মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

শাহনাজ মুন্নীর গল্প : রঙের হাটের বেচাকেনা


রেল লাইনের রেখা ধইরা সোজা চলতাছি। যেন আমি এমন একটা রেলগাড়ি যার কোন ইষ্টিশন নাই। এই রেললাইন কি আমারে কোন জঙ্গলের পথ দেখাইতে পারে? ঘন সবুজ শান্ত জঙ্গল? জানা নাই আমার। হয়তো মন্ডলের জানা ছিল। বহু দূরে রেলগাড়ির হুইসেল শোনা যায়, রেল লাইন তিরতির  কইরা কাঁপে আর আমি মন্ডলের কথা ভাবতে থাকি। 

সহজে মুখ খুলতো না মন্ডল, কিন্তু খুললে বড় আজব আজব কথা কইতো সে। রাইতভর ঘুমাইতো না, ঝিমাইতো। তার জবা ফুলের মতো লাল চক্ষু দুইটা দিন রাইত সারাক্ষণই থাকতো আঁধবোজা, ঢুলু ঢুলু। এইভাবেই হয়তো মন্ডল ঘুমাইতো, ঘুমায়া স্বপ্ন দেখতো, হয়তো ঘুম আর জাগরণের মধ্যে একটা পক্ষপাতশূন্য অবস্থায় যখন চেতন আসতো আর তার মনে কিছু মরমী ভাবের উদয় হইতো, সে আয়েশী গলায় আমার নাম ধইরা ডাকতো, কইতো, ‘বুঝলিরে ময়না, জমিনে চোর চামার গুন্ডা বদমাইশ বাইড়া যাওয়ায় আল্লা চইল্যা গেছে আসমানে, জমিনে অখন তিনার পাইক পেয়াদা ঘোরে আর ঘুষ খায় ...’ 

একেকটা কথার পরেই খুক্ খুক্ কইরা কাশি দিতো ম-ল আর ভোঁশ ভোঁশ কইরা কলকা টানতো। ধোঁয়া ছাড়তো বা ধোঁয়া গিলতো। তার ঘাড় ঝুইলা পড়তো বুকের উপর, সে গভীর নিঃশ্বাস নিতো, তারপর হুট কইরা ঘাড় উঁচায়া বলতো, 

‘ময়নারে, এই দুনিয়া রঙের হাটের বেচা কেনা, চারিদিকে গোলক ধাঁধা, স্বপ্নের সওদাগর’রা দেখ্ দাঁড়ায়া আছে ফাঁদ পাইত্যা....’ 

ওর অস্পষ্ট কথা আমি কিছু বুজতাম কিছু বুজতাম না। মন্ডলরে আসলে বোঝা কঠিন। ওরে বোঝার চেয়ে ওর ভালবাসাটা বোঝা হয়তো সহজ। বাপে যেমন জান পরাণ দিয়া ভালবাসে নিজের সন্তানরে, কোলে নিয়া আদর-আহ্লাদ করে মন্ডল ঠিক সেইরকমই ভালবাসতো আমারে, আমি অন্তর দিয়া বুঝতাম তার অন্তরের কাঁপন, ছুঁইতে পারতাম তার বুকের নরম জায়গাটা। মর্জিনা কি সেইজন্যই আমারে একটু হিংসা করতো? ঝুপড়ির বেড়ায় আঙ্গুলের ডগায় লাইগ্যা থাকা চুনটা ঘইসা একটু ঠেস দিয়াই কি সে বলতো, 

‘এই লেজটা না থাকলে আর শইল্যে রোম কিছু কম থাকলে মানুষ তোমারে ময়নার বাপ মনে করতো মন্ডল সাব।’ 

আমারে কোলে নিয়া পিঠের রোমের মধ্যে দুই আঙ্গুলে বিলি কাটতে কাটতে ম-ল তখন হাসতো আর বলতো, ‘ময়না তো আমার বাচ্চাই, আমি ওর বাপ ! নারে ময়না!’

আমি আমার ভাষায় কিচমিচ করতাম। কি একখান ফালতু নাম রাখছে দেখো ! দুনিয়ায় এত নাম থাকতে একটা বান্দরের নাম ও কি না রাখছে পাখির নামে। আমাদের বানর সমাজে নাম হয় কত সুন্দর! লম্ফবীর, দৌড়কুমারী, লম্বা লেজের রাজা, হাতুড়ি মুখা, কিচমিচানি এইরকম। ফরফর কইরা আকাশে উইড়া বেড়াইন্যা পাখি একদম পছন্দ না আমার।

মন্ডল কইতো, ‘ময়না তো আদরের ডাক, তুই আমার এই দিলের ময়না।’ 

আমার যেমন পাখি পছন্দ না, মর্জিনার তেমন আমারে পছন্দ না। ভালবাসা দূরের কথা সে হয়তো ঘিন্নাই করতো আমারে। একদম ওর কাছে ভিড়তে দিতো না, সারাক্ষণ দূর দূর করতো। 

‘সর, সর বান্দরের বাচ্চা, তোর মন্ডল বাপের কাছে যা, ভাগ্ ....’

মন্ডল আমার মা-বাপ সবই। দুলাল বাজিগরের কাছ থেইক্যা মন্ডল যদি আমারে উদ্ধার না করতো, তাইলে হয়তো আমার গলায় বান্ধা থাকতো শিকল, আর পায়ে ঘুঙুর, রাস্তায় রাস্তায় ডুগডুগির তালে নাচ দেখায়া আমার জীবন কাটতো। আমার মতো, মর্জিনারেও উদ্ধার করছিলো মন্ডল, মর্জিনার বুড়া বাপ, পঙ্গু ফকির লাল মিয়া, যে একটা চাক্কাঅলা কাঠের গাড়িতে চাদর বিছায়া বইস্যা থাকতো আর মর্জিনা সারাদিন তারে ঠেইল্যা নিয়া ভিক্ষায় যাইত, সেই লাল মিয়া তো দিছিলোই ওরে বাড়িওলি খালার কাছে বেইচ্যা। বাড়িওলি নির্ঘাত ওরে পাচার কইরা দিত মুম্বাই নাইলে করাচি। এর আগেও কাওরানবাজারের রেল লাইনের পাশের এই বস্তি থেইক্যা অনেক যুবতী মাইয়া নীরবে নিখোঁজ হইছে। কেউ জানতেও পারে নাই। কিন্তু মর্জিনা অন্য পদের, সে বিপদ টের পাইয়া শুরু করলো গলা ফাটায়া চিক্কার আর কান্দন। বস্তির কোনকিছুই কারো অজানা থাকার সুযোগ নাই, ফলে কান্দন শুইন্যা আরো অনেকের সাথে মন্ডল’ও গেল পঙ্গু ফকিরের ঝুপড়িতে আর গিয়া বুক চিতায়া লাল মিয়ার সামনে খাড়াইল। 

‘এই মেয়া’রে বাড়িওলির কাছে দেওন যাইবো না।’ 

মর্জিনার বাপ দাঁতমুখ খিঁচায়া খারাপ গালি দিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘হেইলে পরে, এই মাইয়ারে কেডা খাওয়াইবে? তুই?’

মন্ডল মাথা ঝাঁকায়। ‘হ।’ 

‘খানকির পোলা নিজেই খাওন পাওনা, তুমি খাওয়াইবা আরেকজনরে? ওই মর্জিনা তুই ভাল চাইলে বাড়িওলির লগে যা, বিদেশ গিয়া কাম করবি, ভাল থাকবি ..’ 

মর্জিনা বাপের আদেশ না মাইন্যা দৌড়ায়া আইসা মন্ডলের পেছনে মুখ লুকাইলে ফকির বুড়ার মুখে শুরু হয় যত রাজ্যের খিস্তিখেউর। মর্জিনারে সে এমনকি এইটাও বলে যে মন্ডল মর্জিনারে রক্ষিতা বানাইবার ধান্দা করতেছে এবং তারে দিয়া এখন ব্যবসা করাবে। মন্ডল এইসব কথার কোন জবাব দিলো না, খালি দুই পা আগায়া সামনে গিয়া বুড়ারে কাঠের বাক্স থেইক্যা কোমর সমান উঁচাতে তুইল্যা মাটির উপরে দিলো একটা আছাড়। ক্যাঁৎ কইরা একটা শব্দ হইল খালি। আর সাথে সাথে বুড়ার জবান বন্ধ, এক্কেরে হঠাৎ যেন থম্্ মাইরা গেল সে। 

মর্জিনা আইসা জুড়লো মন্ডলের ছন্নছাড়া জীবনের সাথে। মন্ডলের কী ব্যবসা আগে আমি বুজতাম না, খালি দেখতাম নানা কিসিমের মানুষ আসে রেললাইন বস্তিতে মন্ডলের ঝুপড়ি ঘরে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র, ধনী, গরিব, পকেটমাইর, রিক্সাঅলা, দোকানদার এমনকি পুলিশ পর্যন্ত। আসে টেকা দেয়, পকেটে পুরিয়া ভইরা বিদায় হয়। এখন আমি জানি মন্ডল শুকনা বেচে। শুকনা’রে কেউ কয় পুরিন্দা, কেউ কয় পুরিয়া। মন্ডল বেচে আবার খায়ও। মন্ডলের একটা দোস্ত আছে ফরিদ, ফরিদরে এই দেখি এই দেখি না। হঠাৎ হঠাৎ উধাও হইয়া যায় সে। শুনছি ও নাকি কোন মাজারের মুরিদ। যার কামই হইল মাজারে মাজারে ঘুইরা বেড়ানো। ম-ল যেমন আমারে ভালবাসে তেমন ফরিদও। আমি ফরিদের কোলে গিয়া বসি। ও আমার গলার নিচে আঙ্গুল দিয়া চুলকায়া দেয়। আমি ওর গায়ের গন্ধ শুঁকি। মন্ডলের মতো ফরিদও আমার কথা বুজে, কিছু জিগাইলে উত্তর দেয়। আমি কই, 

‘ও ভাই, শুকনা খাও কেন? নেশা করো কেন?’ 

ফরিদ কয়, ‘খাই সত্য, কিন্তুক নেশা তো করি না, ময়না। তুই দেখ্ এইগুলা গাছের ডাল, গাছের ফুল। বুছছস, এইডি খাইলে মাথা ঠান্ডা থাকে। ঝিম মাইরা পইরা থাকি। কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করি না। কাইজ্যা ফ্যাসাদ করি না। আপনমনে ডুব দিয়া থাকি। খাবি তুই? একবার খাইয়া দেখ না !’

ফরিদ সত্যি সত্যিই আমার মুখে কইলকা ঠাইস্যা ধরলে আমি কিচমিচ কইরা ওর কোল থেইক্যা লাফ দিয় উইঠা আসি। দেখি ম-লও হাসে। কয়, ‘টান দে রে ময়না, একটা টান দে, আখিরাতে সবই পাবি, শুকনা পাবি না .... হে হে হে...’

ফরিদও তাল দেয়, সুর কইরা কয়, ‘আজরাইলে যখন আইবো, হাতে এক খান বোতল থাকবো, দমে দমে ঢোঁক গিলিবে তোমায় দেবে না-’ 

সেই প্রথম আমার ওই আশ্চর্য জিনিসের স্বাদ নেয়া। মন্ডল শিখায়া দিল কইলকা কেমনে ধরা লাগে, কেমনে চোখ ব্ইুজ্যা, এক্কেরে পেটের ভিতরে থেইক্যা দম নিয়া কইলকা টান দিতে হয়। দিলাম টান, একটা ধাক্কার মতো লাগলো প্রথমে, মনে হইল মাথা ঘুইরা পইড়া যামু তারপর কেমন যেন মাথাটা হঠাৎ খালি খালি লাগল, আহ্ কেমন একটা অদ্ভুত সুখ ! বুকের মধ্যে আত্মার ধুকপুকানি লাগে যেন আরো বাইরা গেল। আমার হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়লো, মায়ের দুধের বোটা মুখে নিয়া তার বুকে ঝুলতেছি, জগৎটা কেমন অদ্ভুত লাগতাছে। যেন লাল-সবুজ কচিপাতা ঘেরা মহুয়ার বনে দুলতেছি, বুকের ভিতরে থমকায়া থাকা চাপা কান্নার পাথর যেন গলতেছে, গলতেছে, সময় থাইম্যা গেছে, ঝিরঝির কইরা পানি পড়তেছে পড়তেছে, অনেক দূর থেইক্যা শুনি মন্ডলের গান ‘নেশা লাগিলো রে ....’ 

এমনে কইরা আস্তে ধীরে আমিও নেশাখোর হইয়া গেলাম।

‘হায় কপাল! মন্ডল সাব, শেষ পর্যন্ত বান্দরটারেও আপনে নষ্ট করলেন! বনের পশুরেও খারাপ বানাইলেন?’

মর্জিনা কপাল চাপড়ায়, মন্ডল তার ঢুলু ঢুলু লাল চোখ একবার খুইল্যা আবার বন্ধ কইরা ফালায়। মর্জিনা অখন পরাণ ভইরা আমারে আর মন্ডলরে গালিগালাজ করে, কাছে গেলেই জুতা খুইল্যা আমারে দৌড়ানি দেয়। আমি মুখ ভেংচি দিয়া কিচমিচ কইরা ঝুপড়ির চালে উইঠা যাই আর বইসা বইসা ঝিমাই। চাল থেইক্যা অনেক দূর পর্যন্ত রেল লাইন দেখা যায়। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত কত রকমের মানুষজনের চলা ফেরা যে দেখতে পাই। ঝিমাইতে ঝিমাইতে সেইসব দেখি, নিজের মনে চিন্তা ভাবনা করি, কখনো মহাশুন্যে ঘুরপাক খাই, কখনো মাটিতে লুটাপুটি করি, চৌদ্দ কিসিমের মানুষ দেখি, লম্বা, খাটো, সাদা, কালো, মন খারাপ করা মানুষ, মোবাইলে কথা কওয়া মানুষ, আস্তে আস্তে হাঁটা মানুষ, উর্দ্ধশ্বাসে ছোটা মানুষ, মোটা মানুষ, শুকনা মানুষ। হঠাৎ একদিন দেখি সেই সব মানুষের ভীড়ে ্আরো কিছু অন্যরকম মানুষ হাঁইট্যা আসে। ওরা খদ্দের না, খদ্দেরের ভিরু চোরের মতো চঞ্চল চাহনী আমার চেনা, এদের চাহনী ভিন্ন রকম, এদের দেখলে মন্ডল পালায়, মন্ডলের সঙ্গী সাথীরাও পালায়। ওদের দেইখ্যা ঝিমানি ছাইড়া আমি লাফ দিয়া উঠি, মন্ডলরে খুঁজি সাবধান করার জন্য। যাতে সে পালায়া যায়। 

কিন্তু আমি মন্ডলরে খুঁইজ্যা পাওয়ার আগেই তারা মন্ডলরে পাকড়াও করে। হাতকড়া পরায়া সোজা নিয়া যায় শশ্বুরবাড়ি। রাস্তার দুইদিকে সারি সারি দোকান আর মানুষজনের ভীড়, এর মধ্যে দিয়া আমি মন্ডলের গাড়ির পিছনে ছুটি আর চিক্কুর দিয়া কান্দি। আমারেও সাথে নেও তোমরা। মন্ডল আমার মা, আমার বাপ। মন্ডল না থাকলে আমি তো এতিম, আমি তো একা। কে দিবে আমার খাবার? কে নিবে আমার খবর? কিন্তু চাইর চাক্কার গাড়ির সাথে চাইর হাত-পায়ে দৌড়ায়া’ও আমি কী আর পারি? 

পথের ধারের মানুষ আমারে নিয়া বিদ্রুপ করে, বাচ্চা পোলাপান ঢিল মারে। ঘরে ফিরা আসি, দেখি, ঝুপড়ি ঘরটা চুপচাপ খালি পইরা আছে। যেন আমার মনের মতোই ঘরটাও খাঁ খাঁ করতেছে, হাহাকার করতেছে, কাতর হইয়া, শুন্য হইয়া বুক চাপরায়া কানতেছে। মাটিতে পাইত্যা রাখা ময়লা চটের উপরে গড়াগড়ি দেই। ক্ষিধা লাগে, নেশা করার তৃষ্ণা জাগে। মন্ডল তুমি কই? আমার কান্দন কি শুনতে পাও না? আমার কাছে কেন আসো না তুমি? সন্ধ্যা ঘনায়া অন্ধকার হইয়া আসলে ঝুপড়ির ঝাপ ঠেইল্যা কেউ একজন ঢোকে। দেখি মর্জিনা। সে চুপচাপ বাত্তি জ্বালায়। তারপর আঁচলের খুট থেইক্যা দুইটা কলা আর পাউরুটি বাইর কইরা আমার দিকে ছুইড়া দেয়। সঙ্গে কাগজে পেঁচানো দুইটা মোটা বিড়ি। 

মর্জিনারে বস্তির লোকজন চিনে মন্ডলের বউ হিসাবেই। কিন্তু বাস্তবে ওদের সম্পর্কটা অদ্ভুত। মর্জিনার পঙ্গু বাপের চিল্লাচিল্লিতে কাওরানবাজার মসজিদের মাওলানা সাব মুখে মুখে কলমা পড়ায়া ওদের একটা বিয়া দিছিলো ঠিকই, কিন্তু ওরা একঘরে থাকলেও একসাথে থাকে নাই। মন্ডল আসলে থাকার চেষ্টা করে নাই, জোর জবরদস্তিও করে নাই, মর্জিনাও নিজের গরজে মন্ডল সাবের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। দুইজন নারী পুরুষ এক ঘরে দুই কোণায় পইড়া থাকছে। আমাদের বানর সমাজে এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু মানব সমাজ অন্যরকম। তবে এখন যখন মন্ডল আর আমাদের সাথে নাই, মন্ডলের ব্যবসা নাই, ফলে কামাই রোজগারও নাই, কিন্তুক তার পোষ্য এই ময়না আর মর্জিনা দুইজনেরই তো পেট আছে, সেই পেটের ক্ষিধাও আছে, সেই ক্ষিধা কিভাবে মিটবে? আমি এইখান ওইখান থেইক্যা চুরি চামারি করি, কলাটা মূলাটা নিয়া আসি, বাজার ফেরত মানুষরে খামচি দেই, মানুষ ভয় পায়, কেউ কেউ দয়া কইরা কিছু দেয়। কিন্তু মর্জিনা? ও কি করবে? 

বস্তির লোকজন বলাবলি করে,‘মন্ডলের ব্যবসার সব টেকা মর্জিনা লুকায়া রাখছে ... ’ 

কথাটা সত্যি না মিথ্যা জানি না। আমিতো দেখি, কাওরানবাজারে সবজির ট্রাকের তলে পইড়া থাকা পেয়াজের খোসা, থেতলাইন্যা শাক আর পচা আলু-পটলের ভিতর থেইক্যা সবজি টুকায়া বিক্রি করে মর্জিনা, নয়তো আড়তদারদের ফাই ফরমাশ খাটে। এক’দুইশ টাকা যা পায়, তা দিয়া আমার আর ওর একবেলা চলে তো আরেক বেলা উপাস থাকি। তার উপরে বাজার হইল বারো রকম মানুষের মেলা, খারাপ মানুষ তো সবখানেই আছে। যারা সুযোগ বুইঝ্যা শইল্যে হাত দেয়, মন্দ কথা কয়। বুঝতে পারি, মর্জিনা মাঝে মাঝে অতিষ্ঠ হইয়া পড়ে, একলা একলা কান্দে, চোখ মুছে। আমি কাছে গেলে আমারে ‘হারামির বাচ্চা’ বইলা গাইল দেয়, ঠ্যাং উঁচায়া লাত্থি দেখায়, দৌড়ানি দেয়। 

ঝুপড়ি ঘরের দরজায় মন্ডলের বাঁধা খদ্দেররা উঁকি ঝুঁকি মারে। মাল খুঁজে। একদিন দেখি, এদিক ওদিক তাকাইতে তাকাইতে জাকির হোসেন আসলো। ময়লা প্যান্ট সার্ট পরা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চক্ষু দুইটা সারাক্ষণই চঞ্চল। একটু পর পর সে থুতু ফেলে আর ঘন ঘন চোখে পলক দেয়। জাকির হোসেন মর্জিনারে কয়, ‘মন্ডলের ব্যবসাটা তুমি ধরো। আমি মাল সাপ্লাই দিমু...’ 

‘না, আমি এই হারামের ব্যবসা করি না।’

মর্জিনা এক কথায় নাকচ কইরা দেয় জাকিরের প্রস্তাব। কিন্তু জাকিরের অসীম ধৈর্য্য। সে প্রতিদিনই আসে আর গলার স্বর নিচু কইরা মর্জিনারে বোঝায়। যাওয়ার আগে জোর কইরা মর্জিনার হাতে টেকা গুইজা দেয়। বাজার সদাই দিয়া যায়। মাঝে মাঝে মায়া কইরা আমার মাথায় হাত বুলায়। কয়, ‘আরে, এইটা মন্ডলের সেই নেশাখোর বান্দরটা না?’

আমার ইচ্ছা করে ওর হাতে জোরে একটা কামড় বসাই। কিন্তু নিজেরে সামলায়া রাখি। দেখি, মর্জিনার মন ধীরে ধীরে নরম হয় আর সে জাকিরের ফাঁদে আটকায়। আসলে, কে যে মর্জিনারে রাজি করায়া ছাড়ে বুঝি না, জাকির নাকি চরম অভাব? 

খদ্দেরের তো কামাই নাই, তারা ঠিকই গন্ধ শুইক্যা ঝুপড়িতে হানা দেয়। মন্ডলরে ওরা ডাকতো মামা, এখন মর্জিনারে ডাকে মামী। তবে মর্জিনার ব্যবসার রীতি মন্ডলের চেয়ে ভিন্ন। সে বস্তির আরো যত গরীব মহিলা আছে তাদের আর তাদের বাচ্চা পোলাপানরেও এই ব্যবসায় জড়ায়া নেয়। বস্তির মহিলারা এখন ডালায় সাজায়া দিনের আলোতে সবার সামনে ‘পুরিয়া’ বেচে। ছোট বাচ্চারা তরুণ আগন্তকদের কাছে গিয়া ফিসফিস করে, ‘মামা, পুরিয়া লাগবো?’ 

‘মামা শুকনা নিবেন? আসেন আমার সাথে....’

ব্যবসা জইম্যা ওঠায় আমাদের খাওনের অভাব দূর হইছে। কিন্তু মন্ডলের লাইগ্যা আমার পরাণটা এখনো পোড়ে। কই গেলো মন্ডল? কবে আবার আইবো? কত দিন তারে দেখি না ! মর্জিনার কাছে জিগাই, ‘মন্ডলের জেল ফাঁস কি হইছে ? একটু খবর নিবা না? এত্ত নিঠুর তুমি, এত্ত বেদরদি ....’ 

কিন্তু ও আমার ভাষা বোঝার চেষ্টা করে না। দয়া কইরা সামান্য খাবার দেয় ঠিকই কিন্তু ওই পর্যন্তই, আদর তো করেই না বরং হাতের কাছে কিছু পাইলে সেইটা দিয়াই ‘যা ভাগ, বান্দরের বাচ্চা’ বইল্যা তাড়া করে।

আমি ঝুপড়ির চালে বইসা একলা ঝিমাই। গায়ে রোইদ লাগাই, কান পাইত্যা শহরের দুঃখী বাতাসের গুনগুন গান শুনি, বেচারা বাতাস শহরের দালানে ধাক্কা খাইয়া ভাঙা মন নিয়া আবার বনাঞ্চলে ফিরা যায়। আমারো মনটা ফিরা যাইতে চায়, ইচ্ছা করে ছোটবেলার মতো মায়ের বুকের দুধে কামড় দিয়া ঝুইল্যা থাকি, এক গাছ থেইক্যা আরেক গাছের ডালে লাফায়া বেড়াই। আমার দলের অন্যদের সাথে ঘুরি ফিরি ছোটাছুটি করি আর আপনমনে দাঁত বাইর কইরা কিচিরমিচির করি। নাইলে মন্ডলের মতো উদাস কন্ঠে কই, ‘বিচিত্র এই ঢাকা নগর, কে খেলাড়ি কে বাজিকর?’

ঝুপড়ির ভাঙা চালে বইসা যেমন রোইদ-বৃষ্টি আর কুয়াশা টের পাই, তেমনই টের পাই হাতে টেকা পয়সা আসার পর মর্জিনার মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। ওর গলার স্বর আরো কঠিন, আরো চোখা আরো উঁচা হইছে। চেহারা ভরাট হইছে, চলা-ফেরা-কথা বার্তার মধ্যেও সেই নরম নেতাইন্যা ভাবটা নাই কেমন শক্ত, কাঠ কাঠ, লোহা লোহা, পাথর-পাথর ভাব। বস্তির সবাই দেখি বেশ সমীহ কইরা চলে ওরে, এমনকি জাকির হোসেনও এখন ওর সামনে হাত কচলায়, গদ গদ ভঙ্গী করে। কয়দিন আগে চ্যাংড়া জাহাঙ্গীর ঠিকমতো মাল বিক্রির টেকা না দেওয়ায় ওরে ক্ষুর বাইর কইরা শাসাইছে মর্জিনা। শান্ত গলায় কইছে, ‘এরপর আর কথা নাই বাইন্ধা আইনা গলায় খালি একটা পোচ দিমু আর কিছু না ...’

বস্তির সবাই জানে মর্জিনা যা কয় তা সে কইরা ছাড়ে। যদি কয়, লাশ ফালায়া দিমু, তাইলে ঠিকই রেললাইনের ধারে লাশ পড়ে। যদি কাউরে কয়, এলাকা ছাড়া করুম, তাইলে এই তল্লাটে সে আর ভিড়তে পারে না। মর্জিনা সাংঘাতিক মেয়ে মানুষ। পোষা একটা গুন্ডা বাহিনী বানাইছে ও। নিজে কিছু করে না। পুলিশ, সাংবাদিক, গুন্ডা, ছিচকা মাস্তান সবই সামলায় ওরা, যেন সবাই তাদের হাতের পুতুল। মর্জিনা এখন বস্তির রাণী, ওদের মালকিন। এই মর্জিনারে আমিই ঠিকমতো চিনি না। এত দিন তফাৎ থাকা মন্ডল, যদি ফিরা আসে, তবে সে কি চিনতে পারবে এই বদলায়া যাওয়া মর্জিনারে? 

আমার বয়স বাড়তাছে বুঝি, শইল্যে আর আগের মতো লাফালাফি করার জোর বল পাই না। মন্ডলের মতোই একখানে বইস্যা ঝিমাই। তিনবেলার কলা পাউরুটি, শসা গাজর আর পুরিয়ার বন্দোবস্ত কইরা দিছে মর্জিনা। মনে হয়, ও আমারে কিছুটা মায়া করে, হয়তো কিছুটা দয়াও করে। কিন্তু এই দয়া-মায়ায় আমার মন ভরে না। আমার খালি মন্ডলের কথা মনে পড়ে, বুকের ভিতরে কষ্ট হয়, যেন কেউ হাতুড়ি দিয়া ইট ভাঙতাছে, ভাঙতাছে। মরার আগে একবার কি তার মুখটা দেখতে পামু? কত মানুষ আসে যায়, তাদের মুখের মধ্যে আমি মন্ডলের মুখটা খুঁজি। পাই না। দিন দিন আশা ছাড়ি, আর শুনতে পাই মর্জিনা জমি কিনছে, হেই কোন যাত্রাবাড়ি পার হইয়া সাইনবোর্ড এলাকায়। হয়তো সেইখানেই বাড়ি করবে, হয়তো কাউরে বা জাকির হোসেনরে বিয়াও করবে। করুক যা ইচ্ছা, তারে রুখে কে? 

আমার দিন যায় আমার মতোই একলা। একদিন এক চৈত্র মাসের খরখরা দুপুর বেলা। বাতাসে ধূলার সঙ্গে শুকনা পাতা চক্কর দিয়া উড়তাছে। দূরে তাকাইলে চক্ষে কেমন ধাঁধাঁর মতো লাগে। সেই ধাঁধাঁর মধ্যে দেখি একটা মুখ কেমন জানি চেনা চেনা লাগে। হায় ! হায়! এইটা কী মন্ডল? সেই রকমই তো চোখ মুখ, ভুরুর উপরে কপালের কাটা দাগ, সেইরকমই সামনে ঝুইক্যা ঝুইক্যা পা ফেলা, শরীরটা লাগে যেন আগের’চে কাহিল, মুখে দাঁড়ি গোফের জঙ্গল, তাতে সাদা কালোর মিশ দেওয়া, তবু আমি ঠিক চিনি এইটাই মন্ডল। তার বুকের উপরে ঝাঁপ দিয়া পড়ি, যেন একটা সবুজ নদীর শীতলতা আমারে জড়ায়া ধরে। যেন পোড়া অন্তরটা বহুবছর পর ঠান্ডা হয়। 

মন্ডল কয়, ‘আরে ব্বাস, ময়না, তুই আমারে মনে রাখছস..’

বস্তিতে আমাদের ঘিরা একটা ভীড় জইম্যা যায়। ‘মন্ডল ফিরা আইছে-এ-এ-’ এমন একটা রব উঠে ভীড়ের মইধ্যে। অনেক রকমের গুঞ্জনও শুরু হয়। তবে সেই সবে ভ্রুক্ষেপ নাই মন্ডলের। সে ঝুপড়ির বন্ধ ঝাঁপের সামনে ঢুলু ঢুলু চোখে পা ছড়ায়া বইসা থাকে। আমারে চীনা বাদাম খাওয়ায়, নিজেও একটা দুইটা দানা মুখে দেয়। গুণগুণ করে, ‘রঙ্গিলা দেশের নাইয়া, মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া ...’ 

বিকাল ঘনায়া আসলে মর্জিনা আসে, তার সাথে জাকির হোসেনও আসে, আশে পাশে দেখি মর্জিনার গুন্ডাবাহিনীর সদস্য আসলাম, নাগু, রাজু আর জামাল’ও আছে। 

‘কি অবস্থা মন্ডল সাব? ফিরলেন অবশেষে....’ মর্জিনা বলে। উত্তরে আধবোজা চোখ খুইল্যা একটু হাসে মন্ডল। ‘লেনা-দেনা কিছু মনে হয় বাকি আছে...’ সে বলে ।

মর্জিনা আঙ্গুল উঁচা কইরা চিক্কার দেয়, 

‘উহু, কোন কিচ্ছু নাই, জায়গা খালি থাকে না মন্ডল সাব। বাঁচতে চাইলে আপনে ফুটেন। দৌড়ের উপরে রাস্তা মাপেন।’

মন্ডল হা হা কইরা হাসে। বলে,‘মুসাফিরের ঠিকানা দরকার নাই ....’

মর্জিনা মুখ ঝামটা দেয়, ‘ভাবের কথা রাখেন মন্ডল সাব, তিন দিন সময় দিলাম, এই বান্দর নিয়া বিদায় হন।’ 

মর্জিনা তার সাঙ্গপাঙ্গোসহ নিজের ঝুপড়িতে গিয়া ঢুকলেও মন্ডলের হাসি যেন আর ফুরায় না। সে আঙ্গুলের কর গোনে ‘-তিন-দিন---এক-দুই-তিন--এক-দুই-তিন- ’

কিন্তু তিন দিন পার হইতে পারে না, দ্বিতীয় দিনেই ঘটনা ঘইট্যা যায়। রেল লাইনের পাশে একটা ঝোপে ঘেরা জায়গায় পাওয়া যায় মর্জিনার গুন্ডাবাহিনীর সদস্য নাগুর উপুড় হইয়া পইড়া থাকা লাশ। ক্ষুরের পোচে কেউ তার গলা সমান দুই ফাঁক কইরা দিছে। পুলিশ আসে। লোকজন নানা কথা কয়। কেউ কয়, নাগু পুলিশের ইনফর্মার হইছিল, কেউ কয় নিজেগো মধ্যে বখরা নিয়া গন্ডগোল কইরা নাগু খুন হইছে, কেউ কয় মর্জিনা খুন করাইছে। সত্যি মিথ্য জানি না। খালি দেখলাম পুলিশ পরথমে নাগুর লাশ উঠায়া নিয়া গেল, তারপরে আইসা ধরলো মন্ডলরে। আগের মতোই হাতকড়া পরায়া নিজেদের গাড়িতে উঠাইল ওরে। 

মন্ডল শেষ একটা হাসি দিল আমার দিকে তাকায়া, হৃদয়টা ভাইঙ্গা খান খান হইয়া গেল আমার। বুঝলাম মন্ডল আর ফিরবে না। আর কোনদিন ওর সাথে দেখা হবে না আমার। এই ঢাকা শহরে আর কার টানে থাকুম আমি। ও রেললাইন কত দূরে যাও তুমি, এই বেলা আমারে নিয়া যাও। হাঁটি তোমার সাথে, চাইর হাত পায়ে, যদি মরার জন্য একটা জঙ্গল পাই। ঘন সবুজ শান্ত জঙ্গল। 










কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন