মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মধুময় পাল'এর গল্প : গীতিনাথ


গীতিনাথ, আজ সকালে আপনাকে মনে পড়ল। হঠাৎই। তেমন কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। এই নয় যে আপনাকে নিয়ে কোথাও কথা হয়েছে বা কথা বলেছি। এই নয় যে আপনার লেখা পড়েছি। এমনও নয় যে কারও গান শুনে আপনার গায়কী বেজে উঠেছে। রেণু, মাধবীরাও অনেককাল আসে না যে আপনার কথা হতে পারে। তবে এমনটা হয়তো ঘটেছে, ভেতরে ভেতরে আপনাকে বহুদিন ধরে জড়ো কবছিলাম 

আমারই অজান্তে। আপনি একটু একটু করে আসছিলেন আমি টের পাইনি। কতটুকুই বা টের পাই আমরা আমাদের মনের চলাচলের । 

বদরি পাখিরা ডাকছিল দেওদারে। আমার ঘুমের জানালায় দেওদার। কাল বিকেলে আকাশ কালো করে ঝড় হল। স্টেশনে লাগানো হার্টের ডাক্তারবাবুর বিশাল ফ্রেক্সটা উড়ে উড়ে ওলাবিবিতলার জলায় পড়ল। জলার বস্তি তখন দাপাচ্ছিল উল্লু গানের ডিজে। এক এলোচুলো জ্যোতর্বাণীমাতার আবির্ভাব তিথি। কালবৈশাখী এল অনেক অনেক দিন পর। কবে যেন শেষ কালবৈশাখী এসেছিল, ভুলেই গিয়েছি। খেলার 

মাঠের মতো আজ আর নেই শৈশব আর কালবৈশাখী। মনে পড়ে, ইস্কুলমাঠে দীপুর সাইকেল গোলপোস্ট থেকে ছুটে গিয়েছিল বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। বারান্দা থেকে চিৎকার করলেন হেডস্যার, সাইকেলে ওটা কে? কে ওটা? আমার চক্ষুরে ফাঁকি দিতে পারবা না। সাইকেল তখন টাল খেতে খেতে ছুটছে। সমম্বরে আমরা বলে উঠলাম, কে, স্যার? কেউ নেই তো! হেডস্যার বললেন, আছে, আছে। দেখতে পাও না, 

বুঝতে পারো না। একদিন বুঝাবা। জ্ঞান হোউক। সাইকেলে শক্তি চড়ছে। গীতিনাথ, আমাদের বাংলাস্কুল এখন বড়ো নির্জন। দেওযালথামসিঁড়ি যেন শোকের ঘরবাডি। মাঠটা কুঁকড়ে একটুখানি হয়ে আছে। তো, কালবৈশাখী ধুয়ে ঝকঝকে করে দিয়েছে দেওদার। তার ডালে ডালে পাতায় পাতায় বদরি পাখিরা খুশির পরবে। আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, এত পাখি আছে? বলি, আমাদের বাড়ি থেকে চার-পাচ ক্রোশ দূরে মাইল-মাইল আমবাগান কেটে দু-চার একরের বিনোদন পার্ক হয়েছে। নাম ‘আম্রকুঞ্জ’। সেই নিহত বাগানের আত্মীয়দের কয়েকজন আমাদের কলোনির অবশিষ্ট গাছে ঠাঁই নিয়েছে। গীতিনাথ, আপনি তো জানেন, উন্নয়ন নিজের কথা ছাড়া কারো কথা ভাবে না। পাখিরা কোথায় যাবে? মানুষ বাতাস কোথার পাবে? জল কোথায় পাবে? শিশুরা অজানা ব্যাধি নিয়ে জন্মাবে? এসব প্রশ্নে পলিটিক্স খুঁজবেন না, প্লিজ। আমরা স্বাধীনতার উদ্বাস্তু, পাখিরা উন্নয়নের । 

দেওদারের ডালে পাতায় বদরিদের কলরবের মধ্যে জেগে উঠে আপনাকে মনে পড়ল। আসুন একদিন। যেকোনোদিন। 

