মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

জয়া চৌধুরী : গল্পের কাছে কী চাই



অনেক ভেবেছি এর কোন স্থির উত্তর হতে পারে না। সচেতন পাঠকের মানসিক বিচক্ষণতা শিক্ষা ইত্যাদির পরিবর্তন হতে থাকে গোটা জীবন জুড়ে। অচেতন পাঠক শুরু থেকে শেষ একই ধরনের পছন্দ নিয়ে বাঁচে। তাদের জড় পাঠক ভাবি। আবার পাঠকের স্পৃহা যে দিকে সেটির সঙ্গেসংস্কার বা পরিবেশের প্রভাব থাকে, এ কথাটিই সত্যি হলে মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মত সমাজের লেখাপড়াহীন তথাকথিত শৃঙ্খলা সংযম বেষ্টনের বাইরে থেকে আসা একজন মানুষের ভেতর পড়ার এত খিদে তৈরী হতে পারে না। তিনি তো আগে পাঠক তারপরে লেখক হয়েছেন। যতদূর জানি রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড় মঠের ত্রয়োদশ প্রেসিডেন্ট স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী ক্লাস এইট থেকে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে আসেন। কিন্তু সারাজীবন পড়ে গেছেন। দর্শন বিজ্ঞান ইতিহাস রাজনীতি ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে তার অগাধ পড়াশোনা ছিল। গল্প পড়ার ইচ্ছেই সম্ভবত ওঁর হয় নি হয়ত। তাই পড়ার অভ্যাস থাকলেই হবে না যারা গল্প পড়েন তারাই বিশেষ অধিকারী গল্পের কাছে কী চান সেইটে জানানোর। ব্যক্তিগত ভাবে আমার একেবারে শিশুকাল থেকেই গল্প ইত্যাদি সব কিছুর পাশাপাশি প্রবন্ধ পড়ার দারুণ ঝোঁক ছিল। এখন বয়স বাড়াতে দেখি ওটি প্রথম পছন্দে চলে এসেছে। 

গল্প কি তবে মায়া? এর জগত কি মায়ার জগত, যেখানে লেখক ও পাঠকের মিলমিশ করে থাকতে চায়! চমক ভাঙলে মায়া থেকে তবে বের হয়ে আসতে ইচ্ছে করে না? প্রথম দিকে গল্পের কাছে পরিণতি চেয়েছি, নিটোল ঘটনার চলাচল যার শেষে একটি উদ্বেগের অবসান ঘটে। আবার অতি আধুনিক সাহিত্য হিসাবে দেশী ও হিস্পানিক যেসব সাহিত্য পড়ি সেখানে দেখি গল্পের চলনের স্টাইলের ওপর মন যায়। আবার তার মধ্যেও আমারকাছে ওই দুনিয়াটি যেহেতু অপরিচিত তাই তার পারিপার্শ্বিক খুঁটিনাটি জানতে আগ্রহ হয়। সমাজের কাঠামো লেখকের মনে ছাপ ফেলে। গল্প এখন লেখা হয় একক দুনিয়ায়। যেখানে এককভাবে লেখক সব কটি ঘটনা ঘটায় বা ঘটনার ফল ভোগে। 

ঘুরে ফিরে কেন আমাদের মন সেই বিভূতিভূষণ দস্তয়ভস্কি রবীন্দ্রনাথ আশাপূর্ণা মপাসা খুঁজে বেড়ায় সেটিকে তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে সেসব গল্পে পরিবেশ চরিত্র হয়ে থাকত। খিমেনেসের প্লাতেরো গাধাই শুধু নয় দোন কিখোতের রোসিনান্তে ঘোড়ার গুরুত্বও লেখকের সম মর্যাদা পেত। অর্থাৎ লেখকই একমাত্র ঘটনার উদ্দেশ্য থাকত না। 

মানুষ যেভাবে প্রকৃতিতে মিশে টিকে রয়েছে এত হাজার বছর, সে গল্পগুলিও ঠিক তাই। প্রাণের গল্পে প্রকৃতির বুকে রাখা গাছ ঘাস জন্তুজানোয়ার পোকামাকড়ের মত মানুষও একটি উপাদান হয়ে থাকে মাত্র। ঘটনার চালক বা ভুক্তভোগী একমাত্র লেখকই থাকে না। স্পেনের বা হিস্পানিক সাহিত্যে এখন যন্ত্র ভিত্তিক লেখার খুব ঝোঁক। আর ছড়াছড়ি ইনভেস্টিগেশনের। গোয়েন্দার মত কোন অনাবিষ্কৃত অধ্যায় তুলে আনেন লেখক। এটি খারাপ বা ভাল এভাবে এক কথায় বলা কঠিন। সারা পৃথিবীর সাহিত্যেই এখন কল্প বিজ্ঞান আর গোয়েন্দা গল্প লেখা ও পড়া দুটোই তুঙ্গে। কেন? কারণ বিচক্ষণতা ক্রমাগত নিম্নগামী। বুদ্ধির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়াতে মননের গুরুত্ব কমে গেছে। ঘটে যাওয়া ঘটনার হেস্তনেস্ত করতে সে বেশি আগ্রহী। 

গল্পের কাছে আমি অন্তত ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা শুধু নয় তার প্রেক্ষিতে মন্থন করে আনা দর্শন খুঁজে ফিরি, চাই স্বস্তি। আবার অস্বস্তিও যদি থাকে কুছ পরোয়া নেই, মুক্তির সম্ভাবনা থাকতেই হবে। ভাবনার মুক্তি। নিজেকে খাঁচায় আটকে ফেলতে দেখলে মনে করি অসার্থক গল্প। তার ভান ভণিতা যতই চিত্তাকর্ষক হোক, অজানা দুনিয়ার হোক তবুও সেই নবলব্ধ জ্ঞানের দুনিয়াতেও ভাবনার ভবিষ্যৎ যেন থাকে।

1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার অনুবাদ অসাধারণ ও যেসব গল্প অনুবাদ করেছেন সেসব আরো আরো অসাধারণ। আপনাকে ভালোবাসা। 🌻

    উত্তরমুছুন