মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

অনির্বাণ বসুর গল্পঃ যারা কয়েদখানায় ঢুকে যায়

|| মহানিষ্ক্রমণ ||

সার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওরা। হেঁটে যাচ্ছে ঠিক নয়, হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, ভেড়া বা শুয়োরের পাল চড়াতে নিয়ে এসেছিল রাখালবালক; সময় হয়েছে ঘরে ফেরার, ফিরে আসছে তাই, মালুম হয়।

ভালো করে দেখলে, দৃষ্টিপাতে যদি সংবেদন থাকে, বোঝা যায়, ওরা ভেড়া নয়, শুয়োর নয়; মানুষ। পাল-পাল মানুষের সারি। কাতারে-কাতারে মানুষের ঢল। শরণার্থীস্রোত। রাখালবালকের পরনে জলপাইরঙা পোশাক, হাতে উদ্যত সঙিন। জন্ম-হওয়া-ইস্তক যে- দেশকে নিজের দেশ বলে জেনেছিল, ভেবেছিল নিজের করে, পূর্বপুরুষদের একদা ভিটেছাড়া হওয়ার অতীত তাদেরকে আজ আবারও বুঝিয়ে ছেড়েছে : একবার শিকড় ছিঁড়ে গেলে তা আর কখনও, কোথাও মেলে না। তাদের শুধু ঘুরে-মরা থাকে─এখান থেকে ওখান, ওখান থেকে সেখান। ছিন্নমূলদের কোনও তীর্থ নেই, শুধু তীর্থযাত্রা থাকে; পথ-শেষের কোনও নির্দিষ্ট সাকিন থাকে না, যাতায়াতটুকু থেকে যায় শেষতক। থেকে যায় সাড়ে-তিন হাত ভূমি। ভূমির তলদেশ। সৎকারের বা গোর দেওয়ার জন্য কাছাকাছি কাউকে পাওয়া না-গেলে বেওয়ারিশ লাশ তখন পড়ে থাকে আপন খেয়ালে─শেষ চরণচিহ্ন এঁকে-দেওয়া জমিতে। জলপাই পোশাকের রাখালদের নজরে এলে বেওয়ারিশ লাশেদের নিয়ে স্তূপ গড়ে ওঠে প্রথমে, তারপর জ্বলে ওঠে দাউদাউ আগুন─খাণ্ডবদাহন।

মানুষগুলোকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দুর্বল, অশক্ত শরীর একটানা হাঁটতে অক্ষম; বন্দুকের নলের সামনে, অথচ, বাধ্যত, হাঁটতেই হয়। জন্মভিটে ছেড়ে জন্মের মতো চলে যাচ্ছে; কিন্তু কোথায়, কোন দেশে যাচ্ছে─ওরা জানে না।

রাখালবালকেরা কিন্তু জানে। তারা জানে, ওরা আসলে অন্য কোনও দেশে যাচ্ছে না, দেশের মধ্যেই, ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে ওদের─অন্তত বন্দোবস্ত তেমনই।

ডিটেনশন ক্যাম্প : দেশের মাটিতেই অবরুদ্ধ দশা। জেলের ভিতর জেল। বড়ো কারাগারের মধ্যেকার ছোটো-ছোটো কালকুঠুরি।

অগণিত মানুষের দল, দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তিতে অবসন্ন, হয়তো ঈষৎ বেঁকে গেছে, কাঁধ ঝুলে পড়েছে, মাথা মাটির দিকে, হেঁটে চলে নিরুচ্চার। মাঝে-মধ্যে চেকপোস্ট পড়ে। তখন ক্ষণিকের বিরতি আসে হাঁটায়। চেকপোস্টের দায়িত্বে-থাকা জওয়ানেরা তখন মিলিয়ে দেখে নেয় এইসব উচ্ছিন্ন মানুষগুলোর পরিচয়পত্র। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, পাসপোর্ট─এমনই সব বহুবিধ পরিচয়পত্র, সরকারি শিলমোহরের ছাপ দিয়ে যা-যা তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল দেশ─রাষ্ট্র─প্রশাসন, তার সবই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বদলে ওরা পেয়েছে নতুন কার্ড, ল্যামিনেশন করা, চকচকে;


এক-একজনের ছবির সঙ্গে শুধু সংখ্যা লেখা ওতে। নামখানাও মুছে দেওয়া হয়েছে সযত্নে।

এই দলটা হাঁটা শুরু করার বেশ অনেকক্ষণ পর একটা চেকপোস্ট পড়ে। চেকপোস্ট পড়লে ক্ষণিকের স্বস্তি। চেকপোস্টে পানীয় জল মেলে। কোনও মেয়ে জল চাইলে ইচ্ছাকৃত ভিজিয়ে দেওয়া হয় তার গলা, বুক, বুকের কাপড়। ভিজে গেলে পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুই বুকের মধ্যবর্তী খাঁজ, বক্ষ-বিভাজিকা। অপুষ্টির আক্রমণে যাদের স্তন আর স্তন থাকে না, হেলে পড়ে মাই হয়ে যায়, তাদের তবু বাঁচোয়া; দিনের-পর-দিন সংসার থেকে দূরে-থাকা ক্ষুধার্তরা, অভুক্তরা চায় কচি মাংস, নরম মাংস।

ওদের হাঁটা শুরু হয় দিনের আলোয়। আলো থাকতে-থাকতে পৌঁছে যেতে হয় কোনও- একটা চেকপোস্টে। সেদিনের মতো সেই সেনাছাউনির লাগোয়া অংশেই ব্যবস্থা হয় রাত কাটানোর। অস্থায়ী তাঁবু পড়ে। গাদাগাদি করে সেই খোপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মানুষগুলোকে। সেনা-জওয়ানদের তখন দেখে কে! তাদের তখন পোয়া বারো। ষোলো আনার উপর আঠারো আনা। ভিতরের পশুটা জেগে উঠলে চোখ চকচক। শুধু হাতের সুখ, সারা শরীর জুড়ে সুখী অথচ জান্তব উল্লাস।

রাত তখন ক’টা হবে, দুটো কিংবা তিনটে, আবার একটা থেকে দুটোর মধ্যেও হতে পারে, পেচ্ছাপ পেলে তাঁবুর মধ্যে এরশাদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। পেচ্ছাপ করবে বলে ওই অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে তাঁবুর বাইরে এসেছিল সে। বাইরে সার্চলাইটের সন্ধানী আলো, কড়া নজরদারি। সেই সাদা হ্যালোজেনের কাছে চাঁদের আলোও ম্লান হয়ে আছে।

অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আচমকা ওই তীব্র, চোখ-ধাঁধানো আলোয় আরও বেশি অন্ধকার দেখেছিল এরশাদ। সেই সাময়িক অন্ধকার কেটে গেলে সে শুনেছিল গোঙানি; চাপা, কিন্তু একটানা একটা ঘ্যানঘ্যানে সুর। যদিও এত জোর পেচ্ছাপ পেয়েছিল তার, অতশত কিছুনা-ভেবে একটা গাছের আড়ালে চলে গিয়েছিল এবং যত ফাঁকা হচ্ছিল মূত্রথলি, শরীর জুড়ে তত প্রশান্তি নামছিল তার।

পেচ্ছাপ করতে-করতে তার খেয়াল হয় না যে, যেখানে সে পেচ্ছাপ করছে, গোঙানির শব্দ সেখানে আরও স্পষ্ট। পেচ্ছাপ শেষ করে আবারও তাঁবুর দিকে ফিরতে যাবে, সেই গোঙানি এসে ধাক্কা মারে এরশাদের অন্তরঙ্গ শ্রুতিতে : গোঙানি তখন আর্তনাদের মতো শোনায়।

সেই আওয়াজের কাছে পৌঁছতে চায় এরশাদ; ফলত সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষু, একে- ফিফ্‌টি এইট অ্যাসল্‌ট্‌ রাইফেল, কারবাইন, নাইন এমএম সেমি-অটোমেটিক পিস্তল আর সীসার বুলেটের কথা মনে আসে না তার। বরং একছুটে পৌঁছে যায় গোঙানির উৎসে। আপাতত শুধু উপরের উর্দিটুকুই শরীরে, বাকিটা পাশে দলা করা, তিন জওয়ানের দাঁত আরও ধারালো আরও চকচক করছিল, ওই আলো-আঁধারির মধ্যেই স্পষ্ট দেখেছিলএরশাদ। শিকার ঘিরে ওরা তিনজন। ওদের একজন শক্ত করে টেনে রেখেছিল  মেয়েটার হাত দুটো। দুই নম্বর মেয়েটির গাল চেপে ধরেছিল; ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঠোঁট ফাঁক হয়ে গিয়েছিল মেয়েটার, যেখানে নিজের পুরুষাঙ্গ ঠেসে ধরেছিল সে; গোঙানিও তখন তাই এমনই অস্পষ্ট যে, শোনা যায় না তেমন। তিন নম্বর তখন মেয়েটির দুই পায়ের ফাঁকে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে পুরুষাঙ্গ আর নাগাড়ে হাপরের মতো নামছে, উঠছে, আবার নামছে।

এরশাদ, জীবনে বন্দুক ধরেনি, ফলত চালায়নি কখনও, পড়ে-থাকা বন্দুক তুলে নেয়; সে জানেও না যে, হিমশীতল যে-বন্দুক সে তুলে নিয়েছে হাতে, ওটা আসলে একে-ফিফ্‌টি এইট, মিখাইল কালাশ্‌নিকভের বানানো একে-ফর্টি সেভেনের আদলে বানিয়েছিল উত্তর কোরিয়া, যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে যায় গোটা পৃথিবীর যুদ্ধবাজারে─দেশের সুরক্ষার কাজে, দেশের ধ্বংসের কাজে : বন্দুকবাজ দেখে বোঝা যায় না সে কোন পক্ষে। আপাতত এরশাদ─যেহেতু বন্দুকের স্বাভাবিক প্রয়োগ তার অজানা─লাঠির মতো ব্যবহার করে অ্যাসল্‌ট্‌ রাইফেল। তাতে কালাশ্‌নিকভের অসম্মান হয় কিনা বোঝা যায় না, কিন্তু এরশাদ ভেঙে যেতে থাকে ভিতরে, সামান্য যেটুকু আশা, যেটুকু সম্ভাবনা, যেটুকু স্বপ্ন বেঁচেছিল তার মধ্যে, ভেঙে যেতে থাকে; ভেঙে যায়। বন্দুকের দ্বিতীয় আঘাত মেয়েটির উপর চেপে-থাকা জওয়ানের পিঠে আছড়ে পড়লে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছিল সেই মরদ, আচমকা আঘাতের কারণে এতক্ষণ নিজের বুকের ভিতর দু’ হাত দিয়ে ঠেসে-ধরা মেয়েটির মুখের বাঁধন শিথিল হয়েছিল, সবটাই এমন আকস্মিক ঘটে গিয়েছিল যে,
চারপাশও স্থাণুবৎ, তক্ষুনি বুঝে উঠতে পারেনি কী করা উচিত এবং সেই চকিতে এরশাদ দেখেছিল মেয়েটির মুখ : জুলেখা।

অস্থায়ী তাঁবুগুলোয় নারী-পুরুষদের আলাদা-আলাদা থাকার বন্দোবস্ত। স্বভাবতই
এরশাদের পক্ষে ঘুণাক্ষরেও বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি যে, রাতভিতে এই পশুগুলোর কবল
থেকে যাকে বাঁচাতে চাইছে সে, সে আসলে তারই নিকাহ্ করা স্ত্রী।

পিষে-যাওয়া ওই অবস্থায় জুলেখাকে আবিষ্কার করে মুহূর্তের জন্য বাহ্যজ্ঞান লোপ পায় এরশাদের। এই সুযোগে অচৈতন্যপ্রায় জুলেখাকে ছেড়ে তাকে কবজা করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না তিন জওয়ানের। বন্দুকের কুঁদো থুতনিতে আছড়ে পড়ায় উপরের পাটির দাঁতে কেটে যায় নিচের ঠোঁট, মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে; এরশাদের কান-মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে থাকে, চারপাশ জুড়ে অন্ধকার নামতে থাকে আর তখনই ভারী বুটের আঘাত এসে পড়ে তার হাঁটুর পিছনে। ভারসাম্য রাখতে না-পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে। কপালে নাইন এমএম দিয়ে মারলে সে মাটি নেয়। মুখের রক্তে মাটি লাগে আর সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন হয়ে-যাওয়ার আগে তার কানে ‘মাদারচোদ, হাত উঠাতা হ্যায়! উঠা, আব হাত উঠা, বহেনচোদ!’─এমনই কিছু ছেঁড়া-ছেঁড়া কথার ভিড়, চুপিসারে, অনুপ্রবেশ করে যায়।


|| গঠনমূলক ||

গোটা দলটাকে এনে রাখা হয়েছে ক্যাম্পে। ক্যাম্প ঘিরে খানিক দূরে-দূরে সেনাছাউনি। সেনাদের কথোপকথন থেকে জানা যায় : সারা দেশ জুড়ে ছোটো-বড়ো এমন প্রচুর ক্যাম্প হয়েছে। বর্ডার আর ডিটেনশন ক্যাম্প─আপাতত এই দু’টিই তাদের বদলির জায়গা। দেশে আর কোনও সমস্যা নেই৷ শেষপর্যন্ত যারা নিজেদেরকে নাগরিক বলে প্রমাণ করতে পেরেছে, তাদের জন্য প্রশাসন থেকে থাকবার জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে অসহায় তারা বাধ্য হয়েই চলে গেছে সেই নতুন জনপদে।

সংশোধনাগার আর পাগলাগারদগুলো সব বদলে গেছে ডিটেনশন ক্যাম্পে। নতুন এই গঠনমূলক দেশে আর-একজনও পাগল নেই। বদলে-যাওয়া এই সমাজ পাগলদের নিকেশ করে ছেড়েছে; ফলত পাগলামি থেকে মুক্তি পেয়েছে মানুষ। একজনই এখন দেশের সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। মুছে গেছে সব অঙ্গরাজ্যের পরিচয়; কেউ মেনে নিয়েছে, কেউ-বা মানতে বাধ্য হয়েছে। সংবিধানের আর কোনও অস্তিত্ব নেই। অস্থায়ী ক্যাম্পের রাতগুলোয়, এইসব অনাগরিক জবরদখলকারীদের গমনাগমনের দিনগুলোয় প্রাকৃতিক কাজকর্ম শেষে পরিষ্কার হওয়ার জন্য প্রধানের নির্দেশে সংবিধানের একটি করে
পৃষ্ঠা দেওয়া হত ওদের। প্রধানের নির্দেশে দেশের কোথাও আর কালি-কলম-কাগজ তৈরি হয় না। প্রতিলিপিকরণের যন্ত্রপাতিগুলো সব সেনাবাহিনীর দখলে। প্রধানের উচ্চারণই এখন সংবিধান।

আরও শোনা যায় : যারা নিজেদের─অর্থ দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, আনুগত্য দিয়ে─দেশের নাগরিক বলে প্রমাণ করতে পেরেছিল, তাদের জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চলে তারা বসবাস শুরু করছিল যখন, ফাঁকা হওয়া স্থানগুলিতে তখন ঘরবাড়িগুলো ভাঙা পড়ছিল, মাপজোক চলছিল নতুনের। এখন সেইসব জায়গায় বিলাসবহুল প্রাসাদ, হোটেল, বড়ো-বড়ো বাজার, কৃত্রিম পর্যটন কেন্দ্র─আরও কত কী!

হাওয়ায় ভেসে-আসা এইসব টুকরো কথার মাঝে বোবা হয়ে-যাওয়া জুলেখা শুধু দেখে, এরশাদ বসে না, শোয় না─দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়। প্রথম-প্রথম দূরে বসে দেখত সে, তার মিঞাজান মাটির দিকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। হাঁটতও ওইভাবে, বিশ্রামও নিত ওইভাবে।

তারপর বেশ কয়েকবার তাকে হাত ধরে টানাটানি করেছে জুলেখা, চেষ্টা করেছে কাঠ দিয়ে বানানো পার্টিশন করা খোপে─যেখানে থাকে ওরা─সেখানে নিয়ে যাওয়ার। পারেনি। স্মৃতি সঙ্গ ছাড়লেও হাল ছাড়েনি। যখনই এরশাদকে চিনতে পারে, তখনই তাকে ঘরে নিয়ে আসার চেষ্টা করে সে।

এই ক্যাম্পের আর-এক কোণে মাথা গোঁজার সামান্য জায়গা পেয়েছিল জুবান শেখ।

চোখের সামনে নিজের বন্ধু, লেখক কলম আলিকে মরতে দেখেছিল সে। তাদের তাড়িয়ে- আনার সময় কলম আলি জিদ ধরেছিল, কাগজ-কলম না-নিয়ে সে কোথাও যাবে না; বলেছিল, সে লিখতে চায়, সে লিখতে চায় গল্প, লিখতে চায় ইতিহাস। শেষপর্যন্ত উপায়ন্তর না-পেয়ে সে, এমন-কি, এও বলেছিল : ‘গল্পই বলো আর ইতিহাসই বলো, সে তো আসলে তোমরা লিখছ─আমি তো মাধ্যম মাত্র।’ উত্তরে শুধু অট্টহাসি শোনা গিয়েছিল আর রক্তাক্ত কলম আলি মৃতদেহে বদলে যাচ্ছিল যখন, নম্বরের কার্ড হাতে

লাইনে দাঁড়িয়ে-থাকা জুবান শেখ শুনতে পেয়েছিল : ‘ইতিহাস লিখে গা, হারামখোর! শুয়ার কা অওলাদ! আব লিখ্‌ ইতিহাস! লিখ্‌, আপনে খুন সে লিখ্‌! যিতনা মর্জি লিখ্‌!’ জুবান শেখ, সেই মুহূর্তে, মৃত্যুভয়ে ভীত, বেজুবান, লাইনে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। সেই জুবান শেখ এখন নিজের মনে বিড়বিড় করে চলে শুধু। নিজেকে নিজেই শোনায় যেন

: ‘উই, দ্য পিপ্‌ল্ অফ...ইন্‌টু আ সভারেইন সোশ্যালিস্ট সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অ্যান্ড টু সিকিওর টু অল ইট্‌স্ সিটিজেন্‌স্
: জাস্টিস্‌, সোশ্যাল,

ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল; লিবার্টি অফ থট্, এক্সপ্রেশন, বিলিফ, ফেইথ অ্যান্ড ওরশিপ; ইক্যুয়ালিটি অফ স্ট্যাটাস অ্যান্ড অফ অপরচ্যুনিটি; অ্যান্ড টু প্রোমোট অ্যামং দেম অল ফ্রেটার্নিটি অ্যাসিওরিং দ্য ডিগনিটি অফ দি ইনডিভিজুয়াল অ্যান্ড দি ইউনিটি অ্যান্ড দি ইন্টিগ্রিটি অফ দ্য নেশন...─’। আপনমনেই বলে চলে। কাউকে পথে-ঘাটে দেখলেও ডাকে না, তাকে ধরে ঝুলে পড়ে না শোনানোর জন্য; কিন্তু, বলে চলে।

জুবান শেখের কাছে সংবিধান আছে; ঠিক সংবিধান নয়, সংবিধানের কয়েকটা পৃষ্ঠা। তবু আছে। সবার অলক্ষ্যে। অস্থায়ী ক্যাম্পের দিনগুলো থেকে জোগাড় করা বাতিল সংবিধানের পৃষ্ঠা, ফর্মা খানেক মতো।

জুবান শেখ হেঁটে যায় নিজের খেয়ালে। মাঝে-মধ্যেই তার দেখা হয়ে যায় এরশাদের সঙ্গে। এরশাদ, আগের মতোই, মাথানত, দাঁড়িয়ে থাকে। কখনও-সখনও চোখে পড়ে জুলেখাকে : শব্দহীন এক নারী পাথরের মতো অনড় এক পুরুষকে ঘরের দিকে টানে। সেই পুরুষের দু’ হাতে শক্ত করে ধরা থাকে পরিচয়পত্র; নামহীন সেই পরিচয়পত্র শুধু সংখ্যা জানান দেয়। তার চোখ মাটি দেখে, না তার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা─বোঝে না জুবান শেখ, অতিক্রম করে যায় তাকে।

একদিন যখন জুবান শেখ বিড়বিড় করতে-করতে হেঁটে আসছিল, সূর্য ঢলে পড়ছিল পশ্চিমে, মরে আসছিল দিনের আলো, দেখতে পায়, এরশাদকে নিয়ে জুলেখার নীরব টানাহ্যাঁচড়া। কী মনে করে ওদের কাছে এসে দাঁড়ায় সে। নিজের সঙ্গে নিজের বকবকানি থামিয়ে মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সবটা। কিছুটা হয়তো বোঝে, কিংবা কিছুই বোঝে না, তবু জুলেখাকে সরে দাঁড়াতে বলে। জুলেখা সরে দাঁড়ালে পর এরশাদের সামনে এসে দাঁড়ায় জুবান শেখ : ‘কার্ড দিখা, হারামখোর!’

এরশাদ ডান হাত সামনে তোলে। হাতে ধরা পরিচয়পত্র। সেটা হাতে নিয়ে মনোযোগের সঙ্গে দেখে জুবান শেখ, তারপর হঠাৎ এরশাদের দিকে কড়া দৃষ্টি হেনে বলে ওঠে :

‘শালা চারশো বিশি! ফৌজ কে সামনে খড়া হ্যায় অউর আভি তক হাত নেহি উঠায়া! হাত উঠা, বহেনচোদ, সার্চ করনা হ্যায়!’

এরশাদ হাতজোড়া আকাশের দিকে তোলে। জুবান শেখ তার সারা শরীর ছানবিন করে৷

তারপর বলে : ‘যা, অন্দর যা।’
বরাবরের মতো মাথানিচু, এরশাদ, বিনা প্রতিবাদে, কয়েদখানায় ঢুকে যায়।

৫টি মন্তব্য:

  1. কী বলি! অসামান্য লিখব। এটা ক্লিশে শোনাচ্ছে। সময়কে নিবিষ্ট ভাবে দেখলে, ভাষাকে নিবিড় ভাবে জানলে আর লেখার হাত তৈরি করেই এ আখ্যান লিখেছেন অনির্বাণ বসু। এ লেখা আমি যতজনকে পারি পড়তে বলব। পড়ার সময় মান্টোকে মনে পড়ছিল কখনও কখনও।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. নম্বরের কার্ড,সময়ের গল্প,সাহসের লেখনী,আগামীর অশনি সংকেত এর প্রতিচ্ছবি...

    উত্তর দিনমুছুন
  3. অনির্বাণ, এই লেখার পোষাক বিষাদ, এই লেখার গহনা ভয়... অনির্বচনীয়!

    উত্তর দিনমুছুন