কে যেন এলো। কড়া নাড়ছে। এখনও তো ঠিকঠাক বেলা হয়নি কারও দরজা খটখটানোর। এমন কোনও খবর কি আছে যা নিজেই,খটখটিয়ে ওঠে। না, আমার জন্যে তেমন কোনো খবর বা ঘটনা বা পরিচয় বা প্রয়োজন নেই। কিছুই নেই। নেই বলেই ডোরবেল লাগাইনি। এখন কত রকমের ডোরবেল বেরিয়েছে। টিপে দিলে বিদেশি বাজনা বা হনুমানচালিশা। হাইরাইজে এরকম বেল ভুরভুরাচ্ছে। কড়ানাড়ার শব্দে 

আমি বেশ একটা প্রাচীন গন্ধ পাই, বেশ একটা মনের আত্মীয়তা পাই, পদাবলি বা মঙ্গলকাব্যের সুর পাই। আপনি বলবেন, আমার আদিখ্যেতা। বলবেন, সত্তর দশকে এই বাংলায় রক্তখেকো কুকুরের মতো পুলিশেরা কড়া নেড়ে নেড়ে তরুণের যুবকের লাশ নিয়ে গেছে এপাড়া ওপাড়া থেকে, মায়ের কান্নায় লাথি মেরেছে লোহার বুটের, ঝলসে দিয়েছে প্রতিবাদী বাবার চোখ। আপনি বলবেন কুকুরপুলিশের পোষা কুকুরগুন্ডারা কম যায় কীসে? ওরাও তো কড়া নেড়ে উৎকট উল্লাসে মোড়ের মাথায় মদমাংসের স্বাস্থ্যকর মজুরি খেয়েছে। ঠিকই বলেছেন। একদম ঠিক। আমার কেন জানি বড়ো সত্য মনে হয় মায়ের হাতে কড়ানাড়ায় ‘খোকা, দরজা খোল’ ডাক। কিংবা রেণু যখন প্রথম এ বাড়িতে এসেছিল, কলেজ পালিয়ে, এক দুপুরে, টিপটিপ বৃষ্টি ছিল, আকাশ অবশ্য তেমন মেঘের নয়, স্পষ্ট মনে আছে, ডেকেছিল কড়া নেড়ে, বলেছিল ‘আমি রেণু’, সেই বলা বড়ো সত্য মনে হয়। রেণু নেই তো কী হল কড়ানাড়ার সেই শব্দ আছে। কিংবা মাঝরাতের কাছাকাছি বাড়ি ফিরে কড়া বাজিয়ে দেখেছি আমের বোল মধু ঝরিয়ে বলে, ‘আমি জেগে আছি।’ 

গীতিনাথ, আমি আসছি। কে যেন এলেন। কেউ এলেন? কেউ কি এলেন? দরজার ওপারে কোনো শব্দ নেই। দরজার ওপারে কেউ নেই। কাঠের দরজা। আগেকার। বেশ ভারি। আমার বাবার ঠাকুর্দা নাকি কাঠের পাটা জুড়ে জুড়ে এই দরজা বানিয়েছিলেন কীর্তন কারিগরকে ডেকে। কাঠ কেটে কেটে লতা পাতা আলপনা তুলেছিলেন খুলনার কারিগর। তেল চকচকে ঢেউখেলানো বাবরি চুল নেচে নেচে কাঠের বুকে খেলা করার সময় নাকি প্রেমের নুপুর বাজত বাতাসে। ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করেছি। জবাব পেয়েছি, অতিসাইরাগো খিদা মিটে না। ঠাকুমার গলায় খাগড়ার কাঁসার ঝানঝানা ছিল। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ আসেনি । কে তবে কড়া নাড়ল? নিজে কড়া বাজিয়ে প্রাচীন গন্ধের ভেতর হেঁটে যাই। ডাকি, মা, এসে গেছি। বলি, মা, রেণু এসেছিল? 

একদিন চলে আসুন, গীতিনাথ। না, ফোন করার দরকার নেই। সেলেবটেলেব নই। কোনো ব্যস্ততা নেই। আপনি হয়তো বলবেন, কে সেলেব? কীসের সেলেব? কীসের ব্যস্ততা? ওসব টপলা। ভোর থেকে এর ওর পা চেটে বেড়ায়, আবার ব্যস্ততা মাড়ায়! "মাড়ায়” শব্দটির ‘ড়’ উচ্চারিত হবে 'ঢ়'এর মতো। দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় আযাঢ়, কোথা হতে পেলি ছাড়া'-র সেই ‘ঢ়’ । আপনি রাগ করলে শব্দের ভেতরে তা 

উচ্চারিত হয়। আপনার রাগের কথা মাঝে মাঝে ভাবি। কে যেন বলেছিল, বাংলা জুড়ে ছেলেমেয়েরা এখন কথায় কথায় লিঙ্গ ছিটোয়। পথে বাসে ট্রেনে বাড়িতে ইস্কুলে কলেজে একাডেমিতে বিধানসভায় পুজোর মন্ত্রে শ্রাদ্ধকর্মে-- সর্বত্র। শুনে আপনি জবাব দিয়েছিলেন, ঘুম ভাঙা থেকে ঘুমে যাওয়া তক, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তোমরা আমার লিঙ্গকে ঠাটাবে, ঠাটাতেই থাকবে, আর আমি লিঙ্গটি চন্দনবাটায় ভিজিয়ে 

রাখব, সে কি হয়, আলুদা? ওটা রাগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ। বিস্ফোরণ দেখেননি! সভ্যতার শেষতম খিস্তি আছড়ে আছড়ে পড়ে। সমাজটা বদলাতে পারে না তো! লিঙ্গযোনিলালাবিষ ছুঁড়ে দেয় সমাজব্যাওড়াদের তাক করে। আমার পাড়ার চোরা এবং লম্পট কাউন্সিলরকে যদি রেন্ডির ফ্যাতাচাটা বলি, সেটা কোনোভাবেই অশ্লীল হতে পারে না। খিস্তি সামাজিক ধর্মে সামাজিক রাগের ভাষা হয়ে ওঠে। 

গীতিনাথ, হঠাৎ মনে পড়ল, রেণু বলেছিল, যদি কখনও আপনাকে ডাকতে হয়, একটা গান গাইবে। ‘বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’ । গাইলে আপনি ঠিক শুনে নেবেন। যদি গাইতে না পারো, যেমন পারো গুনগুন কোরো। রেণু বলেছিল। শুনে হেসে ফেলি। এটা কী হয়? তবু পুরোপুরি অবিশ্বাস করিনি। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি সত্যি বলছি, গান গাইতে যদিও পারি না, ভুলভাল 

সুরে গুনগুনও করিনি। নিজের কাছে আরও একবার বোকা হয়ে যেতে চাইনি। আবার ভেবেছি, এমন হয় যদি চলে আসেন, আমি কোথায় দাঁড়াব? আমার বাস্তববাদ থেকে ছিটকে কোথায় পড়ব! এই যে সিঁড়ি দোতলায় উঠে সোজা পড়ার ঘরে এগিয়ে দেয়, এইখানে বলেছিল রেণু। গেয়েছিল। সুরে সুরে জড়িয়ে একটা আকুতি ছড়িয়ে দিয়েছিল। ‘একাকী বাহিতে তারে পারি না যে আর’। ‘এখনও যা কিছু আছে তুলে লহ তবে কাছে/ রাখো এই ভাঙা নায়ে চরণ তোমার'। সেই তরণী, সেই ভাঙা নৌকো দেখতে পেয়েছি। রেণুকে কী ভীবণ আদর করতে ইচ্ছে করেছে, পারিনি। রেণু চলে গিয়েছিল। 

কেন জানি মনে হয় কোথাও আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে। একবার নয়, একাধিকবার। সন্ধের পর খাওয়া হবে বলে দুপুর থেকে মদের বোতলকে সে কী আদর আপনার । কথার ফাঁকে ফাঁকে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে, এমনকি বাজারফেরত খুচরো গুনতে গুনতে আপনি উঠে যাচ্ছেন টেবিলের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মদের বোতল। তার গায়ে হাত বোলাচ্ছেন। চুমু খাচ্ছেন। বোতল তো নয়, প্রেমিকা 

আপনার । দাড়ির ঘষায় মদের তরুণী কি বলে উঠল, আহ্। তাতে কী, আপনি দিলেন আরও বেশি করে ঘষে । আমি যেন আপনাকে দেখতে পাচ্ছি পারস্যের কোনো পানশালায়। খানিক বাদেই, সূর্য পশ্চিমে গড়ালে, রমণীয় আঁধার সেজেগুজে এলে, বাতাসে বাতাসে পানশালা বসে যাবে, এসরাজ বাজাবেন বিভাস ভট্ট, আপনি জানেন, তবু তর সয় না, আবার উঠে গেলেন আদর করতে, বোতলের কাঁধের ঢালে গাল 

ঘষতে। চুপচাপ এককোণে বসে প্রেম দেখি। প্রেমের শব্দ শুনি। হাসির শব্দ শুনি। টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসে। মদের তরুণী কি কিছু বলে? পানপাত্রে কয়েক চুমুকের পরই আপনি গীতবিতান হয়ে যান। একের পর এক। যারা এসেছে আসরে, তারাও গায়, যে যেমন পারে। এসরাজে বিভাস ভট্ট পাগল করে দেন, 
'বিধুর বিকল হয়ে খ্যাপা পবনে/ 
ফাগুন করিছে হা হা ফুলের বনে/ 
আমি যত বলি তারে এবার যে 
যেতে হবে/ 
দুয়ারে বলে না না না। 
আপনি উঠে দাঁড়ালেন। দু হাত বাড়িয়ে গাইলেন, ‘ও যে মানে না মানা'। গাইতে গাইতে গলা চড়িয়ে বললেন, রবীন্দ্রনাথকে যারা আক্রমণ করে তারা ফাসিস্ত। রবীন্দ্রনাথের জীবন নিয়ে যারা রগরগে লেখে তারা ফাসিস্ত। আবার ডুবে যাবেন গানে। রবীন্দ্রনাথের এত গান আপনার মুখস্থ। কত লোক কত কম জেনে বাজার ঝিংচাক করে আছে। 

বদরির দলের পরব কখন গেছে। খেতে হবে তো। খাবার জোগাড়ে যেতেই হয়। কেউ নেই তো দেবার। কেন দেবে। মাঝে মাঝে একটা দুটো উড়ে উড়ে আসবে। আবার উড়ে যাবে। মা, শুনছ। চা দেবে? ভীষণ ইচ্ছে করছে। তোমার চা-পাগল ছেলেটা ডাকছে। কত মাঝরাতে জ্বালিয়েছি। বলতে, খোকা, মুখ টকে যাবে। গলা-বুক জ্বলবে। এখন শুয়ে পড়। কাল ভোরে ডেকে দেব। ঘুমোও বাবা। কে কার কথা শোনে। 

মা! সিঁড়ি দিয়ে ডাক নেমে যায়। মায়ের কাছে আর পৌঁছাতে পারে না। রেণু, অনেক বেলা হল। চা দেবে? কেউ উত্তর দেবার নেই। থাকে না। ডাকতে ভালো লাগে। কড়া নাড়ল কেউ? মাধবী আসবে না। যদি আসে। ওকে চাওয়াটা কড়ানাড়া হয়ে বাজুক। 

গীতিনাথ, মাধবীর কথা যখন উঠল, বলি। ও আপনাকে কী যে চেয়েছে, আমি ঠিক বুঝেছি। ছোটো একটা ঘটনা বলি। হয়তো ছোটো নয়। শীতের বিকেল তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। দোতলার বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে মা পড়ছিলেন তারাশঙ্কর । হাঁসুলি বাঁকের উপকথা। বললেন, খোকা, আলোটা জ্বেলে দিবি। পানকৌড়ি ডেকে উঠেছিল সপরিবারে। পুকুরের ওপারে মন্দিরে ঘণ্টা বেজেছিল। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। মা অবাক গলায় বললেন, মাধবী, কখন এলে? 'এই তো, আপনি আলোর কথা বললেন’ বলে মায়ের পাশে বসেছিল। দরজা কি খোলা ছিল? কড়া বাজেনি। মা বললেন, যাও, খোকার সঙ্গে গল্প করো গিয়ে। সেই সন্ধ্যায় কথায় কথায় আপনার উপন্যাস ‘শোনো গো দখিন হাওয়া’র প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। উপন্যাসের, নায়ক বলব না, প্রধান চরিত্র সিদ্ধার্থ নামের যুবককে কেমন লাগে জানতে চেয়েছিলাম। যুবকটি ভালোবাসে আর পালায়। এই নয় যে ভোগ করে পালায়। আমাদের গল্পে উপন্যাসে সিনেমায় সিরিয়ালে ওটা খুব চলে। পাবলিক চেটে খায়। আপনার সিদ্ধার্থ শরীর- সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে। শরীরকে ভয় পায়। নিজের মতো করে ভয়ের যুক্তি তৈরি করে। আর পালায়। অদ্ভুত ছেলে। খ্যাপাটে। মাধবী লেখাটা পড়েছে। এমন করে তাকালো, সাদা-কালো বাংলা ছবির নায়িকা যেভাবে অবিশ্বাস আর বিষাদ জড়ানো চোখে মুহূর্তের জন্য ভেসে ওঠে, ঠিক সেইভাবে ভেসে-ওঠা মাধবীকে দেখেছিলাম। প্রশ্ন করেছিল, এটা কি বানানো নয়? গীতিনাথ, মেয়েটি আপনাকে ভীষণ চেয়েছিল। 

চলে আসুন একদিন। ফোন করতে হবে না। চিঠি দিতে হবে না। মোবাইলে মেসেজ বা হোয়াটস্আ্যাপ করতে হবে না। আপনি গেয়েছিলেন, ‘পথ দিয়ে কে যায় গো চলে/ ডাক দিয়ে সে যায়/ আমার ঘরে থাকাই দায়।’ রেণু বলেছিল। এসরাজে ছিলেন ছোটোমামা। মধ্যরাতের এক পাগল পথে নেমেছিল। মদ ফুরিয়ে গিয়েছে। পানপাত্রগুলি যদিও ঢলে পড়েছে এ ওর গায়ে, অনেকের একটা কান্না আপনার গলায় তৃপ্তিহীন হয়ে বেজেছিল। রেণুও গেয়ে উঠেছিল তেমনই পিপাসায়, 'আমার ঘরে থাকাই দায়'। কোনো একটা না-হারান দুপুরে রেণুর গলায় শুনেছি। রেণুর সঙ্গে গেয়েছি। সুর থেকে ঢের ঢের দূরে ‘আমার ঘরে থাকাই দায়’ বলে চিৎকার করে উঠেছি। রেণু চলে গিয়েছে। আপনি শুনবেন? ‘বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’ গানটা বেশ শক্ত। অত সূক্ষ্ণ পর্দা হেঁড়ে গলার জন্য নয়। ‘আমার ঘরে থাকাই দায়’ বেসুরে হলেও 

ভেতরের কথাটা ছুঁতে পারি মনে হয়। সেই ছোঁয়া কি আপনাকে ছুঁতে পারবে? 

দেওদারের ওপারে ঠ্যালা-ভ্যানে বিগবাজার এসেছে। ‘যা নেবেন তিরিশ টাকা। মায়েরা, দিদিরা, বোনেরা, বৌদিরা আসুন। দেখে পছন্দ করে যা খুশি কিনুন। দামাদামি করবেন না। একদাম। তিরিশ টাকা, তিরিশ টাকা, তিরিশ টাকা। একদাম। হাতা, খুন্তি, ডালের কাঁটা, পাপোশ, ঝুলঝাড়া, পা-ঘষা, পিঠ চুলকোনো হাত, চুলের ক্লিপ, কপালের টিপ, বাসনমাজা, বিদ্যুৎ বাম, অষ্টোত্তর শতনাম, সাত-সতেরো পুণাধাম, কার 

ঘরে কিবা কাম, আরো আছে, মায়েরা বোনেরা দিদিরা বৌদিরা আসুন, একদাম। পছন্দ করুন, একদামে কিনূন। অডিও বাজছে। পরিশীলিত উচ্চারণে। গীতিনাথ, আমাদের কলোনিতে ঠ্যালা-ভ্যানে বিগবাজার আসে। তবু দামাদামি হয়। মেয়েদের কেনাকাটার সুখ তো ঐখানেই। 

আমাদের পাড়ায় আসা খুব সোজা। এবং মজারও। সকালেই আসুন বা একটু বেলায়। ট্রেন থেকে নামবেন। আপনার বাঁদিকে প্ল্যাটফর্ম পড়বে। নেমে সামনের দিকে হাঁটবেন। প্ল্যাটফর্মের ঢালের কাছে এলে এক ভদ্রমহিলা আপনার পথ আগলে দাঁড়াবেন। বয়স্কা। কালোপাড় সম্ভার শাড়ি। মুখে দারিদ্র্য। অবাক হবেন একমাথা চুল দেখে। সাদা, ধবধবে সাদা । চোখজুড়োনো ঢেউয়ের চুল ঘাড়ে পিঠে ছড়িয়ে আছে। বৃদ্ধা আপনাকে প্রশ্ন করবেন, বলুন তো, আপনিই বলুন, ব্যাংকে আমার দেনা আছে কি? ওরা বলে আমি নাকি ব্যাংকের টাকা মেরেছি। আমি নাকি দে না ব্যাংক। আপনি তো জানেন। বৃদ্ধার প্রশ্নে ঘাবড়াবেন না। একটু হাসবেন। সহানুভূতির হাসি। বলবেন, ব্যাংকের টাকা মারতে খুঁটির জোর লাগে। 

ব্যস, এতেই হবে। বৃদ্ধা হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে ঢেউচুল উড়িয়ে হেঁটে যাবেন। 

এগিয়ে আসুন। লেভেল ক্রসিং। পাহারা নেই। পাহারাদারের পুচকুলি ঘরটা আছে। দরজা নেই। ভেতরে মানুষের বর্জ্য আর দেওয়াল জুড়ে শেকডবাকড়। রেললাইন যে যার নিজের দায়িত্বে পারাপার করে। বাঁদিকে তাকান। একটু দূরে লাট-কে-লাট পাঁচতলা-ছতলা উঠছে। উন্নয়ন। ওইখানে আমবাগান ছিল মাইল মাইল । মিনিট দুয়েক হাঁটলেই দুটো ছেলে আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে। যুবক। ছেঁডাফাটা জিনসের রঙচটা প্যান্ট। গায়ে কালো গেঞ্জি। ঝাঁকামুটে হেয়ার স্টাইল। মানে, কানকো চাঁছা আর মাথার মাঝখানে ঝাঁকা বসিয়ে দেবার মতো গোছা চুল। ওরা বলবে, ওয়েলকাম টু আওয়ার মেডিটেরানিয়ান জোন। এখানে আপনি সব পাবেন। এভবিথিং ইজ অলোয়েজ অ্যাট ইয়োর কল, স্যার । উই ওয়াইপড আউট দা ওয়ার্ড ‘আনএভেলেবেল' ফ্রম আওয়ার ডিকশনারি। ওরা ব্রোশিওর দেবে। প্রথম আট পৃষ্ঠায় খাবার-দাবার আর 

হোটেলের নামের তালিকা। পরের আট পৃষ্ঠায় ব্যাধি আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আর হাসাপাতালের নামের তালিকা। ওদিকে আর এগোবেন না। ওটা উন্নয়নের রাস্তা। ডানদিকে মরা ঝিলের গায়ে কংক্রিটের রাস্তা ধরুন। গান শুনবেন, 'পচন তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে ছুটে আয় কিংবা ‘আয় তবে সহচরী/ দলে দলে পচে মরি।' কালের দাবি অনুয়ায়ী রবীন্দ্রসঙ্গীতে অ্যাডাপটেশন। গান শুনতে পাবেন 'লুঙ্গি পচ পচ পচ/ 

প্যান্টি ফচ ফচ ফচ/তাকিয়া মচ মচ মচ/ খাটিয়া ভচ ভচ ভচ’। আরও আছে। জানা নেই আমার । চলে আসুন। তেমাথায় একটা স্ট্যাচু পাবেন। আপাতত নামহীন। বছরে বছরে নাম পালটায়। যে যত বেশি টাকা দেবে, স্ট্যাচুর নীচে তার নাম লেখা হবে এক বছরের জন্য। হা, একবছরের মেয়াদে। টাকার জোর বেশি বলে একবছরের বেশি হবে না। কোনো পক্ষপাত নয়। সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। পরের একবছরের জন্য আবার 

নিলামে আসতে হবে। এখন নিলামের সময়। এইখানে আমাদের কলোনি। 

আসুন, গীতিনাথ। এই ডিভানে দুজনে বসব। পাশাপাশি। দেওদারের দিকে কখনও পিঠ রেখে কখনও মুখোমুখি গল্প করব। অনেক গল্প। আমাদের গল্পের মধ্যে ফেরির শব্দ ভেসে আসবে। নদীটি এখানে বেশ চওড়া। দুপুরে মনে হবে, ফেরির শব্দ লম্বা ডানায় উড়াল দিচ্ছে। রাতে মনে হবে, শব্দ আপনার নিকটে আসছে। জলের চ্ছলচ্ছল শুনবেন। যেন আপনাকে নেবে। আমি রোজ শুনি। আগেই বলে রাখি, রাতের 

ফেরি সামাজিক নয়। পুলিশ আর অপরাধের ঝুলন পূর্ণিমা। বাদ দিন। আমরা দেখব, দেওদারের ওপারে ভাঙা নৌকোর গলুইয়ে উড়ছে আমাদের হারিয়ে-যাওয়া পতাকা । আপনাকে ডাকব গীতবিতান নামে। রবীন্দ্রনাথের গানের বই তো নয় শুধু, সব ভালো গল্প কবিতা নাটক সিনেমা গানের সম্মেলক নাম। বেণু আসবে, মাধবী আসবে। আপনি এলে ওরা আসবেই। সবাই মিলে গান শুনতে যাব। স্টেশনের কাছে। 

হাতাগোটানো জামা। ক্ষয়ে-যাওয়া রিডের হারমোনিয়াম। একটা পুরোনো শতরঞ্জি। পুরসভার আবছা আলো। অতুলদা গাইছেন। সোনার বাংলা গান। অনেক অনেক আলো। আপনি, আমি, রেণু আর মাধবী গল্প করতে করতে চেলে যাব কলেজ স্ট্রিটে বাংলা বইয়ের খোঁজে, বাংলা ম্যাগাজিনের খোঁজে। 

গীতবিতান, আপনি আসুন। না এলে, না, রাগ করব না। কীর্তন কারিগরের বানানো দরজার কড়া নাড়ব আর কড়ানাড়ার শব্দের ভেতর একা একা হাঁটব আপনি আসবেন জেনে। 


------------------------------------------------------------------- 
মধুময় পাল, ১ শান্তিপল্লি লাইব্রেরি রোড ভদ্রেশ্বর হুগলি; পিন: ৭১২১২৪ ফোন: ৯৮৩০০ ২৭৩৩৪ 

























কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন