মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

অ্যানচ্যালি ভিভাতানাচাই'এর গল্প : মা



অনুবাদ: মাজহার জীবন


দু’রাত হলো মা দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেছে।

ঘরে জানালার পর্দা অর্ধেক তোলা। কাঠের চিকন কাঠি দিয়ে জানালার সাথে ঝোলানো। সারা পর্দা জুড়ে এমব্রয়ডারি করা যেন খরগোশেরা চাঁদের দেশ ভ্রমণ করছে। গেল শনিবার ব্যাংককের ভারতীয় পণ্যে ভরা ফাহুরাত মার্কেট থেকে কেনা। এ মার্কেট কাপড়ের জন্য বিখ্যাত। আমার শোবার ঘরের বিছানার দিকটায় টানানো পর্দায় একটা বড় ফুটো। আমি আঙুল দিয়ে ফুটোটা করেছি। এখন তা স্থায়ী হয়েছে। এটা আমার দুষ্টুমীর চিহ্ন।

আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি তুমি আমাকে জোরে থাপ্পড় মারার ভয় দেখাচ্ছ। যদি আমি আবার দুষ্টুমী করি। কিন্ত মা তুমি তো ঠিকই জানো দুষ্টুমী আমি আবার করবই। ভেবে দেখোতো তোমার চুল বাঁকানোর কাল রঙের মেশিনটা কোথায়! আর তোমার বিস্কুটের কৌটাটাই বা কোথায় যেটা তুমি ক’দিন আগে পাগলের মত খুঁজছিলে! ওগুলো আমিই নিয়েছিলাম। ভাব দেখিয়েছিলাম যেন ওগুলো স্টিম রোলারের চাকা। পরে সবগুলো নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকের কাঁঠাল গাছটার নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যা একাকার হয়েছিল। এইতো মাত্র তিন চার দিন আগের কথা।

আমার মনে আছে তুমি আমাকে কোলে করে বুকে জড়িয়ে ধরতে। আমাদের দু’জনের নিজস্ব গোপন গান গাইতে গাইতে আমাকে দোল খাওয়াতে। গানটা হঠাৎ করে আমি শিখেছিলাম। প্রথমদিনই তুমি গানটা আমার কন্ঠে পছন্দ করেছিলে। আমি যেদিন গানটার সাথে নেচেছিলাম, তা দেখে খুশিতে তোমার মন ভরে গিয়েছিল। তুমি এতো মজা পেয়েছিলে যে, তুমিও গানের তালে তালে দুলেছিলে। আমার চুল বিনি করতে করতে যখন শক্ত করে চেপে ধরতে, তখন আমি কোনরকমে তোমার কাছ থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করতাম। তখন তোমার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেত। তুমি চিল্লাতে শুরু করতে আর বলতে আমার মত দুষ্টু জীবনে তুমি আর দেখনি। আমার গান তখন কান্নায় পরিণত হতো। আর তুমি তখন তাস্মরে চিৎকার করে আমার কান্না থামাতে আর বলতে নইলে আমায় মেরেই ফেলবে। আমাকে তখন তুমি গোসল করতে বাধ্য করতে।


গোসল শেষ হলে আমি চুরি করে পায়খানায় যেতাম, কাজ শেষ হলে বাড়ির পেছনে কাঁঠাল গাছের পাতা দিয়ে আমার পেছন পরিস্কার করতাম। কারণ তুমি বলেছিলে আমি বড় হচ্ছি, তাই আমাকে একাই এ কাজটি সারতে হবে। আর তখনই তুমি আমার সামনে হাজির হয়ে যেতে। বুঝতে পারতে কোথাও একটা গ-গোল হচ্ছে। আমার অসহায় অবস্থা দেখে তুমি আমার গালে থাপ্পড় লাগাতে। আর সেই তুমিই অবশেষে আমার পেছনটা পরিস্কার করে দিতে। এটা ছিল তোমার নিত্যদিনের কাজ।


আমি এখন ভাবছি, কাঁঠাল গাছ থেকে মোচা কে তুলতো তা কী এখন তুমি বুঝতে পারতে? আমিই সেই দুষ্টু যে এ কাজটি করতাম। কাঁঠালের পাতা ছিঁড়তে যেয়ে মোচাও তুলতাম। আমি বাদুড়কে দুষতাম। আর তুমি তা বিশ্বাস করতে। কারণ তুমি মাঝে মাঝে কাঁঠাল গাছটার দিকে বাদুড়ের আনাগোনা দেখতে পেতে। আমি সেই দুষ্টু মা, আমিই এ কাজটা করতাম।

সারা রাত এই বিশাল বিছানা জুড়ে আমি একা শুয়ে আছি। চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। চোখ বন্ধও করতে পারছি না। যদিও এর কোন নির্দিষ্ট কারণ নাই। তুমি বিছানার যেখানটাই ঘুমোতে ঠিক তার ওপর শুয়ে আছি। তোমার বালিশটা মাথায় দিয়ে আছি। এখন আমি কাঁদছি না। আসলে কোনকিছুই করছি না। তোমার কথা ভেবে আমার কাঁদা উচিত। তাতে কষ্ট লাঘব হবে। কারণ তুমি আমার কাছে স্পেশাল, বিশেষভাবে স্পেশাল।

নানী আর তার সাথে কয়েকজন বাদে সবাই এখন তোমাকে দেখতে প্যাগোড়ায়। এরা সবাই আমার দিকে নজর রাখছে। ডাক্তার মামা বলেছে, সব সময় আমাকে নজরে রাখতে। নানীও আমাকে ভালবাসে। তবে বাড়ির আনাচে কানাচে আমার গোপন বিষয়গুলো নানী কিছুই জানে না। আমার গুপ্তধনের সন্ধান নানী জানে না। আমি ওগুলো রান্না ঘরের পেছনে লুকিয়ে রেখেছি। দস্যুরাও তা খুঁজে পাবে না। এমনকি আলমারির পেছনে ডোরেমনের লুকোনোর প্রিয় জায়গাটারও সন্ধান জানে না নানী। ডোরেমনের দুষ্টু বিড়ালটা আমার কমিক বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে আমার সাথে খেলার জন্য ছুটে বেড়ায়। আমাকে ছাড়া কীভাবে খেলতে হয় তা ও জানে।

সবচে’ গোপন বিষয়টা একটা পরিত্যক্ত বেতের হাতব্যাগের মাঝে লুকানো। ব্যাগটাকে মা তুমি আমাদের খাটের তলায় লুকিয়ে রেখেছিলে। ব্যাগটা নিয়ে এমন গোপনীয়তা করতে আমি যেন তা কোনভাবেই নাগালে না পাই। কিন্তু তুমি তো জান না গোপনে আমি ব্যাগটা খুঁজে বের করেছি। হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় গিয়ে ব্যাগটা পেয়েছি। ব্যাগের মধ্যে যত্নে রাখা আছে সুন্দর চেহারার এক পুরুষের কয়েকটা ফোটো। ব্যাগের একেবারে ভেতরের দিকে ওগুলো লুকিয়ে রাখতে। ওই একমাত্র গোপন বিষয় যা তোমাকে আমি জিগ্যেস করার সাহস পায়নি। আমার জন্য একটা বাবা কিনে আনতে তোমাকে প্রায়ই বিরক্ত করতাম। বাবার জন্য আমার জেদ থামাতে তুমি অনেক খেলনা কিনে আনতে।

পূর্ণিমার আলো এমব্রয়ডারি করা পর্দার ফাঁক গলিয়ে আয়নায় পড়ে দোল খাচ্ছে। তুমি নাচ-গান করতে আর দশ জনের চেয়ে বেশি পছন্দ করতে। যেকোন সময় তুমি গান গাইতে শুরু করতে। কখন কখন আয়নার সামনে একান্তে গান গাইতে আর নাচতে থাকতে। কতদিন তুমি আমার কাছে ধরা পড়ে গেছ। তুমি আমাকে দেখে ফেললে লজ্জ্বায় নাচ-গান বন্ধ করে দিতে। আমার এখন সব মনে পড়ছে।

আজ রাতে আমার সামনে তোমার সব স্মৃতি ভেসে আসছে। আমার বুক তোমার জন্য কান্নায় ভারী হয়ে আসছে। জানালার টানানো পর্দাগুলো দুলছে। আমার মন আজ বিক্ষিপ্ত। বাতাসের ঝাপটা পর্দাটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দোল খাচ্ছে। সুযোগে উজ্জ্বল চাঁদের আলো ঘরটাকে আলোয় ভরে দিচ্ছে যেন ছায়ারা জীবন পাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার পাশে নাচছো। এ অনুভূতি আর ভাবনা আরো জোরালো হচ্ছে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমি কোলে তুলে আমাকে আদর করবে। তোমার কোলে শুয়ে আমাকে কাঁদতে দাও। তোমাকে পাবার জন্য এখন আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আমি চাচ্ছি আমার চাওয়া যেন সত্যি হয়। আমি আমার কান্না চেপে রাখবো তোমার ফেরার অপেক্ষায়। তুমি ফিরলে তোমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকবো। আমাকে একা ফেলে রেখে চলে যাওয়ার জন্য তখন তুমি ঠিকই কষ্ট পাবে।

ক্লিক।

ঘরে বাতি জ্বালানোর সুইচের শব্দ। ঘর আলোময় হয়ে গেল। আবছায়া আর নাই। আমি আমার ফুঁপানো থামালাম। সাথে সাথে দেয়ালের দিকে মুখ লুকালাম। নানী আমার খোঁজ নিতে এসেছে। আমি সত্যিই নানীর ওপর বিরক্ত।

‘নুই, সোনা মানিক আমার! এই দেখ আমি তোমার জন্য স্যুপ আর মিষ্টি এনেছি। সোনা আমার খেয়ে নাও’। আমি স্যুপের বাটি থেকে মুখ ফেরালাম। আমার কথা বলতেই ইচ্ছে করছে না আর খাওয়া! মাথা নাড়িয়ে নানীকে থামাতে চেষ্টা করছিলাম। আসলে ওর কাছ থেকে কোনরকমে নিস্তার পেতে চাইছিলাম। কিন্তু জানি ওর কাছ থেকে ছাড় পাওয়া কঠিন।

‘এসো তোমাকে খাইয়ে দিই। হা করো, এই যে হা করো’। আমাকে খাওয়াতে যেয়ে নানী তার অশ্রু সম্বরণ করতে পারল না। যদিও একটু আগেই আমাকে খাওয়াতে হাসি মুখে ঘরে ঢুকেছিল। আমি কয়েক লকমা মুখে নিলাম। যাতে ওর কাছে থেকে সহজে মুক্তি পাই। আমাকে খাওয়াতে পেরে নানী খুব খুশী হয়। অশ্রুসিক্ত কান্না ভরা মুখেও খুশীর রেখা ফুটে ওঠে। নানী জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দেয় যাতে বাইরের বাতাস ভেতরে ঢুকে গুমসে গরম ভাবটা চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে নানী খাবারের গামলাটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচি। আমার আগের জগতে আবার ডুবে যাই।

নানী ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে আমি লাফ দিয়ে বিছানাই চলে যাই। বাতি বন্ধ করে দিই। অন্ধকারে শুয়ে পড়ি। এখন আমার কেবল চোখের পাতা নড়াচড়া করছে। জানালা দিয়ে বাইরে চম্পা গাছের ডালের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। আমার আয়নার সামনের মেঝেতে ছায়ারা খেলছে। এটা যেন ছায়াদের নাচ। নানী জানালার পর্দা সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই চম্পা ফুলের গন্ধে আমার ঘর মৌ মৌ করছে। তবুও এ গন্ধের ব্যাপারে আমি উদাসীন। আমাকে কোন কিছুই আকর্ষণ করতে পারছে না।

মা তোমাকে পেলে আমি কি যে করব! আমি কথা দিচ্ছি জানালার পর্দায় আর ফুটো করবো না। তোমার চুল বাঁকানোর মেশিন নিয়ে আর কখনই খেলা করবো না। আর তা হারাবোও না। গাছ থেকে কাঠালের মোচা আর ছিঁড়বো না। তোমার প্রিয় মানুষটির ফোটো গোপন জায়গা থেকে বের করে আনব না। তুমি ফিরে আসো প্রিয় মা আমার! তুমি ফিরে আসো, দেখ আমার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে।

চোখের পাতার নিচের গভীর অন্ধকার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে আমাকে এখন তাকাতেই হবে। চোখ খুলতে হবে। আমার বুক জোরে জোরে কাঁপছে। ঘরের মেঝের ছায়ার দিকে তাকাতেই বুকের ধড়ফড়ানি কমে আসছে। ছায়াগুলো ঘুরছে যেন ওরা আমার খেলার সাথী।

আমি প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখি। তোমরা সবাই তা জানো। কতদিন যে আমি দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছি! আমার মনে হতো আমার চোখের ভেতরে কোন এক ডাইনি ঢুকে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। তুমি তখন কাছে টেনে নিয়ে আমায় আদর করতে। বারবার চুমু দিতে। শান্তনা দিয়ে ঘুম পাড়াতে। তুমি অভয় দিতে যতক্ষণ তুমি আমার পাশে আছ, আমার কোন ভয় নাই । তুমি বলতে সব সময় তুমি আমার পাশে থাকবে। তখন তোমার বাধ্য মেয়ের মত আমার চোখ দু’টো বন্ধ করতাম।

আমি যেন কোন এক সাগরের বেলাভূমিতে। সেখানে বালুর ভেতর গাথা গাছের শেকড়ে নিঃসঙ্গ একা বসে আছি। তখন তুমি কোথায় তা জানি না। আমার পাশে তখন কেবল দৈত্যাকার বিশাল গাছের গুড়ি। এগুলো এত পুরাতন যে তা কাল পাথরের বিশাল চাই বলে মনে হচ্ছে। গাছের শাখা প্রশাখাগুলো পেঁচানো গাট যুক্ত যা বিশাল আকারে গভীর খাদের মাঝে ছড়িয়ে আছে। এই গাছটার পেছনে প্রাগৈতিহাসিক পর্বত।

আমি ঘাড় বাড়িয়ে সব কিছু গভীর আগ্রহের সাথে দেখার চেষ্টা করছিলাম। দূরে সাগরের দিকে আমার দৃষ্টি পড়লো। আমি দেখলাম শিলাখ-এর পাদদেশ থেকে বিস্তৃত বালুরাশির সমারোহ যা সাগরে গিয়ে মিশেছে। আমি নিজে নিজেই কথা আওড়াতে শুরু করলাম। এটাকে চায়াম সাগরের বেলাভূমি বলে আমার মনে হলো। যেখানে কিছুদিন আগে আমি খেলা করেছি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনে হতে লাগলো এটা তো অন্য সাগর। এর জলরাশি অন্য সাগরের মত নীল না। কাল। ফুলে উঠা। অতলান্তিক কিন্তু স্থির। ঢেউয়ের লেশমাত্র নেই। সমগ্র দৃশ্যটাই ভয়ঙ্কর ও শ্বাসরুদ্ধকর!

আমার চারপাশে বালু আর বালু। মাঝে মাঝে গাছের শুকনো শেকড় যেখানে সেখানে বালুর মাঝে ছড়িয়ে আছে। মাটির ভেতর প্রবেশের আগে তারা জট পাকিয়ে ভেসে উঠেছে।

এরকম একটা জায়গায় নিজেকে ভেবে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়ে আমার খেলা বন্ধ করে একটা গাছের ডালে চড়ে বসলাম। ভাবলাম গাছের মগডালে চলে গেলে আমি এর শাখায় শান্তি খুঁজে পাব। কিন্তু যখনই আমি গভীর খাদের মাঝে অবস্থিত গাছটার একটা ডাল ধরতে গেলাম, মনে হলো যেন গাছটা শেকড়সহ উপড়ে পড়ে যাচ্ছে।

মুহূর্তে গাছের নিচে বিস্তৃত সাগর গর্জন শুরু করে দিল। যেন সাগরের উপরিভাগ হঠাৎ তীব্র ও গভীর শব্দে ভাগ হয়ে গেল। গর্তের মধ্যে তীব্রতার সাথে সাগরের পানি চলে যাওয়ায় সাগরের তলার নুড়ি পাথরগুলো যেন হামাগুড়ি দিতে লাগল।

সেকেন্ডেরও কম সময়ে আমার মনে হলো, যে গাছটাতে উঠেছি, তা থেকে যেন আমি একটা দরজার সামনে এসে পড়লাম। কিন্তু দরজাটা বন্ধ। এর নিচের অংশ সাগরের সাথে মিশে গেছে। তাই এর নিচ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জো নাই। গাছের ডাল ধরে কাঁপতে কাঁপতে নিচে গাছের শেকড়ের কাছে চলে এলাম। শেকড় দরজাটাকে বন্ধ রেখেছে। অতি দ্রুত গতিতে ঢেউ মাটিতে আছড়ে পড়তে লাগল। আমি এবার শক্ত করে দু’হাত দিয়ে গাছের ডাল জাপটে ধরলাম। আমার শরীর তখন শুন্যে ভাসতে থাকল। ভয়ে চিৎকার শুরু করে দিলাম। নিচে তাকিয়ে দেখলাম, গভীর গহ্বর থেকে এক ডাইনি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ডাইনিটার মুখ পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম না। কারণ ও আমার থেকে অনেক দূরে ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম ও হাসছিল আর আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছিল। এভাবেই ওপরে উঠে আসছিল। আমি আবার চিৎকার করে উঠলাম। ঊর্ধ¦শ্বাসে দৌঁড়াতে শুরু করলাম এই ভয়ে যে, ডাইনিটা আমাকে ধরে ফেলবে আর আমাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। আমি জানি যদি এমনটি ঘটে তাহলে আমি আর কখনই ঘুম থেকে জাগতে পারব না। সকালে আর উঠতে পারব না।

স্বপ্নের মধ্যে দু’চোখ খুলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু তা কোনভাবেই পারছিলাম না। এমন সময় তোমাকে দেখলাম মা। আমি জানি না আমাকে বাঁচাতে একটা মই নিয়ে কতক্ষণ তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে! মইটাকে তুমি একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে রেখেছ। মইয়ের সিঁড়ি বেয়ে এমনভাবে উঠছো যা ঐ অদ্ভুত গাছের কোন অংশ যাতে তোমাকে ছুঁতে না হয়। আমার টেডি পুতুলটা তার ফিতা দিয়ে মইটাকে গাছের সাথে এমনভাবে বাঁধল যাতে তোমার আমার কাছে উঠে আসতে কোন কষ্ট না হয়। আমি জোরে শব্দ শুনতে লাগলাম। তখন আমার চারপাশে লোকজন আনন্দে হাততালি দিচ্ছে আর ডাইনির হাত আমার থেকে আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে। তুমি তখন আমায় আলিঙ্গন করছো। আমার চোখ মুছে দিচ্ছো। আমাকে টেডি পুতুলটার কাছে নিয়ে যাচ্ছ।

তুমি একটা জাদুর তলোয়ার হাতে তুলে নিলে। তোমার সকল শক্তি দিয়ে ডাইনিটাকে টুকরো টুকরো করে নিশ্চিহ্ন করে দিলে। যেমন কাগজে পেন্সিলের আঁকিবুকি ভাল রাবার দিয়ে মুছে ফেলা যায়। এ রকম মহাবিপদ থেকে রক্ষা করলে তুমি।

আমি পানির কলকল শব্দ শুনতে পেলাম। দেখলাম সাগরের উৎসমূল থেকে প্রবল বেগে তা ছুটে আসছে। শুন্য স্থান আবার পানিতে ভরে যাচ্ছে। আমাকে তোমার পিঠে তুলে পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছিলে। এ সময় তুমি তোমার লুকানো ব্যাগের ভেতর থেকে কিছু একটা বের করলে। ক্রেয়নের একটা বড় বাক্স। আঁকার জন্য। আমি ক্রেয়ন বক্স থেকে নীল রঙ বের করে গভীরতর নীল সাগর আঁকতে লাগলাম। দেখি এসময় টেডিটা তার চিবুক চুলকাচ্ছে। এরপর ও তার ছোট ছোট আঁচড় দিয়ে সাগরের ঢেউগুলোকে ভাঙতে লাগল। যেন ঢেউগুলো একে অপরের সাথে ভেঙ্গে ভেঙ্গে তীরে এসে এক অপরের ওপর আঁচড়ে পড়তে থাকল। এ যেন তোমার আমার ছোট ছোট সুখের ঢেউ। ওখান থেকে উঠার আগে লতাপাতাহীন শীর্ণ গাছটাতে আমার ক্রেয়নের লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ রঙ দিয়ে সুশোভিত করতে থাকলাম। আমাকে ওখানে থেকে তুলে আনার আগ পর্যন্ত এ দৃশ্যাবলী অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম। আমার কাছে পুরো বিষয়টা জাদুর মত মনে হতে থাকলো।

আমি পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গত রাতের স্বপ্নের কথা তোমাকে জানালে তুমি আমাকে ভীষণ বকা দিলে। বললে ওটা হল অর্থহীন স্বপ্ন। কিন্তু আমি যখন তোমার চোখের দিকে তাকালাম, দেখলাম তুমি কিছু লুকানোর চেষ্টা করছো। আমি সারাটা দিন তোমাকে নজরে রাখলাম। রাতে শোবার সময় তুমি আমাকে সেই গোপন কথাটি বললে। এটিই আমাদের দু’জনের মাঝে সবচে’ গোপন বিষয় যা নানীও জানতে পারবে না। তুমি বললে যদি অসীম আকাশও আমাদের দু’জনকে আলাদা করতে চায়, আমাদের দু’জনের মাঝে যে ভালবাসা আছে তা সেই অসীম দূরত্ব ঘুচিয়ে আবার দু’জনকে এক করে দিবে।

গত রাতে যে ক্রয়ন আমাকে দিয়েছিলে তা আজও আবার দিয়ে আমাকে বললে, তোমার মনে যা আসে তাই আঁকো যাতে দেখা যাবে তোমাকে আমার কাছ থেকে একদিন আলাদা করে দিয়েছে।

তুমি প্রতি রাতেই আমার সাথে গল্প করতে। আমার ঘুম আসার আগ পর্যন্ত তুমি আমার পিঠ, চিবুকে মৃদু আঁচড় দিতে থাকতে। কতক্ষণ আমি ঘুমের আগে নড়াচড়া করতাম তা কোন বিষয়ই ছিল না। তুমি ঘুমোতে যাবার আগে তোমার গায়ে সুগন্ধি পাউডার মাখতে। তোমার গায়ের পাউডারের গন্ধ আমাকে ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিত যেন তা কোন মায়ের সীমাহীন ভালবাসায় তার শিশুকে দোল খাওয়ানোর মত।

আমাকে এখন নিজে নিজেই চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর জন্য সাহসী হতে হবে।

আমার বুঁজে থাকা চোখের পাতার নিচে গভীর অন্ধকার আমি পরিস্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি। যেন এ অন্ধকার দিনের আলোর মত পরিস্কার। অন্ধকারের বৃত্তগুলো যেন কাগজের ওপর ছড়িয়ে পড়া পানির ছোপ যা কাল রঙের কালি দিয়ে ঘষা হচ্ছে যতক্ষণ না তা ধূসর ম্যাড়ম্যাড়ে রঙ ধারণ করে। এ অন্ধাকার যেন ঝুলানো স্যাঁতস্যাতে কম্বল। এ অন্ধকার যেন বৃষ্টির ঢাল যা স্যাঁতস্যাতে পুরাতন পাঁচিলের সাথে হেলান দিয়ে আছে যার ভেতর দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ছে যার ফলে অদ্ভুত ধরনের গন্ধ বের হচ্ছে। আমার স্থির বিশ্বাস নিঃসঙ্গতা ও ভয়ের যদি কোন রঙ থাকে তবে তার বর্ণনা হতে পারে এটি।

হঠাৎ আমি দেখি সেই ডাইনিটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ওর মুখে শব্দহীন বিকট হাসি যেন তা ভাষাহীন চলচ্চিত্র। ও আমার দিকে যতই এগিয়ে আসছে ততই ভয়ঙ্কর লাগছে। ওর একটা চোখ ঘুরছে। আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর দাঁত খিচাচ্ছে। চোখ মেলার আগে, চোখের তারারা এক অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। আমি আর তাকাতে পারছি না। যদিও আমার চোখ বন্ধ, আমি পুরোপুরি জেগে আছি। তাই আমি যা দেখছি তা কোন কল্পনা না।

আমি নিশ্চিত আমার ঘুম আসছে। তুমি শেষবার আমাকে চালাকি করে ঘুম পাড়িয়েছিলে। আজ রাত থেকে তোমাকে ছাড়া একা একা কিভাবে থাকবো তা আমাকে ভাবতে হবে। আমার চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করলাম। আমি জানি আমার চোখের পাতার পেছনেই ঘুম। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চোখের পাতা খোলা রাখতে পারব, চোখের পাতার নিচে যায়ই থাকুক আমাকে বিরক্ত করতে পারবে না।

চম্পা গাছের পাতা দোলানো আর আয়নার সামনে নিত্যরত বাতাস হঠাৎ থেমে গেল। বাইরে ঝিঁঝির ডাক কমে আসছে। চম্পা ফুলের গন্ধ এখন বিরক্ত লাগছে। অন্ধকার মেঘ ভেদ করে চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে। জোনাকির আলো সর্বত্র জ্বল জ্বল করছে। বাগানের সব প্রান্তে ছুঁটে বেড়াচ্ছে। যতই আমি তাকাচ্ছি ততই ডাইনির কথা মনে পড়ছে যেন ও অন্তহীন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি নানীকে ডাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার কণ্ঠ থেকে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। নানী তো আমাকে দেখাশোনার জন্য সবসময় আমার আশেপাশেই থাকে কিন্তু এখন গেল কৈ? নানী এখন আমার কাছে নেই কেন? যদি দৈত্য তার শরীর, মাথা আর বড় বড় হাত নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে তাহলে তুমি আমাকে যেভাবে আগলে রাখতে মা, নানী যদি তা না করে তবে নানী থেকে আমার কী লাভ বলো?

এভাবে কয়েক ঘন্টা পার হয়ে যায়। ঘুম ঘুম ভাব আরো বাড়ে। চাঁদ মেঘের কিনার থেকে আরো আলো দিতে থাকে। বাতাস বইছে। বাতাসের কারণে চম্পা গাছের ছায়া ঘরের মেঝেতে দোল খাচ্ছে। ছায়ার চলাফেরা বাতাসের গতির ওপর নির্ভর করছে। ছায়াগুলো বেশি বাতাস হওয়ায় তা এখন আমার বিছানায় এসে পড়ছে। মনে হচ্ছে তারা যেন নাচে গানে মেতে উঠে সংগীতময়তা সৃষ্টি করেছে। এ সংগীতময়তা আরো বেড়ে গেলে আমি চাঁদের আলো উপভোগ করতে লাগলাম। চাঁদের আলোয় ফুটে থাকা ফুলের রঙ উপভোগ করতে লাগলাম। হঠাৎ আমার ক্রেয়নের বাক্সের কথা মাথায় আসল। মনে হলো বাক্সটা আমার সামনে। রামধনুর রঙ আমার সামনে ভেসে উঠল। রঙগুলোর মধ্যে সুন্দর গোলাপী রঙটা আমার পছন্দ হলো। আমার চোখ দুটো বন্ধ করলাম ও তোমাকে আাঁকতে শুরু করলাম। এ যেন সময়ের বিরুদ্ধে এক অসীম প্রতিযোগীতা। ডাইনিটা আবার আমার সামনে হাজির হলো। ও তার লম্বা লম্বা হাত দিয়ে আমার ক্রেয়নগুলো তুলে নিল। তখনও আমার ছবি আঁকা শেষ হয়নি। তখনও তোমার হাত আঁকা শেষ হয়নি যে হাত দিয়ে তুমি আমাকে আদর করবে, তোমার পেছনে আমাকে লুকিয়ে রাখবে।

তখন তুমি গান গাইতে শুরু করলে। গান গাওয়ার মধ্যে তুমি হাসছিলে। তোমার কণ্ঠ থেকে বের হওয়া গান যেন ঝর্ণা ধারার মত বইতে থাকলো। নাচের তালকে যেন সারি বাধা সৈনিক আর তোমাকে ওদের জেনারেল মনে হতে লাগল। সঙ্গীত ফল্গুধারার মত বইতে থাকল। অগণিত সুর যেন একটা বৃত্ত তৈরি করে ডাইনিটাকে আঁকড়ে ধরল। সুরের উন্মাদনা আরো বেড়ে গেল এবং ডাইনিটাকে পুরোপুরি ঘিরে ফেলল। পুরো ঘর এভাবেই তোমার গানে ভরে উঠল।

সংগীতের মূর্ছনা যখন পানির ধারার মত ধীরে ধীরে কমে আসল, আমি তখন কান্না বন্ধ করে যেখানে ডাইনিটা ছিল সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা শুরু করলাম। যেখানে ওর হাত দুটো ছিল সেখানে দুটো আঁকার তুলি দেখতে পেলাম যা আমি অনেক অনুনয় বিনয় করে তোমার কাছ থেকে আদায় করেছিলাম। আমি গোলাপী ক্রেয়নটা পাওয়ার চেষ্টা করলোম যা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। ওটা দিয়ে তোমাকে আঁকার জন্য তৎপর হলাম। তোমাকে এমনভাবে আঁকতে চাইলাম যেন তুমি সবসময় আমার সাথে থাক।

আমি এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমি অনুভব করছি তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছ। তোমার শরীর থেকে পাউডারের গন্ধ বের হচ্ছে। দু’জন দু’জনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি যেন আমরা সব কিছুর ঊর্ধে¦ উঠে গেছি এমনকি মৃত্যুও আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। তোমার শেষ গোপন কথাটি বলার আগে তুমি একবার কাঁদছ আর একবার হাসছ। তুমি বলছ, আমি যখনই তোমাকে চাইব তখনই তুমি আমার পাশে থাকবে। আমি তোমাকে আমার গাওয়া গানের মাঝে, ছড়ার মাঝে খুঁজে পাব। আমার বর্ণমালার বইয়ের মাঝে খুঁজে পাব। অক্ষর লেখার খাতায় খুঁজে পাব। আমার ড্রয়িং খাতার ছবি আকার মাঝে খুঁজে পাব। এমনকি আমার পুতুল তৈরির কাঁদার মাঝে তোমায় খুঁজে পাব।

ক্লিক

সাথে সাথে বাতি জ্বলে উঠল। ঘরটা আলোয় ভরে উঠল। আমি চোখ খুললাম। দেখলাম নানী মশারী তুলে আমাকে দেখছে।

আমি বললাম, নানী নানী আমি একটু ওভালটিন খেতে চাই। এই বলেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। নানীও আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখের পানি আমার চিবুকে গড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে ঘরের বাইরের সবাইকে জানান দিল, তোমরা সবাই দেখগো আমার নুই কথা বলছে।

‘নিট, দেখ নুই কথা বলছে। আগামীকাল সকালে ডাক্তার লেককে জানাতে হবে।’ নানী জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল, যেন কিছু বলতে শুরু করবে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল। অনেকক্ষণ বসে রইল। চম্পা ফুলের গন্ধ তাকে মোহিত করে তুলেছে। আমি সতর্কভাবে তাকে পরখ করলাম। আমার চিবুক বেয়ে নানির অশ্রু বইতে থাকল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

-------------


লেখক পরিচিতি:

অ্যানচ্যালি ভিভাতানাচাই(Anchalee Vivatanachai) ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে স্নাতক পাশ করে ঐ বছরই জেমোলজিক্যাল ইনিস্টিটিউট অব আমেরিকা (জেআইএ)তে পড়তে আমেরিকায় পাড়ি জমান। এক সন্তানের জননী স্বামীর কম্পানিতে সহায়তার পাশাপাশি নিউইয়র্কের সিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষার উপর স্নাতকোত্তর করেছেন। ‘ম্যায় ক্রাপ (প্রিয় মা)’ অ্যানচ্যালির প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প যা ১৯৮৫ সালে পেন ইন্টারন্যাশনাল থাই সেন্টার কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়। গল্পটি ‘কুরুভিন বুন-লং’-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হলো। 

অনুবাদক পরিচিতি:
মাজহার জীবন: সম্পাদক লেখালেখির উঠান। প্রকাশিত বই (সবগুলো বইয়ের সহলেখক) বাংলাদেশের দলিত সমাজ: বৈষম্য, বঞ্চনা ও অস্পৃশ্যতা দারিদ্র্য ও পুরুষতন্ত্র: বাংলাদেশে দলিত নারীর বিপন্নতা, Colonialism, Casteism and Development: South-South Cooperation as a ‘New’ Development Paradigm, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানশিক্ষা, Diaspora Philanthropy in Bangladesh ইত্যাদি।


২টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ গল্পটির চমৎকার বাংলা অনুবাদ মৌলিক গল্পের মত উপভোগ্য। ভাষা ব্যবহারে অপূর্ব দক্ষতায় কাহিনি বিন্যাস এবং চরিত্র নির্মাণে বাংলার নিজস্বতা ফুটে উঠেছে।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. এত স্নিগ্ধ ভাষা, চমৎকার অনুবাদ।

    উত্তর দিনমুছুন