মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

কল্লোল লাহিড়ী : গল্পের কাছে কী চাই



ল্যাপটপের সামনে বসে কি প্যাডে আঙুল গুলো রেখে চোখ বন্ধ করলে যে আদিগন্ত কাঁটাতারহীন প্রান্তরকে দেখতে পাই... গল্পের সামনে জানু পেতে বসে আমি তাই চাই। কবেকার সেই ভোরের বালীর বাসায় কুয়াশার সাথে যেভাবে উনুনের ধোঁওয়ার কুন্ডলী মিশে যেত। পেঁয়াজকলি ভাজার গন্ধে যখন শীত এসে এক টুকরো রোদের ফালি দিয়ে উঠোনে এঁকে দিতো আলপনা। গ্রাম ছাড়া, দেশ ছাড়া বেঁচে থাকা মানুষগুলো যখন ওইটুকু রোদ ভাগাভাগি করে মুখের দিকে চেয়ে থাকতো... আমি গল্পের কাছে ওই রোদ্দুরটুকু চাই। 

এক দেশে জন্মে আর এক দেশে উৎপাটিত হয়ে আসা মানুষ গুলোর জলছবির মতো ভেসে ওঠা মুখগুলো চাই। তাদের চাহনির বলা আর না শোনার আখ্যানের পরিসর চাই। ভুলে যাওয়া কিম্বা ভুলিয়ে দেওয়া কান্নার বিষণ্ণতায় এক মায়াবী শব্দ ঝিম ধরা বর্ষায় দোলা দিত। রাস্তাঘাট ভরে যেত নর্দমার নোংরা জলে। ছোট ছোট কাগজের নৌকা ভাসালে সাইকেলের জল কেটে কেটে তারা এগিয়ে যেত সামনে। ভাব ছিল বড় মোহনায় গিয়ে পড়বে। ইলিশ ধরা নৌকায় যাবার আগে ঘনির বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করতো। তার পিঠে ফেলা মাছ ধরা সফেদ জালকে মনে হতো বর্ম। টিপ টিপ বৃষ্টিতে তার থেকে টুপ টুপ জলধারা। সুখদেব জুটমিল থেকে বেরিয়ে ঝিম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গরম চায়ের ভাঁড়ে সুরুৎ সুরুৎ করে চুমুক দিতো..

আমি গল্পের কাছে বৃষ্টি চাই। গরম চায়ের ভাঁড় চাই। এক না হওয়া গল্পকে গল্পের তীরে বাইতে চাই। অনেক ভোরে কতকালের উজান পেরিয়ে বাবা বাড়ি ফিরলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। স্যাঁতস্যেঁতে আলো না ঢোকা ঘরে বাবা টেবিলের ড্রয়ার খোলে। কবেকার চশমার বাক্সে ধুলোমাখা ফ্রেম। কালি পেনে শুকিয়ে যাওয়া কালি। শিস ভাঙা পেন্সিল। ছ্যাতা ধরা রবার। বাবার গা থেকে সেই কবেকার কেয়োকার্পিন তেলের গন্ধ চিতাভষ্মের সাথে মিলে মিশে একাকার। 

অস্থি বিসর্জনের শেষে এক ডুবে একবারও না ফেরা দেখায় বাবার গল্পের বই। আঙুলের ছোঁওয়া। কবেকার হারিয়ে যাওয়া মন কেমন। আমি গল্পের পাতায় পাতায় অক্ষরে অক্ষরে মন কেমন চাই। কবেকার ভাঙা কাঁচের চশমা চাই। কেয়োকার্পিন তেলের গন্ধ চাই। লাস্ট বেঞ্চিতে বসা মন্টু আমাকে শিখিয়েছিল শিস দিয়ে হিন্দি সুর তুলতে। বেঞ্চি বাজিয়ে গান গাইতে। অসম্ভব দক্ষতায় এক অলীক কুহক বাস্তবতাকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ছাদে উঠিয়ে দিতে। সেখানে কৈশোরের পাপ মাখা ধুলোয় জান্তব শরীরে কাম আবিষ্কৃত হলে ভাস্কোদাগামার দূরবীনে চোখ রেখে আমরা স্বর্গ খুঁজতাম। 

আমি গল্পের কাছে মন্টুর সেই দূরবীন চাই। দুহাত উজাড় করে পাপ চাই। লাস্ট বেঞ্চে বসে ট্রেনের চাকায় ওর দুখন্ড শরীরটাকে জোড়া দিতে চাই। আমি চাই এই মুহূর্তে গল্পের কাছে দিল্লীর বর্ডার। হাজার হাজার কৃষকের উদ্যত শিরদাঁড়ায় নবান্নের ঘ্রান। আমি চাই গল্পের কাছে শাসকের পরাজয়। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের সমাপ্তি। প্রতি ঘরে গরম ভাতের সুবাস। আমি চাই মনির সেই ফলসা গাছ। যেখানে মনের শান্তিতে বিষাদের নক্সীকাঁথাখানা মেলা। আমি চাই শ্রুত শব্দ গুলোর বিশাল বিরাট বিস্ফোরণ যা গল্পের গল্পকে অস্বীকার করে বাঁচার আশায়। 



লেখক পরিচিতি
কল্লোল লাহিড়ী
কলকাতায় থাকেন।
কথাসাহিত্যিক।
চলচ্চিত্রবিদ্যা বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম ও টেলিভিশন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যরচনা পেশায় জড়িত। 
প্রকাশিত উপন্যাস : গোরা নকশাল। ইন্দুবালার ভাতের হোটেল। 

৩টি মন্তব্য:

  1. আরে এই কথাগুলোতো আমারও মনের কথা। কিন্তু এই লেখকের মত আমি বলতে পারিনা, পারবো কিনা কোনদিন তাও জানীনা। আজ এ পাড়ে পৌষ সংক্রান্তি, ওপাড়েও পৌষ সংক্রান্তি। লেখকের জন্যে পাঠালাম দুধ চিতই।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. গল্পের সামনে জানু পেতে বসার একটা দৃশ্য পেলাম , বড় মোলায়েম।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. লেখাটা যেন জলছবির মতন দেখতে পেলাম। আহা,কি মিষ্টি ভাষা। পেঁয়াজকলি ভাজার ঘ্রাণ! দারুণ!

    উত্তর দিনমুছুন