মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

শাহাব আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস : পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু--৬ থেকে ১০ পর্ব



৬ষ্ঠ পর্ব 

জানালা দিয়ে চাঁদের জোছনা ঢুকেছে । নাস্তিয়া ঘুমোচ্ছে শিশুর মত কুকড়ে, কিছুটা ফিটাল পজিশনে। ওর মুখটা চাঁদ জোছনায় তরল হয়ে আসা অন্ধকারেও আবছা দেখা যাচ্ছে। কী এক প্রশান্তির ঘুম! গায়ের থেকে ব্লান্কেট সড়ে গিয়েছে। যে সুতির গাউনটি পরে আছে তা সাধারণ সোভিয়েত কারখানায় তৈরী, আহামরি কিছু নয়। কিন্তু রাজকুমারিকে ছেড়া কাপড় পড়ালেও নাকি রাজকুমারির মতই লাগে। নাস্তিয়া ছেড়া কাপড় পড়েনি। তাকে সুন্দর লাগছে। 
সুন্দর সে ভোরের বেলি ফুলের মত। বা পবিত্র সেই ফুলে স্বচ্ছ এক বিন্দু শিশিরের মত!
তার শ্বাস-নি:শ্বাসে উঁকি মারছে বুক। সেই বুকে মেঠো ফুলের মত স্তন-বৃন্ত!

অভ্র অনেক নারীকে নিয়েই সিঙ্গাপুরে কাটিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বিবাহিত এবং জীবন-যৌনতায় অভিজ্ঞ। যারা বিবাহিত নয়, সূর্যমুখি আমের মত তাদের একদিকে সবুজ অন্যদিকে স্বল্প পরিপক্কতার রং। গোঁফ দেখে যেমন বিড়াল চেনা যায়, মেয়েদের সাথে কয়েক মিনিট মিশলেই বোঝা যায় কার ঘড়ায় কতটুকু ফেরোমন।
ঐ মেয়েরা অনেকটা স্বতঃপ্রোনোদিত ভাবেই মেনে নিয়েছে যে একজন পুরুষের সাথে দূরদেশে বেড়াতে গেলে আহার নিদ্রার মত দৈহিকতা ও থাকবে। প্রতিদিন একই রোস্ট খাওয়া যায়না, কিন্তু যাদের খেতে হয়, অন্য কিছু ট্রাই করার অকস্মাত নিষ্প্রদীপ সুযোগ এসে উপস্থিত হলে, তারা ট্রাই করবেনা কেন? আবার শুধু সাধলেই খেতে হবে এবং কোন স্বতস্ফুর্ততা থাকবেনা এমনও কোন কথা নেই। শরীরটাতো সাবান নয়, যে ব্যবহার করলে ক্ষয়ে যাবে। 

নাস্তিয়াই সবচেয়ে কমবয়সী এবং অনভিজ্ঞ একটা মেয়ে। অভ্র কেমন একটা মায়া বোধ করে ওর প্রতি। গতকালই বিশাল একটা ক্যামেলিয়া ফুল দেখে উচ্ছসিত হয়ে উঠেছিল নাস্তিয়া, "দেখো , দেখো কি অপূর্ব একটা ফুল, কি ফুল এটা তুমি জানো?"
লাল টুকটুকে ফুলটা, বিশাল ও অকুমারী, "ক্যামেলিয়া "
"এত সুন্দর ! আমি জীবনে কোনদিন দেখিনি।"

ওর জীবনটা তত দীর্ঘ নয় এবং সে যে দেখেনি তাও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, কারণ রিজান বা মস্কোতে ফুলের মত নারী হয় কিন্তু ক্যামেলিয়া ফোটেনা। রাইবিনা ফোটে, লাল লাল, তুষারের শুভ্রতায় রুশ নারীর লিপস্টিকের মত। কিংবা কে জানে, হয়তো মানুষের রক্তের মত।

চাঁদটা চোরের মত কেন এসেছে ঘরে? কেন ওকে স্ববিরোধী চিন্তায় জাগিয়ে রাখছে রাত?

হ্যাঁ, ওর বাবা খুব সহজে চলে গেছে, কাউকে কোন কষ্ট দেয়নি, মানুষের জন্য খেটে খেটে চুপ করে চলে গেছে। কিন্তু সবাই তো সেটা পারেনা।

একটা বিরাট দীর্ঘনি:শ্বাস বুক দুমড়ে মুচড়ে দেয়। ট্রেনের সিগনালের মত অভ্রের মুডের আপডাউন হয়, সেই কৈশোর থেকেই। কোন কারণ ছাড়াই। কোন কোন দিন সে অসম্ভব ভোরে বা রাতের তিন প্রহরে জেগে যায় কাঠমালতি ফুলের মত সম্পূর্ন ফ্রেশ। গায়ে সিংহের বল বোধ করে। আবার কোন কোন দিন ভীষণ ধূসর ও বিবর্ণ, ঘুঘুর ডাকের মত হু হু-করা মন। বয়েস যত বাড়ছে তত বেশি হচ্ছে মনের এই উর্ধ্ব অধ: পিং পং । বিশেষ করে বাবার মৃত্যু ও পার্টির গ্রুপ থেকে বহিস্কারের পর থেকে । 

অতি আপন জনের মত ছিল ওর কমরেডরা। কখনও ভাবতেও পারেনি শুধু ভিন্নমত প্রকাশের কারণে সবাই এমন পর হয়ে যাবে। বিশ্ব সংসারে নেমে আসবে এমন নিঃসঙ্গতা। বাবা যখন এল তখনও সে ছিল কমরেডদের সাথে, খুব টানাটানির মধ্যে বৃত্তির টাকায়-চলা একজন ছাত্র। অন্যান্য বড়ভাই ও নেতাদের প্রতি অতীব শ্রদ্ধাশীল, পার্টির গ্রুপ মিটিংয়ে খুব সক্রিয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিভিন্ন সময়ে আসা কমিউনিষ্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের নিয়ে মিটিংয়ে সে বক্তব্য রেখেছে বলিষ্ঠভাবে। কথা বলেছে তারই পিতার জিন।

এ তো কারোই অজানা নয় যে, পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার পর থেকেই দোকান-পাট থেকে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য জিনিস-পত্র উধাও হয়ে গেছে। সবকিছু কিনতে হয় ১০-২০ গুন বেশি দামে কো-অপারেটিভ বা "রিনক" ( মুক্ত বাজার) বা "চেলনকিদের" ( হকার) কাছ থেকে । 

অথচ বৃত্তি রয়েছে সেই ৯০ রুবল । কমরেড ফরহাদ যখন বাইরে গিয়ে কাজ করা বা ব্যবসা করা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিলেন,তখন বৃত্তির টাকায় চলা যেত সারা মাস, এখন বড়জোর ১ সপ্তাহ কেঁথে কুঁথে।
অনেকেরই বাড়ি থেকে টাকা আনতে হয় কিন্তু বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ের বাড়িতে সেই সামর্থ্য নেই। জমি বিক্রি করে বা গহনা বন্ধক দিয়ে বাড়ি থেকে কারো কারো মা-বাবা টাকা পাঠিয়েছে সন্তানদের অনাহারের হাত থেকে বাঁচাতে। এই ছিল তাভারিশ গ্রুপের বেশিরভাগ ছাত্রের অবস্থা।

“ছেলে-মেয়েরা বাধ্য হচ্ছে আমাদের ছেড়ে যেতে। পার্টির এ ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন, তা নইলে ওদের বাইরে যাওয়া ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা। সোভিয়েত সরকার ইতিমধ্যেই ব্যবসা বৈধ করে দিয়েছে, কিন্তু পার্টি তা করছেনা।” 

প্রতিমাসেই কমরেডরা আসেন, প্রতিমাসে একই কথা হয় এবং নেতাদের একই প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, "দেশে গিয়ে পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটিতে জানাবো, শিগগিরই খবর পাবেন।"

তিন বছর পরে সেই বিশেষ দিনটি আসে। অভ্রর কক্ষে গোপন পার্টি মিটিং। গোপন, কারণ দুতাবাস এই খবরগুলো বিশেষ করে কোন্ নেতা দেশ থেকে এসে এখানে মিটিং করছে তা জানতে পেলে এন এস আই কে জানিয়ে দেবে। 
অভ্র আগেই রান্না করে রেখেছে। দেশ থেকে আসা ফর্সা কমরেড নুইনা মস্কোর চার-পাঁচজন বড়-নেতাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি বলেন, "অভ্র আপনার জন্য ভাল খবর আছে, পার্টি ছেলে-মেয়েদের বাইরে যেতে এবং দুটা জিন্স এনে বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছে।"

অভ্র সবাইকে খাদ্য সার্ভ করছিল, সে বিশেষ কোন মনযোগ না দিয়েই বলে ফেলে, "অনেক দেরি হয়ে গেছে কমরেড, ছাত্রেরা এখন বৈধ ভাবেই কম্পিউটার এনে বিক্রি করা শুরু করেছে, আনঅফিসিয়ালি সরকারও এটা এনকারেজ করছে, কারণ রাশিয়ায় কম্পিউটার রপ্তানির যে নিষেধাজ্ঞা আছে, তা বাইপাস করে কম্পিউটার আসছে। এখন কেউ আর জিন্স আনায় আগ্রহী হবেনা, কম্পিউটারে মুনাফা বেশি, কম্পিউটার আনতে না দিলে, একজনও আমাদের সাথে থাকবেনা, দেখবেন।"

মস্কোর একজন নেতা বিরক্ত হন, "তুমি কি বলছো অভ্র? কম্পিউটার ? এত টাকা হাতে এলে যে ছেলে-মেয়েদের চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে।"

"টাকা হাতে এলেই যদি চরিত্র নষ্ট হয়ে যায় তবে তাদের পার্টিতে রাখার কি দরকার? আদর্শ, আত্ম সংবরণ, কৃচ্ছতার শিক্ষা এসব কি কিছুই নয় ? পার্টি কি সদস্যদের চরিত্র রক্ষার লাঠিয়াল?"
দেশের প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ কমরেড নুইনা’র মনে হয় অভ্র যেন তার জামার কলার ধরে টেনে অনেকগুলো বিছা ছেড়ে দিয়েছে পিঠে। তার গা জ্বলতে থাকে, ফর্সা মানুষ, মুখ হয়ে ওঠে টকটকে লাল, রাশিয়ার রেড কারান্টের মত। তা তরকারির ঝালে না বিতর্কের তীব্রতায় বোঝা যায়না। উনি মুখ চেপে থাকেন । 

অনাদি কালের আগে পিতার সূর্য-শকট চালাতে গিয়ে ফ্যাইটনের পতনের সময়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ড হয়ে পৃথিবীর বহু মানুষের চামড়া পুড়ে ঘুট ঘুটে হয়ে গিয়েছিল। সেই চামড়া ছিল আমাদের মস্কোর কয়েকজন নেতার। আর মন। দীর্ঘদিন তুষার ধৌত হয়েও তাদের চামড়ায় একফোটা শুভ্রতাও যোগ হয়নি, লাগেনি তাদের মনের কট্টরতায় একটুও দিন বদলের হাওয়া। তাদের চিন্তা চেতনার প্রাচীনতায় জং ধরে আছে, তারা দ্রুত-পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে ধরতে পারছেনা বা চাইছেনা। তারা কি রবীন্দ্রনাথের সেই পুঁথি-বিদ্যায় গজ গজ করা মৃত খাঁচার পাখি? 

অভ্রের ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজমের অপব্যবহারে রাগান্বিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুখের রং বদলায়নি ( চামড়া যে কালো ) কিন্তু বদলে ছিল চোখের রং। নেতাদের চোখে যখন জবা ফুল ফুটে, সেটা বড় দুঃসময়; দুঃসময় মানবতা ও মানবের জন্য।

নেতার চোখে যখন জবা ফুল ফুটে, তখন ট্রটস্কি নামে একজন দু:সাহসি ফ্যাইটনকে হায়েনার মত গলায় কামড় দিয়ে আকাশ থেকে ভূ-পতিত করা হয়। মনেই থাকেনা যে রাশিয়ার বিপ্লবের জন্য ট্রটস্কি হচ্ছে (লেনিনের মতই) খাইবারপাসের বামিয়ান মনুমেন্ট, তাকে হত্যা করতে নেই, সে যত ভিন্নই হোকনা কেন তার মতামত। 

ভিন্নমত আর বিতর্কই হচ্ছে সত্যের জননী, এটা মার্কসেরই উপাত্ত !

কল্পনাই করা যায়না যে, দেশ থেকে বিচ্যুত হয়ে প্যারিসে বড় ছেলেকে হারাতে না হারাতেই ( ট্রটস্কির মতে সেটা ছিল গুপ্তহত্যা ), ছোট ছেলেকে যেতে হয় সাইবেরিয়ায় ফায়ারিং স্কোয়াডে এবং নিজেকে নিহত হতে হয় স্প্যানিশ কমরেডের কুড়ালের আঘাতে । 

অন্য সব যুক্তি-তর্ক-বাগাড়ম্বর বাদ, একজন মানুষ ! একজন ম্যামথাকৃতির মানুষ, তাকে পরিবারসহ এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়া যায় শুধু মত দ্বৈধতার কারণে ? আর এতবড় না হয়ে একজন সাধারণ মানুষ হলেও কি তা বৈধ হয় ?

"আমার মন যে কাঁদে আপন মনে কেউ তা মানে না...."
যাদের মন কাঁদে মানুষের জন্য তারা কি করে এটা মেনে নিতে পারে? কি করে বুঝ দেয় সেই আপন মনকে? নাকি কমরেডদের মন বলে কিছু নেই, মন প্লেটোর একটি ভাববাদী আইডিয়া মাত্র?

সেই ট্রটস্কির খুনী কমরেড ২০ বছর জেল খেটে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক আশ্রয় পায়, তাকে দেয়া হয় "হিরো অব সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্ডার ", ও "লেনিন পদক"। 
খুনী..... কমরেড.... হিরো... লেনিন পদক!

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানব এবং দানব সম্প্রদায় যত ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করেছে , নেতাদের চোখের রক্তজবার বাগানে তারা সব ফুল, "ফুলটা সরিয়ে নাও ... লাগছে !"
একজন কমরেড বলেছিলেন না ? 
কার লাগছে ? নিজের চামড়ায় ? না অন্যের ?

এমনকি ইয়েসিনিন, নাস্তিয়ার প্রিয় ইয়েসিসিন, রিজানের মাঠে হেঁটে, অকা নদীর পবিত্র জলে স্নান করে-আসা সেই মানুষটি, যাকে নিয়ে গল্প করতে করতে নাস্তিয়া কত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো, "যে কবিতা পছন্দ করে তাকে ভয় নেই"-এমন একটা বোধ নিয়ে এবং এখনও ঘুমোচ্ছে সে, এইমাত্র ফিরে শুলো এবং তার বাম হাতটা এসে পড়লো অভ্রের বুকে, সেই ইয়েসিনিনের ছেলেটাকেও 

১৯৩৭ সালে সাইবেরিয়ায়....আহা... অশ্রু , অশ্রু , অশ্রু ।

চলবে 



পেরেস্ত্রইকা ,মস্কো ও মধু শাহাব আহমেদ 
৭ম পর্ব 

নাস্তিয়া ঘুম থেকে উঠেছে, দেখে অভ্র তখনও ঘুমাচ্ছে। ওর ঘুমন্ত মুখে যেন কী একটা অভিব্যক্তি, যেন যন্ত্রনার, যেন রাতভর কেউ তার মাথায় হাতুড়ি পিটিয়েছে। নাস্তিয়ার বয়স অল্প কিন্তু দৃষ্টি ওর চশমাহীন তিক্ষ্ণ। 

জানলা দিয়ে মেঝেতে ঝাপিয়ে পড়েছে সিঙ্গাপুরের ভোরের রোদ। গড়াগড়ি করছে মোটা ও অলস বিড়ালের মত। এই রোদ রিজান বা মস্কোর রোদ থেকে ভিন্ন নয়, একই। শুধু যতদিন পর্যন্ত মানুষ নিজের চোখে তা না দেখে ততদিন বিশ্বাস করেনা, এমন কি কীটসের কবিতা পড়েওনা।

মেঝেতে দাঁড়ায় নাস্তিয়া। নিদ্রার অত্যল্প বসনে ওকে অদ্ভুত আফ্রোদিতির মত মনে হয়। গাউন 

মাত্র উরু মোহনা পর্যন্ত আবৃত করেছে। এরপরে উন্মুক্ত উষা। ঋজু, দীর্ঘ, দেওদারু দেহ। টান টান। ও খুব সাবধানে পা টিপে টিপে বাথরুমে যায়। ওর দীর্ঘ অনম্বর উরুগুলোতে রাশিয়ান জারের রাজ সিংহাসনের জৌলুশ ! কিংবা সেইন্ট আইজ্যাক ক্যাথেড্রালের চোখ ঝলসানো জাঁকজমক। মেঝেতে শুয়ে থাকা অলস রোদ-বিড়াল ওর পায়ে পায়ে দেহ ঘষে মরে যেতে চায়।
আহ্ যৌবন, অদ্ভুত সায়ানাইড যৌবন !

ও দাঁত হাত মুখ পরিস্কার করে বাইরে যাবার লম্বা ড্রেস পরে বের হয়ে আসে।
ঘুমোচ্ছেই অভ্র । 

নাস্তিয়া জানালার পাশে সোফায় বসে বাইরে তাকায়। ব্যস্ত রাস্তায় জীবন টগবগ করছে। গাড়িগুলো ছুটছে ত্রস্ত-ব্যস্ত। একটা গাছ, ঝিরি ঝিরি পাতাগুলো নড়ছে।
একটা কালো কাক বসে আছে। কাকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো, ওর ভারি স্বচ্ছ চোখঃ কা-আ-আ...
আমি তোমাকে ভালোবাসি নাস্তিয়া!
এটা কি অভ্রের কণ্ঠ ? 
না, অভ্র ঘুমোচ্ছে । 
আকাশটা নীল-সাদা, ছেড়া ছেড়া মেঘ।
রৌদ্র !
হে হে হে ! থামো তোমরা! 
থামো! যারা এই মেয়েটিকে বেশ্যা হিসেবে দেখতে ওঁত পেতে আছো। 
সোভিয়েত নারী বেশ্যা নয়, পৃথিবীর কোন নারীই বেশ্যা নয়, রাজনৈতিক নারী ছাড়া।
নারী সুন্দর!

বিশ্বাস হয় না? তাকিয়ে দেখ নাস্তিয়ার দিকে, নাস্তিয়ার ঋজু, দীর্ঘ, উরুর দিকে, যা নিয়ে সে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিল আদম পাহাড়ে! তার পায়ের দাগ আজও আঁকা আছে সেখানে। লোকে বলে আদমের, আমি জানি নাস্তিয়ার!

সে কীটসের স্কটল্যান্ড যাওয়া বালকটিক মত নিষ্পাপ, ( যাকে চিরাচরিত সমাজ নটি বলে ভাবে )। সে শুধু লাল পরিখার বাইরের জগতটা কেমন তা দেখতে গিয়েছে। এটা তার পাপ নয় যে, ৭০ বছর তারা দেখতে পায়নি এই গ্রহটিকে।

অভ্র ঘুমোচ্ছে, গভীর ঘুম। কিছু ব্রেইন ঘুমের মধ্যে বায়োস্কোপ হয়ে যায় এবং সেখানে ঘুরতেই থাকে দৃশ্যের পর দৃশ্য, চিন্তার পর চিন্তা, যন্ত্রনার অনুভূতি, সমাজের হাত-পা কাটা পাপ আর নির্যাতনকারীদের সহাস্য বদন।

কী অসম্ভব দাবানলের বৈশ্বানরে পুড়েছে সে। কী অসম্ভব নীচু খাড়িতে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে তাকে, যে সবসময় তার পিতাকে চোখের সামনে রেখেছে বিবেক ও মানবিকতার মাপকাঠি হিসেবে। কতবছর মস্কোতে সে ছিল তাদের এলাকার পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি, ক্ষেত-মজুর সমিতি, মহিলা পরিষদ, ন্যাপ (মো.),ন্যাপ (প.), একতা পার্টি ইত্যাদির লিয়োজোঁ। অথচ কত সহজে এরা ওকে বের করে দিল। 

"কোন প্রশ্ন নয়, ১০০ % সমর্পন, ১০০ % হাত তুলে ভোট দেয়া"- তা যদি দিতে না পারো তুমি শত্রু, তুমি ট্রটস্কির সহচর, আউট।

ট্রটস্কি হচ্ছে অভ্রের সারাজীবন ধরে জানা একজন বিশাল বিশ্বাসঘাতক। বিপ্লব ও মানবতার শত্রু। আশ্চর্য, শয়তানের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে, তাকে মানবজাতি বলে সন্ত, অথচ সমাজতন্ত্রের সেরা শয়তানের বিরুদ্ধে যে ছিল, তাকে আমাদের পার্টি বলেছে ট্রটস্কি! 

এত কূপমন্ডুকতার 'কুবজলে' মেধার বিকাশ হয় কি করে? মেধা তো চিরকালই ছিল অটোক্রাসির শত্রু। মেধা ও পার্টি কি তবে দুটি পরস্পর বিরোধী জিনিস? পুশকিনের "মোজার্ট ও সালেরি"র সেই দ্বন্দ্ব, যেখানে পুশকিন দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলেন ঃ
"জ্ঞান ও অপরাধ, এই দুটি জিনিস কোনদিন একসাথে চলতে পারেনা" ।
ভুল!
অভ্রের মনে হয় ভীষণ ভুল, পুশকিন একটু বেশি আগে জন্মেছিলেন। 
তার জন্মানো উচিত ছিল বিশ শতকের ২য় বা ৩য় দশকে। তাহলেই দেখতে পেতেন জ্ঞান ও অপরাধ একসাথে কী চমৎকার ট্যাঙ্গো নাচে! বুঝতে পারতেন আকাশটা আদতেই কত নীচু হতে পারে এবং দাঁড়াতে হয় কতটা নুব্জ হয়ে। 

"বন্ধু,বিশ্বাস করো,আসবে সেই দিন , 
ঘুম থেকে জেগে উঠবে রাশিয়া,
এবং স্বৈরতন্ত্রের বিচূর্ন কাঁকরে 
লিখবে আমাদের নাম"

স্বৈরতন্ত্র, মানে রাজতন্ত্র চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলার আহবান জানানো হচ্ছে জারের রাশিয়ায় বসে? এত বড় বুকের পাটা?
এইসব প্রতিবাদী কবিতার জন্য জারেরা লুকোচুরি খেলে, কবিকে কিনতে চায় ভালো চাকরির উপঢৌকন দিয়ে, কবির স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শীষ্ দিয়ে দিয়ে গোপনে ডুয়েলের ব্যবস্থা করে । কিন্তু বলশেভিকদের অত সময় নেই ঃ তাদের পবিত্র গৎ-এক দুই তিন, ফায়ার! 

( গুমিলেওভ, গানিন, বেবেল, ক্লুয়েভ……কত কত মেধাবি মানুষ!)
পুশকিন কি পুশকিন হতে পারতেন বিপ্লবী রাশিয়ায় ? 

না 
লের্মন্তভ লের্মন্তভ? 
না 
এবং ইয়েসিনিনিন যেমন নিজের শিরা কেটে রক্ত দিয়ে লিখেছিলেন শেষ কবিতা, 

"বিদায় বন্ধু, বিদায়.... 
এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা নতুন নয় , 
নতুন নয় মৃত্যুও"

হয়তো পুশকিনও লিখতেন : 
" জ্ঞান ও অপরাধ অবিচ্ছেদ্য, 

এই আমার বিপ্লবী শতক
আমি মেনে নিতে পারিনা, পারিনা" 

এবং রিভলবারের ট্রিগার টিপে দিতেন নিজের হৃৎপিণ্ডে, যেমন দিয়েছিলেন মায়াকোভস্কি , 
এবং কেউ কেউ শ্লেষ ভরে বলতো, "ভাগ্যিস, সে একটা বড় বন্দুক ব্যবহার করেছে, এতবড় কবি, ছোট একটা পিস্তল ব্যবহার করলে কিই-না খারাপ দেখাতো।"*

চলবে 

*লিলি ব্রিক-মায়াকোভস্কির বিক্ষুদ্ধ স্ত্রী নাকি এ কথা বলেছিল।




পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু
৮ম পর্ব

অভ্রের বন্ধু সুদীপের মাথার নিচে বেশ বড় একটা রক্তের ধারা জমা হয়েছিল। কতক্ষণ সে জ্ঞানহীন ছিল তা অজানা। প্রতিবেশি তার বিশালাকৃতির কুকুরটি নিয়ে সিঁড়িতে ঢোকার সাথে সাথে এত অস্থিরভাবে ঘেউ ঘেউ করছিল যে, হন্তারকরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় সুদীপের ব্রিফকেস। ওরা ছিল আলাদিনের দৈত্যের মত তিনজন। একটু দেরি হলেই সুদীপকে সাবাড় করে যেতে পারতো। যদি কাকেও সুদীপের জীবনের জন্য ধন্যবাদ দিতে হয়, তা হবে প্রতিবেশির এই কুকুরটি। 

রুশদের কুসংস্কার হলো কাকেও ছুরি, চাকু ,দা, কুড়াল উপহার দিতে নেই। কেউ অজ্ঞতা বশত দিলে উপহার দাতাকে একটা রুবল দিয়ে দিতে হয়, তাহলে এটা আর উপহার হলোনা, ১ রুবল দিয়ে কিনে নেয়া হল। অন্যথায় কোন অশুভ ঘটনা, এমন কি জীবন সংশয় হতে পারে। ওর জন্মদিন ছিল গ্রীষ্মে, আর ওর বন্ধুরা উপহার দিয়েছিল সুন্দর একটি বাক্সে এক সেট ঝকঝকে চকচকে স্টিলের চাকু। এই জিনিস রাশিয়ায় নতুন। সবেমাত্র আসতে শুরু করেছে বাইরে থেকে। রাশিয়ার চাকুগুলো ভোতা ও ভারি, দেখতেও চকচকে নয়। পুঁজিবাদী দুনিয়ার ছুরি দিয়ে কাটতেও মজা, মারতেও সুখ। সবচাইতে বড় কথা দৃষ্টি-নন্দন। একেবারে অন্ধের চোখও ঝলসিয়ে দেয়। এই বন্ধুরা সুদীপের ব্যবসায়িক সহচর। হ্যান্ডসাম তিনজন রাশিয়ান যুবক প্লাস গাজী মোশতাক, যে সুদীপের ব্যবসায়িক পার্টনার।

কিন্তু সুদীপের শাশুড়ি বৃদ্ধা ও সন্দেহপ্রবণ ! দেশে যে চোঙ্গা ফুঁকে শ্লোগান দিয়ে দিয়ে সুদীপের গলা পরিপক্ক হয়েছে, উপহারে চাকুর সেট দেখে শাশুড়ির মুখ ঠিক সেই চোঙ্গার মত হয়ে গিয়েছিল অশুভ চিন্তায়।

শাশুড়ি বলেছিল, সুদীপ তুই ওদের একটা রুবল দিয়ে দে।

কি হাস্যকর কথা! সারাজীবন ধরে প্রগতিশীল সুদীপ নাকি শেষপর্যন্ত কুসংস্কারে বিশ্বাস করবে।
সে কথাটি শোনে নাই। লজ্জা বোধ করেছে। একটা রুবল দেয়া, যেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন রুবলের লেনদেন !

সে এখন শুয়ে আছে রক্তে। ওর তিন বছরের মেয়ে লাবণ্য বাবাকে ঝাঁকুনি দিতে দিতে কাঁদছে, "পাপা, পাপা শ্তো স্তাবোই?" (বাবা তোমার কি হয়েছে?)

মেয়ের নামটা পুরানো, কিন্তু এককালে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়ে পড়ে সুদীপ লাবণ্যের প্রতি এত প্রেমমুগ্ধ হয়ে পড়েছিল যে ওর মগজে মৌচাকের হাজার হাজার সেলের মত সেল তৈরী হয়। এবং আশ্চর্য প্রতিটা সেলেই বাস করে একটি অপূর্ব সুন্দর মক্ষিরাণী, এবং নাম তার লাবণ্য। ব্যাপারটি একেবারে একটি ট্র্যাজিডিতে পরিণত হয় যখন সে লেনিনগ্রাদে এসে পা ফেলে এবং এখানে তার লাবণ্যের সাথেই দেখা হয়ে যায়! যে প্রেমের জন্ম জন্মের আগে, তা মূক থাকতে পারেনা। যে ফুল মুকুলের ভেতরে ভেতরে সযত্নে বেড়ে ওঠে, ওঠে তা ফুটবার জন্যই। সুদীপ লাবণ্যকে ভালোবাসতো হাজার বছর ধরে, শুধু অপেক্ষা ছিল দেখা হবার। ওদের দেখা হলো তলস্তয় স্ট্রিটে। এবং নেভা নদীর তীরে যেখানে পুশকিন হাঁটতো। আর হাঁপাতো আলেক্সান্দার 

ব্লক। আন্না আখমাতভার দু:খে-ভারী কাঁধ নুয়ে আসতো।
এমন ঘটনা সচরাচর ঘটেনা, লাবণ্যও তাকে ভালোবেসে ফেলে।
তারা বোটানিকাল গার্ডেনে হাঁটে যেখানে ঠাণ্ডা বলে অর্কিড ফোটেনা কিন্তু টিউলিপ ফোটে। 

অর্কিড প্রেমের ফুল সবাই জানে, টিউলিপ অর্কিডের চেয়ে স্বল্পস্থায়ী ও রঙিন, হয়তো যেখানে টিউলিপ ফোটে, প্রেম-ফুলের জন্য তা বিরান প্রান্তর। 

রবীন্দ্রনাথের লম্বা কবিতা নয়, লাবণ্যের প্রেম হলো জাপানি হাইকু, খুব সামান্যে বিরাটের ধারণ ক্ষমতা যার। কখনও দ্বৈত অনুভূতি তার, এক বুঝতে গিয়ে অন্য বোধে পীড়িত হয়ে পড়ে।

জাপানি “ইরো” শব্দের যেমন দ্বৈত অর্থ হয়। ইরো মানে রং, আবার ইরো মানে প্রেম।

মেপল গাছের পাতা যেমন শরতে রং বদলায় তেমনি বদলাতে পারে প্রেমানুভূতি। যাকে ভালো লাগতো, যাকে আঁকড়ে থাকতে ইচ্ছে হতো লতার মত, তাকে আর ভালো না-ও লাগতে পারে। 

মন ধাবিত হতে পারে অন্য ভালোবাসায়। তাই প্রাচীন জাপানে কোন নারী যদি তার প্রেমিককে গাঢ়-লাল, প্রায় পার্পল রংয়ের মেপল পাতা পাঠাতো, তা বয়ে আনতো দু:সংবাদ, “তোমার প্রতি আমার অনুভূতি বদলে গেছে, এই যেমন বদলেছে এই পাতাটির রং।” লাবণ্যের মনের মেপল বনে তাই ঘটেছিল, সে সুদীপকে ফেলে অন্যজনকে কাছে টেনে নিয়েছিল। সুদীপের "দিন গুলো রাত, আর রাত গুলো দিন " হয়ে গিয়েছিল।

হোষ্টেলে রাশিয়ান, ইউক্রেনিয়ান, লাতিশ, ফিন, আরবি ও ল্যাটিন মেয়েগুলো গিজ গিজ করে। মেয়ে নয়, বেলা-ডন্না বিষ! ওদের দিকে তাকালে চোখে পিউপিলগুলো হাট করে খুলে যায়, কিন্তু 

বন্ধ আর হয়না।

সুদীপের মগজের সেলে বসে থাকা মক্ষীরাণীর মত ওরা নড়াচড়া করে, হোষ্টেলের নিরিবিলি কর্নারে ছেলেদের সাথে আলিঙ্গন, আদর-যত্ন, চুমাচুমিতে জড়িয়ে যায়। সুদীপেরও ঘড়া ভরা হরমোন। ওর যা করতে ইচ্ছে করে ওই ছেলে মেয়েগুলো করে তাই। কিন্তু তাকে সেইন্ট লরেন্সের দাহন সইতে হয়। রোমানদের চিতায় পুড়তে পুড়তে মৃতপ্রায় সেইন্ট লরেন্স নাকি বলেছিল, "এই দিকটা পোড়া হয়ে গেছে, আমাকে পাশ ফিরিয়ে দাও।"
তারপরে মারা গিয়েছিল।

অদম্য আকাংখার আগুনে পোড়ার চেয়ে সুদীপ যদি মারা যেতে পারতো সেইন্ট লরেন্সের মত! সে লাবণ্যকে নিয়ে কবিতা লেখে। কল্পনা করে লাবণ্যের সাথে নীলপদ্ম সরোবরে সন্তরণ। অন্য মেয়েগুলো সে সরোবর সাঁতরে যে নিষিদ্ধ শালুক তুলে আনে, ওর কল্পনাগুলো, তার চেয়েও ভিভিড দৃশ্যকল্পে মগজের তলানিতে পোড়া লেগে যায়।ওর মগজ পরিণত হয় কলুসিত এক ময়লাস্তুপে। ওর সত্যিই লাবণ্যকে নিবিড়ভাবে পেতে ইচ্ছে করে, বুকে পিষ্ট করে লাবণ্যের পাঁজরগুলো দলে-মুচড়ে দিতে চায়। একবছর, দুইবছর, তিন বছর, পাঁচ বছর চলে যায়...

বলা চলে সে একটা পার্ভার্ট। ৫ বছর একই মেয়ে, যে আরেকজনের সাথে ঘর করছে, তাকে নিয়ে আকাশ কুসুম-কল্পনা করা যে অন্যায়, সে এটা বুঝতে পারেনা। একদিন সে খুব ডেসপারেট হয়ে লাবণ্যের সাথে কথা বলে, তর্ক করে। তারপর বলা কওয়া নেই, হুট করে এক রাশিয়ান মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে। ওর যখন মেয়ে হয়, শত হাজার আধুনিক বাংলা, আরবি বা রাশিয়ান নাম বাদ দিয়ে সে যে আসলেই পার্ভার্ট তার প্রমাণ দিয়ে নাম রাখে লাবণ্য। 

সুদীপের ২১ বছর বয়স্ক বৌ এখন কাঁদছে। সে দিশেহারা অচৈতন্য স্বামীকে নিয়ে। তার ২১ বছরের জীবন কেটেছে যথেষ্ট নিশ্চিন্তে, কখনই এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়নি। এই ক্ষেত্রে সে রাশিয়ান হয়েও অবিকল বাঙালি নারীর মতই।
সুদীপের শাশুড়ি চোখ মুছতে মুছতে কল করছে ইমার্জেন্সি সার্ভিসে। প্রতিবেশি তার ঈশ্বর প্রেরিত হাতির সমান কুকুরটি ঘরে বেঁধে সুদীপের পাশেই আছে। সে যে সুদীপের বন্ধু ছিল তা নয়, মাঝে মধ্যে দেখা হয়েছে, প্রীতি-সম্ভাষণ বিনিময় হয়েছে, তবু সে না এসে পারেনি। হোক বিদেশি, প্রতিবেশি তো!

রুশ কুসংস্কার কুসংস্কার নয়, সুদীপের উচিত ছিল ওই বন্ধুদের একটা রুবল দিয়ে দেয়া। কারণ যে ৭৫ বছর বেঁচেছে এই সংসারে, সে ২৮ বছরের যুবকের চেয়ে বেশি দেখেছে জীবন, বিশেষ করে রাশিয়ার জীবন। রাশিয়ায় বিগত ৭০ বছর ধরে যদিও মানুষ মানুষের বন্ধু, কিন্তু কখনও শত্রু হলে ব্যপারটা খুব বেশি জটিল হয়ে দাঁড়ায় ।

ভাগ্য ভালো ১০-১২ মিনিটের মধ্যেই এম্বুলেন্স চলে আসে, শহরের মাঝখানে থাকার এই হল সুবিধা। সেই সময়টাতে গাড়ি ছিল খুব কম মানুষের এবং ট্রাফিক জ্যাম ছিলনা। সুদীপকে ধরাধরি করে স্ট্রচারে তোলা হয়। এখন সে মেঝের বদলে স্ট্রেচারে। মেঝেতে রক্তগুলো জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। মেয়েটা মাঝখানে একটু থেমেছিল, কিন্তু এখন সে বাপকে টেনে ধরে চিৎকার করতে থাকে, "ইয়া পাপু নি আত্দাম, উখাদিতে, উখাদিতে" ( আমি বাবাকে নিয়ে যেতে দেবনা, তোমরা চলে যাও, চলে যাও।)"
তার চিৎকারে সারা বাসা ঝনঝন করে উঠে, তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় সর্বত্র। মা কোন মতেই ওকে সরাতে পারছেনা। এত ছোট্ট মেয়ে অথচ কী তার শক্তি! সুদীপকে এম্বুল্যান্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় নিউরো-সার্জারি হাসপাতালে। সুদীপের ‘লাবণ্য দি দীর্ঘশ্বাস’ কিছুই জানতে পায়না, কারণ সে ততদিনে পাশ করে দেশে চলে গেছে।
--চলবে



পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু
৯ম পর্ব

এম্বুলেন্সের ঝাঁকুনিতে অথবা মগজের কোথাও গেঁথে থাকা ওর কন্যার তীব্র চিৎকারের অনুরণনে সুদীপ জ্ঞান ফিরে পায়। চোখ মেলে তাকিয়ে ওর মনে হয় ও একটা বাক্সের মধ্যে এবং বাক্সটি খুব ঝাঁকুনি খাচ্ছে। সেখানে খুব ডিম লাইট, কিন্তু তাও খুব চোখে লাগে। পাশে কে যেন বসে আছে ওর হাত ধরে। মুখটা স্বচ্ছ নয়। 
লাবণ্য?
আলিওনা?

ও হাতটা নাড়ায়, আলিওনা নুয়ে আসে ওর মুখের কাছে, ওর চোখে জল, "প্রিসল ভ্ সিবিয়া? স্লাভা বগু "( জ্ঞান ফিরেছে? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।)

রাশিয়ায় ঈশ্বর কথাটা আসে এদের ভাষার গহীনে প্রোথিত ট্র্যাডিশন থেকে। নাস্তিকেও কথা প্রসঙ্গে এটা বলে। বাক্যটা মোটেও ধর্ম বিশ্বাস বুঝায়না।
"তুমি এখন কেমন বোধ করছ?"
"মাথায়....."
শব্দ খুঁজে পায়না সুদীপ।
"কিছু বলার দরকার নেই, তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো, কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে চলে আসবো।"
"লাবণ্য কই?"
"বাসায়, মায়ের কাছে।"

আবার যেন কোথায় চলে যায় সে। 
বহু দূরে কোথাও.. না, সে চিনতে পারছে।পেত্রদভার্ৎসের বাগানে, যেখানে হাজার হাজার ফুল! 

মে মাসের রৌদ্রময় মৃদু-উষ্ণ দিন। ফিন উপসাগর রোদ পোহাচ্ছে অদূরেই। ঢেউগুলো উন্মত্ত নয়, কিশোরি বুকের মত নম্র। অনেকগুলো গাঙচিল। গাঙচিলগুলোর চোখে বিষণ্ণতা। কিসের বিষণ্ণতা সুদীপ বুঝে উঠতে পারেনা। গাঙচিলের চোখে জল, মনে হয় ওরা কাঁদছে। কেমন যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার!
পার্কের মূর্তি ও ঝর্ণাগুলোর শীতনিদ্রা শেষ হয়েছে, তুষারপাতের থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতি শরতে যে কদর্য হিজাবগুলো পরিয়ে দেয়া হয়, তা তুলে নেয়া হয়েছে। মূর্তিগুলো মুক্তির আনন্দে হাসছে ও হাঁটছে। ঝির ঝির করে জল ঝরছে ঝর্নাগুলোতে। গাছে গাছে কচি কচি পাতা। ওর পাশে লাবণ্য হাঁটছে ...না আলিওনা.... না লাবণ্য...ওই পাতাগুলোর মত অদ্ভুত সতেজ ও হালকা সবুজ, ওর হাত ধরে আছে।কি কোমল হাত! কি উষ্ণ!

আবার জ্ঞান ফিরে পায় সে :
"আমাকে কি ওরা মেরেছে?" 
"হ্যাঁ, তুমি মাথায় আঘাত পেয়েছো।"
"আমি সিঁড়ি দিয়ে বাসার দিকে আসছিলাম, একেবারে বাসার দরজার সামনে পৌঁছাতেই হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে আমার কলার টেনে ধরে, আমার গলায় ফাঁস লেগে যায়, পিছনে তাকিয়ে দেখতে চাই কে? এই সময়ে কি যেন একটা আমার মাথায় আঘাত করে, আমার আর মনে নেই।"
"তুমি এখন বিশ্রাম নাও। এখন ওসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই।"
"আচ্ছা"
তারপরে আবার জিজ্ঞেস করে:
"লাবণ্য কই?"
কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করে সুদীপ আবার গহীনের তলানিতে কোথাও চলে যায়।

দেশ থেকে ফিরে আসার পরের দিনই কাজ শেষে অফিসে এসে উপস্থিত হয়েছিল সের্গেই।

"আমার বাসায় চলো, কথা আছে"।
টেবিলে অনেক খাদ্য। স্তালিচনায়া ভদকার বোতল থেকে তৃতীয় পেগ ঢালতে ঢালতে, বাম হাতে নোনতা কচি শশার পিকল হাতে সের্গেই বলেছিল :

“আনি রিশিলি তিবিয়া জা’মাচিত” ( শোন, ওরা তোমাকে আঘাত করবে )
"কারা?"
“বন্ধুরা"
"কেন?"
"ওদের ধারণা তুমি গাজীকে ঠকাও।"
"তুমি? তুমি কি মনে করো ?"
"আমি কিছুই মনে করিনা, যখন কেউ হামলা করতে চায়, সে সব সময় কোন না কোন অভিযোগ খুঁজে বের করে। মূল কথা হল তোমার কোম্পানি বেশ বড় হয়েছে, সুতরাং কেড়ে নেয়ার সময় হয়েছে।"
"তুমি তো ওদের ঘনিষ্ট বন্ধু, তুমি ওদের সাথে না থেকে আমাকে কেন এসব বলছো?"
"শোনো আমার বাপ একজন রিটায়ার্ড আর্মির জেনারেল। অসম্ভব সৎ ও দেশপ্রেমিক হওয়া সত্ত্বেও সে স্ট্যালিনের সময়ে নিপীড়িত হয়েছে। আমার বাপ এখন অতি বৃদ্ধ। সে সব সময় একটা কথা বলে ,"নিরীহ পরিশ্রমি মানুষদের কষ্ট দিসনা, আমাদের দেশে নিরীহ মানুষেরা চিরকাল নির্যাতিত হয়েছে, যেমন জারের আমলে, তেমন তার পরেও।"
"আমি ওদের সাথে থেকেছি এতদিন ওরা আমার বন্ধু বলে, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই বুঝতে পারছি ওরা ডাকাত। তিনদিন আগে তোমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ওরা তোমাকে সরিয়ে দেবে, আমি তীব্র প্রতিবাদ করেছি কিন্তু ওরা মানেনি।"
"গাজী ওখানে ছিল? "
"না।"
"সে জানে?"
"আমি জানিনা, তবে সে তোমাদের অফিসের লিজ ট্রান্সফার করে দিয়েছে তুমি যখন দেশের বাইরে ছিলে।"
"বলো কি? সে তো আমাকে কিছু বলেনি।"
মনে পড়ে, তাদের অফিসের লিজের যে চুক্তি সেখানে গাজীর সই, যদিও অফিসের তিলোত্তমা রিনোভেশন করা হয়েছে সুদীপর ডিজেল জেনেরেটর বিক্রির কয়েক মিলিয়ন রুবল খরচ করে ।

"আমি সবসময় দেখেছি তুমি কেমন চরকির মত ঘোরো, অনবরত কাজ করো, এক মুহূর্তও বসার ফুরসত নেই। অথচ তোমার পার্টনার গাজীর রুমে অনবরত সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলিতে

দল বেঁধে হেলিকপ্টার আর মিসাইল বিক্রির দিবা স্বপ্নের আড্ডা। আমি নিজে প্রচুর পরিশ্রম করি এবং আমি মনে করি এমন একটা নীচ কাজ তোমার সাথে করা উচিত নয়।"

"কিন্তু গাজী তো আমার দেশি, বন্ধু, আমি নিজে ওকে ডেকে এনে পার্টনারশিপ দিয়েছি, সে এ পর্যন্ত এক কোপেকও কোম্পানির জন্য অর্জন বা ইনভেস্ট করেনি। তোমার কি ধারণা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে?"
"আমি জানিনা, তবে তুমি সাবধানে থেকো, সময় খুব অল্প। ওরা যে কোন দিন আঘাত করবে।"
"তুমি কিছু মাইন্ড করোনা কিন্তু আমার এই প্রশ্নটা না করলেই নয়। তুমি আমাকে একটা কারণ বলো, কেন আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো?"

দূরে ওর দুই বছরের মেয়েটা খেলা করছিল মায়ের সাথে, আর হাসছিল হি হি করে। ওর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, " তোমার মেয়েটা তো আমার মেয়ের থেকে মাত্র ১ বছরের বড়। আমি চাইনা সে এত অল্প বয়সে পিতৃহীন হোক।"

সুদীপ উঠে দাঁড়িয়ে ওর বৌকে ধন্যবাদ দিয়েছিল সুন্দর ডিনার সার্ভ করার জন্য। সের্গেইকে ওর হুঁশিয়ারির জন্য। মেয়েকে নিয়ে ওর বৌ এগিয়ে এসেছিল। বৌটা খুব অল্প বয়সি ও সুন্দর, আপনজনের মতো বলেছিলো,"সাবধানে থেকো, আমার স্বামী তোমাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে 

এবং তোমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত।"
বলে হেসেছিলো সামান্য, যেন সে নিজে কোন অপরাধ করে ফেলেছে। 

সুদীপ বের হয়ে আসে। ড্রাইভার গাড়িতে বসে ঝিমুচ্ছিল। কাছে এসে টোকা মারতেই বের হয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়।

আকাশে অসম্ভব চিকন ও অরাল চাঁদটা। সুদীপের মনে হল সে কোনদিন এমন চাঁদ দেখেনি । অবিকল একটা বড়শির মত। কে যেন অনেক উঁচু থেকে বড়শি পেতেছে। আর এই পৃথিবীটা একটা মহাসমুদ্র। সুদীপ সেই সমুদ্রের তলানিতে একটা ছোট মাছ, বড়শিটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
বড়শি কখনও হা করেনা, মানুষ বা মাছ করে, কিন্তু কি অদ্ভুত এই বড়শিটা হা করে আছে।

সুদীপের মাথায় যেন একটা হাতি চার পা তুলে বসে আছে। এত ভারি! সে কয়েক পেগ ভদকা গিলেছে কিন্তু কোন নেশার ভাব নেই। সের্গেইয়ের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে।
ও যে কথাগুলো বললো, তা কি বিশ্বাস করা যায়?
যদি এর পেছনে ওর কোন উদ্দেশ্য থাকে?
আর যদি.... যদি সত্য হয়?

সুদীপ ভীতু নয়, বেপরোয়া সাহসীও নয়। সে গড়-পড়তা সাধারণ, যাকে বলে এভারেজ একজন মানুষ। হ্যাঁ, ছাত্রজীবনে সে ভালোছাত্র ছিল, কিন্তু তাতে কি? বেশির ভাগ ভালোছাত্রও তো কারো না কারো চাকরি করে, ঘুষ খায়, হয়তো একটু ভালো থাকে অন্যের তুলনায়, তারপরে মরে যায়। এক শস্য পেকে আসতে না আসতেই মানুষ ভুলে যায় তাকে। পায়ুপথে বায়ু পাম্প করে হত্যা করা হয় যে কিশোরকে, তুমুল হৈ চৈ প্রতিবাদ করা সত্বেও মানুষ ভুলে যায় তার নাম ছিল সামিউল রাজন। কয়টি চাঁদ ক্ষয় হয়েছে? খুব বেশি নয়। সে কি তার চেয়ে বড় কিছু? সাধারণের সাধারণ, একজন এভারেজ মানুষ সে, এক ছায়াপথ সমান বুক নিয়ে লাবণ্য বা আলিওনা নামে কোন নারীকে ভালোবাসলেও ভিন্ন কিছু নয়।

-চলবে


পেরেস্ত্রইকা মস্কো ও মধু
১০ ম পর্ব

সুদীপের কাহিনীটা জটিল নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে আসার আগে অন্যান্য অনেকের মতই 

সে ছিল ভালো ছাত্র এবং "হারমোনিয়াম পার্টি" বলে পরিচিত সিপিবির ছাত্র সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়নে খুব সক্রিয়। 
"কেউ খাবে তো কেউ খাবেনা, তা হবেনা তা হবেনা " শ্লোগান দেবার জন্য ওর গলায় যতটা জোর ছিল "উই শ্যাল ওভার কাম সাম ডে " গানটি গাইবার মাধুর্য ততটা ছিলনা। ওর হারমোনিয়ামের সা-রে-গা-মা হারিয়ে গেছে দ্বন্দবাদের হ-য-ব-র-লের জঙলে। কিন্তু রাজনীতির কাজ সে করেছে অতি নিষ্ঠার সাথে। বক্তৃতা দিয়েছে, তর্ক করেছে, মিটিং করেছে এবং পুঁজিবাদের তুলনায় সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য যে সব যুক্তির মারনাস্ত্র প্রয়োগ করা দরকার সবটাই সে করেছে। পড়াশুনায় সে সোভিয়েত ইউনিয়নেও ভালো ছিল। লাবণ্যের সাথে কোমল অনুভূতির দীর্ঘদিনের কঠিন ফিয়াস্কোর যতি টেনে সে যখন বিয়ে করে, তার একবছরের মাথায় ওদের পড়াশুনো শেষ হয়ে যায়। লাবণ্য দেশে চলে যায়। সংসারি সুদীপের ফেরা হয়না।

পুরানো ও পরিচিত যা, তা ভেঙে যাচ্ছিল কসমিক গতিতে। নতুনের মুখ ছিল কদর্য। এই নতুনকে আপন করে গ্রহণ করার এভানগার্ড ছিল শুধু সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনগণ প্লাস কমিউনিস্ট পার্টি, কমসোমল, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদির নেতৃত্ব। কল-কারখানা, সমবায়, দোকান-পাট, ট্রান্সপোর্টেশন, অ্যাভিয়েশন, খনি, বন, বিল্ডিং ইত্যাদি অর্থনৈতিক সংস্থাসমুহের লাল ডাইরেক্টর এবং তাদের সন্তান সন্ততি আত্মীয় স্বজন ও কমরেডগণ পকেটে পুরছিল অসম্ভব গতিতে। চলছিল ইতিহাসের বিশালতম রাষ্ট্রের বিশালতম বৈধ অপহরণ। যা একদিন কেড়ে নেয়া হয়েছিল পুঁজিপতি, বেনিয়া ও অভিজাতদের কাছ থেকে এবং আরও যা গড়ে তোলা হয়েছে বিগত ৭০ বছরে সাধারণ মানুষের রক্ত, ঘাম ও অশ্রু দিয়ে, তাই নতুন নতুন আইন করে রাষ্ট্রের হাত থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছিল ক্ষমতাসীন নব্য পুঁজিপতি, বেনিয়া ও অভিজাতদের দল। অথচ এরাই মাত্র কিছুদিন আগেও বিশ্বব্যাপি জ্বালিয়ে রেখেছিল মুক্তি সংগ্রামের মশাল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত স্ফুলিঙ্গ। এরাই সারা পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলো থেকে ছাত্র এনে বিনা পয়সায় স্পেশালিস্ট তৈরি করে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে, যখন তাদের নিজের দেশেই সিংহভাগ মানুষের ছিল নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবন। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে অর্থ, শিক্ষা, ট্রেনিং দিয়ে চালিয়েছে। প্রগতি প্রকাশনের মাধ্যমে হাজার হাজার বই অনুবাদ করে, দামি কাগজে ছাপিয়ে কার্যত বিনামূল্যে বিশ্বব্যাপী বিতরণ করে লাখো কোটি মানুষকে পরিচিত করেছে চিরায়ত রুশ সাহিত্যের সাথে। তাদের সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘায়িত হতো ভিয়েতনামের যুদ্ধের মতই।এক অদ্ভুত প্রজাতির রাজনীতিবিদ ও আমলা ছিল এরা ! একদিকে সাম্য ও শোষণমুক্তির শ্লোগান, অন্যদিকে মানুষের অধিকার হরণ করতে করতে জনগণের সম্পদ অপহরণ হয়ে ওঠে তাদের উটপাখি দর্শনের আখেরি বাস্তবায়ন।

মানুষের যদিও সম্প্রীতি ছিল তার প্রতিবেশির সাথে, কিন্তু নেতৃত্বের চোখে মানুষ ছিলো গবাদি পশুর মত। সে ইচ্ছা করলেই তার শহর ত্যাগ করে অন্য শহরে গিয়ে বাস করতে পারতোনা।

সে খুঁটায় বাঁধা পশু।

এত দীর্ঘদিন উন্নত সমাজতন্ত্রের গলাবাজি করে এখন পেরেস্ত্রোইকা মানে পুনর্গঠনের ডাক দেয়া 

হয়েছে। তার মানে এতকাল যা গঠন করা হয়েছে, তা ছিল বেঠিক। খাদ্য নেই, দোকান-পাট খালি, কুপন নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, কালো বাজারে বহুগুন দামে খাদ্য কেনা, যার কোন কোয়ালিটি কন্ট্রোল বা এক্সপিরেশন ডেট নেই। রাস্তায় রাস্তায় বৃদ্ধ, অথর্ব ও পেনশনিয়াররা না খেয়ে মরছে। মস্কোতে গর্বাচভ বাজাচ্ছে একই প্রতিশ্রুতির রেকর্ড প্লেয়ার, যা শুনে ১৯৮৫ সালে মানুষ চমকিত ও আশাবাদী হয়েছিল, তাই এখন সৃষ্টি করছে বিবমিষার বিশ্রী অনুভব। কিন্তু ক্ষমতা অন্ধ ও ক্ষমতালোভী। জনগণ শুধু ক্ষমতার পা ফেলার স্থান। এই সেই সময়টা। ১৯৮৯ সাল। ৪৭৬ সালে রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবার মত মানব জাতির ইতিহাসের আরও একটি ভীষণ কালো সময়।

অসম্ভব ভালোবাসায় অন্ধ একটি বৌ ছাড়া সুদীপের বস্তুত আর কেউ ছিলনা। নিজ ভাষায় একটু ভাব বিনিময় করতে পারে এমন লোকজন ছিল হাতে-গোনা মাত্র কয়জন। দূরের নক্ষত্রের মত লাবণ্যের আলোই যেন ছিল সামান্য আলোর উৎস। কিন্তু বড় দূরের। জোনাকির ওড়া-ওড়ির মত রাতের নৈ:শব্দ ও দীর্ঘনিঃশ্বাসগুলো ধাবিত হতো কোন অজানায়। মেপল গাছের পাতায় শরতের

রং খেলে যেতো। বার্চের পাতায় পাতায় কাঁদতো হাওয়া। পপলার গাছে ফুটতো ধবল তুলো। সেই তুলো গ্রীষ্মে বাতাসে উড়ে উড়ে চোখে গিয়ে লাগতো সুদীপের। চোখ ভিজে উঠতো। কেন বোঝা যেতোনা। সুদীপ ছিল নিজস্ব খাঁচায় বন্দি স্বেচ্ছা-মেটামরফোসিসে তৈরি একজন উপমানব।

অন্যান্য অনেকের মতই সে ছিল শুদ্ধচারি। পার্টির নিষেধাজ্ঞা মেনে কোন ব্যবসা করেনি। 

যেহেতু বৃত্তির টাকায় টিকেট কেনা যেতোনা, সে ৭ বছর আগে দেশ ছেড়ে আসার পড়ে আর দেশে যেতে পারেনি। ততদিনে তার মা বাবা দুজনই গত হয়েছে। দেশে ভাই-বোনের যে দঙ্গল রয়েছে বিদেশি বৌ নিয়ে তাদের মাঝে গিয়ে ওঠার কোন পরিস্থিতি ছিলনা। পড়া শেষ করার সাথে সাথে বৃত্তি বন্ধ হয়ে গেছে, হোষ্টেলের রুম খালি করে দিতে হয়েছে। এখন সে থাকে তার শাশুড়ি, স্ত্রী, কন্যা সহ কম্যুনাল বা কমন কোয়ার্টারের একটি মাত্র কক্ষে। ১৬ জন মানুষের ৫টি পরিবারের এই বিশাল বাসাটিতে ১ টি মাত্র টয়লেট, একটি ওয়াশ রুম ও একটি রান্না-ঘর। ভোরে ঘুম থেকে উঠে লাইন ধরে থাকতে হয়। কাজে বা স্কুলে যাবার তাড়াহুড়োতে সময়টা অনন্তকালের মত দীর্ঘ মনে হয়। সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরা পাখিদের মতই আবার অপ্রীতিকর কুজন ও কাকলি। বিপ্লবী রাশিয়া গৃহহীনের গৃহ-সমস্যা এই ভাবে সমাধান করে আর সামনে এগুতে পারে নাই। মানুষকে খুব সস্তার জীবনে বেঁধে রাখতে পারলে দামী জীবনের কী দরকার? মানুষের চাহিদা কি কখনও কমে? ধারণা করা হয়েছিলো পরিখার বাইরে মানুষের যে জীবন, তার সন্ধান ভেতরে কোনোদিন পৌঁছাবেনা ,

মানুষ টেরই পাবেনা, তাদের কী আছে কী নেই। মানুষের যা আছে, তা কখনই বড় হয়ে দেখা দেয়না, কিন্তু যা নেই, তা যে হয় অপ্রাপ্তির হিমালয়, দীর্ঘদিন একনায়কত্বের ছানি পড়া চোখে বিষয়টি ধরা পড়েনি। 

ওদের ঘরে এতদিন যে আলমারিটি ছিল দেয়াল-ঘেষে, তা মাঝখানে এনে কক্ষটিকে দুটি ছোট খুপরিতে পরিণত করা হয়েছে। গাদাগাদি করে বাস করায় কেবল গোরস্থানেই মনোকষ্ট হয় না। 

জীবিত মানুষের হয়। কিন্তু তাতে বাস্তবতার ইতর বিশেষ হয়না। সুদীপরা যেখানে ঘুমায়, দিনে তা সোফা, রাতে বিছানা। সেখানেও যথেষ্ট চিপাচিপি, তবে যৌবন টগবগ করে বলে রাতের চিপাচিপি সয়ে যায়। শীত কম লাগে। 

লাবণ্য ঘুমায় নানির সাথে আলমারির অন্য দিকে।
শাশুড়ির বেতন ১২০ রুবল। সুদীপ বেকার, বিদেশিদের কোথাও চাকরি করার বন্দোবস্ত তখনও ছিলনা। আলিওনা প্রথম বর্ষের মেডিকেল স্টুডেন্ট। এক কক্ষে ১২০ রুবলের আয়ে ২ জনের বদলে ৪ জনের বাঁচা নিয়ে শাশুড়ির খেদ সুদীপের কান পর্যন্ত পৌঁছায়। মানুষ যখন নিজেকে ইঁদুরের কলে আবিস্কার করে তখন তার মনে হয় সে একাই এমন ভাগ্যহত। দেশে চলে যাওয়া উচিত ছিল। লাবণ্যসহ বন্ধুরা সবাই দেশে ফিরে গিয়ে ইন্টার্নিশিপ শেষ করে ফেলেছে, অথচ সে সময় নষ্ট করছে আলিওনার সাক্ষীগোপাল স্বামী হয়ে। সে যে একদিন রেড ডিপ্লোমা নিয়ে পড়াশুনা শেষ করেছিল, তা যেন অনেকদিন আগের কথা এবং মিথ্যা কথা। কিন্তু আলিওনা তাকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসে। স্বামীকে শুনিয়ে কটু-কথা বলার জন্য মায়ের সাথে ঝগড়া করে।

সুদীপও ভালোবাসে আলিওনাকে । 
আসলে সুদীপের শাশুড়িও সোভিয়েত মানবিক সমাজের নীচুতম সিঁড়ির একজন মানুষ।ভালো মানুষ, অভাবে দিশেহারা। যখন তার টগবগে যৌবন এবং আগুনের মত শিখা তোলা রূপ ছিল, তখন সে মাতাল ও লম্পট স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি করে দুটি মেয়েকে নিয়ে জীবনের চোখে 

তাকায় সরাসরি। নিজের সুখের কথা ভুলে গিয়ে, নিজের যৌবনকে বলি দিয়ে, নতুন কোনো পুরুষের স্পর্শ ও ভালোবাসার হাতছানি দূরে ঠেলে রেখেছে। সারাজীবন একা ঘানি টেনে মানুষ করেছে মেয়েদের। এখন সে প্রায় বৃদ্ধা, ভবিষ্যৎহীন, মৃত্যুমুখী মহৎ সমাজের খাঁচায় বদ্ধ মহতী ইঁদুর, সুদীপ বোঝে।

তা সত্বেও ওর চুল ছিড়তে ইচ্ছে করে। মনে হয় লাবণ্যই তাকে দেশ ছাড়া করে নিজে সুখে আছে। আবেগের কাছে যুক্তি পরাজিত হয়। জৈষ্ঠ্যের শেষে জলে ফুলে ওঠা নদীর মত তার বুকে একটা তীব্র অভিমান তীর ভাঙ্গতে থাকে। বিদেশি ছাত্রদের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের “স্টেট কমিটি” বা "গস কমিতিয়েত" ততদিনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর প্রতিস্থাপন তখনও তৈরী হয়নি। সুদীপের বৈধভাবে থাকার জন্য কোন ফেলোশিপ বা পি এইচডি প্রোগ্রামে ঢুকে ভিসা বাড়ানো দরকার। তখনও বিবাহ সুত্রে গ্রিন-কার্ড দেয়া শুরু হয়নি। সুদীপ মস্কোতে দৌড়ায়।এতকাল যে সব কমরেডরা প্রবল দাপটে শুড় ও দাঁত উঁচিয়ে মস্কোতে ম্যামথগিরি করেছে, তাদের প্রায় সবাই লেখাপড়া শেষ করে চলে গেছে। বাংলাদেশের পার্টির সবচাইতে বিশ্বস্থ ও কট্টর ব্যবসা-বিরোধি ছিলেন এমন কয়েকজন সোভিয়ত পার্টি ও নমেনক্লাতুরার সাথে কানেকশন ব্যবহার করে রাতারাতি বড় ব্যবসায়িতে পরিণত হয়েছে। তাদের এই অবিশ্বাস্য উথ্থানের পেছনে কাজ করেছে অভাবনীয় আলাদিনের চেরাগ্ব

শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রে হিসাব বহির্ভুত অর্থ অফুরন্ত। পার্টির যে সব ত্যাগী নেতারা এতকাল বিশ্ব সমাজতন্ত্র গঠনের প্রক্রিয়ায় নিজেদের হাতের তালুর নীচে বিশাল অর্থ স্তুপীকৃত করেছিলেন, সোভিয়েত দেশ ভেঙে যাবার ঘোলা-জল বাস্তবতায় তাদের পশ্চিমমুখী অর্থ পাচারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসে পরীক্ষিত পুরানো কমরেডরা, যারা বহুদিন ধরে এই দেশে থেকে বিভিন্ন উঁচু পদের কমরেডদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। বিনিময়ে তারা খুব উদার কমিশন পায়। এভাবেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিকতাবাদী ভাতৃত্বের। একদল কমরেড আরেকদল কমরেডকে রাষ্ট্রের অর্থ-পাচারে সাহায্য করে কচুগাছ থেকে বটগাছে পরিণত হয় ।
এই একই তেলেসমাতির পথ ধরে সুদীপ, অভ্র ও অন্য অনেকের সার্বক্ষণিক প্রিয় নেতা, যিনি ছিলেন বেত ও ভালোবাসার অপূ্র্ব সংমিশ্রন, সেই ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ভাই ব্যবসায়ে নেমে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন আলাদিনের দৈত্যের চেয়েও দ্রুততা ও ক্ষিপ্রতায়।

তার আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে শিষ্যদের জন্য কিছু করার সময় ছিলনা। তার প্রতিটা মুহূর্তের মূল্য এখন হাজার হাজার ডলার। কিন্তু তার যে ইচ্ছা ছিলনা এটা হলফ করে বলা যাবেনা। তিনি সত্যিই তার স্নেহভাজনদের স্নেহ করতেন। আর তার স্ত্রী, আকসানা ভাবি ছিলেন একজন বিদূষি নারী। খুব গরীব ঘরের মেয়ে হয়েও তিনি প্রায় ২০ বছর নিজে চাকরি করে রাজনীতিবিদ স্বামীকে খাইয়েছেন। শুধু তাই নয় স্বামীর-দেশি ছাত্র-ছাত্রিগুলোকে দেখেছেন আপন ভাই বোন, এমন কি কখনও কখনও আপন সন্তানের মত। তার হঠাৎ এই শ্রেণী বা স্তর পরিবর্তন হলেও চরিত্রে তেমন পরিবর্তন হয়নি। অন্তত সুদীপের ক্ষেত্রে হয়নি।তিনি রয়েছেন আগের মতই সুদীপ ও অসংখ্য অনেকের প্রিয় ভাবী।

কিন্তু নেতৃস্থানীয় একজন কমরেড তখনও ছিলেন আগের মতই নিবেদিত প্রাণ। ব্যবসায়ের ঘুর্ণাবর্তে

তার মাথা ঘোরেনি। তিনি দেশে রাজনীতি করেননি। সরকারী বৃত্তি নিয়ে এসেছিলেন। মস্কোর নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মার্কস-লেনিবাদে দীক্ষা নেন। কোন কিছুই তিনি অর্ধেকভাবে করেন না। প্রচুর পড়াশুনো করেন। কনভিন্সড হন এই তত্ত্বের মহত্ব ও সত্যতায়। উপলব্ধি করেন সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এক নয়, বিপ্লবীদের লড়াই করা উচিত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সহ অন্যান্য মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি সাম্য, মৈত্রি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য।
তিনি ছিলেন অসম্ভব সৎ, অসম্ভব মেধাবি। লিকলিকে শরীর। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও স্বচ্ছ। ভিতরে বাইরে এক; অবশ্য ব্যতিক্রমটা চামড়ায়। বাইরে বেশ কালো কিন্তু তার অন্তর্নিহিত "আপনার রূপ" জোছনার রংয়ের মত। 
বলা চলে তখন তিনিই পার্টির সবে-ধন নীল-মণি নেতা। সুদীপ তার কাছে যায় সাহায্যের জন্য।

মন্ত্রনালয়ে বহু দৌড়াদৌড়ি করে, শেষ পর্যন্ত তিনি সুদীপের জন্য এক বছরের একটা ইন্টার্নিশীপ যোগাড় করে দিতে সক্ষম হন। সুদীপ বহিস্কারের হাত থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু সেই কমরেডের পিএইচডি শেষ হয়ে আসে এবং সে ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি মেধাবি’ ক্যাটাগরির ভিসা ও বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় চলে যায়। 

-চলবে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন