মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

এটগার কেরেট 'এর গল্প : সৃজনশীল লেখা



অনুবাদ : ফারহানা আনন্দময়ী

লেখক পরিচিতি
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ইজরালের রামাত গানে জন্ম গ্রহণ করেন এটগার কেরেট। ছোট গল্প, গ্রাফিক উপন্যাস ও সিনেমা-টিভির জন্য স্ক্রিপ্ট লেখেন। তাঁর বাবা-মা হিটলারের গণহত্যার শিকার হতে গিয়েও বেঁচে যান। তাঁর গল্পভাষা সরল। প্রতিদিনের ব্যবহৃত ভাষা, স্ল্যাং ও আঞ্চলিক ভাষা অবলীলায় ব্যবহার করেন তিনি। তাঁর অধিকাংশই পরাবাস্তবাদী ধারায় লেখা। কেরেটের প্রকাশিত বই-- The Bus Driver Who Wanted to Be God & Other Stories, Gaza Blues with Samir El-Youssef, The Nimrod Flipout, Farrar, Straus and Giroux.


মায়া ওর প্রথম গল্পে যে পৃথিবীর বর্ণনা দিয়েছিল, সেখানে মানুষেরা বংশবৃদ্ধি করার চাইতে নিজের জীবনকেই বরং দু’ভাগে ভাগ করতে পছন্দ করতো। সেই পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষই যে কোনো মুহূর্তে নিজেদেরকে ভাগ করে নিতে পারতো, যার যার বয়সের অর্ধেক-অর্ধেক করে। কমবয়সীরাই এটা বেশি করতো। মানে, ধরুন, একজন আঠেরো বছর বয়সী তরুণ নয় বছর-নয় বছর করে দুটো মানুষে রূপান্তরিত হলো। অন্যরা নিজেকে ভাগ করে নেয়ার কাজটা করার জন্য অপেক্ষা করতো মাঝবয়স অবধি। পেশাগতভাবে আর আর্থিকভাবে মজবুত একটা অবস্থানে পৌঁছানোর পরেই তারা এই বিষয়ে ভাবনাটা শুরু করতো। মায়ার লেখা গল্পের মূল চরিত্রটি কিন্তু নিজেকে টুকরো করার বিপক্ষে। সমাজের সকলের কথা উপেক্ষা করে সে নিজ সিদ্ধান্তেই অটল ছিল। এভাবে থেকেই আশি বছর বয়সে তার জীবনের ইতি টেনেছিল। 

শেষটুকু বাদ দিলে এটা একটা ভালো গল্প হতে পারতো, আভিয়াডের ধারণা এরকম। ওর মনে হয়েছে শেষটা খুব বিষাদী। শুধু বিষাদী-ই নয়, চমকহীন-ও। অথচ মায়া সৃষ্টিশীল গল্পলেখা শিখতে যে কর্মশালায় নাম লিখিয়েছিল, সেখানে নাকি সকলেই ওর গল্পের এই শেষটা খুব পছন্দ করেছে। এই কর্মশালার যিনি নির্দেশক ছিলেন, একজন খ্যাতনামা লেখক তিনি; তার-ও ভুয়সি প্রশংসা পেয়েছে মায়া। যদিও আভিয়াড এই লেখকের নাম কখনো শোনেনি। তিনি নাকি বলেছেন, গল্পটা খুবই হৃদয়স্পর্শী এবং শেষটা গতানুগতিক হলেও লেখার গুণে সেটুকুও দারুণ হয়েছে। মায়া যখন আভিয়াডকে সেটা বলছিল, খুশিতে কী ভীষণ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল ওর মুখ। সে অবাক হয়ে খেয়াল করলো, বাইবেল পাঠ করতে মানুষ যেমন সমর্পিত হয়, মায়াও যেন খানিকটা সেভাবেই বলছিল কথাগুলো। আভিয়াড প্রথমদিকে হয়তো চেয়েছিল গল্পটার শেষটা অন্যরকম হোক। কিন্তু এদের সকলের প্রশংসা শুনে ও পিছিয়ে আসলো, ভাবলো, ও-ই হয়তো গল্পটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি। 

মায়ার এই কর্মশালায় যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তটা ওর মায়ের মাথায় এসেছিল প্রথমে। তার কোন্‌ বন্ধুর মেয়ে এখানে গিয়ে খুব আনন্দের সাথে নাকি সময় কাটাচ্ছে। আভিয়াডও অবশ্য চাইছিল, মায়া ঘর থেকে বেরোক, বাইরের কোনো কাজে নিজেকে জড়াক। মিসক্যারেজের ঘটনার পরে সে নিজে বাইরের কাজে ডুব দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মায়া কিছুতেই বেরোতে চাইছিল না ঘর থেকে। যখনই ও বাইরে কাজ সেরে ফিরতো, মায়াকে দেখতে পেত ঘরের কোণের সোফাটায় একা চুপ করে বসে আছে। বই পড়ে না, টিভি-ও দেখে না, এমনকি কান্নাকাটিও করে না। এরকম একটা অবস্থায় আভিয়াড-ও একরকম জোরই করেছিল মায়াকে, “একবার গিয়ে দেখো না। ভালো লাগবে নিশ্চয়ই। শিশুরা যেমন ডে-ক্যাম্পে গিয়ে মজা পায়, সেরকমও তো লাগতে পারে তোমার!” শেষের কথাটা বলে আভিয়াড একটু লজ্জিত হলো যেন, ভাবলো, ঠিক এরকম মানসিক অবস্থায় মায়াকে ডে-ক্যাম্পের কথা বলে ওকে আঘাত দিয়ে ফেললাম না তো! দুটো মাস ধরে মায়া একটা অবসাদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, মিসক্যারেজের কারণে। শিশুর প্রসঙ্গ না তোলাটাই বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে মায়া হাসিমুখ নিয়ে বললো, এ সময়টাতে ও ডে-ক্যাম্পের মতোই কিছু একটা চাইছিল। 

এরপরের যে গল্পটা মায়া লিখলো, সেটাও এমন একটা জগতের গল্প, যেখানে ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া আর কাউকেই দেখা যায় না। ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা মানুষ ছাড়া অন্য কেউই দৃশ্যমান নয়। এই গল্পের যে মূল চরিত্র, ওর ধারণা, সে তার স্ত্রীকে নিয়ে ভরপুর এক ভালোবাসার সম্পর্কে দিন কাটাচ্ছে। একদিন হলো কী, ভেতরের বারান্দা দিয়ে দুজনেই হেঁটে আসছিল দু’দিক দিয়ে। স্ত্রী তার স্বামীকে যেন দেখতেই পেল না; ওর সাথে এমনভাবে ধাক্কা খেল, যে, স্বামীর হাতে থাকা পানীয়র গ্লাসটি ছিটকে পড়ে ভেঙে গুড়োগুড়ো হয়ে গেল। কিছুদিন পরে আবার আরেক ঘটনা! লোকটি আপনমনে বসে দুলছিল আর্মচেয়ারটায়। আর ওর স্ত্রী কোথা থেকে এসে ঠিক তার গায়ের উপর গিয়ে বসে পড়লো! কী একটা অবস্থা, ভাবা যায়! দু’বারই সে কিছু একটা বলে অজুহাত দিতে চাইলো। পরিস্থিতি খানিক সামাল দিতে চাইলো। অন্যমনস্কতার কারণেই বোধহয় সে স্বামীকে এতটা খেয়াল করে দেখতে পায়নি, এরকম একটা অজুহাত দাঁড় করালো। কিন্তু লোকটির মনে ততক্ষণে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সে ভেবে নিচ্ছিল, ওর স্ত্রী ওকে আর ভালোবাসে না। আর নিজের এই ভাবনাটাকে প্রমাণ করার জন্য কী করা যায়, সেটা ভাবতে বসলো। এবং অদ্ভুত একটা বুদ্ধি এলো ওর মাথায়। সে করলো কী, সেলুনে গিয়ে তার মোচের বামপাশের অর্ধেকটা চেছে ফেললো। এবার একগোছা ফুল হাতে নিয়ে ঘরে ফিরে সোজা গিয়ে দাঁড়ালো স্ত্রীর সামনে। ওর স্ত্রী বেশ খুশি হলো ফুলগুলো দেখে। এমনকী একটা চুমুও ছুড়ে দিল বরের দিকে। মানে চুমুটা বাতাসে উড়িয়ে দিল। 

মায়া এই গল্পের নাম দিল, “আধখানা মোচ”। আভিয়াডকে সে বললো, কর্মশালার সেশনে এই গল্পটা যখন সে পড়ে শুনিয়েছে অন্যদেরকে, কয়েকজনেরই চোখ ছলছল করে উঠেছে। “বাহ! তাই নাকি?” শুনে আভিয়াডও প্রশংসা করলো মায়াকে। মিষ্টি একটা চুমুও এঁকে দিল মায়ার কপালে। তবে রাতে শুতে যাবার আগে তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে বেঁধে গেল ঝগড়া। ঘটনা সেরকম কিছুই নয়। মায়া হয়তো কোনো একটা তথ্য জানাতে ভুলে গিয়েছিল আভিয়াডকে। আর সেটা নিয়েই চেঁচামেচি শুরু করলো আভিয়াড, সেখান থেকে কথা কাটাকাটি। একটু পরে এসে অবশ্য আভিয়াড শান্ত হলো, বুঝতে পারলো সামান্য বিষয় নিয়েই সে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। মায়ার পায়ের কাছে বসে নরম হয়ে বললো, “আজ অফিসে বড্ড বেশি ঝামেলার দিন গেছে। মাথাটা গরম হয়ে ছিল তাই। যা হবার হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দাও না আমাকে”। মায়া তাতেই গলে গেল আর ক্ষমাও করে দিল তখুনি। 

ওদিকে কর্মশালার সেই নির্দেশক শিক্ষক আরেক ধাপ এগিয়ে মনস্থির করলো, সে একটা উপন্যাস আর ছোটগল্পের সমগ্র প্রকাশ করবে। প্রকাশ-ও করলো। বাজারে খুব একটা যে বিক্রি হলো সেসব বই, তা কিন্তু নয়। তবে কয়েকটা ভাল পাঠ-পর্যালোচনা তিনি জোগাড় করে ফেললেন। আভিয়াডের অফিসের ঠিক পাশেই একটা বইয়ের দোকান আছে। সেখানের বিক্রেতা নারীটি ওকে এরকমই একটা ধারণা দিল। ছ’শো চব্বিশ পাতার ঢাউস সাইজের উপন্যাসটার প্রতি কারো তেমন আগ্রহ ছিল না। আভিয়াড ছোটগল্পের বইটা কেনার জন্য সামান্য আগ্রহী হলো বরং। অফিসের লাঞ্চ-এর পরে একটু সময় বের করে দেখতে লাগলো বইটার পাতা উলটেপালটে। খানিকটা সময় পেলে দু’একটা গল্প পড়েও ফেলতো। ছোট ছোট গল্প, ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। এটাই ছিল বইটার চমক দেয়ার একমাত্র কৌশল। বইটার পেছনের প্রচ্ছদে লেখকের একটা পরিচিতিও দেয়া ছিল। তিনি জীবনের বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ-গাইড হিসেবে কাজ করেছিল কিউবা আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। আর এই গল্পগুলো লেখার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তার সেসব অভিজ্ঞতা। তাকে অনুপ্রাণিতও করেছে সেসব দেশের চালচিত্র। লেখকের মুখের একটি সাদা-কালো ছবিও ছিল সে পাতায়। সুখি-সুখি চেহারার ছবি, দেখে আভিয়াডের মনে হলো, মানুষটা তা-ই হতে পেরেছে, জীবনে যা সে হতে চেয়েছিল। 

তো এই লেখককে নিয়ে গল্প করতে করতে মায়া আভিয়াডকে বললো একদিন, কর্মশালা শেষ হবার পরে লেখক মায়ার কিছু নির্বাচিত গল্প তার সম্পাদককে পাঠাবে বলেছে। বইপ্রকাশ নিয়ে এইমুহূর্তে খুব বেশি উচ্ছসিত হবার দরকার নেই, লেখক নাকি এমনটা বলেছেন। তবে সাথে এই আশাটুকুও দিয়েছেন, প্রকাশক নাকি আজকাল নবীন লেখকদের বই প্রকাশে আগের চেয়ে বেশি উৎসাহী হচ্ছেন। 

তৃতীয় যে গল্পটি মায়া লিখলো তার শুরুটা বেশ অন্যরকম, মজার। একটা বেড়ালছানা জন্ম দিল গল্পের নারীটি। কিন্তু বেড়ালছানাটাটা ওর কিনা সেটা নিয়ে একটা সন্দেহের জাল স্বামীর মাথায় ক্রমাগত ঘন হতে থাকলো। ওদের শোবার ঘরের ঠিক নিচে বাড়ির সামনেই পুরনো একটা ডাস্টবিন আছে। আর বেশ মোটাসোটা লাল রঙের একটা হুঁলোবেড়াল ওই বিনের ওপর সবসময় বসে থাকে। লোকটি আবর্জনা ফেলতে যখনই নিচে নামে, দ্যাখে কী, হুঁলোবেড়ালটা ওর দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকে, সারাক্ষণ। স্বামীটি যারপর নেই বিরক্ত এতে, আর ছোট্ট বেড়াল-ছানাটাকে নিয়ে সন্দেহবাতিক তো আছেই। শেষে একদিন না পেরে বেড়ালটার সাথে ছোটখাট একটা যুদ্ধই লেগে গেল তার। বেড়ালটার গায়ে একটা পাথর ছুড়ে মারার পরে সে-ও তেড়ে এসে লোকটাকে কামড়ে খামচে এক বিশ্রি অবস্থা! 

এখন আর কী করা! র‍্যাবিস ইনজেকশন দিতে লোকটিকে সাথে নিয়ে স্ত্রীকে ক্লিনিকে যেতে হলো, বুকেরদুধ খাওয়া বেড়ালছানাটাকেও সাথে নিল সে। যদিও খুব বিব্রত লাগছিল লোকটির, সাথে যন্ত্রণাও হচ্ছিল। কিন্তু অপেক্ষমান অন্য রোগীদের সামনে সে কাঁদবে, সেটাও পারছিল না। বসে থাকতে থাকতেই একটা সময়ে বেড়ালছানাটা ওর মায়ের কোল থেকে একটু বেরিয়ে, লোকটির গায়ে ঘেষে মুখের দিকে খানিক দেখল। মুখটা ঊঁচু করে লোকটার গালে জিভ দিয়ে আলতো করে চেটেও দিল। ‘মিয়াঁও’ কী মিষ্টি করে ডাকলো-ও। খুব আবেগীস্বরে স্ত্রীটি স্বামীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি শুনতে পেলে ওর ডাকটা? ও তোমাকে বাবা বলে ডাকলো”। এবার আর লোকটি আবেগ সামলাতে পারলো না। কান্নাটাকেও পারলো না আটকাতে। আভিয়াডেরও ঠিক অনেকটা এরকম অবস্থাই হলো, মায়া যখন গল্পের এই অংশটুকু তাকে পড়ে শোনাচ্ছিল। গল্পটা শেষ করে মায়া ওকে বলেছিল, “জানো, এই গল্পটা যখন লিখছিলাম, আমি জানতামই না যে, আবার আমি গর্ভধারণ করেছি। একটু অদ্ভুত না বিষয়টা? আমার শরীর তখনো জানেনি, টের পায়নি; অথচ অবচেতনে স্পষ্ট একটা মাতৃরূপ আমি এঁকে ফেলতে পেরেছি”। 

এর পরের মঙ্গলবারে অফিসফেরত আভিয়াড গেল মায়াকে আনতে, ওই কর্মশালা থেকে। গাড়িটা পার্কিং লটে রেখে ক্লাসে ঢুকে মায়াকে খুঁজতে থাকলো ও। এদিকে মায়া ভীষনই অবাক হলো ওকে ক্লাসরুমে হঠাৎ দেখতে পেয়ে। আভিয়াড কেন যেন জোর করছিল মায়াকে, ওই লেখক-শিক্ষকের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিতে। লেখকটির গা থেকে কেমন ভুরভুর করে লোশনের গন্ধ আসছিল।। আভিয়াডের সাথে তিনি করমর্দন করলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে খুব একটা ঋজুতা বা উষ্ণতা ছিল না। তিনি হেসে বললেন, “মায়ার মতো একজন নারী যাকে স্বামী হিসেবে পছন্দ করে নিয়েছে, সে নিশ্চয়ই বিশেষ কেউ হবে”। 

এর ঠিক তিন সপ্তাহ পরে আভিয়াড করলো কী, লেখালিখি বিষয়ে এক্কেবারের নবীনদের জন্য একটি কর্মশালা খুঁজে বের করলো। ভর্তিও হয়ে গেল সেখানে। কিন্তু এই কথাটা সে মায়াকে শোনায়নি। বরং ওর অফিসের সহকারীকে বলে রাখলো, ক্লাসের সময়ে মায়া কখনো ফোন করলে যেন বলে, মিটিং-এ আছে। এখন বিরক্ত করা যাবে না। আভিয়াডের ক্লাসের অন্য যারা সদস্য ছিল, তারা সকলেই অনেকটা বয়স্ক নারী। কী অদ্ভুত আর বিশ্রিভাবে ওর দিকে তাকাচ্ছিল তারা সবাই। শুধু নির্দেশক যিনি ছিলেন, গলায় স্কার্ফ পরনে একজন তরুণী, তাকে নিয়েই বাকিদের যত ফিসফাস গল্প! সে ক্যান্সারের সাথে লড়ছে আর ইজরাইল দখলকৃত ভূমি থেকে আসা একজন প্যালেস্টাইনী নারী তিনি; এটাই অন্যদের আলাপের অন্যতম বিষয়। 

নতুন ধরনের একটা কাজ দিয়ে তিনি ক্লাস শুরু করলেন সেদিন। বললেন, “লিখুন। লিখতে থাকুন, মাথায় যা আসে। কোনোরকম কোনো চিন্তাভাবনা না করেই টানা লিখতে থাকুন”। সেটা শুনে আভিয়াড নিজের মগজটাকে যেন ওখানেই থামিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু সেই কাজটা তো ভীষণই কঠিন। চিন্তা তো স্রোতস্বিনী। একে কি হঠাৎ মাঝপথে থামিয়ে দেয়া যায়! তবু সে চেষ্টা করলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, তার পাশের সেই বয়স্ক নারীটি, দুর্দান্ত গতিতে লেখা শুরু করে দিয়েছে! যেন বালকবয়সে স্কুলের সেই পরীক্ষাকেন্দ্র! কে কার আগে কত বেশি লিখে শেষ করতে পারে! শিক্ষক ‘লেখা থামাও’ বলার আগে যতটা পারা যায়, পাতা ভরানোর চেষ্টা যেন! এসব দেখেশুনে আভিয়াডও লিখতে শুরু করলো। 

একটা মাছকে নিয়ে গল্প লিখতে শুরু করলো আভিয়াড। নীল একটা শান্ত সমুদ্রে মাছটা আনন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ একটা দুষ্টু যাদুকরী, মানে ডাইনি কু-মন্তর ছু-মন্তর দিয়ে মাছটাকে মানুষ বানিয়ে দিলো। মাছটা দীর্ঘক্ষণ ডাইনির পিছুপিছু ছোটাছুটি করেও একটা আপোসে পৌঁছাতে পারলো না, কীভাবে আবার মানুষ থেকে মাছে রূপান্তরিত হতে পারবে সে! অনেকক্ষণ ধরে ডাইনিটার পিছু পিছু ঘুরে শেষে হাল ছেড়ে দিল। মাছ হিসেবে সে ছিল যথেষ্ট বুদ্ধিমান আর মেধাবী। আর সেই কারণেই মানুষ হবার পরে ওর খুব একটা সমস্যা হলো না জীবনকে গুছিয়ে সফল করে তুলতে। এ কাজ-সেকাজ গুছিয়ে নিয়ে বিয়েও করে ফেললো একসময় সেই মাছটি। আর দূরপ্রাচ্যের একটি শহর থেকে প্লাস্টিকের আসবাবাদি আমদানির ব্যবসা জমিয়ে ফেললো। সাতসমুদ্দুরে ঘুরে বেড়ানোর একটা পূর্ব অভিজ্ঞতা, জ্ঞান তো ওর ছিলই। সেসব কাজে লাগিয়ে ব্যবসাটার বিস্তার ঘটিয়ে ফেললো পৃথিবীর অনেক অনেক দেশে। 

এদিকে সেই যে দুষ্টু ডাইনিটা, এত এত বদমায়েশি করতে করতে একটা সময়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ভাবতে শুরু করলো, অনেক তো করলাম, এবার থামি। যাদেরকে কু-মন্তর ছু-মন্তর দিয়ে এরকম রূপান্তর ঘটিয়েছিল, ওদের সবাইকে আবার আদি জীবনটা ফিরিয়ে দিতে চাইলো সে। যেমন ভাবা, সেইমত কাজ। ডাইনিটা দেখা করতে গেল সেই মাছটার অফিসে। ওর অফিস সহকারী জানালো, তিনি এখন স্যাটালাইটে একটা মিটিং-এ আছেন; তাইওয়ানের ব্যবসায়ীদের সাথে। শেষ হতে দেরি হবে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে আপনাকে। মিটিং তো দীর্ঘ হবেই... কারণ মাছটি ততদিনে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ব্যবসা সে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে। কাজের এত ব্যস্ততায় সে ভুলতেই বসেছিল, কোনোদিন সে একটা মাছ ছিল। এদিকে ডাইনিটার আর ধৈর্যে কুলাচ্ছিল না। অপেক্ষা করতে করতে সে হাল ছেড়ে দিল একটা সময়ে। বিরক্ত হয়ে উড়ে চলে গেল, ঝাড়ুর ডগায় বসে। 

দিন গড়াতে লাগলো। মাছটা বিজনেস-টাইকুন যাকে বলে, ওরকম একটা অবস্থানে পৌঁছে গেল একদিন। এখন সে রিয়েল-এস্টেটের ব্যবসায় খুব নামকরা হয়েছে। এতশত ব্যস্ততার মধ্যেও, কোনো এক বিকেলে বহুতল ভবনের অফিসের জানালায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে অনেকদিন পরে সমুদ্র দেখতে মন চাইলো তার। সহসা মনে পড়লো, আরে, আমি তো একটা মাছ! আর এই মাছ হয়েই পৃথিবীর বড় বড় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্টক বাজার সবই হাতের মুঠোয় ভরে ফেলতে পেরেছি। অদ্ভুত লাগছে নিজের কাছেই! কিন্তু, তবুও, তবুও তো আমি একজন মাছ-ই। আহা! কতদিন সমুদ্রের নোনাজলের স্বাদ পাইনি জিভে! 

এটুকু লিখেই কলমটি নামিয়ে রাখলো আভিয়াড। বসে থাকলো চুপ করে। নির্দেশক একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো ওকে। “আমার গল্পের কোনো শেষ নেই”। ফিসফিসিয়ে একটু মার্জনা চাওয়ার স্বরেই আভিয়াড মেয়েটিকে বললো। সে ইচ্ছে করেই গলা নামিয়ে কথাটা বললো, পাশের বয়স্ক নারীটি তখনো গভীর মনযোগে আপনমনে লিখেই চলেছে, লিখেই চলেছে...।




অনুবাদক পরিচিতি
ফারহানা আনন্দময়ী
চট্টগ্রামে থাকেন।
কবি। অনুবাদক। প্রবন্ধকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন