মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মোজাফফর হোসেনের প্রবন্ধ : ন্যারেটিভ : রীতি ও নির্মিতি



শিল্পের মূলে আছে ন্যারেটিভ। কবিতা-নাটক-গল্প-উপন্যাস-মহাকাব্য থেকে চিত্রকলা-সিনেমা সবকিছুর মধ্যে ন্যারেটিভ থাকে। এই কারণে ন্যারেটিভ যদি গল্প হয় তাহলে আমরা বলতে পারি শিল্প-সাহিত্যের সবচেয়ে আদি বিষয় হলো গল্প। গল্প দিয়েই সাহিত্যের শুরু। শুধু সাহিত্য না সবধরনের শিল্পফর্মের মূলে আছে গল্প। চিনুয়া আচেবে বলছেন, মানুষ হতে হলে অবশ্যই তার একটা গল্প থাকতে হবে। মানুষের সেই গল্পটা সভ্যতার আদী থেকেই প্রথমে গল্পকথন পরে ভাষার লিখিত রূপ সৃষ্টি হলে লেখকরা লিখে আসছেন। গল্পগুলো নানাভাবে বলা হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে গুহা-অলঙ্করণ (Cave painting ev Parietal art)-এর মাধ্যমে। পরবর্তীকালে গল্প এসেছে কথারূপক (fable) ও উপরূপক (Parable) হয়ে। বিষ্ণুশর্মা বা ঈশপের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। এরপর লেখক বা গল্পকথক তাঁর কল্পনার ডানা বিস্তৃত করে রূপকথা (fairy tale)’র গল্প বলতে শুরু করেছেন। ‘ফেয়ারি টেল’ থেকে ‘ফেয়ারি’ শব্দটা বাদ দিলে থাকে ‘টেল’ অর্থাৎ আখ্যায়িকা। আখ্যায়িকার ভেতরে দিয়েই আধুনিকপূর্ব ছোটগল্প এবং উপন্যাস দুয়েরই লক্ষণ নিয়ে জন্ম হয়েছে আরেক ধরনের গল্প।

এছাড়াও পৃথিবীতে যত ধর্ম এসেছে সব ছড়িয়ে পড়েছে গল্পের মধ্য দিয়ে। যে কারণে রামায়ণ, মহাভারত বাদ দিলে হিন্দুধর্মের কঙ্কালটা কেবল থাকে। জাতক বাদ দিলে বৌদ্ধধর্ম দর্শনের প্রাণটা আর থাকে না। গ্রিক পুরাণ বা ভারতীয় পুরাণ আধুনিক পাঠকের কাছে মূখ্যত গল্পই। তোরাহ-বাইবেলের যা কিছু আমরা মনে করতে পারি, তা আমাদের কাছে এসেছে বিভিন্ন ধরনের ন্যারেটিভের ভেতর দিয়ে। এগুলোকে বলা হয় ধর্মীয় এলিগরি।

একটি গল্প বা ন্যারেটিভের সঙ্গে বক্তা বা কথকের সম্পর্ক আছে। গল্পটি কার দৃষ্টিকোণ বা পয়েন্ট অব ভিউতে বলা হচ্ছে সেই হিসেবে মোটাদাগে ন্যারেটিভ দুই প্রকার: প্রথম ব্যক্তির বয়ান ও তৃতীয় ব্যক্তির বয়ান। যখন লেখক বা কথক নিজে ন্যারেটিভের অংশ হন, নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটা বলেন, তখন তাকে প্রথম ব্যক্তির বয়ান বলে। এক্ষেত্রে গল্পটা কথকের আত্মজীবনীমূলক হয়ে ওঠে। যখন কথক নিজে কোনো গল্পের চরিত্র না হয়ে পুরো গল্পটা বর্ণনা করেন তখন তাকে তৃতীয় ব্যক্তির বয়ান বলে। এক্ষেত্রে কথক ঘটনার সর্বত্র বিরাজমান থাকেন। ফরাসি সাহিত্য-তাত্ত্বিক Gérard Genette এই দুই ধরনের ন্যারেটিভকে বলছেন: intradiegetic এবং extradiegetic ন্যারেটিভ। Intradiagetic অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তির বয়ান আবার আরও দুই প্রকার: homodiegetic ন্যারেটর নিজেই গল্পের চরিত্র থাকে। এ ধরনের ন্যারেটর অন্য চরিত্রদের মনের কথা বোঝে না, বা নিজে সাক্ষী নয়, এমন কোনো ঘটনার বর্ণনা দিতে পারে না। অন্যদিকে heterodiegetic ন্যারেটর গল্পের কোনো দৃশ্যে নিজে উপস্থিত না থেকেও অন্যান্য চরিত্রদের অভিজ্ঞতা-মনোভাব তুলে ধরতে পারে।

