মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

চন্দন মন্ডল : গল্পের কাছে কী চাই



গল্পের কাছে কী চাই এ রকম ভাবনা থেকে প্রশ্ন ওঠে মনে। চিন্তাটি আসলে কার? পাঠকের নাকি লেখকের? নিশ্চয়ই পাঠকের। কিন্তু লিখছি যে, সে তো আমি।একজন লেখক। তাহলে আমার ভূমিকাটি এখানে পাঠকের। 

তা লেখকও পাঠক বৈকি। অন্য কারো গল্প যখন তিনি পড়ছেন তখন তো তিনিই পাঠক এবং আজকের দিনে মননশীল পাঠকেরই খোঁজ এটা যে গল্পে সে কী চায়। অতএব খুব গুরুত্বপূর্ণ এই জিজ্ঞাসা। তাই সেই জিজ্ঞাসার সূত্র ধরে নিজের পাঠকসত্তার দিকে একবার দৃষ্টি ফেরানো যাক। 

বস্তুত পাঠক হিসেবে যদি নিজের পাঠকসত্তার দিকে তাকাই, তাহলে দেখব যে ছেলেবেলা থেকেই আমার পাঠাভ্যাস ছিল এবং সেটা সর্বভুক পর্যায়ে পড়ে। হাতের সামনে যা কিছু পেতাম গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম।এমনকি ঠোঙার লেখাও পড়েছি। 

শর্ত একটাই,ভাল লাগতে হবে। 

বাল্যকালে ওই বয়সে সবাই নিখাঁদ গল্প পড়ে। রূপকথা থেকে শুরু করে ভুতপ্রেত,দেও-দানো, দেবদেবীর আখ্যান,রহস্যরোমাঞ্চ,গোয়েন্দা কাহিনি, শিকার,হাসির গল্প কী নয়!গল্পের ভেতরে ক্যারিশমা খোঁজার বয়স তখনও হয়নি।তারপর আস্তে আস্তে পঠনপাঠনের জগতে দিন যত গেছে, একটা জিনিসই বুঝেছি যে এখন ভাল লাগাটা একটু একটু করে কঠিন হয়ে গেছে। 

আগের মতো চট করে কোনো কিছু পড়ে ফেলতে পারি না।ভালও লাগে না।পাঠকসত্তায় আগের সেই সারল্যময়তা আর নেই।আজকাল গ্রন্থপাঠ বলি, গল্পপাঠ বলি সরল আনন্দ নয় বরং মননশীলতা খোঁজে মন।গল্পের কাছে চাই আনন্দ, ভাল লাগা, এমনকী ঘোর, সেসব ঠিক আছে কিন্তু পাশাপাশি মননশীলতাও চাই। তা না থাকলে, খুব স্পষ্ট করে বলি,চলবে না।খুব সরল গল্প পড়তে পারি না।শুরু করি যদিওবা,কিন্ত শেষ করতে পারি না।এটি খুব বাস্তব এবং পাঠক হিসাবে প্রাইমারি চাওয়া। 

প্রশ্ন উঠতে পারে সবাই কি মননশীল পাঠক? 

মননশীলতার মাপকাঠিই বা কী?কিংবা ছেলেবেলায় যে সরলানন্দে গল্প পড়তাম,পড়ে হাসতাম,মন খারাপ হতো,ভুতের গল্পে ভয়ে লেপের নিচে কুড়িমুড়ি দিয়ে মায়ের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকতাম সেই পাঠকসত্তার কি কোনো অস্তিত্ব নেই আজ?অবশ্যই আছে।গল্পের আদি পাঠক তো সে-ই।তার কাছে ভাল লাগাটাই মুখ্য বিষয় ছিল।অতএব তাকে তো ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না।আবার মননশীলতার কথাও তো খুব বড় করে বলছি।তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা?মননশীলতা এবং ভাললাগার মধ্যে দ্বন্ধ?নাকি একই সঙ্গে বসবাস মুদ্রার এপিঠওপিঠের মতন? 

প্রকৃতপক্ষে,এ দুইয়ের ভেতরে বিরোধিতা নয়।বরং খুঁজে পেতে মাঝামাঝি একটা জায়গায় যদি নোঙর ফেলা যায় তাহলে মোটাদাগে দেখব যে, 

আমার মতো একজন পাঠক এ অবস্থানেই নিজেকে দেখতে স্বছন্দ বোধ করে।অর্থাৎ গল্পে মননশীলতা থাকবে ঠিক আছে কিন্তু একই সাথে ভাললাগার বিষয়টিও থাকতে হবে। 

বলি, কীসের ভিত্তিতে গল্প পাঠককে চুম্বকের মতো আটকে রাখে? গল্পে কী এমন থাকে যে পাঠক পড়ে মুগ্ধ হয়?পশ্চিমের (ফ্রান্সের) গি দ্য মোপাসাঁ কিংবা আমাদের রবি ঠাকুর ছোটগল্পের সবগুলো প্রকরণ এমনভাবে বেঁধে দিয়ে গেছেন যে, খুব বেশি দূর যেতে হয় না।লেখকের সাহিত্যবোধ, 

ভাষা,ভাষার অলংকার, শব্দচয়ন, দেখবার চোখ, 

পারম্পর্যবোধ,দেশ-কাল-সমাজ ইত্যাদি সম্পর্কে 

ধারণা,জীবনবোধ,পর্যবেক্ষণক্ষমতা সর্বোপরি লিখনক্ষমতা থাকলে গল্প যা-ই লিখুন,যে বিষয় নিয়েই লিখুন, সেটা উৎরোবেই।গল্পে থাকবে টানটান উত্তেজনা,টেনশানে পড়ে যাবে পাঠক, হঠাৎ করে বাঁক নিয়ে অন্যতর অকল্পনীয় কোনো জায়গায় চলে যাবে গল্প,পড়তে পড়তে ধন্ধে পড়ে যাবেন পাঠক এবং বহুমাত্রিক একটা উপলব্ধির জায়গায় নিয়ে গিয়ে গল্প আচমকা ছেড়ে দেবে তাকে নাটকীয়তায়!এবং পরিশেষে অতৃপ্তি থেকে যাবে পাঠকের মনে হঠাৎ করে গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে।তবেই না সেটা গল্প হয়ে উঠবে চূড়ান্ত বিচারে!পড়ে মনে হবে যেন,আহা!কী যেন নাই!কী যেন পেলাম না! 

রবি ঠাকুরের ভাষায়,অন্তরে অতৃপ্তি রবে/সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হইয়াও হইল না শেষ! 

তো এর পর আর কি কিছু বলার থাকে গল্পে কী চাই তা নিয়ে?হ্যাঁ,আর একটা কথা বলবার আছে। গল্পের আকার নিয়ে।খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।বলতে চাই,গল্পের আয়তন অত্যধিক বড় হওয়াটা সহনীয় নয়।বোধহয় পছন্দও করে না আজকের পাঠক।চায়ও না।অত সময় কোথায় তার?তাই গল্পের আকার ছোট চাই আমি।বিন্দুতে সিন্ধু বলে একটা প্রবাদ আছে বাংলায়।ছোট ছোট কথায়,অল্প বাক্যে বৃহৎ-কে তুলে আনতে পারার ক্ষমতা থাকা চাই লেখকের মধ্যে। যা তিনি প্রয়োগ করে দেখাবেন গল্পে।এবং সেটা গল্পকারেরই দায়িত্ব।খুব জরুরি কথা এটা।অন্তত ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে।এখনকার এই গতির দুনিয়ায়, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার জীবনে গল্পের বৃহদাকার আয়তন একধরণের নেতিবাচক ধারণারই জন্ম দেয় বলে আমার বিশ্বাস। 

যে লেখক গল্পে এসব মণিমুক্তা দিতে জানেন, 
ছড়াতে জানেন,সেই কৌশল যিনি রপ্ত করেছেন তিনিই নন্দিত লেখক। তাঁর গল্প তৃষ্ণা নিয়ে পড়বে পাঠক।পড়বেই।কারণ, তিনি জানেন গল্পে কী কী সব অনুষঙ্গ থাকতে হয়। 

গল্পের বিষয়বস্তু খুব একটা জরুরী নয়। ফর্মও কোনো মুখ্য বিষয় হতে পারে না।যে কোনো বিষয়েই উৎকৃষ্ট গল্প রচিত হতে পারে যদি প্রকরণ ঠিক রেখে লেখা যায়।আবার এগুলো এমন কোনো সূত্র নয় যে সূত্র মেনে লিখলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। 

বস্তুত লেখকের লিখনক্ষমতার উপর নির্ভর করে সবকিছু।যিনি যে মানের লেখক তাঁর গল্প সেই মানেরই হয়।সৃষ্টিশীলতা কোনো নিয়মে বিশ্বাস করে না।কলাকৌশল অনুসরণ করে গল্পরচনায় খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না।প্রসঙ্গক্রমে, লেখালেখি সম্পর্কে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথা খুব বলতে ইচ্ছে করছে,সেটি দিয়েই এ লেখাটি শেষ করবো--পা থাকিলেই হাঁটা যায় কিন্তু হাত থাকিলেই লেখা যায় না। 



লেখক পরিচিতি
চন্দন মণ্ডল
লেখক। গীতিকার। গল্পকার।
বাংলাদেশের যশোরে বাড়ি। 
কৃষিবিদ্যায় স্নাতক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন