মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

সৌরভ হোসেন'এর গল্প : লালঘোড়া

যেমনি পিঠের ওপর চাবুকটা স্যাৎ করে মেরে বড় মনিব বলত, ‘এই শাহজাদা চল’ অমনি চিহি করে উঠে টমটম করে ছুটতাম। পায়ের খুর খটমট করে মাটি কামড়ে উঠত। এক ছুটেই পগারপার। মনিব তখন আমার পিঠের ওপর দু’পা ফাঁক করে প্যাটাঙ্গার লতির মতো হলবল করে দুলত। ছিটকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে দুহাত আঁকড়ে ধরত লাগাম। একটু এলেবেলে হলেই সামনের পায়ের দাপনাই চাবুকের চিনচিনে বাড়ি’টা আবার স্যাৎ করে পড়ত। মাইরি, কী লাগা লাগত! জান বিষিয়ে লঙ্কা হয়ে যেত। দাঁত কিড়মিড় করে খিস্তি দিতাম।
মনিবের চোদ্দগোষ্ঠি তুলে গাল পাড়তাম। শালা মনিব ভাবত আমি যেন ফেরেস্তা বহানো ডানাওয়ালা বোরাক। ওজুর পানি গড়াতে না গড়াতেই সাত আসমান পেরিয়ে সিদরাতুনমুনতাহা ছাড়িয়ে আরশে বসে থাকা খোদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে আনব! তবে হ্যাঁ, বাণের মতো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ছুটে যখন গন্তব্যে পৌঁছতাম তখন কিন্তু মনে বেহেশতের সকুন পেতাম। জানে তামাম জাহানের শান্তি বিরাজ করত। তখন কালঠিকরে খুঁটলচোখে ল্যাকপেকে মনিব লোকটাকে সত্যিই আমার নবী মনে হত। আমার পিয়ারা দোস্ত। লোকটা যখন আমার পিঠে স্নেহের হাত রেখে আদর করে দিত তখন আমার বুকটা গর্বে ছাপান্ন ইঞ্চি থেকে বাষট্টি ইঞ্চি হয়ে যেত। আমি তখন বেহেশতকেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতাম। ফেরেস্তাদের বোরাককে হেয় করে বলতাম, তোমরা যদি হও আসমানের বাদশা আমি কিন্তু দুনিয়ার সম্রাট। আরে আমাদের খুঁড়ের ওপর ভর করেই রাজ্যপাট বদল হয়, যুদ্ধে জয় আসে, রাজা-বাদশাদের গরিমা বাড়ে। কোনও বাহিঞ্চোত কি আমাদের ছাড়া তার সাম্রাজ্যের এক ছটাক জমিও বাড়াতে পেরেছেন? যতই ফুটেনি দেখাক, আসল অস্ত্র ছিলেম আমরা। এই তো সেদিন, যখন ফিরিঙ্গিরা আমার পিঠে চেপে জগৎ জয় করল তখনও আমার দেমাগ এতটুকু কম ছিল না। এক ফিরিঙ্গি পিঠে সওয়ার হলেই তরতর করে কেঁপে উঠত গাঁ-গেরাম। আমার মনিবই তো একদিন বলছিল, একবার নাকি এক ফিরিঙ্গি ঘোড়সওয়ার হয়ে দুম করে তাদের কালান্তরমাঠে টহল দিতে ঢুকেছিলেন। তখন ছিল শিরিষ রায়বাহাদূরদের জমিদারি। তারা নাকি ঠিকঠাক খাজনা দিচ্ছিলেন না। মাঠে খড়া-শুকার মিথ্যে গল্প ফেঁদেছিলেন। লেলচে কটা শ্বেতশুভ্র ভ্রূ ওয়ালা ফিরিঙ্গিসাহেব সেসব স্বচক্ষে পরখ করতেই মাঠে ঘোড়া নামিয়েছিলেন। সে ঘোড়ার যেমন ছিল বাহার তেমন ছিল গায়ে বল। দু-মানুষ উঁচু সে ঘোড়ার শরীর ছিল ধনুকের ছিলার মতো টানটান। একবার চিহি করে ডাকত তো এ মাঠ সে মাঠ পেরিয়ে যেত সে ডাক। সাহেবিঘোড়া বলে কথা। তার কদরই ছিল আলাদা। আদর-যত্নের কোন খামতি ছিল না। একটা ঘোড়ার পেছনে পাঁচ পাঁচজন চাকরবাকর লাগানো থাকত। 

আমার যত্নআতিরই বা কম কি ছিল? যখন আমার তাগড়া বয়স, পিঠ ধনুকের মতো টানটান, গায়ে তিন বলদের শক্তি, পায়ের এক চাটিতেই কুকুর-শেয়াল কুপোকাৎ, ঘাড়ে বোঝার জোয়াল দিলেই টমটম করে ছুট দিতেম, মনিবের মনে তখন বিশ্বজয়ের ফুর্তি, আমিই তখন তার মেরাজ ভ্রমণের বোরাক, তার সংসারের শক্ত হাল, তার জীবনের সলতে, তার সুখের ভাত-রুটি। মনিব তখন আমার ঘাড়ের ঝাঁকড়া চুল ছোপ ছোপ করে ছেটে দিত। ঘাড়টা ঢেউ খেলে উঠত। সোনালী চুলের ছাটে আমি তখন রাজকুমার। টমটম করে যেই ছুটতাম গলায় পরিয়ে দেওয়া পিতলের ঘুঙুরগুলো ঝনঝন করে বাজত। লোকে ভ্রূ কপালে তুলে বলত, কালুর ঘোড়াটা তো বেশ বাদশাহি হয়ে উঠেছে! 


দুই 

পাটকাঠির বেড়াটায় ফাঁক দিয়ে যেই মুখটা বাড়িয়েছি অমনি কাঁচা বাঁশের পান্ঠির বাড়িটা ধেই করে মুখে এসে পড়ল। লাগল তো লাগল একেবারে নাকের বাঁশিতে! দরদর করে ঝরে পড়ল রক্ত! সে রক্ত ঠোঁট বেয়ে মুখের ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। রক্তের নুন্ঠা স্বাদ পেয়ে ভেংচে উঠল জিভ। আমার কী আর দোষ। আমি অভ্যেসবসেই বাড়িটায় ঢুকতে গেছি। এতদিনের অভ্যেস কি আর হুট করে ছাড়া যায়? নাই নাই করে তাও তিরিশ বছর হবে। আমার জন্মও যে এ বাড়িতে। কালুর দাদো থেকে বাপ, তিন পিরির জোয়াল টেনেছি। আমি গা-গতর ডুবিয়ে খেটেছিলাম বলেই তো না পরিবারটার একটা হিল্লে হয়েছিল? সে বাড়ির পথ এত তাড়াতাড়ি কী করে ভুলি! তাছাড়া আমার বড় মনিব আতর লোকটার মুখটা একদন্ড দেখার জন্যেও মনটা ছু ছু করে। লোকটার হালও যে অনেকটা আমার মতো। যেদিকেই যাই, এ গলি সে গলি ঘুরে আবার এই ঝাঁপিটার কাছেই চলে আসি। এত কুকুর শেয়ালের মতো দূরদূর ছেই ছেই করলেও আমার লজ্জা হয় না। এক আধবার পেছনে নেড়িকুত্তা লাগিয়ে দেয়, এক আধবার গায়ে পিঠে উধেধুম ঢিল ছুড়ে, তবুও আমার সান হয় না। একবার তো হেসের পাভারি মেরে কানের লতি কেটে দিয়েছিল, তবুও আমি বেহাইয়ার মতো দাঁড়িয়েছিলাম। আমার সত্যিই যেন লজ্জা ঘৃন্না হায়া-পদ্দা বলে কিচ্ছু নাই। 

কালুর বাপ আতরের গায়ে বল থাকলে কি কালু এতটা নিষ্ঠুর হতে পারত? মানুষটার মনে দয়ামায়া ছিল। একবার শহর যাওয়ার সময় ইঞ্জিন গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছিলাম। সামনের ডান পা মুচড় লেগে দুমড়ে গেছিল। সে দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছিল আতর। ক-দিন নিজের নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে আমার ভাঙা পায়ের সেবাশুশ্রষায় দিনপাত করেছিল। জড়িবুটি থেকে পানিওষুধ কিচ্ছু বাদ থুয়ে ছিল না। আমি যেদিন প্রথম ভাঙা পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ালাম সেদিন কালুর বাপটার শুকনো মুখটা শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। খুশি চোখ ছুঁয়ে ধেই করে নেচে উঠতেই কালুর বাপ লোকটার আর পাছা থির ছিল না, ফটাফট সেজদা দিয়ে আল্লাহকে শুক্রিয়ার দু-রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিয়েছিল। পরের দিন বেগুনবাড়ির হাট থেকে আমার জন্যে কিনে এনেছিল হরেক রঙের নাইলনের বাহারি ফুল। সেগুলো আমার মাথার ঝুঁটিটাকে বেহেশতের ফুলঝুটি করে তুলেছিল। যখন দুলদুল করে আমার ঘাড় দুলে উঠত তখন নাকি আমি অপরূপ সুন্দর হয়ে উঠতাম। লোকজনে ঠেস মেরে বলত, আতরের ঘোড়াটা দিনের দিন বাহারি রানি হয়ে উঠছে! মদ্দা ঘোড়াকে রানি বলাই আমারও ফিক ফিক করে হাসি পেত। 


তিন 

ব্যাটা কালু বাপ আতরের এককোণাও হতে পারবে না। আমাকে বেহে বেহে ন্যাকড়া করে দিয়ে এখন বলছে, এখান থেকে ফুট। টানটান শরীরটার এ কি হাল! পাড়িমোষের মতো অতখানি গতরটা এক খামচা মাংস হয়ে গেছে! তাও তো গতর ঝোলা মাংস নয়, হাড়ে দাঁত কামড়ে লেগে থাকা তিরতিরে খিলেনি গোস্ত। জসীম হাজির হাভলা পুকুরটার পাড়ে দাঁড়িয়ে পানিতে পড়া আমার আধমরা ছায়াটা দেখেই আঁতকে উঠলাম। শরীরটার এ কী ছিরি হয়েছে আমার! এ তো শেয়াল এক খামচায় কপ করে খেয়ে নেবে! কালুর নাদুসনুদুস খেসেল বৌ’র এক ফুঁয়েই উড়ে যাব। মাগিটা যা জেরে! আমাকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর লেগে তিনবেলা করে পাছায় গরম বাউলির ছ্যাকা দিত। আমি নাকি ওর সংসারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ওর বাড়া ভাতে নাকি মুখ দিচ্ছিলাম। আমার লাদ তুলতে গিয়ে নাকি ওর কোমর বেঁকে যাচ্ছিল। মাগি শুনে না শুনেই ওয়াক করত। মাগি ভুলে গেছিল, আমার ঘাড়ে করেই একদিন ও বাপের বাড়ি থেকে বৌ সেজে এ বাড়িতে এসেছিল। কালুটারও আমার পিঠে চাকু হাঙতে এতটুকু জান টাটাল না! আমি এখন বোঝা টানতে না পারি ওর ছেলে নুহুকে পিঠে চরিয়ে পাট খাওয়াতে তো পারতেম? পিঠে চাপিয়ে দরগাতলায় মহরমের তাজিয়া দেখিয়ে আনতে পারতেম? যেদিন ঘাড়ের জোয়ালটার ভার সয়তে না পেরে কুঁকড়ে বসে গেলাম, কোনমতেই আর খাড়া হতে পারলেম না সেদিন থেকেই আমি ছোট মনিবটার চোখের বিষ হয়ে গেলাম! হয়ে গেলাম চিরদিনের পর। যখন গায়ে বল ছিল, পেটে ধক ছিল, তখন আমাকে নাক অবধি বহে নিয়েছ আর এখন গায়ে বয়স থাবা বসায় আমাকে কাগজের ঠোঙার মতো ছুড়ে ফেলে দিল! কিয়ামতের দিন আল্লাহ নিশ্চয় এই বেইমানির বিচার করবে। 

যন্ত্রণার ভারে কোনভাবেই পা উঠছে না আমার। গায়ে অসংখ্য ক্ষত’র চিহ্ন। কোন কোন ক্ষতটা দগদগে ঘা হয়ে উঠেছে। আর সেখানে ভনভন করছে শয়তান মাছি। আমাকে দেখলেই মানুষগুলো রে রে করে ওঠে। যেন আমি মানুষকুলের জমশত্রু! তাদের চোদ্দগুষ্ঠির পাকা ধানে মই দিয়ে থুয়েছি। আমার গায়ের দিকে তাকানোর জো নেই। যে যেমনভাবে পেরেছে আঘাত করেছে। ঢিল, পাটকেল, লাঠির বাড়ি, হেসের খোঁচা, দাঁ’এর কোপ কিচ্ছু বাকি নেই! সবাই যেন আমাকে মেরে অদ্ভুত আনন্দ পায়। ছেলে-ছোকড়ারা তো মজার খেলা ভাবে। আমি খেতে তো পাইই না, যা রাস্তাঘাট চরে একগাল আধগাল এর এঠো ওর এঠো কপালে জুটে সেটাও দুদন্ড থির হয়ে খেতে পারি ন্যা। লাদব বলে আশপাশের লোক হেইহেই করে তেড়ে আসে। কী করব, আমার লাদের বিটকেল দুর্গন্ধ তো? এ কি আমি বানাই? এ তো আল্লাহর কেরামতি। তারপর আমি বুড়ে ঝাল হওয়াই সে দুর্গন্ধে টেকাই মুশকিল। 

আল্লাহর দুনিয়াতে আমার লাদার জায়গাও নেই! আমি এতই অপয়া। অভাগা জানোয়ার। হে, আল্লাহ, তুমি কেন আমার গোস্তকে খাওয়ার হালাল করনি? হালাল রুজি করলে এই হতচ্ছিরি দশা আমার হত না। এতদিন কবেই মানুষের পেটে চলে যেতাম। এই কালু আর কালুর জেরে বৌ’ই একেবারে আয়েশ করে খেত। আসমানের দিকে মুখ তুলে ডুকরে কাঁদলাম। চোখ প্রেস্টিতে ছিদলে পড়ে গেছে। শরীল থেকেও একটা পচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। মাংস পচলে এমন বিটকেল গন্ধ হয়। লোকে কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলে, শালা কালুর ঘোড়াটা যাচ্ছেতাই ইল্লত! ইল্লত হবই বা না কেন? কতদিন গোসুল করা নেই। পুকুরঘাটে একটুখানি গা চুবড়িয়ে ডুব দেব তারও জো নেই। মানুষজনে ছ্যা ছ্যা করে তাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া আমার নিজস্ব একটা ভয়ও আছে। যদি পাড়ে আর উঠতে না পারি! একবার হড়কে গেলে এ জিন্দেগী হালাল হয়ে যাবে। অথচ কালুর বাপ আতর যখন আমার গায়ে হড়হড় করে বালতি বালতি পানি ঢালত, সাবান ঘষে কচলে কচলে দিত গায়ের লোম, তারপর রোদে শুকিয়ে গা-গতর যখন পাকা করমচা ফলের মতন চিকনাই মারত তখন আতর পিঠে হাত বুলিয়ে বলত, আমার রাজপুত্তুর। 

এক আধবার ভাবি, মরে গেলেই তো বেঁচে যেতাম। এই নরক জীবন আর সয়তে হত না। তবুও মরতে ইচ্ছে করে না। এই দুনিয়াদারীর ওপর কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। এই মাঠঘাট নদীনালা মানুষমুনিষ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। এখন না হয় ছি ছিক্কারি পাচ্ছি, কিন্তু একসময় ভালোবাসা তো কম পাইনি। কালুর বাপ প্যাটের ছেলের থেকেও আমাকে বেশি যত্ন-আতির করত। আমি শুধু তুষ খেতে চাইতাম না বলে মানুষটা প্রত্যেক হাটে বস্তা ভর্তি করে ছোলা কিনে আনত। দাম আক্রা হলেও বস্তা খালি ফেরত আসত না। যেদিন খ্যাতাল ভালো হত, সেদিন কাঁচা বাদামও ভিজিয়ে দিত। আতর বলত, যার লেগি সংসারের হিল্লে হচ্চে তার হিল্লে আগে না কল্লে হয়? ঘোড়াটার ঘাড়ের ওপর ভর করিই তো আল্লা আমাদের রুজি পাঠাচ্চে। 

খোঁড়া পা’টা নেংড়ে কোনমতে কান্টার দিকে ঢুকলাম। হাড়গিলে শরীরটা অনাহারে অপুষ্টিতে চামটা হয়ে যাওয়াই শরীরের ওজনও শুকিয়ে এক পোয়া। ফলে পায়ের খুঁড়ে আর সেই যৌবনকালের শব্দ নেই। গরুর বাছুরের মতো ঠ্যাঙা পা চারখানা ল্যাকপ্যাক করতে করতে কালুর বাড়ির কান্টার ভাড়ুল গাছটার আড়ালে দাঁড়ালাম। পড়ন্ত বিকেলের সিঁদুর রাঙা সূর্য তখন ভাড়ুল গাছটার মগডাল নুইয়ে জসীম হাজির বাঁশঝাড়ের আড়ালে কোল নিয়েছে। আর কিছুটা রোদ ঝরলেই খপ করে মাতিনদের আমনধানের ভুঁইয়ে লুকিয়ে পড়বে। আন্ধারই ভালো। সঞ্ঝে নামুক। গা ঢাকা দেওয়া সুবিধা হবে। পিটুলির ঝোপে গা লুকিয়ে চারপাশ জরিপ করলাম, পাশের আব্দুল্লার বাড়ির মাদি কুত্তাটা আশপাশে আছে কি না। খানকি কুত্তাটা দেখলে পরে হয়, ঘেউ ঘেউ করে পাড়া মাথায় তুলবে। ওরও আয়ু ফুরিয়ে আসছে। এবার তিন বিহেনে পড়বে। রসকষ শুকিয়ে ত্যানা হয়ে যাবে। তখন রাতে শেয়াল তাড়াতে না পারলে ব্যাটা আব্দুল্লা ওর পাছায় পান্ঠির বাড়ি দিয়ে বাড়ি ছাড়া করবে। লেজটায় আলতো করে ভর দিয়ে বেড়ার দিকে চোখ ফেললাম, কোন লোকটোক ঘুরঘুর করছে না তো! লেজটায় বেশি ভার দেওয়া যাবে না। হেসেতে কাটা ঘা’টা পাছা পর্যন্ত ছ্যাড়ড়া হয়ে গেছে! বাহিঞ্চত লোকগুলোও তাই, আমি কী যে ওদের সর্বনাশটা করেছি, আমাকে দেখলে পরে হয়, পাছার কাপড় তুলে হেই হেই করে তেড়ে আসবে! 

মানুষটাকে একদন্ড চোখের দেখা দেখার লেগে মন ছু ছু করে। এই আতর লোকটাই তো আমার বাপ মা। আমাকে খাইয়ে পুষে খেটনে করেছিল। আদর করে নাম দিয়েছিল, ‘শাহজাদা’। অনেকে তো আবার ঠাট্টা করে বলত, আতরের দুই ব্যাটা, এক কালু আর এক ওই লাল ঘোড়াটা। আমিও সংসারটায় কম ঘাম দিইনি, একেবারে গা ডুবিয়ে রাতদিন এক করে খেটেছি। তখন আতরের গায়েও যেমন দুই মুনিষের দোম, আমার দেহেও দেড় মোষের বল। আসমান ছুঁয়া ধান পাটের বোঝা গাড়ি ভর্তি করে গড়গড় করে টানতাম। কি কাদা কি পানি, খেটে খেটে নাক মাটিতে ঠেকিয়ে দিয়েছি। এক আধবার এলে ঝিমিয়ে পড়লে, মনিব আতর গাড়ির চাকায় চাবুক ঠেকিয়ে খড়খড় শব্দ করত আর অমনি আমিও অদ্ভুত ভাবে গায়ে বলদের শক্তি পেয়ে যেতাম, টমটম করে ছুটাতাম বোঝাই গাড়ি। মনিব আতর তখন গলা ছেড়ে সুখের গান করত। 

মানুষটাও ভালো নেই। অসুখ কবেই মারণ থাবা বসিয়েছে শরীরে। তার ওপর ব্যাটা আর ব্যাটার বৌ’র নিত্য মুখঝামটা খাওয়া, জন্মদাতা বাপকে কুকুর শেয়ালের মতো ব্যবহার করা, মানুষটাও আমার মতো না মরে বেঁচে আছে। বৌ মরা লোকটার হাল দেখে আমার এই ধুকপুক করতে থাকা আধমরা জানটাও টাটিয়ে ওঠে। বয়স যেমন আমার শরীর থেকে বল-শক্তি কেড়ে নিয়েছে তেমনি মানুষটার শরীর থেকেও তো খেটনে ক্ষমতাটা কেড়ে নিয়েছে। অথচ এই লোকটার দেহে কি বল ছিল! একাই বোঝা বোঝা মাল পাক সেটকে ঘাড়ে তুলে নিত। এক ঝটকায় তাগড়া তাগড়া পাটের বান্ডিল গাড়িতে তুলে ফেলত। কোনদিনও বোঝার ভারে কুঁত পেরে পাদ বের হতে শুনিনি। সবাই বলত, আতরের ঘাড় পাটা দিয়ে গড়া। আমি তখন আত্মঅহংকারে চিহি করে উঠতাম। মানুষটাও বুঝতে পারত আমার আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠাটা। সে তখন আলতো করে আমার লেজে আদর মাখিয়ে দিত। আমি লেজ নাচিয়ে টমটম করে ছুটতাম। আমার খুঁড়ে লাগানো লোহার বেড়িগুলো তখন আরও জোরে খটখট করে উঠত। গলায় পিতলের ঘুঙুরগুলো ঝনঝন করে শব্দ তুলত। মাথার বাহারি ফুলগুলো কৃষ্ণচূড়ার ফুলের মতো দুলত। তখন আসমানের ফেরেশতারা আমাকে দেখে হিংসেই জ্বলত। 

লুকিয়ে ছুপিয়ে কান্টার ঝাঁপিটার আড়ালে থির হয়ে দাঁড়ালাম। পাটকাঠির ফাঁকে ফাঁকে তখন মিহি করে জমছে ঝুঝকি। আলো-আঁধারি চরকা কাটছে উঠোনটায়। গায়ে একটা শুকনো পিটুলির ফাংড়ি ডাল আটকে গেছে। এদিক ওদিক গা ঘষটে লেজ ঝাপটেও ডালটা পড়ল না। বেশি লটকাঝটকাও করলাম না। পাছে কেউ টের পেয়ে যায়। অগত্যা ডালফাল গায়ে জড়িয়েই বেড়ার ফাঁকে প্রেস্টি পড়া চোখদুটো আড় পেতে রাখলাম। ভেতরের খড়ের চালের ঝুপড়ি ঘরটা থেকে কাশির একটা খক শব্দ কানে এল। বুঝলাম, বড় মনিবটা বাড়িতে আছে। চোখদুটো আরও ফেড়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম, আতর মনিব হাড়জিরজিরে পাদুটো দ করে বসে খক খক করে কাশছে। দুই হাঁটুর ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছে জুবুথুবু মাথাটা। বুঝলাম, বয়সের থাবায় আমি যেমন পাঁচ পেয়ে জন্তু হয়ে গেছি, আমার বড় মনিবটাও তিন পেয়ে মানুষ হয়ে গেছে। মানুষটার চোখগুলো খুঁটলে ঢুকে টিপ্পি হয়ে গেছে। ঘুষ ঘুষ করে হাঁপাচ্ছে। জানটা যেন কন্ঠে ধুকছে। যে কোন সময় আজরাইল ছোবল মারল বলে। মানুষটার কষ্ট দেখে আমি আর থির থাকতে পারলাম না। ঢুস করে মাথাটা বেড়ার ফাঁকে ঢুকিয়ে দিলাম। খড়খড় করে একটা বিকট শব্দ হামলে উঠল। শব্দটা আতরের কানে গেল। সে ঝুপড়ি ঘরের উশরা থেকে ঝাপসা ভারি চোখ তুলে আমাকে দেখেই ভ্রূ টান করল। কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশের পাকা ঘরটার দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে জোরে জোরে খকখক করে কাশতে থাকল। আমি যত ভেতরের দিকে ঢুকতে যাই, বড় মনিব তত জোরে খকখক করে ওঠে। আমি এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, কাশির ইশারায় বড় মনিব আমাকে পালিয়ে যেতে বলছে। বেড়ার ফাঁকে ঢুকিয়ে রাখা আমার আধখানা মাথাটা বের করে বেড়ার আড়ালে রাখতেই ছোট মনিব কালুর খেসেল বৌ’র খ্যাঁকানি কথাটা ভেসে এল, “ঘুড়াটার মুতন এই বুড়েটাও বাড়ি থেকি গ্যালে বাঁচত্যাম।“ 



সৌরভ হোসেন 
গল্পকার
গ্রাম-দস্তুরপাড়া ; ডাক ও থানা-হরিহরপাড়া ; জেলা- মুর্শিদাবাদ। পশ্চিমবঙ্গ। 

HARPARA ; DIST.-MURSHIDABAD; PIN-742166; PHN-9733779075, email;

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন