মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

বিপুল দাস : গল্পের কাছে কী চাই



একটি গল্পের কাছে কি আনুগত্য আশা করব আমি? পোষা বেড়ালের মত সব সময় আমার পায়ে পায়ে ঘুরবে? আমার গোপন আদর টের পেয়ে গলা দিয়ে আরামের গরগর শব্দ করবে? কী চাই আমি একটা গল্পের কাছে, ভাবতে গিয়ে ধন্দ লেগে যায় আমার। গল্পটার পিঠে হাত বুলিয়ে দিই। কখনও মনে হয় রোমশ, মসৃণ কিছু আমাকে আরাম দিচ্ছে। কখনও মনে হয় কুমিরের পিঠ। এক সারি তীক্ষ্ণ কাঁটায় আমার হাত রক্তাক্ত হতে থাকে। তবু মনে হয়—আহা কী সুখ। কী চাই একটি গল্পের কাছে? মার্জিত মার্জারের সিল্ক-পেলবতা, আনুগত্য? না কি তীক্ষ্ণ হয়ে জেগে থাকে কাঁটার সারি? দৈনন্দিন দিনযাপনের অপমান, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা। কখনও মানুষের জেগে ওঠা। 

আমি যা বলতে চাই, আমার দেখা-শোনা-পড়া, আমার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখি। ধরা যাক এক নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হলো। যে সব মানুষ এতদিন খেয়ায় নদী পার হতো, তারা এখন গটগটিয়ে নতুন ব্রিজের ওপর দিয়ে নদী পার হয়ে যাবে। খেয়ামাঝি এখন বেকার। এই উন্নয়ন ও নির্বাসন নিয়ে আমি একটা গল্প লিখলাম। আমার বোধ থেকে গল্পটা নির্মাণ হলো। কিন্তু মাঝির জীবিকা ছাড়াও প্রতিদিন ঢেউ-এর প্রতিকূলে, কখনও ভরা বর্ষায় নদী পার হওয়ার ভেতরে যে চ্যালেঞ্জ কাজ করে, আমি তার কতটুকু বুঝেছি। খেয়া মাঝির সমস্যা আমি আমার মত করে বুঝেছি। কিন্তু মাঝির বোধে সমস্যাটি যে ভাবে এসেছে, আমি কি তার ধারেকাছে যেতে পেরেছি? 


আমার ভাবনার ভার বহন করে আমার ভাষা। কতটুকু ভাষার ক্ষমতা? কত সূক্ষ্ম অনুভূতির কথা সঠিক শব্দের অভাবে প্রকাশ করতে পারি না। যে কথা বলতে চাই, সত্যিই কি সে কথা বলতে পেরেছি? গল্প থেকে দূরে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে কি নিজের লেখা গল্পের বিচার করতে পেরেছি। যা চেয়েছি একটি গল্পের কাছে, সব সময় কি সেই মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে? হয়নি, হয় না। কত অব্যক্ত কথা বুকের গভীরে, শুধু চেতনায় ইশারাটুকু দিয়ে চকিতে উধাও হয়ে যায়। ধরতে গিয়ে দেখি পালিয়ে গেছে। আমি যা চাই, গল্প কোনও দিন আমাকে সেই অন্বিষ্টে পৌঁছতে দেয়নি। 

কখনও এমন হয় একটা বিশাল ভরের মত অক্ষরসমষ্টি নিয়ে গল্পটা গতিজাড্য নিয়ে গড়াতে থাকে। অসহায় আমার হাত থেকে রাশ খুলে পড়ে। গল্প যেন নিজের ইচ্ছেতেই বাঁক নেয়। কোথা থাকে চরিত্রগুলো এসে যায়। ওরা সংলাপ তৈরি করে। দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মনের গহনে মানুষের যে অপূর্ণ সাধবাসনা থাকে, কান্নাঘাম অশ্রু রক্ত বীর্য মন্থন করে যে শায়ক তৈরি হয় লেখকের মননে—সেই শায়ক ছুটে যায় একটি সম্ভাব্যতার দিকে। তারপর নিষেক। একটি গল্পের ভ্রুণ তৈরি হয়। তারপর ভাষার চতুরালি, শৈলী, ব্যক্তিগত ন্যায়অন্যায় বিবেকবোধ, রাজনৈতিক দর্শন, সততা-অসততার ধারণা- সব মিলেমিশে ভ্রুণের হাতপা তৈরি হতে থাকে। সব শেষ হলে একটি গল্পপ্রতিমার জন্ম হয়। সেই গল্পের কাছে আমি নতজানুন হই। যদি মিথ্যে বলে থাকি, সেই ভয়ে প্রাণপণে পরিত্রাণ চাই। গল্পই আমাকে বাধ্য করে নতজানু হতে-- জীবনের পরম সত্যের কাছে আভূমি প্রপণত হতে।আমি চাই গল্প আমার ঝুঁটি ধরে নাড়া দিক। গল্পের গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে হাত যেন তীক্ষ্ণ কাটায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। তীব্র বেদনায় গল্প আমাকে ছিন্নভিন্ন করুক। 

যখন কারও গল্প পড়ি, আমি বুঝতে চাই গল্পের ভেতরের গল্পটিকে। Between the lines যে বাক্যটিতে রয়েছে আমি তার তালাশ করি। কখনও পাই, কখনও পাই না। কদাচিৎ কোনও গল্পে শিল্পের স্বরূপ বুঝতে পারি। আমাকে শিহরিত করে। আমাকে ঋদ্ধ করে, সেই সব গল্প। সাদাত হাসান মান্টো, মার্কেজ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্প পড়ে কখনও আমার মনে হয়েছে কী রহস্যময় ইশারা তিনি রেখে গেলেন পাঠকদের জন্য। মনে হয় এটাই তো চাই গল্পের কাছে। জীবন ও মৃত্যুর রহস্যময় সমীকরণ, মরণের মুখেও কী সুন্দর কারুকাজ। শিরদাঁড়া শিরশির করে ওঠে।




লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস
জন্ম ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।
গল্পকার। ঔপন্যাসিক।
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে থাকেন।
উপন্যাস : রাগ রঞ্জাবতী, সরমার সন্ততি, লালবল।

২টি মন্তব্য:

  1. ‘মরণের মুখেও কি সুন্দর কারোকাজ’----ভালো লেগেছে।

    উত্তরমুছুন
  2. চমৎকার ভিন্ন রকম ভাবনা এবং অনুভূতির পাঠ।

    উত্তরমুছুন