একটি গল্প বা উপন্যাসে একাধিক ন্যারেটর থাকতে পারে। সাধারণত মূখ্য ন্যারেটর একজনই থাকে, সেটি প্রথম ব্যক্তি বা উত্তম ব্যক্তি হতে পারে। যেমন, ফকনারের ‘অ্যাজ আই লে ডাউন’ গল্পে একাধিক ন্যারেটর আছে। ফকনার চেতনাপ্রবাহের ব্যহারের মাধ্যমে ন্যারেটরের বিষয়টি অনির্দিষ্ট করে তুলেছেন। জোসেফ কনরাডের ‘দ্যা হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসে সমস্ত গল্পটা তিনজন ব্যক্তির (মূল চরিত্র মার্লো, লেখক নিজে ও নামহীন চরিত্র) ন্যারেশনে সম্পূর্ণ হয়েছে। ন্যারেটিভ যে একটা কাহিনিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার উদাহরণ হল আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে রচিত ‘ঝোপের মধ্যে’ গল্পটি, যেটি অবলম্বন করে ‘রাশোমন’ সিনেমা তৈরি করেন পরিচালক কুরোসওয়া আকিরা। ‘ঝোপের মধ্যে’ গল্পে আমরা দেখি, একটি খুনের তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং একজন ভিক্টিম (যে খুন হলো তার আত্মা) একই ঘটনা ভিন্নভাবে ব্যক্ত করছে। খুন করলো কে এই প্রশ্নে প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রত্যেকে নিজেদের খুনি বলে দাবি করছেন। অন্যদিকে খুনির আত্মা বলছে সে আত্মহত্যা করেছে। এভাবেই ঘটনার জট খুলতে গিয়ে সেটি আরও পাকিয়ে যায়। এই গল্পের প্রতিটা চরিত্র এক একজন বর্ণনাকারী। একটি খুনের ঘটনাকে একে একে সবগুলো চরিত্রের প্রেক্ষাপট থেকে তুলে ধরা হয়। যে খুন হয়, তার ভূত এসেও ঘটনাটার আত্মবয়ান উপস্থাপন করে। বঙ্কিমের ‘রজনী’ উপন্যাসে আখ্যানভাগের বর্ণনা দিতে উঠে আসে চরিত্ররাই। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসটির তিনটি প্রধান চরিত্রের মুখ থেকে। দিলারা হাশেমের ‘আমলকীর মৌ’ উপন্যাসে মূলকথক লেখক নিজেই, মাঝে মধ্যে কথকের ভূমিকায় চলে এসেছে কেন্দ্রীয় চরিত্র সারা।

কথকের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিকে ন্যারেটিভের এই বিভাজন কেবলমাত্র কথাসাহিত্যে খাটে। কিছুটা চলচ্চিত্রেও। কিন্তু চিত্রকলা বা নৃত্যের মতো শিল্পমাধ্যমে ন্যারেটিভ অন্যভাবে কাজ করে। এখানে নির্দিষ্ট করে কোনো কথক না থাকলেও এক ধরনের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর থাকে; যে কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীর আঁকা ছবি, আর কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে শেতাঙ্গ শিল্পীর আঁকা ছবি চিনতে আমাদের অসুবিধা হয় না। চিত্রকলায় ন্যারেটিভে কিউবিজম বা কোলাজরীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দৃশ্য সরলভাবে না এঁকে ছড়িয়ে দেওয়া। তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলতে পারি Nonlinear বা disjointed narrative। দর্শক সেটা নিজের মতো করে মিলিয়ে নেবেন। না মেলালেও ক্ষতি নেই। কিউবিজম এবং বিমূর্তকরণ ন্যারেটিভরীতি চিত্রকলা থেকে আধুনিক সাহিত্যে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে শহীদুল জহিরের লেখার কথা আসতে পারে।

শহীদুল জহিরীয় ন্যারেটিভ
শহীদুল জহির কাঠামো বা ন্যারেটিভ সচেতন লেখক ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী থেকে বের হতে চেয়েছেন। তাঁর ছোটগল্পের কাহিনিতে বহির্জীবন এবং অন্তর্লোক এক রেখাতে এসে মিলিত হয়। ফলে অন্তর্বয়ান ও বহির্বয়ান একইসঙ্গে ঘটে। গল্পে ‘অথবা/হয়তো/কিংবা/বা’ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে কতগুলো সম্ভাব্য বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে সেগুলো বাতিল করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। এর ব্যাখ্যা তিনি নিজে দিয়েছেন এই বলে, ‘এইসব অপশন দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যাপারটা একটু ঘোলাটে রাখা। জিনিসটাকে যদি আপনি ছবি মনে করেন, তাহলে বলব, ছবির আউটলাইনটাকে একদম ক্লিয়ার না করা। ফটোগ্রাফিক না করা, একটু ফাজি রাখা। অর্থাৎ ছবিটাকে আমি একটু ঝাপসা রাখতে চাই।’[সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল কর্তৃক গৃহীত]

শহীদুল জহির অধিকাংশ সময় সমষ্টির বয়ানে গল্প লেখেন। অর্থাৎ মহল্লা বা ডাউনটাউনের লোকজন সেই গল্পের কথক। তিনি তাদের মুখে গল্পটা তুলে দিয়ে নিজে কিছুটা দূরে সরে যান। অনেকটা পাঠকের অবস্থানে অবস্থান করেন। ফলে তিনি গল্পে কথা বলার ধরন মিশিয়ে যে-কথন তৈরি করেন সেখানে আখ্যান বা অবয়ব বলে কিছু থাকে না। ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলীটা ভেঙে পড়ে। এজন্য তাঁকে উত্তরকাঠামোবাদী (Post-structuralist) হিসেবে আমরা ভাবতে পারি। জ্যাক দেরিদা ১৯৬৬ সালে ‘Structure, Sign, and Play in the Discourse of the Human Sciences’শীর্ষক প্রবন্ধে Freeplay of Structure-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা এখানে শহীদুল জহিরের গল্পে লক্ষ্য করা যায়। দেরিদার কথা থেকে বলা যেতে পারে, শহীদুল জহিরের গল্পে ‘The Center is at the center of the totality, and yet, since the center does not belong to the totality (is not part of the totality), the totality has its center elsewhere. The center is not the center. [Jacques Derrida, Writing and Differece, trans. Alan Bass, London: Routledge, p 278] ফলে কাহিনির ভেতর এই কেন্দ্রহীনতার কারণে আমরা তাঁর গল্পে উত্তর-আধুনিক ন্যারেটিভ পাই।

প্রচলিত কাঠামো ভাঙার ক্ষেত্রে শহীদুল জহির তাঁর গল্পে চিত্রকলার কিউবিক (Cubism) এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ্যাবস্ট্রাকশন (Abstraction) ফর্ম ব্যবহার করেছেন। ফলে গল্পটা যৌক্তিকতা (reason) ভেঙে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। পাঠককে নিজের মতো করে সেই বিচ্ছিন্ন কোলাজকে মিলিয়ে নিতে হয়। ফলে যেমন দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি হয় তেমনি পাঠকভেদে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন পাঠ। শহীদুল জহির এই ফর্মের কথা উল্লেখ করে বলছেন, ‘মার্কেসের লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, এখানে চিত্রকল্পের ফর্ম আছে। পিকাসোর গুয়েরনিকা যে ফর্মে আঁঁকা, এটা হচ্ছে কিউবিক ফর্ম। একটা জিনিস ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। তো সেই ছবিতে ঘোড়ার মাথা একদিনে পা একদিকে; বিষয়টা হচ্ছে, ঘোড়াটা বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।—আমারও মনে হয়েছে লেখাগুলো যখন যেভাবে খুশি লেখা।’[সাক্ষাৎকার, আর কে রনি কর্তৃক গৃহীত/ শহীদুল জহিরের শেষ সংলাপ ও অন্যান্য বিবেচনা]

শহীদুল জহিরীয় ন্যারেটিভ প্রবণতায় আমরা কিছু সমস্যাও দেখি। যেমন, তাঁর সমষ্টির বয়ান জেন্ডার ভাবনা থেকে নিরপেক্ষ থাকেনি। এটা হয়ে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যৌথভাষা। বা কমন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে শক্তিশালী নারী চরিত্র শহীদুল জহিরে নেই। আলাদা করে শক্তিশালী পুরুষ চরিত্র আমাদের খোঁজার প্রয়োজন হয় না কারণ ভাষা বা ন্যারেটিভের পুরো কাঠামোটাই পুরুষের। আবার শহীদুল জহিরকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিরূপে ভাবতে পারছি না এই কারণে যে, এই সমষ্টি মানবিক চেতনাকে সমন্বিত করে একটা বয়ান খাড়া করেছে।

মার্কসীয় দর্শনের কোনো লেখক লিখছেন জাদুবাস্তবতার কৌশল অবলম্বন করে। সাধারণত এমনটি ঘটে না। কারণ যারা লেখালেখির ভেতর দিয়ে সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাতে চান বা লেখালেখিকে মুভমেন্ট হিসেবে নেন তারা যতটা সম্ভব যোগাযোগবান্ধব থাকার জন্য সরল ও ঐতিহ্যগত কৌশল অবলম্বন করেন। কিন্তু শহীদুল জহির তা করেননি। তিনি বক্তব্যের দিক দিয়ে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন লেখক বটে। সেই অর্থে তার সমস্ত গল্পই পলিটিক্যাল বা সোশ্যাল এলিগরি। একটু প্যারাডক্স বলে মনে হতে পারে, তিনি বাস্তববাদী (Realist) লেখক কিন্তু লিখেছেন চেতনাপ্রবাহ বা ড্রিম-টেকনিক অবলম্বন করে। সমষ্টিগত পর্যবেক্ষণ লিখছেন একান্ত ব্যক্তিগত কথনের ভঙ্গিতে। অর্থাৎ গোটা সমষ্টিটাই যেন একক ব্যক্তি। কারণ আলাদা করে কারো কোনো বয়ান বা পর্যবেক্ষণ নেই সেখানে। এখান থেকে আমরা মিডিয়া, প্রযুক্তি ও পুঁজিবিপ্লবের সাথে সাথে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাবোধের বিলোপ ঘটতে দেখছি। শহীদুল জহির নিজের একাকীত্ববোধ থেকে ঠিক তাঁর বিপরীত অবস্থানে অর্থাৎ সমষ্টির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। এটা তাঁর নিজের একান্ত আকুতি হয়ে থাকতে পারে। হতে পারে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার বিপক্ষে। তবে এর সরল একটা উত্তর তিনি নিজে দিয়েছেন, ‘এটা (সমষ্টির বয়ান ব্যবহার করা) আমি করি, কারণ, এমন অনেক কিছুই বলা হয়, বা করা হয়, যেটা আমি পরে অস্বীকার করতে চাই— লেখক হিসাবে।—লেখক হিসাবে আমি সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারব না জেনেই জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করি, সমষ্টিক আকারে বর্ণনা করি।’[সাক্ষাৎকার,আহমাদ মোস্তফা কামাল কর্তৃক গৃহীত] অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছা বলার স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য এই বয়ানরীতি অবলম্বন করেন।

থিয়েটারে মনোলগ
থিয়েটারে মনোলগও এক ধরনের ন্যারেটিভ। প্রবন্ধতেও ন্যারেটিভ থাকতে পারে, যেমন চার্লস ল্যাম্বের প্রবন্ধগুলোর কথা স্মরণ করতে পারি। জোনাথন সুইফটয়ের স্যাটায়ারধর্মী প্রবন্ধ ‘এ মডেস্ট প্রপোজাল’ বিখ্যাত হয়েছে তার বিশেষ ধরনের ন্যারেটিভের কারণেই। সাংবাদিকতায় খবর এবং প্রতিবেদনেও ন্যারেটিভ থাকে। একটি ঘটনা ঘটে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সেটিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। একই খবরের যে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনাম দেওয়া হয়, তা ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভের কারণে।

মিউজিকেও একটা বায়বীয় ন্যারেটিভ থাকে, যে কারণে একটি গান বা যন্ত্রসংগীত শোনার সময় শ্রোতা একটি নির্দিষ্ট গল্পের রূপরেখা তার মানসপটে তৈরি করে ফেলেন। শ্রোতা তার নিজের গল্পটা সংগীতের মধ্যে দিয়ে একটা ন্যারেটিভের আকার দেওয়ার চেষ্টা করেন।

ন্যারেটিভ ও অ্যালিউশ
সাহিত্যের ন্যারেটিভে পরোক্ষ-উল্লেখ বা অ্যালিউশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি সাহিত্যকর্মে ইতিহাস-মিথ-ধর্ম কিংবা অন্য সাহিত্যকর্ম থেকে উদাহরণ টানাকে বলা হয় অ্যালিউশন। যেমন, বিশ্বসাহিত্যে নানাভাবে গ্রীক-পুরাণের কথা এসেছে। এসেছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা।

আয়রনি ও ন্যারেটিভ
ন্যারেটিভ নির্মিতিতে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আয়রনি। যেটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে এবং যা ঘটছে তার মধ্যে বিরোধাত্মক সম্পর্ক হলো আয়রনি। আয়রনি কয়েক ধরণের: ভার্বাল বা উচ্চারিত আয়রনি, সিসুয়েশন্যাল বা অবস্থানগত আয়রনি, স্ট্রাকচারাল বা কাঠামোগত আয়রনি ও ড্রামাটিক আয়রনি। ভার্বাল আয়রনি হল, যা বলা হচ্ছে তার উল্টো করা। সিসুয়েশনাল আয়রনি হল আপাত পরিস্থিতির উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। যেমন, ‘দ্য গিফট অব মাজাই’গল্পে জিম যখন হাত ঘড়ির বিক্রি করে ডেলার জন্যে চিরনি কিনছে তখন ডেলা তার মাথার চুল বিক্রি করে জিমের হাতঘড়ির জন্যে ঘড়ির চেইন কিনছে। স্ট্রাকচারাল আয়রনি হল একধরনের গঠনশৈলী এবং আখ্যানের ভেতর অন্য অর্থ তুলে আনা। জোনাথন সুইফটের ‘অ্যা মডেস্ট প্রপোজাল’হল স্ট্রাকচারাল আয়রনির উদাহরণ। সুইফট আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পথশিশু হত্যা করে খাওয়ার প্রস্তাবনা পেশ করছেন। স্বরটা সম্পূর্ণ বিনীত রেখে। কিন্তু তিনি যা বলছেন তা বোঝাতে চাচ্ছেন না। আর ড্রামাটিক আয়রনি হল, কোনো আখ্যানে যখন চরিত্রের থেকে পাঠক বেশি জেনে যায় তখন তাকে ড্রামাটিক আয়রনি বলে। যেমন, গ্রিক ড্রামা ‘অয়দিপাউস’-এ রাজা অয়দিপাউস সাবেক রাজার হন্তাকারীকে হন্যি হয়ে খুঁজে বেড়ায়। সে জানে না, সে নিজেই ঐ রাজার হন্তাকারক। কিন্তু পাঠক শুরু থেকেই জানে।

অ্যালিগরি, মেটাফর ও ন্যারেটিভ
অ্যালিগরি হলো মেটাফরের বিস্তারিত রূপ। একটা ন্যারেটিভ বা আখ্যান সামগ্রিকভাবে যখন অন্য একটা বিষয়কে উপস্থাপন করে তখন তাকে আখ্যানরূপক বা অ্যালিগরি বলে। অ্যালিগরি কয়েক প্রকারের। যেমন, সামাজিক আখ্যানরূপক বা সোশ্যাল অ্যালিগরি, রাজনৈতিক আখ্যানরূপক বা পলিটিকাল অ্যালিগরি, নীতিগত আখ্যানরূপক বা মোরাল অ্যালিগরি প্রভৃতি। এখানে উদাহরণ হিসেবে অস্কার ওয়াইল্ডের ‘হ্যাপি প্রিন্স’গল্পের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। গল্পের আপাত-অর্থের ভেতর বেশ কটি অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে আছে। বাংলাসাহিত্যে ‘একটি তুলসী গাছের আত্মকাহিনী’(সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ), ‘মহাপতঙ্গ’(আবু ইসহাক) প্রভৃতি গল্প আখ্যানরূপক গল্পের উপযুক্ত উদাহরণ। তবে বলে রাখা প্রয়োজন, অ্যালিগরির আলাদা উদাহরণ নিষ্প্রয়োজন, কেননা প্রতিটা সাহিত্যকর্মেরই একটা অ্যালিগরিক্যাল অর্থ থাকে।

জাদুবাস্তব ও পরাবাস্তব ন্যারেটিভ
সুরিয়ালিজম আর্টমুভমেন্ট বা শিল্পোন্দোলন হিসেবে চিত্রকলা হয়ে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে আলোচনায় আসে। প্রাতিষ্ঠানিক মুভমেন্ট আকারে ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুরিয়ালিজমে চেতন এবং অবচেতনের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অন্যকথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব থেকে জানা যায়, মানুষের মনের সিংহভাগই থাকে অবচেতনের দখলে। মনের অবচেতন ভাগ মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে সেখান থেকে নানা ভাবনা মানুষের চেতনার জগতে চলে আসে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতা বিষয়টি যতটা না ব্যক্তিমুখী তার চেয়ে বেশি সমাজমুখী। ম্যাজিক রিয়ালিজমে বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি তৈরি করে তার ভেতর জাদু-উপকরণের প্রবেশ ঘটানো হয়। এই দুয়ের সম্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্য হল বাস্তবতাকে ম্যাজিকের মোড়কে পরিবেশন করে মানুষের চেতনাকে ভিন্নভাবে স্পর্শ করা।

সুরিয়ালিজম এবং ম্যাজিক রিয়ালিজমে জাদু এবং বাস্তবতার মিশেল থাকে। কিন্তু পার্থক্য হলো, একটা জগত আমাদের মনের ভেতর তৈরি হয়, অন্যটা তৈরি হয় আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলে। ম্যাজিক রিয়ালিজমে আমাদের চারপাশের চেনাজানা জগতে হঠাৎ করেই অচেনা বা কল্পলোকের কোনো বিষয় উপস্থাপন করা হয়। বলার স্বরটা থাকে খুবই স্বাভাবিক, যেন সত্যিই এমনটা ঘটছে, যেন এমনটি ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পাঠকরা তাতে আশ্চর্য হলেও গল্পের চরিত্ররা চরিত্ররা আশ্চর্য হয় না। কারণ, এখানে সবকিছুকেই সম্ভব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্যারিস রিভিউতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাতিন কথাসাহিত্যের পুরোধা লেখক গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস তাঁর লেখনীর রহস্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন: যখন আপনি বলবেন, হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টা হাতি আকাশে উড়ছে, লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে। অর্থাৎ, মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন, অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে ন্যারেটিভে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবে বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কেসের ‘এ ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ ইনরমাস উইংস’, নিকলাই গোগলের ‘দ্য নোজ’, মুরাকামির ‘দ্য অ্যালিফেন্ট ভ্যানিসেস’গল্পগুলোর প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। প্রথম গল্পে বাস্তবজীবনে হঠাৎ করেই হাজির হয় ডানাওয়ালা মানুষ। গ্রামের মানুষ ভিড় করে দেখতে থাকে। দ্বিতীয় গল্পে এক ব্যক্তি হঠাৎ করে উপলব্ধি করে তার নাক উধাও হয়ে গেছে। এরপর সে বিভিন্ন জায়গায় নাকের সন্ধান চালাতে থাকে। একদিন দেখে, তার নাক তার অফিসের পোশাক পরে অফিস করতে যাচ্ছে। তৃতীয় গল্পে, হঠাৎ কড়া প্রহরা থেকে এক জলজ্যান্ত হাতি উধাও। তিনটি গল্পেই এই যাদুতুল্য ঘটনার উপস্থাপন করা হয়েছে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু বিষয়কে ইঙ্গিত করে। এ ধরনের গল্প কতটা সফল হয়ে উঠবে তা নির্ভর করে লেখকের ন্যারেটিভ-দক্ষতার উপর।

পূর্বেই বলা হয়েছে, পরাবাস্তববাদের আরেক নাম হল স্বপ্নবাস্তবতা। কাজেই পরাবাস্তব সাহিত্যে এমন পরিপাটি করে কোনোকিছু থাকে না। একটা স্বপ্নময়তা থাকে ভাষা ও চেতনায়। স্বপ্নে যেমন ঘটে যাওয়া ঘটনার ভেতর কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক থাকে না, এবং সবকিছু কেমন বিবর্ণ মনে হয়। তেমনি এখানেও ঘটনা ও ভাষায় সেই অ্যাবসার্ডিজম বা অযৌক্তিকতা থাকে। উদাহরণ হিসেবে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটগল্পের প্রবণতার কথা বলা যেতে পারে। কেননা তাঁর অনেক গল্পে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেল ঘটেছে। চেতনাপ্রবাহের বিষয়টি ন্যারেটিভে আছে। অনেক গল্পের প্লট বেশ শিথিল। এর কারণ তিনি এসব ক্ষেত্রে পূর্বপরিকল্পিত কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকেননি। প্লট শিথিল হওয়ার কারণেই চরিত্রদের চিন্তাভাবনায় যৌক্তিক কোন বন্ধন থাকে না। এজন্য জ্যোতিপ্রকাশের গল্পে কাহিনি ধরে এগুনো যায় না। ঘটনার পরস্পর সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণে খেই হারিয়ে ফেলেন পাঠক। আধুনিক মনস্তত্ত্বমূলক ও অস্তিত্ববাদী সাহিত্যে এসে প্লটের গুরুত্ব অনেক কমে গেছে। যেমন, কামু-উলফ-কাফকা-জয়েস তাঁদের উপন্যাসে প্লটের সুতা কেটে দিয়ে চরিত্রগুলোকে আখ্যানের মাঝে ছেড়ে দেন। একটা স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করেন। জ্যোতিপ্রকাশের গল্পেও তাঁর চরিত্ররা যৌক্তিক ‘শৃঙ্খল-বিযুক্ত’রীতিতে গল্পকে ধরবার বদলে তাদের বিশেষ মানসপ্রবৃত্তি অনুসারে গল্পের পরিণামকে চালিত করে। পটভূমি বা সেটিংয়ের ক্ষেত্রেও পরাবাস্তব সাহিত্যের ধারা অবলম্বন করে স্থান ও কালের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বিচিত্র ও বহুমুখী পটভূমি নির্মাণ করেন জ্যোতিপ্রকাশ। এজন্যে তাঁর গল্পে প্রায়শই কাল ও স্থান ধরা যায় না। গল্পের বিভিন্ন দৃশ্যকে তিনি চলচ্চিত্রের মতো আলাদা করে ধারণ করে montage-এর রীতি অনুসরণ করে জুড়ে দেন। জ্যাক দেরিদার Freeplay of Structure-এর ধারণার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় জ্যোতিপ্রকাশের কিছু গল্পে। কাজেই সেখানে চেতনার মতো অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এলোমেলোভাবে মিশে যায়। এ ধরনের গল্পে গল্পবলার মজলিসী ঢঙ লুপ্ত হয়।

ভাষাপ্রধান ন্যারেটিভ
ছোটগল্পের আরেক ধরনের ন্যারেটিভের সাক্ষাৎ পাই আমরা আবদুশ শাকুরের গল্পে। শাকুরের গল্পের ন্যারেটিভ ঘটনা প্রধান নয়, ভাষাপ্রধান। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ভাষা তিনি তাঁর গল্পের চরিত্রের মুখে তুলে না দিয়ে একটি নির্মিত ভাষা তুলে দিয়েছেন; যেমন শেকসপিয়ার তাঁর নাটকের চরিত্রদের উপর ভাষা আরোপ করেছিলেন। সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র ও ভাষা নির্মিতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না শাকুর। তিনি সাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে নির্মাণ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। শাকুর স্পষ্টভাবে শব্দসঙ্কোচন নয়, শব্দসমপ্রসারণের পক্ষে ছিলেন। যে কারণে তিনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আর্থার মিলারদের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ, জয়েস এবং ফকনারদের আদর্শ হিসেবে মেনেছেন। নিজের সৃষ্ট চরিত্রদের অসম্ভব বাকপটুতা নিয়ে তিনি তাঁর ‘গদ্যের কঙ্কাল’শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘তারা (চরিত্ররা) প্রায়শ আমার ভাষা নকল করে। আমি তাদের ভাষা নকল করি না। করি না, কারণ ওদের ভাষা প্রায়শ নকল্তআরোপিত বলেই নকল। ওদের আসল শব্দ হরণ করেছে শোষক সমাজ।’এরপর আবদুশ শাকুর বলছেন, আর্টে কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল হওয়ার প্রয়োজন আছে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে তাঁর ছোটগল্পে এই ‘তৈরি’ভাষা ব্যবহারের পেছনে একটা সুচিন্তিত কারণ আমরা লক্ষ্য করি। যে কারণে হয়ত শাকুরের গল্পে ভাষায় অতি আগ্রহের কারণে সাধারণ পাঠক তাঁর ‘আরোপিত পাণ্ডিত্যে’বলে তার গল্পকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। শেকসপিয়ার তাঁর নাটকের ন্যারেটিভে নির্মিত ভাষার কারণে বিখ্যাত হলেও শাকুর ছোটগল্পে এসে সেটা করতে পারেননি। এর কারণ হয়ত ছোটগল্প আর নাটক একবিষয় নয়।

মেটান্যারেটিভ বা গ্রান্ডন্যারেটিভ
আধুনিকতা অনেকগুলো বৃহৎ আদর্শ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে যা দ্বারা মানুষ গোষ্ঠীগতভাবে বিভিন্নমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত। যেমন ধর্ম, মার্কসবাদ, সাম্যবাদ, ইতিহাস, মানবিকতাবাদ প্রভৃতি। এইগুলো হলো মেটান্যারেটিভ বা গ্রান্ডন্যারেটিভ। বাংলায় বলতে পারি বিশদ প্রেক্ষাপট। উত্তরাধুনিক পর্যায়ে এসে মেটান্যারেটিভসমূহের মধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে, জেগে উঠছে ছোট ছোট বিকল্প-ন্যারেটিভ। উত্তরাধুনিকতাবাদ মেটান্যারেটিভ বা বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতসমূহের ভেতরকার সকল অসঙ্গতি-স্ববিরোধী বিষয় সমূহকেও পৃথকপৃথক ভাবে তুলে ধরছে। এই কারণে জঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার বলেছিলেন, ‘পোস্টমডার্ন মিনস ইনক্রেডুলিটি টুয়ার্ডস মেটান্যারেটিভ।’

মেটাফিকশন
মেটাফিকশন উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্যের কতগুলো প্রবণতায় সমন্বয়। মেটাফিকশনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য বা নির্ণায়ক আছে। যেমন, মোটাদাগে: একটি গল্প বলা হচ্ছে একজন ব্যক্তি বা চরিত্র সম্পর্কে, সেই ব্যক্তি বা চরিত্র আবার নিজেই ঐ গল্পের ন্যারেটিভে যুক্ত হয়ে গল্পের বাকবদল করে দিচ্ছে। অথবা, একটা গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প ঢুকে পড়েছে। অথবা, কোনো গল্পে চরিত্র নিজেই সেই গল্পের লেখক হিসেবে দাবি করছে এবং গল্পের প্লট পরিবর্তন করে দিচ্ছে। কখনো কখনো আবার পাঠকও লেখকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে গল্পের পরিণতি বদলে দিচ্ছে। অথবা, গল্পের চরিত্ররা সরাসরি পাঠকের সাথে কথা বলছে। চরিত্ররা ঐ গল্পের লেখকের আগের কোনো লেখা বা সৃষ্ট-চরিত্র নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, গল্পের চরিত্রটা অবগত থাকবে যে এটা একটা গল্প। যেমন, ‘জুমাঞ্জি’সিনেমায় কোনো বিপদ আসলে চরিত্ররা বোর্ডে গুটি চেলে তার সমাধান খোঁজে। তারা বুঝতে পারে তারা একটি গল্পের ভেতর আছে। ‘স্পেসবলস’সিনেমায়ও আমরা দেখি মহাকাশে আটকে পড়ে চরিত্ররা গেমসের মতো নির্দেশনাবলী পড়ে পরের ধাপে এগিয়ে যায়।

মেটাফিকশন শব্দটি প্রথম পরিচিত করান উইলিয়াম এইচ গাস ১৯৭০ সালে তাঁর ‘ফিকশন অ্যান্ড ফিগারস অব লাইফ’বইতে। পরে এটি নিয়ে আরও বিশদে ধারণা দেন কানাডীয় অধ্যাপক তাত্ত্বিক লিন্ডা হাসিয়ন। আত্ম-উল্লেখের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি ১০৮০ সালে মেটাফিকশনকে ‘narcissistic’বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, মেটাফিকশনে পাঠককে বার বার মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে তারা যা পড়তে সেটি বাস্তব নয়, নির্মিত। কখনো কখনো পাঠকদেরও গল্পে যুক্ত করে নেওয়া হয়। সাহিত্যতত্ত্বের অধ্যাপক ওয়েরনার উলফ বলেন, মেটাফিকশন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও হোমার থেকে রুশদি পর্যন্ত অনেকের লেখায় মেটান্যারেটিভের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

হোমারের মহাকাব্য ‘অডিসি’, সার্ভেন্তেসের ‘দন কিহোতে’উপন্যাসে মেটান্যারেটিভ টেকনিকের যথার্থ প্রয়োগ ঘটেছে। পরবর্তীকালের উপন্যাসের মধ্যে হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’র কথা বলতে হয়। তবে সামপ্রতিক বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান উত্তরাধুনিক ধারার লেখক হলেন ফরাসি কথাসাহিত্যিক জন ফাওলস্। আমি এখানে ‘দন কিহোতে’থেকে মেটাফিকশনের ন্যারেটিভরীতি সম্পর্কে ছোট্ট একটা নমুনা দিচ্ছি: উপন্যাসের ভেতর লেখক সেরভান্তেস এক জায়গায় বলছেন, মূল কাহিনিটি তাঁর নিজস্ব নয়। আরব লেখক সিদি হামিদ বেনেনগালি প্রথম দন কিহোতের জীবনী-উপন্যাস রচনা করেন। সেটির অনুবাদ হয় স্প্যানিশ ভাষায়। সেই অনুবাদ পড়েই সেরভান্তেস এই গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। অথচ মজার বিষয় হল, এর পুরোটাই সেরভান্তেসের কল্পনা। বা বানানো গল্প। সিদি হামিদ বেনেনগালি নামে কোনো আরব লেখক নেই। তাই এই উপন্যাসের মূল কাহিনিটি অনুবাদ হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।

৬০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘দন কিহোতে’-র প্রথম খণ্ড। একজন অসৎ লেখক এর দ্বিতীয় খণ্ড নিজ নামে লিখে বাজারে ছেড়ে দেন। ক্রোধে, ক্ষোভে সেরভান্তেস নিজেই আবার লিখতে লাগলেন দ্বিতীয় খণ্ড। এখানেও মজার ব্যাপার হল, বর্ণনায় মধ্যে মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, দন কিহোতে তার জীবনকাহিনি নিয়ে সেরভান্তেসের লেখা বইটি পড়েছেন, প্রথম খণ্ডটি নকল হওয়ার গল্পও তাঁর জানা আছে।

এভাবেই এখানে ফিকশনের মধ্যে বাস্তব ঢুকে গেছে। আবার উল্টো বাস্তবের মধ্যে ফিকশন ঢুকে গেছে; যেমন, লেখক বলছেন বইটি তিনি পুনলেখন করেছেন। তার একটি বাস্তবসম্মত গল্প তিনি ফেঁদেছেন, যেটি অনেকে বিশ্বাসও করেছেন। গল্পে লেখক নিজে ঢুকে পড়েছেন কোথাও কোথাও। এসব কারণে, ‘দন কিহোতে’উপন্যাসটিকে মেটাফিকশনধর্মী উপন্যাস বলা চলে।

ঢাকার মঞ্চে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার আকরাম খানের ‘দেশ’ও আনিকা মাহিনের ‘ম্যাকাব্রে’দেখেছি। দুটিই থিয়েটারে মেটাফিকশনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে মেটাফিকশ নির্মাণ-কৌশলের প্রয়োগ অনেক বেশি দেখা যায়। Joseph Kupfer দুর্দান্ত একটি বই-ই লিখেছেন এ নিয়ে। বইটির নাম Meta-Narrative in the Movies: Tell Me a Story। ন্যারেটিভের এই কৌশলগত প্রয়োগ আমরা অংশত দেখেছি আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে রচিত ‘ঝোপের মধ্যে’গল্পের ভেতর, যা নিয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। মেটান্যারেটিভ সিনেমার কথা বলতে গেলে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ইন্ডিয়ান-মার্কিন পরিচালক তারসেম সিংয়ের ‘দ্য ফল’ছবিটির কথা। মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। অনন্য এর ন্যারেটিভ শৈলি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এক শিশুকন্যাকে গল্প শোনাচ্ছে। গল্পে তারা দুজনই চরিত্র হয়ে উঠছে। গল্পের কথক এবং শ্রোতা গল্পের ভেতর নিজেদের চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলতে পারছে। আলোচনা করে তারা গল্পটির বাক পরিবর্তন করে ফেলছে।

ডায়াসপোরিক ন্যারেটিভ
ডায়াসপোরা শব্দটি গ্রিক। ‘Dia’মানে দূরে, ‘speirein’অর্থ ছড়িয়ে পড়া। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ শতাব্দীর দিকে ইসরাইল থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখন সমপ্রসারিত অর্থে, কেবল বহিষ্কৃতরা না, জীবিকার জন্য স্বেচ্ছায় দেশান্তরী হয়ে বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়েছেন এমন লোকদেরও ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডায়াসপোরা পরিস্থিতিতে বাস করছেন অর্থাৎ কোনো কারণে নির্বাসনে থেকে বা জীবিকার অন্বেষণে নিজ দেশ ছেড়ে ভিনদেশে বাস করছেন এমন পরিস্থিতিতে কোনো লেখক যে সৃজনশীল সাহিত্য রচনা করেন সেটি ডায়াসপোরা সাহিত্য। ডায়াসপোরা সাহিত্যে বিশেষ ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে।

উত্তরাধুনিক ন্যারেটিভ
উত্তরাধুনিকতা যেহেতু সব ধরনের নির্দিষ্টকরণের বিরুদ্ধে তাই উত্তরাধুনিকতার সর্বজন স্বীকৃতি একক কোনো তত্ত্ব নেই। তাত্ত্বিকরা যে যেভাবে বোঝেন, ব্যাখ্যা করেন। আধুনিকতা থেকে বের হওয়ার জন্য কতগুলো প্রবণতাকে উত্তরাধুনিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মোটা দাগে আধুনিকতার দুটো অবস্থান উত্তরাধুকিতায় খণ্ডিত হয়: এক. আধুনিকতা যে কেন্দ্রের ধারণা এনেছিল সেটা ভেঙে যায়। দুই. আধুনিকতা সবকিছু ভেতরে আদর্শবাদ ঢুকিয়ে দিয়েছিল, সেই আদর্শবাদকে প্রশ্ন তোলে উত্তরাধুনিকতা। আধুনিকতা সবকিছুর মধ্যে একটা কেন্দ্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যেমন, ইউরোপ হচ্ছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রগতির কেন্দ্র। সুবিধাভোগী শ্রেণি সবকিছুর মধ্যে একটা সরল বাইনারি অপোজিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন; যেমন: সাদা ভালো-সুশ্রী-উন্নত, কালো খারাপ-কুশ্রী-অজ্ঞ।

আধুনিকতাবাদ ইউরোপীয় ধারণা হিসেবে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয়তাবাদ হয়ে ওঠে উৎকৃষ্ট বিষয়। ফলে এই জাতীয়তাদের বশ্যতা স্বীকার করে মানুষ স্বদেশি শোষন-জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। যেমন, ঔপনিবেশিক অঞ্চলে ব্রিটিশদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অধিকাংশ ইউরোপীয় লেখক-বুদ্ধিজীবী কোনো কথা বলেননি। অর্থাৎ জাতীয়তাবোধের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়া নীতি-নৈতিকতার মতো একটি প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে গেছে।

উত্তরাধুনিকতা এই আধুনিকতার চাপিয়ে দেওয়া বা প্রতিষ্ঠানস্বরূপ আচরণের বিরুদ্ধ-ধারণা নিয়ে আমাদের মাঝে আসে। যে কোনো শাসকগোষ্ঠীর আদর্শবাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। জাতীয় সংস্কৃতির খণ্ডিত ধারণাকে বাতিল করে দেয়। কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রকে ছড়িয়ে দিতে চায়। মোটা দাগে, প্রান্ত আর কেন্দ্র বা বহির্কাঠামো ও ভেতরকাঠামো বলে কিছু থাকে না। এলিট-সাবঅলটার্ন এই বিভেদরেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। উত্তরাধুনিকতাবাদ নিজেও কোনো চিন্তার কেন্দ্র হয়ে থাকতে চায় না। ফলে এখান থেকে সাহিত্যে উত্তরাধুনিক ন্যারেটিভ তৈরি হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন