মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

অলোকপর্ণা'র গল্প : সংক্রমণ


মার্চ ২৩, ২০২০ 
এইবার মানুষ মানুষকে নিঃসন্দেহে সন্দেহ করতে পারছে, মানুষ মানুষকে নিঃসংশয়ে সংশয় করছে। 
মুখোশ পরা এখন বৈধ। এবং আবশ্যক। 
এখন স্পর্শ নিষিদ্ধ। এখানে স্পর্শ নিষিদ্ধ। 

মাথার উপরে জ্বলছে আকাশ। পায়ের তলায় ধকধক করছে মা-টি। 

আজ থেকে সব কিছু সত্যি সত্যি বন্ধ। নিচের দোকানটা পর্যন্ত খোলেনি। রাস্তাঘাটে মানুষ কমে গেছে। মসজিদ থেকে সারাবেলা আজান শোনা যায়নি। ফাঁকা রাস্তায় বেকার বেকার হাওয়া দিচ্ছে। প্রখর রোদে পাশের ব্লক থেকে দশ কেজি আটার বস্তা হাতে করে বয়ে আনতে, আজ অনেকখানি কষ্ট হল। 


মার্চ ৩০, ২০২০ 
কদিন ধরে ওর মাথা খুব চুলকাচ্ছিল। আজ একটা উকুন ধরা পড়েছে। সম্ভবত ওর কোনো সহকর্মীর থেকে এসেছে। সহকর্মীর নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কিছু বলল না। আমাদের ঘরে কোনো চিকন চিরুনি নেই। দোকানপাট বন্ধ। সারাদিন ধরে ও মাথা চুলকাচ্ছে আর চুল থেকে উকুন বের করার চেষ্টা করছে। 

আমি ওর থেকে দূরত্ব বজায় রাখছি। 

ওষুধের দোকানে মুখোশ পাওয়া যাচ্ছে না আর। এবং মুখোশ না পরলে সুপারমার্কেটগুলো ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। 


এপ্রিল ৩, ২০২০ 
আমাদের পূর্বদিকের দোতলা বাড়িতে থাকেন বাবা, মা ও পুত্রসন্তান। মা পৃথুলা, ডানপা জখম। বাবা পুরনো তাসের বান্ডিলের মত নিরুদ্দেশপ্রবণ। যখন তখন বড় বাড়িটার মধ্যে গুম হয়ে যেতে পারেন, অধিকাংশ সময় তাঁর হদিশ মেলে না। ষোড়শ ছেলেটি রূঢ়। বিকেলবেলা ছাদে হাঁটতে হাঁটতে মোবাইলে মুখ গুঁজে ফুল গাছের টবে অভ্যাসবশত অন্যমনস্ক থুতু ফেলতে সক্ষম। 

তিন কিলো পেঁয়াজ, দেড় কেজি বেগুন আনা হয়েছে আজ। ধীরে ধীরে খাওয়া হবে। একোয়ারিয়ামের মাছের খাবার যা আছে তাতে ওদের আর দিন চারেক চলবে। 

ফেসবুকে সবাই ডালগোনা কফি খাচ্ছে। 


এপ্রিল ৬, ২০২০ 
বেগুনে পোকা বেরিয়েছে। ফ্রিজে থাকা আঢাকা অন্যান্য খাবারেও সেই পোকা ছড়িয়েছে। সব খাবার ফেলে দিয়েছি একটু আগে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অস্থির হয়ে পড়ছি। খাবার না ঢেকে রাখার জন্য ওকে মুখ করলাম। 

পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে ছুড়ি হাতে নিজের উপর ভরসা রাখতে পারছি না। 

ওর ইনসুলিন শেষ হয়ে আসছে। মাছের খাবারও। 


এপ্রিল ১০, ২০২০ 
আজ সকাল এগারোটা নাগাদ আমার কাঁধে একটা উকুন ঝরে পড়েছে। 

উকুনটা গেলে ফেলেছি। 

আমার কিন্তু এতদিন একটুও মাথা চুলকায়নি। 


এপ্রিল ১১, ২০২০ 
ইনসুলিন নিয়ে ফেরার পথে দেখলাম আমাদের বাড়ির পাঁচিলে একটা চিল চুপ করে বসে আছে। এই প্রথম এত কাছ থেকে চিল দেখলাম। অন্যসময় নীল আকাশে ভাজা জিরের মত ভেসে থাকে। আমাকে দেখেও চিলটা উড়ে গেল না। ও বোধহয় টের পেয়েছে আমি বা আমরা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। 

আজকাল ফোন এলে ও ফোন হাতে অন্যঘরে চলে যাচ্ছে। ফোন আসছে দিনে পাঁচ থেকে ছ বার। প্রতিবার অন্তত ১০ মিনিট করে। 

আজ অবশেষে মাছের খাবার পেয়েছি। 


এপ্রিল ১৩, ২০২০ 

বাসন মাজতে মাজতে মনে পড়ল সকালের সংবাদের একটুকরো- উত্তরপ্রদেশে এক জনমজুর কর্মহীন মা ক্ষুধার তাড়নায় তাঁর পাঁচ সন্তানকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। ওকে বললাম। ও বলল খবরটা পড়েছে। আমরা সন্তর্পনে বাকি বাসনগুলোও মাজতে থাকলাম। 

আমাদের মাথা আজকাল ঘন ঘন চুলকাচ্ছে। আমরা দুজনে এখন সারাদিন মাথা চুলকাচ্ছি। 


এপ্রিল ১৪, ২০২০ 
লাল পিঁপড়ের মিছিল চলেছে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়েই ডান দিকে বেঁকেছে মিছিল। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা কাগজের মন্ডটাকে পাশ কাটিয়ে মিছিল চলেছে বাথরুমের দিকে। মিছিলের কারো কারো মাথায় উঁচু করে চিনির ড্যালা সসম্মানে তুলে ধরে রাখা। ছোটোবেলায় পড়েছিলাম, পিঁপড়েরা নিজের ওজনের চেয়ে কুড়ি গুণ ভারি বস্তু বইতে পারে। পিঁপড়েদের মিছিল তাই সম্ভ্রম কাড়ে। বাথরুমের কাছাকাছি মেঝেতে বছর পাঁচ আগে আমার হাত থেকে গ্যাস সিলিন্ডার পড়ে গিয়ে যে ফাটল ধরেছিল, তার সন্নিকটে এসে খেই হারাচ্ছে মিছিলটা। যারা মিছিলের তদারকিতে ব্যস্ত তাদের মধ্যের একজন পিঁপড়ে, ফাটলের কাছে খেই হারানো বাকি পিঁপড়েদের পিপীলিকান ভাষায় ডেকে ডেকে আবার মিছিলে ফেরত এনে দায়িত্বসহকারে ফাটল পার করাচ্ছে। বাথরুমে ঢোকার যে চৌকাঠ তার বাঁদিকের কোণ ঘেষা ছিদ্রপথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছে মিছিল। একবার ভিতরে ঢুকে যাওয়ার পর, কেউ আর বাইরে আসছে না। 

রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম, চিনির কৌটো ভেঙে মেঝেতে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে কাঁচ ছড়িয়ে আছে। 

পিঁপড়েরা মিষ্টত্বের সন্ধান পায় কীকরে? 

আজ পয়লা বৈশাখ। একটু আগে ১৪২৬ এর ক্যালেন্ডার থেকে বেঁচে থাকা মাঘ, ফাল্গুন আর চৈত্রের পাতাটা ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। পিঁপড়েরা সেই মন্ডকে এড়িয়ে, ১৪২৬ কে এড়িয়ে বাথরুমের দিকে চলেছে। তারিখহীন ক্যালেন্ডারে জিভ বের করা মা কালী শিবের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখন দোল খাচ্ছেন ফ্যানের হাওয়ায়। 

গতকালই এক কেজি চিনি এনেছিলাম। এছাড়া আড়াইশ গ্রাম কফি, চল্লিশটা ডিম, তিন কিলো আলু, আধা কেজি লঙ্কা, আর ঘি না পাওয়ায় এক প্যাকেট বনস্পতি এনেছি। 


এপ্রিল ১৭, ২০২০ 
সারাদিন ঘুম পাচ্ছে। দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে উঠে কোনো রকমে ভাত খেয়ে আবার ঘুমোচ্ছি রাত ৮টা অবধি। তারপর ভূতগ্রস্থের মত জেগে থাকছি ভোর ৬টা পর্যন্ত। ও অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। ঘুমের মধ্যে বাচ্চাদের গলার আওয়াজ পাই। শৈশবের ভ্রম হয়। মনে হয় যেন মা ডাকছে। 


এপ্রিল ১৮, ২০২০ 
স্বপ্ন দেখলাম। খাবার শেষ হয়ে যেতে একোয়ারিয়ামের মাছেরা একে অপরকে খেতে শুরু করেছে। শেষ অবধি বেঁচে থাকা টাইগার ফিশটা ফাঁকা একোয়ারিয়ামে পাক খাচ্ছে আর থেকে থেকে বাইরে আসার জন্য ধাক্কা মারছে কাচের দেওয়ালগুলোয়। একসময় অনাহারে থাকতে থাকতে মাছটা নিজেই নিজেকে খেতে শুরু করে দিল। 

এখন একোয়ারিয়ামটা ফাঁকা। টাইগার ফিশের কঙ্কাল বিশাল একোয়ারিয়াম পাক খাচ্ছে আর থেকে থেকে কাচের দেওয়ালগুলোয় ধাক্কা মারছে। 

মাছের খাবার সেদিন যতটা এনেছি তাতে যদিও আগামী দুমাস চলে যওয়ার কথা। 
রাস্তায় এখন সব্জিওয়ালার কুচকাওয়াজ। 


এপ্রিল ১৯, ২০২০, সকাল ৯টা বেজে ২৮ মিনিট, 
বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ছুটে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখলাম কোথাও কোনো আগুন নেই। আগুনের খোঁজে বাইরের ঘরে এসে দেখলাম ও ফোনে ব্যস্ত। আমায় দেখে চুপ করে গেল। আগুনের খোঁজে আমি রান্নাঘরে এলাম, দেখলাম গ্যাস সিলিন্ডারের চাবি বন্ধই আছে। 

বিস্ফোরণটা হল কোথায়? 


এপ্রিল ২২, ২০২০ 
পাড়ার ওষুধের দোকানটা উকুন মারার শ্যাম্পু রাখে না। এপাড়ায় কারো মাথায় উকুন হয় না। 

বিকেলবেলায় রেজার দিয়ে ও আমার আর আমি ওর- মাথার চুল চেঁছে দিয়েছি। আয়নায় আমাদের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মত স্থিতধী লাগছে। আমার মাথার ডানদিকে একটা কাটা দাগ আবিষ্কার করেছে ও। কবেকার ক্ষত, কিছু মনে পড়ল না। 


এপ্রিল ২৩, ২০২০ 
গতকাল থেকে আমরা ছবার মিলিত হয়েছি। এই প্রথম ও পায়ু সঙ্গমে রাজী হল। লুব্রিক্যান্ট হিসেবে আর কিছু না থাকায় বনস্পতি ব্যবহার করা হয়েছে। 

আজকে ওর কোনো ফোন আসেনি। 


এপ্রিল ২৪, ২০২০ 
খুব মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের পায়ের বুড়ো আঙুলদুটোর নিজস্ব মস্তিস্ক আছে। এবং সম্ভবত তাঁরা দুজনেই মার্ক্সিস্ট। মার্ক্সিস্ট মানুষের মত সব বিষয়ে তাঁদেরও নিজস্ব মতামত আছে। কান খাঁড়া করে থাকলে, বিবিধ বিষয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত কথোপকথন শুনতে পাওয়া যায়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেতে শুনলাম তাঁরা মণীন্দ্র গুপ্তর উপন্যাসে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করছেন। তাঁদের আলোচনায় ঢোকার চেষ্টা করতে কেন জানিনা নিজেকে অপাংক্তেয় বলে মনে হল। চুপ করে তাদের বাক্যালাপ শুনতে শুনতে একসময় টের পেলাম চোরের মত চুপিসারে কখন যেন ২৪ শে এপ্রিলের ভোর এসে আমার পাশে বসেছে। 


এপ্রিল ২৬,,, ২০২০ 
আজকাল যে কোনো কাজ তিনবার করে করছি।।। তিনবারের কম করলে ভিতরটা নিশপিশ করছে।।। মনে হচ্ছে কাজটা সম্পূর্ণ হল না।।। একই কাপ তিনবার ধুচ্ছি।।। এক জামা তিনবার ভাঁজ করছি।।। এককথা তিনবার বলছি।।। একবার মুখে, দুবার মনে।।। নাহলে ও আমায় পাগল ভাববে।।। 

আমাদের ঘরের দেওয়ালে একটা টিকটিকি আছে।।। রাতের দিকে ঘুলঘুলির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে- আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।।। আবার ঢোক গেলে।।। আবার আলোর দিকে ধেয়ে যায়,,, পোকার সন্ধানে।।। কখনোই ধরতে পারে না।।। প্রতিবার আমি মনে মনে টিকটিকিকে সমর্থন করি আর হেরে যাই।।। যদি আমি পোকাদের সমর্থক হতাম??? 

দুপুরে মুখোশ পরে ময়লা ফেলতে বেরিয়েছিলাম।।। পাড়ার মোড়ে দাঁড়ানো মুখোশ পরা পুলিশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল ময়লা কোথায় ফেলতে যাচ্ছি।।। একহাত দিয়ে ইশারায় তিনশো মিটার দূরের ডাস্টবিনটা দেখালাম।।। তিনবার।।। 


এপ্রিল ২৯, ২০২০ 
ইরফান খান মারা গেলেন। 

আজ আবার ওর ফোন এসেছিল, সকালে দুবার, বিকেলে দুবার। প্রতিবার মিনিট পাঁচ করে ওদের কথা হয়েছে। চারবারই বারান্দায়। 

যেকোনো মৃত্যুই আমাকে স্থবির করে দেয়। যদিও আমি বেঁচে আছি কি না মাঝে মাঝে টের পাই না। 


মে ১, ২০২০ 
সকালবেলা মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙল। পূর্বদিকের বাড়ির ছেলেটা দোতলার ঘরে ওর বাবাকে পেটাচ্ছিল, আমাদের বারান্দা থেকে তা দেখা গেছে। কেন, তা বোঝা যায়নি। ডান পা জখম থাকায় মহিলা একতলা থেকেই চিৎকার করছিলেন স্বামী ও সন্তানের প্রতি। 

সেই জনমজুর মায়ের খবরটা ফেক ছিল। পরে জানা গেছে, ক্ষুধার তাড়নায় নয়, স্বামীর সাথে লড়াই হওয়ায় মানসিক ভারসাম্যহীন ওই মহিলা তাঁর সন্তানদের গঙ্গায় ফেলে দিয়েছেন। 

ঋষি কাপুর মারা গেছেন গতকাল। 

ও রনবীর কাপুরকে পছন্দ করে। আমার রনবীর কাপুরকে পছন্দ নয়, যেহেতু ও রনবীর কাপুরকে পছন্দ করে। 

শ্রমিকেরা কি আজ ভিনরাজ্যে শ্রমিক দিবস পালন করছেন? 

আজ থেকে অল্প অল্প করে দোকানপাট খুলবে বলেছে। 

আমি মাঝে মাঝে মাথার কাটা দাগটার উপর হাত বুলিয়ে মনে করার চেষ্টা করি, কবে কীভাবে... মনে পড়ে না। 


মে ৩, ২০২০ 
ইনিসুলিন আনতে গিয়ে সকালবেলা ওষুধের দোকানে পূর্বদিকের বাড়ির নিখোঁজপ্রবণ মানুষটার সাথে দেখা। তিনি আমায় চেনেন না। আমি তাঁকে চিনি। অথচ তাঁর দিকে তাকাতে বুঝলাম মুখোশের ওপার থেকে তিনি হাসছেন আমায় দেখে। একপাতা পেইনকিলার কিনে ফিরে গেলেন। 

টিকটিকিটা এখন একটা মথ ধরেছে। ধীরে ধীরে মথকে গিলে ফেলছে টিকটিকি। কষ্ট হচ্ছে, তাও গিলছে, যেমন করে কষ্ট গিলতে হয়। 


মে ৬, ২০২০ 
আজকাল হাত পায়ের চামড়া নিজে নিজে কুঁচকে যাচ্ছে, অনেকক্ষণ জলে থাকলে যেমন হয়। জলস্পর্শ ছাড়াই বেশ খানিকক্ষণ আঙুল কুঁচকে থাকছে। তারপর আবার নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যাচ্ছে। কেন বুঝতে পারছি না। 

বিকেলের দিকে হালকা জ্বর জ্বর লাগছে। দেহের উষ্ণতা যদিও স্বাভাবিক। ভিতরে একটা চিনচিনে ভয় জন্মাচ্ছে। বেসিনে অনেকক্ষণ ধরে হাত ধুচ্ছি। কনুই অবধি। এবার সংগতকারণে হাতের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে। 

বর্ষাকাল নয়, অথচ আমাদের দুজনের মাথাতেই এখন কদম ফুটেছে। কারোর চিরুনি লাগছেনা। 


মে ৮, ২০২০ 
রবীন্দ্রজয়ন্তী। সারাবছর ধরে দেওয়ালে টিকটিকির মত ঝুলে থাকা রবিচ্ছবির আজকে মাটিতে পা ফেলার দিন। 

ওর সহকর্মীর নাম সমীরণ। সমীরণ পাল। লক ডাউনের পর আমরা সেপারেটেড হতে চলেছি। তারপর প্রয়োজন মাফিক কোর্টকাছারি। 

বিকেলের দিকে আবার হালকা জ্বর জ্বর লাগলো। কিন্তু হাত ধুলাম না। 


মে ১০, ২০২০ 
সমীরণ পাল। ১৯৯৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। বাড়িতে কুকুর আছে, কালো রঙের, ল্যাব্রাডর। কুকুরের নাম রনি। রনি পাল। তার নামে ফেসবুক পেজও আছে। সেই পেজের ১৪৮৯ জন মেম্বার। সমীরণ পালের দিদির নাম মনা পাল। মনা নামের অর্থ আমি জানিনা। অর্থহীন নাম আমার পছন্দ নয়। মনা নামের কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে আমার তা মেকী বলে মনে হয়। ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য মনাদের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। মনা নামের মেয়েরা দলবদ্ধ মুড়ির মত। একসাথে মুড়ির টিনের মধ্যে পড়ে থাকে রান্নাঘরের যে তাকে সবচেয়ে কম হাত পড়ে, তার এক কোণায়। তবে এরা খুব ভালো দিদি হতে জানে। ভাইফোঁটার সময় সত্যি সত্যি মন দিয়ে ভাইয়ের সুদীর্ঘ আয়ু কামনা করে। ঘুমের মধ্যে এদের চোখ অর্ধেক খুলে থাকে। এরা অংকে কখনো ৭৫এর উপরে নম্বর পায় না। গোবিন্দার সিনেমা দেখে এদের চোখে জল আসে। এরা টিভিপর্দায় রক্তারক্তি সহ্য করতে পারে না। সম্বন্ধ এলে এরা হারমোনিয়ামে “হে সখা মম হৃদয়ে রহ” গেয়ে টাইট শার্ট পরা পাত্রের মনো (ধোন) রঞ্জন করে থাকে। 

একোয়ারিয়ামের মাছদের দুদিন হল খাবার দিচ্ছি না। ইচ্ছে করছে না খাবার দিতে। দুদিন হল স্নান করিনি। 


মে ১৩, ২০২০ 
মনে হচ্ছে আমার চারপাশের প্রতিটা জিনিস জ্যান্ত। জলের বোতল, চিরুনি, গল্পের বই, গামছা, দরজা, জানালার গরাদ, বিছানার বালিশ, চাদর, দেওয়াল ঘড়ি, টেলিভিশন, চায়ের কাপ, স্টিলের থালা, চামচ- সবাই যেন জেগে আছে। বোবা। স্থবির। কিন্তু সব্বাই জেনে গেছে যে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে চলেছি। 

বুড়ো আঙুলদের কথাবার্তায় রাতে ঘুম আসছে না। ওরা সমীরণ পালের বেতন সম্পর্কে আলোচনা করছিল পরশু রাতে। 
কাল রাতে ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। প্রত্যাখ্যানের ভয়ে। 

দিনের বেলা অকারণে মুখোশ পরে বাজারের ফাঁকা থলে হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছি। পুলিশ থলে হাতে মানুষকে ভয় দেখায় না। 

টিকটিকিটা খাওয়ার মত পোকা পাচ্ছে না দেওয়ালে। আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে তাই। এখন আমি এই ব্যাপারে কীই বা করতে পারি? 

আমি আজও স্নান করিনি। 


মে ১৫, ২০২০, বেলা ১১টা 
অবশেষে স্নান করলাম। তারপর মূখ্যমন্ত্রীর তহবিলে দুহাজার টাকা দিলাম। মাছদের খাবার দিয়েছি একটু আগে। মাছেরা খুশি হয়ে আমায় আশীর্বাদ করল। 

অদ্ভুতভাবে ওর চুল বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে। আমার চুল এখনো কদমছাঁট। 


মে ১৫, ২০২০, দুপুর ৩টে 
একটু আগে ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিলাম। প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। 

মনে পড়ল, তখন খুব ঘুড়ি ওড়াতাম, ভাই আর আমি। ছাদে। একবার ঘুড়িটা আটকে গেল অনুদের এন্টেনায়। আমাদের একতলার ছাদ থেকে পা বাড়ালেই অনুদের ছাদে পৌঁছানো যেত। বর্ষাকালের ছাদের পাঁচিল, বিবাহিত জীবনের মত পিচ্ছিল। পা হড়কে নিচে গিয়ে পড়লাম। মাথা ঠুকে গেল ইটে। একটুর জন্য বেঁচে গেল চোখদুটো। ভাই দৌড়ে এসে নিয়ে গেল ধীরেন ডাক্তারের বাড়ি। ভয়ে কেউ বাবাকে বলতে পারিনি। সাতদিন বাড়িতেও টুপি পরেছিলাম। চোট একদিন শুকিয়ে গেল নিজে থেকে। মাথার মধ্যে গোপনে গোপনে তৈরি হয়ে থাকল একটা দাগ। খননকার্য শেষে যা উদ্ঘাটিত হল এই দুহাজার বিশ সালে। 


মে ১৫, ২০২০, রাত ৮টা বেজে ৪৫ মিনিট 
বিকেল থেকে দুবার পাশবিকভাবে মিলিত হয়েছি আমরা। আমার কোমরে টান লেগেছে। আগে বুঝতে পারিনি। এখন মলম দিলাম। 

টিকটিকিটা একটা মাকড়সাকে খেল একটু আগে। টিকটিকিটার নাম দিলাম “বিজু পাল”। 


মে ১৬,,, ২০২০ 
একটু আগে সমীরণ পাল আমায় ফোন করে ওর থেকে দূরে থাকার হুমকি দিল।।। আমি কলটা রেকর্ড করে রেখেছি।।। মাঝে মাঝে চালিয়ে শুনছি।।। প্রতিবার সমীরণ পাল “শুয়োরের বাচ্চা”কে “শুয়োরের বাচ্ছা” বলছে।।। গুগল করে দেখলাম বাংলায় “বাচ্চা” বা “বাচ্ছা” দুইই মান্য।।। 

বিকেলবেলা আবার একটা চিল এসে বসেছিল পাঁচিলে।।। সেই চিলটা কিনা বুঝতে পারলাম না।। পাঁচিলে চিল।।। চিল পাঁচিলে।।। পাঁচিলে চিল।।। --- বলতে মজা লাগছে বেশ।।। 

পাঁচিলে একচিলতে চিল।।। 
একচিলতে চিল পাঁচিলে।।। 
চিল একচিলতে পাঁচিলে।।। 


মে ১৭, ২০২০ 
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ওকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বলেছি। 

আজ থেকে বিমান চলাচল চালু হল। 

পূর্বদিকের দোতলা বাড়ির ছেলেটা সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা মচকেছে। পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে চেয়ার নিয়ে ছাদে বসে আছে। মোবাইলে মুখ গোঁজা। মাঝে মাঝে পাশের গাঁদা ফুলের টবে পিচিক করে থুতু ফেলছে। ওর বাবা এসে একটু আগে ওকে চায়ের কাপ দিয়ে গেল। 

বুড়ো আঙুলেরা দুপুরের দিকে গার্সিয়া মার্কেজের বাক্যগঠনের সাথে আমাজন নদীর বহমানতার যোগসূত্র সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। বেশ ভালোই লাগছিল তাঁদের আড্ডাটা কিন্তু জানতে পারলাম তাঁরা কথাসাহিত্যে মার্কেজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ। তাঁদের মতে বিভূতিবাবু এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে হোলসাম লেখক। মুখ ফসকে বলে ফেললাম মুরাকামি সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কী? তাঁরা দুজনেই আমাকে অপমানজনকভাবে উপেক্ষা করে গেলেন। 


মে ১৮, ২০২০ 
আজ বিকেলবেলা ও কাঁদছিল। একা একাই। আমায় ডাকেনি। একা একা বেডরুমে বসে কাঁদছিল। কেউ ঘুমোলে বা কাঁদলে তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করেনা আমার। 

সমীরণ পাল আর ফোন করেনি। সমীরণ পাল কি ডিভোর্সি? না বিপত্নীক? সকালে ফেসবুকে দেখলাম ওর সাথে দীঘা ঘুরতে যাওয়ার ২৬টা ছবি দিয়েছে ওকে ট্যাগ করে। আমি প্রতিটা ছবিতেই লাইক দিয়ে এসেছি দুপুরবেলা। তারপর মনা পালের বাড়ির কালিপুজোর ছবি দেখলাম। মনা পালের বরের নাম সুমন পাল। তার টিউব লাইটের কারখানা। লাল রঙের বাইক। পাঁচ ছ বছরের ছেলে। সবই বাগনানে। 

বিজু অনেকক্ষণ ধরে একটা পোকা ধরতে চেষ্টা করছে। পোকাটা কেন জানিনা, উড়ে উঠলেও খুব বেশি দূরে গিয়ে বসছে না। বোধহয় প্রাণের মায়া তেমন নেই। 


মে ২০, ২০২০ 
আমি ঝড় ভালোবাসি। পরের জন্মে মানুষ না হয়ে, আমি ঝড় হতে চাই। ঘূর্ণিঝড়। যার মাঝখানে শান্ত একটা চোখ। বুদ্ধের চোখের মতো। সেখানে সব কিছু থমকে আছে। সেখানে চুপ করে বসে থাকা যায়। 

ঘরে বাইরে সর্বত্র এখন ঝড়। ঝড় আমি বড় ভালোবাসি। 


মে ২২, ২০২০ 
খাবার দিতে গিয়ে দেখলাম গাপ্পিবউটার যে পেট হয়েছে তা ভালো মত বোঝা যাচ্ছে। রাস্তায় মানুষ চলাচল আগের চেয়ে বেড়েছে। আগামিকাল আমি বাজারের থলে ছাড়াই বাইরে বেরব ভেবেছি। ওর ইনসুলিন ফুরিয়ে এসেছে। 

ও জানালো সিদ্ধান্ত এভাবে দুম করে নিতে পারছে না। বিশেষত এই পরিস্থিতিতে। ওর চুল দেখলাম বেশ কাঁধ ছুঁয়ে ফেলেছে। আমার চুল এখন সবেমাত্র চিরুনির নাগালে আসছে। 

সুমন পাল আমায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। আমি এক্সেপ্ট করেছি। 

চিলটা আর আসেনি। বিজুকেও কদিন দেখছি না। কোথায় গেল সব? 

মুখ্যমন্ত্রীর ঘূর্ণিঝড় তহবিলে হাজার টাকা দিলাম। 

আমার হাত পায়ের আঙুলের চামড়া আবার কুঁচকে যাচ্ছে। কেন জানিনা। আমি তো জল ছুঁইনি? 


মে ২৩,,, ২০২০ 
আমরা সবাই ঘর ছেড়েছি।।। সবাই এখন পথে।।। আমরা কেউ কাউকে চিনতে চাইছি না।।। আমরা সকলে বদলে গিয়েছি।।। ভীষণরকম বদলে গিয়েছি।।। আমরা কেউ কাউকে চিনতে পারছি না।।। 


মে ২৫, ২০২০ 
খুব রোদ। খুব বৃষ্টি। খুবের চেয়ে কম কিছু নেই পৃথিবীতে। 

দুপুরে স্বপ্নে দেখলাম বাবা বলছে ছাতা নিয়ে বেরতে, নাহলে ঝলসে যাবো। চিল এসে কবে থেকে বসে আছে স্বপ্নের পাঁচিলে। 

ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমার ফেসবুক ওয়ালে সুমন পাল লিখেছে, “সুস্বাগতম বন্ধু J” 

বিজু পাল এসেছিল আজ, ওর লেজটা আর নেই। একইসাথে নেড়া এবং নতুন দেখাচ্ছিল বিজুকে। 

ও জানালো, সিদ্ধান্ত নিতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। 


মে ২৮, ২০২০, দুপুরবেলা 
মাথার চুল আঁচড়ানোর অবস্থায় এসেছে এতদিনে। আমাদের মাথা এখন আর চুলকায় না। সকালে সুমন পালের সাথে মেসেঞ্জারে চ্যাট করলাম কিছুক্ষণ। সে পুরোদস্তুর মোহনবাগানী। আমাদের সখ্যতা ভালো জমবে বলে মনে হচ্ছে। 

পূর্বদিকের বাড়িতে আজ শুঁটকী রান্না হচ্ছে। জানালা বন্ধ করে দিতে হল। 


মে ২৮, ২০২০, রাত ১১টা 
কথায় কথায় সুমন পাল আমায় জিজ্ঞেস করল, ‘ও’ কি আমার স্ত্রী? 

কী জবাব দেবো ভেবে পাচ্ছি না। 


মে ২৯, ২০২০ 
একটু আগে ও জানালো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বেডরুমে এসে বসতে বলল আমায়। 

গাপ্পিবউ ডিম পেড়েছে আজ। 
সামনের সোমবার থেকে অফিস। 


মে ৩০, ২০২০ 
জ্বর এসেছে কাল রাত থেকে। থার্মোমিটার নেই বলে বুঝতে পারছি না কতটা জ্বর। একোয়ারিয়ামের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। নেশা নেশা লাগছে। দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছি একোয়ারিয়ামের মাছেরা মাছেদের খেয়ে ফেলছে। জানি শেষ অবধি বেঁচে থাকবে সমীরণ পাল। সব মাছ খাওয়া হয়ে গেলে একোয়ারিয়ামের দেওয়ালে ধাক্কাবে বার বার এসে। বেরোতে না পারলে সমীরণ পাল নিজেই নিজেকে খাবে। যেমন আমি আমাকে খাচ্ছি। ও খাচ্ছে ওকে। বিজু নিজের লেজ অবিলম্বে খেয়ে ফেলেছে। পাশের বাড়ির ষোড়শ তনয় শুরু করেছে তার বাবাকে দিয়ে। শেষ করবে গাঁদা ফুলের টবে এসে। সুমন পালও খাবে মনা পালকে। মনা নামের মেয়ে করুণ চোখে দেখবে যে তাকে খেয়ে ফেলা হল। গিলে ফেলা হল। 

পৃথিবীতে মুখোশের চাহিদা আর জোগান এখন সমানুপাতিক। 

২টি মন্তব্য: