মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

গল্পের কাছে কী চাই : স্বকৃত নোমান


গল্প পড়তে হবে কেন? শুনে নিলেই তো হয়। যেমন গল্প বলা ও শোনার প্রচল ছিল প্রাচীনকালে। মানুষেরা তখন মুখে মুখে গল্প বলতো। তাহলে আমরা এখন গল্প লিখি কেন? পড়িই-বা কেন? এই জন্য যে, গল্প শোনার মধ্য দিয়ে ভাষার মজাটা পাই না, গল্প বলার স্টাইলটা পাই না। তার মানে শুধু কাহিনির জন্য আমরা গল্প পড়ি না, ভাষা ও আঙ্গিকের জন্যও পড়ি। কাহিনি, ভাষা ও আঙ্গিক―ছোটগল্পে এই তিনটির কোনো একটি না পেলে সেই গল্প সম্পূর্ণ হয় না। 


কোনো কোনো গল্পকার ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে এতটাই নীরিক্ষা করেন যে, তাদের গল্পে গল্পটাই খুঁজে পাওয়া যায় না। কী বলতে চান, তা স্পষ্ট নয়। এমন গল্প আমার কাছে পাঠ-অযোগ্য বলে মনে হয়। তরকারিতে যেমন লবণ, মরিচ ও হলুদ সমপরিমাণ দেওয়া চাই, তেমনিভাবে একটি গল্পেও ভাষা, আঙ্গিক ও কাহিনি সমপরিমাণ হওয়া চাই। কোনো একটি কম হলে চলবে না। বিস্বাদে রুপান্তরিত হবে। 

গল্পের কাহিনি সত্যি হতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে। মিথ্যা হলেও আপত্তি নেই। কিন্তু গল্পকার ভাষা ও আঙ্গিকের কুশলতায় মিথ্যাকে এমনভাবে উপস্থাপন করবেন, পাঠকের মনে হবে তারা সত্যি কাহিনি পড়ছেন। অর্থাৎ কাহিনিকে গল্পকার বিশ্বাসযোগ্য মাত্রায় উপস্থাপন করবেন। বাংলাদেশে ইদানীং একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, গল্পকাররা যেন বাস্তবতার প্রতিবেদন লেখার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। বাস্তবের ঘটনাটিকে কল্পনার রঙ্গে রঞ্জিত করে অন্য মাত্রা দিতে যেন তারা অনিচ্ছুক। গল্পে যদি কল্পনার জগত সৃষ্টি করা না যায়, গল্পে যদি উপমার ব্যবহার করা না হয়, তবে সেই গল্প পাঠকের মন সহজে কাড়বে না। গল্পের পাঠক গল্পই পড়তে চায়, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন নয়। 

একই সঙ্গে ছোটগল্পে চাই একটি মহৎ দর্শন। মানুষের, মানবেতর জীবনের কিংবা এই মহাপ্রকৃতির কোনো একটি ভগ্নাংশ নিয়ে ছোটগল্প হতে পারে। যেমন আন্তন চেখভের ‘শোক’গল্পটির কথা বলা যায়। এই গল্পে খুব সংক্ষেপে তিনি মানুষের জীবনকে দেখিয়েছেন। মানুষের জীবন তো আসলে এমনই, কুন্দকার মিস্ত্রি গ্রিগরি পেত্রভের মতো, যে তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ছুটছে হাসপাতালের দিকে, অথচ হাসপাতালে পৌঁছার আগেই স্ত্রী মারা গেল। চল্লিশ বছর সে বুড়ির সঙ্গে জীবন কাটিয়েছে, অথচ তখন তার মনে হলো বুড়িকে নিয়ে সবে বাঁচতে শুরু করতে না করতেই, তাকে মনের কথা বলতে না বলতেই, দয়ামায়া দেখাতে না দেখাতেই এবং যে মুহূর্তে বুঝতে পারল সে ভালোবাসে তার স্ত্রীকে, তাকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না, সেই মুহূর্তে বুড়ি তাকে ছেড়ে চলে গেল এবং হারিয়ে ফেলল নিজের পা দুটিও। ডাক্তারের পক্ষেও আর কিছু করার থাকল না। প্রত্যেক মানুষের জীবন আসলে পেত্রভের মতোই। বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। পেত্রভের মতো প্রত্যেক মানুষেরই এমন একটা সময় আসে, যখন তাকে নিয়ে আর কিচ্ছু করার থাকে না কোনো চিকিৎসকের। 

কত সামান্য একটি ঘটনা, জীবনের একটি ভগ্নাংশ, অথচ কী চমৎকারভাবেই না চেখভ তুলে আনলেন তাঁর গল্পে! গল্পে আমি এমনই দর্শন চাই। মহৎ কোনো দর্শন, মহৎ কোনো বোধ, মহৎ কোনো উপলব্ধি, যা গল্পের মোড়কে উপস্থাপন করবেন গল্পকার। গল্পে যদি কিছুই না পাই, তাহলে গল্প কেন পড়ব? পড়ে কেন সময় নষ্ট করব? জীবন তো ছোট। করার মতো কত কাজ পড়ে আছে, কোনো কিছু প্রাপ্তিহীন গল্প পড়ে সময় নষ্ট করব কেন?



                           

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন