মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'এর গল্প : জানালা

রাস্তা দিয়ে কেউই যায় না। তবু, রাস্তাটা রয়েছে। রাস্তাটা রয়েছে বলেই আমরা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। শীতকালে রাস্তাটা দিয়ে কখনও কখনও দুটো লোক হেঁটে যায়। তাদের একজনের জামার রং সাদা। অপরজনের লাল। খুব ধীরে হাঁটে তারা। আমরা বেশ ভালো করে দেখতে পাই ওই দুজনকে। দুজনেরই বেশ ভালো উচ্চতা। গায়ে মেপে মেপে বসানো মাংস। বিজ্ঞাপনের ভাষায় দুজনেই 'স্বাস্থ্যবান'। হাঁটতে হাঁটতে তারা কোথাও একটা যায়, আবার ফিরে আসে। তাদের যাওয়ার সময়টা নির্দিষ্ট। সকাল এগারোটা বারো মিনিট। ওই সময়টাই আমাদের জানলার স্ক্রিনে ভেসে ওঠে জ্যান্ত শরীর দুটো। ওই লোক দুটির যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট হলেও আসার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। কখনও দুপুর বারোটার সময় ফিরে আসে। কখনও বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কখনও অনেক রাত হয়ে যায়। যাওয়ার সময় একসঙ্গে গেলেও ফেরার সময় তারা অধিকাংশ দিনই ফেরে আলাদা আলাদা।

জানলার সামনে বসে ভালো গুড় দিয়ে দুধরুটি খেতে খেতে আমরা তাদের যাওয়া দেখি, তাদের আসা দেখি।

শীতকালে এই একটি দৃশ্যই মনে থাকে আমাদের। গ্রীষ্মকালে আমরা দেখি তারক কাকাদের বাড়ি৷ এই গল্প ওই বাড়িটি নিয়েই।

তারক কাকাদের দোতলা বাড়িটি প্রায় সত্তর বছরের পুরনো। গ্রীষ্মকালে যে আমরা কেবলই ওই বাড়িটা দেখি, রাস্তা দেখতে পাই না, তার কারণ হল, গ্রীষ্মে আমাদের জানলা বদলে যায়। শীতকালের জানলাটিতে বড় বড় শিক দেওয়া। গ্রীষ্মকালের জানলায় আবার গ্রিল। ফুলের স্টাইলে। বিভিন্ন ফুল। একটার সঙ্গে আরেকটার কোনও মিল নেই। আমরা কোনও ফুলই চিনতে পারি না। আমরা, অর্থাৎ, আমি আর আমার রাঙামামা। গত অঘ্রাণে চুয়াত্তর হয়ে গেল রাঙামামার। আমি চুয়াল্লিশ স্পর্শ করব আর কয়েকমাস বাদেই। শীতকালের জানলাটার সামনে গাছপালা বিশেষ নেই। একটি ছোট মতো মাঠ রয়েছে। তারপরেই ওই রাস্তা। মাঠটিতে বহুদিন কেউ আসে না। তবে, তা যে এক সময় মাঠ ছিল এবং সেখানে যে প্লাস্টিক বলে ক্রিকেট খেলত ছেলেপিলেরা, তা বোঝা যায়, যখন রাঙামামা শীতকালের বিভিন্ন প্রহরে জানলার সামনে বসে মাঝেমাঝে বলে ওঠে- ওই যে! আওয়াজটা পাচ্ছিস তুই! প্লাস্টিক বলের মাটিতে ড্রপ খাওয়ার শিরশির আওয়াজটা? আমি সেটা না পেলেও মিথ্যে কথা বলি। ওই মাঠের কোণ থেকে একটি ঘুঘু সুর করে ডেকে যেতো। গোটা শীতকাল জুড়েই আমাদের মাথার মধ্যে ওই ঘুঘুর ডাকটি সদ্য নতুন মাটি ফেলে নিঙোনো উঠোনে দেওয়া আলপনার ভঙ্গিতে ছড়িয়ে থাকত। গরমকালের জানলাটা পশ্চিমমুখো। শীতকালে যেমন দুধরুটি, গরমে আমাদের ডায়েট হল বেলপানা। বেলের সরবত। চল্লিশ কেজি ওজনের বারো বছরের ছেলের হাতের তালুর সাইজের একটা বরফ থাকে তাতে। দুপুর ঘন হলে বাতাসের ভিতর দিয়ে ছোট ছোট আলুর সাইজের অদৃশ্য আগুনের গোল্লা আমাদের পিঠে-মাথায় এসে পড়ে। বেলপানা খেতে খেতেই আমরা তা টের পাই। গরমের দুপুরে জানলার সামনে আরও একটি দেখার মতো দৃশ্য হল, প্রজাপতি ও ফড়িংদের অভাবনীয় রেষারেষি। একে অপরকে পিষে ফেলতে চাইছে ডানার চাপে। মহা অরণ্যের এক অসহ্য প্রাগৈতিহাসিক প্রাচীনতা ঝুপ করে নেমে আসে জানলার সামনে। বাতাসে উড়তে থাকে যুদ্ধরত প্রজাপতি ও ফড়িং-এর ডানা থেকে ভেঙে ভেঙে পড়া রঙের গুঁড়ো। সেই রঙের গুঁড়ো ওড়ার দৃশ্য দেখতে থাকি আমরা মোহগ্রস্ত পোকামাকড়ের মতো। দৃশ্যের চাপেই মনে হয় ফেটে যায় আমাদের দুটো শরীর। রাঙামামা আর আমার গোটা শরীর টুকরো টুকরো হয়ে অজস্র ফড়িং ও প্রজাপতিতে হয়ে উড়ে বেড়ায় তখন। তারক কাকাদের বাড়ি থেকে লতা মঙ্গেশকর গান করে- "সাত ভাই চম্পা জাগো জাগো রে"। "রাজার কুমার আসে না আর ঘোড়ায় চড়ে"-র জায়গাটায় সমস্ত ফড়িং ও প্রজাপতি ফিরে আসে জানলার কাছে।

এই দুটো জানলার কাছে আমি আর রাঙামামা কত বছর ধরে বসে আছি, তা মনে পড়ে না। তবে, বসে আছি দীর্ঘ দীর্ঘদিন। তারক কাকাদের বাড়ির হলদে রং চটে গিয়েছে বহুদিন। গত গ্রীষ্মেরও বেশ কয়েক গ্রীষ্মকাল আগে রাঙামামা একবার কী এক হিসাব করে বলেছিল, বাড়িটা প্রায় সত্তর বছরের পুরনো। বাড়ির ছাদে একটি টালির ঘর রয়েছে। সেখানে বিকেলবেলা অজস্র পাখি উড়ে আসে। তারা খুব সকালে উড়ে যায় ওই ঘর থেকে। অত তাড়াতাড়ি আমরা কেউই উঠতে না পারায় তাদের যাওয়াটা দেখা হয় না কখনও।

এমন এক গ্রীষ্মের বিকেলেই বেলপানায় চুমুক দিয়ে রাঙামামা বলল, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, একমাত্র পাখি ছাড়া আর কাউকেই আসতে দেখি না ওদের বাড়িতে। বাড়ির লোকগুলো কি সব মরে গেল?

"কী জানি"! বললাম আমি। মাসের পর মাস ধরে তাকিয়ে বসে আছি, তবু কাউকেই তো দেখি না।

- কিন্তু এমনটা তো হওয়া উচিত নয়! বাড়িতে মোট কতজন ছিল, তোর মনে আছে? রাঙামামা প্রশ্ন করে আমাকে।

- কতজন ছিল তা তো মনে নেই। তবে, কারা কারা ছিল তা স্পষ্ট মনে আছে।

- বল তো একবার মনে করে। 

আমি মনে করার চেষ্টা করি। তারক কাকার এক ভাই ছিল। একটা পা নেই। মাথার অর্ধেকের বেশি ফাঁকা। যেটুকু চুল আছে, তাতে পাকার পরিমাণই বেশি। প্রথমবার দেখলে কারও মনে হতে পারে, একটা ধবধবে সাদা আইসক্রিম খেয়ে হাতটা কেউ যত্ন করে তার মাথায় মুছে দিয়েছে। একটি বছর দশেকের ছ‌োট ছেলে ছিল। দুজনে মিলে বিকেলবেলায় ক্রিকেট খেলতো আমাদের জানলার সামনের মাঠটায়। ওই দুজনই খেলোয়াড়। তারক কাকার ভাই একটা মাঝারি মাপের টুলে বসে বল করতো। প্লাস্টিকের বল। তার ক্রাচটা হতো ওই বছর দশেকের ছেলেটির ব্যাট। গোটা বিকেল ধরেই ব্যাট করত ওই ছেলেটিই। কোনও চার বা ছয় হতো না। প্রত্যেকটি বল সে ঠুকে ঠুকে খেলে নিজেদের মধ্যেই রাখত। গায়ে বুকের দুধের গন্ধ লেগে থাকা সন্তানকে নিয়ে যেভাবে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেয় বাবা-মা, ঠিক সেরকমই একটি বোঝাপড়া ওই বলটিকে নিয়ে ছিল তারক কাকার ভাই এবং ওই ছেলেটির মধ্যে। খেলা শেষ হয়ে যেতো বাড়ির দোতলা থেকে একটানা একটা শব্দ শুরু হলে। শব্দটি আর কিছুই নয়, একটি স্টিলের বাসনের একভাবে সরু চামচের বাড়ি মারতে থাকলে যেমনটা শোনায়, ঠিক তেমন। প্রতিদিন শব্দটি একই সুরে বাজতো। একদিনের জন্যও সুরটা এদিক ওদিক হয়নি। ওই শব্দটা কে করত, তা জানতে পারিনি কখনও। ওই ক্রিকেট খেলাটির পাশে সুরটা দাঁড়িয়ে থাকত বিশল্যকরণী হয়ে। অনন্তকাল ধরে বেহালার ছররা দিয়ে বাতাসকে খুন করে তার আত্মার ভিতর থেকে ব্যান্ডমাস্টার টেনে বের করে এনেছেন এই সুর। কখনও মনে হতো, এই ক্রিকেটের জন্যই সুর। কখনও মনে হতো উল্টোটা।

রাঙামামাকে এই দুজনের কথা বললাম। আর বললাম, সুরটার কথা। রাঙামামা বলল- ওদের কথা তো আমারও মনে আছে। তোর আর কিছু মনে পড়ে কি? 

বুঝলাম, রাঙামামা আলোচনাটাকে কোনদিকে নিয়ে যেতে চাইছে। তারক কাকার বাড়িতে এক মহিলা ছিল। তাকে দেখে মনে হতো অন্যমনস্ক। একটা টিপ কিংবা নাকছাবি খুঁজছে সবসময়। কিন্তু, পাচ্ছে না। যে টালির ঘরে এখন বিকেলে পাখি উড়ে উড়ে আসে, ঠিক তার নিচের ঘরটিতেই একা থাকত সে। আমাদের জানলার দিকে কখনওই খুব একটা তাকাতো না। ওই মাঝেমাঝে, কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আমাদের জানলাটি দেওয়াল জুড়ে। মানে, তারক কাকাদের বাড়ির দিকের দেওয়ালটাই জানলা বা জানলাটাই দেওয়াল। তার ফলে সারাদিন ধরেই আমরা সবটাই দেখার সুযোগ পেতাম। কিছু না হলে বাড়িটাই দেখতাম। রং উঠে গিয়েছে। কয়েকটা পোস্টারও মারা। লাল কালিতে মোটা করে কোনও চ্যাংড়ার লিখে দেওয়া 'দেওয়ালে মুতিবেন না' এবং 'দেওয়াল ধরে দাঁড়াইলে রাজা পাপ দিবে' ইত্যাদিও রয়েছে। বাড়িটার একদিকের খড়খড়ি দেওয়া জানলার ঠিক নিচ থেকে একটি মোটা ডালের গাছ ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। দাঁড়াশের বাচ্চা চুপিচুপি উঠে আসে সেখানে। দাঁড়াশের বিষ নেই। তবে তার চামড়া আছে। মৃত্যু ও মুক্তির মাঝখানে একটি যত্নহীন অলঙ্কার। ওই গাছের ডালটিতে সরু সরু পাতায় সেই চামড়া ঘষে ঘষে ভাষাহীন গজব আঁকিবুঁকি দেয় যেন সাপটি। তারপর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কিছু দেখে। দেখা হয়ে গেলে পর দেওয়াল বেয়ে নেমে এসে সামনের ইটের পাঁজার ভিতর ঢুকে যায়। দুপুরের আঁচে তারপর তৈরি হয় নতুন আরেক দুপুর। ওই মহিলাটিকে দেখা যেতো সেই দুপুরেই। বেশ কয়েকটা গ্রীষ্মকাল আগে, জানলার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে এক দুপুরে আমার একটা ঝিমুনিভাব এসেছিল, তারপর ঘুমেও ঢলে পড়েছিলাম, তখনই রাঙামামার ঠেলা- এই ওঠ! ওঠ! দেখ! আমাকে দেখল! এই প্রসঙ্গে একটা জরুরি তথ্য দিয়ে রাখা ভালো। এই যে প্রথমে শীতকালের জানলায় বসে দেখা দুজন মানুষ এবং গ্রীষ্মকালেও তারক কাকার পঙ্গু ভাই ও দশ বছরের বালকের ক্রিকেট খেলার বর্ণনা দেওয়া হল- এরা কেউই কোনওদিনই আমাদের জানলাটার দিকে তাকায়নি। মগ্ন কর্মী মৌমাছির মতো নিজেদের কাজটুকু করে দিয়ে চলে গিয়েছে। তাই, এত শীত ও গ্রীষ্ম পেরিয়ে কেউ যে একবার আমাদের দিকে তাকাল, এই কথাটা শুনে আশ্চর্য হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বই কী! আমিও হয়েছিলাম। তারপর সেই মহিলাটি একদিন আমার দিকেও তাকাবে, এই ভেবে এমনকি ঘোর রাত্রিতেও অনেকসময় ঘুমিয়ে পড়তে পারিনি। এমন একটি রাত্রিতেই টানা জেগে থাকার পর প্রথম সূর্যের আলোতে দেখলাম ওই মহিলার দেহটি উপরের টালির ঘরের ঠিক নিচের দেওয়াল থেকে ঝুলছে শূন্যে। কী এক অদ্ভুত দক্ষতায় দেওয়ালের সঙ্গে মোটা একটা দড়ি বাঁধা। মহিলার পায়ের পাতা ভেঙে গিয়েছে। দেহটাকে যত্ন করে বাতাসের দোলনায় তুলে দিয়েছে যেন কেউ। ভোরের যে হাওয়াটা উঠে গাছপালা, পলিথিন, পুকুরের জল- এই সবকিছুকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়, তেমনই একটা হাওয়া দিচ্ছিল। সেই হাওয়াতেই দোল খেতে খেতে দেহটা 'এখানে মুতিবেন না'-এর গায়ে ধাক্কা মারছে। বহুক্ষণ দেহটা ওইভাবেই ছিল। আমি আর রাঙামামা বেলপানা খেতে খেতে দেখেছিলাম সেদিন।

রাঙামামার প্রশ্নের উত্তরে খচ করে একটা কথা বলতে গিয়েও তাই বলতে পারলাম না। কী হবে বলে! তাই জিজ্ঞাসা করলাম অন্য কথা। তোমাকে যেদিন প্রথম এই জানলার সামনে নিয়ে আসা হল, সেদিনটার কথা কি মনে আছে? না! তেমনভাবে মনে নেই! তবে, তার আগেরদিন যে পেটপুরে খিচুড়ি আর বেগুনি খেয়েছিলাম গরম গরম, সেটা মনে আছে। কথাটা বলে ছোট টুলটায় বসে শরীরটা অল্প ঝাঁকিয়ে একটু হেসেই চুপ করে গেল রাঙামামা। বেশি জোরে হাসা যায় না এখানে। তাহলেই বিপদ। টুল থেকে শরীরটা গড়িয়ে পড়লে প্রচুর ঝক্কি। এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন- আমাদের দুজনের শরীরেরই কোমরের নিচের অংশটা নেই। আমাদের দেখতে লাগে অনেকটা আবক্ষ মূর্তির মতো। ঘরের ভিতর থাকায় কাক এসে হেগে যেতে পারে না।

রাঙামামা যে কথাটা বলল, সেটা ডাহা মিথ্যে। এমন মিথ্যে কথা অবশ্য রাঙামামার কাছে নতুন নয়! এই একই প্রশ্ন শীতকালে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো বলে বসবে- অন্ধকার স্তব্ধরাতে গা ছমছমে মৌন পেরিয়ে একশো আটষট্টিটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছিলাম এখানে! বা হয়তো বলল, আমি তো মানুষই ছিলাম না আদতে! পাপুয়া নিউগিনির একটি দ্বীপে ডাইনোসর হয়ে ঘুরে বেড়াতাম। একদিন ঘুম পেল। বড় তীব্র সেই ঘুম। ঘুম ভেঙে উঠে দেখি খ্যাপা কুয়াশার মধ্যে বোকার মতো বসে আছি। ভালো করে চোখ মেলতেই দেখলাম বড় শিক দেওয়া শীতকালের জানলা! 

সত্যিটা হল, কোথা থেকে আমরা এসেছি, তা, দুজনের কেউই জানি না। যেমনভাবে সদ্যজাত-র ঠোঁটের কোণে দুধ লেগে থাকলে মুছে দেয় মা, ঠিক সেভাবেই এখানে আসার আগে পূর্বের স্মৃতি অতি যত্ন করে মুছে দেওয়া হয়। যেহেতু স্মৃতিই নেই, তাই ইচ্ছেমতো ভেবে নেওয়াতেও ক্ষতি নেই খুব একটা। তাই যখন কিছুই করার থাকে না, তখন আমরা ইচ্ছেমতো কাহিনি বানাই। 'তুই কোথায় থাকতিস'? রাঙামামার এই প্রশ্নের উত্তরে আমি একটা বাড়ির কথা বলতাম। সমুদ্রতীরের পাশে একটা বাড়ি। দু'পাশে আমগাছ। মিহি বালির পথ। মস্ত গোধূলি ভেঙে সেখানে সন্ধের পর রোজই ইদের সেমাইয়ের রঙের জ্যোৎস্না নেমে আসে। সেই জ্যোৎস্নার মধ্যে আমি আর আমার স্ত্রী আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় বসে থাকতাম। এটুকু শোনার পরই 'শুয়োরের বাচ্চা' বলে গালাগালি দিয়ে উঠত রাঙামামা। রেগে গেলে রাঙামামার শরীরটা ফুলে ওঠে বিচ্ছিরিভাবে। আমাদের দুজনেরই অর্ধেক শরীর। বাকি অর্ধেকটা ভেবে নিতে হয়। সম্ভবত, রেগে গেলে মন আর শরীরের মধ্যে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলতে থাকে, সেটা সম্পূর্ণভাবে ধারণ করার ক্ষমতা থাকে না শরীরটার। রাঙামামা ফুলে গেলে আমি জোরে গুঁতোই মাথা দিয়ে। তার ফলে শরীরটা ফুটবলের মতো উড়ে গিয়ে দেওয়ালে লেগে আবার জায়গামতো টুলে ফিরে আসে। অর্ধমৃত চিতাবাঘকে কুয়ো থেকে তোলার সময়ের গরগর শব্দ তখন এসে বসে রাঙামামার ভোকাল কর্ডে। এই খেলাটি আমার ভিষণ প্রিয়। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতাম না। পরে মনে হয়েছে, আমার যে এই খেলাটিতে আনন্দ হয়, তা বুঝতে পেরেই রাঙামামা ইচ্ছে করেই রেগে যায় আমার কথায়। নইলে, এমনিতে, 'সমুদ্রতীরের পাশে একটি বাড়ি এবং তার পাশে দুটো আমগাছ'- এমন সামান্যতম ঘটনায় কেউ রেগেই বা উঠবে কেন?!

একটা জিনিস লক্ষ করেছিস? রাঙামামা জিজ্ঞাসা করল। 

কী? প্রশ্ন করি আমি।

ওদের বাড়ির আর কাউকে দেখা যায় না। কিন্তু, বাড়ির সদর দরজার পাশে ওই বড় বোতলটা রাখা থাকে সবসময়।

ওই বোতলটা অনেকদিন ধরেই রয়েছে। স্যানিটাইজারের বোতল। বললাম আমি।

কিন্তু, কেউ তো আসে না আর ওদের বাড়িতে। তাহলে বোতলটা রেখে দিয়েছে কেন?

কখনও কেউ যদি আসে, সেই ভাবনা থেকেই হয়তো...

এটুকু বলে নীরব হয়ে যাই তারপর।

বাড়িটায় কেউ আর আছে কি না জানি না। তবু, বাড়িটা যে আছে, তা বুঝি এই স্যানিটাইজারের বোতলটি দেখে। কেউ একজন ঠিকই আসবে, এই আশাতেই যেন রেখে দেওয়া হয়েছে সেই বোতল। এই আশাটিই তো একটি বাড়ি। একটি সংসার।

দীর্ঘকাল ধরে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মামুলি বাড়িটার মধ্যে তেমন কোনও স্বাতন্ত্র্য নেই। কেবল বোঝা যায়, তার একটা জেদ আছে। খোঁড়াখুঁড়ি আছে। 

বিকেলটা ধীরে ফুরিয়ে যেতে লাগল। 

এমন কত বিকেল এই বাড়িটির উপর দিয়ে বয়ে যায়। শীত কেটে যায়। বৃষ্টি হয় দু-একদিন। জন্ম এবং মৃত্যুর ভিতর তৈরি হতে থাকে অজস্র ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা রাস্তা। শিলে বেটে প্রস্তুত করা হয় রান্না এবং নিয়তি। সবই একভাবে দেখে যায় এই বাড়িটি। শব্দহীন। বর্ণহীন।

এভাবেই গ্রীষ্মকাল শেষ হয়ে গেল একদিন। ফুল দেওয়া গ্রিলের জানলার সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমাদের আবার বসিয়ে দেওয়া হবে শীতকালের বড় শিক দেওয়া জানলার সামনে। আমাদের এখানে কান্না নিষেধ। তবু, দেখলাম, রাঙামামা কাঁদছে। কান্না শোনা যায় না। তবু, কান্না যে আছে, তা বোঝা যায়। আমাদের হাতে দুধরুটির বাটি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দুজনেরই কোমরের তলা থেকে ফাঁকা। যেভাবে সিংহাসন থেকে বেলগাছের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় পুজো হয়ে যাওয়ার পর মূর্তিকে, সেভাবেই গ্রীষ্মের জানলা থেকে অনন্ত শীতের জানলার দিকে চলেছি আমরা। এক জানলা থেকে আরেক জানলায় নিয়ে যাওয়ার আগে ওরা আমাদের খাওয়া বন্ধ করে দেয় টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা। যাতে নতুন জানলার প্রথম খাবারটি একফোঁটাও নষ্ট না হয়। চাঁদ বা নক্ষত্র গিলে নেওয়ার ক্ষুধা নিয়ে খাবারটির সদ্ব্যবহার করি আমরা, এমনটাই চাইতো ওরা। সেই কারণেই এই নিয়ম। শীতকালের জানলার দিকে চলেছি রাঙামামা আর আমি। স্যানিটাইজারের বোতলটা, সদর দরজাটা সব মিলিয়ে গেল। শেষবারের মতো তারক কাকাদের বাড়ি যতটা দেখতে পাওয়া যায়, ততটাই গলাটা থেকে মাথাটা টেনে টেনে বাড়িয়ে নিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল রাঙামামা। চুয়াত্তর হয়ে গেছে। খালি বলে পরের বছর মরে যাবে। আমি বেশ কয়েক চামচ দুধরুটি খেয়ে ফেলেছি তখন। বললাম, খেয়ো নাও রাঙামামা। 2 দিন কিছু খাওনি। দুধে খুব ভালো গুড় দিয়েছে...

২টি মন্তব্য:

  1. মায়া- কষ্ট - ভালবাসা জড়ানো একটা গল্প পড়লাম...

    উত্তর দিনমুছুন
  2. তোমার লেখা মানেই একটা মায়া জড়ানো ব্যাপার থাকে। কিন্তু এই গল্পটার একটা সিনেম্যাটিক ভ্যালু আছে। দৃশ্যগুলো তৈরি হতে হতে চলে। কী ভালো যে লাগল....

    উত্তর দিনমুছুন