়। বাঁধ ভেঙে গেলে বন্যার পানি যেমন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়, শব্দরা তেমন করে আমার দিকে ছুটে আসে। সেখানে আমার জন্য প্রতিটা শব্দেরই অনেক বিকল্প শব্দ ওত পেতে থাকে। আমি যদি নিজেকে একটা সিস্টেমের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে সেই সিস্টেমটা জাপানিজ শব্দ এবং ভাষারীতিতে একদম গাদায় গাদায় পরিপূর্ণ। উপমা হিসেবে আপনারা গবাদি পশুতে বোঝাই হয়ে আছে এমন একটা ঘরের কথা ভাবতে পারেন। যখন কোনো চিন্তাভাবনাকে জাপানিজে প্রকাশ করতে যাই, তখন পশুগুলো সেই ঠাসাঠাসি ঘরের ভেতর উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি শুরু করে। অথচ সেখানে জায়গার বড় অভাব, হাঁটাচলার জায়গা পর্যন্ত নেই। ফলে সিস্টেমটা ধসে যায়।

ইংরেজিতে সে সুযোগ আমার ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি এটুকু বুঝতে পারি যে জটিল এবং কঠিন শব্দ ব্যবহার করবার কোনো প্রয়োজন নেই। সেগুলো ব্যবহার করে আমি হয়তো লোকজনকে সাময়িকভাবে বোঝাতে পারব যে আমি ভাষাটা সম্পর্কে বেশ ভালো জানি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষকে মুগ্ধ করার এই চেষ্টা কোনো কাজে আসবে না।

অনেক পরে আবিষ্কার করি, অ্যগোতা ক্রিস্টফ নামে একজন হাঙ্গেরিয়ান লেখিকা আমার মতো এই একই স্টাইলে লিখেছেন। একই পদ্ধতিতে তিনি অনেকগুলো চমৎকার উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেন। 


অ্যগোতা ক্রিস্টফ 

কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। নতুন একটা কিছু শুরু করতে হলে, আমাকে প্রথমে পুরোনো ব্যাপারগুলো ভুলে যেতে হবে। আমি প্রথমেই আমার এত দিন ধরে কষ্ট করে লেখা পাণ্ডুলিপিটা ছুড়ে ফেলে দিলাম। ইংরেজিতে লেখা হলো আমার প্রথম উপন্যাস। তারপর? টাইপরাইটারটা আবার ক্লজেটে ঢুকিয়ে রাখলাম। টেনে নিলাম পুরোনো ফাউন্টেন পেন। পুরো ইংরেজি লেখাটা জাপানিজে অনুবাদ করতে শুরু করলাম। আসলে সেটা অনুবাদ ছিল না, ছিল পুরোপুরি অদলবদল করে ফেলা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় জন্ম নিল আমার নিজস্ব গদ্যভাষা। লেখা হলো প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’। 

ক্রিস্টফের জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি সেখানেই বড় হয়েছেন। ১৯৫৬ সালে কিছু বিশেষ ঘটনার কারণে দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি ফরাসি ভাষা শেখেন অথবা বলা যেতে পারে, তাকে ফরাসি শিখতে বাধ্য করা হয়। তিনি তখন আমার মতো একই সমস্যায় পড়েন।

ভাষাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁর লেখা শব্দগুলো হয় সহজ, বাক্যগুলো হয় ছোট ছোট। অনেকখানি ছন্দবদ্ধ। প্রতিটা শব্দের মধ্যে একটা রিদম কাজ করা শুরু করে। পুরো লেখার মধ্য কোনো পোশাকি বাহুল্য নেই। ১৯৮৬ সালে যখন তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘নোটবুক’ পড়ি, তখন আমি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। সাত বছর আগে ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ লেখার স্মৃতি আমার মনে পড়ে গিয়েছিল।

যে গল্পে ছিলাম, সেটায় আবার ফিরে আসি। ইংরেজিতে লেখা হলো আমার প্রথম উপন্যাস। তারপর? টাইপরাইটারটা আবার ক্লজেটে ঢুকিয়ে রাখলাম। টেনে নিলাম পুরোনো ফাউন্টেন পেন। পুরো ইংরেজি লেখাটা জাপানিজে অনুবাদ করতে শুরু করলাম। আসলে সেটা অনুবাদ ছিল না, ছিল পুরোপুরি অদলবদল করে ফেলা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় জন্ম নিল আমার নিজস্ব গদ্যভাষা। লেখা হলো প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’।

এমন একটা ভাষায় আমি লিখলাম, যে ভাষাটা আমি আবিষ্কার করেছি। আমি বুঝতে পারলাম, এভাবেই হওয়া উচিত ছিল। কিছু লোক বলে, আমার লেখাগুলোয় একধরনের অনুবাদের গন্ধ থাকে। তারা কী কারণে এই কথাটা বলে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। তবে মাঝেমধ্যে মনে হয়, তারা ঠিকই বলে। আমার প্রথম উপন্যাসটা তো একধরনের অনুবাদই।

কিছু সমালোচক অবশ্য পুরো ব্যাপারটাকেই জাপানিজ ভাষার জন্য একধরনের হুমকি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটা লেখকেরই ভাষা নিয়ে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অধিকার আছে। কেউ যদি কোনো দুঃসাহস না দেখায়, তাহলে এই পৃথিবীর বুকে নতুন কিছু জন্ম নেবে না। তানিযাকি যে গদ্য ভাষায় লেখেন, আমি সেভাবে লিখি না। আমার লেখা কাওয়াবাতার মতোও নয়। তাঁরা তাঁদের নিজস্ব স্টাইলে লেখেন।

আমি বলছি না, তাঁদের লেখা খারাপ, আর আমারটা ভালো। আমি শুধু এটুকুই বলছি যে, আমি আমার মতো করে লিখি। কারণ, আমি সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ। একজন স্বাধীন লেখক, যার নাম হারুকি মুরাকামি।

এক রোববার সকালে ফোনটা এল। ফোন করেছিলেন মাসিক সাহিত্য পত্রিকা গুঞ্জোর সম্পাদক। তাঁরা নবীন লেখকদের জন্য একধরনের সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। আমার লেখা ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ উপন্যাসটা তাঁরা পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। তখন বসন্তকাল।

তত দিনে বেশ অনেক দিন কেটে গেছে। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে উপন্যাস লেখার আইডিয়া পাওয়ার পর এক বছরের বেশি পার হয়েছে। আমার বয়স তত দিনে ত্রিশ। বেলা ১১টার দিকে যখন ফোনটা এল, প্রথমে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারিনি যে ওপাশের লোকটা আসলে কে। বুঝতে পেরে আমি একটু বিস্মিত হলাম। কারণ, তত দিনে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম এবং এ রকম কোনো একটা প্রতিযোগিতায় আমার পাণ্ডুলিপিটা পাঠিয়েছিলাম। দুনিয়ার বাকি সব বিষয় নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে প্রথমে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারিনি তিনি ঠিক কোন বিষয়ে কথা বলছেন। 

আসলে কোনো কিছু চিন্তাভাবনা না করেই আমি উপন্যাসটা ‘গুঞ্জো’ সাহিত্য পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। পাঠানোর আগে ওটার একটা অনুলিপি তৈরি করে রাখব, সে প্রয়োজনটুকুও বোধ করিনি। যেন ওটা মনোনীত হয়ে পুরস্কার পাক বা হারিয়ে যাক, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। এখন মাঝেমধ্যে মনে হয়, তারা যদি উপন্যাসটা পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন না দিত, তাহলে ওটা হারিয়ে যেত। আমি কোনোভাবেই আরেকটা উপন্যাস লিখতে পারতাম না।

সম্পাদক ফোনে আমাকে বললেন, মনোনীত তালিকায় আমিসহ মোট পাঁচজন। আমি শুনে বিস্মিত হলাম। কিন্তু আমি তখন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে বাস্তবে কী ঘটেছে, সেটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারলাম না। পুরো ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকল না। সে কারণে আমি বিছানা থেকে নেমে হাতেমুখে পানি দিলাম। জামা-কাপড় পরে স্ত্রীর সঙ্গে রাস্তায় একটু হাঁটতে বের হলাম।

স্থানীয় একটা এলিমেন্টারি স্কুলের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম, ঝোপের মধ্যে একটা কবুতর আহত হয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম। তার ডানা ভাঙা। পায়ে একটা সরু তার পেঁচিয়ে আছে। আমি খুব সাবধানে কবুতরটাকে নিয়ে কাছের পুলিশস্টেশনে গেলাম। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুহাতজুড়ে আহত কবুতরের শরীরের উষ্ণতা আমি অনুভব করলাম।

রৌদ্রোজ্জ্বল এক রোববার। আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। দোকানপাট ও বিল্ডিংয়ের কাচে সূর্যের আলো ঠিকরে উঠছিল।

ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম। পুরো ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকল। আমি সম্ভবত একটা পুরস্কার পেতে যাচ্ছি। এবং তার চেয়ে বড় কথা, ঔপন্যাসিক হিসেবে একধরনের স্বীকৃতি আমার আসছে। যদিও এটা বড় বেশি আশাবাদী মানুষের মতো শোনাচ্ছে, তারপরও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এটা হবে। পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম। আমার মন আমাকে বলে দিয়েছিল যে আমি একজন লেখক হতে যাচ্ছি।

পরের বছর আমি নতুন আরেকটা উপন্যাস লিখি, ‘পিনবল ১৯৭৩’। সেটাকে ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’-এর সিক্যুয়েল হিসেবেই লিখি। জ্যাজ-বারটা তখনো চালিয়ে যাচ্ছিলাম মহা উৎসাহে। সেই হিসাবে ‘পিনবল ১৯৭৩’ উপন্যাসটাও সারা দিন কাজ করে বাড়িতে ফিরে আমার কিচেন টেবিলেই লেখা। সে কারণেই কিছুটা লজ্জা নিয়ে উপন্যাস দুটোকে আমি ‘কিচেন টেবল ফিকশন’ নামেই ডাকতে ভালোবাসি।

‘পিনবল ১৯৭৩’ লেখার কিছুদিন পরই আমি সিদ্ধান্ত নিই, ব্যবসা–বাণিজ্য আর না। এবার আমাকে একজন ফুলটাইম লেখক হতে হবে। আমি আর আমার স্ত্রী মিলে জ্যাজ ক্লাবটা বেচে দিই। এবার আর সময়ের কোনো অভাব আমার ছিল না। নভেলার দিকে না গয়ে একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাসে হাত দিই। ‘আ ওয়াইলড শিপ চেজ’ লিখতে শুরু করি। ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার জীবনটা শুরু হয়।

আমার আজ যা কিছু অর্জন, তার পেছনে প্রথম দুটো নভেলার ভূমিকা অনেক। ওরা আমার অনেক পুরোনো বন্ধু। জীবনে চলার পথে এমন কিছু বন্ধু আপনি পাবেন, যাদের সঙ্গে হয়তো আর সারা জীবনে আপনার দেখা হবে না। কিন্তু তাদের আন্তরিকতাটুকু একদম খাঁটি, ভুলে যাওয়ার মতো নয়। যখনই তাদের কথা আপনার মনে পড়বে, হৃদয়টা আনন্দে ভরে যাবে, এক আরামদায়ক উষ্ণতা আপনি ভেতরে টের পাবেন।

আমি এখনো পরিষ্কার মনে করতে পারি, জিঙ্গু স্টেডিয়ামে বসে আমার মনে কী ভাবনা চলছিল। সেনদাগায়া এলিমেন্টারি স্কুলের সামনে আহত কবুতরটার শরীরের উষ্ণতা এখনো আমার দুহাতের মুঠোয় অনুভব করি। যখনই কোনো উপন্যাস লিখতে বসি, সেই অনুভূতিগুলো ফিরে ফিরে আসে। আমাকে উদ্দীপনা জোগায়, স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়। আমাকে বলে দেয় যে আমার মধ্যে কিছু একটা হয়তো আছে, যেগুলো নিয়ে সামনে এগোনো যায়। স্বপ্ন দেখতে আমি বড় ভালোবাসি।

সেই অসাধারণ অনুভূতিগুলো এখনো আমার মধ্যে বাস করে, এর চেয়ে মধুর বিষয় আর কী হতে পারে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন