মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

অলোকপর্ণা : গল্পের কাছে কী চাই



।।শব্দসহায়।। 

আমার মা আমায় কখনো কোনো গল্প বলেনি। অথবা বলেছে, কিন্তু আমার মনে নেই। মনে আছে, মা গান শোনাত,- “ও তোতাপাখিরে” আর “বাঁশবাগানের মাথার ওপর”, অগুণতি দুপুর হাপুস কেঁদেছি এই দুটো গান শুনে। এই গানগুলোয় যে গল্প সশরীরে ঢুকে নেই, তা কি বলতে পারি? অক্ষরজ্ঞানহীন ঠাকুমা, দুপুরবেলা ভাতঘুমের আগে বিকট বাতকর্মের ফাঁকে ফাঁকে, তাঁর ঢাকাই উচ্চারণে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঠিক দুখানি গল্পই বলতেন,- টুনটুনি ও রাজার গল্প এবং আপাত “অশ্লীল” ভাষায় নাপিত ও রাজার গল্প। বৈধব্য ধার্মিকভাবে পালন করতেন বলে তাঁর চুল ছিল ছোট করে ছাঁটা, সাদা থান পরতেন, এছাড়া রসকলি আঁকা সারা গা থাকতো খালি। অসংখ্য দুপুর তাঁর বটের ঝুড়ির মতো স্তন জড়িয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আউড়েছি--

“বড় মজা, বড় মজা, 
রাজা খাইল ব্যাঙ ভাজা!” 

আমার নাকে এখনো তাঁর ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ ভাসে। সেই গন্ধ রসকলি তিলকেরই ভাইবোন। 

বাবা রাতে ঘুমনোর আগে একটা ঢাউস, ছন্নছাড়া বই থেকে পড়ে শোনাত হোমারের ইলিয়াড, ওডিসির গল্প। পড়ে শোনাত পিনোকিও- জিপ্পে্‌টোর গল্পও। হাঙরের পেটের ভিতর প্রদীপ নিয়ে জিপ্পে্‌টোর বসে থাকা,- চোখ বুজলে দেখতে পেতাম। বাবা মাঝে মাঝে “ঠাকুমার ঝুলি”ও শোনাত। আর ছিল “ক্ষীরের পুতুল”, চিরকালীন তার সেই সবুজ মলাট। গল্প শুনে মুখপোড়া বানরকে আপন মনে হত। এছাড়া বাবাকে খুব করে ধরলে হারুর গল্প শোনাত। সেই হারুকে একবার নিশিতে পেতো, একবার নিত পেত্নিতে, একবার খেত ব্রহ্মদৈত্য। আবার একবার কলেরায় হারুর গ্রাম উজার, আত্মীয়রা সব প্রেত হয়ে গিয়েও শেষ ট্রেনের হারুর বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করছে। হারু বাড়ি ফিরে অন্ধকারের মধ্যে তাদের দেওয়া পান্তাভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে এবং সকালে উঠে দেখছে গ্রাম জনহীন। “হারু কে?” জিজ্ঞেস করলে বাবা সংক্ষেপে বলতো- “ছোটোবেলার বন্ধু”। 

“তিব্বতে টিনটিন” আর “পান্না কোথায়” আমার প্রথম নিজের মনে পড়া বই। তারপর যখন কাকাবাবু, ফেলুদা পড়ছি, ততদিনে পুরোপুরি পড়তে শিখে ফেলেছি। ক্লাস এইট, নাইনে তথাকথিত বড়দের জন্য লেখা উপন্যাস পড়া শুরু করি। কেউ কোনোদিন বলে দেয়নি, সেসব পড়ে তাজ্জব হতে নেই। 

গল্প আমায় রেহাই দেয়, দিয়েছে, শুরু থেকে। যখন আমি লিখিনি, লিখতে পড়তেও জানিনা,- অন্য কেউ লিখেছে, অন্য কেউ পড়ে শুনিয়েছে, অন্য কেউ বানিয়ে বলেছে, সেই থেকে শুরু করে, যখন এস এন দে-র ভিতর লুকিয়ে লুকিয়ে “প্রথম প্রতিশ্রুতি” পড়ছি,- তখনো। 

একটা লেখার খাতা, তাতে অসংখ্য লাইন টানা। আমি এই লাইনগুলোকে, কী কারণে যেন, সহ্য করতে পারিনা। মার্জিনের বাইরে তাই পেন চলে যায় যখন তখন। গল্প আমার থেকে একটু দূরেই, সবুজ মাঠে চরে বেরানো বুনো ঘোড়া, যার কোনো দায় নেই, পিছুটান নেই, গলায় নেই কোনো লাগামের ছাপ। কারণ গল্পের রাশ ধরার ক্ষমতা আমার হাতে নেই। গল্পের হাতে বরং আমার রাশ ধরা আছে। এ কী আজব অত্যাচার! অকারণেই তো। গল্প আমার অর্থ- হীন, সহায়- হীন, নাম- হীন, সে আমাকে গন্তব্যহীন একটা সাদামাটা পথে টেনে নিয়ে এসেছে। আর আমিও কেমন পিঠে মোট বোঝাই,- অহেতুক চলেছি, যেদিকে দুচোখ যায়। চড়কে ওরা যেমন জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর হাঁটে, মহরমে পিঠে আছাড় মারে ছুড়ি,- একইভাবে একদিন যদি আমার গলায় লাগামের দাগ, লাগামের যন্ত্রণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে,- মনে মনে সেদিন আমার মোচ্ছব হবে! 

একটা সময় ছিল, স্থির করে নিতাম আগামী বছর দুয়েক কী লিখতে চলেছি। নাহলে পথ চলা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। খুড়োর কলে ঝোলান এইসব লেখার পরিকল্পনার পিছনে চরৈবেতি করে, লেখার মুখাপেক্ষী হয়ে বছরগুলো পার করেছি। একটা “তারাদের ঘরবাড়ি” আমায় দুর্বিসহ একটা বছর পার করিয়ে দিয়েছে। একটা “ভাগ ভাগ রিমি ঘোষ”, কিছু সপ্তাহ পার করিয়েছে। শব্দ ভাঙিয়ে ঘুম থেকে জেগেছি, বিছানা ছেড়ে উঠেছি, কাজে যেতে পেরেছি, কাজ থেকে ফিরে খেয়ে না খেয়ে আরও কিছু শব্দ তৈরি করেছি, যা দিয়ে আবার পরের দিনটা কেটেছে। এইভাবে দিন আনি দিন খাই সম্পর্ক পেতেছি আমি গল্পের সাথে। নাহলে হয়তো এতদিনে নটে গাছটি অবিলম্বে মুড়োত। আমার গল্প পাঠককে কতদূর কী দিতে পেরেছে বা চেয়েছে, তা আমার জানা নেই, কিন্তু গল্প আমার জীবনের খান পাঁচেক বছরের শেষ পারানির কড়ি হয়ে ছিল। এখনো মনের মতো কিছু গল্প পাড়তে পারলে কিছু দিন মন ভালো থাকে। মন মরে এলে, আবার ভালো থাকার প্রয়োজনে গল্প লিখতে হয়। 

গল্পের কাছে আমি এমনই এক লোহার ঘর চেয়েছি, অথবা বুদবুদ বাড়ি। আমার সম্বল দুখানি নড়বরে রক্তশূন্য কাঁচা হাত, আর একটা মাত্র মাথা। এই মাথা গোঁজার ঠাইটুকু পেলেই আমি বর্তে যাবো। 

গল্পকে ইদানিং একটা গাছের মতো মনে হয়। কোন্‌ জন্মে যে তাকে পুঁতেছিলাম, কিচ্ছু মনে নেই। জল দিতে লাগেনি। নিজে থেকেই গজিয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ফুলগাছের মতো না, ছায়া দেওয়া বটবৃক্ষ তো আরোই নয়। বরং ঝামড়ানো কিছু পাতা মাথায় নিয়ে একপায়ে খাপছাড়া আকাশে উঠে দাঁড়িয়ে আছে। নাগালের একেবারে বাইরে। ওতে ফুল ফোটে না, তাই প্রজাপতি আসে না। কী ফল ফলে,- তাও বা কে জানে! কাক চিল শকুনে বাসা বাধে সেই গাছে মাঝে মধ্যে। আর নিচে দাঁড়িয়ে আমি লোভী চোখে দেখতে পাই, মগডালে একটা ইয়াব্বড়ো মৌচাক ঝুলছে। 

আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে, প্রাণপণে, পৃথিবীর সর্বসুখের বিনিময়ে, ওই টইটম্বুর মৌচাকে একটা মোক্ষম ঢিল পড়ার অপেক্ষায় একনিষ্ঠ দিন গুনছি।

২টি মন্তব্য:

  1. বাহ্। মোক্ষম ঢিলটি পড়ুক এই প্রত্যাশা লেখকের জন্যে।

    উত্তরমুছুন